বিচিত্র দুনিয়া-অজিব দাস্তাঁ-হোরেশিও(পর্ব-৯) -বর্ষা’২৬

আগের পর্ব- পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮

আশ্চর্য জীবাশ্ম

সাপের ভেতর ইগুয়ানা শ্রেণির টিকটিকি, তার ভেতরে চকচকে পোকা। না না, কালাজাদু-টাদু নয়, আশ্চর্য এক জীবাশ্ম।

দক্ষিণ পশ্চিম জার্মানির মেসেল পিট অঞ্চল একসময় তেলসমৃদ্ধ খনিজ পদার্থের (oil shale) খনি ছিল। কিন্তু সেখানের পাললিক শিলায় বহুল পরিমাণে প্রাগৈতিহাসিক জীবাশ্ম পাওয়া যাওয়ার ফলে মেসেল পিটকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আনুমানিক ৪৭ মিলিয়ন বছর আগে এখানে কোনও আগ্নেয়গিরিতে প্রবল বিস্ফোরণ ঘটায় বিশাল একটা গর্ত তৈরি হয়েছিল। পরে জল জমে এই গর্ত হ্রদে পরিণত হয়। এই বিষাক্ত খনিজ উপাদানে পূর্ণ হ্রদের তলার কাদা ছিল অক্সিজেনহীন। জ্বালামুখ হ্রদ সাধারণত যেমন হয়ে থাকে আর কি। এই হ্রদের তলায় জমে থাকা মৃত প্রাণী বা উদ্ভিদের দেহে অক্সিজেনের অভাবে পচন তো ধরেইনি, বরং সেগুলো ধীরে ধীরে চমৎকার সব জীবাশ্মে পরিণত হয়েছে। হ্রদ শুকিয়ে তৈরি হয়েছে পাললিক শিলা।  পৃথিবীতে তখন ইওসিন যুগ ( Eocene Epoch) চলছিল, তাই সেই যুগের প্রাণীদের একেবারে অক্ষত জীবাশ্ম দেখার সুযোগ পাওয়া যায় মেসেল পিটের সাইটে।

তবে সবচেয়ে আশ্চর্য জীবাশ্মটির কথা শুরুতেই বলেছি, রাশিয়ান মাত্রোশকা পুতুলের মতো সাপের মধ্যে টিকটিকি, তার ভেতরে পোকা।

সম্ভবত প্রাগৈতিহাসিক ইগুয়ানা পোকা ভক্ষণের পরেই সর্প মহাশয়ের উদরস্থ হন। খাদ্যের হজম প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে সেই প্রাচীন সর্প দেহত্যাগ করেন। হয়তো বিষাক্ত হ্রদের খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন ফণীপ্রবর। যা-ই হোক, এই সম্মিলিত মৃতদেহ হ্রদে তলিয়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছিল এই অনবদ্য জীবাশ্ম। রইল সেই জীবাশ্মের ছবি।

চিত্র ঋণ: Krister Smith, Head of Dept. at Senckenberg Society for Nature Research, Frankfurt

জিওগ্লিফ

পাথুরে বা এমনি জমির ওপর ফুটিয়ে তোলা চার মিটার বা তার থেকেও বেশি দীর্ঘ ছবিকে বলে জিওগ্লিফ। পাথর বা অন্য কোনও উপাদান সাজিয়ে এই ছবি গড়ে তোলা যায়, অথবা উপরের স্তর সরিয়ে ফেলে তলার ভিন্ন রঙের মাটি বা পাথর অনাবৃত করেও জিওগ্লিফ বানানো হয়। এত দীর্ঘ হয় জিওগ্লিফ, স্বাভাবিকভাবেই ওপর থেকে না দেখলে ছবিটা সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায় না। পৃথিবীতে এমন অনেক প্রাচীন জিওগ্লিফ থাকলেও পেরুর নাজকা মরুভূমির নাজকা লাইনস সবচেয়ে বিখ্যাত। ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সৃষ্ট এই নাজকা লাইনসের শিল্পীদের নাম না জানা গেলেও এই চিত্র পেরুর নাজকা জনজাতির সংস্কৃতির অংশ ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। হয়তো ধর্মীয় কোনও কারণ ছিল, অথবা অন্য কিছু। ছবির বিষয়বস্তুও বৈচিত্র্যে ভরপুর। গাছগাছালি থেকে মাকড়সা, বাঁদর থেকে জ্যামিতিক নকশা—সবই আছে নাজকা লাইনের ভাঁড়ারে। ওপর থেকে না দেখেও এমন প্রতিসম ছবি কী উপায়ে তারা বানিয়েছিল, তা বোঝার উপায় আজ আর নেই।

সম্প্রতি ইয়ামাগাতা বিশ্ববিদ্যালয় আর আই.বি.এম-এর গবেষণা বিভাগ যুগ্মভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আকাশ থেকে তোলা নাজকা মরুভূমির বেশ কিছু ছবি বিশ্লেষণ করেছিল। মানুষের চর্মচক্ষে যেসব ক্ষয়ে যাওয়া বা ফিকে হয়ে যাওয়া রেখা ধরা পড়েনি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সে-সব রেখা মিলিয়ে আরও সাতশোর ওপর জিওগ্লিফের সন্ধান দিতে পেরেছে। সে-সব ছবিতে বেড়াল, টিয়াপাখি ছাড়া ধরা পড়েছে কাটা মুণ্ডুও। এসব সত্যিই নাজকা সংস্কৃতির মানুষদের তৈরি, নাকি সত্যিই ভিনগ্রহীরা এসেছিল এই নীল-সবুজ গ্রহে, কে জানে!

সঙ্গে রইল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কেরামতিতে খুঁজে পাওয়া জিওগ্লিফের ছবি। মরুভূমির ছবিগুলো ড্রোন দিয়ে তোলা হয়েছিল।

চিত্র ঋণ: SAKAI ET AL. PNAS (Masato Sakai of Yamagata University for Proceedings of the National Academy of Sciences)

কাঠ সহজ বস্তু নয়

পৃথিবীর মানুষের কাছে হিরের মর্যাদা যতই থাক না কেন, মহাজাগতিক নিরিখে কাঠ কিন্তু অনেক বেশি দুষ্প্রাপ্য ও দুর্মূল্য। ব্রহ্মাণ্ডে কার্বনের বিন্দুমাত্র অভাব নেই, আর চূড়ান্ত উচ্চচাপ ও উচ্চতাপ পরিস্থিতিতে এই কার্বন হামেশাই হিরেতে পরিণত হয়। নেপচুন বা ইউরেনাসের বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের পরিমাণ খুব বেশি। বায়ুমণ্ডলীয় চাপও তীব্র হওয়ার কারণে মিথেনের কার্বন পরমাণু প্রথমে গ্রাফাইট ও তারপর হীরায় পরিণত হয়। তারপর শিলাবৃষ্টির মতো হিরে-বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে সেগুলো। সুপারনোভার আবহেও হিরের কুচি পাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। এছাড়া গ্রহাণু আর উল্কার মধ্যেও হিরের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু কাঠ পেতে গেলে সত্যিই অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। জল তরল অবস্থায় আছে এমন গ্রহ চাই সবার আগে, তার বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আলো আসা চাই, অক্সিজেন চাই, সর্বোপরি সালোকসংশ্লেষে পোক্ত জীবজগতের সদস্য চাই। তারপর বহুবছরের অপেক্ষাও চাই। তবেই কাঠ মিলবে। এর একটা ধাপ বাদ গেলে কাঠের অস্তিত্বই থাকবে না।

ভবিষ্যতের আন্তঃগ্রহ বাণিজ্য মেলায় ভিনগ্রহের প্রাণীরা ‘হিরের বদলে কাঠ পেলুম টাকডুমাডুম ডুম’ বলে চারটে হাত কি আটটা পা নিয়ে নেচে বেড়ালে অবাক হওয়ার কিচ্ছুটি নেই।

বোগং মথ

অস্ট্রেলিয়ার বোগং মথের দল সেপ্টেম্বর নাগাদ অস্ট্রেলীয় আল্পসের ঠান্ডা অন্ধকার গুহার দিকে যাত্রা করে, আবার ডিম পাড়ার জন্য ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে কুইন্সল্যান্ড আর ভিক্টোরিয়া অঞ্চলে ফিরে আসে। প্রায় হাজার কিলোমিটারের এই পথ তারা রাত্রিবেলায় অতিক্রম করে, পথ দেখায় আকাশগঙ্গা। এরাই সম্ভবত একমাত্র পতঙ্গ যারা নক্ষত্র দেখে পথের সন্ধান করতে পারে। মেঘলা দিনে? পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের ওপর ভরসা করে গন্তব্যে পৌঁছে যায় তারা। রইল পতঙ্গ জগতের রবার্ট পিয়ারি বোগং মথের ছবি।

চিত্র ঋণ: উইকিকমন্স

 

Leave a Reply