গল্প-সমুদ্রের ফুল-মৌসুমী ঘোষ -বর্ষা ২০২২

প্রতিযোগিতায়  পুরস্কৃত অন্যান্য গল্পেরা-প্রথম স্থান-অভিশপ্ত একশৃঙ্গী, দ্বিতীয় স্থান-সেই রাত তৃতীয় স্থান- নীল পাহাড়ের জ্বলন্ত মূর্তি চতুর্থ স্থান- নীলগাই রহস্য

সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা’২০২১-পঞ্চম স্থান 

golposamudrerful

(এক)

এল ডোরাডো ছোটোবেলা থেকেই ঠাকুমার কাছে কেবল হারিয়ে যাওয়া জাহাজের গল্প শুনেছে। শুধু হারিয়ে যাওয়া জাহাজেরই গল্প বলত ঠাকুমা। হারিয়ে যাওয়া জাহাজ আর তার নাবিকদের গল্প। ঠাকুমার গল্পের প্রভাবেই হয়তো এল ডোরাডো চাকরি নিল এক বাণিজ্যিক জাহাজ কোম্পানিতে। ইঞ্জিন ক্যাডেট থেকে ধাপে ধাপে তার প্রমোশনও হল। সে যখন সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেল তখন কোম্পানির নির্দেশে নিযুক্ত হল এক বিশেষ জাহাজে। বন্ধু-সহকর্মীরা প্রমোশনের খবরে অভিনন্দন জানালেও সেই বিশেষ জাহাজ, জেনেরাল কার্গো শিপ এম ভি আলবুকার্ক — তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা ভয়ের গল্পও শোনাতে ছাড়েনি। এল ডোরাডো অবশ্য এগুলোকে রসিকতা হিসাবেই নিল।

          এম ভি আলবুকার্ক জাহাজে সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিযুক্ত হওয়ায় ব্রিজ ও নেভিগেশন সংক্রান্ত উপকরণগুলোর মেইন্টেনেন্সের দায়িত্ব বর্তালো তার ওপর। বন্দর থেকে রওনা দেবার আগে অফিসারদের নিয়ে মিটিং ডাকলেন ক্যাপ্টেন। সেখানে গতানুগতিক নির্দেশের ক্যাপ্টেন জাহাজটির বিশেষ লক্ষ সম্বন্ধে কিছু আভাস দিলেন।

          ক্যাপ্টেন জানালেন কোম্পানির নির্দেশে উডস হোল ওসেনোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশনের অনুসন্ধানকারী দলকে নিয়ে জাহাজ মলাক্কা জলপ্রণালীর দিকে যাত্রা করবে। এই অনুসন্ধানকারী দলটির লক্ষ্য ১৫১১ সালে বিপুল ধনসম্পত্তি নিয়ে ডুবে যাওয়া ‘ফ্লোর ডি লা মোর’ নামে একটি জাহাজ খুঁজে বার করা। রোবট সাবমেরিন লাগিয়ে যা তথ্য পাওয়া গেছে তাতে অনুসন্ধানকারী দল মনে করছে ডুবে যাওয়া জাহাজটি তারা খুঁজে পাবে। আলবুকার্ক জাহাজ এই অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় মালপত্তর বয়ে নিয়ে চলেছে।

(দুই)

জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ। কোলকাতা বন্দর থেকে রাত দু’টো নাগাদ মলাক্কা জলপ্রণালির উদ্দেশ্যে জেনেরাল কার্গো শিপ এম ভি আলবুকার্ক যাত্রা শুরু করল। প্রথম পাইলট ঘন্টা খানেকের মধ্যে লক গেট পার করে দিল, পরের পাইলট লক গেট থেকে গার্ডেন রিচ। গার্ডেন রিচ থেকে রিভার পাইলট, হুগলি নদীর রিভার চ্যানেল দিয়ে গঙ্গাসাগর অবধি। গঙ্গাসাগর থেকে আরো ত্রিশ মাইল দূরে পোর্ট লিমিট শেষ হল এম ভি আলবুকার্কের। শুরু হল সী প্যাসেজ। যাকে বলা হয় কোলকাতা পোর্টের প্রবেশ দ্বার। হুগলি নদী পর্বের এই যাত্রা শেষ হতে পরের দিন রাত হয়ে গেল এল ডোরাডোদের। এই সময়টায় টুক-টাক যা কিছু মনে আসছিল তাই নোট বুকে লিখছিল সে। ঠাকুমার কথা মনে পড়ছিল তার। বিয়ের পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই নীল সমুদ্রের বুকে হারিয়ে গেছিল ঠাকুর্দা। এল ডোরাডোর বাবা তখন সদ্য জন্মানো শিশু।

ঠাকুমার কাছে গল্প শুনতে শুনতেই এল ডোরাডো প্রথম ‘সমুদ্দুর’, ‘জাহাজ’ এইসব শব্দ বলতে শেখে। ঠাকুমাই তাকে প্রথম শেখায় জাহাজের ব্রিজে দাঁড়িয়ে সামনে দেখলে জাহাজের বাঁদিককে পোর্ট সাইড আর ডানদিককে স্টার বোর্ড সাইড বলে। জাহাজের ব্রিজ বা হুইল হাউস নিয়েই ছোটোবেলা থেকে এল ডোরাডোর যত কৌতূহল।

জাহাজ রওনা হবার সময় থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। আবহাওয়া দপ্তর বলছিল, প্রাক বর্ষার বৃষ্টি। নোটবুক খুলতেই মনে পড়ল বাবার কথা। উচ্চমাধ্যমিকের আগেই এল ডোরাডোর বাবা মারা গেছিলেন। বাবা বেঁচে থাকলে তাকে কিছুতেই এই পেশায় যুক্ত হতে দিতেন না। বাবা কখনও ভোলে নি এই সমুদ্রই তার বাবাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে আর ফিরিয়ে দেয়নি। যদিও ঠাকুমা গল্প বলার সময় বার বার বলত, সমুদ্র সব কিছুই ফিরিয়ে দেয়। তবে কি ঠাকুমা এখনও বিশ্বাস করে সমুদ্র ফিরিয়ে দেবে ঠাকুর্দাকে?

প্রথমদিন সমুদ্র বেশ শান্ত থাকলেও, এখন দুলুনি শুরু হয়েছে জাহাজে যার ফলে মাথাঘোরা আর বমিভাব। এল ডোরাডো এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে কবেই। জাহাজ স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে আর খবরেও পরেরদিন একটা নিম্নচাপের পূর্বাভাস পেল। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভেজা হাওয়ার বেগ ও ঢেউএর উচ্চতা বাড়ল। জুলাই মাসে এ ধরনের নিম্নচাপ স্বাভাবিক।

(তিন)

          ‘দ্য ফ্লোর ডে লা মোর’ মানে সমুদ্রের ফুল। এটি একটি পর্তুগিজ ক্যারাক অর্থাৎ তিন মাস্তুলওয়ালা সমুদ্রে পাড়ি দেবার জন্য জাহাজ, যা তৈরি হয়েছিল ১৫০২ সালে, লিসবনে। ‘আলফানসো দ্য আলবুকার্ক’ ছিলেন এই জাহাজের কাপ্তান। পর্তুগিজরা যখন মালয়েশিয়ার রাজার কাছে ব্যবসার অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হয় তখন তারা সেখানে লুঠতরাজ চালায়। রাজার  সিংহাসন, মণিমুক্তা খচিত মুকুট, সোনা, হীরে, মণিমুক্তো, পান্না লুঠ করে। আলবুকার্ক ‘ফ্লোর ডে লা মোর’ ঠেসে ধনরত্ন পুরেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল রাজা ম্যানুয়ালের দরবারে সেসব পেশ করা।  কিন্তু মলাক্কা জলপ্রণালীর কাছাকাছি এসে এক ভয়ঙ্কর ঝড়ের মুখোমুখি হয় জাহাজ। ১৫১১ সালের ২০শে নভেম্বর সুমাত্রার কাছে এসে ডুবে যায় ফ্লোর ডে লা মোর। আলবুকার্ক কোনোরকমে প্রাণে বাঁচেন। ক্যাপ্টেনের কাছে এই গল্পই শুনেছিলে এল ডোরাডো।

          সেদিনের মিটিং-এ ক্যাপ্টেন ইঞ্জিন ঘরে ইঞ্জিনিয়ারদের ডিউটি ভাগ করে দিয়েছিলেন। তবে তার সঙ্গে এও নির্দেশ দিয়েছিলেন, ইঞ্জিন ঘরের দরজা, রাত একটা থেকে দু’টো অবধি বন্ধ রাখতে হবে। এল ডোরাডো আশ্চর্য হয়েছিল এইরকম অদ্ভুত আদেশ শুনে। আরও আশ্চর্য হয়েছিল অন্যদের চুপ থাকা দেখে। সে বুঝতে পেরেছিল এই আদেশ প্রতিবারের যাত্রাতেই থাকে। সদ্য নিযুক্ত হিসাবে সাহস করে কারণটা জানতে চায় নি। তার মনে পড়ে গেছিল আগের জাহাজের বন্ধু আর সহকর্মীদের সাবধানবাণী আর সেই ভয়ের গল্প। সেদিন মিটিং-এর পরেই এমন আদেশের কারণ জানতে পেরেছিল এক ইঞ্জিনিয়ারের কাছে। সে জানিয়েছিল রাতে সেখানে ওই সময়ে ঘোরাঘুরি করে এক সেকেন্ড অফিসারের আত্মা। এই সেকেন্ড অফিসার ব্রিজ উইং থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। বন্ধুদের মুখে শোনা সেই গল্পটা এই জাহাজের বুকে বসে আবার শোনার পর এল ডোরাডো ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতে পারল না। এর মধ্যেই সে তার এলোমেলো ভাবনাগুলো নোটবুকে লিখে রাখতে লাগল।

          দ্বিতীয়দিন এল ডোরাডোর ডিউটি পরল রাতে  সন্ধেতেই ডিনার সেরে রাত এগারোটা অবধি বিশ্রাম নিয়ে সে নিয়ম অনুযায়ী ডিউটির আগে শাফট টানেলে বেয়ারিং পরীক্ষা করতে গেলে একজন সারেঙ জানাল, বেয়ারিং পরীক্ষার কোনো দরকার নেই। প্রথমে ভূতের ভয় বা অলৌকিকতার একধরণের ভয় তাকে আচ্ছন্ন করে রাখলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শোনা গল্পটির সত্যতা জানার আগ্রহে সে হাইড্রলিক পাম্প ঘুরিয়ে লোহার দরজাটা খুলে ফেলল। হাতের টর্চটা জ্বেলে কিছু দেখার চেষ্টাও করল। কী দেখার চেষ্টা সে করছে, সে নিজেও জানে না। কিন্তু তেলগন্ধী হাওয়ার ঝাপটা খাওয়া ছাড়া আর কিছু আলাদা অনুভূতি হল না। তবে তার দরজা খোলার খবর রাতেই কারো মাধ্যমে জাহাজে চাউর হয়ে গেছিল। ভোরে ডিউটি চেঞ্জের সময় পরবর্তী ইঞ্জিনিয়ারের মুখে বেশ কড়া ঝাল খেল যা উল্টে এল ডোরাডোকে পরের দিন রাতের ডিউটিতে শুধু ইঞ্জিন ঘরের দরজা খুলতেই নয়, ইঞ্জিন ঘরে ঢুকতেও প্ররোচিত করল। সেই মতো নোটবুকে ঠাকুমার উদ্দেশ্যে লিখেও ফেলল এক খোলা চিঠি।

          পরেরদিন রাতে দরজার হাইড্রোলিক পাম্প ঘোরানোর আগেই রাতে ডিউটিরত তেলওয়ালা তাকে ফ্লাক্সের চা অফার করল। তেলওয়ালা ইশাককে দেখে আগের রাতে রটে যাওয়া দরজা খোলার ঘটনাটার বাহককে চিহ্নিত করতে পেরে মনে মনেই সে হেসে ফেলল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, “যাক গতকাল রাতের ঘটনাটা তাহলে ভূতে রটায়নি।” সেই রাতেও দরজা খোলার চেষ্টায় সে যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটা দেখে ইশাক ভয়ে ক্যাপ্টেনের রুমের দিকে যেতে গেলে এল ডোরাডো খপ করে ইশাকের ঘাড়ের কলার ধরে বলল, “তোমাকে দরজার বাইরে পাহারায় থাকতে হবে। আমি একা ভিতরে ঢুকব।” কিন্তু এবারেও কিছুই দেখতে পেলনা সে।

          বেরিয়ে দেখল ইশাক পালায়নি ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে ইশাক যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেল। দু’জনে মিলে চা খেতে খেতে ইশাক বলতে শুরু করল সোমালিয়া জলদস্যু জাহাজে তার কিছুদিন কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা। তারপর এল ডোরাডো শুরু করল, পর্তুগীজ জলদস্যুদের ইতিহাসের গল্প। গল্প বলতে বলতে অতীতের ডুবে যাওয়া সোনা ও মণিমাণিক্য ভর্তি জাহাজের খোঁজে যাওয়ার গল্পে মজিয়ে দিল এল ডোরাডো ইশাককে। একসময় ইশাককে দ্বাররক্ষীর দায়িত্ব দিয়ে সে টর্চ জ্বেলে আবার ঢুকে পড়ল সুড়ঙ্গ পথে। বিয়ারিংগুলো কতটা গরম হচ্ছে তা পরীক্ষা করা শুরু করল প্রথমেই। তেলের মাত্রাও দেখে নিল। ঠিক শেষ বিয়ারিংটা চেক করা হলে ইশাকের চেঁচামিচির আওয়াজ পেল এল ডোরাডো। সঙ্গে সঙ্গে ঘেমে উঠল সে। ইশাকের চেঁচানি থামতেই সামনের সিঁড়ি ওপর থেকে একটা দরজা খোলা আর বন্ধের ক্যাঁচ কোঁচ আওয়াজ এলো। মনটা দোনামোনা করে উঠল, ইশাকের কাছে ফিরে যাবে না সিঁড়ি দিয়ে উপরে ডেকে উঠবে!

(চার)

          পরের দিন ঘুম থেকে উঠে ডেকে দাঁড়াতেই ঠাকুমার কথা মনে পরে এল ডোরাডোর। আসার আগে বুড়ি ফোনে জিজ্ঞেস করেছিল, “কতদিনের জন্য যাচ্ছিস?” সে কিছু বলতে পারেনি। খিদিরপুর ডকে দাঁড়িয়ে ফোনে শেষ যে কথাটা বলেছিল সেটা ভাবলে আনমনা হওয়া ছাড়া গতি নেই। “যতদিন না তোমার বরের খোঁজ পাচ্ছি ফিরিছি না।” ফোনে কথা বলতে বলতে সেদিন সে এগিয়ে গেছিল গা ছমছমে ভুতুড়ে গোডাউনগুলোর দিকে। বছর পঞ্চাশ আগেও এই ডকে জাহাজ ঢোকার জায়গা পেতনা। অথচ এখন গোডাউনগুলোতে কুকুর বিড়াল মরে পড়ে থাকে। ইঁদুর ছুঁচো দৌড়ে বেড়ায়। রাতে আবার ইঁদুর ধরে খায় পেঁচায়। আকাশে উড়ে বেড়ায় চিল। পঞ্চাশ বছর আগের ডকের চেহারাটা অবশ্য এল ডোরাডো ঠিক জানে না। শুনেছে ঠাকুমার মুখে। ঠাকুর্দা না ফিরলে সে জানতেও পারবে না যে ঠিক কেমন ছিল তখন ডকের চেহারা।

          এল ডোরাডো অপেক্ষা করছিল রাতের ডিউটির জন্য। কী মনে হতে নিজের অ্যাকোমোডেশন রুমে গিয়ে ওয়ালেট খুলে ঠাকুমার দেওয়া বিয়ের পর তোলা ঠাকুর্দা আর ঠাকুমার ছবিটা বার করেই চমকে ওঠে। ছোটোবেলায় একবার ঠাকুমার সঙ্গে রথের মেলায় গিয়ে একটা টিনের জাহাজ কিনে এনেছিল সে।  তার মাঝখানটাতে সলতে পাকিয়ে আগুন জ্বালিয়ে চৌবাচ্চার জলে ভাসিয়ে বাবাকে বলেছিল, “বাবা দেখ, এটা লকগেট। এখান দিয়ে জাহাজ যাবে এবার।” বাবা প্রচন্ড রেগে জাহাজটা জল থেকে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল বাগানে। সেই থেকে আর কখনও বাবার সামনে জাহাজের নাম পর্যন্ত করেনি। ছবিতে ঠাকুমার পাশে যিনি বসে তাকে অনেকটা বাবার মতোই দেখতে। তাহলে আগের রাতে সুড়ঙ্গের সিঁড়িতে দাঁড়ানো লোকটা কে ছিল, তার বাবা না ঠাকুর্দা? সে কি সত্যিই কাউকে দেখেছিল নাকি সেই ভৌতিক পরিবেশে তার অবচেতন মন বাবার বা ঠাকুর্দার ছবিই ফুটিয়ে তুলেছিল? কে কাল তাকে উপরে ডেকে উঠতে দিল না? আজ রাতে সেটা জানতে যেতেই হবে আবার। আজও ঠাকুমাকে নোটবুকে একটা খোলা চিঠি লিখল। তাতে রইল রাতে মনের ভুল বা সত্যিই দেখা ভূতের কথা।

          লেখা শেষ করে এল ডোরাডো, কার্গো লোডিং-এর ফাঁকে ফাঁকে খিদিরপুর ডকের লোহার ব্যালার্ডে বসে যে কথাগুলো ঠাকুমার বোন অর্থাৎ ছোট ঠাকুমা ফোনে বলেছিল সেগুলো আবার ভাবল। ঠাকুমার এম আর আই টেস্টের রিপোর্ট ভাল না। ডাক্তার সন্দেহ করছে কারসিনোমা। লাস্ট স্টেজ।

          ঠাকুমা এলডোরাডোকে বার বার বলেছিল ঠাকুর্দাদের জাহাজটা সেবার পোর্টব্লেয়ারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। জাহাজটা কোম্পানিকে শেষ যে ডিস্ট্রেস মেসেজ করেছিল তাতে জানিয়েছিল, ‘স্টার বোর্ড সাইডে জাহাজটার লিস্টিং প্রায় পনেরো ডিগ্রির মতো।’ অর্থাৎ জাহাজটা বিপদে পড়েছিল। কোম্পানির লোক পৌঁছানোর আগেই জাহাজের সকলে লাইফ র‍্যাফটে চেপে সমুদ্রে ভেসে পড়েছিল। সেকেন্ড অফিসার জাহাজে অপেক্ষা করেছিল কোম্পানির জন্য। জাহাজ ডোবার আগেই লাইফ র‍্যাফট বেশ কিছুটা দূরে সরে গেছিল। কোম্পানি ফোনে জানায়, ইন্ডিয়ান কোস্ট গার্ডের একটা প্লেন লাইফ র‍্যাফটগুলোকে খুঁজে পায়। কিন্তু জাহাজটার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি যার মধ্যে সেকেন্ড অফিসার, এল ডোরাডোর ঠাকুর্দা ছিল। এল ডোরাডো আয়নার সামনে গেল। নিজের প্রতিবিম্ব দেখেও চমকে উঠল। তাকেও ছবির লোকটার মতোই দেখতে লাগছে যে!

(পাঁচ)

          “আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের পরে প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে দূরদর্শী আলবুকার্ক একটি পূর্বাঞ্চলীয় সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আলবুকার্ক পূর্ব উপকূলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন। সেগুলি হল, মালাক্কা, হরমুজ, আর গোয়া। দু’শতক ধরে একটি জাতির আবিষ্কার ও বিজয়যাত্রার পেছনে যে সহিংস অতিমানবীয় প্রেরণা কাজ করেছে সেটা কল্পনা করাও কঠিন। তবে সেবেস্টিয়ান গনজালেসের আধিপত্য বিস্তারের সময়ে জলদস্যুতার উত্থানের ইতিহাস পর্তুগীজদের কালিমালিপ্ত করেছিল।”

          বইতে লেখা ইতিহাসের এই গল্প এল ডোরাডো ইশাককে শোনাচ্ছিল। কিন্তু এর পর ইশাক তাকে যা শোনাল সে আরো রোমাঞ্চকর। এম ভি আলবুকার্ক-এর পুরোনো তেলবাহক ছিল ইশাক। সেই সময় যখন আলবুকার্ক ছিল জলদস্যুদের দখলে। তাদের দখলে থাকাকালীন-ই ইশাক এক জলদস্যুর মুখে এক বন্দী অফিসারের আত্মহত্যার গল্পটা শুনেছিল। সেই অফিসারকে জলদস্যুরা নাকি একটা ডুবন্ত জাহাজ থেকে বাঁচিয়েছিল। কিন্তু বছরের পর বছর জলদস্যুদের কাছে বন্দী জীবন আর খাটুনির অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সে একসময় ডেক থেকে জলে ঝাঁপ দেয়। কিন্তু প্রতি রাতে তার আত্মা ফিরে আসতো আলবুকার্কে। তার উৎপাতেই কিনা জানা যায়না, আলবুকার্ক জাহাজ ভারতীয় যুদ্ধজাহাজের হাতে ধরা পড়ে।  

          এল ডোরাডো চমকে উঠল। স্বাভাবিকভাবেই নাবিকদের মুখে মুখে চলে আসা এই কাহিনীর কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই তাই হয়ত এই ঘটনা একটা ভূতের গল্প হয়েই রয়ে গেছে। সেই সেকেন্ড অফিসার কি তাহলে এল ডোরাডোর ঠাকুর্দা? সে চেষ্টা করল ইশাকের কাছ থেকে আরো কিছু তথ্য জানতে, কিন্তু ইশাক বেশি কিছু বলতে পারল না।

          এল ডোরাডো এমন মানসিক অবস্থার মধ্যে পড়ল যে তার যুক্তি বুদ্ধি গুলিয়ে যেতে থাকল। ভূতের ভয় চলে গিয়ে তার তীব্র কৌতূহল জেগে উঠল, এই ভূত বা অশরিরী আত্মার পরিচয় পাবার জন্য। যদি সত্যিই আত্মা বলে কিছু থাকে, ভূত বলে কিছু থাকে তাহলে তার দাদু কি তাকে দেখা দেবে। সে ঠিক করল পরের দিন সে আবার চেষ্টা করবে এই আত্মার দেখা পাবার। কিন্তু এল ডোরাডোর সেই চেষ্টায় যেভাবে বাধা পরল তা অভাবনীয়।

(ছয়)

          আকাশের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের রঙ বদলাচ্ছে। আকাশ যত মেঘলা হচ্ছে, প্রতিফলনে ঘোলাটে দেখাচ্ছে সমুদ্রের জল। এম ভি আলবুকার্ক ছিল পুরোনো জাহাজ। রোলিং-পিচিং বেড়ে যাওয়ায় জাহাজের একদম তলায় থাকা ডিবি ট্যাঙ্কগুলোকে ডেক ক্রু ছেলেটিকে চেক করতে নির্দেশ দিয়ে এল ডোরাডোরা অপেক্ষা করছিল। ছেলেটি ডিবি ট্যাঙ্ক আর বিলজের সাউন্ডিং চেক করে জানাল, ট্যাঙ্কগুলো ফাঁকা আর বিলজে খুব সামান্য জল আছে। কার্গোতে যে বালি আছে তারসাথে কিছু জল মিশে আছে হয়তো। ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ারদের নির্দেশ মতো বিলজের জল পাম্প করে বার করে দিল। তবু জাহাজকে খাঁড়া করা গেল না। জাহাজটা তাতেও স্টার বোর্ড সাইডে চার ডিগ্রি মতো হেলেই রইল।         এরপর ভারসাম্য রক্ষার জন্য জাহাজের নিচে পোর্ট সাইডের দিকে কয়েকটা ডিবি ট্যাঙ্কে জল ভরা হল। তাতেও সুরাহা হল না। দুপুর গড়িয়ে গেল। এল ডোরাডো কয়েকটা ছেলে নিয়ে হ্যাচ পরীক্ষা করার জন্য মই বেয়ে নিচে নামল অন্ধকার দু’নম্বর লোয়ার হোল্ডের ভেতরে। জল-ভরা বালি তুলে আনতে হবে। কিন্তু ওরা নেমে টর্চের আলোয় দেখল খুব সামান্য পরিমাণ জল জমে আছে। ছেলেরা অন্ধকারেই একে অপরের মুখ চাওয়াচায়ি করতে লাগল। এল ডোরাডো বুঝে গেল ওরা এক নম্বর লোয়ার হোল্ডে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে। কারণ এক নম্বর হোল্ডের মুখ অবধি বালি। হ্যাচের ফাঁক দিয়ে টর্চের আলোয় এলডোরাডো দেখল জাহাজের রোলিং পিচিঙের সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে জল আছড়ে পড়ছে। বিপদের আশঙ্কা করে এলডোরাডো ক্যাপ্টেনকে ওয়াকি টকিতে বিপদ সঙ্কেত পাঠাল। মনে মনে ঠিক করে ফেলল, যেকোন উপায়ে ভিতরে ঢুকে জল ঢোকার উৎসটাকে খুঁজে বার করতে হবেই। কিন্তু চারটে ছেলে বালি সরিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে অনেক খোঁজা খুঁজির পরও জল ঢোকার উৎস খুঁজে পেল না। তবে ওরা নিশ্চিত হল সমুদ্রের জলের সাথে বালি ঢুকেই জাহাজ হেলে পড়ছে। জলের উৎস বন্ধ করতে না পেরে এল ডোরাডো বুঝতে পারল জল বার করার গতি বাড়াতে হবে এবং তা করতে হবে দ্রুত। ক্যাপ্টেনের মেসেজ এল, রাত বাড়ছে আর জাহাজ এখন দশ ডিগ্রির মতো হেলে গেছে। ছেলেরা শুকনো বালি কোদাল দিয়ে তুলে বিপরীতের পোর্ট সাইডে জমা করতে করতে ক্লান্ত। পালা করে তাদের পরিশ্রম সত্ত্বেও ভোর হতেই দেখা গেল মেন ডেক ছুঁয়েছে সমুদ্রের জলতল। ছেলেরা দ্রুত রেডি হয়ে মই বেয়ে হ্যাচের দিকে নামতে গেলে প্রথম ধাপে পা দিয়েই ইশাক ভয়ে কেঁপে গেল। ভেতর থেকে জলের ভয়ঙ্কর শব্দ শুনতে পেল। ইশাককে সরিয়ে এল ডোরাডোই আগে নামল। দ্রুত ছেলেরা এল ডোরাডোর পিছু পিছু নেমে বস্তায় বালি ভরে বিপরীত দিকে দিতে লাগল। একটা কোদালের হ্যান্ডেল খুলে গেল, টর্চের আলো নিভু নিভু হয়ে আসছিল বলে মাঝে মাঝেই টর্চ নিভিয়ে রাখতে হচ্ছিল। উৎকন্ঠায় এলডোরাডো নিচু হয়ে হাত দিয়েই বালি সরাতে লাগল।

          উপর থেকে প্রয়োজনীয় রসদ পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্রমাগত। আরো সাত ঘন্টা বালি সরানোর কাজ করল ছেলেরা। তারপর সবাই উপরে উঠে এল। কোম্পানিকে মেসেজ পাঠানো হয়েছে। কোম্পানি জানিয়েছে কোস্ট গার্ড জাহাজ পাঠাচ্ছে, এম ভি আলবুকার্কের পাশাপাশি স্ট্যান্ড বাই হিসেবে যাবে। প্রয়োজনে এসকর্ট করবে। কিন্তু সেটা আসার আগেই অবস্থার আরো অবনতি হতে কোম্পানি অন্য একটা জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশ দিল।

          জরুরি মিটিং-এ ক্যাপ্টেন জানাল, একবার এর চেয়েও বিপদ সঙ্কুল পরিস্থিতিতে সাইক্লোনের সময় এই জাহাজ গতিপথ পরিবর্তন করে বেঁচে ছিল। কিন্তু এই পরিস্থিতি আলাদা। ঘন্টায় ঘন্টায় জল পাম্প করে বার করা আর ট্যাঙ্কগুলো চেক করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।

          এল ডোরাডোর ঠাকুমার কথা মনে পড়ল। ঠাকুমার শোনানো ছোটোবেলার গল্পগুলোর কথাও। ব্যান্ডেল থেকে ছোটঠাকুমার মেসেজ এল, ঠাকুমার অবস্থার অবনতি হয়েছে।

          শ্রান্ত ক্লান্ত এল ডোরাডো নিজের রুমে গিয়ে শুতে গেলেও মনে হল মাথার দিক হেলে আছে, পায়ের দিক উঠে আছে। পাশের রুম থেকে থার্ড ইঞ্জিনিয়ারের গীটারের সুর ভেসে আসছিল। ঘুমোতে পারল না এল ডোরাডো। সেই কি এর কারণ? তার নির্দেশ অমান্য করাই কাল হল?

          একসময় খবর এল, লিস্টিং প্রায় কুড়ি ডিগ্রি। তবে কি এগারোজন ডুবেই মরবে সমুদ্রে?

(সাত)

          জাহাজের সর্বশেষ পজিশন জানিয়ে ডিস্ট্রেস মেসেজ পাঠিয়ে ক্যাপ্টেন জাহাজ ছাড়ার নির্দেশ দিলেন। এম ভি ঈগল আসতে এখনও দু তিন ঘন্টা লাগবে খবর এল। অ্যাকোমোডেশন রুম থেকে নিজের ডকুমেন্টস নিতে গিয়ে ব্যাগের মধ্যে থেকে বার করে হাতে নিল ঠাকুমার দেওয়া সমুদ্রের ফুলটা। সমুদ্রের ফেনা জমানো এই জিনিসটা ঠাকুর্দা ঠাকুমাকে বিয়ের পর উপহার দিয়েছিল আর ঠাকুমা সেটা এলডোরাডোর হাতে তুলে দিয়েছিল প্রথম চাকরিতে জয়েন করতে আসার দিন। সমুদ্রের ফুলটা হাতে তুলে কানের কাছে নিয়ে যাওয়া মাত্র তার প্রতিটা রন্ধ্র থেকে শোনা গেল সেই গল্পগুলো ঠাকুমার কণ্ঠস্বরে। সমুদ্রে সিল মাছের জলকেলির গল্প, কানাডার বরফ কেটে জাহাজের এগিয়ে যাবার গল্প, আটলান্টিকে সাইক্লোন অতিক্রম করার গল্প। মোবাইলটা চার্জে বসিয়েছিল। খুলে চেক করতে গিয়ে দেখল, ছোটঠাকুমার মেসেজ এসে পড়ে আছে। ঠাকুমার মারা যাবার খবর। ঘরে ততক্ষণে জল ঢুকছে দেখে দ্রুত উপরে উঠে এল সে।

সবাই ততক্ষণে লাইফ-র‍্যাফট জলে নামানোর চেষ্টা করছে। হেলানো জাহাজ থেকে ক্যাপসুলের মতো র‍্যাফটকে জলে নামাতে ছেলেরা নাস্তানাবুদ হচ্ছিল। হুইল হাউসে জল ঢুকছিল হুড়হুড় করে। ইঞ্জিন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। র‍্যাফটে নামার জন্য মই ঝোলানো হল। কিন্তু জাহাজ এতটা হেলে থাকায় মই জল পর্যন্ত পৌঁছাল না। ওরা একে একে জলে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে র‍্যাফটে উঠল।

সূর্যাস্ত হচ্ছিল। সূর্যের সঙ্গেই এম ভি আলবুকার্ক ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল। সন্ধের আলো অন্ধকারে জাহাজের শেষ অংশটুকুও মিলিয়ে গেল। প্রচন্ড ক্লান্তিতে এল ডোরাডোর দু’চোখ এই বিপদেও বুজে আসছিল। একটা গোঁ গোঁ শব্দ শুনতে ভেসে আসল আকাশের দিক থেকে। সবাই চেঁচিয়ে উঠল আনন্দে। ফ্লেয়ার গান থেকে ফায়ার করল কেউ। আকাশটা লালে লাল হয়ে গেল। সেই আলোতে এল ডোরাডো যেন দেখল সমুদ্রের ঢেউ যেখানে শান্ত হতে হতে রেখায় পরিণত হয়েছে সেই দিগন্ত রেখায়  ঠাকুর্দা আর ঠাকুমা হাত ধরাধরি করে চলে যাচ্ছে কোথাও। এতক্ষণ হাতের মুঠোর ধরা সমুদ্রের ফুলটা সে কানে চেপে ধরল।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

2 thoughts on “গল্প-সমুদ্রের ফুল-মৌসুমী ঘোষ -বর্ষা ২০২২

Leave a Reply to শুভাশিস ঘোষ Cancel reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s