খেলার পাতা- অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ- অনুবাদ তাপস মৌলিক

 

 KhelaAnnapurna01 Embedded (Medium)

  উচ্চতার হিসেবে অন্নপূর্ণা (৮০৯১ মিটার) বিশ্বের ১০ নম্বর পর্বতশৃঙ্গ১৯৫০ সালে ৮০০০ মিটারের চেয়ে উঁচু প্রথম শৃঙ্গ হিসেবে অন্নপূর্ণা জয় করেন মরিস হারজগের নেতৃত্বে এক ফরাসি অভিযাত্রী দল আটহাজারি শৃঙ্গগুলিতে মোট ২২টি  বিফল অভিযানের পর তাদের এই সাফল্য সারা বিশ্বে হইচই ফেলে দেয়। জয়ঢাকে ধারাবাহিকভাবে চলছে সেই অভিযান নিয়ে হারজগের লেখা রুদ্ধশ্বাস কাহিনী। এবারে সপ্তম পর্ব।

শীর্ষচিত্রঃ ২৭শে এপ্রিল, ১৯৫০ মিরিস্তি খোলার গিরিখাত ধরে এগিয়ে দেখা অন্নপূর্ণা

ফোটোঃ অন্নপূর্ণা অভিযান

 

 KhelaAnnapurna02 (Small)

যুদ্ধ ঘোষণা

বাইরে বেশ গরম। রোদের তেজে চোখ ঝলসে যায়। মেস টেন্টের ভেতরে অবশ্য আরাম। তাঁবুর ক্যানভাসের ছাউনি ভেদ করে ঢোকা সবজেটে রঙের আলোয় ভেতরটা মনোরম হয়ে আছে। আমরা সবাই জড়ো হয়েছি সেখানে। আংথারকে সবার জন্য কফির ব্যবস্থা করছে। সবাই বেশ গম্ভীর। ল্যাচেনাল হাসিঠাট্টা করে আর উদ্ভট সব কথাবার্তা বলে পরিস্থিতি একটু হালকা করার চেষ্টা করছিল বটে, কিন্তু বেশ বুঝতে পারছিলাম ভেতরে ভেতরে সে খুবই অস্থির আর অধৈর্য হয়ে রয়েছে। যাই হোক, আশা করি ঘন্টাখানেকের মধ্যেই কোনও না কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারব আমরা।

শেরপারা ব্যস্তসমস্ত ভাব নিয়ে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, খুব কাজ দেখাচ্ছে সবাই। হয়ত ভাবছে, সমস্ত সাহেব একসঙ্গে ভেতরে জরুরি মিটিং-এ বসেছে, নিশ্চয়ই এবারে হয় এসপার নয় ওসপার কিছু একটা হতে চলেছে।

“আজ মে মাসের ১৪ তারিখ,” শুরু করলাম আমি, “গত ২২শে এপ্রিল থেকে সমস্তরকম চেষ্টা সত্ত্বেও কোনও সম্ভাবনার দরজা আমরা খুলতে পারিনি। কোনও রুট আমরা ওপেন করতে পারিনি, এমনকি কোনদিকে যে এগোব তাই জানি না এখনও! কোনও কিছু নিয়েই নিশ্চিত নই আমরা! সময় খুব কম। অভিযান এরপরে কীভাবে এগোবে সেই নিয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

কেউ কোনও কথা বলল না।

“এই পাহাড়গুলো সাংঘাতিক কঠিন একেকটা চ্যালেঞ্জ। দেখা যাচ্ছে, যে রুটেই যাই না কেন, কোনও চূড়া অবধি পৌঁছতে পারার সম্ভাবনা বেশ কম। দাম্বুশ খোলা ধরে, তারপর গুপ্ত উপত্যকা হয়ে এগিয়ে ধৌলাগিরির রুটটার কথাই ধরো… দু-দু’টো ১৬০০০ ফিট উঁচু গিরিপথ পেরোতে হবে ওই রাস্তায়, তারপরে পেরোতে হবে বিস্তীর্ণ আর ভয়ানক বিপদসংকুল এক হিমবাহ… এত করে তবে কিনা তুমি পর্বতশৃঙ্গের গোড়ায় পৌঁছতে পারবে মাত্র। ওই রাস্তায় অভিযানের পরিকল্পনা করা খুবই ঝুঁকির হয়ে যাবে। পূর্ব হিমবাহের রাস্তা তো আরওই সমস্যাসংকুল। এত বিপজ্জনক রুটে গোটা অভিযানকে নিয়ে যাবার মত মারাত্মক ঝুঁকি আমি নিতে চাই না। যে রাস্তাতেই যাই না কেন, এমনিতেই অনেক বিপদআপদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। তাই জেনেশুনে ওই ভয়ংকর রাস্তায় নিয়তির হাতে নিজেদের সঁপে দিতে আমি প্রস্তুত নই। ধৌলাগিরির ব্যাপারে আর একটা জিনিসই শুধু করা যেতে পারে, তুকুচা শৃঙ্গে উঠে দেখা যে সেখান থেকে ধৌলাগিরির কোনও সম্ভাব্য রুট চোখে পড়ে কিনা! একটা মরিয়া চেষ্টা আর কি! তবে তুকুচা শৃঙ্গের উচ্চতাও ৭০০০ মিটারের ওপরে। ওতে ওঠাটাও খুব একটা সহজ হবে না, ও রাস্তাতেও অনেক বিপদের সম্ভাবনা, আর সময়ও লাগবে প্রচুর…”

“আমি বাবা ওই ধৌলাগিরিতে আর যাচ্ছি না!” টেরে বলে উঠল। ফাটলে ফাটলে ভরা ভয়ানক পূর্ব হিমবাহের স্মৃতি তার মনে এখনও টাটকা। “ও পাহাড়ে কেউ কোনোদিন চড়তে পারবে না,” টেরের ঘোষণা, “কোটি টাকা দিলেও আমি ওই রাস্তায় যাব না আর।”

শ্যাজ গম্ভীরভাবে বলল, “ধৌলাগিরিতে সুযোগ খুবই কম। সত্যি বলতে কি আমি তো কোনও আশাই দেখছি না! দক্ষিণপূর্ব গিরিশিরার রুট তো মাথায় রাখারই প্রশ্ন নেই। উত্তরপূর্ব গিরিশিরাটা কীরকম, টেরে?”

“উত্তরপূর্ব!” টেরের মতামত সদাপ্রস্তুত, “ওতে মানুষে যায়! বাঁদর হয়ে জন্মালে ভাবা যেত। পুরো গিরিশিরাটাই শক্ত কঠিন বরফে ঢাকা, আর এতটাই খাড়াই যে পা রাখার সঙ্গে হাতে ধরে ঝোলার জন্যও বরফের দেওয়ালে আইসঅ্যাক্স দিয়ে খোপ কাটতে হবে।”

আমি বললাম, “কিন্তু কোজি, অডট আর শ্যাজ যে ২৭শে এপ্রিল মিরিস্তি খোলা নদীখাতের শেষ অবধি গিয়েছিল, সেখান থেকে ওরা তো ধৌলাগিরির উত্তরপূর্ব গিরিশিরার স্কেচ এঁকে নিয়ে এসেছিল; সেই স্কেচ দেখে তো সেরকম শক্ত কিছু মনে হয়নি! তাছাড়া, টেরে যে খাড়াই অংশটার কথা বলছ, আমার তো মনে হয় সে অংশটা ১৫০০০ ফিট উচ্চতার নিচে। আর গিরিশিরার বাঁদিকে অনেক ক্রিভাস আছে, যেগুলোর মধ্যে বেশ সুন্দর তাঁবু খাটিয়ে থাকা যাবে। তাছাড়া, শক্ত জায়গাগুলিতে স্থায়ীভাবে রোপ লাগিয়ে দিলেই হয়, সবাই দড়ি ধরে ধরে উঠবে!”

আমার অকাট্য সব যুক্তি কারও খুব মনে ধরেছে বলে বোধ হল না। অনেকক্ষণ নীরবতার পর রেবুফত বলল, “হুমম, বুঝলাম! তবে কিনা ওই উত্তরপূর্ব গিরিশিরায় আগে আমাদের যে করে হোক পৌঁছতে হবে, তারপর তো এইসব প্রশ্ন!”

আমি মনে মনে খুব ভালোভাবেই জানতাম ওই রুটে কোনও আশাই নেই। তাও ইচ্ছে করেই ধৌলাগিরির পক্ষে সওয়াল করে যাচ্ছিলাম। কারণ, একবার ধৌলাগিরির পাতা উল্টে অন্য পাতায় যাওয়ার আগে আমি ধৌলাগিরির সমস্ত সম্ভাব্য রুট সম্পর্কে সবার মতামত যাচাই করে নিতে চাইছিলাম। ধৌলাগিরিকে বাতিল করার পর যেন কারও মনে বিন্দুমাত্রও আক্ষেপ না থাকে যে, ঈশ, ওই রাস্তাটা একবার পরখ করে দেখলে হত!

ফের এক দীর্ঘ নীরবতা। বোঝা যাচ্ছে সবারই কিছু না কিছু বক্তব্য আছে, কিন্তু আগ বাড়িয়ে কেউই প্রথমে মুখ খুলতে চাইছে না। শেষে কোজি, যে সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, একটু ঝুঁকে বসল, তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলতে শুরু করল, “মরিস, অন্নপূর্ণায় তবু কিছু আশা আছে!”

ব্যস! থমথমে ভাবটা কেটে গেল। সবার মুখের আগল যেন হঠাৎ খুলে গেল। সমস্বরে সবাই বলে উঠল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, অন্নপূর্ণা, অন্নপূর্ণা…।” সাহস করে অন্নপূর্ণার কথা পাড়ার জন্য সবাই কোজির পিঠ চাপড়ে দিতে লাগল। সত্যিই তো! অন্নপূর্ণার দিকেই এবার আমাদের মন দেওয়া উচিত।

“অন্নপূর্ণার শৃঙ্গের দিকে এগোতে হলে আমাদের উত্তর দিক থেকে আক্রমণ শানাতে হবে। তার জন্য প্রথমে আমাদের অন্নপূর্ণা শৃঙ্গের উত্তরে পৌঁছতে হবে। গত অনুসন্ধান পর্বে তিলিচো পাসের ক্যাম্প থেকে যা দেখলাম, সেদিক থেকে সেই দানবীয় তুষারপ্রাচীর ডিঙিয়ে অন্নপূর্ণা শৃঙ্গের উত্তরে পৌঁছনো সম্ভব নয়। শুরু করতে হবে দক্ষিণ দিক থেকে। মিরিস্তি খোলা বরাবর তার নদীখাতের শেষ সীমা অবধি আমরা ইতিমধ্যেই পৌঁছতে পেরেছি। সেখান থেকে যা দেখা গেছে তার ভিত্তিতে তিনটে সম্ভাব্য রুটের কথা আলোচনা করা যায়। এক নম্বর, উত্তরপশ্চিম গিরিশিরা। পর্বতাভিযানের পুঁথি অনুযায়ী ভাবলে ওই রুটেই আমাদের প্রথম আক্রমণ শানানো উচিত। দু’নম্বর হল অন্নপূর্ণার পশ্চিম হিমবাহ। মিরিস্তি নদীখাত যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে একটা উপগিরিশিরা (spur) উঠে গিয়ে মূল গিরিশিরায় মিশেছে। পশ্চিম হিমবাহ থেকে একটা সরু খাড়াই গলির মত বরফের নালা সেই সংযোগস্থল অবধি উঠে গেছে। মনে হয় ওই নালাটা ধরে আমরা মূল গিরিশিরায় উঠে যেতে পারব। আর সবশেষ বা তিন নম্বর রুটটা এখনও আমরা কেউ দেখিনি, তবে অন্নপূর্ণার উত্তর দিকে নিশ্চয়ই কোনও হিমবাহ থাকবে যেটা পুরো উত্তরগাত্রের তুষারপাত বা বৃষ্টি ধারণ করে নিচে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সেটা পাহাড়টার উত্তরদিকে না পৌঁছলে আমরা দেখতে পাব না।”

অডট বলল, “দেখ, পশ্চিম হিমবাহের ওই নালাটা ধরে স্পার-এর মাথায় পৌঁছনোর যে রাস্তাটার কথা বললে, সেটাই সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রুট। দু’দিনে আমরা প্রায় ২০,০০০ কিম্বা ২১,০০০ ফিট উচ্চতায় মূল গিরিশিরায় পৌঁছে যাব। অবশ্য ওই স্পার আর মূল গিরিশিরার সংযোগস্থল থেকে অন্নপূর্ণার শৃঙ্গ অবধি রাস্তার কিছুটা নিচ থেকে দেখা যায় না। আমরা কেউ জানি না ওই অংশটায় কী আছে। তবে সেরকম কোনও বাধা থাকলে সেটা এড়াতে স্পার-এর ডানদিকে ফের পশ্চিম হিমবাহে একটু নেমে এসে জায়গাটা ঘুরে যাওয়া যেতে পারে।”

“ঠিক,” কোজি যোগ করে, “আমিও ওই রুটের পক্ষে। খুব বেশি ঝামেলা ছাড়াই ও রাস্তায় আমরা অনেক উঁচুতে পৌঁছে যাব।”

শ্যাজ বলল, “আর যাই বল, ও রাস্তার সামান্য একটু অংশই এখনও অজানা। স্পার-এর মাথা থেকে অন্নপূর্ণার চূড়া অবধি রাস্তার মাঝখানের খানিকটা অংশই শুধু নিচ থেকে দেখা যাচ্ছে না। ওপরদিকের ঢালটা, যা সোজা শৃঙ্গ অবধি উঠে গেছে, সেটা তো নিচ থেকে দেখে খুব একটা শক্ত কিছু মনে হচ্ছে না। আমি নিশ্চিত, ওই অংশে তাঁবু ফেলার উপযোগী সমতল জায়গাও ঢের পাওয়া যাবে। চলো, যাওয়া যাক! তিনদিনের মধ্যে ওই অন্নপূর্ণাকে যদি না বগলদাবা করেছি…”

আমি শ্যাজের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। পরিকল্পনাটা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত বলেই আমার মনে হল। আইজ্যাককে জিগ্যেস করলাম, “তোমার কী মত, আইজ্যাক?”

“পর্বতাভিযাত্রী হিসেবে তো আমি এই অভিযানে আসিনি, মরিস! আমি সামান্য একজন ফটোগ্রাফার।”

“বটে! তিলিচো পাসে গিয়ে তো দেখলাম দিব্যি তড়বড় করে বিশহাজারি একটা শৃঙ্গে উঠে পড়লে! ঠিক আছে, অডট বলো, তোমার কী মনে হয়?”

“ধৌলাগিরিটা বড্ড বেশি ঝুঁকির হয়ে যাবে। আমি অন্নপূর্ণার পক্ষে।”

নোয়েল-এর মতও তাই। আমি রেবুফতের দিকে ঘুরলাম, “তোমার কি মনে হয় তুকুচা শৃঙ্গে উঠে একবার দেখা যেতে পারে ধৌলাগিরির অন্য কোনও রুটের হদিস মেলে কিনা?”

“আমি তো আগেই বলেছিলাম, মরিস! আমাদের শুরুই করা উচিত ছিল তুকুচা শৃঙ্গ আরোহণ দিয়ে। ওর চূড়া থেকে যে দৃশ্য দেখা যেত, তাতে চারপাশের মানচিত্রটা একদম জলের মত পরিষ্কার হয়ে যেত! এখন আর তুকুচার মাথায় ওঠার কোনও প্রশ্নই নেই। তার সময় নেই।”

জানি, একবার কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেলে গোটা দল সর্বশক্তি দিয়ে তা রূপায়িত করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে। একে একে সবার বক্তব্যই শোনা হয়েছে। এবারে সিদ্ধান্ত নেবার পালা। আর সেটা কিনা নিতে হবে আমাকেই, একা! বেশ গুরুদায়িত্ব যা হোক!

“শোন, প্রথমেই সর্বশক্তি নিয়ে অন্নপূর্ণার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে আমরা ওখানে একটা বড় অনুসন্ধানী দল পাঠাব। তাদের কাজ হবে সেরা রুট-টা বাছাই করা। এই অ্যাডভান্স পার্টি দশ দিনের খাবারদাবার নিয়ে এগোবে, প্রয়োজন হলে আরও কিছুদিনের রসদ পেছন থেকে সরবরাহ করা যেতে পারে। যে মুহূর্তে এই অগ্রবর্তী দল সম্ভাব্য রাস্তাগুলো বিচার করে সেরা রুটের ব্যাপারে মনস্থির করবে, সেই মুহূর্তে ওই দলকে অ্যাসল্ট পার্টি বা শৃঙ্গারোহণ দল হিসেবে ঘোষণা করা হবে। অবশ্য আমার থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ পেলেই এই বদলটা হবে। আর পেছনে যারা থাকবে তাদের নিশ্চিত করতে হবে, যেন এই অ্যাডভান্স পার্টিকে অ্যাসল্ট পার্টিতে বদলে ফেলার কাজটায় একদিনও সময় নষ্ট না হয়।”

“ঠিক হ্যায়, সবকুছ ফাইনাল। চলো এবার বেরিয়ে পড়ি,” শ্যাজ তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল।

“দাঁড়াও, এক মিনিট!”

সবাই চুপ।

“অনেক কথা বাকি আছে এখনও। আমাদের কার কী দায়িত্ব সেটা প্রত্যেককে ঠিকঠাক জানতে হবে। গত ২৭শে এপ্রিল যে রাস্তায় মিরিস্তি খোলা নদীখাতের শেষ অবধি যাওয়া হয়েছিল, সে রাস্তা আমাদের মধ্যে তিনজন চেনে। তিনটে দলে ভাগ হয়ে চার দিন ট্রেক করে আমরা সেই অবধি পৌঁছব। ওই তিনজন একেকটা দলকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাবে।

আইজ্যাক, রেবুফত আর আমি সবে তিলিচো ক্যাম্প থেকে ফিরেছি। তিনজনই খুব ক্লান্ত। তাছাড়া এখানে আমার অনেক কাজ জমে আছে – চিঠি লেখা, হিসেবপত্র চেক করা ইত্যাদি। হিসেব পরীক্ষা করাটা ভীষণ জরুরি; দেখতে হবে অভিযান শেষ করে ঠিকঠাক দেশে ফিরতে হলে আরও টাকাপয়সা চেয়ে পাঠাতে হবে কিনা।

ল্যাচেনাল আর টেরে আজই রওনা হোক। শেরপাদের মধ্যে থেকে আজীবা, আংদাওয়া আর দাওয়াথোন্ডুপ-কে ওরা সঙ্গে নিক। শ্যাজ, তুমি ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।

দ্বিতীয় দলে, আমি আর রেবুফত আগামীকাল বেরোব। কোজি আমাদের সঙ্গে যাবে। নোয়েল বেস ক্যাম্পে থেকে এই দলগুলোর নিয়মিত রসদ সরবরাহের কাজটা দেখাশোনা করবে। আইজ্যাক আর অডট, তোমরাও আপাতত বেস ক্যাম্পেই থাকো। আমি খবর পাঠালে তৃতীয় দল হিসেবে রওনা দেবে। তবে সেটা কমপক্ষে ছ’দিনের আগে হবে না। তাই, চাইলে এই ফাঁকে দু’জনে মিলে মুক্তিনাথ গিয়ে একটু তীর্থ-টীর্থ করে আসতে পারো।”

“আর আংথারকে কী করবে?” আইজ্যাক জিগ্যেস করল।

“ওকেও তোমাদের সঙ্গে মুক্তিনাথে নিয়ে যেতে পারো। নোয়েল আর জিবি রানা দুর্গরক্ষীর মত বেস ক্যাম্পে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকবে। আমি না বললে তোমরা কখনওই বেস ক্যাম্প ছেড়ে যাবে না। নোয়েল, তুমি তিনভাগে সমস্ত জিনিসপত্র প্যাকিং করার বন্দোবস্ত কর – অনুসন্ধান পর্বে যা যা লাগবে, শৃঙ্গারোহণের সময় যা লাগবে আর ফেরার সময় যা লাগবে। কুলিদের জোগাড় করা, তাদের সময়মত নিয়োগ করা, এসব কাজও তোমাকেই করতে হবে।”

“রওনা হতে আমি প্রস্তুত। কিন্তু কী কী নিয়ে যেতে হবে? পাহাড়ে চড়ার যন্ত্রপাতি, দড়িদড়া সবকিছু নিয়ে বেরোব নাকি?” ল্যাচেনাল জানতে চাইল।

“সবকিছু চারভাগে ভাগ কর। প্রথম ভাগ, যা তোমরা সঙ্গে নিয়ে যাবে – হালকা জামাকাপড়, টুকিটাকি, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ইত্যাদি – তোমাদের এখন বেশি শক্তিক্ষয় করলে চলবে না। দ্বিতীয় ভাগে থাকবে পাহাড়ে চড়ার যন্ত্রপাতি, রোপ, পিটন, খাবারদাবার, তাঁবু – এর জন্য কুলি লাগবে। তৃতীয় ভাগে শুধু সেইসব জিনিসই থাকবে, অনুসন্ধান দলকে শৃঙ্গারোহণ দলে রূপান্তরিত করতে গেলে যা যা দরকার – যেমন বাড়তি গরম পোশাক, ফেদার জ্যাকেট, হাই অল্টিচিউড টেন্ট, বরফে চলার যন্ত্রপাতি, স্নো বুট এসব। আর চার নম্বর, অর্থাৎ শেষ ভাগে থাকবে এই তুকুচা বেস ক্যাম্প থেকে ট্রেক করে ফিরে যাবার সময় আমাদের যা যা লাগবে। এই শেষ ভাগটা তুকুচাতেই রাখা থাকবে, একদম প্যাক করে ওপরে যার যার নাম লিখে দাও।”

সবার কাছে কার কী কী কর্তব্য একদম পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি আংথারকে-কে ডেকে সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটা ভালো করে বুঝিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেস ক্যাম্পে প্রবল একটা হৈচৈ, ছুটোছুটি, হাঁকডাক শুরু হয়ে গেল। তৈরি হওয়া মাত্র প্রথম দলটা রওনা দেবে। ওরা অবশ্য খুব বেশি মালপত্র নিয়ে বেরোচ্ছে না, কিন্তু বাকি জিনিস তো তাদের এখানে গুছিয়ে রেখে যেতে হবে! তাই চ্যাঁচামেচি, তাঁবু থেকে তাঁবুতে দৌড়োদৌড়ি, জনে জনে পরামর্শ, আলোচনা – এসব চলতেই থাকল।

ডাক্তারবাবু, মানে অডট, ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়ল। প্রথম দলের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় ওষুধপত্র সে এককাট্টা করতে লাগল – লম্বা একটা সফরের জন্য ওদের যা যা দরকার – জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ট্রেক করার সময় কী লাগতে পারে, হাই অল্টিচিউডে কী কী লাগবে, প্রতিকুল আবহাওয়ায় কী লাগতে পারে, কোনও দুর্ঘটনা হলেই বা কী প্রয়োজন – অ্যান্টি-টক্সিক সিরাম, অ্যাসপিরিন, সানবার্ন ক্রিম, ভিটামিন বি টু ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর শুরু হল ডাক্তারি পরীক্ষা। অডট একধার সে সব্বাইকে ফিট বলে ঘোষণা করে দিল। বোঝা গেল, গত তিন সপ্তাহে আমরা সবাই উচ্চতার সঙ্গে বেশ ভালোই মানিয়ে নিয়েছি।

টেরে ঠাণ্ডা মাথায় খুব মন দিয়ে তার রুকস্যাক গোছাল, তারপর বেস ক্যাম্পে তার যে প্যাকিং বাক্সটা থাকবে সেটার ওপর রং দিয়ে বড়ো বড়ো করে নিজের নাম লিখল। ল্যাচেনালের দায়িত্বে আছে পাহাড়ে চড়ার সমস্ত যন্ত্রপাতি। সে পিটন, ক্র্যাম্পন, দড়িদড়া প্যাকিং করার কাজে ডুবে গেল।

নোয়েল একটু চিন্তায় পড়ে গেছে। এখানকার সুবার সঙ্গে কুলি নিয়োগ নিয়ে জিবি রানার দর কষাকষিটা সত্যিই একটা ঝকমারি ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। নোয়েল তাদের বারবার প্রাণপণে বোঝাতে লাগল যে প্রথম দলের জন্য যে ঘোড়াগুলো চাওয়া হয়েছে সেগুলো এক্ষুনি দরকার। শেষ অবধি ঘোড়া পাওয়া গেল, তবে তাদের দেখে একেবারেই ভক্তি হল না। একটার পাগুলো ধনুকের মত বাঁকা, আরেকটা এক্কেবারে বুড়ো – তার মাথাটা মৃগী রোগীর মত এপাশে ওপাশে নড়ে চলেছে। ল্যাচেনাল আর টেরেকে পিঠে নিয়ে এ দু’টো তুকুচা পেরোতে পারে কিনা সন্দেহ! অভিযানে রওনা হওয়ার উত্তেজনায় কোথায় তারা অধৈর্য হয়ে পাথুরে মাটিতে ঘনঘন পা ঠুকবে, আকাশের দিকে মুখ তুলে হ্রেষাধ্বনি করবে, তাদের নাক দিয়ে আগুনের ফুলকি বেরোবে, তা নয়, হাড় জিরজিরে বেতো ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমোতে লাগল!

এদিকে গোছগাছ শেষ। সবাই মনে মনে লিস্ট মিলিয়ে শেষবারের মত ঝালিয়ে নিল সবকিছু নেওয়া হয়েছে কিনা। শেরপারা তাদের বোঝ তুলে নিল। যারা ক্যাম্পে থাকছে তারা ওদের সাহায্য করল। এরপর বিদায় সম্ভাষণের পালা। অবশেষে প্রথম দল অন্নপূর্ণার দিকে রওনা দিল।

KhelaAnnapurna03 Embedded (Medium)

সন্ধ্যেবেলা তাঁবুতে বসে রাতের খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি অভিযানের খরচাপাতির হিসেব ঠিকঠাক করে ফেললাম, আর প্যারিসে একটা চিঠি লিখলাম।

প্রিয় লুসিয়ান ডেভিস,                           তুকুচা, ১৫ই মে, ১৯৫০

    আমরা সবে অন্নপূর্ণার উত্তরদিক থেকে দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর এক অনুসন্ধান পর্ব সেরে ফিরেছি; ফিরেই তোমায় চিঠি লিখছি।

    প্রথমেই জানাই, আমাদের সকলের পরিবারকে তুমি আমাদের কুশল সংবাদ দিতে পারো। আমরা সবাই খুব ভালো আছি, চাঙ্গা আছি, অডটের ডাক্তারি পরীক্ষায় সবাই পাশ। অভিযানের সবাই দলবদ্ধ এবং সুসংহতভাবে চমৎকার কাজ করে চলেছে।

    এবারে অভিযানের কথায় আসি। আমাদের প্রাথমিক অনুসন্ধান পর্ব প্রায় শেষের মুখে। ধৌলাগিরির শৃঙ্গে ওঠার যে ক’টা রাস্তা আছে সেগুলো শুধু প্রচণ্ড কঠিনই নয়, কিছু কিছু অংশ অত্যন্ত বিপজ্জনক। তুলনায় অন্নপূর্ণায় যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।

    তাই গতকাল আমি অভিযানের সম্পূর্ণ শক্তি অন্নপূর্ণার দিকে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একটা বড় অনুসন্ধান দল অন্নপূর্ণায় পাঠানো হয়েছে, সময় বুঝে যেটাকে রাতারাতি শৃঙ্গারোহণ দলে রূপান্তরিত করা যাবে।

    আসলে, ধৌলাগিরি যেখানে একা একটা দানবীয় পিরামিডের মত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে অন্নপূর্ণা এক বিশাল ও বিস্তীর্ণ পর্বতপুঞ্জের প্রধান শৃঙ্গ। ওই পর্বতপুঞ্জে ২৩০০০ ফিটের চেয়ে উঁচু প্রায় পঞ্চাশটা শৃঙ্গ আছে, আছে অসংখ্য উঁচু উঁচু গিরিশিরা, আর প্রায় অগম্য এক সুউচ্চ উপত্যকা। কেবলমাত্র একটা জায়গাই অন্নপূর্ণার রক্ষণে একটু দুর্বল বলে মনে হচ্ছে, সরু নালার মতো তুষারাবৃত একটা খাড়াই গলি, যেটা পশ্চিম হিমবাহ থেকে সোজা একটি মূল গিরিশিরায় উঠে গেছে। ওই পথেই আমরা আক্রমণ শানাবো।

                                                ইতি –

                                             মরিস হারজগ

টেরে আর ল্যাচেনালের দলটা বেরিয়ে যাওয়ায় বেস ক্যাম্পটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে পড়েছে। সবাই কেমন চুপচাপ, মনখারাপ মনখারাপ ভাব। কেন এমন লাগছিল বুঝলাম না! আমাদের বন্ধুরা অভিযানে বেরিয়ে পড়েছে, আর আমরা পেছনে পড়ে আছি, সে জন্য? এখনও কি আমরা কেউ কেউ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি? নাকি সিদ্ধান্ত নিতে কোনও গণ্ডগোল হল? না এই অবসন্নতা স্রেফ ক্লান্তির জন্য? কী জানি! রেবুফত স্লিপিং ব্যাগের ভেতর নাক ডাকাচ্ছে। কিন্তু অনেক রাত অবধি আমার চোখে ঘুম এল না। বসে বসে হিসেব করলাম, বাজেট তৈরি করলাম, কাগজে আঁকিবুঁকি কাটলাম।

পরদিন সকালে ধীরে ধীরে ফের ক্যাম্প জেগে উঠল। লোকজন ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমাদের দ্বিতীয় দলটা দুপুরবেলা রওনা হবার কথা। মেস টেন্টে রান্না চাপল। শেরপারা ব্যস্তভাবে তাঁবুগুলোর মাঝে ঘোরাঘুরি শুরু করল। প্রতিদিনের মত গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়ের দল বেস ক্যাম্পের চারদিক ঘিরে অবাক চোখে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। এক বৃদ্ধ আপনমনে তকলিতে সুতো কাটতে কাটতে আমাদের কাণ্ডকারখানা জরিপ করতে লাগলেন। একজন ফেলে দেওয়া একটা খাবারের খালি টিন সাগ্রহে কুড়িয়ে নিল, যেন গুপ্তধন পেয়েছে। আরেকজন একটা পুরনো খালি কনডেনসড মিল্কের প্লাস্টিক টিউব কুড়িয়ে নিয়ে সেটাকে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে সশব্দে ফাটিয়ে দিল।

একে একে কুলিরা হাজির হতে শুরু করল। তাদের সবাইকে বিকেলে আসতে বলা হয়েছিল। সুতরাং তারা যে সকালেই চলে আসবে এতে আর আশ্চর্য কী! অপেক্ষা করা আর আমাদের গতিবিধি লক্ষ্য করা ছাড়া ওদের কিছুই করার নেই এখন। পানসি, সরকি আর আয়লা গোছগাছে ব্যস্ত। ওরা আমাদের সঙ্গে যাবে। আমি ওদের রুকস্যাক গোছানোয় কড়া নজর রাখছিলাম, কারণ, দেখেছি শেরপারা সর্বদা নিজেদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে চলতে পছন্দ করে। শৃঙ্গ অভিযানে তিন জোড়া ট্রাউজার বয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয়? বরং একটা বাড়তি রোপ নিয়ে গেলে কাজে দেবে!

মেস টেন্টে বসে নোয়েল ওয়্যারলেস সেট মারফৎ নিউজ ধরার চেষ্টা করছিল। সেখান থেকে ভারতীয় সঙ্গীতের সুর ভেসে আসছে। সেই গান হঠাৎ করে আমাদের কেমন আনমনা করে দিল। হিমালয়ের বাইরেও যে একটা জগত আছে সেটা মনে পড়ে গেল। কিছুক্ষণের জন্য মনটা কাজকর্ম ভুলে দেশে পাড়ি দিল। ফ্রান্সে ওরা কি আমাদের খবর পাচ্ছে? এখানে তো আমরা একটাও চিঠি পেলাম না। কত খবর নেওয়া হল, নেপালি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো হল, বিশেষ দূত পাঠানো হল – কিন্তু আমাদের চিঠিপত্র না মেলার রহস্যটা উন্মোচিত হল না। বাড়ির কোনও খবরই পেলাম না।

রান্না হয়ে গেলে পেট পুরে লাঞ্চ সেরে নিলাম। বেস ক্যাম্পের জম্পেশ খাবার আবার কবে পাব ঠিক নেই। দ্বিতীয় দল অর্থাৎ আমাদের রওনা হবার সময় উপস্থিত হল। গতকাল যা যা দেখেছিলাম আজ তার পুনরাভিনয় চলল। ফারাকের মধ্যে টেরের বদলে আজ রেবুফত খাবারদাবার, রসদ ইত্যাদির প্যাকিং দেখাশুনো করল; আর কোজি দেখল পাহাড়ে চড়ার যন্ত্রপাতির দিকটা। আমাদের জন্য ঘোড়া এসে উপস্থিত হল। ভাগ্য ভালো যে কুলিরা তখনও অপেক্ষা করছিল!

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। বেশ গরম আর ঘেমো আবহাওয়া। আইজ্যাক, অডট আর নোয়েলকে বিদায় জানিয়ে আমরা ঘোড়ায় চড়ে বসলাম। এবার আমাদের চূড়ান্ত অভিযানে বেরিয়ে পড়ার পালা।

KhelaAnnapurna04 Embedded (Medium)মরিস হারজগ

(এরপর আগামী সংখ্যায়)

এই লেখার সবকটা এপিসোড একত্রে এই লিংকে–>

 
   

_________