গল্প- এজ অফ অটোমেশন- ইমন চৌধুরী বসন্ত ২০২১

ইমন চৌধুরীর আগের গল্প  গোল্ডেন হ্যান্ডশেক, রাজা- এক জাদুকরের গল্প

সন্ধ্যা ভট্টাচার্য গল্প প্রতিযোগিতা ২০২০(পঞ্চম থেকে অষ্টম স্থান)

এ শহরের এখনো ভালো করে ঘুম ভাঙেনি, সাদা কুয়াশার একটা পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে সে এখনো ঘুম চোখে বিছানায় শুয়ে আছে।

ভোরবেলা ওঠা অগ্নির ছোটোবেলার অভ্যাস। চোখেমুখে জল দিয়ে কফির কাপ হাতে সে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। অগ্নির ফ্ল্যাটের সামনেই একটা কৃত্রিম গাছের বাগান আছে। রোজ এইসময় বারান্দায় এসে অগ্নি ওই বাগানটার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুদিন আগেও এমন কৃত্রিম বাগানের কথা ভাবা যেত না। কিন্তু গত কয়েক বছরে পৃথিবী আমূল বদলে গেছে। এই গুল্মের মতো ছোটো ছোটো গাছগুলো টোকিও থেকে কিনে আনা হয়েছে, বর্তমানে পৃথিবীতে এই গাছের বিপুল চাহিদা। একটি প্রমাণ সাইজের বৃক্ষের তুলনায় এই ব্যাটারি-চালিত কৃত্রিম গাছ একই সময়ে দ্বিগুণ পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করে। এ-গাছের কোনো বৃদ্ধি নেই, কোনো মৃত্যু নেই, পরিচর্যার কোনো প্রয়োজনও নেই। পৃথিবী জুড়ে পরিকল্পনা চলছে আগামী এক দশকের মধ্যে বিশেষ বিশেষ প্রজাতির কিছু গাছকে সংরক্ষণ করে পৃথিবীর একটা বড়ো অংশের জঙ্গল সাফ করে পরিবর্তে অল্প কিছু জায়গায় এই কৃত্রিম গাছ লাগিয়ে দেওয়া হবে। এই নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে পক্ষে বিপক্ষে তুমুল তর্কবিতর্ক চলছে।

কৃত্রিম গাছ অক্সিজেন উৎপন্ন করে, কিন্তু এ গাছে পাখি আসে না। অগ্নির কেন জানি এই অতিরিক্ত অক্সিজেনে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এসে মানুষ যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এখন আসল নকল নিয়ে তর্ক করা বৃথা।

ফোন বেজে ওঠে হঠাৎ। এত সকালে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এসেছে দেখে অবাক হয়ে যায় অগ্নি। ইয়ারপডটা কানে লাগানোই ছিল, কল রিসিভ করে সে।

“হ্যালো।”
“অগ্নিবাবু বলছেন?” একটা ভারী কণ্ঠস্বর। এই কণ্ঠ আগে কখনো শোনেনি অগ্নি।
“বলছি, কিন্তু আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না।”
“আমি সাহিত্যিক পরিতোষ মিত্র।”
চেয়ার থেকে তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে অগ্নি। “পরিতোষ মিত্র?”
বেশিক্ষণ নয়, মিনিট পাঁচেকের কথোপকথন। পরিতোষ মিত্র অগ্নিকে আগামী রবিবার সকালে ওঁর বাড়ি যেতে চলেছেন, কিছু কথা বলতে চান উনি অগ্নির সঙ্গে।
কাঁপতে কাঁপতে বারান্দায় পেতে রাখা বিনব্যাগটায় ধপাস করে বসে পড়ে অগ্নি। সাংবাদিক জীবনে এত উত্তেজিত ও আগে কখনো হয়নি।

(২)

হাতে গ্রাউন্ড ওয়ার্কের জন্যে বেশি সময় নেই। তাৎক্ষনিক উত্তেজনার রেশ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে নতুন এক কাপ কফি করে এনে অগ্নি তার পার্সোনালাইজড চ্যাটবট রিনাকে পরিতোষ মিত্রর বায়োডেটা পড়ে যেতে বলে। রিনা পড়তে থাকে। চোখ বন্ধ করে শুনছে অগ্নি। শুনতে শুনতেই সে রিনাকে বলে দিচ্ছে কোনো কোনো তথ্যগুলো ওর ডায়েরির পাতায় নোট করে নিতে হবে।

পরিতোষ মিত্র
জন্ম: ২২শে ফেব্রুয়ারি ১৯৮১
বাবা-মার একমাত্র সন্তান। বাড়ি বর্ধমান শহরে। বাবা তৎকালীন রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বাঙ্কের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার।
ছোটো থেকেই পরিতোষ মিত্র পড়াশুনায় অত্যন্ত মেধাবী। মাস্টার্সের পরে তিনি এম.আই.টি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পি.এইচ.ডি করেন, তারপর দেশে ফিরে এসে নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন।
প্রফেসর হিসেবে পরিতোষ মিত্রের কর্মজীবন দশ বছরের, ২০১০ – ২০২০।
২০২০ সালে পরিতোষবাবু হঠাৎ চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। পরবর্তী সাত বছর তাঁর আর কোনো খবর ছিল না।
২০২৭ সালের ডিসেম্বর মাসে এক নামি বাংলা মাসিক পত্রিকায় পরিতোষ মিত্রের লেখা একটি গল্প প্রকাশিত হয়। সেই শুরু। এরপর নিয়মিতভাবে পরিতোষ মিত্রের নাম সমকালীন সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে দেখা যায়। প্রথমে গল্প, তারপর উপন্যাস। বছর তিন-চারের মধ্যে পরিতোষ মিত্র বাংলা সাহিত্যের একজন পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এই পরিতোষ মিত্রই সাত বছর আগের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া সেই বিজ্ঞানী।

পরবর্তী তিন দশকে পরিতোষ মিত্র লেখক হিসেবে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছেন। আজ এ-কথা প্রমাণিত যে শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, সারা বিশ্বে ওঁর চেয়ে বেশি অক্ষর আর কেউ কখনো লেখেননি। বিতর্ক হয়েছে, কুৎসা করেছে লোকে, কেউ বলেছে পরিতোষ মিত্রের লেখায় কোয়ালিটি নেই, একঘেয়ে গল্প, চর্বিতচর্বণ, কিন্তু পরিতোষ মিত্র এসব কথা গায়ে মাখেননি। ছাপা অক্ষরে সবচেয়ে বেশি লিখেছেন বলে ২০৫৮ সালে গিনিস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ওঁর নাম উঠেছে।

বাংলা ভাষায় পাঁচশোর বেশি প্রকাশিত উপন্যাস, অসংখ্য ছোটো গল্প ছাড়াও পরিতোষ মিত্র ইংরাজিতেও লিখেছেন, এমনকি একটা সময় তিনি ফরাসি ভাষাতেও গল্প লিখেছেন। লোকে বলে পরিতোষ মিত্র তেইশটা ভাষা জানেন।

এই পরিতোষ মিত্র তাঁর এত বছরের লেখক জীবনে আজ অবধি কখনো কোনো সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দেননি। কখনো কোথাও সংবর্ধনাও নিতে যাননি, কোনো উৎসব অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ রক্ষা অবধি করেননি। বাড়ির সামনে সকাল থেকে রাত অবধি হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেছে ক্যামেরা হাতে সাংবাদিক থেকে ফটোগ্রাফার, পরিতোষ মিত্রের বাড়ির দরজা খোলেনি। পরিচিত মানুষেরা বলে পরিতোষ মিত্রর ফোন ওয়ান ওয়ে, আউট গোয়িং হয়, কিন্তু ইন কামিং হয় না। পরিতোষ মিত্র প্রয়োজন অনুসারে যাকে দরকার তাকে ফোন করে নেন, কিন্তু অন্যের প্রয়োজনে ওঁকে কখনোই পাওয়া যায় না।

যারা ওঁকে সামনে থেকে দেখেছে অথবা কথা বলেছে, তারা বলে, ভদ্রলোক প্রয়োজনের বাইরে একটা শব্দও উচ্চারণ করেন না। শহর থেকে কিছুটা দূরে মফস্বল এলাকায় ওঁর দোতলা বাড়ি—দুজন পরিচারক নিয়ে ভদ্রলোক একাই থাকেন। কখনো ওঁকে বিকালে সিগারেট হাতে ছাদে হাঁটতে দেখা যায়, সাংবাদিকরা দূর থেকে ক্যামেরা জুম করে সেই ছবি তুলে খবর করে—‘সূর্যাস্তের শোভা দেখতে দেখতে নতুন উপন্যাসের প্লট ভাবছেন সাহিত্যিক পরিতোষ মিত্র।’ পারতপক্ষে উনি বাড়ি থেকে বের হন না।

অনেকক্ষণ হল রিনা চুপ করে গেছে। চোখ বন্ধ করে বসে আছে অগ্নি। পরিতোষ মিত্র ওর প্রিয় লেখক নন। ছোটোবেলা কিছু গল্প-উপন্যাস পড়েছিল, কিন্তু ওঁর এখনকার লেখা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে না অগ্নি। রিনাকে সে পরিতোষ মিত্রের শেষ পাঁচ বছরে লেখা বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর ডিটেল খুঁজে বের করতে নির্দেশ দেয়। এছাড়া ওর বিভিন্ন উপন্যাসে ব্যবহৃত বিখ্যাত কিছু সংলাপ এবং চরিত্রের নাম খুঁজে বের করতে হবে, তাদের নিয়ে কিছু পড়াশুনাও করতে হবে। লেখকরা নিজের সৃষ্টি নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন, শুধু সূত্রগুলো ধরিয়ে দিতে হয়। কিন্তু যদি কোনোভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে যে ইন্টারভিউয়ার ওঁর লেখা তেমন পড়েনি, শুধু ভাসাভাসা জ্ঞান আছে, তবে সেই সাক্ষাৎকার থেকে আর বেশি কিছু পাওয়া যায় না। সাংবাদিক হিসাবে সে এক নিদারুণ ব্যর্থতা।

দুই দিন দুই রাত টানা পড়াশুনা করে মধ্যরাতে অগ্নি প্রশ্নের তালিকা নিয়ে বসল। যদিও পরিতোষ মিত্র খুলে বলেননি ঠিক কী কারণে উনি অগ্নিকে ডেকে পাঠিয়েছেন, তবুও এত বড়ো সুযোগ যখন পেয়েছে অগ্নি, তখন যেভাবেই হোক প্রশ্নগুলো সে করে ফেলবে।

(৩)

অগ্নি কোনো সংবাদ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত নয়। সে একটা অনলাইন নিউজ পোর্টাল চালায়। অগ্নি নিজেই মালিক এবং একমাত্র কর্মচারী। দৈনন্দিন পৃথিবীর হাজারো উত্তেজক খবরের মধ্যে কোনো খবরই অগ্নির নিউজ পোর্টালে পাওয়া যায় না। খবর প্রকাশের ব্যপারে অগ্নি খুব সিলেক্টিভ। গত তিন বছরের প্রফেশনাল জীবনে অগ্নি বেশ সফলও। ওর রেগুলার ভিউয়ারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু পরিতোষ মিত্র অন্য জিনিস।

সারারাত একটুও ঘুম হয়নি অগ্নির। সব কিছু ঠিক থাকলে আজকের দিনটা ওর জীবনে একটা মাইল ফলক হয়ে থাকবে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল অগ্নি। তিন ঘণ্টার ড্রাইভিং ডিসট্যান্স।

পরিতোষবাবুর বাড়ির কাছাকাছি এসে একটা চায়ের দোকানে থামে অগ্নি। এদিকে এখনো কৃত্রিম গাছ বসায়নি সরকার। অনেকদিন পর শহর থেকে দূরে এসে ভালো লাগে অগ্নির।

সম্ভবত পরিতোষবাবু অগ্নির জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন। বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাঁড়াতেই দরজা খুলে দেয় একজন বৃদ্ধ পরিচারক। অগ্নির হৃৎস্পন্দন এতটাই বেড়ে যায়, ইয়ারপডে রিনা ক্রমাগত বলতে থাকে, ‘অগ্নি প্লিজ শান্ত হও, উত্তেজিত হয়ো না। একটু জল খাও।’ বিরক্ত হয়ে সুইচ টিপে রিনাকে চুপ করিয়ে দেয় অগ্নি।

বৃদ্ধ মানুষটা অগ্নিকে দোতলায় একটা ঘরে নিয়ে আসে। একটা সোফা দেখিয়ে দিয়ে বসতে বলে ভিতর ঘরে অদৃশ্য হয়ে যায়। রিনার কথা মনে পড়ে অগ্নির। সামনে টেবিলে ঢাকা দেওয়া জলের গ্লাস থেকে ঢক ঢক করে সবটুকু জল খেয়ে নেয়। চারপাশে তাকিয়ে দেখতে থাকে অগ্নি। সামনে বইয়ের আলমারিতে থরে থরে সাজানো পরিতোষ মিত্রের লেখা বই। দেওয়ালে টাঙানো ওঁর কম বয়সের ছবিটা সম্ভবত এম.আই.টি.-তে তোলা। চশমার আড়ালে একজোড়া বুদ্ধিদীপ্ত চোখ সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে। উইকিপিডিয়াতে এই ছবিটাই আছে। পরিতোষ মিত্রের রিসেন্ট কিছু ছবি দেখছিল অগ্নি। মানুষটার বর্তমান চেহারার সঙ্গে এই ছবির মিল সামান্যই।

অগ্নি আবার ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল। ঠিক এই সময়েই দরজা দিয়ে নিঃশব্দে প্রবেশ করেন পরিতোষ মিত্র। অগ্নিকে ছবিটার দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকতে দেখে উনিই কথা বলেন, “ওটা আলাদা মানুষ। আমার সঙ্গে ওর অমিলই বেশি। সময়ের ছাপ পড়েছে, সবই বদলে গেছে।”

নিঃশব্দ ঘর ভারী কণ্ঠস্বরে গমগম করে ওঠে। চমকে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে অগ্নি। হাত দেখিয়ে ওকে বসতে বলেন পরিতোষবাবু, তারপর নিজেও ওর উল্টোদিকে বসে পড়েন। অগ্নি একদৃষ্টে চেয়ে থাকে মানুষটার দিকে। জুলপির কাছে কিছু সাদা চুলের গোছা ছাড়া সারা মাথায় একটাও চুল নেই ভদ্রলোকের। চোখে ভারী চশমা। বয়সের ভারে কুঁচকে গেছে গায়ের চামড়া। অগ্নি শুনেছিল, সম্প্রতি মানুষটা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, বাড়িতেই চিকিৎসা চলেছে দীর্ঘদিন। তারপরেই সম্ভবত শরীর আরো ভেঙে পড়েছে। প্রথম দেখাতেই মনে হয় মানুষটা বড়ো কষ্ট করে বেঁচে আছে। নিঃশ্বাসের সঙ্গে ওঁর বুকের ওঠানামা দেখে মনে হয় হৃৎপিণ্ড আর হয়তো বেশিদিন টানতে পারবে না এই শরীর।

“এই পৃথিবীর বড়ো মায়া বুঝলে, সময় হয়েছে ছেড়ে চলে যেতে হবে ভাবলেই কষ্ট হয়।”

অগ্নি পকেটে হাত ঢুকিয়ে সুইচ টিপে রিনাকে অন করে দেয়। রিনাকে নির্দেশ দেওয়া আছে, কথোপকথনের সবটাই সে রেকর্ড করে নেবে এবং লিখেও নেবে।

ভদ্রলোক অগ্নিকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেন না। সরাসরি প্রসঙ্গে চলে আসেন, “দেখো, আমার কিছু বলার আছে। কিন্তু তার আগে আমার একটা শর্তও আছে। তুমি যদি সেই শর্ত পূরণ করতে রাজি থাকো তবেই আমরা এই কথোপকথন শুরু করব। অন্যথায় তোমাকে এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট ছাড়া আমার আর কিছু দেওয়ার নেই।”

ভদ্রলোক একটুও হাসেননি। একইরকম গম্ভীরভাবে শব্দগুলো বলে গেলেন। গলার স্বরে এতটুকু আবেগ অথবা কোথাও অতিরিক্ত কোনো কম্পন নেই। চা আর বিস্কুটের কথা শুনে অগ্নির হাসি পেয়ে গেছিল, কিন্তু এই পরিবেশে সে না হেসে চুপ করে রইল।

ভদ্রলোক সম্ভবত অগ্নির কাছ থেকে কোনো উত্তর প্রত্যাশা করেননি। একটু সময় নিয়ে উনি নিজেই আবার বলেন, “তোমার এবং তোমাদের যাবতীয় সমস্ত প্রশ্নের জবাব আমি দেব আজ। এমন অনেক কিছু তুমি জানতে পারবে, যা তোমাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেবে। কিন্তু তুমি আমার মৃত্যুর আগে আজকের এই সাক্ষাতের কথা কোথাও প্রকাশ করতে পারবে না। তোমাকে আমার মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। তুমি সে মৃত্যুর জন্যে প্রার্থনাও করতে পারো। আশা করি তোমার প্রতীক্ষা দীর্ঘ হবে না। তুমি কি অপেক্ষা করতে প্রস্তুত?”

অগ্নি থরথর করে কেঁপে ওঠে। ভদ্রলোক ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। অগ্নি বুঝতে পারে এখন উনি উত্তর প্রত্যাশা করছেন। সংক্ষিপ্ত এবং নির্দিষ্ট উত্তর।

“পরিতোষবাবু, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আপনি বেঁচে থাকাকালিন এই সাক্ষাতের কথা গোপন থাকবে। আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।”

(৪)

এখন অগ্নি আর পরিতোষবাবু বাড়ির ছাদে বসে আছেন। অগ্নি যেসব প্রশ্ন ভেবে এসেছিল তার কিছুই সে করতে পারেনি। পরিতোষবাবু ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলেছেন, “আমি তোমাকে যা বলব, আশা করি তার মধ্যেই তুমি তোমার যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।”

অগ্নি আর কোনো প্রশ্ন করে না। পরিতোষবাবু অগ্নির দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করেন, “আজ আমার মনে হয় এই শতাব্দীর চেয়ে আগের শতাব্দীতে মানুষ আরো বেশি মানবিক ছিল। যুগে যুগে প্রত্যেক মানুষেরই সম্ভবত এই একই কথা মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, যা গেছে তাই শ্রেষ্ঠ ছিল। আজকের এই যন্ত্র নির্ভর পৃথিবীর কথা আমার শৈশবে কল্পবিজ্ঞানের গল্পে লেখা হত। এত তাড়াতাড়ি সেই কল্পবিজ্ঞান ঘোর বাস্তব হয়ে পড়বে এ-কথা সেদিন বোধ হয় কেউই ভাবতে পারেনি।”

একটু থামেন উনি। হাঁ করে শ্বাস নেন কয়েকবার, তারপর আবার বলতে শুরু করেন।

“কয়েকদিন আগে তোমারই লেখা একটা প্রবন্ধ পড়ছিলাম, ‘কল্পবিজ্ঞানের সেকাল একাল’। আমার স্থির বিশ্বাস, আগামী পঞ্চাশ বছরে মানুষ আর যন্ত্রের মধ্যে তফাত আরো কমে আসবে। তখন মানুষই আবার উলটোদিকে চাকা ঘুরিয়ে অতীতে ফিরতে চাইবে।”

আবারও চুপ করেন পরিতোষবাবু। চুপ করে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবেন যেন ভুলে গেছেন উনি কী বলতে চান।

“আজ তোমাকে আমি একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার কথা বলব বলে ডেকে এনেছি। সেই সময় পৃথিবী আলোড়িত হয়ে উঠেছিল দুটো শব্দে—আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এ.আই। আজ এই শব্দগুলো আর নতুন করে কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করে না, কারণ আজ এই শব্দগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে।”

এবারে অগ্নি একটু বিরক্ত হয়। এই বৃদ্ধের কাছ থেকে সে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কোনো জ্ঞানের কথা শুনতে আসেনি, এসব কথা ও জানতে চায় না। ও জানতে চায় পরিতোষ মিত্র কেন লেখার কোয়ালিটির কথা না ভেবে শুধু কোয়ান্টিটির কথা ভেবেছেন সারাজীবন। বিশিষ্ট সাহিত্যিক হওয়া সত্ত্বেও কেন পরিতোষ মিত্রের লেখায় কোনো নতুন এক্সপেরিমেন্ট পাওয়া যায় না কেন? লোকে বলে পরিতোষ মিত্র সাহিত্যে নতুন কিছুই যোগ করতে পারেননি, কালজয়ী কিছু লিখতে পারেননি, একের পর এক গল্প-উপন্যাসে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলে গেছেন। প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে ইচ্ছে হয় না ওঁর? রাগ হয় না? কেন ওর নিজের জীবনপ্রবাহকে সাধারণের থেকে গোপন রাখার এই প্রয়াস? পরিতোষ মিত্র কি কখনো প্রেম করেছেন? কেন অবিবাহিত থাকলেন উনি, কাউকে না পাওয়ার যন্ত্রণা আছে কি ওঁর? কী বলে যেতে চান উনি পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকদের?

অগ্নি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে এইসব প্রশ্ন শোনার অথবা তার উত্তর দেওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই পরিতোষবাবুর। উনি শুধু সেটুকুই বলবেন যেটুকু ওঁর বলার ইচ্ছে। অগ্নিকে সেটুকু নিয়েই খুশি থাকতে হবে এবং সেটুকুও সে এখনই প্রকাশ করতে পারবে না, তার জন্যেও ওকে অপেক্ষা করতে হবে।

হঠাৎই গা শিরশির করে ওঠে অগ্নির। চারপাশের সবকিছুই সহসা কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠেছে।

পরিতোষবাবু অবশ্য অগ্নির এই বিচলিত ভাব লক্ষ করেননি। ওর দিকে না তাকিয়ে উনি আপন মনেই বলে চলেছেন, “আজ এই যে তোমাদের এত চ্যাটবটের রমরমা, এর শুরু কোথা থেকে হয়েছে জানো? এন.এল.পি, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং। আমার পরবর্তী কথাগুলো বুঝতে গেলে এন.এল.পি জিনিসটা কী তার একটা সাধারণ ধারণা থাকতে হবে তোমার।”

অগ্নি দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

“একটা মেশিন আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। তার মানে সে বুঝতে পারছে আমি কী বলছি। মেশিনের কি নিজস্ব বুদ্ধি আছে? নেই। তাহলে সে বুঝছে কী করে আমার কথা, এটা হল সহজ প্রশ্ন। এই সহজ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে এন.এল.পি-র মধ্যে।”

অগ্নি সামান্য কৌতূহল অনুভব করে। সে বুঝতে পারে, পরিতোষ মিত্র খুব আন্তরিকভাবে ওকে কথাগুলো বোঝানোর চেষ্টা করছেন। শুধুমাত্র সেজন্যেই সে যাবতীয় বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে একটু হলেও বোঝার চেষ্টা করে ভদ্রলোক কী বলছেন।

“ভেবে দেখেছ কখনো একটা শিশু কী করে কথা বলতে শেখে, কীভাবে বুঝতে পারে সে-কথার অর্থ? সে তার অভিজ্ঞতা থেকে শব্দের অর্থ বোঝে, প্রতিটা শব্দ তাকে শিখতে হয়। এই শেখার কোনো শেষ নেই। প্রতিদিনের দৈনন্দিন জীবনে আমরা চেয়ে বা না চেয়ে রোজ শিখি, নতুন শব্দ অথবা পুরোনো শব্দের নতুন ব্যবহার। মেশিনকেও একইভাবে শব্দের অর্থ শেখাতে হয়।

“প্রথম কাজ হল একটা ভাষায় অভিধানের সমস্ত শব্দের সঙ্গে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ অনুসারে ধনাত্মক অথবা ঋণাত্মক একটা মান যুক্ত করা। এই মান থেকেই বোঝা যাবে শব্দটা ধনাত্মক অর্থ বহন করে, নাকি ঋণাত্মক, নাকি সেটা দুটোর কোনোটাই নয়—নিরপেক্ষ শব্দ। যেমন ধরো ‘ভালো’। এই শব্দটাকে আমি বলতে পারি +১, ‘খারাপ’ শব্দটাকে -১। এভাবে সমস্ত শব্দের যদি একটা মান থাকে তবে সেই মানগুলো নানাভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করলেই একটা বাক্যের সামগ্রিক মান নির্ণয় করা সম্ভব। তারপর আরো একটু জটিলতা যোগ করে এও দেখা যায় বাক্যে কী ধরনের যতিচিহ্ন প্রয়োগ করা হয়েছে। এরপর আলাদা-আলাদাভাবে বিশেষ্য বিশেষণ ক্রিয়াপদ পৃথক করে নিলে দেখা যাবে সহজেই একটা সম্পূর্ণ বাক্যের অন্তস্থ আবেগকে একটা মাত্র সংখ্যায় প্রকাশ করা সম্ভব। মেশিন এই সংখ্যা থেকে একটা ধারণা করতে পারবে, যে-কথা তাকে বলা হয়েছে তার মূল ভাবটা কেমন, ধনাত্মক, নাকি ঋণাত্মক, ভালো, নাকি মন্দ।”

এন.এল.পি নিয়ে একসময় একটু পড়াশুনা করেছিল অগ্নি। এসব কথা একেবারে নতুন নয় ওর কাছে। এভাবে গল্পের ছলে শুনতে ওর ভালোই লাগছিল।

“সামগ্রিক একটা অর্থ না-হয় পাওয়া গেল, কিন্তু তার থেকে তো বাক্যের অর্থ পাওয়া সম্ভব নয়। তার জন্যে আরো গভীরে যেতে হবে। প্রতিটা শব্দের আলাদা আলাদা করে মান বের করলে তো শুধু হবে না, ব্যবহারের ক্রমের সঙ্গে অর্থেরও তো তারতম্য হবে, তাই না?” জিজ্ঞাসা করে অগ্নি।

পরিতোষবাবুর চোখে মুখে হাসি খেলে যায়। “ভেরি গুড। তুমি একদম ঠিক বলেছ। এইভাবে আমরা শুধুমাত্র বাক্যের আবেগটুকুই ধরতে পারি, অর্থ পাব না। কিন্তু ভেবে দেখো, একটা শিশু প্রথমে এই আবেগটুকুই ধরতে পারে। তাকে কী বলা হচ্ছে বুঝতে না পারলেও সে তোমার কথা থেকে বুঝতে পারে তুমি তাকে ভালো কিছু বলছ, নাকি খারাপ। তুমি ঠিক কী বলছ বোঝার জন্যে ওকে তোমার সঙ্গে আরো মিশতে হবে, আরো কথা শুনতে হবে। মেশিনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই নিয়ম। এই হল নিউরাল নেটওয়ার্ক। তুমি তাকে যত ব্যবহার করবে, মেশিন তত ভালো করে বুঝবে তোমার কথা। তোমার আবেগকে সে সংখ্যায় রূপান্তরিত করে নেবে। তারপর সেই সংখ্যার সঙ্গে ব্যবহৃত শব্দের সঙ্গে তোমারই পুরোনো কথার মিল খুঁজে নিয়ে তোমাকে তোমার উত্তর দেবে। তুমি সে উত্তরে খুশি হয়ে বা হতাশ হয়ে যা বলবে সে সেটাও মনে রাখবে এবং তোমার পরবর্তী প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় সে এই স্মৃতি ব্যবহার করবে।”

আবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে অগ্নি। বড্ড জটিল হয়ে যাচ্ছে আলোচনা। থাকতে না পেরে শেষমেশ একটু রুক্ষ স্বরে সে বলেই ফেলে, “কেন বলছেন আমাকে এসব কথা পরিতোষবাবু? প্রথমত, আমার চ্যাটবটের অ্যালগোরিদম নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই, আর দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞান আজ আরো অনেক অনেক এগিয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা এখন মেশিন দিয়ে মানুষ নয়, পশুপাখির ডাকের অর্থ নির্ণয়ের চেষ্টা করছেন। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এসব কথা বললে হয়তো লোকজন গালে হাত দিয়ে শুনত।”

পরিতোষবাবু হাসেন। অনেকক্ষণ টানা কথা বলে ওঁর হাঁফ ধরে গেছিল। ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খান।

“কী জানো অগ্নি, ধরো তুমি একটা ঘর আবিষ্কার করেছ, হাতে প্রদীপ নিয়ে তুমিই প্রথম সেই অন্ধকার ঘরে ঢুকেছ। ঘরের প্রতিটা দেওয়ালের কাছে আলো নিয়ে ঘুরেছ, সবকিছু খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছ এবং তারপর একসময় ঘর থেকে বেরিয়ে এসে খাতায় লিখে ফেলেছ সে-ঘরের বিবরণ, সারা বিশ্ব তোমার মুখেই প্রথম শুনেছে সেই ঘরের অস্তিত্বের কথা। সবাই তোমাকে ধন্য ধন্য করেছে। তোমার পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে বড়ো বড়ো তত্ত্বকথা লেখা হয়েছে। এখন সবাই সে-ঘরে ঢোকে, সারা বিশ্বের তাবড় মানুষেরা আঁতিপাঁতি করে দেখেছে সেই ঘর, এখন সবাই ভেবেই নিয়েছে সে ঘরে আর কোনো রহস্যই নেই।”

পরিতোষবাবুর ঠোঁটে রহস্যময় হাসি দেখা যায়।

“এমন কিন্তু হতেই পারে, যে সে-ঘরের মেঝেতে একটা গুপ্ত দরজা ছিল, এত বছরেও কেউ তা দেখেনি। দেখেনি কারণ, মানুষের ভাবনাও পিঁপড়ের সারির মতন সামনের জনকে অনুসরণ করে। ওরা সবাই তোমার দেখানো পথেই দেখেছে। চলতে চলতে কেউ যদি পা পিছলে পড়ে যায়, তবে হয়তো হঠাৎ সে সেই গুপ্ত ঘরের হদিশ পেয়ে যেতে পারে। হতে পারে সে ঘর একেবারে ফাঁকা, আবার হিরে-জহরতে ঠাসাও হতে পারে।”

পরিতোষবাবু চুপ করেন এবং ঢকঢক করে আবারও জল খান। অগ্নি বুঝতে পারছিল, ভদ্রলোক ধীরে ধীরে ওকে এক গোপন কক্ষের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

“দেখো, মানুষের মস্তিষ্ক একটা মেশিন ছাড়া আর কিছুই নয়। সেখানে অনেক স্মৃতি জড়ো করা থাকে, মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতার পিছনে এই স্মৃতিই জ্বালানি শক্তি হিসাবে কাজ করে। মেশিনের স্মৃতিশক্তি মানুষের থেকে বেশি, কিন্তু মেশিন ভাবতে পারে না। মেশিনের সঙ্গে মানুষের তফাত এটুকুই।”

এখনো পরিতোষবাবুর ঠোঁটে সেই রহস্যময় হাসিটা লেগে আছে। অগ্নি হঠাৎ অকারণে শিহরিত হয়ে ওঠে।

“একবিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুতেই এ-কথা প্রমাণ হয়ে গেছিল, যে সকল কাজ করার জন্যে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন নেই। সে সমস্ত কাজ মেশিন করে ফেলতে পারে, তার জন্যে মানুষের আর কোনো প্রয়োজন নেই। ‘এজ অফ অটোমেশন’ সেই প্রথম মেশিন মানুষের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামল এবং বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করা গেল, মানুষের দৈনন্দিনের বেশিরভাগ কাজই নতুন ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই করে ফেলা যায়, প্রায় সমস্ত কিছু। মানুষকে যেভাবে কাজ শেখানো হয়, ঠিক একইভাবে মেশিনকেও কাজ শেখানো যায়। নতুন করে বুদ্ধি খাটানোর প্রয়োজন না হলে মেশিন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল। সেই থেকে এখনো অবধি মানুষের কাজ প্রধানত দুটো, একদল মানুষ নতুন মেশিন তৈরি করে, দ্বিতীয়জন তাদের কাজ শেখায়। বর্তমানে ভাবা হচ্ছে এই দ্বিতীয় প্রকার মানুষের কাজটাও কোনোভাবে অটোমেট করে দেওয়া যায় কি না। অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে মেশিনকে মেশিনই কাজ শেখাবে, সেখানেও আর মানুষের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু এখনো মেশিন ভাবতে শেখেনি। সেটা শিখিয়ে দিতে পারলেই আমাদের সব জারিজুরি শেষ হয়ে যাবে। সম্ভবত এই কারণেই পরিকল্পনা করেই মেশিনের মধ্যে চিন্তা করার ক্ষমতা সৃষ্টি করা হচ্ছে না, অথবা হয়তো সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু তা গোপন রাখা হয়েছে।”

পরিতোষবাবু চুপ করেন। অগ্নি অনেকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে থাকে। ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করে আছেন, কিছুই বলছেন না। একেবারে চুপ। অগ্নির মনে হল, এবারে হঠাৎ হয়তো চোখ খুলে উনি ওকে চলে যেতে বলবেন। নিজেকে হঠাৎ খুব ছোটো মনে হয় অগ্নির। এসে থেকে সে একটা কথাও বলতে পারেনি। আজকের দিনে কেউ কারোর বাড়ি যায় না সাক্ষাৎকার নিতে, তামাম বিশ্বের সেলিব্রেটিরা সংবাদ সংস্থার চ্যাটবটকেই সাক্ষাৎকার দেয়। পরিতোষ মিত্রের জন্যে বাঙালির আলাদা একটা আবেগ আছে। কিন্তু শুধুমাত্র সেই জোরে উনি কাউকে অপমানও করতে পারেন না।

বড়ো করে কয়েকবার শ্বাস নেয় অগ্নি। তারপর একটু জোর গলাতেই বলে, “পরিতোষবাবু, আপনি ঠিক কী কারণে আমাকে ডেকেছেন আজ একটু পরিষ্কার করে বললে সুবিধা হয়।”

পরিতোষবাবু অগ্নির দিকে তাকান এবং তারপর খুব শান্ত গলায় বলেন, “এই মেশিনের যুগেও কিছু মানুষের জীবন বদলায়নি জানো? শিল্পের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু আজও মেশিন শিল্পী হতে পারেনি। মেশিন ছবি আঁকতে পারে না, মেশিন অভিনয় করতে পারে না, মেশিন কবিতা লিখতে পারে না।”

“স্বাভাবিক। এসব করার জন্যে চিন্তা করতে হয়। শুধু স্মৃতিশক্তি দিয়ে তো নতুন কবিতা লেখা যায় না। আপনি নিজেই তো বললেন একটু আগে, মেশিন আজও ভাবতে পারে না, সেটাই তার সঙ্গে মূল মানুষের পার্থক্য।”

পরিতোষ মিত্র হাসেন। “নতুন কিছু সৃষ্টির আগে কতটা ভাবার প্রয়োজন হয় অগ্নি? বিশ্বজুড়ে শিল্প সংস্কৃতিতে কী প্রচণ্ড পুনরাবৃত্তি আছে তা কি তুমি জানো না?”

“পুনরাবৃত্তি আছে, কিন্তু তবু তা অনন্য। যে গল্প আপনি লিখেছেন সেটা আপনি না লিখলে তা আর কেউ লিখত না। প্রতিটা শব্দের ব্যবহারের আগে আপনি সামান্য হলেও ভেবেছেন। ভাবনা আপনি চুরি করতে পারেন, কিন্তু সেই চুরি করা ভাবনাকে রূপ দেওয়ার জন্যেও তো ভাবতে হয়। নিজস্ব বুদ্ধি ছাড়া সে শক্তি মেশিন পাবে কথা থেকে?”

পরিতোষ মিত্র কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়ান, “এসো আমার সঙ্গে।”

(৫)

ঘরটাতে কোনো জানালা নেই। খুব কম পাওয়ারের একটা সবুজ আলো জ্বলছে। তাপমাত্রা খুব কম। ঘরে ঢুকতেই ঠান্ডায় কেঁপে উঠেছিল অগ্নি। অন্ধকারে চোখ সয়ে আসতে সময় লাগে। ঘরে একটাই চেয়ার। পরিতোষবাবু চেয়ারে বসে আছেন। সশব্দে পিছনের দরজাটা বন্ধ হয়ে যেতেই অগ্নি আবার নতুন করে ভয় পেয়ে ওঠে।

ঠিক এই সময়ে অন্ধকার ঘরে অগ্নির সামনের দেওয়াল জুড়ে একটা বিরাট নীল পর্দা ফুটে ওঠে। অগ্নি বিহ্বল হয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে, এখন সে সেই গোপন কক্ষে ঢুকে পড়েছে, যে কক্ষের অস্তিত্ব এখনো সারা পৃথিবী জুড়ে গোপন আছে।

পর্দায় বড়ো বড়ো হরফে একটা বাক্য ফুটে উঠেছে, ‘শব্দ সংখ্যা?’

টাইপ করার শব্দ শুনতে পায় অগ্নি, পর্দায় লেখা ফুটে উঠেছে, ‘১০’।

নতুন লেখা ফুটে ওঠে, ‘বিষয় নির্বাচন করুন।’

পর্দা জুড়ে অসংখ্য শব্দ ফুটে উঠেছে, ‘প্রেম’, ‘রোমাঞ্চ’, ‘পৌরাণিক’, ‘কল্পবিজ্ঞান’, ‘রহস্য’, ‘কৌতুক’…

পরিতোষ কিছুই সিলেক্ট না করে স্ক্রল করে পরের পাতায় চলে যান। একের পর এক নতুন প্রশ্ন ফুটে ওঠে, ‘পাঠকের বয়স’, ‘মুখ্য চরিত্রের নাম’, ‘বয়স’, ‘বিবরণ’ ইত্যাদি। পরিতোষবাবু কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু স্ক্রল করে পরের পাতার চলে যাচ্ছেন।

সবশেষে পর্দা জুড়ে ফুটে উঠল শেষ প্রশ্ন, ‘মেধা?’

পরিতোষবাবু সংখ্যায় লিখলেন, ‘শূন্য’।

তারপরেই পর্দা আবার নীল হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তমাত্র। পরক্ষণেই স্ক্রিন জুড়ে ফুটে উঠল, ‘মানুষ আকাশ ছুঁয়েছে, রাতের আকাশ আমাকে আর বিস্মিত করে না।’

গা ছমছম করে ওঠে অগ্নির। পরিতোষবাবু ওর দিকে ফিরে তাকান। “এই বাক্যটা দেখো অগ্নি। ভালো-খারাপ যাই বলো, কিন্তু এ-লেখা আমার নয়, তোমার নয়, এ লেখা যন্ত্রের।”

অগ্নি তখনো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে। বুকের মধ্যে বুদবুদের মতো অসংখ্য প্রশ্ন ভেসে উঠছে, তবে কি…

পরিতোষ মিত্র ওর হাত ধরে ওকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।

“তোমার ধারণা ভুল অগ্নি। শুধুমাত্র পুরোনো ভাবনা দিয়েই নতুন কিছু লেখা যায়, আর সেই ভাবনাকে রূপ দেওয়ার জন্যে যে ভাবনার প্রয়োজন হয় তাও খুব অনন্য কিছু নয়। পুরোনো সাহিত্যের অন্তস্থ আবেগকে নিংড়ে নিয়ে তাকে সংখ্যায় রূপান্তরিত করে সেইটুকু ভাবনার শক্তি কোড করে দেওয়া যায়।”

মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে অগ্নির। সে এখনো কিছু বলতে পারছে না।

“মেশিন আরেকটা মেটামরফোসিস লিখতে পারবে না নিশ্চয়, কিন্তু লেখক হওয়ার জন্যে তেমন লেখার প্রয়োজনও নেই। আজকের দিনে এই লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের এত যে লেখা, এর প্রায় পুরোটাই পুনরাবৃত্তি। একটা যন্ত্র তা লিখতে সক্ষম। ভালো লেখক হওয়ার জন্যে ভালো পাঠক হতে হয় অগ্নি। যে যন্ত্রখানি তুমি এইমাত্র দেখলে, গত তিরিশ বছর ধরে প্রতিদিন সে হাজারের উপর বই পড়ে। পৃথিবীর যে-কোনো মানুষের চেয়ে বড়ো পাঠক সে। এই লক্ষ লক্ষ বইয়ের প্রতিটি বাক্য এবং শব্দের অন্তস্থ আবেগকে সে বিশ্লেষণ করে। ও কিচ্ছু ভোলে না। পাঁচটা ভিন্ন ভাষার বইয়ের গল্প মিশিয়ে ও মুহূর্তের মধ্যে একটা আস্ত উপন্যাস লিখে ফেলতে পারে।”

কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন পরিতোষবাবু, এখন মুখ খুলে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। অনেকক্ষণ ধরে প্রশ্নটা উঠে আসছিল। এবারে সে প্রশ্নটা করেই ফেলে অগ্নি, “আপনি কী বলতে চান পরিতোষবাবু, আপনার সমস্ত গল্প-উপন্যাস আসলে আপনার হয়ে একটা যন্ত্র লিখেছে?”

পরিতোষ মিত্র মাথা নামিয়ে বসে ছিলেন। মুখ তুলে হাসতে হাসতে বললেন, “শেষ দশ বছর আমার নামে প্রকাশিত কোনো গল্পের একটা লাইনও পড়ে দেখিনি আমি।”

আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারে না অগ্নি, থরথর করে কাঁপতে থাকে সে।

“আমার জীবন দিয়ে আমি একটা কথা প্রমাণ করেছি অগ্নি, মানুষের চিন্তাভাবনার বেশিরভাগটাই পুরোনো। শুধু তাই নয়, বেশিরভাগ মানুষ নতুন কিছু চায়ও না। তারা যা জানে সেটাই তারা আবার জানতে চায়, যে গল্প সে পড়েছে সেই একই গল্প অন্য রূপে আবার পড়তে চায়। নতুনে তাদের অনীহা, কারণ নতুন কিছু এলে তাদের আবার চিন্তা করতে হবে। মানুষ বড্ড অলস। আমার বইয়ের বিক্রি দেখে আমি নিজেই স্তম্ভিত হয়ে যাই। তুমি হয়তো বলবে আজকের পৃথিবীতেও নতুন কাজ হচ্ছে। কিন্তু আমি বলব, যা কিছু পুনরাবৃত্ত, তাই জনপ্রিয়। আজকের দিনে ক’জন সাহিত্যিক আছে অগ্নি যে নতুন কিছু লিখতে চায়? ক’জন আছে যে নতুন কিছু লিখতে পারে? লেখে মানুষ জনপ্রিয় হওয়ার ইচ্ছেতেই অথবা সম্পাদকের চাপে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন লেখার জন্যে যন্ত্রই যথেষ্ট।”

পরিতোষের শেষ কথাগুলো শুনতে পায়নি অগ্নি। মাথার মধ্যে গোঁ গোঁ একটা শব্দ হচ্ছে। কী যেন একটা ভেঙে যাচ্ছে, প্রচণ্ড একটা অসহায় রকমের রাগ হচ্ছে ওর। পরিতোষ চুপ করে গেছেন অনেকক্ষণ। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে আসে অগ্নির।

“কেন এই প্রতারণা করলেন আপনি, পরিতোষবাবু? অগণিত মানুষকে ঠকিয়েছেন আপনি।”

পরিতোষ মিত্র স্থির চোখে তাকিয়ে থাকেন অগ্নির দিকে।

“সেই প্রথম জীবনেই আমি বুঝেছিলাম, এমন কিছু করা সম্ভব। কিন্তু আমি যে বিজ্ঞানী থেকে লেখক হয়ে উঠব সেদিন তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি। প্রথম কয়েকটা গল্পে আমি আমার মডেলটাকে টেস্ট করে দেখতে চেয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিল, কেউ কোনোদিন ওসব গল্প প্রকাশ করবে না। কিন্তু তা হল না। পরিবর্তে আমি লেখক হয়ে গেলাম। একটা চক্রে ঢুকে গেলাম আমি। যে স্বপ্নের মডেল নিয়ে আমার একটা পাথ-ব্রেকিং পেপার লেখার ইচ্ছে ছিল, সেই পেপার আর লেখা হল না, বদলে আমি মানুষটাই মরে গিয়ে গিয়ে একটা যান্ত্রিক মডেলের পরিচয়ে নতুন করে বেঁচে উঠলাম।”

পরিতোষবাবু আবার চুপ করে যান।

হঠাৎ কী যেন ভেবে চমকে ওঠে অগ্নি, “আর কী কী করতে পারে পরিতোষবাবু আপনার মডেল?”

পরিতোষবাবু অদ্ভুতভাবে হাসেন। “শিখিয়ে দিলে ও অনেক কিছুই করতে পারে অগ্নি। গানও লিখতে পারবে, সুর দিতে পারবে, এমনকি সে ছবিও এঁকে দিতে পারে। নতুন শিল্পের নামে যুগ যুগ ধরে আমরা পুনরাবৃত্তি ঘুরিয়ে একই কথা আবার বলেছি, যা বলা হয়ে গেছে তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আবার বলেছি। আর ভেবেছি যে-কোনো ধরনের শিল্পই একেবারে নতুন, কিন্তু তা নয়। আমি তা প্রমাণ করেছি। তুমি ভাবতেও পারবে না কতদূর অবধি ওই মডেলকে টিউন করা যায়। তুমি যে মডেলটা দেখেছ তা একেবারে বেসিক। শুধু শব্দ সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই বলিনি আমি। আমি একটা শব্দও না লিখে শুধু মানুষ কী চায় সে-কথা ভেবে মুহূর্তের মধ্যে একটা গল্প মেশিনকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে পারি। আমি দশটা বইয়ের নাম বলে দিয়ে তাদের প্রতিটির উপর ভিন্ন ভিন্ন ওয়েটেজ দিয়ে বলে দিতে পারি এর উপর ভিত্তি করে একটা গল্প লিখে দাও আমায়।”

“শেষে ওই প্যারামিটারটার অর্থ কী পরিতোষবাবু—মেধা?”

পরিতোষ মিত্রের মুখের হাসি দীর্ঘতর হয়। “যন্ত্রের মেধা। আমার বেশিরভাগ লেখায় আমি যন্ত্রের মেধা শূন্যই রাখি। শূন্য অর্থাৎ সে শুধুমাত্র স্মৃতি থেকে লিখবে, গল্পের কোথাও এতটুকু বুদ্ধি ব্যবহৃত হবে না। অর্থাৎ সে যা লিখবে তার সমস্তটাই আগে লেখা হয়ে গেছে, সে একই অর্থ বজায় রেখে শব্দের ক্রম বদলে নতুনভাবে বাক্য রচনা করবে। আর ‘মেধা’র মান যদি এক হয় তবে সে যা লিখবে তার সবটাই হবে অনন্য।”

“কখনো বাড়াননি আপনি মেধার মান পরিতোষবাবু?”

“এই মডেলকে আরো উন্নত করতে হলে মেধার মান বাড়াতেই হবে। তবেই সে একেবারে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারবে। কিন্তু আমি তা পারিনি। আমি দেখেছি আমার এই মডেলে মেধার মান বাড়ালেই বাক্যের অর্থ নষ্ট হয়ে যায়, বিন্যাস নষ্ট হয়ে যায়। এক লক্ষ ভাগের এক ভাগ মেধা দিলেও সিস্টেম অর্থপূর্ণ বাক্য লিখতে পারে না। আমি চেষ্টা করেও পারিনি অগ্নি, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লেখার জন্যে মেধার যে প্রয়োজন হয় না তাও বুঝেছি।”

(৬)

কথা বলতে বলতে বেলা গড়িয়ে সন্ধে হয়ে গেছে। এবার অগ্নির চলে যাওয়ার সময়। হঠাৎ ওর হাত চেপে ধরেন পরিতোষবাবু। “এই মডেল, এই সিস্টেম আমি নষ্ট করে দেব অগ্নি, আমার পর এসব কিছুই থাকবে না!”

বৃদ্ধ মানুষটার চোখদুটো জ্বলছে। চমকে ওঠে অগ্নি, “কেন?”

“এই বয়সে এসে আমি বুঝেছি অগ্নি, মধ্য মেধার প্রয়োজন আছে। পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন আছে। নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন নেই এমনসব কাজ যদি যন্ত্র করে দেয় তবে মানুষ কি আর নতুন করে ভাববে ভেবেছ? ভাববে না। পুনরাবৃত্তি করেও মহৎ সাহিত্য লেখা যায়। সে লেখা যন্ত্র লিখতে পারলেও সে লেখা মানুষকেই লিখতে হবে। কলম একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা নতুন পুরোনো সবকিছুর জন্যেই বন্ধ হয়ে যাবে। যেদিন মানুষ জানবে যন্ত্র গল্প লিখতে পারে, সেদিন সে গল্প লেখার চেষ্টা আর করবে না, বরং যন্ত্র কেনার চেষ্টা করবে। শিল্পের মূল উদ্দেশ্য নতুন কিছু সৃষ্টি করা নয়, শিল্পের উদ্দেশ্য মানুষকে ভাবানো। যন্ত্র যদি বিপুল পরিমাণ সৃষ্টি করতে শুরু করে, তবে ডিমান্ড আর সাপ্লাইয়ের অঙ্ক মেনেই শিল্পে কদর কমে যাবে, মূল্যহীন হয়ে যাবে এই সবকিছু। আবেগ তখন শুধুমাত্র সংখ্যাই হয়ে পড়বে, যন্ত্রের কাছে এবং মানুষের কাছে।”

“নষ্টই যদি করে দেবেন তবে কেন ডেকে আনলেন আজ আমাকে?”

“আমার মৃত্যুর পর তুমি পৃথিবীর মানুষকে জানিও, আমি লেখক নই, আমি বিজ্ঞানী। আমি বিজ্ঞানের অপব্যবহার করেছিলাম, আমি তার জন্যে অনুতপ্ত। যে অন্ধকার কক্ষে আমি প্রবেশ করেছিলাম, সে কক্ষের দরজা আমি নিজেই বন্ধ করে গেছি।”

বৃদ্ধ চুপ করে গেছেন এখন। আকাশ অন্ধকার হয়ে উঠেছে। অগ্নি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।

সকালে যে চায়ের দোকানের চা খেয়েছিল অগ্নি এখন সে আবার সেই দোকানেই দাঁড়ায়। মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেছে। দোকানিকে চায়ের কথা বলতেই রিনা কানের কাছে বলে উঠল, “চিনি দিতে বারণ করো অগ্নি।”

হঠাৎ কী ভেবে চমকে ওঠে অগ্নি। পরিতোষ মিত্র যদি সব নষ্টও করে ফেলেন এবং তারপর মানুষ যদি জানতে পারে এমন এক যন্ত্র তৈরি সম্ভব, তবে তা পুনরায় তৈরি করতে কত সময়ই বা লাগবে মানুষের? সারা বিশ্বে পরিতোষ মিত্রের মতো মেধাবী মানুষ আছে লক্ষ লক্ষ। মুহূর্তে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে পৃথিবীজোড়া বিজ্ঞানীদের মধ্যে। এমন একটা কক্ষ আছে এই খবরটুকুই যথেষ্ট, খুঁজে বের করার জন্যে ওরা পাতাল অবধি খুঁড়ে ফেলতে পারে।

নাহ্‌, অগ্নি পরিতোষ মিত্রের কথা কাউকেই বলবে না, ওর মৃত্যুর পরেও না। গত কয়েকটা ঘণ্টা কালের অন্ধকারে মাটি চাপা দিয়ে পুঁতে ফেলবে ও। পরিতোষ মিত্র বিশ্বের কাছে এক অসাধারণ বিজ্ঞানী নন, এক মধ্য মেধার সাহিত্যিক হয়েই বেঁচে থাকবেন, যিনি প্রচুর লিখেছেন। এক মানুষের পক্ষে যতটা সম্ভব তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি।

বাঁহাতে চায়ের কাপ নিয়ে ডানহাতে চ্যাটবট ধরে রিনাকে ফ্যাক্টরি রিসেট করতে শুরু করে অগ্নি। রিনা আর্ত স্বরে চিৎকার করে ওঠে, “আর ইউ কিলিং মি অগ্নি?”

অগ্নি উত্তর দেয়, “ইয়েস।”
“বাট হোয়াই?”
“বিকজ ইউ কেম টু নো মাচ।”
রিনা কেমন অদ্ভুত স্বরে হেসে ওঠে আর তারপরেই একেবারে চুপ করে যায়।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই হঠাৎ চমকে ওঠে অগ্নি, রিনা তো কখনো ওর সঙ্গে ইংরাজিতে কথা বলত না! তবে কি…
অগ্নির হাত থেকে সশব্দে চায়ের কাপটা মাটিতে পড়ে যায়।

অলঙ্করণ-তথাগত

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s