বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-প্রতিবেশী গাছ-পেঁপে-অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়

biggangaachh01 (Medium) সে অনেক কাল আগের কথা, আমি তখন স্কুলে পড়ি সেভেন এইটে হবে। থাকতাম বর্ধমান শহরের এক প্রান্তে,সাধনপুরে। বাবা সাধনপুরের মহারাজা বিজয়চাঁদ ইনসটিটিউট অফ এনজিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজিতে পড়ান। কলেজ সংলগ্ন নিউ হস্টেলের সুপারিনটেনডেন্টও উনি। তাই হস্টেল সুপারের কোয়াটার্সে থাকতাম। কোয়াটার সংলগ্ন বাগানে আমার মা নানাধরণের ফুল আর ফলের গাছ লাগিয়েছিলেন। এর মধ্যে পেঁপে গাছও ছিল। বাড়ি লাগোয়া দুটি পেঁপে গাছ বেশ লম্বা হয়েছিল। দোতলার শোবার ঘরের জানলা দিয়ে দেখতাম পেঁপে গাছে ফল ধরেছে । হাত বাড়াতাম যদি সেগুলি ধরা যায়,কিন্তু না,পারতাম না ধরতে।

ফল পাকতে শুরু করেছে, পেঁপেগুলির রং সবুজ থেকে হলুদ হচ্ছে। এমন সময় একদিন হনুমান এসে ছাদে লাফালাফি শুরু করেছে। একটা হনুমান পাকা পেঁপে দেখে লোভ সামলাতে পারেনি। ছাদ থেকে মেরেছে এক লাফ,সোজা পেঁপে গাছে। পেঁপে গাছ কি হনুমানের ভার সহ্য করতে পারে!! তাই পটাং। গাছের মাথাটা গেল ভেঙে। দেখে বড়ই দুঃখ হয়েছিল সেদিন। তবে গাছ ভাঙার জন্য যত না দুঃখ হয়েছিল,পাকা ফলগুলোর জন্য আরো বেশি। কিছুদিন পরে দেখলাম, গাছের যে জায়গাটা ভেঙেছিল সেই জায়গা থেকে কয়েকটা নতুন ডাল আবার বের হয়েছে।

পেঁপে মধ্য এবং উত্তর আমেরিকার গাছ। বর্তমানে পৃথিবীর বহুদেশে এই গাছের চাষ হয়। বেশ বড়োমাপের সুস্বাদু ফলের জন্য এর চাহিদা সর্বত্র। ভারত এবং ব্রাজিল পেঁপের মূল উৎপাদনকারী দেশ। ফলের চাহিদা হিসাবে পেঁপে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। প্রথম তিনটি স্থান দখল করে আছে কলা,লেবু এবং আম।

biggan02 (Medium)পেঁপে গাছের কাণ্ডটি সরু, ফাঁপা এবং লম্বা। কাণ্ডটি সোজা উপরের দিকে উঠে গেছে। গাছের রং সবুজ বা সাদাটে সবুজ বর্ণের। মোটামুটি ১৫-২০ ফুট লম্বা হয়। বর্তমানে ছোট গাছের চাষ হচ্ছে ব্যাপকভাবে। গাছের সারা কাণ্ড জুড়ে চাকা চাকা দাগ রয়েছে। পাতাগুলি বেশ বড়,হাঁসের পায়ের পাতার মতো। পাতার বোঁটা লম্বা, নলাকার। পাতা, কাণ্ড এবং কাঁচা ফলে সাদারঙের রস বর্তমান (তরুক্ষীর বা ল্যাটেক্স)।

তিন ধরণের পেঁপে গাছ দেখা যায় – পুরুষ, স্ত্রী এবং উভলিঙ্গ। পুরুষ গাছের ফুলগুলি লম্বা দণ্ডযুক্ত। দণ্ডটি কয়েকফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এই গাছে ফল ধরে না। স্ত্রী গাছের ফুলগুলি ক্ষুদ্র দণ্ড যুক্ত। এই গাছে ফল ধরে। উভলিঙ্গ গাছে স্ত্রী এবং পুরুষ, এই দুই ধরণের ফুল ফোটে। 

স্ত্রী পুষ্প হতে ফল তৈরি হয়। ফলগুলি গোলাকার বা ডিম্বাকৃতি। কোন কোন ক্ষেত্রে নলাকার বা গদার মতো ফল দেখা যায়। ফলের ওজন সাধারণ ভাবে ৫০০ গ্রাম থেকে ২ কেজি পর্যন্ত হয়। কাঁচা অবস্থায় ফলের খোসার রং সবুজ। শক্ত এবং মোমের আস্তরণযুক্ত।  ভিতরের অংশ সাদা। এই অবস্থায় বীজের রংও সাদা। ফল পাকলে খোসা হলুদ বর্ণের হয়ে যায়। শাঁস হলুদ বা লাল বর্ণের হয়। পাকা ফলের বীজের বর্ণ কালো এবং সাদা রঙের রস (তরুক্ষীর) থাকেনা।

ভারত মহাদেশে পেঁপে খুবই জনপ্রিয়। শুধুমাত্র ফল হিসাবে নয় সবজি হিসাবেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। উপযুক্ত পরিচর্যা করলে সব ধরণের মাটিতে পেঁপের চাষ সম্ভব। গাছে ফল ধরতে এক বছর সময় লাগে। একটি গাছে ২০ থেকে ৫০টি ফল ধরে। পেঁপে চাষ লাভজনক ব্যাবসা। এদেশে প্রায় সারা বছর পেঁপে পাওয়া যায় তাই এই গাছটিকে বারোমাসি উদ্ভিদ বলে। পেঁপের কয়েকটি জাতের নাম- শাহী, ওয়াশিংটন, হানি ডিউ, পুষা জায়েন্ট, পুষা ম্যাজেস্টি,ইত্যাদি।

সাধারণ মানুষ পুষ্টির জন্য শাকসবজি এবং ফল মূলের উপর নির্ভরশীল। পেঁপেতে প্রচুরপরিমাণে ক্যারোটিন এবং ভিটামিন বর্তমান। তাই সবজি এবং ফল হিসাবে এর চাহিদা রয়েছে।

শিবকালী ভট্টাচার্য-এর লেখা চিরঞ্জীব বনৌষধী সমেত বিভিন্ন বইয়েতে পেঁপের ভেষজ ব্যবহার সম্বন্ধে বিশদভাবে লেখা রয়েছে। ভেষজগুণের কয়েকটি এখানে উল্লিখিত হল –

১। ক্ষুধা ও হজমশক্তি বৃদ্ধিতে – প্রতিদিন সকালে ২/৩ ফোঁটা পেঁপের আঠা জলে মিশিয়ে খেতে বে।

২। আমাশয় – আমাশয় এবং আমাশয়জনিত পেটের যন্ত্রণায় পেঁপের আঠা এবং চুন জলের মিশ্রণ ভাল কাজ করে।

৩। যকৃতের রোগে – দীর্ঘদিন আমাশয় রোগাক্রান্ত ব্যক্তির যকৃত বৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায় যা ডাক্তারি শাস্ত্রে অ্যামিবিক হেপাটাইটিস নামে অবিহিত। এমন ঘটনা ঘটলে কয়েক ফোঁটা পেঁপের আঠা এক চামচ চিনির সঙ্গে খাবার বিধি রয়েছে। তবে এটি দীর্ঘদিন ধরে খেলে উপকার পাওয়া যায়।

৪। প্রবল জ্বরে – এক কাপ জলে দেড় চামচ পেঁপে পাতার রস মিশিয়ে খেলে জ্বর কমে যায়।

৫। ডেঙ্গু জ্বরে – ডেঙ্গুর চিকিৎসায় পেঁপে পাতার রস উপকারী।

৬। দাদের চিকিৎসায় – কাঁচা পেঁপের অথবা পেঁপে গাছের আঠা একদিন অন্তর লাগানোর বিধান দেওয়া আছে।

৭। মাথায় ঊকুণের সংক্রমণ ঘটলে- কাঁচা পেঁপের আঠা জলে ভালভাবে মিশিয়ে (১:৮), সেইজল চুলের গোড়ায় লাগিয়ে কিছুক্ষণ রাখার পর, জল দিয়ে মাথা ধুয়ে ফেলতে হবে। এইপ্রক্রিয়া সপ্তাহে ২/৩ বার করলে মাথায় ঊকুণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

৮। পেট ফাঁপায় – কয়েক টুকরো পাকা পেঁপে লবণ এবং গোলমরিচ গুঁড়োর সঙ্গে খেলে পেট ফাঁপায় উপশম হয়।

৯। রোগ সংক্রমণে – পেঁপে গাছের ফুল ফুসফুসের সংক্রমণ প্রতিরোধী। 

১০। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে – পেঁপে গাছের ফুল ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

১১। ত্বকের সমস্যায় – পেঁপে ভাল ভাবে থেঁতো করে দুধের সঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগালে ত্বকের দাগ দূর করে এবং ত্বক টানটান হয়।

১২। ব্রণের সমস্যায় – কাঁচা পেঁপে ভাল ভাবে থেঁতো করে মুখে লাগালে ব্রণের সমস্যা কম হয়।