পরিযায়ী পাখিদের তালিকায় বোধ হয় হাঁসের সংখ্যা সবথেকে বেশি। হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এরা উড়ে বেড়ায় এক দেশ থেকে আর এক দেশে। কখনও শীত এড়াতে, আবার কখনও গ্রীষ্ম এড়াতে, আর অবশ্যই খাদ্যের খোঁজে। ভারতে এরা শীতের পরিযায়ী হয়ে আসে, আর এখানেই প্রজনন করে গ্রীষ্মের আগেই ছানাপোনাদের নিয়ে পাড়ি দেয় নিজ বাসস্থানে। এবার এমনই এক পরিযায়ী হাঁসের গল্প নিয়ে উপস্থিত হলাম, যাকে দেখতে যেতে হয় বড়ো কোনও জলাশয়ে যেখানে তারা বাস করে, প্রজনন করে আর অপরিমিত খাদ্য পেয়ে থাকে। দেখতে গৃহপালিত হাঁসের মতোই আর ডাকও প্রায় একই প্রকারের, কেবল গায়ের রঙ ভিন্ন আর একটু ছোটো আকারের। এই পরিযায়ী হাঁসকে বাংলায় বলা হয় ‘পিয়াং হাঁস’, আর ইংরেজিতে ‘গাদওয়াল’।
পিয়াং হাঁস (Gadwall, বৈজ্ঞানিক নাম: Anas strepera) Anatidae গোত্রের অন্তর্গত একটি মাঝারি আকারের পরিযায়ী হাঁস। শীতে বাংলাদেশ-সহ বিভিন্ন দেশে এদের প্রচুর দেখা যায়। ধূসর রঙের এই হাঁসটি ১৮-২২ ইঞ্চি লম্বা ও ওজনে প্রায় ৭৪০-৯৯০ গ্রাম হয়। পুরুষ হাঁস স্ত্রী হাঁসের চেয়ে কিছুটা বড়ো এবং এদের প্রধান খাদ্য জলজ উদ্ভিদ ও বীজ। এরা দলবদ্ধভাবে থাকতে পছন্দ করে এবং মাঝে মাঝে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে থাকতে দেখা যায়। এরা উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া ও সাইবেরিয়ার প্রজনন করে এবং শীতকালে ভারত-সহ বাংলাদেশের উষ্ণ অঞ্চলে পরিযায়ী হিসেবে আসে। পিয়াং হাঁস প্রধানত জলজ উদ্ভিদ, বীজ, ছোটো জলজ পোকা এবং মাছ খায়। আই.ইউ.সি.এন. (IUCN) পিয়াং হাঁসকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত (Least Concern) বলে ঘোষণা করেছে। ভারত-সহ দক্ষিণ এশিয়ার জলাশয়গুলোতে শীতের শুরুতে এই হাঁসগুলোর আগমনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। পাখিটির পিছনের অংশ দেখতে কালো বর্ণের। ডানার ওপরের অংশ পিঙ্গল বর্ণের এবং নীচের অংশ ধবধবে সাদা। এর ঠোঁট নীলাভ ধূসর। পা এবং পায়ের পাতা দেখতে হলুদ রঙের। স্ত্রী পাখিটি দেখতে অনেকটা পুরুষ পাখিটির মতো। তবে এদের সারাদেহে বাদামি বর্ণের ছোপ দেখা যায়। এদের ঠোঁট হলুদ, সঙ্গে কালো রঙের দাগ থাকে। পিয়াং হাঁসকে সাধারণত খোলা জলাভূমিতে দেখতে পাওয়া যায়। বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে থাকতে এরা পছন্দ করে। এই প্রজাতির পাখিরা শাকাহারী স্বভাবের হয়। এরা জলে ডুব দিয়ে খাবার সংগ্রহ করে। এদের খাদ্য তালিকায় আছে বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ, শৈবাল, ঘাস, নলখাগড়া, হোগলা পাতা, আগাছা ও উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ যেমন পাতা, মূল, কাণ্ড, বীজ ইত্যাদি। প্রজননকালে এরা মাংসাশী স্বভাবের হয়। এ-সময় এরা শামুক ও অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণী খেয়ে থাকে। পিয়াং হাঁসের প্রজনন মৌসুম শুরু হয় শীতকালে। এরা জমিতে বাসা বানায়, যা জল থেকে দূরে থাকে। এদের বাসা সহজে চিহ্নিত করা যায় না। স্ত্রী হাঁসটি বাসা বানানোর দায়িত্বে থাকে এবং পুরুষ হাঁসটি নিরাপত্তা প্রদান করে। গাছের পাতা, ডাল, খড়কুটো ইত্যাদি দিয়ে বাসা বানানো হয়। বাসা তৈরি হলে স্ত্রী পাখিটি ডিম পাড়ে। এরা একসঙ্গে ৭ থেকে ১২টি ডিম পাড়ে। ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা বের হতে সময় লাগে ২৪ থেকে ২৭ দিন।
আমার শহর কল্যাণী থেকে পূর্বস্থলী গাড়িতে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। ট্রেনে গেলে কৃষ্ণনগরে নেমে, চৈতন্য সেতু পার করে পৌঁছতে হয় পূর্বস্থলীর চুপিরচরের জলাশয়ে। এই জলাশয় গঙ্গার সঙ্গে যুক্ত থাকায় এখানে সারাবছর জলের অভাব হয় না, আর শীতকালে এখানে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে। বহুদূর থেকে পক্ষী-পর্যবেক্ষক এবং পক্ষীবিদেরা এখানে এসে থাকেন পাখিদের আনাগোনা দেখার জন্য। আমার এই জলাশয়ে এক পরিচিত নৌকাবাহক আছে। সে আমাকে ফোনে জানায় কোনও নতুন পাখি আগমন হল কি না। ২০২৫-এ শীত বেশ জাঁকিয়ে পড়েছিল। সে আমাকে খবর দেয়, প্রচুর পরিমাণে রাঙ্গামুড়ি অথবা লালঝুঁটি ভুতিহাঁস, যাকে ইংরেজিতে রেড ক্রেস্টেড পোচার্ড বলা হয়, তার আগমন হয়েছে। তাহলে তো যেতেই হয় চুপিরচর; এই সুযোগ প্রকৃতি ঈশ্বর বার বার দেন না।
এক শীতের ভোরে বেরিয়ে পড়লাম দুজনে, আমি আর আমার স্ত্রী। নৌকাবাহককে বলা ছিল, সে তীরে তৈরি ছিল আমাদের জন্য। দাঁড় টেনে মাঝিভাইকে অনেকটা যেতে হল, তারপর মানুষের কোলাহল থেকে একটু দূরে পৌঁছতেই আরম্ভ হল পাখিদের কোলাহল। কিচিরমিচির শব্দে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। বেশিরভাগ ডাকগুলো শোনা যাচ্ছে সরাল ও ডাউখোল (Lesser Whistling Duck & Coot) পাখিদের। আরও নিরিবিলি স্থানে পৌঁছে পাওয়া গেল সেই গোলাপি মাথাওয়ালা হাঁস জাতীয় পাখি অথবা লাল ঝুঁটি ভুতিহাঁস। কী অপূর্ব দেখতে সেই পাখি! এই পাখির গল্প নিয়ে পরে আবার লিখব।
ঘুরতে ঘুরতে বেশ বেলা হয়ে গেল। এবারে ফেরার পালা। মাঝি জানতে চাইল, একবার উলটোদিকের প্রান্তে যাব কি না। সেখানেও অনেক পরিযায়ী পাখি দেখা যায়। বেশ তো, তবে দেরি কীসের? যাওয়া যাক সেদিকে। এসেছি তো পাখি দেখতে। প্রতিদিন তো আর আসা হবে না। এই বলে নৌকা চলল সেই প্রান্তের দিকে, যেদিকে কিছু পরিযায়ী পাখিদের দেখা পাওয়া যায়। পূর্বস্থলীর এই পাখিরালয়ে কোনও মোটরবোট চলে না। ইঞ্জিন লাগানো বারণ, কারণ সেই শব্দে পাখিরা আর আসবে না। তাই দাঁড় টানা নৌকাই নিঃশব্দে চলে। জলে কেবল ছলাৎ ছলাৎ দাঁড় টানার শব্দ। এই শব্দে পাখিদেরও কোনও শান্তি ভঙ্গের উপদ্রব হয় না। এই অন্য প্রান্তে পৌঁছতে একটু সময় লাগল ঠিকই, কিন্তু কাছে পৌঁছতেই অনেক হাঁস জাতীয় পাখির দেখা পেলাম। আমাদের নৌকাবাহক জানাল, এর থেকে বেশি কাছে গেলে পাখিরা উড়ে যাবে, তাই আমার ক্যামেরায় লাগানো লম্বা লেন্সের সাহায্যে ছবি তুলতে হবে। এরই মধ্যে দেখতে পেলাম, আমার আশেপাশে আরও কিছু নৌকা এসে উপস্থিত হয়েছে, আর তাতে আমার মতো বড়ো লেন্স লাগানো ক্যামেরা নিয়ে প্রায় শুয়ে পড়ে তারাও হাঁসের ছবি তুলতে প্রস্তুত। আমিও একই অঙ্গভঙ্গি করে ছবি তোলার জন্য প্রস্তুত হলাম। এই ভঙ্গিমায় একটা সুবিধা যে ক্যামেরা নড়বে না, আর ছবি পরিষ্কার আসবে। কারণ, এই বড়ো লেন্স বেশ ভারী ওজনের, আর হাতে ধরে রাখা খুব কঠিন। তাই হয় ট্রাইপড স্ট্যান্ড ব্যবহার করতে হয়, না-হলে এইভাবে শুয়ে ক্যামেরা একটা সমান জায়গায় রেখে যাতে না নড়ে, তারপর ছবি তোলা। খালি চোখে বোঝা যাচ্ছে যে দূরে একদল হাঁস রয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার প্রজাতি চেনা যাচ্ছে না। লেন্স চোখে দিয়ে দেখা মাত্র বোঝা গেল, এই হাঁস আমাদের স্থানীয় নয়।
এই পাখি চোখে দেখতে পাওয়ায় নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। কারণ, গাদওয়াল অথবা পিয়াং হাঁস উত্তর আমেরিকা এবং উত্তর ও মধ্য ইউরেশিয়ার ৪০° থেকে ৬০° উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে বিস্তৃত অঞ্চলে বংশবৃদ্ধি করে। শীতকালে এরা দক্ষিণদিকে মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ-মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরেশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার ২০° উত্তর থেকে ৬০° উত্তর অক্ষাংশের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করে। এই পাখি ভারতীয় উপমহাদেশের এক সাধারণ শীতকালীন পরিযায়ী পাখি, যা মূল ভূখণ্ডের নলখাগড়াপূর্ণ জলাভূমিতে দেখা যায়; যেমন চুপিরচর পূর্বস্থলীতে অথবা ভারতের বিভিন্ন জলাভূমি যেমন সুলতানপুর, কেওলাদেও, মঙ্গলাজোড়ি ইত্যাদি। দক্ষিণ ভারতে এরা বিরল এবং শ্রীলঙ্কায় এদের খুব কমই দেখা যায়। এই পাখিরা অক্টোবর মাস থেকে আসতে শুরু করে। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে এদের সংখ্যা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায় এবং মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মধ্যে এরা আবার নিজের বাসভূমিতে ফিরে যায়। রাজস্থানের ভরতপুরের কেওলাদেও পাখিরালয়ের ‘রিংগিং ডেটা’ (পাখির পায়ে রিং পরিয়ে সংগৃহীত তথ্য) থেকে জানা গেছে যে এই হাঁসেরা সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আসতে শুরু করেছিল এবং এপ্রিলের মধ্যে অধিকাংশ আবার ফিরে গিয়েছিল।
পরিযায়ী পাখিদের নিয়ে লিখতে গিয়ে একটা তথ্য আগেও দিয়েছি, আবার জানিয়ে রাখি যে এরা তাদের গন্তব্য কী করে চিনে রাখে। এদের সঙ্গে তো আর মানুষের মতো কম্পাস অথবা ম্যাপ (মানচিত্র) থাকে না। তাহলে প্রতিবছর এরা কী করে পথ চিনে সেই স্থানে পৌঁছে যায়? পরিযায়ী পাখিরা শুধু মানচিত্র বা স্মৃতির অপর নির্ভর করে না। চৌম্বকীয় সংবেদনের মাধ্যমে তারা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র অনুভব করতে পারে এবং গ্রহটিকে একটি জীবন্ত কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে হাজার হাজার মাইল জুড়ে অবিশ্বাস্য নির্ভুলতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে পথ চলে।
পাখি পরিযান (Bird Migration) হল নির্দিষ্ট প্রজাতির পাখিদের ঋতু পরিবর্তন বা খাদ্যের খোঁজে প্রতিবছর দুটি ভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে নিয়মিত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রক্রিয়া, যা তাদের প্রজনন ও বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। এই পাখিদের পরিযায়ী পাখি বলা হয়, যারা খাদ্য ও অনুকূল আবহাওয়ার খোঁজে উত্তর থেকে দক্ষিণে বা দক্ষিণ থেকে উত্তরে হাজার হাজার কিলোমিটার উড়ে যায় এবং সূর্য, নক্ষত্র, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র বা পরিচিত ভৌগোলিক চিহ্ন ব্যবহার করে পথ চেনে। ভাবতে অবাক লাগে যে প্রতিবছর এরা নিয়ম করে এসে আমাদের দেখা দেয়। এদের সংরক্ষণ আমাদের দায়িত্ব। প্রাণীরা কথা বলতে পারে না, তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। বন্যপ্রাণী ফটোগ্রাফার হিসেবে আমরা আমাদের ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের হয়ে কথা বলতে পারি এবং তাদের রক্ষা করতে পারি। এভাবেই আমরা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অবদান রাখতে পারি। এর পরের অধ্যায়ে অন্য এক প্রজাতির পরিযায়ী হাঁস নিয়ে আবার উপস্থিত হয়ে এক দারুণ তথ্য দেব যা সত্যিই চমকপ্রদ।