আমার শহর-ফেলে আসা কলকাতা-সুজয় রায়

জানবাজারের রানিমা জমিদার রাজচন্দ্র দাস-এর স্ত্রী বাংলার ইতিহাসে এক মহিয়সী রমণী। জানবাজারে আজকের সুরেন ব্যানার্জি রোড ও রানি রাসমণি রোডের জমিদার বাড়িতে অধিষ্ঠাত্রী ছিলেন রাসমণি দেবী। জানবাজারের যৌতুক জমি ছাড়া আরো প্রচুর জমি ছিল কলকাতার বেলেঘাটা,ট্যাংরা,ভবানীপুরে। জমিদারি ছিল খুলনা, ফরিদপুর,ও রংপুর।

রাজচন্দ্র তার দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রী রাসমণির পরামর্শে অনেক সৎ কাজ করছিলেন। যেমন গঙ্গার ঘাটে স্নানার্থীদের জন্য ঘাট তৈরি করা হয়েছিল। আজ  সেটা বাবুঘাট নামে পরিচিত। রাসমণির অনুরোধে রাজচন্দ্র নিমতলায় গঙ্গাযাত্রীদের জন্য বাড়ি ও আহিরিটোলায় গঙ্গার ঘাট বানিয়েছিলেন। নানাভাবে প্রজারক্ষায় রাসমণি দেবী ইংরাজদের বিরুদ্ধে ছিলেন নির্ভীক, যদিও তিনি ছিলেন সেকালের অন্দরমহলের নারী।

প্রজাবৎসল, সৎ জমিদার, দেশপ্রেমী রাসমণি ভারতের ধর্মীয় জীবনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। দক্ষিণেশ্বরে তিনি  কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।  তাঁর আশ্রয় লাভ করে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ভারতে ধর্মের নব নবজাগরণে অগ্রগণ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন।

দক্ষিণেশ্বর ও জানবাজারের বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ থাকতেন। পাঁচ খিলান বিস্তৃত জানবাজারে ঠাকুরদালানে তিনি দুর্গাপুজো করতেন। রানি রাসমণির জামাই মথুরবাবুর সাথে ঠাকুর রামকৃষ্ণ অনেক সময় কাটিয়েছেন এই বাড়িতে। রাসমণির কুলদেবতা ছিলেন শ্রী রঘুনাথজি। শালগ্রামশিলায় এঁর পূজা হত। রঘুনাথজির জন্য রূপোর রথ ছিল। প্রচুর ধুমধাম করে পূজা হত। রানি রাসমণি গত হলে তার পাঁচ নাতি পালা করে এই পূজা অব্যাহত রেখেছিলেন। আজ রূপোর পাত দিয়ে মোড়া সেই রথের ভগ্নদশা।

feleasa01 (Medium)১৮৪০ সালে স্বামী রাজচন্দ্র এর অকালমৃত্যুর পরে রাসমণি বার্ষিক সাত্তাত্তর লক্ষ টাকা আয়ের বিশাল জমিদারির উত্তরাধিকারিণী হয়েছিলেন।পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে সরস্বতী নদীর ধারে সপ্তগ্রাম গড়ে উঠেছিল। এই নদী ছিল বলে সেকালে সপ্তগ্রাম বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এখানে শ্রেষ্ঠী অর্থাৎ শেঠরা মুঘল সম্রাজ্যের সঙ্গে ব্যাবসা করতেন। এই সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে ব্রিটিশ পূর্বভারতের ইতিহাস লেখা যাবেনা। ষোলশ শতকের প্রথমভাগে সরস্বতী নদী পলিমাটিতে বুঁজে যায়। ছোটো নৌকা ছাড়া সমুদ্রগামী বড়ো নৌকা সপ্তগ্রামে প্রবেশ করতে পারত না। ক্রমে আজকের বড়বাজারের শেঠেদের পূর্বপুরুষ মুকুন্দরাম শেঠ ১৫৩৭ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ কালীঘাটে এসে বসতি শুরু করেন। এঁর বংশধর বৈষ্ণব শেঠ গঙ্গাজলের ব্যাবসা করতেন। নিজের নামের শীলমোহর দিয়ে কলসী কলসী গঙ্গাজল নানা জায়গায় পাঠাতেন। পূণ্যার্থীদের গঙ্গাজল বেচে বিরাট ধনী হয়েছিলেন। তার বংশধর যাদবেন্দ্র ১১৩৬ সালে বংশতলা স্ট্রিটে রাধাকান্ত জিউ ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গঙ্গাজল থিতিয়ে ঠাকুরের ভোগের ভাত, ডাল, তরকারি রান্না হত।বর্তমানে এই  রাস্তার নাম শ্রী হরিরাম গোয়েঙ্কা স্ট্রিট। বড়োবাজারের ঘনবসতি। মুকুন্দরাম শেঠ তাঁর শ্রী শ্রী গোবিন্দরাম জিউকে আজকের কালীঘাটের উত্তর-পশ্চিমে আদি-গঙ্গার সংযোগস্থানে বসতি স্থাপন করেন।কিন্তু সেই জায়গা ছিল অস্বাস্থ্যকর। পরবর্তী সময়ে মুকুন্দরাম আজকের লালদিঘী ও বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগের কাছাকাছি জঙ্গল কেটে বসতি শুরু করেন। সেই কারণে শেঠ বসাকদের জঙ্গলকাটা বাসিন্দা বলা হয়। মুকুন্দরামের ছেলে লালমোহন ওখানে পুকুর কাটিয়েছিলেন। তার নামই নাকি এখন লালদিঘী। তিনি সংলগ্ন এলাকায় বাজার বসান, যার নাম বর্তমান লালবাজার।

feleasa02 (Medium)

শেঠেরা  সুতো, কাপড়ের ব্যাবসা করতেন। পর্তুগিজ, ইংরাজ, ওলন্দাজ, ফরাসিদেরকে তা বিক্রি করতেন। লালমোহনের ছেলে গিরিধারী বরানগরে তন্তুবায়দের দাদন দিয়ে নানারকম কাপড় বানাতেন। তখন প্রতি শনিবার সুতানুটিতে হাট বসত। সেই হাটে বিদেশি বণিকরা কাপড় কিনত।গিরিধারী তাদের সঙ্গে একচেটিয়া ব্যাবসা করতেন। সুতো ও কাপড় বোনার জন্য একটা বড়ো কারখানাও ছিল।সেখানে প্রতিদিন প্রায় হাজার তন্তুবায় নিযুক্ত হতেন।এইসময় ইংল্যান্ডের ম্যাঞ্চেস্টার থেকে কাপড় আমদানি করে ভারতের শিল্প নষ্ট করা হয়নি।কিন্তু পরে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির আমলে ইংরাজদের কায়েমিস্বার্থের ফলে বাংলার শিল্প নষ্ট হয়েছিল।সাহেব আমলের আগে কোলকাতার সঙ্গে তার হিন্টারল্যান্ড বা পশ্চাদভূমির সক্রিয় ব্যাবসা ছিল।আশেপাশের কারিগর ও শিল্পীরা হাটে বিক্রি করে লাভবান হতেন।কিন্তু ইংরাজ আমলে কলকাতার পশ্চাদভূমি সম্পদশূন্য হল।সেই আমলে বৈষ্ণবচারণ শেঠ এবং শোভারাম বসাক সাহেবদের সঙ্গে ব্যাবসা করে লাভবান হয়েছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রয়োজনের সময় অনেক অর্থ দিতেন। কিন্তু তাঁরা ছিলেন ‘দাদনি বণিক’। রাজনৈতিক ক্ষমতা তাঁদের ছিলনা, সেটা ছিল সাহেবদের অধিকারে।

ইংরাজ ১৫৫৭ সালে গোবিন্দপুরে বর্তমান ফোর্ট উইলিয়ামের জন্য জায়গা প্রয়োজন হয়েছিল। শেঠরা তখন সেই জমি ছেড়ে তাঁদের কুলদেবতাকে নিয়ে বড়োবাজারে চলে আসেন। ১৮৩৮ সাল থেকে ম্যাঞ্চেস্টার থেকে  প্রচুর মিলের কাপড় আসা শুরু হয়। এতে শেঠেরা প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হন,কারণ তাঁদের ছিল কুটিরশিল্প। অগত্যা অনেকেই তাঁরা চাকরি শুরু করেন। লাটসাহেবের দেওয়ান, জাজ, সাব্‌-জাজ, মুনসিফ ইত্যাদি কাজে যোগ দেন। তাছাড়াও তাঁরা খুলে বসলেন বিস্কুট, বার্লি, কুইনাইন প্রভৃতির কারখানা। এছাড়া আরম্ভ করেন তিসির তেল ও রঙের ব্যাবসা। লিলি বিস্কুট ও বার্লির প্রতিষ্ঠাতা বিনয়কৃষ্ণ শেঠকে অনেকে মনে রেখেছেন। এছাড়া বিনয়কৃষ্ণ ‘সুষমা’ নামে কেশতেলের ব্যাবসা শুরু করেন। এছাড়া খুললেন প্রসাধন দ্রব্যের কারখানা ও ছাপাখানা। কোলকাতায় প্রথম তিনরঙা কাপড় সেখানেই ছাপা শুরু হয়।এই পরিবারে উমাচরণ শেঠ ১৮৩৮ সালে  কোলকাতা মেডিক্যাল কলেজে  প্রথম ডাক্তারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ছাত্রদের মধ্যে প্রথম স্থান পেয়েছিলেন। স্যার হরিরাম গোয়েঙ্কা স্ট্রিটে শেঠবাড়ির তিনমহল ছিল। মস্ত শেঠবাড়ি, কিন্তু রক্ষণশীল পরিবার ছিল। নাচঘর নেই, বাইজি নাচত না। স্যার হরিরাম গোয়েঙ্কা স্ট্রিটের শেঠ বাড়ির একটি গলি পরে শোভারাম বসাক স্ট্রিট। বসাক পরিবারও সমইয়োপযোগী বিভিন্ন ব্যাবসা করতেন। তাঁদের বংশধররা বিউটি পার্লার খুলেছেন। নাম ‘শৃঙ্গার লেডিজ বিউটি পার্লার’। ভাবতেও অবাক লাগে।

(ক্রমশ)

ফেলে আসা কলকাতা-র সমস্ত এপিসোড এই লিংকে একত্রে