ভ্রমণ-কানাডারচিঠি(পর্ব ১০)- বুমা ব্যানার্জী দাস-বসন্ত’২৬

Happy Canada Day background

রকি বেয়ে গল্পেরা সব প্রেইরি জুড়ে নামে,
জুটিয়ে নিয়ে লিখছি চিঠি, মেপল পাতার খামে।

১৫ এপ্রিল, ১৯১২। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে টাইটানিকের অকাল সলিলসমাধি ঘটল। অসংখ্য যাত্রী তলিয়ে গেলেন, বাকিদের লাইফ জ্যাকেট পরা নিথর শরীর ভাসতে থাকল মহাসাগরের ঢেউয়ে। সে-সব দেহ উদ্ধার করার বিশেষ উদ্যোগ কিন্তু নেওয়া হয়নি প্রথমে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ আত্মীয়স্বজন আর সংবাদপত্রের চাপে টাইটানিকের মালিকানা যাদের, অর্থাৎ সেই হোয়াইট স্টার লাইন চারখানা জাহাজ পাঠাল দেহ উদ্ধারের উদ্দেশ্যে। এই উদ্ধারকার্য পুরোটাই পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল নোভা স্কোশিয়ার হ্যালিফ্যাক্স থেকে। নিউফাউন্ডল্যান্ডের সেন্ট জনস হ্যালিফ্যাক্সের তুলনায় দুর্ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী ছিল বটে, কিন্তু সেখানে যাতায়াতের ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না তখন। এদিকে উত্তর আমেরিকার পুবদিকের শহরগুলো থেকে রেলগাড়িতে হ্যালিফ্যাক্স পৌঁছানোর সুব্যবস্থা ছিল। মৃতদেহ শনাক্ত করার জন্য আত্মীয়স্বজনকে আসতেই হত, তাই হ্যালিফ্যাক্স থেকে উদ্ধারকার্য চালানোটা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত।

প্রথম রওনা দিল ক্যাবল কোম্পানির জাহাজ ম্যাকে-বেনেট। তারা সাধারণত সমুদ্রের নীচে টেলিগ্রাফের ক্যাবল পাতে, সারাই করে। কর্মীদের মধ্যে যারা চট করে বিচলিত হয়ে পড়ে না, তাদেরই নাকি এই কাজের জন্য বাছা হয়েছিল। ১২৫টা কফিন আর প্রায় সত্তরটা মৃতদেহ সংরক্ষণ করার মতো সুগন্ধি বস্তু তোলা হয়েছিল ম্যাকে-বেনেটে। এর বেশি সুগন্ধি নাকি ছিল না আর শহরে, তাই বেশ কিছু টন বরফও নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া এক পাদরিকেও নেওয়া হয়েছিল সঙ্গে, যাঁদের দেহ জাহাজে করে ফিরিয়ে নিয়ে আসার অবস্থায় নেই, তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে সমুদ্রেই সমাধি দেওয়ার জন্য। ১৩ দিন ধরে সমুদ্রে ঘুরে বেড়িয়েছিল ম্যাকে-বেনেট, উদ্ধার করেছিল ৩০৬টি দেহ। মোটে ১৯০ জনকে আনা হয়েছিল হ্যালিফ্যাক্সে, বাকিদের কপালে জুটেছিল সলিলসমাধি। মৃতদেহের পরিস্থিতি প্রধান বিচার্য বিষয় হলেও যাত্রীদের সামাজিক অবস্থানও সেসব সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। পরে মিনিয়া নামে আরও একটা জাহাজ গিয়েছিল, তবে তারা মাত্র সতেরোটা দেহ খুঁজে পেয়েছিল। বাকি দুটো জাহাজও খুব বেশি কিছু খুঁজে পায়নি আর। হ্যালিফ্যাক্সের তিনটে কবরখানা এই মহৎ দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিল। যদিও হোয়াইট স্টার লাইন এই শেষকৃত্যের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেছিল, তবু হ্যালিফ্যাক্সবাসীরাও শ্রদ্ধার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিল সমস্ত ক্রিয়াকর্মে। আর এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার করুণ রস মিশে গিয়েছিল শহরটার পরতে পরতে।

ঠিক পাঁচ বছর পরের ডিসেম্বর মাস। হ্যালিফ্যাক্স বন্দরে ফরাসি মালবাহী জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লাগে নরওয়ের এক জাহাজের। দুর্ভাগ্যবশত ফরাসি জাহাজে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক পদার্থ মজুত ছিল। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে হ্যালিফ্যাক্সের রিচমন্ড অঞ্চল প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মৃত্যু হয় সতেরোশ’রও বেশি মানুষের। একে বন্দরনগরী— জাহাজডুবি, জলদস্যুর আক্রমণ ইত্যাদি তো চিরকালীন ঘটনা। তার ওপর টাইটানিক আর এই ভয়ংকর বিস্ফোরণ মিলে শহরটাকে আদ্যন্ত ভূতুড়ে করে তুলল। আজও হ্যালিফ্যাক্সের অলিতে গলিতে অশরীরী উপস্থিতির ইঙ্গিত।

প্রথমেই বলতে হয় সেন্ট পলস অ্যাংলিকান চার্চের কথা। ১৯১৭ সালের বিস্ফোরণে চার্চের দোতলার জানালার কাচ এমন অদ্ভুতভাবে ভেঙে যায় যে মনে হয় সেখানে যেন কোনও মানুষের ছায়া পড়েছে। লোকে বলে, এক যাজক নাকি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, জানালায় তাঁর ঝলসানো দেহের ছাপ পড়ে গেছে। আসল ঘটনা সম্ভবত তা নয়। ভাঙা জানালার ওই আজব আকার সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। দূর থেকে দেখলে কারও ছায়া বলে ভুল হয় বইকি। নীচে রইল সে-জানালার ছবি।

যুক্তি যাই হোক না কেন, এ জাতীয় ঘটনা নানা রোমাঞ্চকর কাহিনির জন্ম দেয়; এই চার্চকে তাই ভূতুড়ে বলেই মেনে নেয় সবাই।

সে বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়েছিল আরও একটি বাড়ি— এক অনাথ আশ্রম। জাহাজ ধাক্কা লাগার বিকট আওয়াজে আশ্রমপ্রধানা ভেবেছিলেন শহর আক্রান্ত হয়েছে কোনোভাবে। বাচ্চাদের নিয়ে তিনি বাড়ির বেসমেন্টে লুকিয়ে পড়েছিলেন; আশ্রমের বাকি তিনজন কর্মীও তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন। হায় রে, নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে এই লুকিয়ে থাকাই ডেকে আনল মৃত্যু। একটু পরেই বিস্ফোরণের ধাক্কায় ভেঙে পড়েছিল গোটা বাড়িটা। চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল চব্বিশ জন অসহায় বাচ্চা সমেত আশ্রমপ্রধানা ও তাঁর কর্মীরা। বেশ কিছু বছর পরে যখন ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর একটু একটু করে আবার গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন আরও একটা অনাথ আশ্রম তৈরি করা হয় এই জায়গায়। সে-বাড়ির বর্তমান নাম ভেইথ হাউস। যদিও সেটা এখন আর অনাথ আশ্রম নয়, তবু থেকে গেছে মৃত অনাথ শিশুদের অলৌকিক উপস্থিতি। কেউ জানালায় বিষণ্ণ শিশুর মুখ দেখতে পায়, কেউ-বা সেই আশ্রমপ্রধানাকে ঘুরতে দেখে বাড়ির বিভিন্ন অংশে। হয়তো আজও কর্তব্য থেকে নিষ্কৃতি মেলেনি তাঁর।

এছাড়াও আরও বহুবিধ ভূতের আধিপত্য আছে হ্যালিফ্যাক্সে। ব্রিটিশরা ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে দুর্গ বানিয়েছিল এখানে, নাম দিয়েছিল হ্যালিফ্যাক্স সিট্যাডেল। প্রায় দুশো বছর ধরে সে দুর্গ ছিল প্রথমে ব্রিটেন, তারপর কানাডার অন্যতম সামরিক ঘাঁটি। এখন সিট্যাডেল হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পেলেও একসময় সৈন্যসামন্তে সর্বদা গমগম করত। শত্রুপক্ষের জাহাজের ওপর নজর রাখা হত এখান থেকে, আবার কখনও যুদ্ধবন্দিদের আটক করেও রাখা হত। কালক্রমে মৃত সৈনিকদের অতৃপ্ত আত্মার লীলাভূমি হয়ে উঠেছে হ্যালিফ্যাক্স সিট্যাডেল। তবে সবাইকে টেক্কা দিয়েছে মিস কেসি অ্যালেন ওরফে গ্রে লেডি। দুর্গের কোনও সৈন্যের সঙ্গে এর বিবাহ স্থির হয়েছিল, কিন্তু বিবাহের দিনই কী কারণে যেন সে-সৈন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কেসি অ্যালেনের অতৃপ্ত আত্মা আজও সে শোক ভুলতে পারেনি। ধূসর গাউন পরা গ্রে লেডিকে কখনও রকিং চেয়ারে বসে উদাসভাবে দুলতে দেখা যায়, কখনো-বা অশ্বারোহীদের বাসস্থানে ঘুরে ঘুরে সে খুঁজে বেড়ায় তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়তমকে।

টাইটানিকের যাত্রীদের স্মৃতির উদ্দেশে মেরিটাইম মিউজিয়ামে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা নানা জিনিস রাখা আছে। বলা বাহুল্য, সে সবই যাত্রীদের ব্যবহার করা জিনিস। এর মধ্যে সবচেয়ে ভূতুড়ে বোধ হয় শনাক্ত না হওয়া একজোড়া বাচ্চাদের জুতো। সে-জুতোর সামনে কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, ভয়ানক অস্বস্তি হয়। এমন স্মৃতিচিহ্নের সামনে দাঁড়ালে মন এমনিতেই ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে, তাই ওই বিষাদ সত্যিই অলৌকিক কিছু কি না— সে সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল। টাইটানিকের মৃত যাত্রীদের উদ্ধার করা দেহ কবরস্থ করার আগে যে বাড়িতে এনে রাখা হয়েছিল, সেখানে এখন রেস্তোরাঁ খোলা হলেও কেউ কেউ নাকি মায়া কাটাতে পারেনি এখনও। অদ্ভুত সব শব্দ, আনাচে-কানাচে ঘুরতে থাকা ছায়া তো আছেই, এ ছাড়াও রেস্তোরাঁর বাসন নাকি শূন্যে ভেসে ওঠে যখন-তখন।

নীচে রইল টাইটানিকের যাত্রীদের সমাধিক্ষেত্রের ছবি। তাঁদের কারো-কারো পরিচয় আর জানা যায়নি কখনও।

এ ছাড়া হ্যালিফ্যাক্সের ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরিফ হল নামক আবাসনে এক পেতনির দৌরাত্ম্য টের পাওয়া যায়; তার নাম আবার পেনেলোপি। আবাসনের চারতলায় সে নাকি আত্মহত্যা করেছিল। সেদিন থেকে নীল গাউন পরে শোকবিহ্বল মুখ-চোখ নিয়ে সে ঘুরে বেড়ায়। শেরিফ হলের আবাসিক ছাত্ররা অকারণে লাইট জ্বলতে নিভতে দেখে, ফিসফিসে আওয়াজ আর কান্নার শব্দ ভেসে আসে থেকে থেকে।

এমন ভূতুড়ে শহরে পর্যটকদের ভিড় হবেই। এমনিতেই নোভা স্কোশিয়া ভারি সুন্দর জায়গা। কিন্তু হ্যালিফ্যাক্সের ভৌতিক রস থেকে যাতে অতিথিরা বঞ্চিত না হন, তাই ঘোস্ট ওয়াকের ব্যবস্থাও আছে। একটা সেই সিট্যাডেলের ওয়াক, সত্তর মিনিটের। আগেই বলেছি, সিট্যাডেল এখন হেরিটেজ সাইট। সেখানের কোনও কর্মী দুর্গটা ঘুরিয়ে দেখান। তাঁর পরনে থাকে প্রাচীন যুগের সৈনিকদের পোশাক। হাতে লন্ঠন নিয়ে আধো অন্ধকারে রোমাঞ্চকর সব কাহিনি বলতে বলতে পর্যটকদের নিয়ে তিনি পাড়ি দেন অতীতে। আর একটা ওয়াক একটু বেশি সময় ধরে হয়, সেখানে সিট্যাডেল দুর্গ বাদে বাকি সব ভূতুড়ে জায়গা ঘুরিয়ে দেখানো হয়।

কানাডা এমনিতেই তুষারাবৃত জঙ্গুলে জায়গা, রহস্যময়ও। শীতের দিনে খাস শহর এলাকা দেখলেও মনে হয় পরিত্যক্ত, কোণে কোণে অশরীরীরা সব ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই হ্যালিফ্যাক্স ছাড়াও ভূতুড়ে উপদ্রবের কমতি নেই দেশজুড়ে।

ব্রিটিশ কলম্বিয়া ছবির মতো সুন্দর, কিন্তু কোয়েনেলের (Quesnel) এক যাদুঘরে ম্যান্ডি নামধারী এক কুখ্যাত পুতুল আছে। কোয়েনেলেরই এক বাসিন্দার পারিবারিক পুতুল এই ম্যান্ডি। বয়স কম নয়, প্রায় একশো বছরের ওপর। সম্ভবত উত্তরাধিকারসূত্রে ম্যান্ডিকে তিনি পেয়েছিলেন। কিছু অদ্ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা হওয়ার ফলে তিনি যাদুঘরে দান করে দেন তাকে। দেখতে মিষ্টি হলেও ম্যান্ডির স্বভাব খুব সুবিধের নয়। যাদুঘরে আসার পরই তার ছবি তুলে রাখার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় অন্য এক অংশে। পরদিন কর্মীরা সেখানে গিয়ে দেখেন সবকিছু তছনছ হয়ে আছে, যেন কোনও বায়নাদার বাচ্চা হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই ছোড়াছুড়ি করেছে। পরবর্তী সময় ম্যান্ডির সঙ্গে এক আলমারিতে কিছু রাখলেই দেখা গেছে পরদিন সেটা আলমারির বাইরে পড়ে আছে। কী ঘটছে বোঝার জন্য ক্যামেরা বসিয়েও লাভ হয়নি, কারণ ক্যামেরাতে অন্য সবকিছুর ছবি এলেও ম্যান্ডি পুতুল অনুপস্থিত। অনেকেই অনুভব করেছেন, সে-ঘরে থাকাকালীন ম্যান্ডির দৃষ্টি যেন তাঁদের অনুসরণ করে বেড়াচ্ছে।

ব্যাঁফের মতো অতি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রও ভূতমুক্ত অঞ্চল নয়। পাহাড়ের কোলে দুর্গের মতো ফেয়ারমন্ট হোটেল নিজেই এক দ্রষ্টব্য বস্তু। কিন্তু তাদের এক লিফটচালক আদৌ মানুষ নন। স্যাম নামক এই অশরীরী নাকি জীবিতকালেই বলে রেখেছিলেন যে মৃত্যুর পরও তাঁর কাজ তিনি নিষ্ঠাভরে করে চলবেন। ভূতেরা যে এমন এককথার মানুষ (?) হয় কে জানত। তার ওপর হোটেলের বলরুমে মাঝে-মধ্যেই বধূবেশী এক পেতনি নাচতে আসেন। এঁর ঘটনা অবশ্য খুবই দুঃখজনক; বহুদিন আগে ফেয়ারমন্ট হোটেলেই এঁর বিয়ের ভোজসভার আয়োজন করা হয়েছিল। বিয়ের দিন ইনি সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যান; তখন বৈদ্যুতিক আলো ছিল না, সিঁড়ির ধারে মশাল জ্বলছিল। পড়ার সময়ে পোশাকে আগুন ধরে যায় তাঁর, অতঃপর মৃত্যুও ঘটে। তাঁর হৃদয়বিদারক কান্না হোটেলের অনেক বাসিন্দাই  শুনেছে।

সালফার মাউন্টেনের কোলে রাজকীয় ফেয়ারমন্টের ছবি রইল নীচে। সত্যি বলতে কী, এমন একটা বাড়িতে ভূত না থাকলে মানায় কখনও!

*

ম্যানিটোবা বললে প্রথমেই শ্বেতভল্লুকের কথা মনে পড়ে। কিন্তু লেক ম্যানিটোবার পাশে ম্যালার্ড লজের ধারেকাছে বোধ হয় শ্বেতভল্লুকরাও যেতে রাজি হবে না। একসময় এই লজ ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ ছিল। শোনা যায়, লজ বানানোর সময় একজন কর্মী ভিতের মধ্যে পড়ে যান। হয়তো তিনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন বা অন্য কিছু, কেউ টের পায়নি ব্যাপারটা এবং তাঁকে ভেতরে রেখেই ভিত তৈরি হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর অশরীরী উপস্থিতির ভেতর একটু প্রতিশোধস্পৃহা দেখা যায়। লজে আসা অতিথিদের তিনি কঙ্কালরূপ ধরে রীতিমতো ভয় দেখিয়ে থাকেন।

নাহান্নি অভয়ারণ্যের গল্পটাও বেশ হিংস্র প্রকৃতির। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এখানে সোনার খোঁজে অভিযান চালানো হত। কেউ ফিরত, কেউ-বা হারিয়ে যেত চিরতরে। যেমন, ১৯০৬ সালে হারিয়ে গিয়েছিল দুই ভাই— উইলি আর ফ্রাঙ্ক ম্যাকলিয়ড। দু-বছর বাদে তাদের মুণ্ডহীন দেহ পাওয়া গিয়েছিল। সম্ভবত তাঁবুতে থাকাকালীন তারা কোনোভাবে আক্রান্ত হয়। ১৯১৭-তে আরও একটা মুণ্ডহীন দেহ পাওয়া যায়। এদের মৃত্যুর কারণ আজও রহস্যাবৃত। তবে এখনও মাঝে-মধ্যেই নদীর ধার দিয়ে কবন্ধ ভূতদের হেঁটে চলে বেড়াতে দেখা যায়। কেউ কেউ আবার ইউএফও-ও দেখেছে এই অঞ্চলে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই উপত্যকার নাম হয়েছে কবন্ধের উপত্যকা।

যাওয়া যাক নুনাভুটে। সেখানের দমকলের অফিসে দুটি নির্বিবাদী ভূতের বাস। তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক— তিনি সম্ভবত নিজেই ফায়ারফাইটার ছিলেন, অন্যজনের মৃত্যু কিন্তু সেখানে হয়নি। কোনও এক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছিল বাচ্চা মেয়েটি।

একটা ঐতিহাসিক জেলকে হস্টেল বানিয়ে দিলে কী হতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ অটোয়ার সেইন্টলো জেল হস্টেল। এই হস্টেলে অবশ্য এমনিতে কেউ থাকে না, কিন্তু সেই মেজকর্তার মতো ভূত শিকারি হলে এক রাতের জন্য থাকাটা অবশ্যকর্তব্য। এখানে একসময় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদেরও রাখা হত। যারা মৃত্যুদণ্ড পায়নি, তাদের অবস্থা সম্ভবত আরও খারাপ ছিল। শোনা যায়, কানাডার দুঃসহ শীতেও কয়েদখানা গরম রাখার ব্যবস্থা ছিল না কোনও। মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রিতে জমেই মরে যেত কতজন। সে-সব আত্মা এখনও ঘুরে বেড়ায় জেলের ভেতর। বলাই বাহুল্য, ভূত শিকারিদের ঠান্ডার মধ্যে কষ্ট পেতে হয় না, এখন সবরকম সুযোগ-সুবিধাই আছে সেখানে।

আমাদের শহর ক্যালগেরিও বঞ্চিত নয়, আমরাও আমাদের ভাগের ভূত বিধিমতো পেয়ে থাকি। খোদ ডাউনটাউনের কাছে, বো আর এলবো নদীর সংযোগস্থলে ডিন হাউস নামে একটা রেস্তোরাঁ আছে। সেখানে জোড়া খুন-আত্মহত্যা ঘটেছিল ১৯৩৫ সাল নাগাদ। তারপর থেকে এক রহস্যময় লোককে ধোঁয়া-ওঠা পাইপ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। একটা বিকল টেলিফোন নাকি হঠাৎ হঠাৎ বেজে ওঠে, আর চিলেকোঠায় জিনিসপত্র রাখার দরজাওলা একটা খোপকে কিছুতেই তালাবন্ধ করে রাখা যায় না।

স্ট্যামপিডের গল্প তো অনেক করেছি। তা সেই স্টেডিয়ামও নাকি ভূতগ্রস্ত। ফাঁকা স্টেডিয়ামে হাততালি, শোরগোলের শব্দ শোনা যায়, তার সঙ্গে শোনা যায় কার যেন পদশব্দ। এখানে তো আর শ্মশানঘাট বলে কিছু হয় না; মৃতদেহকে যেখানে রেখে করবস্থানে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তাকে বলে ফিউনারেল হোম। এমন একটা স্থান পরিত্যক্ত হলেও তাকে কিনে নিয়ে আনন্দ করার জায়গা বানিয়ে দিলেই যে সব মিটে যায় না, সেটা রোজ অ্যান্ড ক্রাউন পাব হাড়ে হাড়ে বুঝছে। অনেকদিন আগে সে-বাড়ি ফিউনারেল হোম ছিল। পরে হাতবদল হয়ে পাব হয়। এখন জানালা খেয়ালখুশি মতো খুলে যায়, লাইট যথারীতি দপদপ করে; সবচেয়ে বিচ্ছিরি ব্যাপার হল, একটা খোকা ভূত এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করে বেড়ায়।

ক্যালগেরির সবচেয়ে আমোদের রাস্তা স্টিফেন অ্যাভিন্যু। সারাবছর কিছু না কিছু হয়েই চলে সেখানে। এমন ঝলমলে হুল্লোড়ে রাস্তায় একটা ভূতুড়ে বাড়ি আছে। বাড়ির নাম ডল ব্লক। লুই হেনরি ডল নামে এক রত্ন ব্যবসায়ী মস্ত বাড়িটা বানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দশ বছর বয়সি ছোট্ট মেয়েটা তারাদের দেশে চলে গিয়েছিল হঠাৎ। পথচলতি মানুষ আজও নাকি তাকে তিনতলার জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কখনো-কখনো। ও-বাড়ি এখন হায়াত রিজেন্সির সম্পত্তি, তবুও। কতবার গিয়েছি ওই রাস্তা দিয়ে, অবিশ্বাসীর চোখে বোধ হয় ধরা পড়ে না ওসব।

এই যে সেই আলো-ঝলমল রাস্তার ছবি। বাঁয়ের সারির একেবারে শেষের দিকে সেই বাড়ি।

ক্যালগেরির ১৪০ বছরের পুরানো নক্স (Knox) চার্চে বহুবার গিয়েছি। এখানকার হাইস্কুলগুলোর বেশিরভাগ অনুষ্ঠান ওখানেই হয়। লোকে বলে, ভুল সুর বাজালে কে যেন এসে কব্জিতে চাঁটি মারে। কে জানে, ভূত না ভগবান, কার কাজ সেটা। তবে পুরানো চার্চে ভূত থাকাটাই দস্তুর। আমার কন্যা বেশ কয়েকবার স্কুলের অনুষ্ঠানে বেহালা বাজিয়েছে সেখানে, দলের কেউ চাঁটি খেয়েছে বলে শুনিনি। চার্চের ভেতরটা কিন্তু ভীষণই সুন্দর।

ক্যালগেরিরও ঘোস্ট ওয়াক আছে, হ্যালোউইনের সময় বেশ ভিড়ও হয়। ভূতুড়ে জায়গায় ঢুঁ মারা এখানে ট্যুরিজমের একটা অংশই বলা যেতে পারে।

ঠিক কবে থেকে মানুষ ভূতের অস্তিত্ব কল্পনা করতে শিখেছে জানি না, তবে নাগরিক সভ্যতার পত্তন হওয়ার আগে, দিনের শেষে আধো-অন্ধকারে বসে হয়তো হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে মনে করতে গিয়ে এর উৎপত্তি। তারও অনেক আগে সভ্যতার প্রায় গোড়ার দিকে মানুষ প্রকৃতির অনেক কাছাকাছি থাকত, বলা যায় পুরোপুরি প্রকৃতিনির্ভর জীবন ছিল তখন। তবু আকাশে কেন হঠাৎ একটা চোখ-ধাঁধানো আলো ঝলসে উঠল, বা অঝোর ধারায় জল পড়ছে কেন ওপরের ওই নীল চাঁদোয়া থেকে— এসব কিছুই তেমন বুঝতে পারত না। ঘন জঙ্গলে ঠিক কী কী বিপদ থাকতে পারে তাও জানত না। কল্পনা করে নিত আকাশের দেবতাকে; তিনি ক্রুদ্ধ হলে চারদিক ভাসিয়ে দেন, অথবা সব জল শুকিয়ে মাটিতে ফাটল ধরান। জঙ্গলের আলোছায়া তার মনে তৈরি করত অদ্ভুত সব না দেখা প্রাণীর কল্পনা। হয়তো এটাই ছিল আধুনিক ভাষায় যাকে বলে তার কোপিং মেক্যানিজম। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যেত সে-সব কাল্পনিক কাহিনি। কানাডার ফার্স্ট নেশনদের নানা গোষ্ঠীর মধ্যে এমন কত যে অদ্ভুত চরিত্রের সৃষ্টি হয়েছিল! কল্পনার ফাঁকে হয়তো সত্যও মিশে আছে কোথাও। সে-সব গল্পের ঝুলি খুলব পরের পর্বে।

আজ তবে এই পর্যন্ত। তোমাদের আশেপাশে ভূতুড়ে বাড়ির খোঁজ নিয়ে দেখতে পারো কিন্তু, অবশ্যই বড়োদের অনুমতি নিয়ে।

টা টা

ভ্রমণ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply