গল্প -অকাজের জিনিস-অদিতি ভট্টাচার্য্য-শীত ২০২০

অদিতি ভট্টাচার্য – র সমস্ত গল্প

সকালবেলাতেই মেজাজটা একেবারে খিঁচড়ে গেল হৃষীকেশ পাকড়াশির। সবে কিছু দরকারি কাগজপত্র নিয়ে নিজের গদি আঁটা পেল্লায় চেয়ারটা টেনে বসেছেন, চোখ গেল সামনের সেন্টার টেবিলটার দিকে। টেবিলের মাঝখানে একখানা জয়পুরী ফুলদানি রাখা থাকে। সেটার গায়ে লাল, নীল, সবুজ, বেগুনি—হরেক রঙের ঝুটো পাথর বসানো। মাঝখানের লাল পাথরটা সবচেয়ে বড়ো। হৃষীকেশের কপাল কুঁচকে গেল। চেঁচিয়ে উঠতেই যাচ্ছিলেন, এমন সময় চেয়ারের কাছে এসে খুব নীচু স্বরে অমর বলল, “একটা কথা বলব কাকু?”

“কী কথা?” জলদগম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন হৃষীকেশ, কপাল সেইরকমই কুঁচকোনো।

“মার শরীরটা একেবারে ভালো যাচ্ছে না, জ্বরও এসেছে। যদি কিছু টাকা দেন…” কিন্তু কিন্তু করে বলল অমর।

“একটা পয়সা দেব না, একটাও না!” গর্জে উঠলেন হৃষীকেশ। চেয়ার থেকে উঠেও পড়লেন। “এত অন্যায় করে আবার পয়সা চাওয়া হচ্ছে?”

অমর হকচকিয়ে গেল। মাস তিনেক কাজে ঢুকেছে, এর মধ্যে হৃষীকেশের স্বভাব সম্পর্কে যে একেবারেই কোনো ধারণা হয়নি তা নয়, তাই বেশ ঘাবড়ে গেল। তবে জিজ্ঞেস করতেও ছাড়ল না, “আমি আবার কী অন্যায় করলাম?”

“অন্যায় করে আবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে? যেন কিছুই জানো না, বোঝো না, তাই না?” হৃষীকেশের তর্জন গর্জন থামারই নাম নেই।

“কী করলাম বলবেন তো!” অমরও নাছোড়বান্দা।

“বেরিয়ে যা বলছি, এক্ষুনি বেরিয়ে যা। আমি আর তোকে কাজে রাখব না। এই মুহূর্তেই ছাড়িয়ে দিলাম তোকে। যা চলে যা, দোকানেও যাবি না।” কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে হাঁফাতে হাঁফাতে আবারে চেয়ারে বসে পড়লেন হৃষীকেশ।

অমর কয়েক মুহূর্ত হৃষীকেশের দিকে তাকিয়ে দেখল, তারপর আস্তে আস্তে চলে গেল। খুব খারাপ লেগেছে ওর, বিরক্তও হয়েছে খুব। নাহয় ওরা গরিব মানুষ, তাই বলে এরকম করে কথা বলতে হবে? আর অন্যায়টা যে কী করল তা তো বুঝলই না।

হৃষীকেশ জ্বলন্ত চোখে অমরের চলে যাওয়া দেখলেন, তারপর আবার টেবিলের দিকে তাকালেন। ব্যাপার আর কিছুই নয়। টেবিলের ওপর যে ফুলদানিটা আছে তার যেদিকটায় পাথর বসানো সেদিকটা হৃষীকেশের চেয়ারের দিকে করে রাখতে হয়। হৃষীকেশ ঘুম থেকে উঠে পুজো সেরে চা-বিস্কুট খেয়ে এই চেয়ারে বসে প্রথমেই ফুলদানিটাকে দেখবেন। ফুলদানি মানে ফুলদানির গায়ের পাথরগুলো। চেয়ারে বসেই ওগুলো দেখতে না পেলে নাকি ওঁর দিনটা ঠিক সুবিধের যায় না। আজ এ ঘরে আসার আগে অমরকে টেবিলটা ঝাড়পোঁছ করতে দেখতে পেয়েছেন। কাজেই ফুলদানি যে ঘুরে গেছে ওর ঝাড়পোঁছের চোটে সে তো বলাই বাহুল্য। রাগ সেই জন্যেই। তার ওপর আবার চেয়ারে বসামাত্রই টাকা চাইল। আজ বৃহস্পতিবার, আজ যে হৃষীকেশ টাকা দেবেন না সে কথাটাও কি অমর জানে না? তাছাড়া সকালের জলখাবার খাওয়ার আগে এধরনের কোনো কোথা শুনতেও উনি পছন্দ করেন না। কারুর যদি টাকাপয়সার দরকার হয় তাহলে হৃষীকেশের জলখাবার খাওয়া শেষ হলে তারপর বলতে হয়। নয় নয় করে তিন মাস কাজ করছে অমর, এসব নিয়মকানুন জানে না? মালিকের মেজাজ-মর্জি মানবে না? তাহলে তার আর এখানে কাজ করারই কোনো দরকার নেই। বাড়িতে বা দোকানে নতুন কেউ কাজে বহাল হলে তাকে পাখিপড়া করে সব নিয়মকানুন বোঝাতে হয়।

বাড়ির ক্ষেত্রে সে কাজটা করেন চৈতালি মানে হৃষীকেশের স্ত্রী আর দোকানে করেন বহু দিনের পুরোনো কর্মচারী সুবল সাহা। এঁর যথেষ্ট বয়স হয়েছে, হৃষীকেশও এঁকে মানেন, ইনি কিছু বললে সেটা মনঃপূত না হলে অন্তত চেঁচামেচিটা করেন না। শোনেন, তারপর নিজে যা ভালো বোঝেন তাই করেন। আজ যে সাধনা বস্ত্রালয়ের এত রমরমা, শুধু এ শহরে নয়, পাশের শহরেও একখানা ব্রাঞ্চ খুলে ফেলেছেন। সেটাও বেশ চলছে, নতুন-পুরোনো দোকানের সঙ্গে দিব্যি পাল্লা দিচ্ছে। তার পেছনে এই সুবলের অবদান অস্বীকার করতে পারেন না হৃষীকেশ। তাই এইটুকু সম্মান দেন।

অমরের মা অনেক বছর হৃষীকেশদের বাড়িতে কাজ করেছে। আজকাল খালি খালি অসুস্থ হয়ে পড়ে বলেই মাস দেড়েক আগে কাজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। অমর অবশ্য তার আগেই দোকানের কাজে ঢুকেছে। তবে হৃষীকেশ মাঝেমধ্যে তাকে বাড়িতেও আসতে বলেন। আসবাবপত্র, জানালা-দরজা ঝাড়পোঁছ করাই অমরের কাজ। দোকান খুলতে খুলতে সেই দশটা, তার আগেই বাড়ির কাজ সেরে নেয় অমর। আজ তো একেবারে কাজ থেকেই বরখাস্ত হয়ে গেল, দোকানের কাজখানাও গেল।

হৃষীকেশ কিছুক্ষণ ফুলদানিটার দিকে তাকিয়ে থেকে সেটাকে ঠিক করলেন, মানে যেদিকটাতে পাথরগুলো বসানো আছে সেটা নিজের সামনে আনলেন। তারপর চোখ বন্ধ করলেন। করে ওইভাবেই চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন। দু-পা এগোলেন, তারপর চোখ খুলেই ঘর থেকে চলে গেলেন। বোধ হয় চোখ বন্ধ করে বেশি চলাফেরা করা উচিত নয় ভেবেই—চতুর্দিকে জিনিসপত্র তো কম নয়, ঠোক্কর খেতে কতক্ষণ? আবার তক্ষুনিই এ ঘরে এসে ঢুকলেন। এসেই প্রথমে ফুলদানিটাকে ভালো করে দেখলেন, তারপর ধীরেসুস্থে চেয়ারে বসে কাগজপত্র দেখতে লাগলেন।

হৃষীকেশ পাকড়াশির বাতিকের চোটে বাড়ির লোকজন অতিষ্ঠ। কোন জিনিস কোথায় কীভাবে রাখতে হবে, কখন কী করতে হবে, কখন কোন কাজ একেবারেই করা যাবে না, কখন কী বলা যাবে আর কখন কী বলা যাবে না তার ফিরিস্তি লম্বা। মনে রাখতেই রাখতেই সকলে হিমশিম খায়।

এই তো সেদিন, সোফায় পাঁচটা কুশনের বদলে চারটে কুশন রাখা হয়েছিল, তাই নিয়েই হুলস্থুল পড়ে গেছিল বাড়িতে। এর আগে নাকি কবে একদিন সোফায় চারটে কুশন ছিল, সেদিন নাকি হৃষীকেশের টাকার ব্যাগ থেকে কী করে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট হারিয়ে গেছিল। কোথাও পড়ে-টড়ে গেছিল আর কী। তখন খেয়াল করেননি, পরে দোকানে গিয়ে বুঝে যা কাণ্ড শুরু করেছিলেন সে আর বলার নয়। তারপর থেকে সোফায় পাঁচটা কুশন রাখা শুরু হয়েছে। অথচ তার আগে-আগেও যে বরাবর চারটে কুশনই ছিল, তখন তো টাকা হারায়নি, সেটা আর ওঁকে বোঝানো গেল না।

“পাঁচটা কুশন, কীরকম বিচ্ছিরি দেখতে লাগছে। তার থেকে দুটো থাক বরং।” চৈতালি বলেছিলেন।

“না না, পাঁচটাই থাকবে, পাঁ-চ-টা, বুঝেছ?” গাঁক গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন হৃষীকেশ।

অতএব সেই থেকে পাঁচটা কুশনই রাখা আছে।

যত দিন যাচ্ছে, হৃষীকেশের বাতিক তত বাড়ছে। সবাই বলে, তবে আড়ালে, ওঁর কান বাঁচিয়ে। যমজ মেয়ে ওঁদের, কলেজে পড়ে তারা। কিন্তু দুজনের কেউই বাড়িতে থাকে না। মেসে থেকে পড়ে। অথচ কলেজ যে বাড়ি থেকে খুব দূরে তা কিন্তু মোটেই নয়।

“বাব্বা, বাড়ি তো নয়, যেন জেলখানা! এই কোরো না, ওটা ওখানে রেখো না, সেট এরকম করে রাখো! এখানে মানুষ থাকতে পারে!” দু-মেয়েরই এক বক্তব্য।

অতিকষ্টে তারা ক্লাস টুয়েলভ অবধি বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেছে, কিন্তু তারপর আর নয়। উচ্চ মাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে ঢুকেই তারা একথা ঘোষণা করেছিল।

হৃষীকেশ একেবারেই আপত্তি করেননি। মেয়েদুটো দিন-কে-দিন যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। সবেতেই তাদের খালি হিহি হিহি! কোনোকিছু মানতে চায় না। সকালবেলা কোনো গানবাজনা কানে আসুক এ ঘোরতর অপছন্দ হৃষীকেশের। সকালবেলা, অন্তত দোকানে যাওয়ার আগে তো ওসব তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। আশেপাশে কোথাও লাউড স্পিকার বাজলে তিনি বাড়ির দরজা-জানালা সব এঁটে রাখেন। তাতেও কাজ না হলে কানে তুলো গোঁজেন।

বাড়ি থেকে ক’টা বাড়ি দূরে বিয়েবাড়ি। সেখানে গান বাজছে। খুব জোরে নয়। জানালা বন্ধ করে তার আওয়াজ আটকানো গেছে। হৃষীকেশ বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে কাগজপত্র নিয়ে বসেছিলেন। এমন সময় ঝড়ের মতো দুই বোন ঘরে ঢুকেই ফটাফট জানালাগুলো সব খুলে দিল। একগাল হেসে একজন আরেকজনকে বলল, “নে নে শোন, তোর ফেভারিট গান হচ্ছে।”

হাড়ে চটেছিলেন সেদিন হৃষীকেশ। সারাক্ষণই তো ফোন নিয়ে কানে তার গুঁজে বসে থাকে। তিনি না থাকলে বাড়িতে জোরে জোরে গানও বাজে, সে খবরও আছে তাঁর কাছে। তার ওপরেও কোথায় বিয়ে বাড়িতে গান বাজছে, সেটা না শুনলে নয়?

“জানালা বন্ধ কর, এক্ষুনি বন্ধ কর বলছি!” হৃষীকেশ চেঁচিয়ে উঠেছিলেন।

সেই চিৎকার শুনে চৈতালি ছুটে এসেছিলেন। হৃষীকেশ তখন হাত-পা নেড়ে বিকট চেঁচামিচি জুড়েছেন, “একটা কাজ করার উপায় নেই। সর্বনাশ হয়ে যাবে যে সে বোধবুদ্ধি নেই এদের! একেবার হয়ে গেলে তখন কী করবি শুনি? গান শোনা তখন বেরিয়ে যাবে, বুঝলি? দেখব তখন কত ফূর্তি থাকে।”

“কী সর্বনাশ হবে বাবা?” মেয়েদের কোনো ভয়ডর নেই।
চৈতালি এসে অতিকষ্টে দু-পক্ষকে শান্ত করে জানালা আবার বন্ধ করলেন, তারপর মেয়েদের নিয়ে ঘর থেকে গেলেন।
ওদিকে হৃষীকেশ তখন চেয়ারে বসে পড়ে, “ওরে বাবা, প্রেশারটা মনে হচ্ছে ধাঁই ধাঁই করে বেড়ে গেল! এত অশান্তি! আজ না ডাক্তারের কাছে ছুটতে হয়! কেউ একটা কথা শুনবে না! আমাকে একটুও তিষ্ঠোতে দেবে না!” করছেন।
“অত চেঁচামিচি করলে প্রেশার এমনিই বাড়বে। হয়েছেটা কী? জানালাই তো খুলেছে। এখন কেউ জানালা বন্ধ করে রাখে? দেখো তো সব বাড়ির জানালা খোলা।” চৈতালি না বলে পারেননি।
হৃষীকেশ আবার হাঁউমাউ করে কী বলতে যাচ্ছিলেন, মেয়েরা, “চলে এসো মা, চলে এসো।” করে তাঁকে টেনে নিয়ে গেল।
হৃষীকেশ কাগজপত্র রেখে চোখ বন্ধ করে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে শুরু করলেন। এতে নাকি মন শান্ত হয়। কাগজপত্র দেখার আগে মন শান্ত করা দরকার।
মেয়েরা কিন্তু নাছোড়বান্দা। তারা পরেরদিন সকালে দোকান খোলার আগেই সুবলের কাছে গিয়ে হাজির হয়েছিল। সুবলের বাড়ি খুব দূরে নয়।
“সুবলজেঠু, একটা কথা বোলো তো, একদম ঠিক করে বলবে কিন্তু। ভাসা ভাসা উত্তর দিলে চলবে না।”
“কী কথা মা?” এত সকালে ওদের বাড়িতে আসতে দেখেই সুবল বুঝেছেন কিছু হয়েছে।
“গতকাল কি দোকানে কিছু হয়েছে?” মেয়েদের প্রশ্ন।
“না তো, কী হবে?” সুবল খুব অবাক হলেন।
“না মানে, ধরো কোনো গোলমাল, না, ঠিক গোলমালও নয়, মানে এমন কিছু যাতে বাবার মেজাজ খারাপ হয়? মানে ধরো বিক্রিবাটা কি তেমন হয়নি?” মেয়েরা দুজনে পরিষ্কার করে সুবলকে বোঝাল।
“না, সেরকম তো কিছু নয়। প্রত্যেকদিন কি আর একইরকম বিক্রি হয় রে মা? তার তো কমবেশি হয়ই। বলতে নেই, কাল বরং ভালো হয়েছে। তিনটে বিয়ের পার্টি এসেছিল, বিয়ের বাজার করল। এখন তো লগনসা চলছে, এই সময়টা মা লক্ষ্মীর কৃপায় বিক্রিবাটা মন্দ হয় না। কিন্তু তোরা এসব জিজ্ঞেস করছিস কেন বল তো?”
ওরা সব বলল।
শুনে সুবল একচোট হাসলেন। তারপর বললেন, “তোদের বাবার বাতিক ক্রমেই বাড়ছে দেখছি। বেড়ে বেড়ে একখানা অসুখের মতো হয়ে গেছে এখন। দোকানেই কি কম কাণ্ড করে নাকি? এই তো ক’দিন আগে কী করল শুনবি? গাঁটরি গাঁটরি মাল এসেছে। ট্রাক থেকে নামিয়ে সেসব দোকানে ঢোকানো হয়েছে। তারপর সেগুলো থেকে খুলে খুলে সব সাজিয়ে রাখা হবে। তোদের বাবা বলেছে আগে শাড়িরগুলো খুলতে। দেখিয়েও নাকি দিয়েছিল কোনগুলো শাড়ির গাঁটরি আর তার মধ্যে কোনটা আগে খুলতে হবে। কোনটা খুলবে সেও বাছার নিয়ম আছে। সব শাড়ির গাঁটরি পরপর রাখা থাকবে, ও তার সামনে গিয়ে আগে সেগুলো ভালো করে দেখবে, কী যে দেখে তা তো জানি না। তারপর চোখ বন্ধ করে একটাতে আঙুল ঠেকাবে। যে-কোনো আঙুল নয়। ডানহাতের তর্জনী আর তার পরের আঙুলটা জোড়া করে ঠেকাবে, এই যে দেখ, ঠিক এরকম করে।” সুবল দেখালেন।

দেখেশুনে মেয়েদের চক্ষুস্থির। “তারপর?” তারা জিজ্ঞেস করল।

“তারপর সেই গাঁটরিটাই আগে খুলতে হবে। তা এবার একটু গোলমাল হল। সবসময় শাড়ি কোনগুলোতে, জামাকাপড় কোনগুলোতে বোঝা যায় না। ট্রাক ভাড়া করতে হয়, একসঙ্গে অনেক জিনিসই আসে। তোদের বাবাও বুঝতে পারেনি। কিন্তু সে কি আর বললে শোনে? যাই হোক, তোদের বাবা আঙুল ঠেকিয়ে চলে গেছে, কী দরকারি ফোন এসেছিল। সে আবার দোকানের যে-কোনো জায়গায় ফোনে কথা বলে না, জানিস তো? ফোনে কোথা বলারও তার একটা জায়গা আছে। সেখানে ছাড়া সে কথা বলে না। কথা বলে যখন আবার এদিকে এল, ছেলেটা খুলে ফেলেছে দু-তিনটে গাঁটরি। তার একটাতেও শাড়ি নেই। তোদের বাবা তো কুরুক্ষেত্র শুরু করল। সে নাকি ও-তিনটের একটাতেও আঙুল ঠেকায়নি। ওদিকে ছেলেটা বলছে ওরই একটাতে ঠেকিয়েছে। সে যে কী কাণ্ড হচ্ছিল। অনেক কষ্টে তাকে ঠান্ডা করা হয়েছিল সেদিন।”

“কী করে ঠান্ডা করলে?”

“তখনো ভালো করে খোলা হয়নি। আবার কোনোরকম সব ভেতরে ঢুকিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখা হল। ভালো করে কি আর মুখ বন্ধ করা যায়? একখানা বিছানার চাদর নিয়ে এসে চাপা দেওয়া হল সেগুলোর ওপর। তারপর তোদের বাবা আবার অনেক ঘুরে ঘুরে সব দেখেশুনে আরেকটা বাক্সতে আঙুল ঠেকাল। তার সামনেই তক্ষুনি সেটা খোলা হল। আমিই খুললাম। সেটায় শাড়ি ছিল। দেখে তার কী উল্লাস! সে যদি দেখতিস। সে নাকি আগেরবারও এটাই বেছেছিল, ছেলেটা গোলমাল করেছিল, তার বক্তব্য এই।” বললেন সুবল।

“তবে গতকাল যে কিছু হয়নি এই কথাটাই বাবাকে গিয়ে বলতে হবে।”
ওরা চলে গেল।
“তুমি যে কীসব উদ্ভট উদ্ভট কাণ্ড করো না বাবা!” বাড়ি ফিরেই মেয়েরা শুরু করল।
তখন হৃষীকেশ দোকানে বেরোবেন বেরোবেন করছেন।

“কাল গান শুনে কী হয়েছে? কিচ্ছু হয়নি। আমরা সুবলজেঠুর কাছ থেকে সব জেনে এসেছি, কাল দোকানের বিক্রি ভালোই হয়েছে। কী, ঠিক তো? যত্ত সব কুসংস্কার!”

হৃষীকেশ হাড়ে চটলেন। বাড়ি থেকে দোকানে বেরোবার পাঁচ মিনিট আগে থেকে তিনি কথা বলেন না। কাউকে কিছু বলতে হলে ইশারায় বলেন, ফোন এলেও ধরেন না। তাই মেয়েদিকে কটমট করে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

“এটা একেবারে তোমার উচিত কাজ হয়নি সুবলদা। মেয়েরা গেল এর তুমিও একেবারে বেচাকেনার সব হিসেব দিয়ে দিলে! এটা কি ঠিক? ভালো বিক্রি হচ্ছে, অনেক বিক্রি হচ্ছে এসব কোথা কি বলা উচিত? এতে যে মা লক্ষ্মী রুষ্ট হন সেও জানো না! এতদিনের মানুষ তুমি, তোমার কাছ থেকে এ আমি আশা করিনি।” দোকানে গিয়ে সুবলকে বলেছিলেন হৃষীকেশ।

সুবলও ভালো মানুষের মতো মুখ করে বললেন, “তুমিই বা এটা কী বললে? আমাদের অনেকদিনের পরিচয়, সেই ছোটোবেলা থেকে। মেসোমশাই যখন দোকান খুললেন, তার কিছুদিন পর থেকেই আমি আছি। বলতে গেলে তুমি আর আমি একসঙ্গেই এই দোকানে আসছি। তুমি সেটা মানো। কর্মচারী হলেও তুমি আমাকে মানিগন্যি করো সে আমি ভালোই জানি। সে তোমার মহত্ত্ব। কিন্তু দোকানের মালিক যে তুমি সেটাই বা আমি কী করে ভুলি বলো? মালিকের সন্তানও হল গিয়ে মালিকের তুল্যই। তাই তারা কিছু জিজ্ঞেস করলে আমি না বলি কী করে বলো?”

এ যুক্তি শুনে হৃষীকেশ সন্তুষ্ট হলেন। না, ভুল তো কিছু বলেননি সুবল। হাজার হোক, তিনি মালিক আর সুবল কর্মচারী। সত্যি কথা হচ্ছে, ওঁর মেয়েদুটোই চূড়ান্ত অবাধ্য। সুবল বয়সে ওঁর থেকে বড়ো, কিন্তু তাও মালিক বলে ওঁকে এত সম্মান দেন আর ওঁর নিজের মেয়েরা বাবা বলে বিন্দুমাত্র মানে না! উলটে বাবার সব বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে প্রমাণ করবে বলে সাতসকালে সুবলের বাড়িতে অবধি হানা দিয়েছে! এরা যে কী! এদের জন্যেই সমাজ উচ্ছন্নে যাচ্ছে।

অমর চলে গেছে, কিন্তু হৃষীকেশের মেজাজ ভালো হল না।

“অমরকে তাড়ালে কেন? ছেলেটা ভালো ছিল, বিশ্বাসীও।” জলখাবার খেতে খেতে চৈতালি জিজ্ঞেস করলেন।

“তাড়ালাম কেন মানে?” খিঁচিয়ে উঠলেন হৃষীকেশ, “আরো আগেই তাড়ানো উচিত ছিল। এর আগে একদিন দেখেছিলাম ফুলদানিটা ঘুরে গেছে। সেদিন অল্প ঘুরেছিল, আজকের মতো পুরো উলটো হয়ে যায়নি। সেদিন আমি আড়চোখে দেখে বুঝতে পেরেই চোখ বন্ধ করে ঠিক করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ আর সর্বনাশ আটকানো গেল না। এখন জানি না সারাটা দিন কী করে কাটবে। মা লক্ষ্মী, দয়া করো মা!” খেতে খেতেই চোখ কপালে তুলে মা লক্ষ্মীকে ডাকতে শুরু করলেন হৃষীকেশ।

“এই কারণে ছেলেটাকে একেবারে কাজ থেকে ছাড়িয়েই দিলে?”

“এই কারণে মানে? তোমার কি এটাকে খুব সামান্য কারণ মনে হচ্ছে নাকি? তুমি ওকে বলে দাওনি সব?”

“কী, ওই ফুলদানির কথা? মনে হচ্ছে তো বলেছিলাম।”

“মনে হচ্ছে তো! তুমি বলছ মনে হচ্ছে তো! এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুমি মনে রাখতে পারো না! তাহলে আর কী হবে?” হাহাকার করে উঠলেন হৃষীকেশ।

“লিস্টে থাকলে বলে দিয়েছি।” নির্বিকার স্বরে কথাক’টা বললেন চৈতালি।

বাড়ির প্রতি ঘরে একখানা তালিকা আছে। এ-ফোর সাইজের কাগজে দু-ভাগ করে লেখা। ডুস অ্যান্ড ডোন্টস। কম্পিউটারে টাইপ করে প্রিন্ট-আউট বার করে তার অনেকগুলো ফটোকপি করানো হয়েছে। মেয়েরাই করে দিয়েছে। চৈতালি মনে রাখতে পারতেন না, সেই জন্যে এই ব্যবস্থা। গুরুত্ব অনুযায়ী এক দুই তিন করে লেখা।

“কই, দেখি লিস্ট।” হৃষীকেশের ততক্ষণে খাওয়া হয়ে গেছে।
“ওই তো রয়েছে ওখানে, জলের বোতলের পাশে।”
হৃষীকেশ লিস্ট হাতে নিয়ে দেখলেন, “এই তো তিন নম্বরে রয়েছে।”

“তাহলে বলেছি। বললামই তো, লিস্টে থাকলে নিশ্চয়ই বলেছি। লিস্ট দেখে দেখেই তো বলি। এ বয়সে এত আর মুখস্থ রাখতে পারি না।” চৈতালি তেমনই ভাবলেশহীন।

হৃষীকেশ বিরক্ত হলেন। দুঃখও পেলেন। তাঁর নিজের লোকেরাই তাঁর এত জরুরি বিষয়কেও গুরুত্ব দেয় না। মনোকষ্টেরই কথা। তবে এখন এ নিয়ে কথা বলার সময় নেই। এখন দোকানে বেরোতে হবে, তার অন্তত পাঁচ মিনিট আগে থেকে নীরবতা পালন প্রয়োজন। হৃষীকেশ তাই চুপ করে গেলেন।

স্নান সেরে পুজো করছিলেন চৈতালি। ঠাকুরের সিংহাসনের পাশে মেঝেয় একটা লাল ভেলভেট ঢাকা একটা ছোটো কাঠের টুল। আর সে টুলের ওপর একটা পেতলের ছোটো ডিবে। চ্যাপ্টামতো। সে ডিবে কেউ ধরতে পারে না, খুলতে তো পারবেই না। হৃষীকেশের কড়া নিষেধ। অনেক বছর আগেকার কথা। হৃষীকেশ একদিন কোন এক মন্দির থেকে ঘুরে এসে এই ডিবে টুলের ওপর রেখে বলেছিলেন, “এটা কেউ ছোঁবে না, যেমন আছে তেমন থাকবে। কেউ টুলও নড়াবে না।”

সেই মন্দিরে এক সাধুবাবা থাকতেন। তাঁর সঙ্গে হৃষীকেশের এক বন্ধু হৃষীকেশের দেখা করিয়ে দিয়েছিলেন। হৃষীকেশ তখন নিজের ব্যাবসার উন্নতি নিয়ে খুব চিন্তিত। সাধুবাবা ওঁকে দুটো সোনার গিনি, একটা পেতলের কৌটো, একটা কাঠের টুল আর টুল ঢাকা দেওয়ার মতো লাল রঙের ভালো কাপড় নিয়ে আসতে বললেন। সোনার গিনির বদলে রুপোর কয়েন হলেও চলত, তবে সোনার গিনি হলে নাকি ফল ভালো পাওয়া যাবে। হৃষীকেশকে তার জন্যে চিন্তা করতে হয়নি, গিনি গোটা চারেক বাড়িতেই ছিল। হৃষীকেশের ঠাকুমা গিনি দিয়ে নাতির মুখ দেখেছিলেন। হৃষীকেশ ততক্ষণাৎ তার দু-খানা নিয়ে সাধুবাবার কাছে গেলেন। অন্যসব জিনিস জোগাড় করা তো এমন কিছু ব্যাপার নয়। সাধুবাবা এগারো দিন সেসব নিজের কাছে রেখেছিলেন। তার মধ্যে ভালো দিন দেখে যাগযজ্ঞও করেছিলেন। তারপর এগারো দিনের দিন কীসব দুর্বোধ্য মন্ত্র পড়তে পড়তে হৃষীকেশের সামনে গিনি দু-খানা ডিবেতে ভরে তাঁর হাতে দিলেন। বললেন, “এবার বাড়িতে গিয়ে ঠাকুরের সিংহাসনের পাশে এই টুলের ওপর এটা রেখে দাও। ঠিক দশটা সাতান্ন মিনিটেই করবে। কাপড় ঢাকা দিয়ে টুলটা আগে থেকে রেখে দাও। ডিবেটা ঠিক দশটা সাতান্ন মিনিটে টুলের ওপর রাখবে। তোমার উন্নতি কেউ রুখতে পারবে না। আমার কথা মিলিয়ে নিও। তবে কেউ যেন কোনোদিন ভুলেও এই ডিবে না ছোঁয়, টুল না নড়ায় বা ডিবে না খোলে। তাহলে কিন্তু সর্বনাশ। ব্যাবসা পড়তে সময় লাগবে না।”

হৃষীকেশ ভক্তিভরে সব জিনিসপত্র নিয়ে সাধুবাবাকে মোটা প্রণামী দিয়ে বাড়ি এলেন। তারপর সাধুবাবার কথামতো ঘড়ি ধরে সবকিছু করলেন। সেই থেকে সোনার গিনি সমেত সেই কৌটো ঠাকুরঘরে টুলের ওপরে রয়েছে। এর ওপরে হৃষীকেশের অসীম ভক্তি। সাধনা বস্ত্রালয়ের এত উন্নতি যে এই কারণেই, তা উনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। ব্যাবসায় উন্নতির জন্যে উনি কি পরিশ্রম কিছু কম করেছেন? মোটেই না। দিনরাত এক করে খেটেছেন, ওঁর সঙ্গে সুবলও। কিন্তু পরিশ্রম করলেও কি আর সবসময় আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়, না সবাই পায়? তাই এই টুল আর পেতলের কৌটো স্পর্শ না করার কথা লিস্টের একেবারে এক নম্বরেই লেখা আছে।

চৈতালি অবশ্য মানেন না। এত ধুলো পড়ে যায় থেকে থেকে, না পরিষ্কার করলে চলে কখনো? উনি পুজোর করার সময়ে মাঝে মাঝে তাই পরিষ্কার করে দেন। হৃষীকেশ তখন বাড়িতে থাকেন না। টুলের ঢাকাও আরো গোটা দুই করিয়ে রেখেছেন—এক রঙের, এক কাপড়ের। সেটাও বদলে দেন মাঝে মাঝে। তবে কৌটো কখনো খোলেননি। হৃষীকেশ একবার বলেছিলেন, “পেতলের ডিবেটা কীরকম চকচক করে সবসময় দেখেছ? অথচ অন্য বাসনকোসন তো দেখি থেকে থেকে কীরকম কালো কালো হয়ে যায়।”

“এ কি সাধারণ জিনিস? সাধুবাবার মন্ত্রপূত জিনিস। এর কত ক্ষমতা, সাধারণ ধুলোবালি এর কী করবে?” যথাসাধ্য গম্ভীর হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন চৈতালি।

হৃষীকেশ শুনে খুশি হয়েছিলেন। যাক, এতে অন্তত চৈতালিরও পূর্ণ বিশ্বাস আছে তাঁরই মতো।

আজও পুজো করার পর কৌটোটা হাতে নিলেন পরিষ্কার করবেন বলে। মনটা আজ একেবারে ভালো নেই। অমর বেচারা বিনা দোষে কাজটা খোয়াল। এত খারাপ ব্যবহারও করলেন হৃষীকেশ যে বলার নয়। কিন্তু ওঁকে এ নিয়ে কিছু বলতে যাওয়া বৃথা। অমরকে একবার দেখা করতে বলেছেন চৈতালি। আসবে এর একটু পরেই। এসব সাতপাঁচ ভাবনায় মন অন্যমনস্ক ছিল, কৌটোটা হাত থেকে পড়ে গেল। মেঝেতে ঠুকে গিয়ে ঢাকাটার একটা পাশ খুলে গেল। চৈতালির কৌতূহল হল। এত বছর যা করেননি, তাই করলেন। ঢাকাটা খুলেই ফেললেন আর ফেলে যা দেখলেন তাতে চক্ষুস্থির হয়ে গেল। কোনোরকমে আবার ঢাকাটা বন্ধ করে কৌটোটা টুলের ওপর রেখে দিলেন। রাখতে গিয়ে হাতটা কেঁপে গেল। কৌটোর ভেতর টং টং আওয়াজ হল।

অমর এসেছিল চৈতালির সঙ্গে দেখা করতে, কিন্তু তাকে কাজে বহাল করা সম্ভব হয়নি। তবে হৃষীকেশের ব্যবহারের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন চৈতালি। বলেছেন, “জানিসই তো তো কাকুর কাণ্ডকারখানা। কী যে এক বাতিকগ্রস্ত লোক! আমার তো হয়েছে যত জ্বালা! নিজেও ছাই মনে রাখতে পারি না আর ভয়ে ভয়ে থাকি এই বুঝি কিছু হল। তুই কিছু মনে করিস না বাবা। আমি সুযোগ বুঝলেই তোকে আবার ডাকব। ক’টা দিন যাক, দেখি কী করতে পারি। এই ক’টা টাকা রাখ, মাকে ভালো ডাক্তার দেখা।”

দিন কাটছে। হৃষীকেশ বেশ আছেন নিজের গাদাগুচ্ছের বাতিক নিয়ে। বরং অমর যে আর কাজ করে না এতে তিনি খুশি। ছেলেটা বড়ো ইয়ে, ফুলদানি ঘুরিয়ে রেখেছিল! এখন একজন নতুন পরিচারিকা যোগ দিয়েছে কাজে। চৈতালি তাকে পাখিপড়া করে সব বুঝিয়েছেন। সে কাজও ভালো করছে। এই ক’দিনে একবারও ফুলদানি ঘুরে যায়নি, জলখাবার খাওয়ার আগে কেউ টাকাপয়সা চায়নি, সোফায় পাঁচটা কুশনই আছে সবসময় ইত্যাদি ইত্যাদি, দোকানেও কোনো গোলমাল হয়নি। হৃষীকেশের মেজাজ তাই ভালো। কাগজপত্রগুলো দেখে সব টেবিলে রেখেছেন, চৈতালি এলেন। বিনা বাক্যব্যয়ে পেতলের কৌটোটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন।

হৃষীকেশ হায় হায় করে উঠলেন। উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, “এ তুমি কী সর্বনাশ করলে! জানো না ও কৌটো ছুঁতে নেই! আর তুমি কিনা তাকে টুলের ওপর থেকে উঠিয়ে এখানে এনে একেবারে খুলে ফেললে! এ কী করলে তুমি? এখন আমার বিজনেসের কী হবে? এরকম রমরম করে চলা দোকানগুলো তো শেষ হয়ে যাবে একেবারে! আমার সব পরিশ্রম জলে যাবে! সাধুবাবা তেমনই বলেছিলেন। এ তোমার কী মতিভ্রম হল? কেন করলে এ সর্বনাশ?”

“সর্বনাশ যা হওয়ার তা অনেক আগেই হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও যখন দোকান চলছে তখন এখনো কিছু হবে না।” চৈতালি বললেন, “এখন হায় হায় করা বন্ধ করে কৌটোর ভেতর কী আছে সেটা দেখো বরং।”

অতি সন্তর্পণে হৃষীকেশ উঁকি মারলেন। আর মেরেই চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলেন, “এ কী! গিনি কোথায় গেল? এ তো দেখছি দুটো একটাকার কয়েন! সাধুবাবা আমার সামনে দুটো গিনি পুরে কৌটো বন্ধ করে আমার হাতে দিয়েছিলেন।”

“সে আমি জানি। কৌটোর জোরে ব্যাবসার উন্নতি হয়েছে কি না বলতে পারব না, তবে সাধুবাবা গিনি যে সরাননি সে আমি জানি।”

“তাহলে? তাহলে কে সরাল? আর তুমিই বা কৌটো খুলেছ কেন?”

“আশ্চর্য তো! কৌটো না খুললে জানা যেত কি যে ভেতরে গিনির বদলে একটাকার কয়েন আছে? সেদিন পরিষ্কার করতে গিয়ে হাত থেকে পড়ে গেছিল। হ্যাঁ, আমি বরাবরই পরিষ্কার করি কৌটোটাকে। এত বছর ধরেই করে আসছি, কিন্তু খুলিনি কোনোদিন। সেদিন পড়ে গিয়ে ঢাকাটার একটা পাশ খুলে গেল, আমারও দেখার ইচ্ছে হল আর দেখলাম এই।”

“কোনদিন?” চোখমুখ কুঁচকে প্রশ্ন করলেন হৃষীকেশ।

“যেদিন তুমি অমরকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিলে সেদিন।”

“জানতাম, আমি জানতাম সেদিন যে এরকম একটা কিছু হবে। হবে না? ফুলদানি ঘুরে গেছিল যে! এসব অমরের জন্যে। ওর জন্যেই এত বড়ো সর্বনাশ হল আমার। ওকে আমি ছাড়ব না।”

“কী বলছ আবোলতাবোল? ফুলদানি ঘুরে গেছিল বলে সোনার গিনি একটাকার কয়েন হয়ে যাবে? বরং সেদিনই তো জানতে পারলাম যে এই কাণ্ড হয়েছে আর এর পেছনে কার হাত। গিনি তো তার আগেই চুরি হয়ে গেছে আর চোর বুদ্ধি করে দুটো একটাকার কয়েন রেখে দিয়েছিল কৌটোতে, যাতে নড়লে চড়লে শব্দ হয়, আমাদের সন্দেহ না হয়। দেখেছে তো আমাকে টুলের কাপড় পালটাতে, কৌটো পরিষ্কার করতে, তাই এই বুদ্ধি।”

“কার হাত? কে করেছে?”

“বিন্নির মা। লোভ সামলাতে পারেনি। এতদিন কাজ করছে একটা কিছু এধার ওধার করেনি, হঠাৎ এত অধঃপতন কেন হল কে জানে! অনেকদিনের পুরোনো লোক, তাই ওতে কী আছে সেও জানে। শুনেছে কোনো সময়ে কারুর কাছ থেকে। আর তোমার বাতিকের কল্যাণে যে ও-কৌটো খোলা হবে না তাও জানে। ব্যস, নিয়ে নিতে আর অসুবিধে কোথায়? সেদিন কিন্তু ফুলদানি ঘুরে যায়নি। তবে যখন কাজটা করছিল তখন অমর দেখে ফেলেছিল। দেখেও বলেনি কিছু। সংকোচ করছিল মনে হয়। তার দু-দিন পরেই তুমি ওরকম যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে ওকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিলে। আমি দেখা করতে বলেছিলাম। এসেছিল। তখন মনের দুঃখে, রাগে বলেই ফেলল, ‘যে চুরি করল তার কিছু হল না আর আমাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিল কাকু!’ তারপরেও কি আর নাম বলতে চায়? অনেক চাপাচাপিতে বলল শেষ অবধি।”

“আর বললেও কী হবে! আমার সর্বনাশ তো হয়েই গেল! আমার ঠাকুমার দেওয়া গিনি। ঠাকুমা নেই, তাঁর স্মৃতি তো ছিল। এখন তাও গেল।” আবার চেয়ারে বসে পড়লেন হৃষীকেশ।

“যায়নি। এই যে তোমার গিনি, এই নাও।” চৈতালি দিলেন গিনিদুটো।

“পেলে কী করে?”

“বিন্নির মাকে পরিষ্কার বললাম যে তার কীর্তির কথা আমার জানতে বাকি নেই। যদি ভালোয় ভালোয় ও-দুটো ফেরত দেয় তো ভালো, নাহলে থানাপুলিশ হবে। ছাড়ব না। লোভে পড়ে চুরি করেছিল, কিন্তু ভয়ে কোথাও বেচতে পারেনি। ফিরিয়ে দিয়ে গেল। কাল থেকে অমর আবার দোকানে যাবে। দরকার হলে বাড়িতেও আসবে। আমি খবর পাঠিয়েছি। কী উপকারই না করল ছেলেটা! ভাগ্যিস ফুলদানিটা ঘুরে গেছিল! তাই তো সেদিন কৌটোটা খুললাম আমি!”

হৃষীকেশ কিছু বললেন না। গিনিদুটো হাতে নিয়ে উদাস চোখে সামনে তাকিয়ে রইলেন।

***

হৃষীকেশের মেয়েরা এখন বাড়ি থেকে কলেজে যাতায়াত করছে। বাড়ির প্রতি ঘরে ঘরেও এখন আর লিস্ট নেই। শুধু একটা ওরা রেখে দিয়েছে পুরোনো দিনের স্মৃতি হিসেবে। গিনিদুটো আলমারিতে ঢুকে গেছে, যদিও খালি কৌটোটা এখনো ঠাকুরঘরে টুলের ওপর রাখা আছে। ওটা সরানো হয়নি। সাধুবাবাকে এতটা অমান্য করা নাকি উচিত হবে না। তবে ফুলদানিটা হৃষীকেশ বিদেয় করেছেন। কারুর কথা শোনেননি, অমরকেই দিয়ে দিয়েছেন ওটা। ফুলদানি নাকি বড়োই অকাজের জিনিস, খালি জায়গা জুড়ে থাকে।

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s