গল্প-রাতুলের হিজিবিজি- প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জি -শীত ২০২০

অমনি মিহি গলায় কে যেন পেছন থেকে বলে উঠল, “হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ!”

রাতুল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উলটোদিকে তাকাতেই দেখে একটা বেশ সবুজ রঙের টিয়াচন্দনা পাখি। সে দিব্যি তার দিকে তাকিয়ে মানুষের ভাষাতেই বলে উঠল, “কী খোকা, কৃষ্ণের নাম জানো?”

রাতুল আবার একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কী যে ঘটছে কিছুই মাথায় ঢুকছে না। সকালে কার মুখ দেখে উঠেছে কে জানে, না হলে এইসব ঘটনা ঘটে!

এই রে, আপনাদের কথা তো বেমালুম ভুলে গেছিলাম। কিচ্ছু বুঝতে পারেননি নিশ্চয়ই? না পারারই কথা। আজ সকাল থেকেই রাতুলের কপালটা হেব্বি খারাপ। সকালে উঠেই ব্রাশে পেস্ট নিয়ে ব্রাশটাকে ম্যাজিক ওয়ান্ডের মতো ঘোরাতেই পেস্টের কিছু অংশ সাঁই-ই করে উড়ে গিয়ে পড়ল তার বাবার দামী কালো ফর্মাল শার্টটায়।

রাতুল খুব ভালো ছেলে। কিন্তু ওই মাঝে-মাঝেই মাথার মধ্যে উদ্ভাবনী আইডিয়াগুলো ঘুরঘুর করে। এই তো সেদিন মায়ের সুতির শাড়িটা টেন্ট করতে গিয়ে একটু ছিঁড়ে গেল। তারপর মা পিঠে একটা নতুন স্কেল ভেঙে দিল। আসলে এই বাবা ও মা তার উদ্ভাবনী দিকটা একদম বোঝে না। সেদিন বাবার ফাইলে সুন্দর করে একটা বেড়াল এঁকেছিল। আর তারপর কী ঘটেছিল, সে-ইতিহাস গোপন থাকাই শ্রেয়। আরেকবার ঠাকুমার পানের বাটা থেকে পান চুরি করে খেতে গিয়ে জিভটাই পুড়িয়েছিল চুনে। সে কী কাণ্ড!

আজকে কোনও ঝামেলা না করে দিব্যি গুড বয়ের মতো সুড়সুড় করে স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট করতে বসে যায় সে। তার বরাদ্দ দুধ-বিস্কুট খেতে খেতে দেখে, একজোড়া সরু চোখ তাকে যেন জরিপ করছে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জরিপ করতে-করতেই তিনি বললেন, “আজ কী উলটো-পুরাণ রাতু?”

কেমন যেন সন্দেহের দৃষ্টি। আসলে এই এদের দোষ, সবসময় সন্দেহ করা। রাতুল মুখটাকে যথাসাধ্য নিষ্পাপ করে, জুতো পালিশ করে তারপর জুতো পরতে পরতে বলে, “টিফিনটা নিয়েছি।”

এমন সময় আচমকা বাজখাঁই গলার চিৎকারে ওই মহিলা মানে রাতুলের মায়ের চায়ের কাপ থেকে চা-টা ছলকে মাটিতে পড়ে যায়। গলাটা অবশ্য রাতুলের বাবার। বিড়বিড় করে তিনি অর্থাৎ রাতুলের মা বলেন, “আবার নির্ঘাত কিছু করেছে।”

ততক্ষণে রাতুলের বাবা ওরফে প্রকাশবাবু চিৎকার করে বলছিলেন, “আমার ফর্মাল কালো শার্টে কে পেস্ট লাগিয়েছে? আজ মিটিং আছে! মিনিমাম কমন সেন্স কি নেই?”

রাতুলের কপালটাই খারাপ। দিব্যি সুড়ুৎ করে পালিয়ে যাবে ভেবেছিল, কিন্তু ওই যে, লাক খারাপ।

রাতুল কাঁচুমাচু মুখ করে আস্তে আস্তে পিছোচ্ছিল, হঠাৎ তার মা ক্যাঁক করে তার চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকিয়ে বললেন, “বলি আপদ, রোজ কিছু না কিছু তোকে করতেই হবে! আজ তোকে তক্তা বানাবই। স্বভাব শুধরোবে না তোর? পড়াশোনা তো করিস না। দিন দিন গেছো বাঁদর তৈরি হচ্ছিস।”

অমনি খুনখুনে গলায় রাতুলের ঠাকুমা বললেন, “বৌমা, কতবার বলেছি তোমায় গা, ইস্কুলে যাবার সময় গায়ে হাত দিওনি! এই করে বাছার আমার হাত-পা শুকিয়ে যাচ্ছে।”

ভাগ্যিস ঠাকুমা ছিল। যেই অন্যমনস্ক হয়ে রাতুলের মা মুঠিটা আলগা করেছেন, অমনি রাতুল এক লাফে রাস্তায় নেমে হাঁটতে থাকে।

ওই মহিলা মানে রাতুলের মা গজগজ করতে থাকেন, “আদরে আদরে বাঁদর হয়েছে।”

রাতুল অবশ্য ছাড়া পেয়েই শোঁ-ও-ও করে করে বেরিয়ে যায়। বাড়ি থেকে স্কুল এমন কিছু দূরে নয়। বন্ধু সায়নের সঙ্গে একসঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতেই পৌঁছে যায় ঠিক। অবশ্য আজ হয়তো বরাতটাই খারাপ ছিল। আজ স্কুলেও তার লাক সঙ্গ দিল না।

সে বেশ শান্তভাবেই ক্লাসে বসে ছিল, ঠিক সেই সময় সাঁই-ই করে একটা পাথর তার কানের পাশ ঘেষে বেঞ্চে পড়ে। কাগজে মোড়া ছোট্ট পাথর। কাগজটা খুলতেই দেখল সেটা একটা চিরকুট। চিরকুটে লেখা আছে—

এক যে আছে রাতু
তোরে দেব কাতুকুতু
খায় খালি দুধু ভাতু
করে সবাই আতু পুতু।

পাশে আড়চোখে তাকাতেই দেখে আর্য আর ওর বন্ধুরা ফিকফিক করে হাসছে। বুঝতে বাকি রইল না এ কার কীর্তি। গা জ্বলে উঠল তার। এত বড়ো অপমান! তাও রাতুল মুখোপাধ্যায়কে?

আর্য রাতুলের সহপাঠী। গায়ের জোরে রাতুলের সঙ্গে পারে না। আর খেলাধুলায় কখনও রাতুলের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না।

ক্লাসে কোনও শিক্ষক তখনও আসেননি, থার্ড পিরিয়ড চলছে। চিরকুট পেয়ে রাগে রাতুলের গা গরগর করতে লাগল। রাগের মাথায় এক লাফ দিয়ে সে পাশের বেঞ্চে গিয়ে আর্যকে ধরতেই বেশ একচোট হাতাহাতি হয়ে গেল। আর তাতেই আর্যর হাতটা গেল অনেকখানি কেটে। রাতুলের মাথাটাও সে ঠুকে দিয়েছিল দেওয়ালে, কিন্তু সেদিকে কারও কোন লক্ষ ছিল না।

প্রিন্সিপালের কাছে আর্যর বন্ধুরা গিয়ে নালিশ করতেই তিনি রাতুলকে ডেকে পাঠান। গোল চশমার ফাঁক দিয়ে রাতুলকে দেখে তিনি বললেন, “কী, শ্রীমান রাতুল? এটা কী করেছ?”

রাতুলের বুকের ভেতরটা ভয়ে ঢিপঢিপ করছে। খেলাধুলাতে ভালো বলে স্কুলের প্রিন্সিপাল তাকে বেশ ভালোবাসেন‌। স্যারের গম্ভীর মুখটা দেখে রাতুলের চোখ ফেটে জল এল। সে তাড়াহুড়ো করে বলতে লাগল, “স্যার স্যার, আমি আগে থেকে করিনি। ওই আর্য আমাকে এই চিরকুটটা দিয়েছিল, আপনি দেখুন।”

রাতুল হাতের মুঠোটা খুলতেই দেখে চিরকুটটা ছেড়াফাঁটা, ঘামে ভিজে গেছে। কালিটাও লেপটে গেছে। তিনি সেই কাগজটা দেখে বললেন, “যাই হয়ে যাক, তাই বলে তুমি হাতাহাতি করবে? ওকে আঘাত দেবে? এটা তো অন্যায়।”

এই বলে নোটপ্যাড নিয়ে খসখস করে চিঠি লিখে সেটা দিলেন রাতুলের হাতে। দিয়ে বললেন, “তোমার অভিভাবককে এটা দিও।”

সেদিন রাতুল চুপ করে বসে রইল। আর্যরা হাজার টিটকিরি করে উত্যক্ত করলেও নিশ্চুপ রাতুলকে দেখে একসময় তারাও চুপ করে যায়।

শনিবার হওয়ায় হাফ টাইমের পরেই স্কুল ছুটি হয়ে যায়। স্কুল ছুটির পরেই সবার আগে সে স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়ে। সায়নকে এড়িয়ে একাই চলল। সে জানে সে পড়া করে না, দুষ্টুমি করে, কিন্তু তাই বলে গার্জেন কল? এ-চিঠি বাবার হাতে পড়ার পর কপালে শনি যে ভূত-নেত্য করবে তা সে ভালোমতোই জানে।

পিচ বাঁধানো রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল রাতুল। ছোট্ট শহর পলাশপুর, তাই একাই যাতায়াত করে বাড়ি থেকে স্কুলে। কিন্তু আজ যে তার বাড়ি যেতে মন যাচ্ছে না। ঘরে গেলেই টর্নেডোর ঝড়ে সে কোথায় উড়ে যাবে কে জানে।

এই এক পথ দিয়ে সে যাতায়াত করে রোজ। পথের পাশেই শিবুপিসিদের বড়ো পুকুর। রাস্তার ধার থেকে একটা ঢিল তুলে ছুড়ল পুকুরে। ছোটো বড়ো কত তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল। হঠাৎ দেখল, পুকুরের পাশ দিয়ে সরু একটা লাল কাঁকর বেছানো পথ ওইদিকের জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গেছে। ভীষণ ইচ্ছে করছিল তার জঙ্গলের পথে যেতে। ব্যস, যেই না ভাবা অমনি কাজ শুরু। একটু ভয় লাগলেও আস্তে আস্তে সেই পথে পা বাড়ায় রাতুল। সারি সারি তাল আর নারকেলগাছের সারি। কিন্তু এতদিন এই পথটা কেন দেখতে পায়নি সে। রোজ তো এই পথেই যায়। অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল কীভাবে আর্যকে জব্দ করবে। কখন যে সে এসে পড়ল গাছগাছালি ঘেরা একটা জায়গায়, বুঝতেই পারল না। মাথার ওপরে গনগনে সূর্য থাকলেও গাছগাছালি ঘেরা জায়গাটা বেশ ঠাণ্ডা। ঠাকুমা প্রায়ই তাকে বলতেন, জঙ্গলের ভেতরে নাকি এক আজব দেশ আছে। সেখানে যেন কখনও না যায় সে। রাতুল নিজেই হি হি করে হাসতে হাসতে বলত, “ঠাকুমা, এখনও ছেলেভোলানো গল্প বলছ আমায়? আমি তো বড়ো হয়ে গেছি।”

এদিকে দুপুর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাতুলের পেটের ভেতরের ছুঁচো আর ইঁদুরগুলো ডনবৈঠক দিচ্ছে তখন। চোখের সামনে গরম গরম বেগুনভাজা, রুইমাছের কালিয়া, সরু চালের ভাত সবকিছু মনে পড়ে জিভে জল চলে এসেছিল তার। সুড়ুৎ করে টানল। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই প্রিন্সিপালের ওই অ্যাটম বোম মার্কা চিঠি আর তারপরে বাবার মুখটা মনে পড়তেই মনটা বিচ্ছিরিমতো তেতো হয়ে গেল। চিঠিটা দেবার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে যে কী বিস্ফোরণ ঘটবে সেটা খুব ভালোমতো সে বুঝতে পারছে। অজান্তেই মাথার পেছনে হাতটা চলে গেল রাতুলের। এখনও ব্যথা করছে। সকালে মায়ের চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকানোর পরে ব্যথাটা ছিল। সঙ্গে সঙ্গে আজকের হাতাহাতির সময় মাথাটা খুব জোরে দেওয়ালে ঠুকে দিয়েছিল আর্য। তখনও সেই জায়গাটা দপদপ করছিল, ফুলেও গেছিল। খিদেও পেয়েছে খুব, মনে-মনেই ভাবে, নাহ্‌, বাড়ি সে যাবে না। গেলেই ঝামেলা হবে। বকা খাবে, মার খাবে।

ওখানে আশেপাশে রাতুল ঘুরঘুর করে একটু ডানদিকে যেতেই দেখে একটা বাঁধানো পুকুর, টলটলে জল। পুকুরের জলে হাত-পা ধুয়ে, মুখের জলের ঝাপটা দেয়। কী আরাম লাগে রাতুলের, শরীর জুড়িয়ে যায়। আর তারপরেই ঘটে এই বিদঘুটে ঘটনা।

রাতুলকে চুপ থাকতে দেখে আবার মানুষের ভাষাতেই টিয়াপাখি বলে উঠল, “হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ! বলি এই ফাজিল ছেলে, তুই উত্তর দিলি না যে?”

রাতুল একটু তুতলে বলল, “তুমি কথা বলতে জানো নাকি?”

বিচ্ছিরিমতো খ্যা খ্যা করে হেসে সে বলল, “আজব। কেন কথা বলব না, একা তোমরাই কথা বলবে নাকি? যত পাগলদের কারবার। তোমাকে যে পোশ্নটা কল্লাম, ‘কৃষ্ণ কে’, উত্তর দিলে না তো!”

রাতুল একটু মাথা চুলকে বলল, “ওই তো, লিটিল কৃষ্ণা, দেখেছি তো কার্টুন চ্যানেলে। জানব না কেন? ওই তো মহাভারতের সময়…”

“ইশ, কী দশা! তুমি তো গোমুখ্যু গো! আরে ওই যে শিবুপিসি আছে, ওকে আমি কৃষ্ণের নাম বললেই আমায় নারকেল নাড়ু দেয়। তুমি কীসব মহাভারতের কথা বলছ কিছুই বুঝছি না।”

রাতুল মনে মনে ভাবতে লাগল, শিবুপিসি মানে কি তাদের পাড়ার ওই কিপটে শিবুপিসি? অবশ্য এসব ভাবতে তার মন যাচ্ছে না। টিয়াপাখিটা আবার কেমন চোখ পাকিয়ে বলল, “তা এই মহাভারতটা কী? সেখানে কৃষ্ণ আছে নাকি? উফ্‌, এই ছেলেটা একদম কিছু জানে না। আমরা তো গাছে থাকি, আবার মহাভারত কেন?”

চোখ কপালে তুলে রাতুল। বলল, “তুমি মহাভারতের গল্প জানো না? সে কী যুদ্ধ, কী যুদ্ধ! কী যুদ্ধ!”

বাকিটা আর রাতুলের মনে পড়ছিল না। অমনি টিয়াপাখিটা বলল, “ধুত্তোর, খালি যুদ্ধ আর যুদ্ধ। পড়াশোনা না করলে এইই হয়! এই ছোকরা, আমায় বোকা ভেবেছিস নাকি? এক চড়ে তোর মুণ্ডু ঘুরিয়ে দোব। এখন একহাজার বার কৃষ্ণের নাম জপ কর।” এই বলেই সে আবার বলতে লাগল, “হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ!”

রাতুল ঘাবড়ে গেল তার বকা শুনে। সে মাথা চুলকে ভাবছিল, যত্তসব আপদ। হঠাৎ শুনল টিয়াপাখিটা বলছে, “হরে কৃষ্ণ! তা আপদ কে রে? তুই, না আমি? তা এখানে এলি কী করে?”

আমতা আমতা করে রাতুল বলল, “না না, আমি তো এমনি, মানে রোজ এই পথে ফিরি, আজ দেখতে পেলাম একটা পথ পুকুরের পাশ দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেছে…”

টিয়াপাখিটা ডানা ঝাপটে মুখ ভেংচে বলল, “এমনি এমনি কিছু হয় না। যারা খুব দুষ্টু, তারাই এইখানে আসে। আর তারপরে…”

ঢোঁক গিলে রাতুল বলল, “কী হয় তারপরে?”

উদাস সুরে টিয়াপাখি বলল, “থাকতে হয় এখানে। আর বাড়ি ফেরার রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায় না, যায় না!”

রাতুল বলল, “ধুর বাবা, আমার এসব ভালো লাগছে না। খুব খিদে পেয়েছে।”

রাতুল পুকুরের আশেপাশে একটু ঘুরতে ঘুরতে দেখে ঝোপের পাশেই একটা পেয়ারাগাছ, বেশ ডাঁসা পেয়ারাও ফলে আছে তাতে। তারপর গোটা চার-পাঁচ পেয়ারা পাড়ে গাছ থাকে। গাছের ছায়ায় জুত করে বসেছে, অমনি টিয়াপাখিটা বলে উঠল, “কী নোলা!”

রাতুল হেব্বি রেগে বলল, “যাও যাও, একদম বিরক্ত কোরো না।”

অমনি সে গম্ভীর স্বরে বলল, “হুম হুম, আমায় এখন ধ্যান করতে হবে। হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ!”

এরপর রাতুল যেই না পেয়ারায় কামড় দিতে যাবে অমনি সাঁ-আ-আ করে তার পেয়ারাটা কে যেন কেড়ে নিল। খুব রেগে রাতুল গাছের দিকে তাকাতেই দেখে বেশ কয়েকটা বাঁদর তার দিকে তাকিয়ে বিচ্ছিরিভাবে দাঁত বার করে হাসছে। রাতুল তাদের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচে দিল। অমনি একটা বাঁদর মানুষের মতো গলায় বলে উঠল, “কী হে ছোকরা, একটুও সহবত জ্ঞান নেই?”

রাতুলের তো ভিরমি খাবার জোগাড়। তাও বুকে সাহস এনে বলল, “তোমরা সহবত জানো বুঝি?”

বাঁদরটা বলল, “আমাদের পঞ্চানন গুরুমশাই সব শেখায়। তোমার তো স্কুলে গিয়ে কোনও শিক্ষাই হয়নি দেখছি।” এই বলে আবার ভেংচি কাটে।

রাগে রাতুলের গা পিত্তি জ্বলে গেল। বলে কিনা, তার নাকি শিক্ষা হয়নি! ব্যাগ থেকে গুলতিটা বার করে টিপ করতে যাবে, ঠিক তখুনি হেঁড়ে গলায় কে যেন বলল, “এত কথা কীসের? কম কথা বলো, না হলে সব বুদ্ধি ফস ফস করে বেরিয়ে চলে যাবে মাথার থেকে।”

রাতুল তো হাঁ হয়ে যায়। দেখে, চোখে মোটা চশমা পরে একটা বড়সড় বাঁদর ঠ্যাং ঝুলিয়েছে গাছ থেকে, হাতে একটা লাঠিও আছে। অন্য বাঁদরটা বলে, “আজ্ঞে গুরুমশাই, এই ছোঁড়াটার সহবত নেই একদম, সেই কথাই বলছিলুম।”

চশমা ঠকঠক করে দু’বার গাছের ডালে ঠুকে চোখে পরে গুরুমশাই বললেন, “তা কী করেছে এই ছোকরা?”

“না বলে পেয়ারা খাচ্ছে।”

“বেশ করেছে। এবার বল দিকি কত শতাংশ পেয়ারা খেয়েছে ছোকরা।”

“গোটাটাই ছোঁ মেরে নিয়ে নিয়েছি তো। খেতেই পারেনি।”

তিন-চারটে গাছের পাতা দিয়ে চশমাটা মুছে গুরুমশাই বলেন, “বলিস কী? তাহলে কত শতাংশ খেল সেটা বল।”

বাঁদরটা মাথাটা ঠকঠক করে দু’বার গাছের ডালে ঠুকে বলল, “অনেক কষেছি। মনে হচ্ছে একের তিন ভাগ।”

অমনি গুরুমশাই ঠাস করে একটা বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় কষিয়ে বললেন, “একের তিন কেন হবে? পুরোটাই তো। ওটা তো তোর পেটে।”

রাতুল আমতা আমতা করে বলল, “কিন্তু ওটা তো ভগ্নাংশ, শতকরা কেন হবে?”

গুরুমশাই চোখগুলোকে সরু করে বললেন, “এই ডেঁপো, তুই অঙ্কে কত পেয়েছিস যেন?”

“ফরটি।”

“তাহলে আর জ্ঞান দিতে হবে না। ওটা শতকরাই।”

রাতুলের মাথা খারাপ হয়ে যাবার যোগাড়। কী যে হচ্ছে, কিছু তার মাথায় ঢুকছে না। গুরুমশাই সরু কঞ্চিটা বাকি বাঁদরগুলোর দিকে তাক করে বললেন, “সবাই ইতিহাস পড়, সুর করে।” তারপর লাঠিটা রাতুলের দিকে এগিয়ে বললেন, “কী রে, তুই পড়বি না, নাকি…”

রাতুল তাড়াতাড়ি ইতিহাস বই বার করে পড়তে শুরু করল সুর করে, ‘বহু প্রাচীন কালে মানুষ গুহায় থাকত। গুহার দেওয়ালে তারা ছবি আঁকত। তাদের পূর্বসূরি ছিলেন বাঁদর। দীর্ঘ বিবর্তনের ফলে আজ তা মানুষের রূপ নিয়েছে…’

কথাটা শেষ করেনি অমনি পঞ্চানন গুরুমশাই প্রচণ্ড রেগে বড়ো বড়ো চোখ করে বললেন, “এত বড়ো সাহস, আমার সামনেই বলছে পূর্বসুরি বাঁদর ছিল! এই, তুই এখুনি একশোটা কান ধরে ওঠবোস কর। তাছাড়া তোকে বললাম ইতিহাস পড়তে, তুই তো জীবনী পড়ছিস। না না, তোর পানিশমেন্ট ডবল হবে। তুই চারশোটা কান ধরে উঠবোস কর।”

রাতুল তো ভ্যা করে প্রায় কেঁদেই ফেলে। কিন্তু সে খুব সাহসী কিনা, তাই আস্তে আস্তে বলে, “একশোর ডবল তো দুইশো হয়।”

অমনি গুরুমশাই বলেন, “আবার মুখে মুখে কথা! শাস্তি দ্বিগুণ হবে।”

সমস্বরে সবাই বলে, “দ্বিগুণ হবে, দ্বিগুণ হবে।”

অমনি বাঁদরটা এক লাফে রাতুলের সামনে এসে মাথায় মারে এক চাটি। বলে, “বুদ্ধিসুদ্ধি তো নেই, গোবর-পোরা।”

কাঁদো কাঁদো স্বরে রাতুল বলে, “দেখুন, বইয়ের সামনে ইতিহাস লেখা আছে।”

অমনি সব বাঁদরগুলো খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে থাকে। একসঙ্গে বলে, “গোবর-পোরা, গোবর-পোরা!”

এসময় একখানা বক জল খেতে আসে ঐ পুকুরে। এসে বলে, “কীসের এত হাসাহাসি?”

“এই ছোকরা সহবত জানে না, পড়াশোনাও জানে না।”

বক বেশ গম্ভীর স্বরে বলে, “আসলে সব মায়া। তা এই অঙ্ক আর ইতিহাস জেনে লাভটা কী? অনুলোম বিলোম করো। ধ্যান করো। অবশ্য তোমরা কুয়োর ব্যাঙ এসব বুঝবে না। আমি থাকি আকাশে, তাই সব দেখতে পাই।”

অমনি পঞ্চানন গুরুমশাই বলেন, “এই শোনো বক, বেশি বকবক কোরো না। পারো না, সেটাই বলো।”

“তুমি তো বাজে বকবক করো বুড়ো বাঁদর! বলো তো আকাশ কীভাবে পরিমাপ করবে, আর আকাশের ভূগোল কী?”

“এ আর এমন কঠিন কী?” এই বলেই বাঁদরটা বেশ কয়টা গাছে লাফালাফি করল। তারপর একটা কাঠি নিয়ে মাটিতে অনেক আঁকিবুঁকি কাটল। আবার মুছল, আবার আঁকল। একবার করে মাথা চুলকায়, আরেকবার করে আঁকিবুঁকি কাটে। তারপর গম্ভীর মুখে বলল, “এই যে আমি সাড়ে এগারোটা গাছে লাফালাফি করলাম, তার স্পিডের গড় বের করে গুণ করতে হবে। তারপর ধরো তোমার কাছে কিছু নেই, আর তখন তোমায় যদি বাঘে তাড়া করে তুমি কেমন করে ছুটবে? সেই গতিবেগ দিয়ে গুণ করতে হবে। তারপর…”

এই বলে সে চুপ করে রইল। আবার খানিক সময় পরে বলে, “তারপর…”

রাতুল অধৈর্য হয়ে বলল, “তারপর কী হবে?”

“তারপর কিছুই নেই। আকাশ মানে তো শূন্য। আর শূন্যকে কিছু দিয়ে গুণ করলে শূন্য আসবে।” এই বলেই সে একাই হেসে লুটোপুটি খেতে থাকে। তাকে দেখে বাকি বাঁদররাও হাসতে থাকে।

আস্তে আস্তে রাতুল এক পা এক পা করে পিছোতে থাকে। হঠাৎ দেখে একটা কালো কুচকুচে কুকুর রাজকীয় ভঙ্গিতে হেলতে দুলতে এসে বসল। তারপর দিব্যি মানুষের ভাষায় বলল, “ঝগড়া করেই গেল।” রাতুলের দিকে তাকিয়ে সে বললে, “নতুন নাকি? তা তুমিও কি ঝগড়া করছ?”

ফস করে রাতুলের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “মায়ের কাছে যাব।”

অমনি মুখটা ভীষণ গম্ভীর করে সে বললে, “মা? তুমি বলো তো মা শব্দ কোথা থেকে এসেছে? কী বললে, মা? উফ্‌, চোখে জল চলে এল।”

এই বলে সে ভেউ ভেউ করে কেঁদে নিল। তারপর বলল, “মা আমায় কেতো বলে ডাকত। এই খোকা, মা শব্দটা কোথা থেকে এসেছে বলতে হবে না, বলো তো মা শব্দের ক্রিয়া কী হবে।”

রাতুল বলল,  “জানি না। আমি মায়ের কাছে যাব।”

অমনি বকটা কুকুরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “এই কেতো, জানিস না শিশুদের মানসিক চাপ দিতে নেই? দিলে চোদ্দপুরুষ নরকবাস, আর পাঁচবার চাবুক খেতে হয়। বাছা তোমায় পড়তে হবে না। তুমি ভগবানের কথা শোনো, আত্মিক উন্নতি হবে।”

অমনি হাসি থামিয়ে পঞ্চানন গুরুমশাই ঝাঁপিয়ে পড়ে বলেন, “তার জন্য অঙ্ক জানতে হবে, ভূগোল জানতে হবে। পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা সে, আবার বকবক করছে!”

“চোওওওপ! তুমি এই ঈশ্বর-দেবতার কী বোঝ হে পঞ্চানন? ক’টা বাঁদরকে পড়িয়ে ভাবছে কেউকেটা হয়ে গেছি।” এই বলে বকপাখি ডানা ঝটপট ঝটপট করতে লাগল

“হ্যাং ইওর দেবতা, ভাষাটাকেই গুরুত্ব কেউ দিল না। সব উচ্ছন্নে গেছে একেবারে!” এই বলে কেতো গরগর করতে লাগল।

ওরা তিনজন মিলেই ঝগড়া করতে শুরু করেছে। নিরুপায় রাতুল করুণ চোখে একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে তাকায়। বাঁদরগুলোর হাসি শুনে রাতুল তাকিয়ে দেখে, তার ব্যাগটা নিয়ে ঐ হতচ্ছাড়া বাঁদরগুলো লোফালুফি করছে। রাতুল চিৎকার করে বলল, “হেড স্যারের চিঠি আছে, আমার ব্যাগটা দাও! বাবা চিঠি না পেলে খুব মারবে। আমার ব্যাগটা দাও বলছি।”

রাতুল একদৌড়ে ব্যাগটা নিয়ে টানাটানি করতে করতে থাকে। দড়ি টানাটানির মতো একদিকে সে অন্যদিকে বাঁদরগুলো। পঞ্চানন ঝগড়া ভুলে এই দড়ি টানাটানিতে রেফারির মতো বকবক করতে  থাকে, আর বকটা তাকে তখনও বলে যাচ্ছে কীভাবে অনুলোম বিলোম করতে হবে। হঠাৎ টানাটানি করতে গিয়ে রাতুল এমন হ্যাঁচকা টান দিয়েছে যে ব্যাগের হাতল ছিঁড়ে গিয়ে ব্যাগটা নিয়ে রাতুল মাটিতে পড়ে গেল। আর তারপর…

তার মনে হল অনেক দূর থেকে যেন শোনা যাচ্ছে, “বাবা, ও বাবা, ও সোনাই, রাতুল সোনা!”

আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখে তার মুখের সামনে কতগুলো উদ্বিগ্ন মুখ। সেগুলো যেন তার বাবা, মা, ঠাকুমার মুখের মতো। ধড়মড় করে উঠে বসে চারদিকে তাকাতেই দেখে, সে তাদের বাড়ির বারান্দায় শুয়ে আছে। ডাক্তারবাবুও দাঁড়িয়ে আছেন। রাতুলের বাবা প্রিন্সিপালকে বললেন, “ভাগ্যিস ও-পাড়ার জগা আজ বনের মধ্যে গিয়েছিল। সে-ই তো ওকে খুঁজে পেয়েছে, গাছের তলায় ঘুমিয়ে ছিল।”

রাতুল কাঁদো কাঁদো মুখে বলে, “বাবা, স্যার চিঠি দিয়েছিলেন। ওই আর্যর সঙ্গে মারপিট করেছি, সেজন্য। এই দেখো।”

রাতুলের বাবা গম্ভীর মুখে চিঠিটা খুলে পড়লেন। তারপর কিছু না বলেই পকেটে রাখলেন চিঠিটা।

রাতুলের মা আর বাবা দু’জনেই তাকে সেই রাত্রে অনেক আদর করে খাইয়ে দেন, ঘুম পাড়ান। সেও লেপটে থাকে।

এরপর থেকেই রাতুল বড়ো শান্ত হয়ে গেল। প্রকাশবাবু আর তাঁর স্ত্রীও ছেলের এহেন পরিবর্তনে একটু চমকে গেলেন। মনে মনে অবশ্য খুশি হলেন। রাতুল এখন মন দিয়ে পড়ে, স্কুলে মারপিট করে না। প্রকাশবাবু ভেবেছিলেন, ওই চিঠির পরেই রাতুল নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। কিন্তু রাতুল তো কিচ্ছু ভোলেনি, সেইদিনের সব ঘটনাই  মনে আছে। ওই যে টিয়াপাখিটা বলেছিল, ‘আর বাড়ি ফেরার রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায় না, যায় না!’

সেদিন রাত্রিবেলায় সে তার ব্যাগটা চেক করে দেখেছিল, ব্যাগের একটা হাতল ছেঁড়া আর পেয়ারাগুলো তখনও ছিল। সে জানে তার বাবা-মা এই গল্প বিশ্বাস করবে না। এই গল্প সে তার কোনও বন্ধুকেও বলেনি। শুধু চুপিচুপি ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, বনের মধ্যে আজব দেশ আছে কি নেই। ঠাকুমা তার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলেছিলেন, “বিশ্বাস করলে সব আছে, না হলে কিছুই নেই।”

অলঙ্করণ:অংশুমান দাশ

জয়ঢাকের গল্পঘর

7 thoughts on “গল্প-রাতুলের হিজিবিজি- প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জি -শীত ২০২০

  1. ও প্রিয়াঙ্কা দেবী , আমি যে আপনার ফ্যান হয়ে গেলাম । উম্মাহ !

    Like

  2. ❤️বাঃ, বড্ড ভালো ভাগলো। বড় সুন্দর উপস্থাপনা। বড় মায়াময় লেখা। চাইল্ড সাইকোলজিটা দক্ষ হাতে ফুটিয়ে তুলেছো। ভালো লাগলো ❤️ আরও লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s