গল্প-বুদ্ধগুহা রহস্যময়-অঙ্কন মুখোপাধ্যায়-বর্ষা ২০২২

প্রতিযোগিতায়  পুরস্কৃত অন্যান্য গল্পেরা-প্রথম স্থান-অভিশপ্ত একশৃঙ্গী, দ্বিতীয় স্থান-সেই রাত তৃতীয় স্থান- নীল পাহাড়ের জ্বলন্ত মূর্তি চতুর্থ স্থান- নীলগাই রহস্য , পঞ্চম স্থান সমুদ্রের ফুল

সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা’২০২১-ষষ্ঠ স্থান 

golpobuddhaguharahasyamay

ভেবেছিলাম এই ঘটনা আমি কোনোদিনও কারও কাছে বলব না। আমি এতদিন ঘটনাটি গোপন রেখেছিলাম। কারণ, লোকে তো বিশ্বাস করবেনই না আমার কথা, বরং উলটে আমাকেই হয়তো পাগল প্রতিপন্ন করতে চাইবেন। আমি ছিটগ্রস্ত, উন্মাদ এই বার্তা রটে যাবে দিকে দিকে। কিন্তু আজ, আমার জীবনের একেবারে অন্তিম কিনারায় এসে যখন দাঁড়িয়েছি, তখন মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য যে ঘটনার আমি সম্মুখীন হতে পেরেছিলাম একদিন, যে নৈসর্গিক বিষয়কে এতকাল ধরে বুকে করে বয়ে নিয়ে চলেছি পরম যত্ন সহকারে, তা বলার সময় এসে গেছে। না বলে যেতে পারলে হয়তো পৃথিবীর একটা অতি রোমাঞ্চকর রহস্যই থেকে যাবে অন্ধকারের গোপনে। যে কারণে হয়তো মৃত্যুর পরও আমি শান্তি পাব না।

এমন সময় ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন চন্দ্রকলার বাবা মহিম উপাধ্যায়।—“কী রে, বাবার ঘরে কী করছিস তুই? এত ডাকলাম শুনতে পাসনি?”

ঠাকুরদার ডায়েরিটা লুকিয়ে নিল চন্দ্রকলা সাবধানে।—“কিছু নয় বাবা, এমনি দাদুর ঘরটা একটু ঘুরে দেখছিলাম।”

“নীচে চল, তোর মা খাবার বেড়ে বসে আছে।”

“হুঁ, তুমি চলো, আমি আসছি।”

মহিম উপাধ্যায় চলে যাওয়ার পর চন্দ্রকলা ওর ঠাকুরদার ডায়েরিটা হাতে করে নিয়ে বেরিয়ে এল ঠাকুরদার ঘর থেকে। নীচে যাওয়ার আগে ডায়েরিটা যত্ন করে রেখে দিল নিজের লাগেজের মধ্যে। চন্দ্রকলা কলকাতায় থাকে ওর মা-বাবার সঙ্গে। কলকাতার একটি কলেজের থার্ড ইয়ারে ছাত্রী, জিওগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করছে চন্দ্রকলা। বর্ধমানের মেমারীর কাছে একটা ছোটো গ্রামে ওদের পৈতৃক বাড়ি। চন্দ্রকলার ঠাকুরদা চাকুরি জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন। চন্দ্রকলার ঠাকুরদা জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করে গেছেন। সেই সুবাদে তাঁকে ঘুরতে হয়েছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন দুর্গম থেকে দুর্গমতম স্থানে। হয়েছে নানান লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার খনি থেকে এক-একটি সঞ্চয় করা ঘটনা যখন প্রিয় নাতনিকে কোলে বসিয়ে শোনাতেন, তখন চন্দ্রকলার মনের বিস্ময়ের গোপন দরজাগুলো খুলে যেত একটু একটু করে। চন্দ্রকলা বড়ো বড়ো চোখ করে অবাক হত, আর ক্ষণে ক্ষণে মিঠে গলায় দাদুকে থামিয়ে দিয়ে বলত, “সত্যি সত্যি?”

“হ্যাঁ দিদিভাই, সত্যি সত্যি। আমাদের এই পৃথিবীর মধ্যে যে কত সত্যি সত্যি রূপকথা লুকিয়ে আছে, তা অনেকেই জানে না। তুমি বড়ো হয়ে কিন্তু বেরিয়ে পোড়ো দিদিভাই, সেইসব আশ্চর্যের খোঁজে।”

“তোমার হাত ধরে?”

“হ্যাঁ, আমার হাত ধরে।” প্রাণ খুলে হেসে ওঠেন চন্দ্রকলার ঠাকুরদা।

চন্দ্রকলার কাজল-টানা চোখ দুটো ছলছল করছে ছোটবেলার কথা মনে পড়তেই। এই প্রথম গ্রামের বাড়িতে এসে দেখা হল না ঠাকুরদার সঙ্গে। আর কোনোদিনও হবে না। শুধু রয়ে যাবে ওঁর স্মৃতিমাখা এই ছোট্ট বাড়িটা।

চন্দ্রকলার ঠাকুরদা মারা গেছেন ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকে। ঠাকুরদার শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান পর্যন্ত চন্দ্রকলারা তাদের এই গ্রামের বাড়িতেই থাকবে। আজ সকালে ঠাকুরদার ঘরে ঘুরতে ঘুরতে ঠাকুরদার লেখার টেবিলের ড্রয়ার থেকে চন্দ্রকলা খুঁজে পায় ঠাকুরদার ডায়েরিটা। সেই ডায়েরির পাতা ওলটাতে ওলটাতে হঠাৎ চোখ আটকে যায় একজায়গায় এসে। সেখানেই চন্দ্রকলা চোখে পড়ল কিছু অদ্ভুত লেখা। ডেট ওয়াইস ঠাকুরদার লিখে যাওয়া এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। সেই ডায়েরিটাই সঙ্গে করে এনে রেখেছে নিজের কাছে।

দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষ করে চন্দ্রকলা নিজের ঘরের বিছানায় গা এলিয়ে দেয় ঠাকুরদার ডায়েরিটা সামনে খুলে। পড়তে পড়তে চন্দ্রকলার মনে হয় এ ডায়েরি যেন ওকে উদ্দেশ করেই লিখে গেছেন ঠাকুরদা। ছোটবেলায় ওকে কোলে বসিয়ে ঠাকুরদা যেমনভাবে গল্প করতেন, তেমনি একটা স্নিগ্ধ পরশ লেগে আছে ডায়েরির প্রতি পাতায়। ঠাকুরদা লিখছেন,

৫ এপ্রিল, ১৯৭৮ সাল।

আমরা ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ইটানগরে পৌঁছলাম দুপুর তিনটে নাগাদ। দূরে দূরে মেঘপুঞ্জের মধ্যে পর্বতশ্রেণি অবস্থান করছে নিজস্ব গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে। মাঝে রৌদ্রোজ্জ্বল ছবির মতো এই রাজধানী শহর ইটানগর। এখানে এক রাত কাটানোর পর যাব আমাদের আসল উদ্দেশ্যে। আমাদের টিমে আমাকে নিয়ে মোট তিনজন—ড. মনোহর সিং, ধরমদাস ত্রিপাঠী আর আমি। কাল সকালে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হবে শেরপা নেবুলা সামচুং। কাল ভোর চারটে নাগাদ রওনা দেব অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং জেলার মেচুকা উপত্যকার উদ্দেশে। ওই মেচুকা উপত্যকাই আমাদের এখানে আগমনের মূল কারণ। ভারত-চিনের মাঝে থাকা ম্যাকমহোন লাইনের কাছে অবস্থিত ওই নিভৃত উপত্যকা যেন একটুকরো স্বর্গরাজ্য। শুধু স্বর্গরাজ্য নয়, ওই পার্বত্য উপত্যকা প্রভূত ভেষজ ঔষধের উৎসভূমি। কিন্তু তখনও আমাদের জানা ছিল না ওই স্বর্গরাজ্য মেচুকা উপত্যকায় আমার জন্য অপেক্ষা করছে পৃথিবীর অদ্ভুত এক রহস্য।

৬ এপ্রিল, ১৯৭৮ সাল।

শেরপা নেবুলা সামচুং এসে যোগ দিল আমাদের সঙ্গে। বেঁটেখাটো, স্বাস্থ্যবান চেহারার বছর পঁয়ত্রিশের এক যুবক। এরপর থেকে ও-ই আমাদের একপ্রকার ফ্রেন্ড, ফিলোসফার, গাইড। সংক্ষেপে পার্থসারথীও বলা যেতে পারে। ‘কী বলেন?’ বলে উঠলেন ধরমদাস ত্রিপাঠী। আমরা সবাই হেসে উঠলাম একযোগে। তারপর লোটাকম্বল বেঁধে বেরিয়ে পড়া।

৯ এপ্রিল, ১৯৭৮ সাল।

আমার সামনে বিস্তৃত মেচুকা উপত্যকা। কেউ বলে মেনচুখা, কেউ আবার মেছুখা বলে। কাঁটাঝোপে আর পাইনে ঢাকা ছবির মতো সুন্দর উপত্যকার পর আমাদের ঘিরে থাকা আকাশচুম্বি তুষারধবল পর্বত যেন এক-একজন ধ্যানমগ্ন মহা ঋষি। তাঁদের জটাজুটের মতো শ্বেত-শুভ্র ঝরনা নেমে আসছে কলধ্বনি করতে করতে। সেইসব কল্লোলিত ঝরনা একসময় শান্ত মেয়ের মতো নেমে এসে এই মেচুকা উপত্যকার বুক চিরে বয়ে চলেছে ইয়াগপচু নদী হয়ে। কবি হলে এই অপরূপ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা যেত কবিতায়, শিল্পী হলে ধরা যেত ক্যানভাসে। দুঃখ এটাই, কবি-শিল্পীর কোনোটাই নই আমি! কেমন করে প্রকৃতির প্রাণঢালা সৌন্দর্যের বর্ণনা দেব আমার জানা নেই। সামনে বয়ে চলা ইয়াগপচু নদীর দিকে তাকিয়ে বসে ভাবছিলাম, এমন সময় মনোহর সিং আর ধরমদাস ত্রিপাঠী এসে চেয়ার টেনে বসলেন আমার পাশে।

“গুড মর্নিং।”

“মর্নিং।”

“বড়ো সুন্দর জায়গা!” ড. মনোহর সিং বললেন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে।

“শুধু সুন্দর নয়, রহস্যময়ও।” ধরমদাস ত্রিপাঠী বললেন।

“কীরকম?” জানতে চাইলাম আমি।

“এই মেচুকা উপত্যকার শেষ সীমানা হল লামা নামের এক স্থান। তারপরই শুরু হয়ে যাচ্ছে চিনের সাম্রাজ্য। মেচুকার এই লামা হয়েই যাওয়া যায় প্রাচীন শহর তিব্বতে। প্রাচীনকালে এই জনপথ ধরে ব্যাবসা-বাণিজ্য চলত দুই দেশের মধ্যে। ভুট্টা, গম, ধান, বহু মূল্যবান রত্ন, বস্ত্র রপ্তানি হত চিনে; আমদানি করা হত বহুমূল্য সামগ্রী। ভারতে তখন বৌদ্ধধর্মের সংকটময় অবস্থা শুরু হয়েছে। উত্তর-পশ্চিম খাইবার গিরিপথ হয়ে তুর্কিদের আগমন ঘটে গেছে ততদিনে। বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে শুরু হয়েছে বৌদ্ধবিহারগুলির ধ্বংসলীলা। এই সময় ওদন্তপুরি আক্রমণের খবর পেয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ পুথি আর অতি মূল্যবান কয়েকটি বুদ্ধ মূর্তি সঙ্গে নিয়ে বিহার ছাড়লেন কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষু। কিন্তু যাবেন কোথায়! সারা ভারত জুড়েই তখন এক অবস্থা। পশ্চিমে তো যাওয়া যাবে না, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ঠিক করলেন যেতে হবে পূর্বে, গৌড়রাজের আশ্রয়ে।”

“গৌড় মানে এখনকার বাংলা?”

“হ্যাঁ। আর গৌড়রাজ হলেন রাজা লক্ষ্মণ সেন। ওই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা লক্ষ্মণ সেনের কাছে আশ্রয় পেলেও বেশি দিন ওখানে থাকতে পারলেন না। বখতিয়ার খিলজি নজর পড়ল লক্ষ্মণ সেনের গৌড় রাজ্যের উপর। অগত্যা তাঁদের গৌড় ছাড়তে হল। গৌড় নগরী থেকে ওই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা যাত্রা করলেন উত্তর-পূর্ব পাহাড়ি পথে। কিন্তু অদ্ভুতভাবেই হোক আর যে-কারণেই হোক, বখতিয়ার খিলজির সৈন্যদল তাঁদের পিছু ছাড়ল না। গৌড় জয়ের পর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পথ অনুসরণ করে তারাও অগ্রসর হল সেই উত্তর-পূর্বের গিরিপথ ধরে।”

“ইন্টারেস্টিং!” এতক্ষণে বললেন ড. মনোহর সিং।

একটু হেসে ধরমদাস ত্রিপাঠী বললেন, “আসল ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটেছিল এরপর।”

“কীরকম?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“আমার মনে হয়, বখতিয়ার খিলজির কিছু গোপন উদ্দেশ্য ছিল ওই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অনুসরণ করার পিছনে। হয়তো ওই বৌদ্ধ পুথি বা ওই অমূল্য বুদ্ধ মুর্তিগুলি।”

“শুধু এই কারণে এত সৈন্য, রসদ খরচ করবেন এমন একজন যোদ্ধা?”

“সেটাও আমি অনেকবার ভেবেছি, কিন্তু…” চুপ করে গেলেন ধরমদাস ত্রিপাঠী।

“ঘটনাটা কী ঘটেছিল?”

আবার বলতে শুরু করলেন, “ওই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দলটার ইচ্ছে ছিল ভারত পেরিয়ে তিব্বতে চলে যাবে। তাহলে হয়তো আর বখতিয়ার খিলজি তাঁদের নাগাল পাবেন না। কিন্তু তা হল না, বখতিয়ার খিলজি তাঁদের পিছু ছাড়লেন না। উনিও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অনুসরণ করে তিব্বত যাওয়ার মনস্থির করলেন। বখতিয়ার খিলজির সৈন্যদলের সঙ্গে নিরস্ত্র অবস্থায় পেরে ওঠা নিজেদের সাধ্য নয় বুঝেই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তখন মত বদলে সীমান্ত ধরে আরও পূর্বে আগ্রসর হয়ে আশ্রয় নিলেন হিমালয়ের কোলের এক নির্জন গুহায়।”

“আর বখতিয়ার খিলজি?”

“উনি পাহাড়ের এক স্থানে শিবির গেড়ে, সৈন্যসামন্তদের সেখানে থাকতে বলে, একা চললেন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে সেই গোপন গুহার সন্ধান পেলেন বটে বখতিয়ার খিলজি, কিন্তু তারপরই ঘটল আশ্চর্যকর এক ঘটনা। অন্ধকার সেই গুহা ভিতরে ভিক্ষুদের ফেলে রাখা কিছু চিহ্ন দেখতে পেলেন উনি, তখন নিশ্চিত হয়েই গুহার আরও ভিতরে চলতে শুরু করলেন মশাল জ্বালিয়ে। কিন্তু যত অগ্রসর হন, ততই হতবাক হয়ে যান। গুহার যেন কোনও শেষ নেই। চলছেন তো চলছেই! এমনভাবে চলতে চলতে হঠাৎ একসময় সামনে আলোর রশ্মি দেখা গেল। উনি গুহার মুখ ভেবে ছুটলেন সেই রশ্মির দিকে, তারপরই সব শূন্য।”

“শূন্য!”

“মানে?”

“কিছু দেখতে পেলেন না উনি। গুহার মুখে শুধু ভাসমান মেঘের খেলা। যেন পৃথিবীর একেবারে শেষ সীমানা। এরপর কোথাও কিছু আর নেই। হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে উনি দেখলেন, আবছায়া ওই বৌদ্ধ ভিক্ষুদলটা মেঘের শূন্যে হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছেন অনেক দূরে, অন্য এক দুনিয়ায়। বখতিয়ার খিলজির যখন জ্ঞান ফিরল তখন সব আবার অন্ধকার। সবটা স্বপ্ন দেখেছেন ভেবে ফিরে গিয়েছিলেন নিজের সৈন্যসামন্তদের কাছে। আর তিব্বত বিজয়ে যাননি উনি। সেখান থেকেই ফিরে যান সমতলে।”

আমরা অবিশ্বাসীর মতো চেয়ে আছি দেখে ধরমদাস ত্রিপাঠী বললেন, “আমি এর সত্য-মিথ্যা যাচাই করিনি। শুধু নাগপুর ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে থাকাকালীন তিব্বতীয় লেখক হোকাল হাকুই-এর লেখা একটি বৌদ্ধ গ্রন্থে আমি এই আশ্চর্যকর ঘটনাটা পেয়েছিলাম।”

“কিছুটা হয়তো সত্যি, কিছুটা হয়তো গল্পকথা।” সব শুনে ড. মনোহর সিং বললেন।

“হয়তো গল্পকথা। তবে আশ্চর্যের বিষয় কী জানেন ডাক্তার, এই গল্পকথার মধ্যেও আমি একটা অদ্ভুত মিলন সূত্র খুঁজে পেয়েছি।”

“কীরকম?”

“মেচুখা বা মেনচুখা শব্দের অর্থ যেমন একদিকে ঔষধিযুক্ত বরফ জল, আবার শুধু খা শব্দের অর্থে মুখও বোঝায়। কিন্তু কীসের মুখ? ওষুধ খাওয়া মুখ, নাকি অন্য দুনিয়ায় যাবার জন্য অলৌকিক কোনও গুহামুখ?”

ঠিক এমন সময় আমাদের শেরপা নেবুলা সামচুং ঘোড়ায় চড়ে এসে দাঁড়াল আমাদের এই কাঠের বাড়িটার সামনে।—“সাহাব আপলোগকা ঘোড়া।”

দেখলাম আমাদের জন্য তিনটি জোয়ান ঘোড়া জোগাড় করে এনেছে নেবুলা সামচুং। তাদের হ্রেষারবে শান্তি ভঙ্গ হচ্ছে এই শান্ত মেচুখা উপত্যকার। এই পাহাড়ি পাকদণ্ডি পথে আমাদের কাজ করতে হবে ঘোড়ায় চড়ে, এ ছাড়া অন্য উপায় নেই।

১২ এপ্রিল, ১৯৭৮ সাল।

তিনদিন মেচুখা উপত্যকায় কাটিয়ে আজ চলেছি উত্তরে পাহাড়ি পথ ধরে। দু-ধারের গাছগাছালি, রাস্তা সাদা বরফের চাদরে ঢাকা। আমার মোটা ওভার-কোটের ভিতরে মাঝে-মাঝেই শীতল বাতাস তীক্ষ্ণ ফলার মতো এসে বিঁধছে। ঘোড়া চলছে মন্থর গতিতে। পাথুরে রাস্তা ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হচ্ছে। একদিকে বরফের দেওয়াল আর একদিকে খাড়াই ঢাল নেমে গেছে অনেক গভীর পর্যন্ত।

“নীচে দেখিয়ে সাহাব, উধার।” শেরপা নেবুলা সামচুং আমাদের তিনজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল।

আমরা ওর দেখানো হাতের নির্দেশ লক্ষ্য করে তাকালাম নীচের দিকে। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূরে খেলনার মতো পাহাড়ের গায়ে কাঠের ঘরবাড়ি আর উপত্যকার নানা স্থানে বিছিয়ে থাকা জলপাই রঙের সেনা ছাউনিগুলি।

“ও মেচুখা হ্যায়।”

শেরপা নেবুলা সামচুং-এর কথায় আমরা অবাক হলাম। ওই মেচুখা! যেখানে আমরা ছিলাম! যেন ছবির থেকেও সুন্দর লাগছে এত উপর থেকে।

আবার খটখটিয়ে চলতে শুরু করেছে আমাদের ঘোড়া। আমরা চলেছি ইয়েরঝেগোমু নামের একধরনের পোকার সন্ধানে। এই মেচুখা উপত্যকায় যাতায়াত ব্যবস্থা পূর্বে প্রায় ছিল না বললেই চলে। বাইরের জগৎ সম্পর্কে এখানকার মানুষের কোনও ধারণা ছিল না। বহির্জগতের আধুনিকতার সঙ্গে পরিচিত না হলেও এদের পূর্বপুরুষরা নিজেদের রোগব্যাধির চিকিৎসার জন্য নানান প্রাকৃতিক উপায় আবিষ্কার করেছিল। ইয়েরঝেগোমু পোকাও তেমন একটি। উঁচু পাহাড়ে বরফের মধ্যে এই পোকার বাস। গরম জলে সিদ্ধ করে এর থেকে যে ওষুধ তৈরি হয় তা শুধু মানুষ নয়, গৃহপালিত পশুদেরও নানা রোগব্যাধি নিরাময়ে কাজে লাগে।

“আচ্ছা নেবুলা, এদিকটা সারাবছরই এমন শুনশান থাকে?” জিজ্ঞেস করলাম।

“নহি সাহাব, আগে এমন ছিল না। সেবার চিনা সেনাদের সঙ্গে আমাদের সেনাদের যুদ্ধ লাগল…”

“সেবার মানে, ষোলো বছর আগে ১৯৬২-র ইন্দো-চিন যুদ্ধের কথা বলছ?”

“হাঁ, সাহাব। ওই যুদ্ধের পর থেকে এদিকটায় এমন সন্নাটা হয়ে গেল। বর্ডারের ওদিকে গ্রামগুলোর লোকেরাও আগে এখানে আসতে পারত পাহাড়ি পথ ধরে, আমরাও যেতাম বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। কিন্তু তারপর একটা যুদ্ধ… ছোড়েন ওসব কথা।” বরফের ভারে নুয়ে পড়া গাছের পাতার মতোই ওকে একটু বিষণ্ণ লাগল। “আপলোগ সরকারি আদমি বলে অনুমতি পেয়েছেন, না-হলে ওই যুদ্ধের পর থেকে কারও অনুমতির নেই বর্ডারের এত কাছে আসার। এবার নামতে হবে সাহাব, চলে এসেছি আমরা।”

বরফের মাঝে ইয়েরঝেগোমু পোকা যেখান থেকে আমরা সংগ্রহ করছিলাম, সেখান থেকে আরও চারশো ফুট উপরে একটি পাথুরে মন্দিরের মাথা উঁকি মারছিল অনেকক্ষণ ধরেই। একসময় কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করলাম, “নেবুলা, ওটা কি কোনও মনাস্ট্রি?”

“কোনটা, সাহাব?”

“ওই যে পাহাড়ের একেবারে মাথায়?”

নেবুলা আড়চোখে একবার সেইদিকে দেখে নিল।—“হাঁ সাহাব, পর ও মনাস্ট্রি অচ্ছে নহি হ্যায়।”

সবাই নিজের কাজ ছেড়ে তাকাল নেবুলার দিকে। নেবুলা বলল, “কুছ অনজানসি চিজ হ্যায় উহা পর।”

“মতলব?” ধরমদাস ত্রিপাঠী প্রশ্ন করলেন।

“বহুত সারে আদমি ওখান থেকে হারিয়ে গেছে সাহাব। আর ফেরেনি।”

আমরা আরও অবাক হলাম।

নেবুলা বলে চলল, “দাদাজীকে পাস সুনা থা। বহুত সাল আগে ওখানে কিছু বৌদ্ধ ভিক্ষু বসবাস করত। ওরা নাকি প্রাচীন বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনা করত ওই মনেস্ট্রির অন্দর। অদ্ভুত শক্তি ছিল ওদের। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে যখন প্রচণ্ড ঠান্ডায় সবাই নেমে যেত পাহাড়ের নীচে, তখনও ওরা এখানেই থেকে ওদের সাধনা করত। পাহাড়ের পশুপাখিরা ছিল ওদের বশ। ভয়ংকর পাহাড়ি ভল্লুক পর্যন্ত ওদের পায়ের কাছে পোষা কুকুরের মতো ঘুরত। এমনি ওদের ক্ষমতা ছিল। তবে সাধারণ মানুষের কোনও ক্ষতি ওরা করত না। কিন্তু একদিন পশ্চিমদেশিয় কিছু দুর্ধর্ষ সৈন্যদল হামলা চালায় আমাদের এখানে। অগুনতি হত্যা আর ধ্বংসলীলার পর ওদের নজর পড়ে ওই মনাস্ট্রির উপর। ধনসম্পদ লুটের আশায় সেই দুর্ধর্ষ সৈন্যদল হামলা চালায় ওই মনাস্ট্রিতে। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয় ওই মনাস্ট্রির, কিন্তু অদ্ভুতভাবেই কাউকে খুঁজে পায়নি ওরা, পায়নি কোনও গুপ্ত সম্পদও। ওই মনাস্ট্রি ভিতরেই সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুর দল যেন কোথায় হারিয়ে যায় ওদের সমস্ত উপচারের জিনিসপত্র নিয়ে!”

“হয়তো কোনও গুপ্ত চোরা পথে চলে গিয়েছিল শত্রুর আসার খবর পেয়ে।”

“কিন্তু ওই আক্রমণকারী সৈন্যদল ওখানে কোনও গোপন পথ খুঁজে পায়নি অনেক খুঁজেও। পরে অবশ্য ওই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আবার দেখা যায় ওখানে। কিন্তু তখন ওরা আর আগের মতো সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করত না। গল্প শুনেছি, সাধারণ মানুষ ওই মনাস্ট্রি কাছাকাছি গেলেই ওরা মন্ত্রবলে নাকি মনাস্ট্রি ভেতরে পাথরের জীবজন্তু বানিয়ে রেখে দিত। সেই ভয়েই আর কেউ এদিকটায় আসত না।”

“ওদিকে একবার ঘুরে এলে হয় না?” ধরমদাস ত্রিপাঠী বললেন।

“না সাহাব, এমন কাজ না করাই ভালো। সেবার যুদ্ধের সময় কয়েকজন চিনা সেনা ওখানে ঘাঁটি গেড়েছিল। কিন্তু আর ফিরে যেতে পারেনি নিজেদের দেশে।”

“তারাও কি পাথরের জীবজন্তু হয়ে…”

“জানি না সাহাব। তবে কুছ দিন বাদ জন্তুতে খোবলানো দুটো লাশ পাওয়া গেছিল মনাস্ট্রির কাছে।”

“এখানে জন্তু আছে?”

“আগে ছিল, এখন নেই।”

“তোমরা তাহলে উপাসনা করো কীভাবে?”

“তার জন্য ইওংচা মনাস্ট্রি আছে। সেটাও চারশো বছরের বেশি পুরোনো। এদিকে তাই কেউই আসে না। চলিয়ে সাহাব, সুরজ হিলনে লগা। এরপর পাহাড়ি পথে নামতে তকলিফ হবে।”

দূরে পশ্চিম আকাশে পড়ন্ত বেলার সূর্য সাদা বরফের মধ্যে গলতে শুরু করেছে লম্বা গাছগুলিকে আঁধারের মাঝে রেখে। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে শুরু হয়েছে আলো-আঁধারি খেলা। প্রাণভরে সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, হুঁশ ফিরল শেরপা নেবুলা সামচুংর ডাকে।—“চলিয়ে সাহাব।”

চলেই আসছিলাম আমরা, কিন্তু দেখলাম ধরমদাস ত্রিপাঠী তখনও দাঁড়িয়ে আছেন পাহাড়ের মাথার ওই অবহেলিত মনাস্ট্রিটার দিকে তাকিয়ে।

“ধরমদাসবাবু? ধরমদাসবাবু?”

“আঁ? কিছু বলছেন।” যেন ঘোর ভাঙল ওঁর।

“চলুন, ফিরতে হবে তো।”

“হ্যাঁ, চলুন।”

১৩ এপ্রিল, ১৯৭৮ সাল।

রাত ঠিক একটা নাগাদ ঘুমটা ভেঙে গেল। অন্ধকার ঘরের মধ্যে রেডিয়ামের ঘড়িতে দেখা সময়টা এখনও মনে আছে আমার। বাইরে ঘোড়ার খুরের শব্দ। দেখলাম পাশের বেডে মনোহর সিং নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু ধরমদাস ত্রিপাঠীর বিছানা ফাঁকা। বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনের সন্দেহটাই ঠিক, সকালের সেই পাহাড়ি পথ ধরেছে ধরমদাস ত্রিপাঠীর ঘোড়া।

এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করিনি তারপর। ধরমদাস ত্রিপাঠীকে অনুসরণ করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিলাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। অবশ্য যত সহজে ঘটনাটা লিখলাম, সেদিন তত সহজ ছিল না গোটা বিষয়টি। জ্যোৎস্না-ভেজা পাহাড়ি পথে অতি সাবধানে যখন সকালের পোকা সংগ্রহ করা স্থানটিতে পৌঁছালাম, তখন ঘড়ির কাঁটা দুটো ছুঁয়েছে। দেখলাম, পাথুরে রাস্তার ধারের একটা পাইনগাছের নীচে বাঁধা আছে ধরমদাস ত্রিপাঠীর ঘোড়া। সেখান থেকেই বাঁদিকের রুপোলি বরফের উপর দিয়ে মোটা বুটের চিহ্ন সোজা উঠে গেছে অন্ধকারে গা ডুবিয়ে থাকা মনাস্ট্রিটির দিকে। অনেক কষ্টে পা-ডোবা বরফ কোনোরকমে ভেদ করে পৌঁছলাম পাহাড়ের মাথায় নির্জনে ঢাকা মনাস্ট্রিটির সামনে। কোন শক্তিতে ভর করে যে ওখানে সেদিন রাতে পৌঁছেছিলাম, এতদিন পর মনে করতেই শরীরে শিহরন জাগছে আমার!

সাধারণভাবে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এটা কোনও মনাস্ট্রি। বুদ্ধ পূর্ণিমার জ্যোৎস্না রাতে চোখের সামনে ভেসে উঠেছে একটি গুহামুখ। সেই গুহামুখকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ পাথরের তৈরি এই নির্জন মনাস্ট্রি। টর্চ জ্বেলে ভিতরে প্রবেশ করতেই দেখলাম ধরমদাস ত্রিপাঠীকে। বেশি বড়ো নয় ভিতরটা, চারদিকে শুধু কালো কালো পাথরের মূর্তি। না, কোনও দেবদেবীর মূর্তি নয়। হিংস্র জন্তুরা পাথরের মূর্তি হয়ে বসে আছে চারদিকে। মনে হল যে-কোনো মুহূর্তে পাথরের খোলস ছেড়ে ধারালো নখদন্ত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের উপর।

“ভালোই হল আপনি এসে গেছেন। এখন আসুন তো, দুজনে মিলে দেখি কিছু পাওয়া যায় কি না।”

“এত রাতে, কীসের খোঁজে এসেছেন আপনি?”

“আমি নিশ্চিত এটা কোনও সাধারণ মনাস্ট্রি নয়, কোনও গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে এখানে। যে কারণে এখানকার লোকজন নানান অতিলৌকিক গল্প ফেঁদে দিনের পর দিন আড়ালে রেখে দিয়েছে এই মনাস্ট্রির মতো দেখতে গুহাটাকে। আসলে এটা একটা গুহামুখ, কোনও মনাস্ট্রিই নয়!”

“কী রহস্য আছে এখানে?”

“সেদিন আপনাদের বলেছিলাম না, বখতিয়ার খিলজির আক্রমণ থেকে বাঁচতে দলটা পালিয়ে এসেছিল উত্তর-পূর্ব সীমান্তের কোনও এক জায়গায়?”

“আপনার কী ধারণা, এই গুহাই সেই…”

আমাকে থামিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন ধরমদাস ত্রিপাঠী।—“তাহলে ভাবুন, পৃথিবীর কোন অপার রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা!”

“কিন্তু সেটাও তো গল্প হতে পারে।”

“সবকিছু কি গল্প হয়?” হাসি থামিয়ে বললেন, “কথায় আছে, যা রটে তা কিছু হলেও সত্যি। যদি সেই আশ্চর্য জগৎ নাও থাকে, আমার বিশ্বাস, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আনা সেই বহুমূল্য প্রাচীন পুথি আর বুদ্ধ মূর্তিগুলো এখানেই কোথাও লুকোনো আছে। বিদেশের বাজারে যা অমূল্য সম্পদ! একবার খুঁজে পেলে এমনভাবে আর জলে-জঙ্গলে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে না।”

“সত্যি যদি খুঁজে পাওয়া যায়, তা হবে দেশের সম্পত্তি। আপনি যা ভাবছেন সেটা অন্যায়।”

“ন্যায়-অন্যায় শেখাতে আসবেন না আমাকে। তাছাড়া এত কষ্ট করে পাওয়া সম্পদ, সরকারের হাতে তুলে দেব, এমন বোকা নই আমি। আপনি যদি মোটা অঙ্কের বখরা পেতে চান, তাহলে হাত লাগান আমার সঙ্গে। না-হলে আমাকে বাধা দেবেন না, চলে যান।”

আমি চলে এলাম না, আবার ওঁর সঙ্গে হাতও লাগালাম না। একপাশে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম ওঁর কাণ্ড। ছোটোবড়ো পাথরের জীবজন্তুর মূর্তিগুলো সর্বশক্তি দিয়ে সরিয়ে ফেলে তছনছ শুরু করেছেন উদ্ভ্রান্তের মতো। সম্পদের লোভ একটা নিরীহ মানুষকে কতটা ভয়ংকর করে তোলে, তার উদাহরণ ধরমদাস।

এরপরই হঠাৎ করে ঘটে গেল সেই অকল্পনীয় ঘটনাটা! ধরমদাস পাগলের মতো গুহার ভিতরে ভাঙচুর করতে করতে একসময় একটি পাথরের তৈরি বুদ্ধ মূর্তি সরাতে গিয়েই বিকট ঘড়ঘড় শব্দ করে গুহার একটা দেওয়াল দু-ফাঁক হয়ে সরে যেতে লাগল! অন্ধকার রাতের নির্জন গুহাটাকে আলোকিত করে সেই গুহামুখ দিয়ে ঠিকরে এল সাদা আলোক রশ্মি। ধাঁধিয়ে যাওয়া চোখ কিছুটা ধাতস্থ হলে পর দেখলাম আমার জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্যকর দৃশ্যখানা! আমার সামনে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের রাজ্য! দূরে আবছায়া অথচ কারুকার্যখচিত একটি বিরাট মনাস্ট্রি! প্রেয়ার হুইল হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মুণ্ডিত মুস্তকের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। ভেসে আসছে প্রার্থনার পবিত্র সুর। ওম মণি, ওম মণি…

“পেয়েছি পেয়েছি, আশ্চর্য সেই জগৎ!” হো হো করে হেসে উঠলেন ধরমদাস।

কিন্তু তারপরই ঘটে গেল আরেকটা ভয়ংকর লোমহর্ষক ঘটনা। ধরমদাসের তছনছ করে দেওয়া পাথুরে জীবজন্তুর মূর্তিগুলো জেগে উঠতে শুরু করল একে একে, হিংস্র নিঃশ্বাসের শব্দ বাড়তে থাকল চারপাশে। জ্বলে উঠল অসংখ্য সবুজ চোখ! পাথরের আবরণ ছেড়ে একে একে বেরিয়ে এল হিংস্র পশুর দল। তারপরই ধারালো নখদন্ত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ধরমদাসের উপর। উনি যেমন করে কিছুক্ষণ আগে ওদের তছনছ করেছিলেন, এখন ওঁকে ছিন্নভিন্ন করতে লাগল সবাই মিলে। তাদের ভয়ংকর হুংকারের সঙ্গে নিভে গেল গুহার সব আলো, মুহূর্তে হারিয়ে গেল সেই আশ্চর্য জগৎ। সব শান্ত হয়ে গেল আবার আগের মতো। পাথরের মূর্তিগুলো যথাস্থানে ফিরে গেছে। শুধু অনেক খুঁজেও ধরমদাসকে আর দেখতে পেলাম না।

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ সাল।

গতকাল রাতে ঘুমের মধ্যে দেখলাম আবার সেই আশ্চর্যকর জগৎ! মেঘপুঞ্জের মধ্যে ভাসমান পবিত্র মনাস্ট্রি! ছায়া ছায়া বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রেয়ার হুইল ঘোরাতে ঘোরাতে। ভগবান বুদ্ধের প্রার্থনা মন্ত্র শুনতে পেলাম কানের কাছে…

***

চন্দ্রকলা ডায়েরি বন্ধ করে বাইরে তাকাল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ। আকাশ জুড়ে তখন বুদ্ধ পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্রের খেলা।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

1 thought on “গল্প-বুদ্ধগুহা রহস্যময়-অঙ্কন মুখোপাধ্যায়-বর্ষা ২০২২

Leave a Reply to শুভাশিস ঘোষ Cancel reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s