গল্প-উত্তরাধিকার-রাজীব কুমার ঘোষ-বসন্ত ২০২১

সন্ধ্যা ভট্টাচার্য গল্প প্রতিযোগিতা ২০২০(পঞ্চম থেকে অষ্টম স্থান)

এক
গোলাপের দিন

যদি বলি দু-হাজার উনিশ সালে ডিসেম্বর মাসে চিনের উহানে সেই অদ্ভুত ফ্লু ছড়িয়ে পড়া আর গোটা দুনিয়া অতিমারীর কবলে যাবার চার বছর আগে থেকেই আমরা কয়েকজন স্কুলের ছাত্র জানতাম এই বিপর্যয় আসতে চলেছে তাহলে আমাদের কী ভাববে সবাই! অথচ কথাটা সত্যি, ভয়াবহভাবে সত্যি।

একটা ধাঁধা দিয়ে আমাদের কাহিনিটা শুরু হতে পারে অথবা একটা ধাঁধার সমাধান খুঁজে পাওয়া দিয়ে। তবে যেভাবেই শুরু করি, থাকবে গোলাপ আর বৃতি। থাকব আমি—রাজীব, রোহন আর রিশান। স্কুলে আমাদের ডাকা হয় থ্রি আর—রিডিউস, রিইউস আর রিসাইকল। ক্লাস সিক্সে সায়েন্স স্যার ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের চ্যাপ্টার পড়ানো পর থেকেই আমাদের এই নাম। এর পেছনে ছিল আমাদের যত ফেলে দেওয়া, বাতিল জিনিস সংগ্রহ আর সেইসব দিয়ে নানা মডেল তৈরির চেষ্টা। আগে ধাঁধা, তারপর ধাঁধার সমাধান। আমাদের অবিশ্বাস্য কাহিনির শুরুটা অন্যরকম করা যাক। ধাঁধার সমাধান দিয়েই শুরু করা যাক। কোনো অসুবিধা নেই, কারণ দুটো ধাঁধা আলাদা।

সেদিন ছিল গোলাপের দিন, ভ্যালেন্টাইন সপ্তাহের হ্যাপি রোজ ডে। দিনটা সাত ফেব্রুয়ারি, দু-হাজার কুড়ি। স্কুল থেকে ক্লাস ইলেভেন আর টুয়েলভ সায়েন্স সেদিন সায়েন্স সিটিতে। আমরা টুয়েলভ। ডায়নামোশন হলে নানা স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ে সুযোগ বুঝে গোলাপটা ইলেভেনের সর্বাণীকে দেবার চেষ্টায় ছিল রিশান। আমরা ছিলাম ওর সহযোগিতায়। প্রচেষ্টা আশাতীতভাবে সফল হবার পর আমরা দুজন যখন রিশানের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিলাম, তখনই দেখেছিলাম বৃতিকে। ওকে দেখে অসুস্থ লাগছিল, মুখ ফ্যাকাশে আর স্থির চেয়ে আছে একটা বোর্ডের দিকে। আমরা যেতেই ও আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, “তোদের বলেছিলাম না! এই দ্যাখ, এই বিপদের কথাই আমরা ডেসিফার করেছিলাম ক্লাস এইটে।”

আমরা নির্বাক তাকিয়ে ছিলাম বোর্ডটার দিকে। এইট থেকে আমাদের এই বিপদের কথা বলে বলেই কি প্রায় পাগল করে দিয়েছিল বৃতি? পৃথিবীর একটা ম্যাপ যার বুকে জায়গায় জায়গায় লাল মাথা পিন ফোটানো। আশেপাশে চোখ চালিয়ে আমরা দেখলাম হলের এই কোণটায় নভেল করোনা ভাইরাসের খবর নিয়ে একটা তথ্যমূলক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, সায়েন্সের পড়ার চাপে তখন আমরা অত খবর রাখতাম না, তাছাড়া একমাস পরেই ফাইনাল। হালকা নাম শুনলেও সেই প্রথম আমরা ভালোভাবে জানলাম কোভিড-১৯ সম্পর্কে। পর পর ডিসপ্লে বোর্ড। ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে তোলা এন কোভ পার্টিকেলের ছবি, রোগ লক্ষণের ফিরিস্তি, সতর্কতা অবলম্বনের পদ্ধতি।

আমরা দেখছিলাম আর বৃতির কথাটা যাচিয়ে নিচ্ছিলাম, এই কি সেই? আমাদেরও মুখ শুকিয়ে আসছিল। মনের ভেতর কোথাও একটা অবিশ্বাস বরাবরই ছিল, এই সবই বৃতির পাগলামো—ওর পর্যবেক্ষণগুলোর কোনো দাম নেই আর পর্যবেক্ষণগুলো ঠিক হলেও ওর সিদ্ধান্তগুলো ভুল। আমাদের মাথার মধ্যে তখন ঘুরছিল বৃতির আঁকা শয়ে শয়ে এ-ফোর কাগজগুলো। রংবেরঙের আঁকিবুকি বুকে নিয়ে কাগজগুলো মনে হচ্ছিল আমাদের ঘিরে ধরেছে, ঝাপটা মারছে। চার বছর ধরে যে ধাঁধা বৃতি তৈরি করেছিল, সত্যি করেই কি এটাই তার উত্তর?

দুই
পিঁপড়ের গতিবেগ

প্রথম ধাঁধার দিনটাও ছিল গোলাপের দিন। হাই স্কুলে ক্লাস সিক্সে প্রথম দিন। স্কুল থেকে আমাদের প্রত্যেককে একটা গোলাপ দেওয়া হয়েছিল। আমি রোহন আর রিশান এক স্কুল থেকে এসেছিলাম। নতুন স্কুলে সেদিন যে ছেলেটি আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল, সে বৃতি। তার প্রশ্নটা ছিল সরল—একটা পিঁপড়ে কতটা জোরে চলতে পারে?

আমরা যখন বিভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়ের গতিবেগ নিয়ে তর্ক শুরু করেছি, তখন বৃতি ব্যাপারটাকে ধাঁধার চেহারা দিয়েছিল। বৃতি বলেছিল, পিঁপড়ে নাকি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ তিনশো মিটার যেতে পারে। তারপর ব্যাপারটা গুলিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘পিঁপড়েটা তো আসলে পৃথিবীর ওপরে, আর পৃথিবী ঘণ্টায় এক হাজার মাইল পথ পাড়ি দিচ্ছে।’ আরো জটিল করে দিয়ে বলেছিল, ‘আমাদের সৌর জগৎটা ঘণ্টায় চার হাজার তিরাশি মাইল গতিতে গ্যালাক্সিতে ঘুরে চলেছে।’ এই তথ্য হজম করতে না করতেই বলেছিল, ‘এমনকি গ্যালাক্সিটাও তো ঘুরছে তেরো লক্ষ মাইল প্রতি ঘণ্টা হিসাবে। তাহলে একটা পিঁপড়ের গতিবেগ কী দাঁড়ায়!’

বৃতির সঙ্গে ক্লাসের কারো কখনো খাপ খায়নি, আমাদের সঙ্গেই যা কথা বলত। আসলে ও বোধ হয় আমাদের বাতিল ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে নানা মডেল তৈরির পাগলামোটাকে পছন্দ করত। প্রথম দিন থেকেই আমরা বৃতির পিঁপড়ে বাতিকের কথা জেনে গেছিলাম। ওর জগৎটা পিঁপড়ে দিয়ে তৈরি। পিঁপড়ে সম্পর্কে ওর জানার আগ্রহ ছিল লাগামছাড়া। পিঁপড়ে নিয়ে ওর নানা অদ্ভুত কথাবার্তা আমরা মন দিয়েই শুনতাম। কথাগুলো উড়িয়ে দিতে পারতাম না।

সেভেন ক্লাসে একদিন আমরা বৃতির বাড়ি গেলাম। অনেককালের বাড়ি এখন শরিকি ভাগে বিভক্ত। আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখলাম বাড়ির বড়ো বাগানের মধ্যে একটা ঘরকে বৃতির পড়ার ঘর বানিয়েছে, আসলে সেটা একটা পরীক্ষাগার বলা চলে। সেদিন বৃতি ওর কাজের কথা আমাদের বলেছিল। আমরা কথা দিয়েছিলাম ওর কাজ গোপন রাখব আর যথাসাধ্য ওকে সাহায্য করব।

সেদিন বৃতির কাজটাকে খুব একটা আহামরি মনে হয়নি, বিশেষ কিছু মনে হয়নি। বৃতি বিভিন্ন পিঁপড়ের সারিকে অনুসরণ করত। তাদের পথের ম্যাপ আঁকত। ওদের সেই বাগান আর বাড়ির আনাচে কানাচে পিঁপড়েরাই ছিল ওর পরীক্ষার বিষয়।

সেদিন বিষয়টার গুরুত্ব বোঝাতে বৃতি আমাদের অনেক কথা বলেছিল। বলেছিল, গোটা দুনিয়াতেই নাকি পিঁপড়েদের চলার পথের বিন্যাস নিয়ে গবেষণা হয়। শুধু জীববিজ্ঞানীরাই যে করেন তা নয়, পদার্থবিদ্যা থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানেও কাজ হয়। এই চলার পথগুলো নাকি নানা ম্যাথেমেটিক্যাল প্যাটার্ন। আমরা শুনে তাজ্জব হয়েছিলাম যে এই প্যাটার্ন, মাইক্রো রোবটদের দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় জীবাণু সাফ-সাফাইয়ের কাজের প্রোগ্রাম তৈরিতে লাগে।

বৃতিকে আমরা খুব গম্ভীরভাবে যেমন নিতে পারিনি সেদিন, আবার উড়িয়েও দিতে পারিনি। টেবিলের ওপর বৃতি বিছিয়ে ধরেছিল ধবধবে সাদা এ-ফোর কাগজের রাশি। প্রতিটি কাগজে নানা রঙের কালি দিয়ে অজস্র আঁকিবুকি। ওগুলো পিঁপড়ের চলার গতিপথের ম্যাপ। সেদিন আমরা কি ভাবতে পেরেছিলাম এক বিপজ্জনক আবিষ্কারের দিকে আমরা পা বাড়িয়েছিলাম! আজ মনে হয় সেদিন বৃতির ওই পরীক্ষাগারে না গেলে আমাদের কাছে দিনগুলো আগের মতোই থাকত। এখন করোনার ভয়ে দিন কাটাতাম। করোনা হয়ে মরার আতঙ্ক আমাদের আবিষ্কারের ফলাফলের আতঙ্ক থেকে কম। এই অভিশপ্ত আবিষ্কারের জ্ঞান আমাদের চেনা জগৎটা বরাবরের মতো বদলে দিয়েছে। জীবন আর আমাদের কাছে আগের মতো নেই।

তিন
সমষ্টিগত বুদ্ধিবৃত্তি ও একটি উত্তপ্ত ডিসকোর্স

আজ আর মনে নেই সেদিন কেন ব্রেক টাইমে ছুটি হয়ে গিয়েছিল। তবে মনে আছে আমাদের একটি উত্তপ্ত আড্ডা। এর মধ্যেই বৃতি আমাদের কয়েকটা জিনিস ওর পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্য দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছিল। যেমন ও দেখিয়ে দিয়েছিল একটা পিঁপড়ের চলার গতি আরেকটা পিঁপড়ের সঙ্গে দেখা হবার পর এবং নিজেদের মধ্যে স্পর্শ বিনিময় করার পর বদলে যায়। আমাদের মধ্যে রিশান উৎসাহিত হয়ে বৃতিকে একটা ক্যামেরা কিনে তাতে কীসব যন্ত্র জুড়ে দিয়ে দিল। খুব সহজেই সেই ক্যামেরা দিয়ে বৃতি আরো নিখুঁতভাবে পিঁপড়েদের গতিবেগ মাপতে পারছিল। ওর আবিষ্কার করা তথ্যটাকে আবার আমরা ভেরিফাই করলাম রিশানের ক্যামেরার সহায়তায়। দেখলাম বৃতি নির্ভুল বলেছে। রিশান ব্যবসায়ী বাড়ির ছেলে, টাকা ওর কাছে কোনো সমস্যা ছিল না। আমার আর রোহনের পরিবারেরও অবস্থা ভালো। আমরাও সাহায্য করতে লাগলাম। রিশানকে সঙ্গত দিল রোহন। ওর ফিজিক্সে খুব উৎসাহ। একের পর এক যন্ত্র ওরা উদ্ভাবন করতে লাগল পিঁপড়েদের চলাফেরা চিহ্নিত করার জন্য। আমি বায়োলজির দিকটা ঘাঁটাঘাঁটি করতে থাকলাম। আর এইসবই আমরা করতে শুরু করেছিলাম ক্লাস সেভেনেই।

আমরা দেখেছিলাম, পিঁপড়েরা কয়েক ধরনের পদ্ধতি কাজে লাগায়। বাসা থেকে বেরোনোর সময় ওরা বাসা থেকে দূরত্বের একটা হিসাব রাখে। আমাদের এও মনে হতে থাকল, পিঁপড়েরা চোখে দেখেও পথের হিসাব রাখে। পরে ক্লাস নাইনে পড়ার সময় এটা আমরা প্রমাণ করে ফেলেছিলাম। আমরা এও লক্ষ করেছিলাম, কোনো পিঁপড়েকে যদি পথভ্রান্ত করে দেওয়া যায় তাহলে সে উলটোপালটাভাবে ছোটাছুটি করে না। এদিক সেদিক যাবার মধ্যে পরিষ্কার একটা প্যাটার্ন দেখা যায়। এইভাবেই আমরা পিঁপড়েদের জগতে ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছিলাম। কিন্তু সেদিন হঠাৎ ছুটির মওকায় নদীর ধারে যে ঘোরতর আলোচনা হয়েছিল তাতে স্পষ্ট হয়ে গেছিল বৃতি পিঁপড়ে বিষয়ে তার আসল কাজ আমাদের থেকে তখনো গোপন করে রেখেছিল।

সেদিন বৃতি বলেছিল, পিঁপড়েদের পক্ষেও একটা সভ্যতা গড়ে তোলা সম্ভব, আর বলাও যায় না ওরা হয়তো গড়েও তুলেছে। আমি বলেছিলাম, একটা সভ্যতা গড়ে তুলতে লাগে বুদ্ধিমত্তা আর প্রযুক্তি। বৃতি বলেছিল, আমি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছি যে ওদের বুদ্ধিমত্তা নেই। রোহন বলেছিল সভ্যতার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তি দরকার তা দীর্ঘ স্মৃতি দাবি করে। পিঁপড়ের ছোট্ট ব্রেন কতটা তথ্য সঞ্চয় করতে পারে। বৃতি বলেছিল, আমাদের বুদ্ধিমত্তার উৎস নিউরন, স্নায়ুকোষ। অজস্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক কোষগুলো যদি সমষ্টিগতভাবে দীর্ঘ স্মৃতির আধার আর বুদ্ধিমত্তা গড়ে তুলতে পারে তাহলে প্রতিটি পিঁপড়ে কি একইভাবে একটা সমষ্টিগত বুদ্ধিমত্তা গড়ে তুলতে পারে না? রিশান বলেছিল, বৃতি কি বলতে চাইছে গোটা পিঁপড়ের কলোনিটাই একটা সমষ্টিগত স্মৃতি ও বুদ্ধিমত্তার ধারক ও বাহক?

আমরা বুঝতে পেরেছিলাম বৃতি এবার তার আসল কথা বলবে। কিন্তু সেই আসল কথা শোনার পরে আমরা এতটাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম যে বেশ খানিক্ষণ লেগেছিল আবার তর্কের জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে।

বৃতি বলেছিল, সে নিশ্চিত যে পিঁপড়েদের এই চলাফেরার প্যাটার্ন বা ছক নির্দিষ্ট। আমরা যে ভাবছি খাবারের জন্য ওরা এইভাবে চলছে, সেটা ঠিক, কিন্তু সেই চলাটাও ওরা হিসাব কষে করে। আসলে কোনো পিঁপড়ের চলাটাকে এককভাবে দেখলে হবে না। ওদের এই চলাফেরাকে বলা চলে সমষ্টিগত গতিশীলতা।

এই পর্যন্ত সমস্যা ছিল না। এরপরেই বৃতি আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়ে বলল, ওর বিশ্বাস, পিঁপড়েদের এই চলাফেরার ছকের মাধ্যমে পৃথিবীর বাইরের কোনো একটা সভ্যতা আমাদের কিছু বার্তা পাঠাচ্ছে। কিছু সময় নিস্তব্ধতা আমাদের গ্রাস করেছিল আর তারপরেই আমরা একসঙ্গে প্রায় চেঁচিয়ে উঠেছিলাম।

চার
অপার্থিব ইশারা

সেদিন আমাদের যাবতীয় আপত্তি, যুক্তি বৃতির যুক্তির কাছে টেকেনি। বৃতি বলেছিল, “তোরা কি জানিস, ওয়ারলেস ডিভাইসগুলো যেমন মোবাইল, কর্ডলেস ফোন, ওয়াই ফাই—পিঁপড়েদের ওপর এগুলোর কী প্রভাব পড়ছে তা খতিয়ে দেখা হয়? তোরা তো এটা জানিস কতরকমের মহাজাগতিক তরঙ্গ পৃথিবীর বুকে প্রতিনিয়ত আছড়ে পড়ছে। সবটাই কি মানুষ আবিষ্কার করে ফেলেছে? আমার খোঁজ এটাই বলছে, এইরকম কিছু একটা পিঁপড়েদের দিয়ে আমাদের কোনো বার্তা দিচ্ছে।”

আমি বলেছিলাম, “তুই কী করে বুঝলি যে আমাদেরই বার্তা দিচ্ছে?”

বৃতি বলেছিল, “হ্যাঁ, সেটা নাও হতে পারে। ওরা হয়তো বার্তা দিচ্ছে এই আশা নিয়ে যে এই গ্রহে কোনো উন্নত প্রাণী থাকলে তারা সেটা ডেসিফার করতে পারবে। সেটা হয়তো সুনির্দিষ্টভাবে মানুষের জন্যই পাঠানো হয়নি।”

রোহন বলেছিল, “পিঁপড়েই কেন?”

বৃতি বলেছিল, “তা বলতে পারব না। হয়তো আরো প্রাণী এইরকমভাবে সাড়া দিচ্ছে। আমি পিঁপড়ের ওপর কাজ করেছি বলে পিঁপড়ের ব্যাপারটা বুঝতে পারছি। আবার হয়তো এও হতে পারে, ওরা যে তরঙ্গ পাঠাচ্ছে বা অন্য কিছু তা শুধু পিঁপড়েরাই নিতে পারছে।”

রিশান বলেছিল, “এই ওরাটা কারা? এলিয়েন?”

বৃতি নদীর দিকে তাকিয়ে উদাস স্বরে বলেছিল, “তা বলতে পারব না। আমার মনে হয় নক্ষত্রপারের কোনো উন্নত সভ্যতা, তবে তা এই পৃথিবীর নয়—পার্থিব নয়।”

আসল প্রশ্নটা আমি করেছিলাম, “ওরা কী খবর পাঠাচ্ছে?”

এর উত্তর সেদিন বৃতি তার পরীক্ষাগারে নিয়ে গিয়ে তাড়া তাড়া কাগজ দেখিয়ে দিয়েছিল। সে এখনো উদ্ধার করতে পারেনি। পিঁপড়ের অজস্র গতিপথের রেকর্ড তার কাছে আছে। সে বার করতে পেরেছে নির্দিষ্ট কিছু ছক। এই ছকগুলো উদ্ধারে সে আমাদের সাহায্য চায়।

বৃতিকে সেই সময় পাগল মনে হলেও তার পাগলামি আমাদের সংক্রমিত করেছিল। আমরা আদাজল খেয়ে লেগে পড়েছিলাম ডিকোড করার জন্য। সেই পদ্ধতি আমাদের লিখিতভাবে রাখা আছে। এই ডায়েরিতে লেখার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু বলি, আমরা বুঝতে পেরেছিলাম এই বার্তা আমাদের প্রচলিত কোনো অক্ষরভিত্তিক বার্তা নয় এবং এই বার্তা ননলিনিয়ার অর্থোগ্রাফি অর্থাৎ এর আরম্ভ বা শেষ পয়েন্ট আমরা পাব না। আমরা লোগোগ্রামকে মাথায় রেখে কাজ শুরু করেছিলাম যেখানে একটা ছক সামগ্রিকভাবে কোনো বার্তা দিচ্ছে।

আমরা যখন ক্লাস এইট প্রায় শেষ করে এনেছি তখন আমরা প্রথম ভাসা ভাসা উদ্ধার করতে পারলাম সেই বার্তা। তাতে বলা হয়েছে এক আসন্ন বিপদের কথা। আমরা যত আমাদের পদ্ধতি আরো ভালোভাবে গড়ে তুলতে লাগলাম তত বার্তাটি স্পষ্ট হল—বিপদ, সামনে বিপদ। এককথায় বলা যায় চেতাবনি। বাবার মুখে শুনেছিলাম, মাঝে মধ্যে তাঁদের ছোটোবেলায় কোনো বাবাজী ঘোষণা করতেন কাল পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে—একেই বলে চেতাবনি। আমাদের সময় ২০১২ বলে একটা মুভি খুব হিট হয়েছিল। মায়া ক্যালন্ডার নাকি ইঙ্গিত দিচ্ছে পৃথিবী ধ্বংসের কথা। আমাদের ডিকোড করা বার্তাও কিন্তু ধ্বংসের ইঙ্গিত দিচ্ছিল, কিন্তু আমরা কিছুতেই ডিকোড করতে পারছিলাম না এই ধ্বংস কীভাবে হবে।

সায়েন্স সিটিতে দাঁড়িয়ে সেদিন আমরা ঘামছিলাম। এক সপ্তাহ আগেই ডিকোডের নতুন যে সূত্র আমরা পেয়েছিলাম তাই দিয়ে বিগত চার-পাঁচ বছরের ডাটাগুলো আবার ঘাঁটা শুরু করেছিলাম আমরা। এবার আমরা পেয়েছিলাম যে, বিপদটা আসবে জীবিত এবং অতি সূক্ষ্ম কিছু থেকে। করোনা ভাইরাসের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা ভাবছিলাম, এই যদি আমাদের ধাঁধার উত্তর হয় তাহলে পৃথিবীর সমূহ বিপদ। অথচ সেই মুহূর্তে চারপাশের কোলাহল আর জীবনের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল সবটাই আমাদের পাগলামি। ভুল, বড়ো মাপের ভুল। হাজার হোক আমরা কেউ বিজ্ঞানী নই। এই সবই আমাদের ভ্রম। শুধু রিশান আজ সর্বাণীকে যে গোলাপটা দিয়েছে সেটাই সত্য।

পাঁচ
আমার শেষ কথা

এখন ২০৪২। পৃথিবী প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে। ২০২০ সালের পর যখন মনে হচ্ছিল পৃথিবী স্বাভাবিক হবে, তখন করোনা ভাইরাস আবার পরিবর্তিত হয়ে ফিরে আসে। সেই থেকে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা কমতে কমতে আজ অবস্থা ভয়াবহ। সবকিছু বিপর্যস্ত। আমিও আর বাঁচব না, আমার সংক্রমণ সবে শুরু হয়েছে। এরপর আর লেখারও ক্ষমতা থাকবে না। সংক্ষেপে লিখে যাই শেষ কিছু কথা। কেন যে লিখছি তাও জানি না। আমি জানি সংক্রমণের আশঙ্কা সত্ত্বেও রোহন, রিশান আর বৃতি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে রয়ে গেছে আজ তিনদিন। দেশের সেরা হসপিটাল আর সেরা চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে আমার জন্য। আমরা এখন ভিআইপি। মানুষ জাতির ভবিষ্যৎ আমাদের ওপর নির্ভর করছে।

২০২০ সালের শেষদিকে সর্বাণী করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে মারা যায়। রিশানকে আমাদের সামলাতে হয়নি। রিশান মন-প্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বৃতিকে সাহায্য করতে। মনে হয়েছিল ওর জীবনের লক্ষ্য এটাই। আর তারপরেই আমাদের গবেষণা এগোতে থাকে। এর মধ্যেই আমাদের কলেজ আর ইউনিভার্সিটি পার হয়ে যায়। আমরা প্রত্যেকেই বিজ্ঞানী হই। কিন্তু আমরা কাউকে কখনো বলিনি আমাদের এই গবেষণার কথা। এই সময়ে আমরা একে একে হারিয়েছি বহু প্রিয়জনকে।

আমার ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে মেঘ দেখছি, দূরে পাহাড় দেখতে পাচ্ছি। মানুষের সংখ্যা কমে যেতেই প্রকৃতি তার ছন্দে ফিরে এসেছে। আমরা বুঝতে পারছি এই গ্রহ আমাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো উপায় নেই শুধু একটা আশা ছাড়া। আমাদের দীর্ঘ গবেষণায় আমরা বেশ কিছু তথ্য জানতে পেরেছি। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল একটা সাহায্যের কথা। একটা সাহায্য আমরা পাব, কিন্তু কীভাবে কখন সেটা উদ্ধার করা যায়নি। সেই নিয়ে জোরকদমে কাজ চলছে। আমরা আরো একটা কাজ শুরু করেছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম, পিঁপড়েদের চলাকে নিয়ন্ত্রণ করে ফিরতি কোনো মেসেজ কি আমরা পাঠাতে পারি? এই কাজ আমার আর দেখে যাওয়া হল না। আশা রাখি ওরা পারবে। আমি মারা যাচ্ছি, আমার কোনো দুঃখ নেই। শুধু একটা আশা নিয়ে চলে যাব, সেই সাহায্যটা যেন খুব তাড়াতাড়ি আমার বন্ধুদের জীবৎকালেই আসে।

আর লিখতে পারছি না। মনের মধ্যে শুধু ঘুরে ফিরে আসছে সেই পুরোনো দিনগুলো। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি হাই স্কুলের সেই প্রথম দিনটিকে। আমরা সবাই একটা গোলাপ করে পেয়েছিলাম। বৃতি বলেছিল একটা পিঁপড়ে কতটা জোরে যেতে পারে।

ছয়
ডায়েরি শুরু

সুবিশাল মহাকাশযানে মহা সমারোহে যাত্রার তিনশো আলোকবর্ষ উদযাপন উৎসব শুরু হবে। প্রতি আলোকবর্ষের সমাপ্তির দিনটিতে উৎসব হয়ে থাকে। কিন্তু এবার তিনশো, বিশেষ উৎসব। প্রতিবার উৎসবের শুরু হয় আমাদের চার মহান বৈজ্ঞানিককে স্মরণ করে—বৃতি, রাজীব, রোহন আর রিশান। কীসব অদ্ভুত নাম হত সেই সময়। এবার বিশেষ উৎসব বলে সযত্নে বিশেষভাবে সংরক্ষিত রাজীবের ডায়েরি থেকে মূল ভাষায় প্রথমে পাঠ হল। ওটা বেশ বোরিং। যে ভাষা বুঝি না সেই ভাষায় কোনো কিছু শোনাটা বিরক্তিকর। আমরা চার বন্ধু মিলে তখন মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিলাম। ব্যক্তিগত ডিভাইসগুলো তো এখানে আনা যায় না, আনলে গেমস খেলা যেত। কিন্তু এখনকার ভাষায় ডায়েরিটা পাঠ হতেই আমরা চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। মাঝে থেমে থেমে প্রোজেকশন দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল সেই সময়ের নানা প্রসঙ্গগুলো। সায়েন্স সিটি ব্যাপারটা আমরা বুঝতেই পারছিলাম না, তারপর গোলাপ দেওয়ার ব্যাপারটা। ধীরে ধীরে আমরা ঢুকে গেলাম সেই যুগে।

পাঠ যখন শেষ হল আমরা স্তব্ধ। আসলে আমাদেরও তো এখন সেই বয়স যে বয়সে ওরা শুরু করেছিল ওদের যুগান্তকারী গবেষণা যার ফলে আজ এই স্পেস শিপে মানুষ বেঁচে রয়েছে। ডায়েরির পরের ঘটনাগুলো সবাই জানে। ওগুলো আমাদের ইতিহাসের অন্যতম বিশেষ পাঠ। কয়েক বছরের মধ্যেই এই বিশাল মহাকাশযান পৃথিবীর আকাশে দেখা দেয়। বিজ্ঞানী বৃতি, রোহন আর রিশানের নেতৃত্বে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ সেই যানে মানে আমাদের এই যানে ঠাঁই নেয়। কিছু মানুষ অবশ্য থেকে গিয়েছিল আমাদের সেই গ্রহে। এই যান আমরা চালাই না। এই যান প্রোগ্রামড। কোথায় চলেছি আজও আমরা জানি না। মহাকাশযানে রাখা পিঁপড়েরাই আমাদের ভরসা। তাদের চলাফেরা ক্রমাগত ডিকোড করা হয়। কিন্তু আজও আমরা জানতে পারিনি আমরা কোথায় চলেছি। বেশ কয়েক প্রজন্মের জন্ম-মৃত্যু এই মহাকাশযানেই হয়েছে, আরো কত প্রজন্ম আসবে চলে যাবে আমরা জানি না। শুরু থেকেই আমরা চলেছি এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির দিকে। হয়তো ওখানেই কোথাও আমাদের নতুন বাসস্থান আছে। আমাদের মধ্যে অনেকে তাকে স্বর্গ বলে। এই মহাকাশযানকে অনেকে নোয়ার নৌকা বলে। নোয়ার গল্প আমাদের সিলেবাসে আছে। আমরা সেই গল্প জানি। পৃথিবীতে তখন অধিকাংশ লোকই ঈশ্বরে বিশ্বাস করত। এখন ঈশ্বরে বিশ্বাসকারীর সংখ্যা নগণ্য। ঈশ্বরের জায়গা নিয়েছে আমাদের অজানা সাহায্যকারী এলিয়েনরা যাদের বার্তা আমাদের কাছে আসে পিঁপড়েদের মাধ্যমে।

উৎসব শুরু হয়ে গেল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য আমরা আগ্রহে বসে ছিলাম, কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না। আমরা চারজন বেরিয়ে এলাম। মহাকাশযানে অজস্র বাগানগুলোর একটায় আমরা চারজন বসলাম। কেউ বলল, ‘সেই সময় মানুষদের কী সুন্দর নাম হত, তাই না!’ আমাদের এখন এইরকম কোনো নাম হয় না। সবার নির্দিষ্ট চিহ্নিতকরণ নম্বর আছে।

আমি বললাম, “আমরা নিজেরা একটা নাম নিতে পারি না?”

সবাই লাফিয়ে উঠল। তারপর খুব গোপন ষড়যন্ত্রের মতো আমরা চারজন চারটে নাম নিলাম, আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত চারটে নাম—বৃতি, রাজীব, রোহন, রিশান। বাগানের মাঝে গোলাপগাছটাকে ঘিরে আমরা শপথ করলাম, আজ থেকে আমরা ডায়েরি লিখব। শুরু করব আমাদের গবেষণা। যে প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি, তাই দিয়ে শুরু হবে আমাদের গবেষণা। কোথায় চলেছি আমরা?

আমি রাজীব, আজ আমার ডায়েরি লেখার প্রথম দিন। তাই কীভাবে আমি ডায়েরি লেখা শুরু করলাম তাই প্রথমে লিখলাম। রিশান আমাদের গবেষণার একটা কোড নেম দিয়েছে যাতে কেউ বুঝতে না পারে। ও কীসব প্রাচীন ভাষা ঘাঁটাঘাঁটি করে সেখান থেকে একটা পুরোনো ভাষায় প্রজেক্টের নাম রেখেছে ‘কুয়ো ভাদিস ডোমিনি’ যার মানে ‘কোথায় যাচ্ছ?’ নামটা আমাদের বেশ পছন্দ হয়েছে। আমরা আশা রাখি আমাদের জীবদ্দশায় এর উত্তর আমরা বার করে ফেলব।

অলঙ্করণ-তথাগত

জয়ঢাকের গল্পঘর

3 thoughts on “গল্প-উত্তরাধিকার-রাজীব কুমার ঘোষ-বসন্ত ২০২১

  1. স্যার আপনারা 3 জন আমার ইন্সপিরাশন । আমার এতটাও পান্ডিত্য নাই যাতে আমি আপনার লেখার সমালোচনা করবো। আমার ভাষার মধ্যে এতোটাও অলংকরণ নেই। আমার ছোট্ট মস্তিষ্কে যতটা বুদ্ধি ধরে তার ভিত্তিতে এককথায় বলতে পারি অনবদ্য ।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s