টাইম মেশিন-সীমান্তের অন্তরালে-সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী

এই ঘটনার মাস দুই পরেই পেশাওয়ারে সংবাদ এল যে চারসাদ্দার উপকণ্ঠে কয়েকটি ব্রিটিশ ঘাঁটি আক্রমণ করে দখল করেছে উৎমন খেল উপজাতি। স্যার ক্যম্বেলের সৈন্যবাহিনী সোয়াট উপত্যকা থেকে ফেরার পর তখনও অটুট অবস্থাতেই ছিল। তিনি সেই বাহিনী নিয়ে আবার পাড়ি দিলেন চারসাদ্দার দিকে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ব্রিটিশ বাহিনী প্রচণ্ড প্রতিআক্রমণ করে ঘাঁটিগুলি পুনরোদ্ধার করল আর ব্রিটিশ শক্তিকে উপেক্ষা করার ধৃষ্টতার জন্য উৎমন খেল উপজাতি পাখতুনদের গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে দিলেন স্যার ক্যাম্বেল , তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেবার উদ্দেশে।

উৎমনখোলদের সাময়িকভাবে দমন করে স্যার ক্যাম্বেল তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে ফিরে গেলেন পেশওয়ারে। সেখানে পৌঁছেই তিনি খবর পেলেন যে সোয়াটের রানিজাই উপজাতীয় নেতারা তাঁদের প্রতিশ্রুত অর্থদণ্ড দিতে অস্বীকার করেছেন। তাঁরা ইতিমধ্যে সাড়ে চার হাজার লোক নিয়ে একটি লশকরও গঠন করেছেন, যদিও সেই লশকরের কাছে কোনও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। শুধুমাত্র তলোয়ার আর কিছু গাদা বন্দুক নিয়েই রানিজাই পাখতুনরা দেশের ওপর নিজেদের অধিকার সাব্যস্ত করার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছে।

রানিজাইদের দুটি মজবুত ঘাঁটি সাখাকোট ও দরগাই গ্রাম অবরোধ করলেন স্যার ক্যাম্বেল। রানিজাইরা এ দুটি গ্রামের দক্ষিণে পাথর দিয়ে সাঙ্গড়ের সারি গড়ে তুলেছিল ইংরাজ ফৌজের আক্রমণ রোধ করার জন্য। উপজাতীয় যোদ্ধারা এই সব সাঙ্গড়ের আড়ালে আক্রমণকারী ব্রিটিশ সৈন্যের মোকাবেলা করার জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ব্রিটিশ গোলন্দাজ সৈন্যের কামানের গোলায় সাঙ্গড়গুলি তাসের ঘরের মতই লুটিয়ে পড়ল। একের পর এক পাখতুন যোদ্ধাদের মধ্যে অনেকে পিষে গেল কামানের গোলায়। তারপর আরম্ভ হল সাখাকোট ও দরগাই গ্রামের ওপর ব্রিটিশ পদাতিক সৈন্যের আক্রমণ। গ্রাম দুটি রক্ষার জন্য রানিজাইরা প্রভূত সাহস আর বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করল। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি আর অলিগলিতে তারা ব্রিটিশ সৈন্যকে বাধা দান করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করল , কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ইংরাজবাহিনীরই জয় হল। এই যুদ্ধের প্রামাণিক বিবরণ থেকে জানতে পারা যায় যে ব্রিটিশ সৈন্যের হতাহতর সংখ্যাও প্রচূর ছিল এই যুদ্ধে।

এরপর আরও কয়েকটি পাখতুন উপজাতির সঙ্গে ইংরাজের যুদ্ধ হয়ে গেল ১৮৫২ সালে। উত্তরে ইউসুফজাই এবং সোমান্দ, মধ্য পাখতুনিস্থানে আদমখেল এবং দক্ষিণে শিরানি উপজাতি প্রায় একই সময় তাদের এলাকার মধ্যে ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলি আক্রমণ করে ঘাঁটির রক্ষিদলসমূহকে পর্যুদস্ত করল। ফলে অতিরিক্ত কয়েকটি বিশেষ বাহিনী গঠন করে পাঠালেন ইংরাজ সরকার, আক্রমণকারী উপজাতিগুলিকে দমন করার জন্য। এগুলির মধ্যে ইউসুফজাইদের অভ্যুত্থানটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। কর্নেল ম্যাকসন পাঁচ হাজার সৈন্যের এক ব্রিটিশ ফৌজ নিয়ে  কয়েকমাস ধরে যুদ্ধ করে ইউসুফজাইদের পরাস্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে কর্নেল ম্যাকসন  ইউসুফজাইদের গ্রামগুলি সম্পূর্ণরূপে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন ।

১৮৫১ সালে থাল এর দক্ষিনে যে সব ওয়াজিরি উপজাতি ব্রিটিশের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল তারা ১৮৫৪ সালে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল । মাঝে দীর্ঘ চার বছর সময় তাদের কতকটা চুপচাপ থাকতে হয়েছিল কারণ ইংরাজ ফৌজ তাদের গ্রামগুলি সমস্ত 
ধ্বংস করে দেওয়ায় তারা স্ত্রীলোক ও শিশুদের নিয়ে বনে, জঙ্গলে ,গুহায় বাস করতে বাধ্য হয়েছিল। অনাহারে, অর্ধাহারে, নিষ্ঠুর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে তাদের দিন কাটাতে হয়েছিল। এই অসহনীয় অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি তারা সহজেই পেতে পারত বহিরাগত দখলকারি ইংরাজের কাছে নতি স্বীকার করে , কিন্তু তা তারা করেনি।

*********

রশীদ খান তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু কূদরৎ খানের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন একদিন। কুদরৎ খান রশীদের মতই লম্বা চওড়া জোয়ান মানুষ, পেশীবহুল শরীর , মাথায় বাবরি চুল, গায়ের রং ফিকে গোলাপি, সুন্দর চেহারা। রশীদের এর সঙ্গে কুদরৎ খানের কয়েকটা বিষয়ে খুবই অমিল। রশীদ খানের চোখের দৃষ্টি স্থির ,কুদরৎ খানের চঞ্চল। রশীদ অত্যন্ত ধীরস্থির প্রকৃতির লোক, কুদরৎ-এর প্রকৃতি অস্থির। রশীদ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, কুদরৎ এর দৌড় মোল্লাদের মাদরাসা পর্য্যন্ত। রশীদ নেশা করেন, কুদরৎ মাদক দ্রব্য স্পর্শ পর্য্যন্ত করেন না। রাইফেল, রিভলবার তৈরি করতে ঐ অঞ্চলে তাঁর জুড়ি ছিলনা। কুদরৎ খানের হাতের তৈরি লি এনফিল্ড ও বিএসএ রাইফেলের এবং ওয়েবলি স্কট রিভলবারের হুবহু কপি দেখে আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি যে সেগুলি বিলাতের আধুনিক কারখানায় তৈরি নয়। আগেই বলেছি কুদরৎ খান ও তাঁর স্ত্রী সলমা থাকেন মান্দুরির কাছে আমাদিশামা গ্রামে ও তাঁড় স্ত্রী পেওয়াড় গিরিসঙ্কটের মুখে শালোজান গ্রামের মেয়ে।

পারাচিনার থেকে একটা কাঁচা রাস্তা চলে গেছে শালোজান গ্রামের মাঝখান দিয়ে পেওয়াড় গিরিসংকট পর্যন্ত।তারপর সেটা পশ্চিমদিকে মোড় ঘুরে কাছেই ডুরান্ড লাইনের ওপর ইংরাজ সরকারের সামরিক পোস্ট খারলাচিতে শেষ হয়েছে। পেওয়াড় দিয়ে আফগানিস্থানে যাতায়াত করতে গেলে শালোজান গ্রামের সঙ্গে পরিচয় না হয়ে উপায় নেই। শালোজানের আখরোট , আপেল, আঙুর যেমন প্রসিদ্ধ তেমনই ঐ গ্রামের  মেয়েদের সৌন্দর্যও গোটা পাখতুনিস্থানে বিখ্যাত। তবে সে মেয়েরা মোটেই কাব্যটাব্যের ময়েদের মত ধীরস্থির নয়, এদের গতি গজরাজের মন্দ গতির মত মোটেই না, বরং হরিণের সঙ্গে মিল আছে। শোনা যায় যে আফগান নৃপতি ও সভাসদদের পক্ষে অন্তত একটি করে শালোজান কন্যা বিবাহ করা অনিবার্য প্রথা। তবে এ গ্রামের মেয়ে বিয়ে করা অত্যন্ত ব্যায়সাপেক্ষ। মেয়ের সমান ওজন খাঁটি রুপোর আফগানি টাকা কন্যাপণ হিসেবে দিতে হয়, কাজেই আমির ওমরাহ ধরনের লোক ছাড়া সাধারনের নাগালের বাইরে । এহেন গ্রামের মেয়েকে অতি সাধারন আর্থিক অবস্থার লোক কুদরৎ খান কী করে বিয়ে করে আনল তার অন্য ইতিহাস আছে।

*********

থাল এর উত্তর পশ্চিমে প্রায় ষাট মাইল রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছতে হয় পারাচিনারের (আদি নাম তুতকাই) মালভূমিতে। ছ হাজার ফুট পাহাড়ের মাথায় ষোল মাইল লম্বা ও বারো মাইল চওড়া সমতলভূমির মাঝখানে ছোট্ট উপজাতীয় গ্রাম। গ্রামটির পশ্চিমে প্রায় আধ মাইল দূরে পারাচিনারের ব্রিটিশ দুর্গ। দুর্গরক্ষি সৈন্য এক ব্যাটেলিয়ান কুরাম মিলিশিয়ার সিপাই। দুর্গের পূর্বদিকে কিছু দূরে বড়ো বড়ো বাংলোয় থাকেন কুরামের পলিটিকাল এজেন্ট, কুরাম মিলিশিয়ার ব্রিটিশ অফিসাররা ও অ্যাসিস্ট্যান্ট পলিটিকাল অফিসার। পারাচিনারকে ঘিরে রেখেছে উত্তর আর উত্তর-পশ্চিম দিকে সুউচ্চ পর্বতশ্রেণী। পারাচিনার মালভূমিতে প্রচুর সবুজ গাছপালা, কিন্তু উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমের পাহাড়গুলি রুক্ষ ও কর্কশ ।

থাল পারাচিনার সড়কটি সাধারণত দিনের বেলায় যাতায়াতের পক্ষে নিরাপদ বলেই জানা ছিল, অবশ্য মাঝে মাঝে উপজাতীয় স্নাইপিং বা ছোটোখাটো হামলা যে না হত তা নয়, তবে তেমন ঘটনাকে সে দেশে স্বাভাবিক বলেই সকলে মনে করে। কিন্তু দুদিন পূর্বে মান্দুরি থেকে থালে ফেরার পথে যে ঘটনাটি হয়েছিল তার জন্য আমি একটু সন্ত্রস্ত মনে করছিলাম। বন্ধু রশীদ খান তখনও পেশাওয়ার থেকে ফিরে আসেন নি যে তাঁকে অনুরোধ  করব আমার সঙ্গে যেতে, অথচ পারাচিনার যাওয়া আমার একান্তই প্রয়োজন চাকরির খাতিরে। ভেবেচিন্তে কুদরৎ খাঁ এর কাছে বার্তা পাঠালাম আমার সঙ্গে পারাচিনার যাবার অনুরোধ জানিয়ে।

কুদরৎ খাঁ ও আমার দেহরক্ষী নাজিব গুলকে সঙ্গে নিয়ে পারাচিনার যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, এমন সময় কুরামের পলিটিকাল এজেন্টের কাছে থাল ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার্সে খবর এল যে ওয়াজিরি উপজাতির বহুসংখ্যক সশস্ত্র মানুষকে কুরাম উপত্যকার মধ্যে চলাচল করতে দেখা গিয়েছে। সেইজন্য থাল পারাচিনার সড়ক ছাপরিতে বন্ধ করে দেওয়া হবে বেলা একটার সময়। ওই সময়ের পর সেদিন কোনও যানবাহনকে ছাপরি গেট অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না ,কারণ বিপদের সম্ভাবনা প্রচুর।

কুদরৎ খাঁ ও নাজিব গুলকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম বেলা বারটা নাগাদ। থাল থেকে ছাপরি মাত্র ছয় সাত মাইল দূর, পাহাড়ি রাস্তা হলেও মিনিট পনেরো কুড়ির মধ্যে ছাপরি পৌঁছে যাবার কথা। কাজেই নিশ্চিন্ত ছিলাম যে রাস্তা বন্ধ হবার আগেই আমরা ছাপরি পেরিয়ে যাব।

ছাপরি গেটে পৌঁছতে আর মাইল দেড় রাস্তা বাকি, পাহাড়ের গায়ে ছাপরির মিলিশিয়া পোস্ট স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এমন সময় কড়াং শব্দ করে আমার গাড়ির টাই রডটা খুলে গেল। গাড়ি থামিয়ে গাড়ির তলায় ঢুকলাম মেরামত করার প্রয়াসে। কুদরৎ খাঁ ও নাজিব গুল নিজেদের রাইফেল নিয়ে গাড়ির দু পাশে দাঁড়িয়ে পাহারায় রত হল।

কয়েকবার টানাটানি করে টাই রডটাকে তার সকেটের ভিতর ফিট করলাম কিন্তু প্রত্যেক বারই গাড়ি চালাবার সঙ্গে সঙ্গেই খুলে বেরিয়ে যায়। এমনি করে প্রায় দু ঘন্টা সময়  নষ্ট করলাম, শেষে কুদরৎ খাঁ নিজের রাইফেলটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এবার আপনি পাহারাদারের ভূমিকা নিন,আমি একবার দেখি গাড়িটাকে চালু করতে পারি কি না। এসব কাজ এঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা হয় না। মিস্ত্রিরাই পারে।”

কুদরৎ খাঁ সুদক্ষ কারিগর। আধ ঘণ্টার মধ্যেই ঠুকে পিটে টাই রডটা লাগিয়ে গাড়ি চালু করে দিল। ছাপরিতে গিয়ে পৌঁছলাম বেলা চারটের পর। রাস্তা তখন বন্ধ ,আর গেটের ওপর কড়া পাহারা। মিলিশিয়ার সিপাইরা কিছুতেই গেট খুলতে রাজি হল না। মিলিশিয়া পোস্ট থেকে পারাচিনারে অ্যাসিস্ট্যান্ট পলিটিকাল অফিসার খাঁ বাহাদুর নক্সবন্দ খাঁকে টেলিফোনে  অনুরোধ করলাম আমাকে ছাপরি পার হবার অনুমতি দিতে। খাঁ বাহাদুর  সাহেব রাজি হলেন না, যেহেতু সেদিনকার পরিস্থিতিতে তিনি আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারবেন না। কাজেই ছাপরি গেট পার হবার অনুমতি দিতে তিনি অক্ষম।

কী করা যায় ভেবে কোনও কুলকিনারা পেলাম না। তখন থালে ফিরবার পথও কম বিপদজনক নয়। সন্ধ্যার পর থেকে স্বাভাবিক অবস্থাতেও ব্রিটিশ কেল্লার দেয়ালের বাইরে উপজাতীয়দের রাজত্ব চলে। কুদরৎ খাঁর পরামর্শ চাইলাম। কুদরৎ খাঁ বলল, “শোন সাহেব, ছাপরির বন্ধ গেটকে ফাঁকি দিয়ে পারাচিনার যাওয়া খুবই সহজ। গাড়িটাকে মাইল আড়াই পিছিয়ে নিয়ে গেলে একটা অস্থায়ী সেতুর কাছাকাছি পৌঁছনো যাবে। সেই সেতু দিয়ে কুরাম নদী পার হয়ে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডের’ ভিতর দিয়ে একটি কাঁচা রাস্তা চলে গেছে মান্দুরির ওপারে। মান্দুরিতে আর একটি অস্থায়ী সেতু আছে, সেই সেতু পেরিয়ে এপারে এসে এই রাস্তায় উঠতে পারা যাবে। তারপর ছাপরির বন্ধ গেটের তোয়াক্কা রাখতে হবে না।”

‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ এর ভিতর দিয়ে চোদ্দ মাইল কাঁচা রাস্তা পার করার প্রস্তাবে মনটা ভীষণ দমে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম ওই রাস্তায় কোনও বিপদ আছে কি না। আমার প্রশ্ন শুনে কুদরৎ খাঁ ও নাজিব গুল দু জনেই হেসে উঠল। কুদরৎ খাঁ বলল, “বিপদ কোথায় নেই ? মানুষের ছায়ার মতই বিপদ তার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় সর্বদা , বিপদের মুখোমুখি হয়ে তার সঙ্গে পাঞ্জা লড়েই তাকে পরাস্ত  করা যায়।”

উপায়ান্তর না দেখে কুদরৎ খাঁর পরামর্শ অনুযায়ী গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে গিয়ে অস্থায়ী সেতুটি পার করে নো ম্যানস ল্যান্ডের ভিতর দিয়ে ছোটোছোটো পাহাড়ের মাঝে কাঁচা সড়কটি দিয়ে এগোতে লাগলাম। রাস্তাটি খুবই খারাপ ও মোটরকার চলার পক্ষে অনুপযোগী। গাড়িটা হোঁচট খেতে খেতে ঘণ্টায় মাত্র দশ মাইল স্পিডে চলছিল।

সূর্য তখন ডুবু ডুবু করছে, সেই সময় একটা মোড় ঘুরতেই দেখি সামনে প্রায় একশ গজ দূরে একটি টিলার ওপর জনা ত্রিশ উপজাতীয় লোক তাদের রাইফেল বাগিয়ে বসে আছে,লক্ষ আমাদের গাড়ি। সেই দলের দলপতি তাঁর টাট্টুঘোড়াটি ছুটিয়ে রাস্তার ওপর গাড়ির সামনে থামলেন, আর রিভলভার তাগ করে হুঙ্কার ছাড়লেন, “ওয়াদারেগা”,  অর্থাৎ থামো। আমার তো হার্ট ফেল হবার জোগাড়। মনে হল সাক্ষাৎ যমরাজের অনুচর আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত এসে গেছে। আমি গাড়ি থামিয়ে দিলাম। দলপতি প্রশ্ন করলেন, “তা চোকে”(তুমি ক)? উত্তর দেবার চেষ্টা করলাম,কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। সেই সময় কুদরৎ খাঁ গাড়ির ভিতর থেকে চিৎকার  করে দলপতিকে লক্ষ করে বলল, “তা মালিক সাব দে” (তুমি কী মালিক সাহেব)? কুদরৎ খাঁর গলার স্বর চিনতে পেরে মালিক সাহেব রিভলবার খাপে পুরে টাট্টুঘোড়া থেকে নামলেন। ইতিমধ্যে কুদরৎ খাঁ গাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এল ও দলপতির করমর্দন করে তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপ আরম্ভ করে দিল। কয়েকমিনিট পরে দলপতি আমার দিকে এগিয়ে এসে “স্তু্ড়িমাসে” বলে সাদর সম্ভাষণ করে হাত বাড়িয়ে দিলেন, আমিও তাঁর করমর্দন করে প্রত্যাভিবাদন করলাম “খোয়ারমাসে” বলে। দলপতি বললেন যে, কুদরৎ খাঁ সঙ্গে থাকার জন্য আমার প্রাণটা সে যাত্রা বেঁচে গেল। সাবধান করে দিলেন সাদ্দা ফোর্টের পাশ দিয়ে যাবার সময় যেন খুব সতর্ক থাকি , কেননা ফোর্টের কাছে বঙ্গশ,বিলন্দ খেল ও পাড়া উপজাতীয়দের খুব বড়ো একটা দল জমায়েত হয়ে আছে। দলপতির সঙ্গে আমরা সকলে করমর্দন করে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করলাম।

timemachineseemanter (Medium)

সাদ্দা ফোর্টে পৌঁছবার আগেই হাল্কা হাল্কা তুষারপাত আরম্ভ হয়েছিল এবং সম্ভবত সেইজন্যই সাদ্দায় জমায়েত উপজাতীয় দল সড়কের ওপর বিশেষ নজর রাখেনি। আমরা নির্বিঘ্নে ওই বিপদজনক স্থান পার হয়ে গেলাম। কিন্তু আরও একটা ক্ষুদ্রতর বিপদ  অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য পথে। পারাচিনার পৌঁছতে তখনও মাইলতিনেক রাস্তা বাকি, তুষারপাত প্রচণ্ড হয়ে উঠেছে আর রাস্তার ওপর এত বরফ জমে গেছে যে গাড়ি আর স্টিয়ারিং এর বশে চলতে চাইছে না, বরফের ওপর স্কিড করে যত্রতত্র চলে বেড়াচ্ছে। কয়েকশ গজ পথ এমনি ভাবে রাস্তার এপাশে ওপাশে চলে গাড়ির চাকা বরফের ভিতর একেবারে বসে গেল। আ্যক্সিলারেটারে চাপ দিয়ে যতই গাড়িটাকে আগে বাড়াবার চেষ্টা করি ততই গাড়ি বরফের মধ্যে ডুবে যায়। শেষ পর্যন্ত গাড়িটাকে সেইখানেই ফেলে রেখে আমরা হাঁটতে আরম্ভ করলাম। পড়ন্ত বরফের ওপর দিয়ে হাঁটাও এক দুরূহ কাজ। একে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তখন হাত পা প্রায় অসাড়, তার ওপর বরফের ভিতর পা ডুবে যাচ্ছে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত। কোনওরকমে যখন পারাচিনার পৌঁছলাম তখন রাত একটা  বেজে গেছে । সে সময়ে আমার স্ত্রী ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকতেন পারাচিনারে। তিনি খবর পেয়েছিলেন যে আমি সন্ধ্যা নাগাদ সেখানে পৌঁছব। কিন্তু রাত দশটা পর্যন্ত আমি না পৌঁছনোয় তিনি খাঁ বাহাদুর নক্স বন্দ খাঁ সাহেবের কাছে লোক পাঠালেন, তিনি কোনও খবর দিতে পারেন কিনা জানবার জন্য। খাঁ বাহাদুর সাহেব বলে পাঠালেন যে যেহেতু তিনি আমাকে ছাপরি গেট অতিক্রম করার অনুমতি দেননি, আর তিনি খবর নিয়ে জেনেছেন যে আমি থালেও ফেরত যাই নি, তখন ধরে নিতে হবে যে আমি উপজাতীয় লশকরের হাতে নিহত হয়েছি। তিনি আশ্বাস দিলেন যে পরের দিন তিনি সার্চ পার্টি পাঠাবেন আমার মৃতদেহ তল্লাশের চেষ্টায়।

খাঁ বাহাদুর সাহেব আমাকে তাঁর খাতা থেকে একেবারে ছেঁটে বাদ দিয়েছিলেন। আমি সশরীরে উপস্থিত হওয়ায় আমার ক্রন্দনরতা স্ত্রীর মুখে হাসি ফুটে উঠল।  সরকারি কাজ সারা করে পরদিন বিকেলবেলায় আমার থালে ফিরে যাবার কথা, কিন্তু আমি আটক হয়ে পড়লাম। সেই রাতে আমরা সাদ্দা ফোর্ট অতিক্রম করার পর উপজাতীয় লশকর ফোর্ট আক্রমণ ও দুর্গরক্ষীদের পরাস্ত করে ফোর্টে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কোহাট থেকে ব্রিটিশ আর্মর্ড কলম এসে রাস্তা বিপদমুক্ত না করা পর্যন্ত থাল-পারাচিনার রাস্তা সরকারি হুকুমে সর্বসাধারণের ও বিশেষ করে সরকারি চাকুরেদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ।      

   ক্রমশ

সীমান্তের অন্তরালে–সমস্ত এপিসোড একত্রে এই লিংকে–>