বসন্ত স্পেশাল- ঋতুনাং কুসুমাকর

তুনাং কুসুমা

অনুপূর্বা রায়

splarticle01 (Medium)

ক্যালেন্ডারের পাতায় মার্চ মাস বর্ণময়। একদিকে অফিস-কাছারিতে অর্থবর্ষ শেষের হিসেব নিকেশের ব্যস্ততা,অন্যদিকে পড়ুয়াদের বোর্ডের পরীক্ষা শেষের স্বস্তি কিংবা স্কুলে নতুন সেশন শুরুর অপেক্ষা। আবার এই সময়ই মনোরম বসন্তদিনে রঙের উৎসবে মেতে ওঠার জন্য সকলের মন কমবেশি মুখিয়ে থাকে। আসলে শীতের রুক্ষতার শেষে প্রকৃতি এই সময় নিজেকে নতুন বেশে রাঙিয়ে তোলে আর প্রকৃতির সেজে ওঠার সাথে সাথে মানুষও মেতে ওঠে বসন্তের আবাহনে,শুরু হয় রঙের উৎসব- কোথাও ‘হোলি’ আবার কোথাও ‘দোল’ কিংবা ‘বসন্তোৎসব’ নামে।

সব শুরুরও যেমন একটা শুরু থাকে,সব উৎসবেরও তেমন একটা আদি থাকে। বৈদিক যুগ থেকেই এদেশের মানুষের কাছে বসন্ত ঋতুর একটা আলাদা আকর্ষণ আছে,তার প্রধান কারণ নাতিশীতোষ্ণ মনোরম আবহাওয়া। তাছাড়া এই সময়ই শুরু হয় সূর্যের উত্তরায়ণ,অর্থাৎ দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে উত্তর গোলার্ধে যাত্রা। তাই শীতের জড়তা কাটিয়ে মানুষও নতুন উদ্যমে কর্মমুখর হয়ে ওঠে।

বৈদিক যুগে বিভিন্ন যজ্ঞ আরম্ভ হত এই বসন্তকালে। ‘গীতা’য় পাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুণকে বিভূতিযোগ দেখাতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন – ‘ঋতুনাং কুসুমাকর’ অর্থাৎ ঋতুদের মধ্যে আমি বসন্ত ! যুগে যুগে কবি সাহিত্যিকরা যে ঋতুকে তাদের লেখায় সবচেয়ে বেশি আহ্বান করেছেন,সেই বসন্ত ঋতু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জীবনে দৈনন্দিন সুখ-দুঃখের অনুভূতির প্রকাশকে প্রভাবিত করেছে।ইংরেজ কবি Shelley তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘Ode to the West Wind’ এর শেষ দুটি লাইনে শীতের শেষে বসন্তের আগমনকে সর্বজনগ্রাহ্য করে তুলেছেন – ” O wind, if winter comes can spring be far behind? ” মহাকবি কালিদাস রচিত ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’এ দেখতে পাই শকুন্তলার আংটি এক ধীবরের কাছ থেকে উদ্ধার করার পর রাজা দুষ্মন্ত বিরহ ব্যথায় কাতর হয়ে রাজ্যে বসন্তোৎসব পালন  বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কালিদাস ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম্ ‘গল্পে আবার দেখিয়েছেন মালবিকার সাথে মহারাজ অগ্নিমিত্রের মিলন হয়েছিল বসন্তদিনে ।

বসন্তের উৎসব দোল বা হোলি যে নামেই পালন করিনা কেন,মনে প্রশ্ন জাগে কবে থেকে শুরু হল এই উৎসব আর কেনই বা শুরু হল? তবে এ নিয়েও মতান্তরের শেষ নেই। ভাগবতপুরাণ অনুসারে দৈত্য হিরণ্যকশিপুর ক্রোধ থেকে ভক্ত প্রহ্লাদকে বাচাঁতে গিয়ে ভগবান বিষ্ণু ‘হোলিকা’ নামে এক রাক্ষসীকে ভস্ম করে দেন। তার ছাই থেকে হোলির সূচনা আর এটাই নাকি প্রথম আবির। আবার পৌরাণিক আখ্যান থেকে জানা যায় আবির বা ফাগ শব্দটা এসেছে ব্রহ্মার ঘাম ‘ফল্গু’থেকে। আর ‘দোল ‘শব্দটা পাই দোলারোহণ থেকে। ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীকৃষ্ণকে একটা দোলনায় চাপিয়ে দোল দিয়ে পুজো করা থেকেই ‘দোল’ নামের সৃষ্টি। স্কন্দপুরাণে দোলের আগের দিন ন্যাড়াপোড়ার উল্লেখ আছে। কোথাও আবার এর নাম চাঁচর কিংবা বুড়ির ঘর। খড়,বাঁশ,শুকনো পাতা ইত্যাদি কুড়িয়ে ঘরের আকারে বানিয়ে দোলের আগের দিন সন্ধ্যেবেলা বিপুল আনন্দ নিয়ে আগুন দেওয়া হয়,সাথে থাকে উল্লাসধ্বনি:  আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়ানো,

কাল আমাদের দোল….।

অনেকে মনে করেন শীতের শেষে ঝরে যাওয়া পাতা,মরা ঘাস,আবর্জনা পুড়িয়ে পরিষ্কার করার জন্যই দোলের আগের দিন এই আনন্দ-নিয়ম। প্রাচীনকালে সমগ্র ভারতবর্ষে বসন্তের এই উৎসব শুধুমাত্র সনাতন হিন্দুধর্মের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না,মুঘল সম্রাটরাও যে হোলি উৎসবে মেতে উঠতেন ইতিহাস তার সাক্ষ্য বহন করে। বাবরপুত্র হুমায়ুনের রাজত্বকালে টানা ২০দিন চলত হোলি উৎসব। হুমায়ুন হোলি উপলক্ষে নদীর বুকে নৌকার ওপর ‘মিনাবাজার’ বসাতেন। পারস্যদেশের ‘নওরোজ’ উৎসবের রঙ মিশিয়ে বসন্তোৎসবকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ উদার রাজা সম্রাট আকবর। মুঘল চিত্রকলা থেকে জানা যায়, অন্তঃপুরবাসিনীদের সঙ্গে তিনি হোলি খেলতেন। মুঘলযুগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজলের লেখা ‘আইন -ই-আকবরি’ থেকে জানা যায় শাজাহানের রাজসভা উত্তাল হয়ে উঠত রঙের বন্যায়, দোলের দিন গোলাপজল আর সুগন্ধী আবিরে বিভোর হয়ে থাকতেন জাহাঙ্গীর বাদশা। তবে হোলির রেওয়াজ ছিলনা ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে।

বঙ্গদেশে দোলের মাহাত্ম্যকে পরিপূর্ণতা দিয়েছেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব। শুভ দোলপূর্ণিমা তিথিতেই তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ১৪০৭ সালে। হিন্দু বৈষ্ণদের উৎসব হিসাবে দোল চৈতন্যদেবের জন্মস্থান নদীয়ার নবদ্বীপ, মায়াপুরকে মহিমান্বিত করেছে অন্যদিকে বাংলার বাইরে বৈষ্ণবদের ভূমি মণিপুর রাজ্যেও দোল গৌড়িয় ভাবাবেগে পালিত হয়। বস্তুতপক্ষে দোল এমনই এক উৎসব যা ভারতের মানচিত্রে উত্তর থেকে দক্ষিণ,পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রায় সর্বত্র নিজস্ব ঘরানায় অনুষ্ঠিত হয়।

উত্তরপ্রদেশের নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘হোলি’একটা মহোৎসব বলে পরিচিত। বৃন্দাবনের দোলে কৃষ্ণের জন্মস্থান নন্দগ্রাম এবং রাধার জন্মস্থান বর্ষণাতে মহিলা ও পুরুষরা আলাদা আলাদা ভাবে আনন্দে মেতে ওঠে। পুরনো কলকাতার দোলে শাক্ত আর বৈষ্ণবরা একসাথে মেতে উঠতেন। বড়িষার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের দোল দেখার জন্য East India Company র সাহেবরাও ভিড় জমাতেন বলে কথিত আছে। রঙ,আবিরের পাশাপাশি চিনির মুড়কি,মঠ,ফুটকড়াই,সিদ্ধি,মালপোয়া এসব খাবার ছিল উৎসবের অঙ্গ। এখানেই শেষ নয়, দোলের দিন পুরনো কলকাতার রাস্তায় সকালে দোলের সঙ বের হত,সেইসঙ্গে খেউড় আর অশ্লীল গানের আসর বসত। তবে বসন্তের রঙিন উৎসব শুধুমাত্র ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ফাগুনের আবির গুলাল

সেলুলয়েডের পর্দাকে অতি প্রাচীনকাল থেকে রাঙিয়ে আসছে। আসলে মানুষের গতানুগতিক জীবনের দিনযাপনের গ্লানিকে ‘সিনেমা’ নামক বিনোদন কিছুটা মোচন করে আর সেখানে হোলিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অসংখ্য সিনেমার সিকোয়েন্সে আমাদের মন রঙিন হয়।

    এবার আসি সেই মানুষের বসন্তোৎসবের কথায় যিনি বাঙালীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন শুধুমাত্র ঋতুকে কেন্দ্র করে কিভাবে একটা অনুষ্ঠানকে চূড়ান্ত নান্দনিক করে তোলা যায়! ‘সব পেয়েছির দেশ’ শান্তিনিকেতন ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে আরও বেশি রঙিন হয়ে ওঠে। ভারতবর্ষের বহুযুগের দোলযাত্রাকে এক ভিন্ন রুচিসম্মত রূপ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের সূচনা করেছিলেন। ১৯২৫এ টানা পাঁচ মাস বিদেশে থাকার পর শান্তনিকেতনে ফিরে কবি দেখলেন গাছে গাছে নতুন কচিপাতা,সেই সাথে শাল,পলাশ,অশোক,শিমুলের রঙরের বন্যায় আর আমের মুকুলের গন্ধে ভরে উঠেছে তাঁর বিদ্যাশ্রম। কবির বাসগৃহ ‘উত্তরায়ণ’এর বাগানের ‘নীলমণিলতা’বসন্তের আগমনকে ধ্বনিত করছে। ‘মাধবী’ফুলকেই প্রথম ডাক দিয়ে কবি বললেন – “হে মাধবী, দ্বিধা কেন? আসিবে কি ফিরিবে কি দ্বিধা কেন?”

কবি সে বছরই শান্তিনিকেতন আশ্রমে প্রথম শুরু করলেন বসন্তোৎসব। প্রথম উৎসবের আয়োজন হয়েছিল আম্রকুঞ্জে ২৬শে ফাল্গুন। কিন্তু রাতে প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টিতে সেবারের উৎসব প্রায় ভেস্তে গেছিল,কবি লিখেছিলেন :

মিলনদিনে হঠাৎ কেন লুকাও তোমার মাধুরী

ভীরুকে ভয় দেখাতে চাও একি দারুন চাতুরী.. ” 

splarticle02 (Medium)

তারপর থেকে প্রতি বছরই লাবণ্যে পূর্ণপ্রাণে বসন্ত আশ্রমে এসেছে,কালের স্রোতে আজও সেই আসায় কোথাও ছেদ পড়েনি! ১৯৩৫ সালের বসন্তোৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। সেবার বসন্তবন্দনার নাচের দলে যোগ দিয়েছিলেন ইন্দিরা নেহেরু। তখনও তিনি গান্ধী হননি, ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্রী। ‘তোমার বাস কোথা যে পথিক…’  আর  ‘কে দেবে, চাঁদ, তোমায় দোলা.. ‘এই দুটি গানের সাথে তিনি নেচেছিলেন। 

তবে শুধু শান্তিনিকেতনে নয়,রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে সেকালে কলকাতা শহরেও বহুবার বসন্তোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৪০ সালে শেষবারের মতো রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসবে যোগদান করেছিলেন। সে বছর ‘অস্পষ্ট’ কবিতাটি পাঠের মধ্যে দিয়ে কবি বসন্তকে আবাহণ করেন।

উৎসবের আগেরদিন রাতে গৌরপ্রাঙ্গন থেকে বেরোয় বৈতালিক- ‘ও আমার চাঁদের আলো,  আজ ফাগুনের সন্ধ্যাকালে ধরা দিয়েছ….” এই গানের সাথে সাথে বৈতালিকের দল শালবীথির পথ ধরে এগিয়ে যায়,তাতে পা মেলান বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রী, কর্মীবৃন্দ, আশ্রমবাসীগণ আর দেশ-বিদেশ থেকে আসা তামাম পর্যটক। উৎসবের দিন সকালে বসন্তের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য দেওয়া হয় বৈদিক মন্ত্র পাঠের মধ্য দিয়ে। ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল…… ‘ সমবেত এই গানে,নাচে মাতোয়ারা হয় আশ্রম চত্বর। নাচের দলের পরনে থাকে বাসন্তী রঙের পোশাক,কপালে আবির,ছেলেমেয়েদের হাতে থাকে কাঁচা শালপাতার ঠোঙা,তাতে পলাশ আর শালফুল। ‘যা ছিল কালো ধলো রঙে রঙে রঙিন হল….’ এই গান শেষ হতে না হতেই শুরু হয় আবির খেলা। রাতে ফাল্গুনী পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদের মায়ায় আশ্রম চত্বরে বসন্ত উৎসবকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় নৃত্যনাট্য। নবযৌবনের যে কবি ‘ফাল্গুনী’ নাটকে লিখেছেন – “যারা ম’রে অমর, বসন্তের কচি পাতায় তারাই পত্র পাঠিয়েছে…. ” সেই কবির আশ্রমের বসন্তোৎসব ফাগুনের নবীন আনন্দে, নান্দনিকতার সমারোহে আজও চির অমর চির অমলিন !!