বনের ডায়েরি-বন্যপ্রাণ-এদেরও বাঁচার অধিকার আছে-অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়

bonerramdarshan01 (Medium)অসম সাহসী রামদর্শন বিষণোই

 সাম্প্রতিক কালের একটি ঘটনা। সময়টি হল এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসের এক সন্ধ্যা। তিনজন সশস্ত্র প্রাণি হত্যাকারী (পোচার) ছুটে পালাচ্ছে এবং তাদের তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছে এক নিরস্ত্র পশুপ্রেমিক। অবাক হওয়ার মত ঘটনাই বটে। এই  নিরস্ত্র পশুপ্রেমিক (যার হাতে একটি ছোটো লাঠি পর্যন্ত ছিল না) বিষণোই সম্প্রদায়ের একজন। বিষণোই বলতেই মনে পড়ে যায় কয়েক বছর আগে খবরের কাগজে প্রকাশিত একটি ছবির কথা। ছবির বিষয়- একজন অল্পবয়সী বধূ, তাঁর কোলে একটি শিশু সন্তান। সেই শিশুটি একটি স্তন্য পান করছে, অপর স্তন্যটি পান করছে  একটি হরিণশিশু। এমন মানুষ এই বিষণোইরা। প্রকৃতিই এদের প্রাণ। প্রাণ দিয়েও এরা প্রকৃতিকে রক্ষা করে।  যে বিষণোই মানুষটির ভয়ে পোচারদের  ছুটে পালাতে হয়েছে তাকে মারার চেষ্টা হয়েছে, গুলিচালনা করা হয়েছে বারবার, কিন্তু সফল হয়নি তারা।  এই ঘটনাটি ঘটেছে আবোহর অভয়ারণ্যের কাছে যোধপুর গ্রামের কাছে।

আবোহর অভয়ারণ্যের মধ্যে  রায়পুরা গ্রামে পোচাররা প্রাণিহত্যার জন্য  গুলি চালাতে শুরু করলে রামদর্শন বিষণোই, যিনি অখিল ভারতীয় জীবরক্ষা বিষণোই সভার (পঞ্জাব শাখা) সভাপতি, গুলির আওয়াজ শুনে তিনি বুঝতে পারেন কোন দুষ্কৃতী প্রাণিহত্যার উদ্দেশ্যে গুলিচালনা করেছে। সময় নষ্ট না করে তিনি তাঁর গাড়ি করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান  তিনজনের একটি দল আবোহর অভয়ারণ্যে ঢুকে প্রাণিহত্যা করে চলেছে। তারা ইতিমধ্যে একটি কৃষ্ণসার মৃগকে আহত করেছে এবং একটি Partridge পাখি হত্যা করেছে। রামদর্শন বিষণোইকে দেখেই পোচারদের দলটি গাড়িতে উঠে পালাতে আরম্ভ করে। রামদর্শনও নিজের গাড়ি করে ওদের পিছু ধাওয়া করেন। ৪৫ মিনিট পর ডাব্বান, মালুকপুর এবং বাহাদুরখেরা গ্রাম পার হবার পর রাস্তার এক বাঁকে রামদর্শন পোচারদের গাড়ি ওভারটেক করে ওদের গাড়ির সামনে নিজের গাড়ি রেখে রাস্তা আটকে দাঁড়ান। ধূলিময় এই গ্রাম্য রাস্তায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালানো যথেষ্ট অসুবিধাজনক। তৎসত্ত্বেও রামদর্শন  হাল ছাড়েন নি।

গাড়ি থেকে নেমেই রামদর্শন পোচারদের গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই একজন গাড়ি থেকে বার হয়ে রামদর্শনকে মারার জন্য রিভলবার থেকে গুলি ছোঁড়ে। রামদর্শন মাথা নিচু করে নিজেকে বাঁচান এবং এগিয়ে এসে ঐ ব্যক্তির হাতে আঘাত করেন। ফলে, রিভলবারটি হস্তচ্যূত হয়। পরে রামদর্শন হাঁটুর সাহায্যে ঐ ব্যক্তির পেটে আঘাত করলে ব্যক্তিটি পড়ে যায়। অন্য দুই ব্যক্তি মনে করে যে রামদর্শন রিভলভারটি হস্তগত করেছেন। তাই তারা ছুটে পালাতে আরম্ভ করে। কিছুদুর যাবার পর বুঝতে পারে যে রামদর্শনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্রটি নেই। তখন একজন ফিরে এসে গাড়ির নম্বরপ্লেটটি খুলে নেয় এবং গাড়ি থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে যাবার চেষ্টা করে।

এই সময় তৃতীয় এক ব্যক্তি, গাড়ির নম্বর প্লেটটি যে খুলেছিল তাকে  নির্দেশ দেয় তার হাতের শটগানের সাহায্যে রামদর্শনকে গুলি করতে। ব্যক্তিটি তখন  রামদর্শনকে লক্ষ করে গুলি চালায়। কিন্তু রামদর্শনের তৎপরতায় গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। যেহেতু শটগানের সাহায্যে একবারমাত্র গুলি করা যায়, তাই শটগানে গুলি ভরে পুনরায় মারার চেষ্টা করে।

গোলাগুলির শব্দে পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকেরা ঘটনাস্থলে হাজির হলে পোচাররা ধরা পড়ে যায়। দুষ্কৃতিদের একজনকে রামদর্শন সনাক্ত করতে সক্ষম হন। সেই ব্যক্তির নাম গুরমিত সিং, পিতা বলবীর সিং যিনি মালুকপুর গ্রামের নামবরদার। এদের কাছ থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, একটি ওয়েবলি প্যাটার্ন ০.১২ বোরের শটগান এবং একটি ০.২২ বোরের রিভলভার ও প্রচুর বুলেট পাওয়া যায়। যে zen গাড়িতে চেপে দুষ্কৃতীরা এসেছিল সেটি বন ও বন্যপ্রাণি দপ্তর বাজেয়াপ্ত করে।

লুপ্তপ্রায় কচ্ছপ

bonerramdarshan03 (Medium)

এবার দ্বিতীয় একটি ঘটনার উল্লেখ করা হচ্ছে। এটি ঘটেছিল কলকাতায়। ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরো (WCCB) এবং রাজ্য বনবিভাগের ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিট গত সেপ্টেম্বর মাসে গ্যালিফ্‌ স্ট্রিটের বাজারে একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পনেরোটি বিশেষ ধরণের কচ্ছপ (Soft shell turtle) বাজেয়াপ্ত করে। এই ব্যবসায়ীর নাম বিশ্বজিৎ প্রসাদ (বাপি)। এই জাতীয় কচ্ছপগুলি গঙ্গা ও মহানদীতে পাওয়া যায়। এদের খাদ্য হল ছোট ছোট মাছ, ব্যাং জাতীয় প্রাণি। কোন কোন সময় জলজ  উদ্ভিদও খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে। এই কচ্ছপগুলি পৃথিবী থেকে লুপ্ত হতে চলেছে। তাই বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ এক্টের (১৯৭২) শিডিউল-ওয়ান এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ এই কচ্ছপগুলি বাঘ, গন্ডারের মত একই পর্যায়ভুক্ত লুপ্তপ্রায় প্রাণি।

বন্যপ্রাণি দপ্তরের পদস্থ কর্মচারী সূত্রে আরও জানা যায় যে কিছুকাল আগে সোদপুরে দুজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এই জাতীয় কচ্ছপ পাওয়া গেছিল। ধৃত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বেশ কিছু তথ্যও পাওয়া যায়। সেই তথ্যের উপর ভিত্তি করে বিশ্বজিতকে ধরা সম্ভব হয়।

বন্যপ্রাণি সংক্রান্ত অবৈধ ব্যবসা

 

প্রতিনিয়ত সারা পৃথিবীতে অসৎ ব্যক্তিরা হাজার হাজার বন্যপ্রাণি নিধন করে চলেছে। অত্যন্ত খেদের কথা, এই ব্যাবসা বেড়েই চলেছে। হাতির দাঁতের জন্য প্রাণ যাচ্ছে হাতির। সেই রকম গন্ডারের শিংয়ের জন্য গন্ডারের, কস্তুরীর জন্য কস্তুরীমৃগের। সারা বিশ্বে এই ব্যাবসার পরিমাণ কত সেটা বলা বড়োই মুশকিল এবং অনুমাননির্ভর। এর বড়ো কারণ এই ব্যাবসাটি লুকিয়ে-চুরিয়ে ঘটে। একটি হিসাবমত সামুদ্রিক প্রাণি সংক্রান্ত ব্যাবসার বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ হল ৪.২ থেকে ৯.৫ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার (বর্তমানে এক আমেরিকান ডলার = ৬৫ টাকা এবং এক বিলিয়ন = ১০০ কোটি)। লুকিয়ে কাটা গাছ বিক্রির পরিমাণ ৭ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার। সামুদ্রিক প্রাণি ও লুকিয়ে  কাটা  গাছ বাদ দিয়ে বন্যপ্রাণি সংক্রান্ত অবৈধ ব্যবসার পরিমাণ ৭.৮ থেকে ১০ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার।

বন্যপ্রাণিদের নিয়ে এই অবৈধ ব্যাবসার জন্য প্রাণ যাচ্ছে হাজার হাজার প্রাণির। ২০১১ সালে শুধুমাত্র ইউরোপের দেশগুলির জাদুঘর, নিলামকেন্দ্র এবং পুরাবস্তু বিক্রির দোকান (Antique shop) থেকে চুরি হওয়া হাতির দাঁতের কিছু অংশ বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হয়। এর পরিমাণ ২৩ টন অর্থাৎ কমপক্ষে ২,৫০০ হাতির প্রাণ হরণ করা হয়েছে। ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় গন্ডার হত্যা ৩,০০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আফ্রিকা মহাদেশের ক্যামেরুনে অশ্বারোহী বন্যপ্রাণি হত্যাকারী দলের হাতে চলে এসেছে সেনাবাহিনী ব্যবহৃত মেশিনগান। সুতরাং পরিণতি সহজেই অনুমেয়।  ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে হত্যা করা হয়েছে কয়েক শত হাতি । এইভাবে প্রাণি হত্যা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের হয়ত বন্যপ্রাণিদের বইয়ের পাতায় ছবি দেখেই ক্ষান্ত হতে হবে, বনে আর থাকবে না কোন বন্যপ্রাণি।