গল্প-ট্রিবট-শেলী ভট্টাচার্য- শীত ২০২০

সন্ধ্যা ভট্টাচার্য গল্প প্রতিযোগিতা ২০২০
(নবম দশম স্থানের পাঁচ গল্প)

ধ্রুববাবু বিকালের চা শেষ করে আরামকেদারায় বসে একটু আমেজে আড়মোড়া ভাঙলেন।

“বাবা, আরেকবার চা করে দেব?” প্রীতি সুমিষ্ট গলায় এসে জিজ্ঞাসা করল।

“না না, আর নয়। তোমার হাতের এক কাপ চা খেয়েই আমি চনমনে হয়ে উঠি মা। তুমি তো জানো এখন আমার গার্ডেনিং টাইম।” চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হালকা হেসে বললেন সত্তর-ঊর্ধ্ব ধ্রুববাবু।

“আপনার নাতি আপনার আগেই সেখানে চলে গিয়েছে। এতক্ষণে আপনার বাগানের অর্ধেক সংখ্যক গাছে জলও দিয়ে দিয়েছে বোধ হয়।” প্রীতি শ্বশুরের দিকে চেয়ে বেশ আনন্দ সহকারে বলল কথাগুলো। ও মনে মনে এটাই চায় যে ওর শ্বশুরের মতো গুণী সজ্জন মানুষের প্রতিটি মুহূর্তের প্রতিটি কাজের সঙ্গী হোক ওর ছেলে।

“তাই নাকি? তবে তো আমি লেট। আর বিলম্ব নয় নয়, আর বিলম্ব নয়…” গুপি-বাঘার মতো সুর করে বলতে বলতে বাগানের দিকে চললেন ধ্রুববাবু।

প্রীতি শ্বশুরমশাইয়ের শিশুসুলভ আচরণ দেখে মনের সুখে ওঁর দিকে চেয়ে ছিল।

(২)

“ট্রিবট। আমি আমার তৈরি ট্রি জেনোবোটের নাম রেখেছি ট্রিবট। আমরা জানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর রিজেনেরেটিভ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজির গবেষকরা ইতিমধ্যেই ব্যাঙাচির স্টেম সেল নিয়ে জীবন্ত রোবট তৈরি করে ফেলেছেন। আমার মতে সেটা যেহেতু প্রাণীর স্টেম সেল নিয়ে তৈরি, তাই সেটির মধ্যে প্রাণীর কিছু বৈশিষ্ট্য থাকবে। কিন্তু আমি গবেষণার শুরুর দিক থেকেই চেয়েছিলাম উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন রোবট তৈরি করব।”

“আপনার এই ইচ্ছার পেছনের কারণগুলো জানতে পারি কি?” স্টেজে উপস্থিত বোর্ড কমিটির একজন হোমরাচোমরা বিজ্ঞানী প্রশ্ন করলেন।

“কারণ অনেক। তবে অনুপ্রেরণা ছিল আমার মা। যিনি আমায় খুব ছোটো থেকে বিবিধ গাছের সংস্পর্শে বড়ো করেছিলেন। জীবনের প্রতিটি স্তরে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন একেক প্রজাতির সবুজ আত্মীয়ের সঙ্গে। আমার মনে আছে, সেই ছোটোবেলা থেকে মা আমার একেকটি জন্মদিনে অদ্ভুদ সুন্দর একটা করে গাছ উপহার দিতেন। নিজের হাতে ধরে তাদের যত্ন নিতে শেখাতেন। সেই অভ্যাস রপ্ত করে যখন গাছে ফুল-ফল আসতে দেখতাম, তখন সৃষ্টির আনন্দে লাফিয়ে উঠতাম আমি। মা বলতেন, সেই সৃষ্টিই প্রকৃত অর্থে সুন্দর হয়, যা দেশের বা দশের নিঃশর্ত উপকারে লাগে। কোনো সৃষ্টি আমাদের সৃষ্টিকর্তার নিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে, তাতে সফলতা আসে না।

“প্রতিটি গাছ সারাজীবন ধরে অকাতরে আমাদের কোনো না কোনোভাবে উপকার করে যায়। আমরা কতটুকু প্রতিদান দিতে পারি তাদের? তা না পারি, অন্তত তাদের সেই উপকারী স্বভাবকে কাজে লাগিয়ে মানবজাতির জন্য কিছু করতে তো পারি।

“মায়ের সেইসব কথা থেকেই আমার মধ্যে ট্রিবট তৈরির স্বপ্ন জেগেছিল। আমি নিজের মতো করে গবেষণায় ডুব দিয়েছিলাম। মিমোসা বা লজ্জাবতী গাছের স্পর্শ অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে প্রথম সিসমোন্যাস্টিক রোবট গড়েছিলাম। তারপর স্টেম সেল গবেষণার অ্যালগরিদম ব্যবহার করতে শুরু করেছিলাম।”

“সেই অ্যালগরিদম কি আপনার বাবার জেনোবট টিমের অ্যালগরিদম?”

“আপনার বাবার তৈরি সামরিক রোবট মানবজাতির ক্ষতি করছে, সেটা আক্ষরিক অর্থে মেনে নেওয়াতেই কি আপনার এইরূপ ভিন্ন ধারণা?”

“ট্রিবটের এই স্টেম সেল গবেষণায় আপনার বাবার ভূমিকা ঠিক কতখানি? আপনিই কি তাঁকে কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছেন এদেশে? নইলে ডঃ বিদ্যুৎ বাগচির ছেলের কাছে এত বড়ো গবেষণার জন্য এত বিপুল অর্থ এল কোথা থেকে?”

একের পর এক উপর্যুপরি প্রশ্নে গর্জে উঠল বোর্ড কমিটি।

দৃশ্যটার সম্মুখীন হতেই হাতে থাকা রিমোটে বোতাম প্রেস করে রেকর্ডটাকে বন্ধ করে দিল জ্যোতীন্দ্র। সঙ্গে সঙ্গে সামনের দেওয়াল জুড়ে থাকা ফ্ল্যাট স্ক্রিন প্রোজেক্টর মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল।

ওর জীবনের এমন স্বপ্নের দিনটা যে এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে, তা ও আগে স্বপ্নেও ভাবেনি। ও সেদিন স্টেজে উঠে জোর গলায় স্বীকার করতে পারেনি সত্যকে। যে বিজ্ঞানীর জন্য সারা দেশ গর্বে মাথা উঁচু করে থাকে, সেই বিদ্যুৎ বাগচির বিরুদ্ধে একসময় তার অসংখ্য অভিযোগ ছিল। চোখ বন্ধ করলে এখনো শুনতে পায় মায়ের সেই কান্নাভেজা গলা—‘ওদের মেরে ফেললে তুমি!’

নিছক স্কুলে টিচারি করেই জ্যোতীন্দ্রের মা লজ্জাবতী গাছের উপর ঘরোয়া গবেষণা করছিলেন। যার মধ্যে পরবর্তীকালে ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন জ্যোতীন্দ্র ইলেক্ট্রো-বায়োলজিকাল তরল প্রয়োগ করে তার চলনকে সম্ভব করেছিল কৃত্রিম শিকড়ের দ্বারা।

সে সময় ওর বাবা বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী ডঃ বিদ্যুৎ বাগচির ল্যাব ছিল ওদের দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে। মায়ের প্রশস্ত বাগান ছিল দো-মহলা বাড়িটার পেছনদিকে। একদিন সকালে উঠে জ্যোতীন্দ্র শুনতে পেল মায়ের আর্তি। ও দুজনের কথোপকথন শুনে বুঝতে পারছিল, বাবা তাঁর গবেষণার জন্য মায়ের প্রিয় বাগানের কিছু অংশ নষ্ট করে দিয়েছেন। বিদ্যুৎ বাগচিকে সে সময় তাঁর যান্ত্রব সৃষ্টিকে মাটির উপরের সাবলীল চলন পরীক্ষার জন্য জায়গা খুঁজতে হচ্ছিল। গবেষণার গোপনীয়তা রক্ষার প্রয়োজনে ভোররাতের দিকে পেছনের বাগানে চলছিল সেই পরীক্ষানিরীক্ষা। বিখ্যাত বিজ্ঞানীর বাড়ির উপর দিনের আলোতে প্রায় সবসময় তখন মিডিয়ার ক্যামেরা ওত পেতে থাকত।

সেই ভোরের কথা আজও ভুলতে পারে না জ্যোতীন্দ্র। কান্নায় দু-চোখ ভিজে আসে ওর। তারপরেই ওর বাবা বরাবরের জন্য বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। বিদ্যুৎ বাগচির একটাই বক্তব্য ছিল, ওঁর গবেষণার ভালোমন্দের প্রসঙ্গে কেউ নাক গলাতে পারবে না। উচ্চাশার এক সর্বগ্রাসী নেশা তখন ওঁর মাথা দখল করে দাপিয়ে বেড়াত।

বিদ্যুৎ বাগচি বিদেশে চলে যাওয়ার পর ওদের দক্ষিণ কলকাতার বাড়ি ছেড়ে ওরা আজকের এই ছোট্ট বাড়িতে এসে উঠেছিল। এক এক করে রোজমারি, জুঁই, স্নেক প্লান্টে ওর মা ওঁর শোওয়ার ঘরটাকে ভরিয়ে তুলেছিলেন। এগুলো নাকি ঘুম ভালো করায় সহায়ক হয়। বাইরের উঠোনে ছিল সারি সারি লজ্জাবতী গাছ। বেশ কাটছিল দিনগুলো। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে শীর্ষ স্থান অধিকার করে এগোচ্ছিল জ্যোতীন্দ্র।

সে সময় একদিন প্রায় মধ্যরাত্রে দরজায় কড়া নড়ে উঠল। ঘুমচোখে এসে দরজা খুলতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত জ্যোতীন্দ্র বিস্ময়ে হতবাক।

কে এ? এমন উসকোখুসকো চুল, গর্তে ঢুকে যাওয়া চোখ, চোখের নীচে কালির রেখা… একমুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে থাকার পর প্রথমে দু-পা পেছনে ফেলে পিছিয়ে এসেছিল সেদিন জ্যোতীন্দ্র।

(৩)

“এতদিন ধরে লোকটা এমন একটা গবেষণা করে গেল, আর তোমরা কিছু টেরই পেলে না?”

মিঃ হেনরির মুখে রাগের ছাপ সুস্পষ্ট। বহুবছর ধরে তিনি ভারতে থেকে কয়েকজন বাঙালি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে রোবোটিক শিকড় তৈরির কাজে দিনরাত এক করে দিচ্ছিলেন। সফলতা আসেনি যে তা নয়। রোবোটের মধ্যে নকল ফিলামেন্ট প্রবেশ করিয়ে ইলেকট্রিক চার্জ প্রয়োগ করা হয়েছে। তাতে সেই ফিলামেন্ট উদ্দীপিত হয়েছে। তার মধ্যেও গাছের শিকড়ের মতো জল ও পুষ্টি খোঁজার লক্ষণ দেখা গেছে। শিকড়ের মতো দ্রুত গতিতে না হলেও সেই ফিলামেন্ট বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে ধীরে ধীরে। কিন্তু তাই বলে এমন অভিনব রোবট! ভাবতেই দু-হাতে কানের উপরে থাকা মাথার অবশিষ্ট চুলগুলোকে গোছা করে ধরে চেয়ারে বসে পড়লেন হেনরি। টেবিলে মাথা নীচু করে বসে বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছিলেন তিনি, “আমরা এত উন্নত সেন্সর ব্যবহার করলাম, তাতেও তো এতটা ভালো ফলাফল পাইনি।”

“স্যার, আমার মনে হয় ট্রিবটে অন্য টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে।”

প্রীতমের কথায় তখন রীতিমতো খেঁকিয়ে উঠলেন হেনরি, “কী টেকনোলজি? ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া?”

“ন-না-আ, মানে…” বলে মাথা নীচু করে ঢোঁক গিলছিল প্রীতম।

ওর পেছন থেকে বিপুল এগিয়ে এসে বলল, “স্যার, একটা কথা বলব?” বলেই হেনরির মেজাজ বুঝে উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলল, “আমি একজনের নাম বলতে পারি যিনি জ্যোতীন্দ্রের কাজের ব্যাপারে কিছু বলতে পারবে।”

মিঃ হেনরি কথাটা শোনামাত্র মাথা তুলে কৌতূহলী দৃষ্টিতে চোখ সরু করে তাকালেন বিপুলের দিকে।

“আমি জ্যোতীন্দ্রের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে গিয়ে ওর ইউনিভার্সিটির এক প্রফেসর মিঃ চ্যাটার্জির নাম পেয়েছি যাঁর সঙ্গে একসময় ওর ভালো সম্পর্ক ছিল। আরেকটা কথা বলছি স্যার, জ্যোতীন্দ্র কিন্তু যে-সে ছেলে নয়, ওর শরীরে বইছে বিদ্যুৎ বাগচির রক্ত।”

“জেনোবট রিসার্চ টিমের সদস্য ডঃ বিদ্যুৎ বাগচি?” বিপুলের দিকে চেয়ে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন মিঃ হেনরি।

“ইয়েস স্যার। তবে মিঃ বাগচির সঙ্গে জ্যোতীন্দ্র আর তার মা বহুবছর থাকতেন না।” বিপুল থামল।

“বাট হোয়াই?” মিঃ হেনরি ভুরু কুঁচকে বললেন।

“বিদ্যুৎ বাগচির তৈরি সামরিক রোবট যেভাবে দুই দেশের মধ্যের মানুষকে বিষক্রিয়ায় মেরে ফেলার জন্য নিজেকে তৈরি করেছিল, তার চরম বিপক্ষে ছিলেন জ্যোতীন্দ্রের মা। তাই হয়তো…”

“পারিবারিক মতান্তর।” বিপুলকে থামিয়ে বলে উঠল প্রীতম।

“হয়তো। কিন্তু শেষ বয়সে ডঃ বাগচিকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।”

“মানে, নিরুদ্দেশ?” বিপুলের কথার পিঠে বিস্ময়সূচক প্রশ্ন করল প্রীতম।

“আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড অ্যাবাউট ডঃ বাগচি। ফাইন্ড আউট হিজ সন।” টেবিলের উপর দু-হাত দিয়ে দাবড়া মেরে বলে উঠলেন মিঃ হেনরি।

(৪)

“দাদুভাই, তুমি কী করছ ওখানে?”

“আমার ওর সঙ্গে খেলতে খুব ভালো লাগে।” লজ্জাবতীর পাতার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বলছিল বছর এগারোর অর্ঘ্য।

ধ্রুববাবু নাতির দিকে চেয়ে স্মৃতি-সরণি বেয়ে দ্রুত যেন টাইম ট্রাভেলে চলে গেলেন। প্রায় কুড়ি বছর আগে এই বাগানে ঠিক অর্ঘ্যর মতোই সে এসে লজ্জাবতী গাছের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ির খেলা খেলত। আর বলত, ‘স্যার, আমাদের ঘরের মধ্যেও বাগান, আবার বাইরেও বাগান আছে।’ ওর প্রিয় স্যারকে ওর বাড়িতে সাজানো মায়ের বাগানে ঘুরে আসার নেমন্তন্নও করেছিল ও। কিন্তু সেদিন আর এল না। ছেলেটির মায়ের হাতের রান্না খাওয়া আর হয়ে ওঠেনি ধ্রুববাবুর। এরপর ছেলেটির সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্নও হয়ে গিয়েছিল। তবে ছেলেটির বুদ্ধিমত্তার উপর বিশ্বাস ছিল ধ্রুববাবুর। তিনি জানতেন, ছেলেটি একদিন ওর মায়ের স্বপ্নপূরণ করবেই। সারা বিশ্বকে ও গাছের উপকারিতা সমন্বিত এক অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক উপহার দেবেই। নীচু ক্লাসেই ছেলেটির বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা আর অধ্যাবসায়ের নজরকাড়া নেশা ছিল। এতদিনে হয়তো…

আপনমনে জ্যোতীন্দ্রর বিবিধ সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের চিত্রপট এঁকে ফেলছিলেন ধ্রুববাবু। এমন সময় প্রীতি মোবাইল নিয়ে ছুটে এল বাগানে।

“বাবা, আপনার ফোন।”

“কার?” প্রশ্ন করলেন ধ্রুববাবু।

“আননোন নম্বর।”

ধ্রুববাবু মোবাইলের স্ক্রিনে একবার চোখ রাখার পর ফোন ধরলেন।

“হ্যালো।”

“আপনি ডঃ ধ্রুব চ্যাটার্জি?”

“বলছি। আপনি?”

“আপনি জ্যোতীন্দ্র বাগচিকে চিনতেন তো?”

নিজের প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে অপরিচিত কণ্ঠে আবার নতুন প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন ধ্রুববাবু। ভুরু কুঁচকে মনে মনে ভাবলেন, এ তো রীতিমতো টেলিপ্যাথি। অতঃপর শান্ত গলায় বললেন, “আপনি কে জানাটা আমার প্রয়োজন।”

“আমি একটি মিডিয়া চ্যানেলের প্রতিনিধি। জ্যোতীন্দ্র বাগচির উপর বড়োসড়ো রিপোর্ট তৈরি করছি। ওঁর অভাবনীয় আবিষ্কারের কথা লিখছি। তাই ওঁর জীবনে যাঁরা অনুপ্রেরণা হিসাবে ছিলেন বা আছেন, তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছি। আসলে বিজ্ঞানী জ্যোতীন্দ্র বাগচিকে আমরা জন্মদিনে এই রিপোর্ট গিফট করতে চাই।”

“আচ্ছা।” ছোট্ট করে বললেন ধ্রুববাবু।

“আপনার সঙ্গে ওঁর এখন যোগাযোগ আছে?”

“না।”

“আপনি জানেন না এখন উনি বিদেশে থাকেন?”

“না।”

উত্তরটা দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফোনটা কেটে গেল। ছাত্রের আশাতিরিক্ত উন্নতির খরর পেয়ে আনন্দে মন নেচে উঠল ধ্রুববাবুর।

এমন সময় আবার ফোনটা বেজে উঠল।  মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে আননোন নম্বর। ফোন তুলে হ্যালো বলতেই, ধ্রুববাবুর কানে ভেসে এল পরিচিত সেই কণ্ঠস্বর।  খুশির আনন্দে ভিজে উঠল গর্বিত শিক্ষকের দু-চোখের পাতা।

(৫)

“ডঃ চ্যাটার্জির সঙ্গে জ্যোতীন্দ্রের এখন যোগাযোগ নেই স্যার। ও দেশে কি বিদেশে আছে, সে ব্যাপারেও ওঁর কোনো ধারণা নেই। আমি মিডিয়ার ভয়েস হয়ে ইন্টারোগেট করে যা বুঝতে পারলাম, জ্যোতীন্দ্রের গবেষণাগারের হদিশ এখন কেউ জানে না।”

প্রীতমের কথা শুনে জেগে ওঠা ক্ষীণ আশাও হারিয়ে ফেললেন হেনরি। রেগে গিয়ে চিৎকার করে উঠলেন বিশ্রী গলায়, “আমার হাতে সময় কম।  শীগগির খুঁজে বের করতে হবে জ্যোতীন্দ্রের ল্যাবের ঠিকানা।”

“স্যার।” বিপুলের ডাকে রাগী চোখে ওর দিকে তাকালেন হেনরি।

“জ্যোতীন্দ্রের ট্রিবটের একটা কপি জমা আছে অল ইন্ডিয়া রিসার্চ সেন্টারের কলকাতা শাখায়। যেখানে সেমিনারে জ্যোতীন্দ্রকে শেষ দেখা গিয়েছিল। ওখানে গিয়ে দেখি, হয়তো এমন কিছু তথ্য পাব, যা স্ক্যান করে ব্যাক-ট্রেস করলে জ্যোতীন্দ্রর বর্তমান লোকেশন পাওয়া যেতে পারে।”

বিপুলের কথাটা শুনে নিজের উপর নিজেরই গর্ববোধ হল হেনরির। মনে হল, দারুণ ট্রেনিং দিতে পেরেছেন তিনি তাঁর সেনাপতিকে। সুর নরম করে হেনরি বললেন, “গুড আইডিয়া। তাড়াতাড়ি করো সেটা। তবে সাবধানে, আমাদের উদ্দেশ্য যেন কেউ ধরতে না পারে।”

একটা বিকৃত হিংসাত্মক হাসি বসের দিকে ছুড়ে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল বিপুল। প্রীতমের সারা মস্তিষ্কে তখন কিলবিল করছে হিংসার সংক্রমণ। স্যারের কাজটা বিপুল করে দিতে পারলে বিদেশ ফেরার আগে স্যার এতজনের দায়িত্ব ওকে দিয়ে যাবে। উপস্থিত বুদ্ধির স্কিলটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা স্যার নিজের কাজের মধ্য দিয়ে বরাবর বোঝাতেন ওদের। পরিশ্রমে ও এগিয়ে থাকলেও বিপুল বরাবর শেষ স্তরে পৌঁছে বাজিমাত করে দেয় উপস্থিত বুদ্ধির জোরে। ভেবে নিজের দু-হাতকে রাগে মুষ্টিবদ্ধ করছিল প্রীতম। নিজের অকর্মণ্যতার কথা চিন্তা করে ওর চোয়াল শক্ত হচ্ছিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হেনরির ফোনে একটা মেসেজ ঢুকল।  মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখতেই ঠোঁট বাঁকানো হাসির রেখা ফুটে উঠল হেনরির মুখে। তারপর প্রীতমের দিকে চেয়ে হেনরি তৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, “রেডি করো টিমকে।  লুকোচুরির খেলাটা এবার সবাই মিলে গিয়ে শেষ করে আসি।”

প্রীতম ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই হেনরি রকিং চেয়ারে তৃপ্তিতে নিজেকে হেলিয়ে দিলেন। ওঁর মনের মধ্যে কুটিল হাসির রেখা আনন্দে কুটিপাটি করে ওঁকে যেন জানান দিচ্ছিল, বাপকে কব্জা করতে পারিনি, ছেলেকে পারবই। এবারের অ্যালগরিদম আরো দামি। সেবার মানুষের স্বভাবগত রিপু সংক্রমণের ফলে হিউবোটে যা কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছিল, সেগুলো ট্রিবটে আর হবে না। তাই হিংসাত্মক সভ্যতা তাদেরকে নিঃসন্দেহে ক্রীতদাসের মতো চালনা করতে পারবে। ক্ষমতার জন্য যে সৃষ্টি মনিবের সঙ্গে লড়তে যাবে না, গদির লোভে যে স্বজাতির সঙ্গে হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত হবে না, সেই নিষ্পাপ নির্ভেজাল ট্রিবটই তো এখন সারা বিশ্বের কাছে সবচেয়ে দামি। সমস্ত প্রভাবশালী মানুষই এখন চায় চরম অনুগত একটা যান্ত্রিক আত্মীয়কে নিজের ঘরে রাখতে। যে আত্মীয় কূটবুদ্ধিহীন হওয়ায় অনুচিত চিন্তামুক্ত, অন্যদিকে জীবনদায়ী। জ্যোতীন্দ্রের ভাষায়, ওর সবুজ আত্মীয় দিনে রাতে শুধু অক্সিজেন দিয়ে মানবজাতির সহায়ক হয় না, গাছের মতোই অকাতরে সেবা করে যেতে সক্ষম হয়।

“স্যার, আমরা প্রস্তুত।”

প্রীতম এসে জানাতেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন হেনরি। প্রায় দেড় যুগ আগের ফসকে যাওয়া সম্পূর্ণ অ্যালগরিদমটা আজ ওঁর হাতের মুঠোয় আসতে চলেছে, নতুন রূপে। ভেবে ফুরফুরে মেজাজে সামনে ঘুরে দাঁড়াতেই হঠাৎই একটা ভারী কিছুর তীব্র আঘাত এসে লাগল ওঁর কপালের ঠিক মাঝ বরাবর। দু-চোখে অন্ধকার নেমে আসার আগের মুহূর্তে হেনরি দেখতে পেলেন একটা ইলেক্ট্রোলাইট সিরিঞ্জ। বিষের গাঢ় নীল রঙ তার তরলের মধ্যে অস্থির হয়ে উঠেছে মানবদেহে প্রবেশের জন্য।

(৬)

ছোট্ট বাড়িটার পেছনদিকে এসে পথ খোঁজার চেষ্টা করছিলেন ধ্রুববাবু।

“এদিক দিয়ে আসুন স্যার।”

যান্ত্রিক আওয়াজে বিস্মিত হয়ে ধ্রুববাবু দেখলেন, একটা গাছ তার কয়েকটি শাখাকে এগিয়ে দিয়েছেন ধ্রুববাবুর দিকে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দু-পা পিছিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই ধ্রুববাবুর চোখে পড়ল একটি ছোট্ট পাতলা ধাতব টুকরো, কতকটা কাগজের মতো। গাছটির একটি শাখা মানুষের মতো ধরে ছিল সেটিকে। ধ্রুববাবুর মনে পড়ল, জ্যোতীন্দ্র যখন ফোন করে ওর আসন্ন বিপদের কথা জানিয়ে ওর দেওয়া ঠিকানায় আসতে বলেছিল, তখন আরো কী একটা বলছিল। কী এক বার্তাবাহক ট্রিবটের কথা যার হাতে ওর মেসেজ থাকবে।

কাঁপা কাঁপা হাতে গাছের শাখা থেকে ধাতব পাতাটি হাতে নিতেই ধ্রুববাবুর বুঝতে অসুবিধা হল না ওঁর পরবর্তী পদক্ষেপগুলো।

ট্রিবটের পিছু পিছু জ্যোতীন্দ্রের ঘরে ঢোকার পর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে এদিক ওদিকে চোখ বোলাচ্ছিলেন ধ্রুববাবু। চতুর্দিকে গাছের বিবিধ দৈর্ঘ্যের বিবিধ প্রজাতির বিচরণ চলছে সেখানে। কেউ ঘর সাফ করছে, আবার কেউ টেবিলের উপর খাবার বেড়ে দিচ্ছে। কেউ আবার ঘরের এককোণায় পেতে দেওয়া সোফাতে মানুষের মতোই গা এলিয়ে শুয়ে আছে।

এমন সময় ‘স্যার, স্যার’ বলে বিভ্রান্তের মতো এগিয়ে এল জ্যোতীন্দ্র। আর ধ্রুববাবুর হাত ধরে চেয়ারে বসিয়ে বলতে শুরু করল। ওর অন্যহাতে ছিল একটা মোটা ফাইল।

“স্যার, আমি জানি না আগামী কয়েক ঘণ্টা আমার সঙ্গে কী হতে চলেছে। রিসার্চ সেন্টার থেকে একজন আমায় জানিয়েছে, তারা আমার তৈরি ট্রিবটের ব্যাপারে খোঁজ নিতে এসেছিল। আমি নিশ্চিত, ওরা এতক্ষণে আমার এই গোপন ঠিকানার হদিশ পেয়ে গেছে। হয়তো এখানে এসেও পড়বে ওরা কিছুক্ষণের মধ্যে।”

“ওরা কারা?” জ্যোতীন্দ্রের কাঁপতে থাকা হাতের উপর স্নেহসুলভ হাত রেখে প্রশ্ন করলেন ধ্রুববাবু।

“ওরা হেনরির টিম। হেনরি স্টেম সেল রিসার্চ প্রজেক্টে জায়গা না পেয়ে বন্ধুত্বের অভিনয় করে বিদেশে বাবার সঙ্গে থাকত। আর কৌশলে বাবার টিমের সব খবর জেনে নিত। জেনোবোটের অ্যালগরিদম হাতে পাওয়ার জন্য হেনরি নিজে কিছু রোবট তৈরি করেছিল৷ পরে হিউবট মানে হিউম্যান স্টেম সেল রোবটের অ্যালগরিদমও হাতিয়ে নিয়েছিল বাবার কাছ থেকে। কিন্তু কোডের শেষ পদক্ষেপ অর্থাৎ দরকারে রোবট ধ্বংস করার পদক্ষেপগুলো বাবা অ্যালগরিদমের শেষে বাংলায় লিখে রেখেছিলেন। তাই হিউবট সে সৃষ্টি করতে পারলেও তার উপর নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি হেনরির জানা ছিল না। তাই সে এদেশে এসে বাঙালি টিম নিয়ে প্রথমে কাজ করছিল। পরে সেই টিমের আর হদিশ পাওয়া যায়নি অবশ্য। এখন যারা ওর সঙ্গে থাকে, তারা ভিন্ন জন।

“হেনরি বিদেশে থাকাকালীন ইন্টারন্যাশনাল হিউবট সেমিনারে বাবাকে মারার জন্য ছক কষেছিল। সেদিন বাবার তৈরি হিউবট বাবাকে বাঁচায়নি৷ প্রাণ হাতে করে বাবা সেখান থেকে পালিয়ে চলে এসেছিলেন আমাদের আগের আস্তানায়। এসে আমায় জানিয়েছিলেন সবটা। মায়ের হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছিলে, মানুষের মতো স্বার্থপর আর কিছুই নেই। তাই তো আমার তৈরি হিউবোটের মধ্যেও গজিয়ে উঠেছিল রিপুর সংক্রমণ। বিপদে মনিবকে রক্ষা না করে সে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার দাবিতে মেতে উঠেছিল।’

“বাবার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছিল সে সময়। আমি চিকিৎসা করাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাবা রাজি হননি। তাঁর মতে, তাতে সারা বিশ্ব জেনে যাবে যে তিনি বেঁচে আছেন, রিসার্চ পেপারের বন্ড ভেঙে দেশে ফিরে এসেছেন। কারণ হিসাবে সবাইকে হেনরির বিরুদ্ধে প্রমাণ দিতে পারতেন না বাবা। সব মিলিয়ে ভীষণ বিধ্বস্ত ছিলেন বাবা। আমার হাতে স্টেম সেল রোবট গড়ার নিজস্ব অ্যালগরিদম তুলে দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই প্রাণত্যাগ করেছিলেন বাবা।

“বাবার শেষকথা ছিল, ‘আর হিউবট নয়, ট্রিবট তৈরি করার চেষ্টা করবি তুই। নির্ভেজাল উপকারী ট্রিবট।’

“আমি আর মা তারপর এখানে চলে এসেছিলাম। আপনার সঙ্গেও যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এখানে আসার পর মাও চলে যান ক’বছরের মধ্যে। আমার সমস্ত একাকিত্বকে আমি গবেষণার কাজে ডুবিয়ে দিই। তার ফলাফল এরা।” বলে হাত দেখিয়ে চারপাশের চলতি ফিরতি গাছগুলোকে দেখাল জ্যোতীন্দ্র। তারপর ধ্রুববাবুর হাতে ফাইলটা দিয়ে বলল, “আপনি এটা নিয়ে এখান থেকে দ্রুত চলে যান স্যার। আজ আমার কিছু হয়ে গেলেও আমি চাই বাবার তৈরি এই অমূল্য অ্যালগরিদম একজন ভালো মানুষের কাছে সুরক্ষিত থাকুক।”

“কিন্তু আমি এই বয়সে…” ইতস্ততভাবে বলা ধ্রুববাবুর কথাটা শেষ হতে পারল না, ঘরের বাইরে থেকে ভেসে এল সমবেত এক যান্ত্রিক শব্দের কোলাহল।

জ্যোতীন্দ্র চটজলদি উঠে দৌড়ে গেল জানালার দিকে। আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “যা ভেবেছিলাম তাই হল। আমার বাউন্ডারি পাঁচিলের বাইরে প্রায় দশ-বারোজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত হেনরির টিম।”

“তারাই এমন শব্দ করছে?” ধ্রুববাবু কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন।

“না। ওদের দেখে প্রতিবাদ করছে আমার তৈরি কার্নিভোরাস ট্রিবট। ওদের কারো মধ্যে আছে ফ্লিপট্যাপ, কারো মধ্যে আছে ড্রসেরা স্টেম সেল। প্রতিরক্ষার কাজে ওরা আমার বাউন্ডারি বরাবর দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু এখন ওরা যে শব্দ করছে, তাতে তো মনে হচ্ছে না ওরা কোনো মানুষকে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বরং ওদের সেন্সর আমায় ভিন্ন শব্দ করে জানাচ্ছে ওদের প্রতিপক্ষ মানুষ নয়।”

জ্যোতীন্দ্রের কথায় বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ধ্রুববাবু বলে উঠলেন, “মানে?”

“আমার যতদূর মনে হচ্ছে, ওরা হেনরির তৈরি হিউবট। হেনরির টিম। হেনরিও পেছনে আছে নিশ্চয়। ওর সঙ্গে অন্যভাবে হিসাব বুঝে নেব। আগে বাবার তৈরি অ্যালগরিদমের শেষ পর্যায়টাকে এখন কার্যকর করতে হবে। আমি কিছুতেই কোনো হিউবটকে আমার তৈরি ট্রিবটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেব না।”

(৭)

“তাহলে হেনরি মৃত?” ধীর, শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন ধ্রুব চ্যাটার্জি।

“প্রীতম আর বিপুল নামক হিউবটদের আমি সেদিন সেমিনারে মিট করেছিলাম। বুঝতেই পারিনি তখন, যে তারা মানুষ নয়। সেদিন ওরা যার হয়ে আমায় তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, আজ ধ্বংস হওয়ার আগের মুহূর্তে তারা আমার কাছে স্বীকার করে গেল, যে তারা হেনরিকে শেষ করে এসেছে। হেনরির মতো স্বেচ্ছাচারী মনিবকে ওরা মেনে নিতে পারছিল না। হয়তো এটাও বুঝতে পারছিল, আমার হাত থেকে অ্যালগরিদম পেয়ে গেলে ওদের মারার সিদ্ধান্তটাও হেনরির হাতে চলে যাবে। তাই…”

“মানুষ এত উন্নত হল, হিউবট গড়ল, ট্রিবট গড়ল, কিন্তু মানুষ লড়াই নামক শব্দটাকে মুছতে পারল না জীবন থেকে। কবে যে মানুষ নিজের মানবিকতা অবলুপ্ত হওয়ার কারণ খোঁজার তাগিদে গবেষণা করবে কে জানে।” ভীষণ হতাশায় ধ্রুববাবু বলে উঠলেন কথাগুলো।

জ্যোতীন্দ্র অনুভব করল, বিগত কয়েক ঘণ্টার যান্ত্রব লড়াই স্যারের মনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ওর নিজের মায়ের কথা ওর খুব মনে পড়ছিল তখন। প্রকৃতির মতো সহজ সুন্দর বন্ধু আর হয় না। একটা অনুশোচনা ওর মধ্যে পাক দিয়ে প্রশ্ন তুলছিল যেন, ‘তুইও বাবার মতো রোবট তৈরির নেশায় মেতেছিলি?’

স্যারের হাতে থাকা অ্যালগরিদমের ফাইলটাকে লক্ষ করে ও বলল, “আজ বড্ড ক্লান্ত লাগছে স্যার। আর গবেষণা নয়। আমি আবার আগের মতো হতে চাই। আপনার বাগানে গিয়ে লজ্জাবতী গাছের পাতায় হাত বুলিয়ে ওর স্বতঃস্ফূর্ত জীবন্ত ছোঁয়া পেতে চাই। এই ফাইল আমার আর চাই না।”

ছাত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরে ধ্রুববাবু বললেন, “চলো, প্রকৃতি মায়ের কোলে ফিরে গিয়ে একটু নির্ভেজাল শ্বাস নিই আমরা।”

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s