বনের ডায়েরি-অচানকমার টাইগার রিজার্ভ-রিশলু লাহিড়ী

bonerDiaryacanakmar01 (Medium)ইংরাজি লেখাটি Sanctuary Asia-২০০৮ এর আগস্ট ইস্যুতে প্রকাশিত হয়েছে ) মূল ইংরিজি লেখা থেকে ভাষান্তর স্বপ্না লাহিড়ী

মে মাসের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সূর্য সারাদিন প্রখর উত্তাপ ছড়িয়ে অবশেষে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে অস্তাচলে ঢলে পড়েছেন। বড়ো বড়ো গাছপালা,ঝোপঝাড় সহ এই জঙ্গলটিতে আর্দ্রতাও তুঙ্গে ছিল সেদিন।   সূর্যের শেষ রশ্মিটিও মুছে গেছে আকাশ থেকে। থোকা থোকা অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চতুর্দিক। আচানকমার বনাঞ্চলের যে অংশ দিয়ে তখন আমি ড্রাইভ করে যাচ্ছিলাম,সেখানে জঙ্গল এতো ঘন যে দিনের বেলাতেও পনেরো মিটারের বেশি কিছু দৃষ্টিগোচর হয় না।

সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। একটা মোড় ঘুরতেই দেখতে পেলাম,প্রায় দশ মিটার দূরে রাস্তার ধারে একটা বেশ বড়োসড়ো কোন জানোয়ার গুঁড়ি মেরে বসে আছে। আকার আয়তন দেখে মনে হল বাঘ হতে পারে। আরও খানিকটা কাছে গিয়ে গায়ে আলো ফেলতেই সেটা এক লাফে পিছন দিকের ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেল। গায়ের কালো কালো ছাপ ও আয়তন দেখে বোঝা গেল একটা বেশ বড়ো সাইজের লেপার্ড। আমি দেশের ছোটো বড়ো অনেক ন্যাশনাল পার্কে ঘুরেছি ও লেপার্ড দেখার সৌভাগ্যও হয়েছে আমার,এ লেপার্ডটাকে তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে ফেলা যায়। বোঝা গেল,আচানকমার তার অধিবাসীদেরকে সুখেসচ্ছন্দেই রেখেছে।

 ছত্তিসগড়ের বিলাসপুর সহর থেকে মাত্র ষাট কিলোমিটার দূরে অচানকমার টাইগার রিজার্ভ। ৯১৪ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই পার্কটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য অসামান্য। বড়ো বড়ো সাল,বিজা,সাজা,হলদু,খামার,টিক,টিনসা ,ধাওরা বাঁশ ছাড়াও আছে প্রায় ছ’শো প্রজাতির ঔষধি গাছ। মনিয়ারি নদীর স্বচ্ছ স্নিগ্ধ জলধারা বয়ে চলেছে জঙ্গলটির ফাঁকে-ফাঁকে। সেখানে নানান প্রজাতির পাখির সমাবেশ। পার্কটি অচানকমার বায়ো রিজার্ভের একটি অংশ। এখানে বাস করে বাঘ,লেপার্ড,বাইসন,উড়ন্ত কাঠবিড়ালি,মালাবার কাঠবিড়ালি,চিংকারা,বন্য কুকুর,হায়না, সম্বর,চিতল। আর আছে একশ পঞ্চাশটিরও বেশি পাখির প্রজাতি। একটা ট্রেকে কত পশুপাখি দেখা যেতে পারে তার একটা উদাহরণ দিই। আমার বন্ধু অভিজ্ঞ ও দক্ষ পার্ক সুপারিন্টেনডেন্ট শ্রী বি পি সিং এর সাথে পার্ক পরিদর্শনের সঙ্গী হয়েছিলাম একদিন। বেলা তখন প্রায় এগারোটা হবে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমরা জিপে চারদিকের ঝোপঝাড়ের ওপর নজর রেখে রেখে চলছি।

bonerDiaryacanakmar04 (Medium)

bonerDiaryacanakmar03 (Medium)চার ঘণ্টার মধ্যে যা দেখলাম সেটাই বলি। প্রথমেই দেখলাম তিনটি প্রজাতির প্যাঁচা,তিনটে লেপার্ড,তারপরে প্রায় আশিটা বাইসনের একটি দল,বুনো খরগোশ,কুড়ি পঁচিশটা জংলি কুকুরের একটা দল,আর প্রায় শ’খানেক চিতল।

জঙ্গলের এই অংশটার অনেকটাই বাঘের এলাকার মধ্যে পড়ে। কিছুদিন আগে দিয়াবার বিট এ একটি বাঘিনী ও তার দুটি বাচ্চা দেখা গেছে শুনেছিলাম,তাই আমরা ঠিক করলাম ফেরার আগে ওদিকটাও একবার ঘুরে আসা যাক। দিয়াবার জলাশয়ের ঠিক আগে একটা ছোট্ট নালা কাটামি থেকে দিয়াবার পর্যন্ত বয়ে গেছে। নালাটা যখন আমরা পার করছিলাম তখন হঠাৎ কাছের একটা ঝোপের ভিতর থেকে দুটো বাঘের বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। সেখানেই আমরা জিপ দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম যদি বাচ্চাদুটো ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসে। মাঝেমাঝেই বাচ্চাদুটো ডেকে উঠছিল। ওদের ডাক শুনে মনে হল ওদের মা বোধহয় অভুক্ত বাচ্চাদের জন্যে শিকারে গেছে আর শীঘ্রই ফিরে আসবে। বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেও ওদের না দেখতে পেয়ে আমরা ফেরার রাস্তা ধরলাম।

পথে আসতে আসতে আমরা আলোচনা করছিলাম যে পার্কটার ভবিষ্যৎ নিয়ে আর চিন্তা নেই। এই বাঘিনীটি তার বাচ্চা দুটোকে সুস্থভাবেই বড়ো করে তুলছে। আগের ব্যাঘ্রগণনাতে জানা গেছে অচানকমার টাইগার রিজার্ভটিতে আঠারো থেকে চব্বিশটি বাঘ আছে এবং তার মধ্যে চোদ্দ মাস বয়সের কম শাবকগুলিকে ধরা হয় নি। আমরা পার্কটির আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে এক বছরের কম বয়েসের অন্তত দশটি ব্যাঘ্রশাবকের পায়ের ছাপ দেখেছি এবং নিশ্চিত ছিলাম যে বাঘের সংখ্যা ভালভাবেই বাড়ছে ।   

অচানকমার পার্কটির দুটি বড়ো সমস্যার একটি হল,জঙ্গলটিতে গাছপালা এতো ঘন যে কয়েক ফুট দুরের জন্তু জানোয়ারও টুরিস্টরা খুব ভালোভাবে দেখতে পান না। জায়গাটি পার্বত্য অঞ্চলে হওয়ার দরুন রাস্তাঘাটও এমন যে তিন কিলোমিটার যেতে প্রায় আধ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। দ্বিতীয় সমস্যাটি আরও বড়ো। পার্কটির ভিতরে এবং আশেপাশে গোন্দ এবং বৈগা  আদিবাসীদের বাইশটি গ্রাম রয়েছে,যার কিছু আছে একেবারে কোর এরিয়ায়। সব চাইতে বড়ো গ্রাম কাটামিতে একশরও বেশি ঘর আছে । এই গ্রামগুলির জন্যে মানুষের পার্কের মধ্যে আনাগোণা আটকানো অসম্ভব। আর তাতে জঙ্গলের প্রাণীরা ডিস্টার্ব হয় ও নিজেদেরকে বাঁচিয়ে দূরে সরে থাকে। এদের গবাদি পশুরা প্রায়ই বন্যপ্রাণীদের শিকার হয়। প্রত্যেক সপ্তাহেই পার্ক অধিকারীরা এই গ্রামবাসীদের রোষের সম্মুখীন হন এবং তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। ফরেস্ট অ্যাডভাইসরি কমিটি (FAC) কুড়িটার মধ্যে আটটি গ্রাম পার্কের বাইরে সরাবার অনুমতি দিয়েছেন যদিও Central Empowered Committee র অনুমতি আসার অপেক্ষায় রয়েছে সবাই । গ্রামবাসীরা যদি উপযুক্ত সুযোগ সুবিধা পায় তো তারা অন্য জায়গায়  যেতে রজি আছে। গ্রামগুলি সরে গেলে সেই সব জায়গা ঘাসজমিতে পরিবর্তিত করে বাঘ আর অন্যান্য প্রাণীদের চারণক্ষেত্র  তৈরি হয়ে যাবে। যদিও বন এবং বন্যপ্রাণী বাঁচানোর কথা মুখে বলা যতো সহজ, কাজে তত নয় ।    

bonerDiaryacanakmar02 (Medium)আচানকমার জঙ্গলটিকে দু ভাগে বিভক্ত করে ছুটে গেছে বিলাসপুর থেকে জব্বলপুর ভায়া অমরকণ্টক যাবার জাতীয় সড়ক। সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত ভারী গাড়ির যাতায়াত এই রাস্তায় নিষিদ্ধ, তবুও গাড়ির ধাক্কায় নিহত শিয়াল চিতল বা হায়না প্রায়ই মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় রাস্তার ওপর,তাই একটি বাইপাস রাস্তা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

এতো সব বাধাবিপত্তি থাকা সত্ত্বেও বন অধিকারীরা পার্কটিতে যথেষ্ট কাজ করছেন। গোটা জঙ্গলটিতে আলাদা আলাদা জায়গাতে পাঁচটারও বেশি ওয়াচ টাওয়ার বানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে একটি আছে লামনি রেঞ্জের টাঙ্গলি পাঠার বলে জায়গাটিতে। সমুদ্রতল থেকে ১০৩৯ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত টাঙ্গলি পাঠারের টাওয়ার থেকে গোটা অচানকমার জঙ্গলটির অপরূপ বিহঙ্গম দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। মার্চ মাসে পাতাঝরার দিনের সৌন্দর্য যে কোন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবি বলে মনে হয়। এই জায়গাটি খুঁজে বের করে এত উচ্চতায় টাওয়ারটি বানানোর কৃতিত্ব যায় পার্কের মুখ্য বনপাল শ্রী কৌশলেন্দ্র সিং এর। পার্ক অধিকারী ও কর্মচারীদের অদম্য উৎসাহ আর অক্লান্ত পরিশ্রমে পার্কটি ভারতের প্রশান টাইগার রিজাসার্ভদের অন্যতম হয়ে উঠছে।

অচানকমারের শতাধিক বছর পুরানো ব্রিটিশদের তৈরি গেস্ট হাউস গুলির উল্লেখ না করে পারছি না । প্রকৃতির কোলে স্বপ্নের ছবির মতন দাঁড়িয়ে আছে আচানকমার, লামনি  ছপরওয়া ও সুরহি গেস্ট হাউস,খুবই সুন্দরভাবে রাখা,সব রকম সুবিধাযুক্ত ও আশেপাশে কোনও হোটেল বা লজ না থাকায় এ জায়গাগুলোতে টুরিস্টদের ভিড় সামলানো কখন কখনও মুশকিল হয়ে পড়ে।    

পশুপক্ষিদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে পার্ক কর্তৃপক্ষ জঙ্গলের আলাদা আলাদা জায়গায় ছোটোবড়ো কুড়িটি জলাশয় নির্মাণ করেছেন। বন্যপ্রাণীরা জল খেতে যখন এই জলাশয়গুলিতে আসে এদের ভালো করে দেখা,জানা, স্টাডি করা ও ফটোগ্রাফি করার অপূর্ব সুযোগ পাওয়া যায়। কল্পনা করে দেখ কী এক রোমাঞ্চর পরিবেশ তৈরি হবে যখন সূর্যাস্তের সময় মনিয়রি নদীর ধারে তার স্বচ্ছ জল খেতে হরিণ নেমে আসবে আর বাঘের সাড়া পেয়ে সম্বর আর গাছের ডালে বসা লঙ্গুর অ্যালার্ম কল দেবে,পাখিরা কলরব করতে করতে বাসায় ফিরবে আর একটি দুটি করে তারা ফুটে উঠবে তারা আকাশে!

bonerdiaryrtishlu03 (Medium)গরমকালে এর আর একটা নিষ্ঠুর দিকও দেখা যায়। গ্রামবাসীরা জঙ্গলে আগুন ধরিয়ে দেয়,সাল বিজা হলদুগাছগুলো দাউ দাউ করে জ্বলে ছাই হয়ে তদের ক্ষেত তৈরি করে। গরমকালে জঙ্গলে আগুন দাবানলের মতন ছড়িয়ে যায়,বন কর্মচারীদের হাজার চেষ্টাতেও সে আগুন সহজে আয়ত্তে আনা যায় না। আগুন নিভে গেলে দেখা যায় গাছগাছালির সঙ্গে পশু পাখিদের মৃত দেহ যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়ে আছে।

আচানকমারের এই অপরূপ সুন্দর বনাঞ্চল ও অরণ্যবাসী প্রাণী ও তার জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে গ্রামগুলিকে জঙ্গলের বাইরে সরানো খুবই প্রয়োজন ।  

আমি ছত্তিসগড়েরই মানুষ ,এই অঞ্চলেই ছোটো থেকে বড়ো হয়েছি । এখানকার বন জঙ্গল আলোহাওয়া,এখানকার সংস্কৃতি আমার রক্ত মজ্জায় রণিত হচ্ছে । আচাণকমার টাইগার রিসার্ভের দিনে রাতের অপরূপ রূপ আমাকে বার বার এখানে টেনে এনেছে । এই জঙ্গল আমার বড়ো প্রিয় । আচানকমার ও তার প্রাকৃতিক ধনসম্ভার বাঁচাতে হলে আমাদের সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে ।

পুনশ্চ—এখন সরকারি নিয়ম অনুসার আচানকমার টাইগার রিজার্ভের ভিতরের সমস্ত গেস্ট হাউসগুলি টুরিস্টদের জন্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অচানকমারের মধ্যে দিয়ে যে জাতীয়

সড়কটি বিলাসপুর থেকে জব্বলপুর যাচ্ছে সেখানে টু হুইলার ও চারচাকার ছোটো গাড়ি ছাড়া সমস্ত ভারি বাহন নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। আদিবাসীদের পুনর্বাসনের কাজ চলছে ।

ছবিঃ সংগৃহীত