গল্প অন্য আলো সুব্রত নাগ শীত ২০১৯

সুব্রত নাগের আগের গল্প বাউন্সার

এক

হেডমাস্টারমশাইকে যমের মতো ভয় করলেও এ-যাত্রায় তাঁর জন্যই রামধোলাইয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেল পল্টু আর হরেন। নইলে লিকলিকে কঞ্চি হাতে অঙ্কের টিচার গোপীনাথবাবু দাঁত কিড়মিড় করতে করতে এগিয়ে আসছিলেন। অবশ্য দাঁত কিড়মিড় করার ষোলো আনার উপর আঠারো আনা কারণ ছিল। নাইন বি সেকশনের সেকেন্ড ইউনিট টেস্টের খাতা দেখাচ্ছিলেন, এগারোজন শূন্য পেয়েছে। বেশ কিছুটা দুঃখ পেয়েই বলেছিলেন, “প্লেটোর নাম শুনেছিস গাধার দল? বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক প্লেটো। কী বলেছিলেন জানিস? বলেছিলেন যে অঙ্কে ফেল করে, স্বর্গে তার প্রবেশ নিষেধ।”

বাঁদিকের সেকেন্ড বেঞ্চের কোণ থেকে কাজল ফুট কাটল। পরিষ্কার শুনতে পেলেন কাজল বলছে, “যে স্বর্গে যেতে হলে অঙ্কে পাশ করতে হয়, সেই স্বর্গে গিয়ে কাজ নেই।”

এরপর কোনও ভদ্রলোকেই আর মেজাজ সামলাতে পারেন না। কঞ্চি দিয়ে কাজলকে সপাসপ ঘা কতক দিতে-দিতেই দেখলেন লাস্ট বেঞ্চে পল্টু আর হরেন মাথা নিচু করে সন্দেহজনক কিছু করছে। বাজখাঁই গলায় হাঁক দিলেন, “অ্যাই পল্টে, কী করছিস র‌্যা?”

পল্টু নির্বিকার ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “খাতা চেক করছিলাম স্যার।”

মাথার চুল এমনি এমনি পাকেনি গোপীনাথবাবুর। হাড়বজ্জাতটার কথায় বিন্দুমাত্র বিশ্বাস না করে পাশের ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন, “অ্যাই কাবলে, বদমাশ দুটো কী করছিল র‌্যা?”

ধর্মসংকটে পড়ে গিয়ে প্রমাদ গোনে কাবুল। সদ্য টিফিন পিরিয়ডে হরেন ঘুগনি আর আইসক্রিম খাইয়েছে ওকে। ঘুগনির ঝাল ঝাল স্বর্গীয় গন্ধটা এখনও লেগে রয়েছে হাতে। এত দ্রুত বিশ্বাসঘাতকতা করাটা উচিত হবে কি না ভেবে ইতস্তত করছিল। কিন্তু স্যার কঞ্চিটা দু’বার শূন্যে দোলাতেই কাবুল আর রিস্ক না নিয়ে বলে ফেলল, “কাটাকুটি খেলছে স্যার।”

বটে! হতভাগা দুটোর পিঠে কঞ্চি ভাঙার ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা নিয়েই এগোচ্ছিলেন গোপীনাথবাবু। কিন্তু হেডমাস্টারমশাই স্বয়ং এসে উপস্থিত হওয়ায় কঞ্চির সদ্ব্যবহারটা আপাতত পেন্ডিং রেখে গোপীনাথবাবু অভ্যর্থনা জানান, “আসুন স্যার, আসুন। কিছু বলবেন?”

একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে হেডস্যার যেটা বললেন সেটা হল জেলা স্কুল দফতর থেকে একটা নোটিশ এসেছে—বিদ্যালয় নির্মল অভিযান। আগামী সপ্তাহে প্রত্যেকটি স্কুলকে এই কর্মসূচী পালন করতে হবে। স্কুলের প্রত্যেকটি ক্লাসরুম, বারান্দা, বাথরুম, জলঘর, খেলার মাঠ, সাইকেল স্ট্যান্ড সবকিছু সাফসুতরো চাই।

“ব্যাপারটাতো বেশ অভিনব।” গোপীনাথবাবু জানান হেডস্যারকে।

“নিশ্চয়ই। সেজন্য স্কুলের তরফ থেকেও বিশেষ একটা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমরা বিভিন্ন ক্লাসের মধ্যে একটা কম্পিটিশনের আয়োজন করেছি, ক্লাসরুম পরিষ্কার প্রতিযোগিতা। যে ক্লাসের ছাত্ররা সবচেয়ে সুন্দরভাবে তাদের ক্লাসরুম পরিষ্কার করবে, তাদের ফার্স্ট প্রাইজ দেওয়া হবে। মনে রেখো, ক্লিনলিনেস ইজ নেক্সট টু গডলিনেস।”

কাল থেকেই মনটা ভারি প্রসন্ন হয়ে আছে হেডস্যারের। প্রায় বারোশো ছেলের কলকাকলিতে মুখর হয়ে আছে পঁচাশি বছরের এই বিরাট স্কুল কম্পাউন্ড। একঘেয়ে পড়াশোনা আর পরীক্ষার রুটিন থেকে ছাড়া পেয়ে সম্পূর্ণ অন্যধরনের এই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে ছেলেপুলেদের আনন্দ-ফূর্তির অন্ত নেই। দুয়েকজন বয়স্ক টিচার মৃদু অনুযোগ জানিয়েছিলেন, “ক্লাসে ক্লাসে যে ছুঁচোর কেত্তন শুরু করেছে ছোঁড়াগুলো! চেল্লাচিল্লিটা একটু কমাতে বলুন।”

খুব একটা আমল দেননি হেডস্যার। বরং কিছুটা প্রশ্রয়ের হাসি হেসেই বলেছেন, “বাচ্চা তো, নতুন একটা কাজের দায়িত্ব পেয়েছে, একটু হৈ-হুল্লোড় তো করবেই।”

সিলেবাস নির্ভর অচলায়তন ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে দেখে স্মিত হাসিতে মুখ ভরে ওঠে হেডস্যারের। তবে হোঁচট খেতে হয় যখন ক্লাস নাইন এ সেকশনের ফার্স্ট বয় শুভব্রত চ্যাটার্জ্জীর বাবা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। হাল আমলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কিছুক্ষণ খেজুরে আলাপ চালিয়ে ভদ্রলোক বলেন, “একটা পারমিশন নেওয়ার ব্যাপার ছিল স্যার।”

“পারমিশন? কীসের?”

ভদ্রলোক গলা খাঁকরে বলেন, “বলছি যে স্যার, আপনাদের স্কুলে তো এখন নির্মল বিদ্যালয় সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে। তা এ ক’দিন তো ক্লাস-টাস তেমন হবে না। তাই ভেবেছিলাম ছেলেটাকে স্কুলে পাঠাব না; বরং ঘরে বসে সিলেবাস কমপ্লিট করুক। কিন্তু ওদের ক্লাস টিচার নাকি হুইপ জারি করেছেন ক্লাসের ফার্স্ট বয় থেকে লাস্ট বয়, প্রত্যেককে আসতে হবে, অ্যাটেনডেন্স মাস্ট।”

হুইপ শব্দটা হেডস্যারের কানে জোরালো ধাক্কা দিল। বললেন, “হুইপের কথা আসছে কেন? স্কুলের তরফ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মাত্র। আমরা চাই ইচ অ্যান্ড এভরি স্টুডেন্ট এই অভিনব কাজে পার্টিসিপেট করুক।”

অপ্রতিভ হলেও ভদ্রলোক কিছুটা ইতস্তত করে বলেন, “কিন্তু স্যার, ওরা এখন উঁচু ক্লাসে উঠেছে, এখন দু-তিনদিন পড়াশুনা নষ্ট হলে তো ভীষণ ক্ষতি, বলুন?”

হেডস্যার মৃদু হাসেন। “বেশ তো, আমি না হয় ওকে স্পেশ্যাল পারমিশন দিলাম। ওকে স্কুলে এসে নোংরা ঘাঁটতে হবে না। ঘরে বসে পড়াশুনা করুক আর দারুণ রেজাল্ট করুক। আপনি খুশি হবেন তো?”

ভদ্রলোক আশার আলো দেখতে পান। “হ্যাঁ স্যার, দারুণ রেজাল্টই তো আমরা চাই।”

“আর কিছু চান না?”

থতমত খান ভদ্রলোক। “আর কিছু মানে… একটা ব্রাইট ফিউচার…”

ভদ্রলোককে থামিয়ে দেন হেডস্যার। “সেই ফিউচারটা কী? শুধুই পার্সোনাল সাকসেস? র‌্যাট রেসে সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া? তালগাছের মতো সবাইকে ছাপিয়ে একা বড়ো হয়ে লাভ কী? বড়ো যদি হতে হয় তাহলে বটগাছের মতো বড়ো হোক, ডালপালা মেলে সবাইকে ছায়া দেবে।”

ভদ্রলোক তবুও কিন্তু কিন্তু করেন। “আসলে আমরা গার্জেনরা অ্যাংজাইটির মধ্যে থাকি…”

“কেন থাকবেন? বেরিয়ে আসুন আর ছেলেমেয়েদেরকেও নম্বর, কেরিয়ারের খাঁচা থেকে বের করে আনুন। সিমপ্যাথি, ফেলোফিলিং, লিডারশিপ কোয়ালিটি এগুলো স্কুলে না এলে, সামাজিক কাজে পার্টিসিপেট না করলে কীভাবে গড়ে উঠবে? জানেন তো, শিক্ষাবিজ্ঞানে একটা কথাই আছে। ‘স্কুল ইজ আ মিনিয়েচার সোসাইটি। বাই দা বাই, শুভব্রত বাড়িতে কী কী কাজ করে?”

“কিছু না।” ভদ্রলোক হাঁ হাঁ করে ওঠেন, “কোনও কাজই করতে দেওয়া হয় না। ও তো শুধু পড়াশোনা নিয়েই থাকে।”

“তাই?” হেডমাস্টার স্মিত সুরে বলেন, “আপনার সেই আদুরে ছেলে ওদের ক্লাসে লিড করছে। গোটা ক্লাস আপনার ছেলের নেতৃত্বে রুম পরিষ্কার করছে। আসুন, দেখবেন আসুন।”

তৃতীয়দিন শুরুতেই কিন্তু লেগে গেল ঝামেলা। নিজের চেয়ারে বসে টিচারদের সার্ভিস বুকগুলো চেক করছিলেন হেডস্যার, হঠাৎই একটা হৈ-হট্টগোলের আওয়াজে মুখ তুলে দেখলেন চার-পাঁচজন ছাত্র একটা ছেলেকে টানতে টানতে নিয়ে আসছে। পেছনে গেমস টিচার। একটু ঘাবড়ে গিয়েই জিজ্ঞেস করেন, “কী ব্যাপার, বিমানবাবু?”

বিমানবাবু কিছু বলার আগেই পাহারাদার ছেলেগুলো হাঁই-মাই করে ওঠে, “দেখুন না স্যার, পলাশ কী করেছে।”

হেডস্যার হাত তোলেন। “একজন। একজন বলো কী হয়েছে।”

সন্দীপন বলে, “আমরা এত কষ্ট করে রুম পরিষ্কার করলাম আর পলাশ সেখানে এক হাঁড়ি গোবর এনে ঢেলে দিয়েছে। সব নষ্ট করে দিল স্যার।”

“সত্যি?”
আবার সবাই কলবল করে ওঠে, “সত্যি স্যার। আমরা সবাই দেখেছি আর ধরে এনেছি।”
বিমানবাবু বলেন, “এ তো সাবোতাজ স্যার!”
হেডস্যার হাত নেড়ে ছাত্রদের বলেন, “তোরা ক্লাসে যা, আমি দেখছি।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছেলেগুলো চলে যায়। হেডস্যার জিজ্ঞেস করেন পলাশকে, “কী রে, এমন কাজ করলি কেন?”
চুপ করে থাকে পলাশ। বিমানবাবু এবার উঁচু গলায় বলেন, “স্যার কী জিজ্ঞেস করছেন? কেন গোবর এনে ফেললি? তোদের ক্লাস তো আর প্রাইজ পাবে না। ভালো লাগবে সেটা?”
পলাশ মাথা নিচু করেই জবাব দেয়, “আমি ক্লাস ক্যাপ্টেন হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ক্লাস টিচার সন্দীপনকে ক্যাপ্টেন করলেন।”
অবাক হন হেডস্যার। “ব্যস! এটুকুই? এই জন্য তুই নিজের ক্লাসের সর্বনাশ করলি? হ্যাঁ রে, বাড়িতে যদি বাবা-মায়ের কাছে কিছু চেয়ে না পাস, তাহলে কি রাগ করে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিবি?”
বিমানবাবুর গলা আরও চড়া। “ঠিকই তো বলেছেন স্যার। নিজের বাড়ির ক্ষতি করবি?”

মাথা নাড়ে পলাশ। হেডস্যার বলেন, “তাহলে? নিজের বাড়ির ক্ষতি করবি না, কিন্তু ক্লাসের ক্ষতি করলি! এই স্কুল, এই ক্লাসরুম এগুলো তোর নিজের বাড়ির মতো আর ক্লাসমেটরা হল নিজের ভাইয়ের মতো। এই বোধটাই যদি এখনও না হয়ে থাকে তাহলে পড়াশোনা করে আর স্কুলে এসে কী লাভ?”

“গার্জেন কল করবেন?” বিমানবাবু জানতে চান।

করাই তো উচিত, বলতে গিয়েও থমকে যান হেডস্যার। একঝলক তাকান ছেলেটার দিকে। এখনও মাথা নামিয়ে রয়েছে। অনুতাপ কিছু হল কি ছেলেটার? কী ভেবে বললেন, “থাক। আমি ওদের ক্লাসে যাচ্ছি।” পলাশকে বলেন, “চল আমার সঙ্গে। যে জায়গাটা নোংরা করেছিস, সেই জায়গাটা তুই নিজে পরিষ্কার করবি। চলুন বিমানবাবু।”

গত দু-চারদিনের মেঘ-বৃষ্টির ভ্রূকুটি কাটিয়ে আকাশ আজ আশ্চর্যরকমের সজীব। আকাশের চেয়েও আলোকিত হেডস্যারের মুখ। প্রেয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার-বারোশো ছাত্রের গুঞ্জনধ্বনিকে ছাপিয়ে উঠছিল তাঁর গলা, “অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে আমাদের এই প্রিয় বিদ্যালয় এ-বছর জেলায় নির্মল বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করেছে। গত সপ্তাহে পরিদর্শকদের যে টিম এসেছিলেন, তারা প্রত্যেক স্কুল পরিদর্শন করে আমাদের বিদ্যালয়কেই শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা দিয়েছেন। এজন্য আমি স্কুলের সমস্ত শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং প্রত্যেক ছাত্রকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষত ক্লাস টেন এ সেকশনকে আমি আলাদাভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের স্কুলের সবচেয়ে অপরিষ্কার জায়গা ছিল পশ্চিমদিকের পাঁচিলের পাশের ঝোপঝাড়গুলো। টেন-এ যে একদিনের মধ্যে ওই জঞ্জাল পরিষ্কার করেছে, তার জন্য ওদের উদ্দেশ্যে সবাই হাততালি দাও।”

“এক মিনিট স্যার।” হাততালির ঝড়টা ওঠার আগেই বিমানবাবু হেডস্যারের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলেন, “হাততালিটা আসলে কার প্রাপ্য জানেন?”
“কার আবার? সবার, গোটা ক্লাসের।”
“না স্যার, গোটা ক্লাস নয়, হাততালি প্রাপ্য এই যে, এই ছেলেটার।” বিমানবাবু পলাশকে এনে হেডস্যারের সামনে হাজির করেন।
“পলাশ!” অবাক হন হেডস্যার। “কেন, কী করেছে ও?”
“ওই তো সব করেছে। টেন-এ নয়, একা পলাশ সমস্ত ঝোপঝাড় পরিষ্কার করেছে।”
“কী বলছেন আপনি? একা ওই কাজ করা সম্ভব?”

পলাশের মাথায় হাত বুলিয়ে বিমানবাবু বলেন, “নিষ্ঠা আর জেদ থাকলে সবই সম্ভব। ইন্সপেকশনের আগের দিন স্কুল থেকে বেরোতে আমার বেশ দেরি হয়েছিল। তখন প্রায় সন্ধ্যা। সাইকেল চালিয়ে যখন ওদিকটা পেরোচ্ছি, দেখি পলাশ একটা কাটারি দিয়ে পাগলের মতো ঝোপ পরিষ্কার করছে। সাপখোপ থাকতে পারে ভেবে থামাতে গেলাম ওকে। কিন্তু ও থামল না। বলল, ‘আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে দিন স্যার।’ সন্ধ্যা হয়ে গেলে ওকে জোর করে বাড়ি নিয়ে গেলাম। পরদিন ভোরবেলা আবার আমরা চলে এলাম। ন’টার আগেই পলাশ সমস্ত ঝোপ একা সাফ করে ফেলল। একবারের জন্যেও আমাকে হাত দিতে দেয়নি।”

বিস্ময়ের পারাটা চড়তে থাকে হেডস্যারের। “যা বললেন সব সত্যি?”

“একদম সত্যি। আরও আশ্চর্যের কথা কী জানেন, সব কাজ শেষ করে পলাশ বলেছিল ওর নাম নয়, ওর ক্লাসের নাম জানাতে।”

গোটা প্রেয়ার লাইন জুড়ে নিস্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে। হেডস্যার পলাশকে ডাকেন, “শোন, এদিকে আয় আমার কাছে।”

পলাশ পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে। হেডস্যার তার মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন খোঁজার চেষ্টা করেন। তারপর জিজ্ঞেস করেন, “তুই একা একা এত জঙ্গল পরিষ্কার করেছিস? তোর কষ্ট হল না?”

পলাশ মাথা নিচু করেই জবাব দেয়, “সেদিন রাগ করে নিজের ভুলে ক্লাসের ফার্স্ট হওয়ার আশা নষ্ট করে দিয়েছিলাম। তাই ঠিক করেছিলাম, যে করেই হোক স্কুলকে ফার্স্ট করতেই হবে। তাই স্যার প্রায়শ্চিত্ত করতেই…”

কথাটা শেষ করতে পারে না পলাশ, তার আগেই হেডস্যার তাকে বুকে টেনে নিয়েছেন। স্তব্ধতার আগল কাটিয়ে গোটা স্কুল তখন গর্জে উঠেছে, “থ্রি চিয়ার্স ফর কামাক্ষাপ্রসাদ বয়েজ হাই স্কুল! হিপ হিপ হুররে! থ্রি চিয়ার্স ফর পলাশ! হিপ হিপ হুররে!”

নিত্যনতুন ঝামেলায় ব্যতিব্যস্ত হতে হতে কতবার হেডমাস্টারের চেয়ারটা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছেন। কিন্তু এইসব অলৌকিক মুহূর্তগুলোর সাক্ষী থাকার জন্যেই বোধহয় ওই চেয়ারটা চিরকাল আঁকড়ে থাকা যায়। বুকের কাছে একটা ভেজা ভেজা গরম অনুভূতি হয় হেডস্যারের। বোঝেন, পলাশ কাঁদছে। দু’হাতে ওর মুখটা তুলে ধরতেই চোখে পড়ে কান্না ভেজা কিশোর মুখটাতে অন্যধরনের অদ্ভুত এক আলো এসে পড়েছে। বহু অভিজ্ঞতা-ঋদ্ধ হেডস্যার জানেন অন্য এই আলো বড়ো অবহেলায় সূর্যতেজকেও হারিয়ে দিতে পারে আর প্রিয় ছাত্রের মুখে এই আলোটুকু দেখার জন্যেই একটা গোটা শিক্ষকজন্ম অনায়াসে পার করে দেওয়া যায়।

অলঙ্করণঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s