খেলার পাতা- এভারেস্ট-এরিক শিপটন- অনুবাদ বাসব চট্টোপাধ্যায়

   

আবহাওয়ার ক্রমশ অবনতি হতে থাকল। বাধ্য হয়ে নর্থকলে চারদিনের অপেক্ষা। অলস শরীরটাকে সচল করার উদ্দেশ্যে একদিন আমরা উত্তর-পূর্ব গিরিশ্রেণীর অন্তবর্তী একটি শৃঙ্গে আরোহণের চেষ্টা করতে করতে উপলব্ধি করলাম আবহাওয়ার উন্নতি না হলে উচ্চতর শিবির স্থাপন সম্ভবই নয়। সিদ্ধান্ত নিলাম আবহাওয়ার যতক্ষণ না পরিবর্তন হচ্ছে, তৃতীয় শিবিরেই আমরা অপেক্ষা করব। পুরো গ্রীষ্মকাল হাতে থাকায় নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করে পুনরায় আরোহণের সম্ভাবনা টিকে রইল। তাঁবু এবং যাবতীয় সামগ্রী নর্থ কলে ফেলে রেখে অবরোহণ শুরু করলাম। কলের চূড়া থেকে ২০০ ফুট নামার পর আমাদের অপ্রতিভ অবস্থা। গিরিগাত্রের ঢালটি ৬ ফুট গভীর এবং ১/৪ মাইল দীর্ঘ পিচ্ছিল পথ নীচে নেমে গেছে। পরিণামে হিমবাহে তুষারধ্বসের সম্ভাবনা। মনোযোগ দিয়ে আমরা বরফের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে এই ভেবে সন্তুষ্ট হলাম যে আরো তিন দিনের পরিশ্রমের ফসল হিসেবে গলিত বরফের সুগম পথে আমরা গন্তব্যে পৌঁছব।

    দুটি বিষয় আমাদের কাছে দিনের আলোর মতো তখন পরিষ্কার। প্রথমত, নর্থকলের নীচের ঢাল নিরাপদ নয়। দ্বিতীয়ত, ঐ সময় এবং স্থানের তুষার অবস্থা সম্পর্কে আমাদের বিচার করার জ্ঞানবুদ্ধি ছিল সীমিত।

তীব্র হাওয়ার দাপট থেকে আমাদের রক্ষাকর্তা তখন নর্থকলের পূর্বদিকের ঢালে তৈরি হওয়া অর্ধবৃত্তাকার বেসিন। জুলাই মাসে আমাদের মাথার ওপর সরাসরি মধ্যদিনের প্রখর সূর্য। উল্টোনো শুভ্রাকৃতি জ্বলন্ত কড়াই থেকে সবেগে তাপ নিঃসৃত হচ্ছে। নর্থকলে ২২,৫০০ ফুট উঁচুতে তাপপ্রবাহের কাছে ভারতবর্ষের সমতলের গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রাও ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। অথচ রাত বাড়তেই তাপমাত্রা শূন্যের নীচে চলে যায়। তাপমাত্রার এহেন বৈপরীত্য এই উচ্চতায় অভিযাত্রীদের পক্ষে সহ্য করে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় বিশেষত এভারেস্ট অঞ্চলে বরফের উপরের স্তর অতিরিক্ত শীতলতায় কঠিন হলেও তার তলায় বরফ নরম থেকে যায়। ফলে এখানে ভয়ংকর তুষারধ্বসের প্রবণতা বেড়ে গ্রীষ্মকালে এই ঢাল হয়ে ওঠে বিপজ্জ্বনক।

পারিপার্শ্বিক পর্বতশৃঙ্গ এবং তুষার অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি একাকি নর্থকল ছেড়ে এগিয়ে যাব। ওই অঞ্চলের তুষারের অবস্থা অগ্রসর হবার জন্য মোটামুটি ভালোই ছিল। রাতের তাপমাত্রাও সহ্যের সীমা ছাড়ায়নি। কিন্তু ২৩০০০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছোতে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন খেয়াল করলাম। ক্রমশ বাড়তে থাকল নরম তুষারের পরিমাণ, তুষারের গভীরতায় আধডোবা শরীরটাকে টেনে নিয়ে এগোতে থাকলাম ধীর গতিতে।  আগস্টের শেষে ঐ অঞ্চলের তুষার, রিজ বরাবর এগিয়ে যাবার অনুকূল হলেও অপেক্ষাকৃত উচ্চ হিমবাহে কঠিন বরফের আস্তরণ লঙ্ঘণ প্রায় অসম্ভব। উপরের স্তর শক্ত বরফের হলেও নীচের স্তরে মৌচাকের মধুর মত জলস্তর পূর্ণ।

এভারেস্টের ঐ উচ্চতায় কর্মক্ষমতা প্রায় থাকে না বললেই চলে। কত কী করার তখন বাকি। দক্ষিণের প্রধান রিজ ধরে পশ্চিম CWM- এর দিকে আমরা তখন অতিক্রম করার চেষ্টা করতে থাকলাম। দুই বা ততোধিক অংশে বিভক্ত বিন্দুতে পৌঁছেই বুঝলাম আমরা রহস্যময় CWM-এর প্রবেশদ্বারে। যেখান থেকে অবরোহণ প্রায় অসম্ভব। ২০,০০০-২৩,৬০০ ফুট উচ্চতার আমরা প্রায় ২৬টি শৃঙ্গ আরোহণ করেছিলাম। অভিযানের জরিপ বিশেষজ্ঞ মাইকেল স্পেনডর দেশের একটি বিরাট অংশের ক্ষেত্র সমীক্ষা করেছিলেন।

    আমারও ইচ্ছে ছিল পুরো শীতকাল জুড়ে হিমালয়ের বিভিন্ন উচ্চতার আবহাওয়ার সম্যক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। অভিযাত্রীদের মনে জেগে ওঠা নানা প্রশ্নের পুঙ্খানুপুঙ্খ উত্তর সন্ধান। প্রতিজ্ঞা করলাম ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে আগামী অভিযানের প্রস্তুতিতে সহযোগিতার হাত বাড়াব।

*****

    ১৯৩৬ সালে Hugh Ruttledge-র নেতৃত্বে সংগঠিত অভিযানের সদস্য ছিলাম। মুখোমুখি হয়েছিলাম এক  তিক্ত অভিজ্ঞতার। মে মাসের শুরুর দিকেই মরসুমের ছয় মাস পূর্বেই শুরু হল প্রবল বর্ষণ। নর্থকলের উচ্চতা থেকে আরো উপরের দিকে এগোনো সম্ভব হল না। ভয়াবহ তুষারধ্বসের (Avalanche) কবল থেকে কোনো রকমে রক্ষা পেয়েছিলাম।

    ১৯৩৮-এ H.W.Tilman-এর নেতৃত্বে নতুন উদ্যমে শুরু হল অন্য এক অভিযান। ওঁর সাথী হয়ে আমি পৃথিবীর বিভিন্ন শৃঙ্গ আরোহণ করেছিলাম। ছোটো ছোটো পরিচিত অভিযানগুলিই বেশি নির্বাচন করতাম। হিমালয়ের কষ্টকর বড়ো অভিযানের পদক্ষেপ নেওয়া হত কম। ১৯৩৮-এর মাত্র সাতজনের অভিযাত্রী দলে ছিলেন –Tilman, Smythe, Odell, Oliver, Lloyd, Warren এবং আমি। অভিযানের খরচ হয়েছিল মাত্র ৩০০০ পাউন্ড। পূর্বের যাবতীয় পূর্ণমাত্রার অভিযানের ব্যয় (১২০০০ পাউন্ড) অপেক্ষা এই অভিযানের খরচ অনেকাংশেই কম। মার্চের শুরুতেই সিকিম উপত্যকার তুষার পথ অতিক্রম করে রংবুক পৌঁছলাম। ৩০ জন শেরপা নিয়ে আমরা ২০শে এপ্রিল হিমবাহের উপর তৃতীয় শিবির স্থাপন করলাম।   

ক্রমশ

এভারেস্ট – এর সবকটি এপিসোড একত্রে এই লিংকে>