সেই মেয়েরা –ভারতের প্রথম মহিলা ইতিহাসবিদ গুলবদন বেগম-উমা ভট্টাচার্য

seimeyera01 (Medium)

অতীত কাল থেকে নানা ভাষা, নানা মত, নানা ধর্মের  মানুষের  বাসভূমি এই ভারত উপমহাদেশ। কিন্তু ভারতের কোন লিখিত ইতিহাস ছিল না । আর্যরা এসে এদেশে বেদের মত সাহিত্য রচনা করেছেন,কিন্তু সে সময়ের দেশের মানুষের কথা,তাদের নিজেদের এই দেশে বাসস্থাপন বা আধিপত্য বিস্তারের ধারাবাহিক কোন বিবরণ লিখে যাননি। নানাসময়ে নানা রাজা বিভিন্ন অঞ্চলে রাজত্ব করেছেন, যুদ্ধজয় করেছেন,বিজয় স্মারক স্থাপন করেছেন কিন্তু সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহের কোন ধারাবাহিক বিবরণ লিখে রেখে যাননি,যা লিখেছেন বা লিখিয়েছেন তা নিজেদের প্রশস্তি বর্ণনা,ভূমিদানের বিষয় ইত্যাদি। সভাকবিরাও যা লিখেছেন রাজার বা পৃষ্ঠপোষকদের প্রশস্তি ও কৃতিত্ব বর্ণনা।

আমরা ভারতবর্ষের ভূপ্রকৃতি,জলবায়ু, সম্পদ, রাজা-মহারাজা,সাধারণ মানুষ,তাদের জীবনযাত্রা,শাসনব্যবস্থার প্রথম বিবরণ লিখিতভাবে জানতে পারি বিদেশী লেখকদের লেখা থেকে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মেগাস্থিনিস, টলেমি,ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং, প্রমুখ। সে ছিল ভারতের ইতিহাসের প্রাচীন যুগের কথা।

ইতিহাসের মত করে সময়ের আর সমসাময়িক ঘটনার বিবরণ রাখা শুরু হয় ভারতে মুসলমান আক্রমণের সময় থেকে। এই বিষয়টি আরো গুরুত্ব পায় মুঘল আমলে,ভারতের ইতিহাসে যা মধ্যযুগ বলে পরিচিত। যে যুগের সূত্রপাত বলতে গেলে এক বিদেশী যোদ্ধা বাবরের হিন্দুস্থান জয় ও সাম্রাজ্য স্থাপনের মধ্য দিয়ে।

বাবরের অভ্যাস ছিল রোজনামচা লেখা, প্রতিদিনের ঘটনাবহুল জীবনের কথা,যুদ্ধ,আক্রমণ,প্রতিআক্রমণ,জয় পরাজয়ের বিবরণ তিনি লিখে রাখতেন, পুত্রকন্যাদের জন্মের তারিখ ইত্যাদি থাকত তাঁর রোজনামচায়। পার্শি ও তুর্কি ভাষায় লিখিত সেই রোজনামচা পরে ‘বাবরনামা’ নামে পরিচিত হয়েছিল। এই বাবরের কন্যা ছিলেন গুলবদন বেগম। বাদশাহ হুমায়ুনের বোন,আর মুঘলবংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট আকবরের পিসিমা।

seimeyera02 (Medium)গুলবদন বেগম যে লেখায় সমকালীন ঘটনাবলীর বিবরণ লিখেছিলেন তার শুরু হয়েছিল প্রিয় ভাইপো সম্রাট আকবরের নির্দেশ বা উপরোধে। আকবরের একসময় ইচ্ছা হল তিনি তাঁদের বংশের ইতিহাস লেখাবেন। কিন্তু তথ্য কোথায়? বাবরের লেখাতে ছিল শুধু তাঁর জীবিত অবস্থার সময়ের কিছু ঘটনার বিবরণ। হঠাৎ মনে এল পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠা তাঁর পিসিমার কথা। যিনি বাবরের হিন্দুস্থান অভিযানের সময় ছিলেন মাত্র দুই কি আড়াই বছরের শিশু। তিনি পিসিমাকে বললেন তাঁর স্মৃতি থেকে তাঁর পূর্বতনদের বিষয়ে যা মনে আছে লিখতে।

এই স্মৃতিচারণ হয়ে উঠেছিল মুঘল জমানার শুরুর দিকের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই তথ্য লিপিবদ্ধ না হলে হয়ত আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’ লেখা সম্ভব হতনা।

১৫২৩ সালের কাছাকাছি সময়ে জন্ম হয়েছিল গুলবদন বেগমের। নামের অর্থ –লাবণ্য যার গোলাপের মত। পিতার দিক থেকে তুর্কি তৈমুর লঙ আর মাতার দিক থেকে চাঘতাই  মোঙ্গল—মধ্য এশিয়ার এই দুই জাতির দুই সম্ভ্রান্ত পরিবারের আভিজাত্যের মিলন হয়েছিল গুলবদনের চেহারা আর প্রকৃতিতে।

গুলবদনের যখন জন্ম সে সময় প্রায় ১৯ বছর ধরে বাবর কাবুলের অধিপতি। কুন্দুজ, বাদখশান,বাজুর,স্বোয়াতও তাঁর অধিকারে। চেষ্টা করে চলেছেন হিন্দুস্থান জয়ের। শৈশব কেটেছিল পিতা বাবরের সান্নিধ্যে,কাবুলে আর হিন্দুস্থানে। বাবরের মৃত্যুর পর কৈশোর কাটে রাজ্যহারা ভাই হুমায়ুনের নির্বাসনের দুঃখের অংশীদার হয়ে। বাকি জীবনটা তাঁর কেটেছিল ভাইপো ভারতসম্রাট আকবরের ছত্রচ্ছায়ায়,নিরাপদে।

ছেলেবেলা থেকেই গুলবদন বেগমের স্মৃতিশক্তি ছিল আশ্চর্যরকম প্রখর। ছোটবেলা থেকেই তিনি সুন্দর গল্প বলতেন। আকবরের পিতা হুমায়ুন যখন প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি,ভ্রাতৃবিরোধ প্রভৃতি কারণে নির্বাসিত,  শিশু আকবর ও তাঁর পিসিমা গুলবদন বেগম এবং আরও অনেকে তখন বাধ্য হয়েছিলেন গুলবদনের বিদ্রোহী ভাই কামরানের আশ্রয়ে থাকতে। একরকম শত্রুপুরীতে তিনি আকবরের দেখভাল করতেন,রক্ষা করতেন তাকে। সে’সময় তিনি ছোটোদের গল্প বলতেন। নানা সুন্দর সুন্দর গল্প। বাবরের রাজ্য অভিযানের গল্প, তাঁর ফিরে আসার গল্প, যুদ্ধের গল্প, বাদশা বাবর ফিরে এলে যে আনন্দ উৎসব হত সেসব গল্প। আকবরের মনে ছিল সেসব,তাই পিসিমাকে বলেছিলেন সেইসব  ঘটনা লিপিবদ্ধ করতে। সুন্দরী, শিক্ষিতা,রাজনীতিজ্ঞ,সুরুচিপরায়ণ গুলবদন সেই আদেশকে নিলেন চ্যালেঞ্জ হিসাবে। ৬০ বছর বয়সে শুরু করলেন লেখা। যা পরবর্তী কালে প্রকাশ হল ‘হুমায়ুননামা’ নামে-দুই প্রজন্মের সময়কালের ঘটনা প্রবাহের ধারাবিবরণী।

লিখলেন পিতা বাবরের দৃঢ় চরিত্রের কথা, তাঁর কর্তব্যজ্ঞানের কথা, তাঁর অতি শিশুকালে দেখা পিতার যুদ্ধে যাবার দৃশ্যের আবছা বর্ণনা, কাবুল ও লাহোরের নানা বিবরণ,পিতার স্নেহপ্রবণতার কথা, হিন্দুস্থান জয়ের ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগে নানা প্রতিকুল অবস্থার সঙ্গে বাবরের লড়াই ও জয়ের কথা, তুর্কি বেগ আর নিজেদের পূর্বপুরুষ তৈমুরের পরিবারের মানুষজনের বৈরীতার কথা। তিনি লিখেছেন হিন্দুস্থান জয়ের পর বাবর কিভাবে সমস্ত সম্পদ আমীর ওমরাহ, সেনা ও সেনাপ্রধান,নিজের পরিবারের সদস্য,এছাড়া যারা তাঁর এই যুদ্ধজয়ের সাথী,যাদের পরিবার এজন্য ক্ষতিগ্রস্ত তাদের সকলের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। পুত্রদের উপযুক্ত করে তোলার জন্য কত কম বয়সেই তাদের বিভিন্ন বিজিত অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত করতেন,যুদ্ধে তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসতে নির্দেশ দিতেন। আবার পুত্রদের প্রশংসাযোগ্য কাজের জন্য বয়স ও উপযুক্ততা অনুযায়ী উপহার প্রদান করতেন।

পরিবারের মহিলারা ও নিজের কন্যা ও বেগমরাও যে তাঁর কাছে সমান গুরুত্ব পেত,সেই বর্ণনা দিয়েছেন। হিন্দুস্থান জয়ের পর কাবুলে দীর্ঘকাল দুশ্চিন্তা আর উৎকন্ঠায় কাটানো অন্তঃপুরবাসিনীদের জন্য মনোহারী ও যথোপযুক্ত উপহার পাঠিয়ে আর তাদের ভ্রমনের ব্যবস্থা করে,তাদের আনন্দদানের জন্য নৃত্যগীতের ব্যবস্থা করার আদেশ দিয়ে বাবর যে কর্তব্য করেছিলেন,সেই বর্ণনাও পাওয়া গেছে তাঁর লেখাতে। লিখেছেন ১২ বছর বয়সী বাবরের আন্দিজানে থাকার সময়  তাঁর অভিভাবিকা ও উপদেষ্টা হিসাবে দুর্গের নিকটে বাগানবাড়িতে থাকা বাবরের দিদিমা সাহসী এহসান দৌলত বেগমের কথা। লিখেছেন ভাগ্যাণ্বেষী কিশোর বাবরকে অনেক রাজনৈতিক বিষয়ে পরামর্শদানকারী তাঁর মা কুলতুগ নিগর খানুমের দৃঢ়তার ও দূরদর্শিতার কথা, বাবরের প্রিয় ভগ্নী ও অত্যন্ত শুভাকাঙ্খী,সুন্দরী,শিক্ষিতা খান জাহান বেগমের কথা। বাবরের চিরকালের বৈরী  উজবেক সুলতান ধুরন্ধর শয়বানী খানের হাতে সমরখন্দে অবরুদ্ধ বাবর ও পরিবারকে অবরোধমুক্ত করার জন্য জাহান বেগম, বাবরের অনিচ্ছাতেও শয়বানী খানের শর্ত অনুযায়ী তাকে বিবাহ করেন। নিজের প্রজ্ঞা,শিক্ষা,রুচি,কাব্যরচনার দক্ষতা সব জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন ভাইয়ের জন্য। এ কাজে তাঁর সমর্থক ছিলেন দিদিমা এহসান দৌলত বেগম। পরে ভাগ্যান্বেষণে যাযাবরের মত  ঘুরতে ঘুরতে বাবর যখন কাবুলে আসেন সেই সময় ইরানের শাহের সঙ্গে যুদ্ধে শয়বানি খান পরাজিত ও নিহত হন,তাঁর হারেমও  ইরানের শাহের অধিকারে আস। সেই সময় বাবর শাহ ইসমাইলকে পত্রানুরোধ করে অতি প্রিয় ভগিনী জাহান বেগমকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনেন। এমনই ছিল বাবরের কর্তব্যপরায়ণতা।    

বাবর যে কত স্নেহান্ধ ছিলেন তা জানা যায় তাঁর পুত্র,দিলদার বেগমের ছোট ছেলে সুদর্শন আর গুণবান আলোয়ারের মৃত্যুতে তিনি বেশ কিছুদিন শোকাকুল হয়ে ছিলেন। ছেলের শোকে দিলদার বেগম উন্মাদ হয়ে যান। তখন হারেমের মেয়েদের ও দিলদারের সুস্থতার জন্য ঢোলপুরে হাওয়া বদলের জন্য যাওয়ার বন্দোবস্ত করেন, ‘এমনই সবদিকে নজর ছিল আমার পিতা আলা হজরতের,’ লিখেছেন গুলবদন। এই সময়েই হুমায়ুন অসুস্থ হয়ে পড়েন মথুরাতে। সঙ্গে সঙ্গে হাওয়া বদলের সিদ্ধান্ত বদলে চললেন মথুরায়,হুমায়ুনকে আগ্রায় ফিরিয়ে আনতে।

প্রিয় ও জ্যেষ্ঠপুত্র,তাঁর নির্বাচিত উত্তরসূরী হুমায়ুনের এই গুরুতর অসুস্থতার সময় চিরকালের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী  প্রিয়জনের রক্ষার জন্য আল্লার কাছে নিজের  আত্মোৎসর্গের ঘটনা থেকে বোঝা যায় তাঁর পিতৃস্নেহের গভীরতা। অসুস্থ হুমায়ুনের শয্যা তিনদিন ধরে পরিক্রমা করে তিনি  অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমরা জানি এরপর হুমায়ুন  সুস্থ হয়ে ওঠেন ও কিছুদিন পর বাবরের মৃত্যু হয়। কিন্তু বাবরের মৃত্যুর আসল কারণ ছিল যে বিষক্রিয়ার ধীর প্রভাব সে কথা জানা যায় গুলবদন বেগমের লেখা থেকে। পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদির পরাজয় ও মৃত্যুর পর বাবরের কাছ থেকে জীবনধারণের সম্মানজনক উপায় লাভ করলেও পুত্রশোকে কাতর লোদির মা সফল হয়েছিলেন বাবরের রসুই ঘরের বাবুর্চির মারফৎ বাদশাহর খাবারের রুটিতে বিষ মেশাতে। যদিও এ কাজের ভার প্রাপ্ত সেই বাবুর্চি অন্তর্বেদনায় মারা যায় রান্নাঘরেই, তাই পুরো বিষটুকু সে মেশাতে পারেনি বাবরের খাবারে। অতি সামান্য পরিমাণে সেই তীব্র বিষ তাঁর খাবারে মেশার ফলে বেশ বিষের বিক্রিয়ায় কিছুদিন ভুগে বাবরের মৃত্যু হয়।

seimeyera03 (Medium)তাঁর লেখা থেকে জানা যায় মুঘল হারেমবাসিনীদের কথা। বাবরের স্ত্রীদের কথা, প্রধানা মহিষী, হুমায়ুনের মা মাহাম বেগমের কথা,যিনি এক সন্তানের মৃত্যুর পর বাবরের কাছ থেকে চেয়ে (দত্তক) নিয়েছিলেন দিলদার বেগমের দুই সন্তান হিন্দাল ও গুলবদনকে। তাঁর সুশিক্ষাতেই বড় হয়েছিলেন দু’জন,তাই চিরকাল এঁরা ছিলেন হুমায়ুনের সঙ্গী ও সমর্থক। মাহাম বেগম প্রায় সময়েই বাবরের কাছে কাছে থাকতেন,সে কারণে পিতা বাবর আর ভাই হুমায়ুনকে কাছে থেকে দেখেছেন,জেনেছেন গুলবদন।

হুমায়ুনের রাজত্বকালে গুলবদন আগ্রাতে কাটিয়েছিলেন এবং শাহি খানদানের অনিবার্য আভ্যন্তরীন কলহ,ষড়যন্ত্র,সৌন্দর্যপ্রিয়তা,পালিকা মাতা মাহাম বেগমের কর্তব্যপরায়ণতা ও বিচক্ষণনতা প্রভৃতি  বিষয়ের নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন তাঁর লেখনিতে।

তাঁর লেখা থেকেই জানা গেছে হারেমের মেয়েদের কথা। জানা গেছে তুর্কি ও মোঙ্গল পরিবারের মেয়েরা যে শিক্ষার সুযোগ পেতেন,ঘোড়ায় চড়তে পারতেন,প্রয়োজনে অস্ত্র ধরতেও পিছপা হতেন না,রাজনীতি বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিতেন, মতামত দিতে পারতেন, সেইসব তথ্য। মুঘল হারেম ছিল মা,কাকীমা,শিশু,মাসিমা,দিদিমা,পিসিমা,ঠাকুমা,বোন,নার্স,‌আয়া ইত্যাদি মহিলা কর্মচারীদের হস্টেলের মত। হারেমবাসিনীদের পদমর্যাদা ও গুরুত্ব অনুযায়ী, বাদশাহের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের গুরুত্ব অনুযায়ী মহিলাদের থাকার জায়গা  নির্দিষ্ট থাকত। এখানে তাঁরা একত্র হতেন,একত্রে খাওয়াদাওয়া করতেন,রাজপরিবারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন এবং সে সিদ্ধান্ত গ্রাহ্যও হত।

আকবরের মা হামিদা বানুর সঙ্গে  হুমায়ুনের বিবাহের  সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন তাঁরাই। পরিবারের মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এই বিবাহের ব্যাপারে হুমায়ুনের ভ্রাতা হিন্দালেরও আপত্তি ছিল। হিন্দালকে প্রভাবিত করে রাজি করিয়েছিলেন হারেমের মহিলারা।

দেশবিদেশে পালিয়ে বেড়ানো হুমায়ুনকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিলেন না তেজস্বিনী হামিদাও। টানা ৪০ দিন নানা কথোপকথনের পর দিলদার বেগমের অনুরোধে,হারেমের অন্য মহিলাদের চাপেই হামিদা বানু রাজি হয়েছিলেন বিবাহে। ১৫৪১ সালের শেষ দিকে ১৪ বছর বয়সী হামিদা বানুর বিয়ে হয়ে যায় দেশছাড়া হুমায়ুনের সঙ্গে। পরে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন মরিয়ম মাকানী নামে।

হামিদা বানু ছিলেন গুলবদনের চিরদিনের সখী। রাজ্যচ্যুত দেশছাড়া হুমায়ুনের ভবঘুরে জীবনের সময়কার সব ঘটনা,কামরানের অত্যাচার,বিদেশে নানা বিপদ ও পরিত্রাণের ঘটনা হামিদা বানুই গল্প করেছিলেন তাঁর কাছে। সে সব গল্পের সবই তিনি স্মৃতির পাতায় সযত্নে ধরে রেখেছিলেন,যা প্রকাশিত হয়েছিল ‘হুমায়ুননামা’র পাতায় পাতায়। এসব তথ্য সরবরাহ না হলে আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’ লেখা হত না হয়ত,বা হলেও সঠিক বহু তথ্যই স্থান পেত না সেখানে।

শেরশাহের কাছে পরাজিত রাজ্যচ্যুত হুমায়ুনকে ক্রমাগত ভাই কামরান ও আসকারির শত্রুতার শিকার হতে হয়েছ ভারতবর্ষের বাইরে ও ভিতরে। এমনকি আড়াই বছরের শিশু আকবরকেও লাহোরে বন্দি করে রেখেছিলেন কামরান। সেই বন্দিদশাতেও তাঁর সঙ্গে ছিলেন গুলবদন বেগম। যেহেতু তিনি ছিলেন হুমায়ুনের প্রিয়পাত্রী তাই তাঁকেও চোখের জল ফেলে আগ্রার দুর্গ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল কামরানের কাছে।

আবার, হুমায়ুনের দুর্দিনের সময় পরিবারের অন্যান্য মহিলা ও শিশুদের রক্ষা করেছিলেন কান্দাহারের শাসনকর্তা হিন্দাল,একথাও তাঁর লেখা থেকে জানা যায়।   

কামরান যে কতখানি হিংস্র আর লোভী ছিলেন সে কথা গুলবদনের লেখায় যেমন নিরপেক্ষভাবে পরিবেশিত হয়েছে,তেমনি প্রিয় ভাই বাদশাহ হুমায়ুনের শাসক হিসাবে দুর্বলতার কথা,তাঁর ক্ষতিকারক আফিমপ্রিয়তার কথাও বাদ পড়েনি।

কামরানের  আগ্রাসনের হাত থেকে হিন্দালের কান্দাহার বাঁচানোর জন্য হুমায়ুন তাঁর পিসিমা খানজাদা বেগমকে অনুরোধ করেছিলেন কামরানকে কান্দাহারে গিয়ে বোঝাতে যে,কাছেই উজবেক ও তুর্কীরা তাঁদের সাম্রাজ্যে দখলের জন্য ওঁৎ পেতে আছে,এ অবস্থায় নিজেদের মধ্যে বিবাদ না করাই উচিত। কামরান যদি তা মেনে নেয় তাহলে হৃতরাজ্য ফিরে পেলে কামরান যা চাইবেন তাই তাঁকে দেবেন হুমায়ুন। এই ঘটনা প্রমান করে যে মুঘল পরিবারে নারীরাও যোগ্য মর্যাদা পেতেন, তাঁরা আশ্রিত ছিলেন না,তাঁদের দৌত্য করার অধিকার ও  ক্ষমতা ছিল। তাঁদের উপহার দেবার মত নিজেদের সম্পদ ছিল।

হজরত খানজাদা বেগম সেখানে যাবার পর কামরান নিজেকে বাদশা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য চাপ দিতে থাকেন,কিন্তু  হজরত খানজাদা বেগম তাতে নরম না হয়ে দৃঢ়ভাবে জানিয়ে ছিলেন যে এ ব্যাপারে পরলোকগত বাদশাহ বাবরই হুমায়ুনকে উত্তরাধিকারী নির্বাচন করেছেন, অতএব এ ব্যাপারে আর কোন প্রসঙ্গ তোলার কারণ নেই। তবুও অবাধ্য কামরান এঁদের বর্তমানেই চারমাস কান্দাহার অবরোধ করে রাখেন। সকলের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। পরে আমীরদের সাহায্যে খোৎবা পাঠ করিয়ে কান্দাহারের দখল নিয়ে প্রিয় ভাই আসকারিকে দেন ও মাত্র একদিনের জন্য গজনীর অধিকার দেন হিন্দালকে। দুঃখে হিন্দাল সবকিছু ছেড়ে বদখসানের দিকে চলে যান।

মীর্জা কামরানের জন্যই যে বাবরের প্রিয় ভগিনী খানজাদা বেগমের মৃত্যু হয়েছিল সে কথাও স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন গুলবদন। হুমায়ুন কান্দাহার পৌঁছুলে  কামরান কাবুল থেকে বারবার খানজাদা বেগমকে অনুরোধ করেন যে,তিনি যেন হুমায়ুনের সঙ্গে তাঁর আপস মীমাংসা করে দেন। হুমায়ুন ৪০ দিন কান্দাহার অবরোধ করে রাখার পর আসকারি কান্দাহার প্রত্যর্পণ করেন হুমায়ুনকে। বৈরাম খানকে কান্দাহারের দায়িত্ব দিয়ে হুমায়ুন খানজাদা বেগমকে নিয়ে বাদশাহী কাফেলাতে কাবুল রওনা দিলেন। পথশ্রমে ক্লান্ত বৃদ্ধা মাঝপথেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। চারদিনের জ্বরবিকারে তাঁর মৃত্যু হল ১৫৫০ সালের শেষদিকে। আর এই  বছরেই হুমায়ুন কামরান মির্জার অধিকার থেকে কাবুল জয় করতে সক্ষম হন। কাবুল জয় করে শিশু আকবরকে,গুলবদন বেগমকে,মা দিলদার বেগমকে,আরেক ভগ্নী গুলচেহরা বেগমকে উদ্ধার করেন।

এইভাবে পাঁচবছর পর আবার সকলে মিলিত হলেন। কিন্তু এরপরেও কামরানের বিদ্রোহ শেষ হয়নি। গুলবদন নিজেও রাজনীতিতে  প্রভাবশালী ছিলেন। কামরান যখন এরপরেও বারাবার হুমায়ুনকে আক্রমণ করে অতিষ্ঠ  করে তুলেছেন, তখন নিজের স্বামীকে ও পুত্রকে চিঠি লিখে নির্দেশ দিয়েছেন ও নিরত করেছেন কামরানের সঙ্গ দিতে। কামরান হুমায়ুনকে অস্ত্রাঘাতে আহত করেছেন। শিকাররত অবস্থায় মির্জা হিন্দালকে আততায়ী পাঠিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করেছেন ও কিছুদিন পর সফল হয়েছেন। হিন্দাল ভ্রাতা ও বাদশাহ হুমায়ুনের সম্ভ্রম,মর্যাদা আর প্রাণ রক্ষা করতে প্রাণ দিয়েছেন। এরপরেও কামরান থামেননি। সারা হারেম হিন্দালের হত্যায় মূহ্যমান হয়ে পড়েছিল। এরপর খোশবে থেকে কামরান বন্দি হলেন।

সকল প্রজা,সুবার শাসকেরা,আমীর ওমরাহ,সৈনিক যারা এতদিন কামরানের অন্যায় রাজ্য লিপ্সার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তারা সকলেই,এমনকি হারেমের মহিলারাও একবাক্যে কামরানের মৃত্যুদণ্ড দাবি করলেন। কিন্তু স্নেহপ্রবণ হুমায়ুন ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ড দিতে রাজি হলেন না। তিনি তাঁর দুই চোখ সেলাই করে দেবার আদেশ দিলেন। সেই আদেশ পালন করা হল সঙ্গে সঙ্গে।

এই ঘটনার বিবরণের পরেই গুলবদন তাঁর স্মৃতিলেখন শেষ করেছেন। হয়ত আরও কিছু লিখেছিলেন,কিন্তু তেমন কোন পাতা পাওয়া যায়নি। বাবরের সময় থেকে হুমায়ুনের দ্বিতীয়বার হিন্দুস্থানে ফিরে আসা পর্যন্ত প্রবহমান ঘটনাবলীর এই অসামান্য বিবরণ লিখতে গিয়ে তাতে ঘুরেফিরে এসেছে শাহী পরিবারের আনন্দ উৎসব,বিবাহ,ধর্মান্তরকরণ,মায়েদের পরিচয়,পিতার দূরদর্শিতা,নান্দনিক ভাবনা, নতুন স্থাপত্য তৈরির ভাবনা,খাওয়াদাওয়া,একসঙ্গে পরিবারের সকলের সঙ্গে সময় কাটানো,পাঠাগার স্থাপন,বিনোদনের জন্য মঞ্চস্থাপন,উৎসবে ও রাজ্যবিজয়ের আনন্দে আলোকসজ্জার প্রবর্তন,পুত্রদের সাফল্যে তাদের উপহার দানের বিশদ ও খুঁটিনাটি বিবরণ। লেখায় স্থান পেয়েছে বিভিন্ন জায়গার আবহাওয়া, ভূপ্রকৃতি,খাদ্যের কথা,দুর্গের বিবরণ,যুদ্ধের বিষয়,রাজনীতির নানা টানাপোড়েনের কথা। সদ্যপ্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্যের নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধতার কথাও বিবৃত হয়েছে তাঁর লেখায়।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার যে সেই সময়ের মৌলবাদী মৌলবীদের নির্দেশ অমান্য করে আকবর তাঁকে জাহাজে করে হজ করতে পাঠিয়েছিলেন এবং তিনি সেই হজ করে সাতবছর পরে আবার দেশে ফিরে আসেন। কোন মহিলার হজযাত্রাও বোধ হয় এদেশে সেই প্রথম ও মুঘল জমানায় সেই শেষ।    

সেই মেয়েরা সবকটা এপিসোড একত্রে এই লিংকে