ধারাবাহিক অভিযান- অজানা আফ্রিকায়- আর্থার ডোনাল্ডসন স্মিথ-ভাষান্তর: অরিন্দম দেবনাথ-অধ্যায় ৩ ও ৪-বর্ষা ২০২৬ (পর্ব-২)

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- ভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

পূর্বপ্রকাশিত–> পর্ব-১

তৃতীয় অধ্যায়

হারগেসায় 

জুলাইয়ের ১৭ তারিখ আমরা হারগেসায় পৌঁছেছিলাম। এটি সোমালিদের একটা বড়ো ও গুরুত্বপূর্ণ বসতি। এর প্রধান এক বিচক্ষণ বৃদ্ধ। বারবেরা থেকে যত ক্যারাভান এখানে আসে, সব পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে ইংরেজ সরকারের সশস্ত্র বাহিনী।

হারগেসা ছাড়ালেই আসে ‘হাউদ’ নামের প্রায় একশো মাইল লম্বা এক শুকনো তৃণভূমি। দক্ষিণে মিলমিল পর্যন্ত বিস্তৃত এই তৃণভূমিতে বর্ষার সময় ছাড়া একবিন্দু জল মেলে না। বর্ষা পরবর্তী সময়ে এই তৃণভূমি সবুজে ভরে যায়। তখন সোমালিরা হাউদে তাদের হাজার হাজার পশু চরাতে নিয়ে আসে। পশু চরানোর জায়গা দখল নিয়ে লড়াই বেধে যায় হাবর-আউয়াল, গাদেন ও অন্যান্য উপজাতিদের মধ্যে। গরমের সময় এই জায়গায় চরে বেড়ায় শুধু সিংহের দল আর কিছু গ্যাজেল ও আন্টিলোপ।

হারগেসায় আমাদের সম্মানে হারগেসার প্রধান এক ঘোড়সওয়ারি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। এক ডজন সোমালি যোদ্ধা ঘোড়ার পিঠে তাদের কসরত দেখিয়েছিল। যোদ্ধারা ধুলোর ঝড় তুলে উদ্দাম চিৎকার করতে করতে গোল হয়ে বর্শা ছুড়ে চলেছিল ক্রমাগত। দুই ভাগে ভাগ হয়ে যোদ্ধার দল যখন যুদ্ধ করছিল, তখন ওদের ঘোড়াগুলোর পিঠ আর মুখ থেকে রক্ত ঝরছিল। ঘোড়াগুলো যন্ত্রণায় চিৎকার করে চলছিল। সে এক ভয়াবহ দৃশ্য। এরা ঘোড়াগুলোর গায়ে এমনভাবে গিঁটওয়ালা দড়ি জড়িয়ে রাখে যে সামান্য ঘষাতেই ঘোড়াগুলো চামড়া কেটে রক্ত ঝরতে শুরু করে। ঘোড়াদের ঝরে পড়া রক্ত যোদ্ধাদের মনে কোনও দাগ কাটে বলে মনে হল না। উলটে যোদ্ধারা ঘোড়াগুলোর পিঠে মেরে চলেছিল ক্রমাগত।

চারদিন ছিলাম আমরা হারগেসাতে। উটগুলোকে বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন ছিল। এছাড়া এখান থেকে বেশ কিছু দুর্বল হয়ে পড়া উটের জায়গায় নতুন উট কিনেছিলাম। আর দুটো ছেলেকে দল থেকে তাড়িয়ে হারগেসা প্রধানের সহায়তায় দুজনকে দলে নিয়েছিলাম। ছেলে দুটোকে দল থেকে তাড়িয়েছিলাম ওদের অভব্য আচরণের জন্য। না-হলে দলের বাকিদের বিগড়ে দিত ওরা। প্রধান যে দুটো ছেলেকে জুটিয়ে দিয়েছিল, তার মধ্যে একটি ছেলে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বলে জানিয়েছিল প্রধান। ওর গণনা নাকি অভ্রান্ত! কথাটা যে সত্যি, তা অবশ্য প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল দিন কয়েকের মধ্যেই। ও আমাদের দলের একটা ছেলে দুয়াল্লা ফারহাকে দেখিয়ে বলেছিল যে সে আমাদের মধ্যে বেশিদিন থাকবে না। অপঘাতে মৃত্যু হবে ওর। আমাদের ক্যাম্পের কাছে এক নদী পার হতে গিয়ে ডুবে মারা গিয়েছিল বেচারা। ওই জায়গার কাছেই আমি তার খানিক আগে একটা বুনো কুকুরকে গুলি করে মেরেছিলাম।

ফ্রেড দিন তিনেকের জন্য কাছাকাছি অঞ্চলের মধ্যে থেকে শিকার অভিযানে গিয়েছিল। আমি যাইনি। কারণ, আমি শিকারের উদ্দেশ্যে আসিনি। ফ্রেড ফিরে এসেছিল উটের পিঠে শিকার বোঝাই করে। ফ্রেড ফিরে আসতে আমরা আর খুব একটা দেরি করিনি। পানীয় জলের ব্যারেলগুলো ভরতি করে রওনা হয়ে পড়েছিলাম মিলমিলের দিকে। ক্রমাগত চড়াই ভেঙে পৌঁছেছিলাম ৫,৫০০ ফুট উঁচু এক সমভূমিতে। সেখান থেকে টানা হেঁটে পৌঁছেছিলাম শুকনো তৃণভূমির প্রান্তে। এখান থেকে দিন পাঁচেক হাঁটলে তবে পৌঁছানো যাবে তৃণভূমির অন্য পারে।

মিলমিল

প্রতিদিন গড়ে নয় ঘণ্টা করে হেঁটে প্রায় চব্বিশ মাইল পার হচ্ছিলাম আমরা। হারগেসা পার হবার পর প্রথমে পৌঁছেছিলাম বুন-সেলা নামের একটা জায়গায়। এটা ছিল একটা সমতল ভূমি। ঘাসের আদিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। স্থানীয় রিপোর্ট অনুসারে, এটা সাত মাইল চওড়া ও পূর্ব-পশ্চিমে চল্লিশ মাইল লম্বা। ঘাসজমি হলেও পুরো অঞ্চলটা ছিল বাবলা আর মিমোসা গাছের ঝাড়ে ভরা। বাবলা আর মিমোসা গাছের কাঁটায় হাত কেটে যাচ্ছিল। দূর থেকে প্রায়শই মনে হচ্ছিল, আমরা এগিয়ে চলেছি পাহাড়ের দিকে। নজরে আসছিল দূরে পাহাড়ের শ্রেণি। কিন্তু খানিক পরেই টের পাচ্ছিলাম, ওই পাহাড়-টাহার দৃষ্টিবিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। আফ্রিকার সমতলের এক সাধারণ ব্যামো। কাঁটাগাছের খোঁচা খাওয়া ছাড়া ঘাসজমিতে হাঁটাটা আমার সেরকম কষ্টকর লাগেনি। গরমও কিছু অসহনীয় ছিল না। গড় তাপমাত্রা ছিল ৭৩ ডিগ্রি ফারেনফাইট।

২৭ জুলাই টাগ-মিলমিলের গাগাপে বলে এক স্থানে পৌঁছেছিলাম। এটা ওগাদেন প্রদেশের অন্তর্গত। ওখানে দেখা পেয়েছিলাম বেশ কিছু সুদর্শন পুরুষ ও মহিলার। বেশ কিছু স্বাস্থ্যবান উট ছিল এদের কাছে। সোমালিল্যান্ডের অন্যান্য অংশের থেকে এদের শারীরিক গঠন অনেকটাই আলাদা। গায়ের রঙ অনেক হালকা। এরা আগে পালে পালে উট নিয়ে চরিয়ে বেড়াত। এখন এদের কাছে উটের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে আবিসিনিয়ান উপজাতির লোকেরা এসে হামেশাই এদের ওপর আক্রমণ চালায় আর উট কেড়ে নিয়ে যায়। এরা প্রায় সবাই আরবি বোঝে। এদের দলের সব বালকের হাতেই একটা করে ছোটো কোরানের বাণী লেখা বোর্ড দেখতে পেয়েছিলাম।

মিলমিল অঞ্চলে বেশ কিছুদিন ছিলাম আমার লোকেদের বিশ্রাম দেবার জন্য। আমার আসার কথা জানতে পেরে বহুদূরের গ্রামগুলো থেকে লোকজন সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। নানারকম আমোদের ব্যবস্থা করেছিল ওরা। সঙ্গে লেনদেনও চলেছিল ভালোই। অনেকগুলো শক্তসমর্থ উট কিনেছিলাম। নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম দলে একশোরও বেশি উট থাকাতে। মিলমিলে আমার শিবিরের কাছেই এক সোমালিল্যান্ডে দেখা আমার সেরা সিংহটি শিকার করেছিলাম। একদল স্থানীয় লোক আমার কাছে এসে দরবার করেছিল একটা সিংহকে মেরে দিতে। সিংহটা রোজ লোক মারছিল। শুধু তাই নয়, সিংহটা গ্রামের কাঠের গুঁড়ির ঘের ‘জারেবা’ টপকে গ্রামে ঢুকেও মানুষ তুলে নিয়ে যাচ্ছিল দিনের পর দিন। ওরা কিছুতেই সিংহটাকে বাগে আনতে পারছিল না। সিংহটা শুধু যে চেহারায় বিশাল ছিল তাই নয়, অসম্ভব ধূর্ত ছিল। আগুনকেও ভয় পেত না। আমি ওদের কথা শুনেই রাইফেল নিয়ে আমার দলের কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ওদের সঙ্গে রওনা দিই। যে গ্রামে সিংহটা সবচাইতে ঘন ঘন হানা দিচ্ছিল, সেই গ্রামের পাশে গিয়ে আমাদের ছেলেদের দিয়ে একটা ছোটো জারেবা বানাই। জারেবাটা আমার, আর এক সঙ্গীকে নিয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট শক্তপোক্ত আর বড়ো ছিল। জারেবাটা ছেলেগুলো ঝোপঝাড় কেটে ঘিরে দিয়েছিল, যাতে চট করে সিংহটা আমাদের উপস্থিতি টের না পায়। আমার সঙ্গীর কাজ ছিল সিংহটা আসছে কি না নজর করা, আর আমার রাইফেল বহন করা। জারেবার কাছে একটা গাধাকে টোপ হিসেবে বেঁধে রেখেছিলাম। ঠিক সন্ধে হবার সঙ্গে সঙ্গে একপাল হায়েনা এসে জড়ো হয়েছিল গাধাটাকে খাওয়ার জন্য। ছোটো ছোটো ঢিল ছুড়ে হায়েনাগুলোকে ভাগাতে হচ্ছিল প্রতিনিয়ত।

নিঃসাড় অপেক্ষার শেষ হয়েছিল অচিরেই। খানিক পরেই সরে গিয়েছিল হায়েনার দল। বুঝতে পেরেছিলাম, মহারাজ এসেছেন। অন্ধকারে প্রায় কিছুই ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না। আচমকা সিংহটা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গাধাটার ওপর। গাধার আর্তনাদ আর সিংহের গর্জনে কেঁপে উঠেছিল চারদিক। গাধা আর সিংহের ধস্তাধস্তিতে ধুলোয় ঢেকে গিয়েছিল জায়গাটা। আমি আমার রাইফেল কাঁধে তুলে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ধুলোর আস্তরণ খানিক হালকা হয়ে যেতেই আবছা আলোয় নজরে এসেছিল, বিশাল আকারের সিংহটা গাধার শরীরটাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে। সিংহটা আমাদের জারেরার ফুট দশেকের মধ্যেই ছিল। ভাগ্য ভালো, সিংহটা কোনোভাবেই আমাদের উপস্থিতি টের পায়নি। কারণ, হাওয়া বইছিল আমাদের উলটোদিকে। আমি সিংহটার কাঁধে লক্ষ্যস্থির করে নিশ্বাস চেপে ধরে আমার আট বোরের রাইফেলের ট্রিগারে চাপ দিয়েছিলাম। প্রবল আওয়াজ তুলে গুলি বিঁধেছিল ঠিক নিশানায়। সঙ্গে সঙ্গে খাবার থেকে মুখ তুলে গর্জন করে উঠেছিল সিংহটা। গর্জনের শব্দে আমার গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠেছিল। আমি জীবনে কোনও শিকার অভিযানে গিয়ে এরকম হাড় কাঁপানো আওয়াজ শুনিনি।

দূর থেকে সিংহের গর্জন আর একদম পাশ থেকে শোনা সিংহের গর্জনে যে কতটা ফারাক, তা বলে বোঝানো কঠিন। যে শুনেছে, সে-ই বুঝবে। আর সেই সিংহ যদি মানুষখেকো আর আহত হয়, তা হলে যে সে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, তা যারা অভিজ্ঞতার ভাগীদার, তারাই জানবে। যন্ত্রণায় কাতর সিংহটা আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে লাফ দিয়েছিল জারেবা লক্ষ্য করে। ওর শরীরের ভারে জারেবার সামনের খানিক অংশ ভেঙে গিয়েছিল লহমায়। কিন্তু সিংহের গুঁতোয় ফাঁকটা এমন কিছু হয়নি যেখান দিয়ে ওটা ভেতরে ঢুকতে পারে। জারেরার বাইরে দাঁড়িয়ে সিংহটা গর্জন করতে করতে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল চারদিক। আমার আর আমার সঙ্গীর মনের অবস্থা যে কী হয়েছিল, তা ঈশ্বর জানেন। খানিক পর সিংহটার হাঁকডাক কমে আসতে শুরু করেছিল। বুঝতে পারছিলাম, বন্দুকের গুলির অভিঘাত কাজ করতে শুরু করেছে। সিংহটা কয়েক পা হেঁটে একটা ঝোপের পাশে এলিয়ে পড়ে গোঙাতে লেগেছিল। মিনিট দশেক পর গোঙানির আওয়াজ থেমে গিয়েছিল। আমরা জাবেরার ঘেরটোপ থেকে বেরিয়ে আসার দুঃসাহস করিনি সহজে। অনেক পর একটা শেয়াল ডেকে উঠতে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম, মারা গেছে এই অঞ্চলের ত্রাস। জাবেরা থেকে বেরিয়ে এসে আমি আমার সঙ্গীকে নিয়ে মৃত সিংহটার পাশে শুকনো কাঠকুটো দিয়ে খানকয়েক ছোটো ছোটো আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়েছিলাম, যাতে এত সুন্দর চামড়াটা শেয়াল আর হায়েনা মিলে ছিঁড়ে নষ্ট করতে না পারে।

রাতভর হায়েনাদের ভয় দেখিয়ে সরিয়ে রাখতে খানিক পরপর গুলি ছুড়তে হয়েছিল। একটাকে খতম করতে হয়েছিল কিছুতেই বাগে আনতে না পারায়। ভোরের আলো ফুটতেই মৃত সিংহটার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। ঘাসের ওপর দুই পা মেলে নিশ্চিন্তে চিরঘুমে অঞ্চলের ত্রাস। সিংহটার কেশর কালো রঙের। যা খুবই বিরল। চামড়া ছাড়ানোর কাজ শুরু করার আগে সিংহটাকে মেপে দেখি, সেটা নয় ফুট আট ইঞ্চি লম্বা। একটা দানব বেড়াল। ভোর হতে না হতেই আশেপাশের গ্রামের লোকেরা এসে ভিড় জমিয়েছিল সিংহটাকে ঘিরে। নেচে, গেয়ে, ড্রাম বাজিয়ে, হাততালি দিয়ে আমাকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল ওরা।সেসাবেন

মিলমিল ছেড়ে যতটা সম্ভব পশ্চিমদিকে ধরে এগোব ঠিক করেছিলাম। কিন্তু সে-পথ এত কষ্টকর যে সেসাবেনে যাবার জন্য পরিকল্পনা বদলে খানিক দক্ষিণে সরে যেতে হয়েছিল।

যেতে যেতে একটা লোমহীন ইঁদুর জাতীয় প্রাণী ধরতে পেরেছিলাম। লম্বায় ১০ সেন্টিমিটার আর ওজন ৪০ গ্রামের মতো। টেরোসেফালাস নামের এই প্রাণীটি সোমালিল্যান্ড সেখানেই দেখা যায়, যেখানে মাটি নরম। এরা মাটির ফুট খানেক নীচে গর্ত করে থাকে। দ্রুত গর্ত খুঁড়তে ওস্তাদ এরা। চট করে মাটির ওপর দেখা যায় না। এদের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় আগ্নেয়গিরির আগুনের ভলকের মতো নীচ থেকে ছিটকে আসা মাটির গুঁড়ো দেখে।

১ আগস্ট সেসাবেন পৌঁছে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম সেখানকার গবাদিপশুর পাল দেখে। এর আগে সোমালিল্যান্ডে আমি এর অর্ধেক পশুও একসঙ্গে দেখনি। পশুপালকেরা খুবই শান্তশিষ্ট ছিল। এই জায়গা ছেড়ে যাবার ক’দিন পরেই শুনেছিলাম, রাস ম্যাকননের অধীনস্থ আবিসিনিয়ানরা এদের আক্রমণ করে সব পশু ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সঙ্গে অল্পবয়স্ক মেয়ে-পুরুষদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল দাস বানাবে বলে, আর অধিকাংশ বয়স্কদের হত্যা করেছিল। শুনে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। একটা কষ্ট বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠেছিল।

সেসাবেন জুড়ে জলের অনেক কুণ্ড। পর্যাপ্ত জল পেয়ে পুরো অঞ্চলটা গাছে গাছে সবুজ হয়ে আছে। অসংখ্য সিকামোর বা ‘ডুরে’ গাছ আশপাশ জুড়ে। ডুমুরের মতো ছোটো ছোটো ফল হয় এই গাছে, কিন্তু একদম বিস্বাদ। সোমালিল্যান্ডের যেখানেই জল আছে, সেখানেই এই গাছের আধিক্য। এছাড়াও দেখা যায় গাব জাতীয় গাছ ‘জুজুব’। চেরির মতো ছোটো ছোটো ফল হয় এই গাছে। খেতে সুস্বাদু হলেও ভেতরে পাথরের মতো শক্ত একটা বীজ থাকে। ফলে আমার খেতে একদম ভালো লাগেনি। স্থানীয়রা অবশ্য এই ফল তারিয়ে তারিয়ে খায়।

নমুনা সংগ্রহের জন্য এখনও পর্যন্ত আমি আর ডডসন মিলে ৭০টার মতো পাখি শিকার করেছিলাম। এর মধ্যে অধিকাংশ পাখির পালকের সৌন্দর্য অবাক করার মতো। পাখিগুলো শিকারের উদ্দেশ্যে মারিনি, মেরেছিলাম নমুনা সংগ্রহের জন্য। এই নমুনাগুলো এই অঞ্চলের প্রাণীজগৎ সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণা দেবে বলে আমার বিশ্বাস। বেশ কিছু ঘুঘুর নমুনা পেয়েছিলাম, তাদের কয়েকটা ছিল আকারে খুব ছোটো। ছিল নীল ডানা আর হলুদ বুকের স্টারলিং। হারগেসাতে শিকার করেছিলাম কয়েকটি রাতচরা পাখি। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই দু-চারটে করে নতুন প্রজাতির পাখির নমুনা জড়ো হচ্ছিল সংগ্রহে। এগুলো যে বিজ্ঞানচর্চায় যথেষ্ট সাহায্য করবে, তাতে সন্দেহ নেই।

শাস্তি

সেসাবেন থেকে অনেকপথ ঘুরতে হয়েছিল লাফকিতে যাবার জন্য। দক্ষিণ ঘুরে উত্তরের দিকে। কারণ, সোজা পথে গেলে কম করে তিনদিন আমাদের এমন জায়গা দিতে যেতে হত যেখানে জল প্রায় নেই বললেই চলে।

আমাদের যেতে হয়েছিল পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে। মিমোসা গাছের ঝাড়ে বোঝাই পাথুরে ভূমি। সোমালিরা এই অঞ্চলটিকে বলে সিব্বে। এর আর একটি নামও আছে—হাবর-ই-এরদে, যার অর্থ ‘বৃদ্ধ মহিলাদের জন্য নয়’। বলতে গেলে, এই নামটাই আমায় টেনেছিল এই পথে। আমি সোমালিল্যান্ডে বৃদ্ধাদের শোচনীয় অবস্থা দেখেছি। সোমালিদের মতো বর্বর জাতি সারা আফ্রিকায় নেই। আর তাদের বর্বরতার এক জলন্ত নমুনা বৃদ্ধাদের প্রতি তাদের আচরণ। সে-বৃদ্ধা তার মা বা বোন, যে-ই হোক না কেন। মহিলাদের বয়স হয়ে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এদের পরিবার থেকে ঝেড়ে ফেলা হয়। তখন এরা ঘুরে ঘুরে বেরি ফল কুড়িয়ে আর ভিক্ষে করে কোনোরকমে বেঁচে থাকে। তারপর হয় না খেতে পেয়ে মারা যায়, অথবা যায় হায়েনা বা সিংহের পেটে। আমাদের ক্যারাভানেরও পিছু নিয়েছিল কিছু বৃদ্ধা। এরা এদের সাধ্যমতো কাজ করার চেষ্টা করত। জল এনে দিত, কাঠ কুড়িয়ে আনত। বিনিময়ে আমাদের দলের ছেলেরা ওদের খাবারের উচ্ছিষ্ট দিত। শুধু বৃদ্ধারাই নয়, বেশ কিছু কমবয়সি, দেখতে-শুনতেও ভালো মহিলা আমার ক্যারাভানের পিছু নিয়েছিল এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে যাবার নিরাপত্তা পাবে বলে। এরাও আমার দলের ছেলেদের হয়ে অনেক কাজ করে দিত।

লাফকির দূরত্ব যে খুব বেশি ছিল, তা নয়। মাইল পঁচিশ মতো। এটাই ছিল আমাদের অভিযানের পথে পাওয়া শেষ সমৃদ্ধ গ্রাম। আমি এখানে কয়েকদিন থেকে যাওয়া স্থির করি। প্রথমত, এতে দলের পশুগুলো খানিক বিশ্রাম পাবে, আর কাহিল হয়ে পড়া উটের বদলে নতুন উটও কিনতে পারব। এর আগে সব জায়গায় টাকার বদলে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পেরেছিলাম, এখানে দেখি টাকা অচল। কারণ, টাকাপয়সা এরা বোঝে না। এরা বোঝে জিনিস বদল। ওরা কাপড়ের বদলে উট দিতে রাজি ছিল। এর মধ্যে স্থানীয় একজন আমার দলের ভেড়া একের পর এক চুরি করে পালাচ্ছিল। দু-বার ধরা পড়ার পর দেখলাম ধমক-ধামক দিয়ে ছেড়ে দিয়ে লাভ হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে চোরটাকে আচ্ছা করে চাবকানোর হুকুম দিয়েছিলাম।

ট্রেনিং

আমি থামতে থামতে যাচ্ছিলাম শুধুমাত্র পশুদের বিশ্রাম বা নতুন করে ভারবাহী পশু কেনার জন্য নয়। আমি যেতে যেতে দলটাকে তৈরি করে নিচ্ছিলাম আগামী কঠিন যাত্রার জন্য। পাশাপাশি ক্রোনোমিটার নিয়ে কাজও করে যেতে হচ্ছিল। আমি দলের ছেলেদের নিয়ে ছোটো ছোটো গ্রুপ তৈরি করে তাদের ট্রেনিং দিতে দিতে এগোচ্ছিলাম। প্রতিটি দশজনের গ্রুপের একজন করে লিডার। আর সব দলের লিডারদের মাথা বানিয়েছিলাম হাজি ইদ্রিসকে। আর ইদ্রিসকে দুজন প্রধান সহকারী দিয়েছিলাম— এদের একজন সালান মোহাম্মদ, আর একজন আহমেদ আদেন। তিনজনেই চমৎকার আর করিতকর্মা মানুষ। আমার দলের বেশিরভাগ ছেলেই প্রথমবার এইরকম বিপদজনক যাত্রায় যোগ দিয়েছিল। প্রায় সবাই জীবনের প্রথমবার রাইফেল দেখল। ব্যবহার করা তো অনেক দূরের কথা। তাই নিয়মিত ওদের রাইফেল ট্রেনিং করাতে হচ্ছিল। ছেলেগুলো দ্রুত শিখে নিয়েছিল রাইফেল ব্যবহার-সহ অন্যান্য কলাকৌশল। প্রত্যেকেই জেনে গিয়েছিল অতর্কিতে কোনও আক্রমণ এলে কী করে তা সামলাতে হবে, প্রতিটি দলের রাইফেলের গুলি কোথায় থাকবে। ঠিক করা হয়েছিল, প্রতি রাতে প্রতি দল থেকে একজন করে রাত পাহারায় থাকবে। অর্থাৎ, আটজনকে রাত পাহারায় থাকতে হবে। আর বিপদজনক জায়গা হলে প্রতি দল থেকে দুজন করে। দলের সেরা পনেরো জনকে দেওয়া হয়েছিল একটি করে উইনচেস্টার রাইফেল। আর বাকিদের দেওয়া হয়েছিল স্নাইডার্স রাইফেল। প্রত্যকেকে বলে দেওয়া হয়েছিল যে সবসময় কাঁধে রাইফেল নিয়ে চলতে হবে। সঙ্গে সবাইকে দিয়েছিলাম ৩০টি গুলিভরা একটি করে বেল্ট।

প্রতি ইউরোপিয়ানের সঙ্গে চারজন করে ছেলে থাকত রক্ষী হিসেবে। ফ্রেডের ছেলেরা সবসময় ওর সঙ্গে শিকার অভিযানে যেত। কিন্তু আমি আর ডডসন আমাদের রক্ষীদের অন্যভাবে কাজে লাগিয়েছিলাম। ওদের শেখানো হয়েছিল কী করে নানাধরনের প্রাকৃতিক-ইতিহাসের নমুনা সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ করতে হবে। ছেলেগুলো দ্রুত বুঝে নিয়েছিল আমরা কী চাই। ওরা নিজ উদ্যোগে নানাধরনের পোকামাকড় আর প্রজাপতির নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছিল। আমাদের দুই রাঁধুনি মিরহে আর আবদুল্লা এর আগে আমার আর ড. ডব্লিউ. এল. স্মিথের শিকার অভিযানে সঙ্গী ছিল। ওরা যে সামান্য কাঁচামাল দিয়ে কী করে এত অসামান্য খাবার বানায়, তা দেখে অবাক হয়ে যেতাম। লম্বা পথ পার হয়ে এসে মাঝে-মাঝেই দেখা যেত জ্বালানি কাঠ প্রায় জোগাড়ই হয়নি। কিন্তু সামান্য কাঠকুটো জ্বেলেই দুই রাঁধুনি পথে খাবারের জন্য শিকার করা পাখি দিয়ে অসামান্য স্যুপ বানিয়ে ফেলত, সঙ্গে রুটি। ওরা দুটো টিনের টুকরোর মাঝে ময়দার দলা রেখে সেগুলো আগুনের কুণ্ডের পাশে পাথরের ওপর হেলান দিয়ে রাখত, তাতেই রুটি সেঁকা হয়ে যেত। রুটির ওপর ছড়িয়ে দিত সামান্য নুন। স্বাদে ভরপুর হয়ে যেত রুটিগুলো। আবদুল্লার আসল নাম হল এডেন আররালা, নানা অভিযানে যোগ দিয়ে অভিজ্ঞতায় ভরপুর হয়ে উঠেছে। আমার অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল আবদুল্লা। পুরো দল ওর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনত।

এর আগে এই অঞ্চলে দুটো অভিযাত্রী দলে এসেছিল। একটা অভিযান হয়েছিল ক্যাপ্টেন সোয়েনের নেতৃত্বে আর একটি কাউন্টস হোজেস ও কুডেনহোভের নেতৃত্বে। কিন্তু এঁরা লাফকি থেকে দক্ষিণে গিয়েছিলেন শেবেলি নদীর উদ্দেশে। এই দেশের পশ্চিম অংশ সম্পর্কে কোনোকিছু জানা নেই। কাজেই স্থানীয় গাইডদের ওপর ভরসা করা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় ছিল না। গাইডরা জানিয়েছিল, অভীষ্টে পৌঁছনোর সংক্ষিপ্ত কোনও পথ নেই। থাকলেও সে-পথে যাওয়া আত্মহত্যা করার চেষ্টার শামিল হবে। কারণ, অধিকাংশ অঞ্চলই জলহীন। পথের কোনও চিহ্ন নেই, গাইডদের অনুমানই ভরসা।

আমরা চলছিলাম ঘন জঙ্গল পথে। জঙ্গল মানে গাছ, কোথাও না কোথাও জল পাওয়া যাবেই। কাঁটাগাছ ভরা জঙ্গল। সামান্য আঁচড়েই চামড়া ছিঁড়ে যাচ্ছে। মেক্সিকো আর টেক্সাসে এই গাছগুলো পরিচিত ‘স্প্যানিশ বেয়োনেট’ নামে। সোমালিরা এই গাছকে বলে ‘হিগ’ আর আরবি ভাষায় এর নাম ‘সালাব।’ এত শক্ত আর ছুঁচলো এর কাঁটা যে দলের পশু থেকে মানুষ সবাই প্রতি পদক্ষেপে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। এই হিগ ছাড়াও এই জঙ্গলের তলদেশ ভরতি ঘৃতকুমারী গাছে। কাঁটাই কাঁটা। অথচ এই জঙ্গল ছাড়া অন্য পথ ধরারও উপায় নেই। কারণ, সে-পথে জল নেই। সোমালিল্যান্ডের সবজায়গাই ভরা এই গাছে। এছাড়াও ছিল ‘কেডি’ আর ‘হুরা’ নামের বাবলা প্রজাতির গাছ। হুরা গাছে লালচে রঙের মটরশুঁটির আকারের একধরনের ফল হয়েছিল। সোমালিরা এই ফল খেতে খুব ভালোবাসে। এটি চুষলে খানিক মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায়।

প্রতিদিনই সামান্য পরিমাণে বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ ঢেকে ছিল মেঘে। ফলে হাঁটতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছিল না। কিন্তু আকাশ মেঘে ঢাকা থাকায় ক্রোনোমিটার নিয়ে কাজ করতে পারছিলাম না।

১০ আগস্ট ছিল সবচাইতে কষ্টকর দিন। একের পর এক ‘টাগ’ পার হতে হয়েছিল। টাগের পাড়গুলো ছিল খুব ঢালু, ফলে পা টিপে টিপে অতি সাবধানে মালবোঝাই পশুগুলোকে জলের ঝোরাগুলো পার করাতে হয়েছিল। তারপর পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে একের পর এক পাহাড় টপকে পৌঁছেছিলাম উঁচু সমতলে।

পরদিন দেখা হয়েছিল এক ইউরোপিয়ানের সঙ্গে। ক্যাপ্টেন সি. জে. পার্সিভাল। তিনি দলবল নিয়ে উত্তরের দিকে চলেছিলেন। আমরা ছাড়া তিনিই আর এক সাদা চামড়ার লোক যিনি এখনও পর্যন্ত এই দেশের এত ভেতরে আসতে পেরেছেন। পরে ওঁর সঙ্গে এডেনে আবার দেখা হলে আমার সঙ্গে দেখা হবার খানিক পরের ঘটনা শুনিয়েছিলেন। আমরা যে-যার পথে চলে যাবার পর একদল নেটিভ ওঁর কাছে এসেছিল একটা সিংহকে মারার জন্য। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সিংহটা দু-একদিন পরপর গাছের গুঁড়ির বেড়া টপকে গ্রামে ঢুকে কাউকে না কাউকে মুখে তুলে পালাচ্ছিল। গ্রামে গিয়ে সিংহের আক্রমণে সাংঘাতিকভাবে আহত এরকম দুজনের দেখা পেয়েছিলেন উনি। গ্রামের লোকেরা সিংহটাকে মারার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিল। উনি গ্রামে যেতে দেখেন, গ্রামের লোকেরা অস্ত্র নিয়ে তৈরি। অস্ত্র মানে গাদা খানেক বর্শা। সিংহটা সাঁঝের আঁধারে গ্রামে ঢুকতেই সাহেবের ওপর ভরসা না করে বর্শাধারী লোকেরা চারপাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সিংহটার ওপর। সিংহটা মরেছিল ঠিকই, কিন্তু তার আগে একজন মানুষকে মারে আর দুজনকে প্রায় ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে।

দু-দিন জোরকদমে হেঁটে আমরা পৌঁছেছিলাম টাগ লুমুতে। এখানে জলাশয়গুলো পরিষ্কার টলটলে জলে ভরতি। আমি যেসব গাইডদের ভরসায় এগোচ্ছিলাম, তারা যে পথের কোনও দিশাই জানে না, তাতে আমার কোনও সন্দেহ ছিল না। গাছ কেটে, পাথর সরিয়ে, মাটি খুঁড়ে পশুগুলোকে নিয়ে এগোবার পথ বানিয়ে নিতে হচ্ছিল প্রায়শই।

চতুর্থ অধ্যায়

গন্ডার শিকার

১৪ আগস্ট টাগ তুরফার বোদেলেতে পৌঁছেছিলাম। এখানে প্রচুর পরিমাণে ‘টাগ’ বা জলের কুণ্ড। এখানে দেখা মিলেছিল কিছু সোমালির। ওরা জানিয়েছিল, এখান থেকে বিশাল ক্যারাভান নিয়ে পশ্চিমের দিকে যাওয়া অসম্ভব। পুরো অঞ্চলটাই অসমতল এবং উঁচু-নীচু খাড়া টিলাময়। জল পাওয়া কঠিন হবে। একটি নদী এই অঞ্চল দিয়ে বয়ে গেলেও সে প্রবাহিত হয়েছে খাড়া পাহাড়ের খাদের মধ্যে দিয়ে। সেই নদীখাতে পৌঁছানো অসাধ্য। আমার অনুমান ছিল, নদীটি এরারে হবে। হারারে থেকে বেরিয়ে নদীটি পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেবালে নদীতে মিশেছে। ঠিক করেছিলাম, এখানে দিন কয়েক উটগুলোকে খানিক বিশ্রাম দিয়ে আমি ডাডসনকে নিয়ে এগিয়ে দেখে আসব এই পথ দিয়ে ক্যারাভান নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে কি না।

১৫ আগস্ট গিলেটকে ক্যারাভানের দায়িত্বে রেখে বোদেলে ছেড়ে আমরা রওনা দিয়েছিলাম হারারে নদীর গতিপথ বুঝে নিতে। ডাডসন ছাড়াও সঙ্গে নিয়েছিলাম কুড়িটা ছেলেকে। সঙ্গে মাত্র পাঁচটা উট নিয়েছিলাম। ভয় ছিল, পাছে বেশি উট নিলে দলে আহত উটের সংখ্যা না বেড়ে যায়। সাড়ে নয় মাইল মতো কাঁটাঝোপে ভরা পথ দিয়ে একটা বিশাল খোলা ঘাসজমিতে পৌঁছে ক্যাম্প করেছিলাম। পুরো অঞ্চলটা কাঁটাঝোপে ভরা হলেও আমাদের এগোতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি, কারণ আমরা যে পথ ধরে এগিয়েছিলাম, সেটা গণ্ডারদের চলার পথ। গণ্ডারেরা সরু, কাঁটাহীন মসৃণ পথ বানিয়ে রেখেছিল। পরদিন ভোরে চলা শুরু করার পর থেকেই বিস্তৃত সমতল ঘাসজমিতে পালে পালে জেব্রা আর অরিক্সের দেখা পেয়েছিলাম। ঝাঁকে ঝাঁকে উটপাখিও ঘুরে বেড়াচ্ছিল ঘাসজমি জুড়ে।

আমি দল থেকে আমার বন্দুকবাহক হারসিকে সঙ্গে নিয়ে খানিক আগে আগে হাঁটছিলাম। সবে একটা জেব্রা শিকার শেষ করেছি, এমন সময় দেখি একটা গণ্ডার সোজা আমার দিকে ছুটে আসছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে হারসির দিকে ঘুরে আমার গুলির ব্যাগটা চাইতেই দেখি ওর মুখ শুকিয়ে গেছে। একটু আগে বেচারা গুলির ব্যাগটা দলের একটা ছেলেকে ধরতে দিয়েছিল খানিক সময়ের জন্য। তারপর আমার পেছন পেছন আসার সময় সেই ব্যাগটা চেয়ে নিতে ভুলে গিয়েছিল। আমার হাতে যে .৫৭৭ এক্সপ্রেস রাইফেলটা ছিল, তার জন্য মাত্র একটা গুলি ছিল আমার কাছে। গণ্ডারটার থেকে আমাদের দূরত্ব ছিল বড়োজোর দুশো গজ। একটা গুলি সম্বল করে গণ্ডারের মুখোমুখি হওয়া চূড়ান্ত বোকামি হত, তাই অন্য কোনও উপায় না থাকায় প্রাণপণে ছুট লাগিয়েছিলাম ক্যারাভান লক্ষ্য করে। আমার ভাগ্য ভালো যে দলের কাছে পৌঁছনোর আগে গণ্ডারটা অল্প সময়ের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল। ফলে সময় পেয়ে গিয়েছিলাম অনেকটাই। যে-ছেলেটার কাছে আমার গুলির থলেটা ছিল, সেও বিপদ বুঝে ছুটে আসছিল আমার দিকে। আমি ছেলেটার হাত থেকে ব্যাগটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে গুলি ভরে নিয়েছিলাম বন্দুকের নলে। গুলি ভরা হতে না হতেই দেখি গণ্ডারটা আবার ছুট লাগিয়েছে আমাদের দিকে। আমাদের থেকে গণ্ডারটার দূরত্ব খুব বেশি হলে গজ কুড়ি ছিল। ডাডসনের সঙ্গে থাকা কিছু ছেলে উটগুলো থেকে খানিক দূরে ছিল। গণ্ডারটার গতিপথ ঘোরাতে ওরা গণ্ডারটার দিকে হাত-পা নাড়িয়ে যাচ্ছিল। খানিক সফল হয়েছিল ওরা। গণ্ডারটা খানিক ঘুরে যেতে আমি গুলি করার জন্য ঠিক জায়গাটা বেছে নিতে পেরেছিলাম। এক গুলিতে বিশাল গণ্ডারটা মাটিতে পা ছড়িয়ে উলটে পড়েছিল। নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য দ্বিতীয় গুলিটা ছুড়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু তার দরকার ছিল না।

তৃতীয়দিন একটা সরু জলের স্রোতের ধার ধরে আমরা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে এগোতে শুরু করেছিলাম। আশা ছিল, জলের স্রোত আমাদের নদীর কাছে নিয়ে যাবে।

জায়গাটা গণ্ডারদের আস্তানা। একটা গণ্ডার কাছে এসে আমাদের ভয়ংকর বিপাকে ফেলে দিয়েছিল। আমি ক্যারাভানের আগে আগে যাচ্ছিলাম গণ্ডারের চলার ফলে তৈরি পথের রেখার ওপর দিয়ে। আর আমাদের ক্যারাভান আসছিল খানিক দূর দিয়ে খোলা ঘাসজমি ধরে। হঠাৎ এক ঝোপের আড়াল থেকে এক গণ্ডার বেরিয়ে এসে সোজা ধেয়ে আসে আমাদের লক্ষ্য করে। আমি গণ্ডারের চলার পথ থেকে ছিটকে সরে আসি ঘাসজমির ওপর। কিন্তু গণ্ডার মাথা নীচু করে দুরন্ত গতিতে ছুটে আসতে থাকে আমাদের দল লক্ষ্য করে। আমার ভাগ্য ভালো, আমি একটা আট বোরের রাইফেল হাতে হাঁটছিলাম। বিশাল ভারী জানোয়ারটা মুহূর্তের মধ্যে আমার হাত তিনেকের মধ্যে চলে এসেছিল। দিশেহারা হয়েও আমি গণ্ডারটার ঘাড় লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে পেরেছিলাম। গুলির ধাক্কায় গণ্ডারটা ছিটকে পড়েছিল মাটির ওপর। কিন্তু পরমুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ধেয়ে এসেছিল আমাকে লক্ষ্য করে। আমি খানিক সরে যেতে পারলেও গণ্ডারের গোঁ থেকে বাঁচতে পারিনি। সে আমাকেই আক্রমণের লক্ষ্য বানিয়েছিল। এবার ওর মাথা তাক করে গুলি ছুড়েছিলাম। আবার ছিটকে পড়লেও উঠে দাঁড়িয়েছিল জন্তুটা। ততক্ষণে আমি খানিক দৌড়ে সরে গেলেও, তাড়া করে এসেছিল গণ্ডারটা।

আমার দলের লোকেরা ভয়ে যে যেদিকে পারে ছুটেছিল। উটগুলো পিঠ থেকে মালপত্র ঝেড়ে ফেলে এদিক-ওদিক লাফাচ্ছিল। আমি এবার গুলি ছুড়েছিলাম গণ্ডারটার চোখ নিশানা করে। নির্ভুল লক্ষ্য। গুলি খেয়ে গণ্ডারটা একজায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আমার সঙ্গে গণ্ডারটার দূরত্ব দাঁড়িয়েছিল তিরিশ গজের মতো। আমি আর দেরি করিনি, বন্দুকে গুলি ভরে দাঁড়িয়ে থাকা গণ্ডারটার ঘাড়ের ঠিক নীচে গুলি ছুড়েছিলাম। গণ্ডারটা মাটিতে পড়ে আর উঠতে পারেনি। খানিক দাঁড়িয়ে থেকে জন্তুটার কাছে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, শেষ গুলিটা সোজা ওর হৃৎপিণ্ডে গিয়ে ঢুকেছে, আর আগের গুলিগুলো জন্তুটাকে সামান্য আহত করেছিল মাত্র। এরপর থেকে চূড়ান্ত সতর্ক হয়ে গিয়েছিলাম। ছেলেদের বলে দিয়েছিলাম বন্দুক সবসময় প্রস্তুত রাখতে।

এর অল্প সময় পরে আমরা একটা স্বচ্ছ জলের বিশাল ধারার সামনে পৌঁছেছিলাম। সবাই আনন্দে মেতে উঠেছিল। এতদিন হেঁটেও এত পরিষ্কার কোনও জলের স্রোত আগে আমরা পাইনি। পাথরের বুকের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছিল জলধারা। মাইল দু-এক জলস্রোতকে পাশে রেখে চলার পর আমরা পৌঁছেছিলাম এমন জায়গায়, যেখানে উপত্যকাটা ক্রমেই সরু হয়ে আসছিল। বিশাল বিশাল পাথরের স্তূপ সামনে খাড়া হয়ে ছিল। সামনে এগোনো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছিল। উটগুলো নিয়ে এগোনো অসম্ভব হয়ে উঠছিল। একজায়গায় পাঁচটা উটকে টেনে-হিঁচড়ে পাথরের ওপরে তুলে সেদিনকার মতো যাত্রায় ইতি টানতে হয়েছিল।

পরদিন সকালে আমি আমাদের দলকে তিন ভাগে ভাগ করলাম। তিনটে দল তিনদিকে যাবে। ক্লান্ত উটগুলোকে ওখানেই ছেড়ে রাখলাম আমরা। এরার নদীর হদিশ বের করা খুব জরুরি। জানা দরকার এ-পথের বিস্তারিত খুঁটিনাটি। আমি পাঁচটা ছেলেকে নিয়ে এগোলাম জলস্রোত ধরে। নিজেদের কাজের সুবিধার জন্য জলস্রোতটার নাম দিয়েছিলাম ‘স্টোনি ব্রুক’। মাইল দু-এক পাথরের ওপর দিয়ে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে এগিয়ে পৌঁছেছিলাম দ্রুত বহতা এরার নদীর ধারে।

যে উপত্যকার মধ্যে দিয়ে নদীটি বয়ে চলেছে, তার সৌন্দর্যতা বলে বোঝানো মুশকিল। নদীর দু-পাশের পাহাড়ের গা ফুলের ঝোপে ভরা। রঙবেরঙের গুল্ম পাথরের খাঁজে খাঁজে ঝুলছে। নদীর পাশ থেকে পাহাড় খাড়া উঠে গেছে নয় নয় করেও হাজার তিনেক উচ্চতায়। পাথরের রঙ হালকা হলুদ। সবুজের ছোঁয়া সবজায়গায়। পুরো উপত্যকাটা আশ্চর্যরকম জীবন্ত। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে বেড়াচ্ছে। খরগোশ, বানর আর কাঠবেড়ালির দল নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করে চলেছে। অধিকাংশ জায়গায় এরার প্রায় আশি ফুট চওড়া, তিন ফুট গভীর আর জলের গতি ঘণ্টায় চার মাইল।

এত সত্ত্বেও আমি খানিক হতাশ হয়ে পড়েছিলাম নেটিভদের কথা সত্য প্রমাণিত হওয়াতে। এই পথে বিশাল ক্যারভান নিয়ে যাওয়া যাবে না। যদিও অন্যদিকে নদীটা খুঁজে পাওয়াতে আর তার সঙ্গে নানাধরনের পাখি, মাছ, প্রজাপতি, ছোটো ছোটো স্তন্যপায়ী প্রাণী, আর পোকার নমুনা সংগ্রহ করতে পেয়ে খুশিও হয়েছিলাম।

দু-দিন এরারের পাশে পাশে কাটিয়ে আমরা ফিরে এসেছিলাম আমাদের মূল দলের কাছে। দেড় দিন লেগেছিল ফিরে আসতে। তবে ফেরার সময় কোনও গণ্ডারের কবলে পড়তে হয়নি। ফিরে এসে দেখি, গিলেট একটা বিশাল সিংহ শিকার করেছে।

ফ্রেড গিলেটের সিংহ এবং চিতাবাঘ শিকার

ফ্রেড গিলেটের জবানিতে—

ড. স্মিথেরা যখন পথের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন, তখন ক্যাম্পে বসে আমার কিছু করার ছিল না। খানিক দূরে একটা ঝোপের কাছে সিংহের থাবার দাগ নজরে এসেছিল। সিংহ শিকারের আশায় একটা আস্ত উট বেঁধে রেখেছিলাম ঝোপটার পাশে। পাশাপাশি জঙ্গলের মাঝে সিংহের আরও টাটকা পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছিলাম। সিংহের খোঁজে সঙ্গে একজন বন্দুকবাহক নিয়ে জঙ্গল চষে বেড়াচ্ছিলাম। কিন্তু চাইলে তো আর সিংহ এসে সামনে এসে উপস্থিত হবে না! আমি নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম, সিংহটা ধারেকাছেই আছে।

একদিন সন্ধের খানিক আগে একটা আহত জেব্রার পিছু নিয়েছিলাম সিংহের খোঁজ পেতে। জায়গাটা ক্যাম্প থেকে খুব বেশি দূরে না হলেও, কাঁটাঝোপে ভরা। চলাফেরা করা বেশ কঠিন। পদে পদে কাঁটার ফাঁদে আটকে নাস্তানাবুদ হচ্ছিলাম। অন্ধকার দ্রুত ঘনিয়ে আসছিল। ক্যাম্পে ফিরে আসছিলাম। ঠিক তখনই কুড়ি গজের মতো দূরে থেকে পিলে কাঁপানো গর্জন ভেসে উঠল। আমার বন্দুকবাহক ফিসফিসিয়ে উঠেছিল, ‘সাহেব, বড়ো বন্দুকটা নেবেন?’ জায়গাটা এমন ছিল, ঠিকমতো নড়াচড়া করা যাচ্ছিল না। ওখানে দাঁড়িয়ে নিভু নিভু আলোয় শিকার করার চেষ্টা মানে অহেতুক বিপদ ডেকে আনা। আমি ক্যাম্পে ফিরে আসাই ঠিক মনে করেছিলাম।

অবশেষে এক সকালে সবে ব্রেকফাস্ট শেষ করেছি, একটি ছেলে দৌড়ে এসে জানাল, খানিক দূরে ঝোপের ধারে বাঁধা উটটাকে সিংহ মেরেছে। ছেলেটার সঙ্গে গিয়ে দেখি, তখনও উটের ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। মানে সদ্য সদ্য সিংহটা এসেছিল। দেরি না করে ছেলেটাকে ক্যাম্পে পাঠালাম কিছু লোককে ডেকে নিয়ে আসতে। লোকগুলো আসতেই আমি বললাম ঝোপঝাড় পিটিয়ে সিংহটাকে এদিকে তাড়িয়ে নিয়ে আসতে। আমি খোলা জায়গায় বন্দুক কাঁধে দাঁড়িয়ে রইলাম। লোকগুলো জঙ্গলে বিট করতে শুরু করতে না করতেই সামনের ঝোপ থেকে মট করে আওয়াজ উঠেছিল। শব্দ লক্ষ্য করে মুখ ফেরাতেই কাঁটাগাছের ফাঁকে হলুদের আভাস নজরে এসেছিল। পরমুহূর্তে কাঁটাঝোপ থেকে লাফ দিয়ে সামনে এসে পড়েছিল সিংহটা। আমার গজ তিরিশ সামনে, খানিক থমকে দাঁড়িয়ে শরীর বেঁকিয়ে আমাকে লক্ষ্য করে লাফ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল জন্তুটা। ওই খনিক সময়ের মধ্যেই আমি ওর ঘাড় নিশানা করে গুলি ছুড়েছিলাম। এক গুলিতেই সিংহের লাফ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল চিরতরে।

এরপর আমার লোকেরা যা শুরু করেছিল, তা দেখে আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়ার উপক্রম করেছিল। সিংহটা এক গুলিতে খতম হবার পর আনন্দে ওরা আমাকে সিংহের পাশে বসিয়ে, বন্দুক গুলিভরা অবস্থায় সেফটি ক্যাচ বন্ধ না করে গোল হয়ে নাচতে শুরু করেছিল। ভাবছিলাম, ট্রিগারে অনাবধানবশত একটা চাপ কী ঘটাতে পারে!

যতক্ষণ না শেবেলি নদীর ধারে পৌঁছাই, ততক্ষণ টাগ তুরফার দক্ষিণে এগোনো ছাড়া আমাদের আর অন্য কোনও পথ সামনে ছিল না। পথ চলতে জলকুণ্ডের কারণে বার বার মোচড় খেতে হচ্ছিল আমাদের। অনেক জীবাশ্ম বা ফসিল পেয়েছিলাম আমরা জলের স্রোতের ধারে। আশেপাশের পাথর আর পাহাড়গুলো শক্ত গ্রানাইটের।

যাত্রাপথ সেরকম কিছু বিপদজনক না হলেও গিলেটের একটা চিতাবাঘের সঙ্গে মোলাকাতের কথা না বললেই নয়। গিলেটের জবানিতেই শোনা যাক।—

সকাল থেকে দুপুর ছাড়িয়ে গিয়েছিল এক শুকনো নদীখাতের মধ্যে দিয়ে টানা চলতে চলতে। আমি ক্যারাভানের বেশ খানিকটা আগে আগে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ নজরে আসে, নদীর অন্য পাড়ের জঙ্গল থেকে একটা চিতাবাঘ মুখ বাড়িয়ে আমাদের দেখছে। কিন্তু ক্যারভানের হল্লা শুনে মুহূর্তের মধ্যে ঘন ঝোপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। বিপদ যে ঘনিয়ে আসছে, বুঝতে আমার সময় লাগেনি। আমি দলের ছেলেদের ডাকলাম চিতাটার একটা হিল্লে করার জন্য। না-হলে জানি, ও আমার দলের কাউকে মারবে।

দলের প্রথমে ছিলাম। ততক্ষণে ড. স্মিথও এসে গিয়েছিলেন। তিনি এসে সব শুনে ওখানেই ক্যাম্প তৈরি করার হুকুম দিয়েছিলেন। আর উটের সঙ্গে যারা ছিল, তাদের বলেছিলেন ঝোপ পেটাতে, যাতে চিতাটা ঝোপ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আমি আর ড. স্মিথ রাইফেল কাঁধে ঝোপের কাছে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম।

কিন্তু কাঁটার ঝোপ এত ঘন যে তাতে ঢোকা অসাধ্য ছিল। তাই ছেলেগুলো চিতাটাকে ঝোপ থেকে বাইরে বের করতে ঝোপের মধ্যে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চিতাটা ঝোপ ছেড়ে বেরিয়ে এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে গরগর আওয়াজ শুরু করে শরীর বেঁকিয়ে টানটান করে মাটিতে আঁচড় কাটতে লেগেছিল। বুঝতে অসুবিধা হয়নি, সে আমার ওপর ঝাঁপ দিল বলে। আমার থেকে চিতাটার দূরত্ব কয়েক গজ ছিল মাত্র। মুহূর্তের মধ্যে সে আমার বাঁদিকে লাফ দিয়ে গজ চল্লিশেক দূরে দৌড়ে গিয়ে আবার আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আমি আর দেরি না করে নিশানা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত না হয়েই ওর ঘাড় লক্ষ্য করে চকিতে গুলি ছুড়েছিলাম। চিতাটা শ’খানেক গজ ছুটে গিয়ে মুখে থুবড়ে পড়েছিল। বুঝে গিয়েছিলাম, গুলি ঠিক জায়গাতেই আঘাত করেছিল।

জলে ভরা নদী

বোদেলে থেকে দু-দিন হাঁটার পর আমরা পৌঁছই এমন একটা জায়গায়, যেখানে নানাদিক থেকে জলের ধারা এসে মিশেছে। সিলুল, দাচেটো, লুম্মো, বোরঘা আর তুর্ফা টাগ একে ওপরের সঙ্গে মিশে নদীর রূপ নিয়ে এগারো মাইল গিয়ে শেবেলি নদীতে পড়েছে। এই জায়গাটার নাম বিশোরা, সোমালিতে যার অর্থ ‘জলসঙ্গম’। আমরা এখানেই ক্যাম্প করেছিলাম। আমি কিছু ছেলেকে আগে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম জায়গাটা ছানবিন করতে। সামনে কী আছে জানাটা খুব জরুরি। বোদেলে থেকে যে গাইডগুলো নিয়েছিলাম, সেগুলো কোনও কাজের ছিল না। পথের হদিস কিছুই জানত না বুদ্ধুগুলো। এর আগে এরার নদী পর্যন্ত গিয়ে আমাকে পথের অবস্থা দেখে আসতে হয়েছিল। আমার সন্দেহ ছিল, এই নদী উপত্যকা দিয়েও বিশাল ক্যারাভান নিয়ে এগোনো দুষ্কর হবে। কিন্তু আমার ছেলেরা সন্ধের আগে ফিরে এসে জানাল, সামনে একটা বড়ো নদী আছে, আর সেখানে দলবল নিয়ে সহজেই পৌঁছানো যাবে।

২৪ আগস্ট সকাল থেকে মাইল দশেক মতো হেঁটে আমরা পৌঁছেছিলাম ওয়েবি শেবেলির কিনারায়। সোমালিতে যে-কোনো নদীকেই ওয়েবি বলে। কিন্তু নদীর ধারে পৌঁছে হতাশই হতে হয়েছিল। নদী জলে টইটম্বুর। কম করেও আশি গজ চওড়া। তেমনি গভীর। আর জলের স্রোতও খুব। সেখানেই ক্যাম্প করে আমি কয়েকজনকে নিয়ে নদী পার হবার একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। স্থানীয় কোনও গাইড পেলে তাকেও দলে ভেড়ানোর ইচ্ছে ছিল। খানিক এগিয়ে হতাশই হতে হয়েছিল। নদীর ধারে কয়েকটি পরিত্যক্ত কুটির ছাড়া কিছুই নেই। কোনও মানুষের চিহ্ন নেই আশেপাশে। তবে আমার স্থির বিশ্বাস ছিল, নদী যখন আছে তখন মানুষের বসতিও থাকবে। দু-পাশের পাহাড় যে খনিজ লোহায় ভরতি, নদীর জলের লালচে আভা তা বলে দিচ্ছিল। নদী উপত্যকায় লোহার উপস্থিতির ফলে আমার কম্পাসে উলটোপালটা রিডিং দিচ্ছিল।

নদীর দু-পাশে ধুম খেজুরের গাছ। আফ্রিকান নেটিভরা এই গাছের ফল আর রস খেয়ে থাকে। এই গাছের ফলগুলো আকারে অনেকটা আলুর মতো। শাঁসালো। শুকনো আদার মতো স্বাদ। আমরা অনেক ভাঙড় জাতীয় মাছ ধরেছিলাম নদী থেকে। জলে ফেলা টোপে যে মাছগুলো ধরা পড়ছিল, নয় নয় করেও এক-একটার ওজন ছিল দুই থেকে আড়াই কেজি।

ক্রোকোডাইল ক্যাম্প

খুবই কঠিন সময়ের মোকাবিলা করতে হয়েছিল এই সময়; সেই সময়কার কথা তুলে দেওয়া যাক সরাসরি আমার ডায়েরির পাতা থেকে।—

২৫ আগস্ট। সকাল থেকেই ক্যাম্পের খানিক দূরে আমরা লড়ে যাচ্ছিলাম নদী পার হবার একটা উপায় বের করতে। নদী এখানে একশো গজেরও বেশি চওড়া। আর গভীরতা দুই থেকে সাত ফুট। আমার হেডম্যান ইদ্রিস আর ফ্রেডের বন্দুকবাহক আবদি সেগার্ড একটা দড়ি নৌকায় করে ও-পাড়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল যার একটা প্রান্ত থাকবে নদীর এ-পাড়ে বাঁধা। নদীতে স্রোত খুব। আবদি প্রাণপণে বৈঠা মেরে যাচ্ছিল। অনেক লড়াইয়ের পর, বহুক্ষণের চেষ্টায় ওরা ও-পাড়ে পৌঁছতে পেরেছিল। নদীর পাশের ঝোপে নৌকা বেঁধে দড়ির গোছা পাড়ে নামাতে যেতেই ইদ্রিসের হাত থেকে দড়ির পিছলে পড়ে যায় জলে। এটা ছিল ইদ্রিসের প্রথম ব্যর্থতা। এরপর ইদ্রিস আর আবদি মিলে ফিরে এসে আরও লোক নিয়ে ও-পাড়ে যায়। ও-পাড়ে গিয়ে দড়ির প্রান্ত একটা গাছে বাঁধতে পারলেও কোনও লাভ হয়নি। জলের স্রোতের টানে জলে পড়ে থাকা দড়ি ছিঁড়ে যায়।

দুপুরের পর আমরা একটা ভেলা বানানো শুরু করি। পাশাপাশি শুরু হয় দড়ি পাকানোর কাজ। দড়িটা এমন মোটা করে বানানো হচ্ছিল যাতে ছিঁড়ে না যায়। ক্যাম্পে ফেরার সময় কানে ভেসে আসছিল একের পর এক বন্দুকের আওয়াজ। খানিক আঁতকে উঠেছিলাম। নেটিভ গালাসরা ক্যাম্প আক্রমণ করেনি তো? দ্রুত ছুটেছিলাম শব্দ লক্ষ্য করে। গিয়ে দেখি, ফ্রেডের একটা খচ্চরকে কুমিরে অনেকটা জলের ভেতর টেনে নিয়ে গিয়েছিল। দলের ছেলেরা কুমিরটাকে গুলি করে ভাগালেও, তার সামনের একটা পা ভয়ংকরভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। ফ্রেড আর ডডসনও খানিক দূরে ছিল। আমারই মতো ওরাও ভেবেছিল, গালাসরা আক্রমণ করেছে বোধ হয়। ওরা ছুটে আসার আগেই খচ্চরটাকে টেনে ডাঙায় তুলেছিল দলের ছেলেরা। খচ্চরটাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে, না বন্দুকের গুলিতে ওর যন্ত্রণার অবসান করা হবে—এই নিয়ে খানিক তর্কবিতর্ক চলেছিল। কারণ, খচ্চরটা যেভাবে আহত হয়েছিল, তাতে ওর বাঁচার আশা ছিল খুব কম। ফ্রেড ওকে গুলি করে মারতে চাইল না। বাঁচা-মরা খচ্চরের ভাগ্যের হাতেই ছেড়ে দিতে চাইল ফ্রেড। এই ঘটনার পর আমরা জায়গাটার নাম দিলাম ‘ক্রকোডাইল ক্যাম্প’।

আগস্ট ২৬। ছেলেরা সকাল থেকে লড়ে যাচ্ছিল সদ্য বানানো ভেলায় চাপিয়ে দড়ির বোঝা নদীর ও-পাড়ে নিয়ে যেতে, যার একটা প্রান্ত বাঁধা থাকবে নদীর এ-পাড়ে। রীতিমতো যুদ্ধ চলছিল। কিন্তু সব লড়াই ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। ভেলা নিয়ে নদী পার সম্ভব হয়নি। গত চব্বিশ ঘণ্টায় নদীর জল প্রায় ছয় ইঞ্চি মতো কমে গিয়েছিল। কিন্তু তাতেও খুব কিছু সুরাহা হল না। নদীর জলে পালে পালে জলহস্তী সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছিল। যদিও এগুলোর একটাকেও শিকার করার চেষ্টা করিনি।

আগস্ট ২৭। ফ্রেডের আহত খচ্চরটা অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছিল। ফ্রেডের সিদ্ধান্তের তারিফ না করে পারিনি। এমনিতেই আমাদের দলে মালবহনকারী পশুর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কমই ছিল। ছেলেরা সকাল থেকে লড়ে যাচ্ছিল চারটে আট গ্যালনের জলের পিপে দিয়ে আর একটা নতুন ধরনের ভেলা বানাতে। দুপুর নাগাদ তৈরি হয়ে গিয়েছিল ভেলাটা। তিনটে দড়ির বান্ডিল চাপিয়ে ছেলেরা নদীর মাঝামাঝি পৌঁছেও গিয়েছিল। ভাগ্য খারাপ থাকলে যা হয়! মাঝনদীতে জলের তোড়ে ভেলাটা উলটে গিয়েছিল। ছেলেরা সাঁতরে ঠিকঠাক পাড়ে উঠে এলেও, বুঝতে পেরেছিলাম, এভাবে হবে না। নদী পার হবার অন্য কোনও জায়গা খুঁজতে হবে।

আগস্ট ২৮। আমরা ক্যাম্পের আরও খানিক দক্ষিণে গিয়ে একটা জায়গা পেলাম যেখানে নদী অনেকটা সরু। ছেলেরা নদীর ধারে সহজে পৌঁছনোর জন্য মাটি কেটে, জঙ্গল পরিষ্কার করে রাস্তা বানিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু দুপুর গড়াতে-গড়াতেই নদীতে জল বাড়তে শুরু করেছিল হু হু করে। দেখতে দেখতে প্রায় ফুট খানেক জল বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের কারোরই কিছু করার ছিল না দেখে যাওয়া ছাড়া। তবে আমি নদী পার করার আশা ছাড়িনি কোনোভাবেই। আমাদের ছেলেদের ধৈর্য আর উৎসাহ বিপুল। নিশ্চিন্ত ছিলাম, কোনও না কোনও উপায় হবেই। এর মধ্যে আমার বন্দুকবাহক কারশা এক গুলিতে একটা বিশাল ওয়াটার-বাক শিকার করে ফেলেছিল রাতে খাওয়ার জন্য।

আগস্ট ২৯। গতকালের জায়গায় কিছু ছেলেকে কাজে লাগিয়ে রেখে কয়েকজনকে নিয়ে আমি আরও এগিয়ে গিয়েছিলাম, আর ফ্রেডের সঙ্গে আমার হেডম্যান আর কয়েকজনকে দিয়ে পাঠিয়েছিলাম উত্তরের দিকে নদী পার হবার জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় কি না দেখতে। ক্যাম্প থেকে মাইল ছয়েক গিয়ে একটা জায়গা পেয়েছিলাম যেখানে নদী চল্লিশ গজের মতো চওড়া। কিন্তু সেখানে নদী যেমন গভীর, তেমনি স্রোত। কিন্তু মনে হয়েছিল, উটগুলোকে নিয়ে এখানে সম্ভবত নদী পার হওয়া সম্ভব। আগামীকাল ফিরে এসে একবার চেষ্টা করে দেখতে হবে ভেবে ফিরে এসেছিলাম। ফ্রেড কী খুঁজে পেল, তাও জানা দরকার ছিল। ফ্রেড ফিরে এসে জানিয়েছিল, যে-পথে তারা এগিয়েছিল, সেখানে নদী পারাপার অসম্ভব। নদী যেরকম চওড়া, তেমনি গভীর।

জলের সঙ্গে লড়াই

আগস্ট ৩০। গতকাল নদীর যে সরু অংশটা দেখে এসেছিলাম, সেখানে পৌঁছে সামান্য প্রাতরাশ সেরে আমরা কাজে লেগে পড়েছিলাম। দলের এক দক্ষ সাঁতারু দড়ির এক প্রান্ত কোমরে বেঁধে ওই খরস্রোত পার করে ও-পাড়ে পৌঁছে গিয়েছিল। ওই দড়ির থেকে একটা ফাঁস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই ফাঁসের দু-পাশে আবার দড়ি বাঁধা ছিল। একটা উটের ঘাড়ের পাশে একটা পিপে বেঁধে নদী পার করার চেষ্টা হচ্ছিল। পিপেটা বাঁধা হয়েছিল যাতে চট করে উটটা না জলে ডুবে যায়। উটটার শরীরে দড়ি পেঁচিয়ে ঠেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল জলে। দড়িটার এক প্রান্ত ছিল এ-পাড়ে, আর এক প্রান্ত ও-পাড়ে।

দলের বেশ কিছু ছেলে নদীর ও-পাড়ে পৌঁছে গিয়েছিল আগেই। উটটাকে জলে নামাতেই ওরা প্রাণপণে শরীরের সব শক্তি দিয়ে টানা শুরু করেছিল দড়িটা। স্রোতের প্রবল টানে উটসুদ্ধু দড়ি ছিঁড়ে যায় আর কি। পিপের সঙ্গে বাঁধা থাকায় উটের মাথাটা ভেসে ছিল জলের ওপরে। ছেলেগুলো দড়ি টেনে যাচ্ছিল আসুরিক শক্তিতে। মাঝনদীতে আচমকা উটের মাথা চলে যায় জলের তলায়। ভেবেই নিয়েছিলাম, শেষরক্ষা হল না। ছেলেগুলো কিন্তু দড়ি টেনেই যাচ্ছিল। প্রায় পনেরো সেকেন্ড পরে উটটা একটা হাঁসের মতো ভুস করে ভেসে উঠেছিল জলের ওপর। নিরাপদে উটটাকে পাড়ে তোলার পর ছেলেদের উচ্ছ্বাস দেখার মতো ছিল। আমাদের নদী পারাপারের একটা উপায় হয়েছে। সন্ধের আগে মোট এগারোটা উটকে নদীর ও-পাড়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম আমরা।

আগস্ট ৩১। সোমালিরা কাজের ব্যাপারে খুব পটু, যদি ওরা মনের আনন্দে কাজ করে তবেই। হইহই করতে করতে গলা ছেড়ে গান জুড়ে, কোমর দুলিয়ে নাচ করতে করতে মনের আনন্দে মালপত্র পার করছিল ওরা। ঠিক দুপুরবেলা ঘটেছিল ঘটনাটা।

উটের সঙ্গে আসা একটা বাচ্চা ছেলে দুআল্লা ফারাহ খুব একটা ভালো সাঁতার জানত না। নদী পার করার সময় প্রবল স্রোতের টানে হাতে ধরা দড়িটা ছুটে গিয়ে স্রোতের টানে তলিয়ে যায় ও। কোনোভাবেই রক্ষা করা যায়নি ছেলেটাকে। অবাক হয়ে গিয়েছিলাম তারপর অন্য সোমালিদের দেখে। নাচগানে ভাটা পড়েনি একটুকুও। নির্লিপ্তভাবে বলেছিল, যা হয়েছে তা আল্লাহর ইচ্ছেয় হয়েছে। আমাদের কী করার আছে! এই ছেলেটা যে বেশিদিন আমাদের মধ্যে থাকবে না, দলে যোগ দেওয়া এক ভবিষ্যতদ্রষ্টা গোলাদ ফারাহা তো এ-কথা অনেক আগেই জানিয়েছিল।

পরদিন সকালে পঁয়তাল্লিশটা উটকে একইভাবে নদী পার করার পর এসেছিল খচ্চর আর পোনিদের পার করানোর পালা। ফ্রেডের আহত খচ্চরটাকে দড়িতে বেঁধে নদীর ও-পাশে নিয়ে যাবার পর দেখা গেল ধকল সহ্য করতে পারেনি বেচারা, মরে গেছে। আমার একটা খচ্চরও ভাগ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। একটা পোনি নদী পার হতে পারলেও ওর ফুসফুসে এত জল ঢুকে গিয়েছিল যে তার পরদিন মারা গিয়েছিল সেটা। সবাই নদী পার হবার পর দেখেছিলাম, খেসারত যথেষ্ট দিতে হয়েছিল। উটের সঙ্গে আসা একজন লোক আর দুটো খচ্চর জলে ডুবে মারা গেছে। সোমালিদের মধ্যে বিষয়টা কোনও ছাপ না ফেললেও, আমাকে বিষণ্ণ করে তুলেছিল। গত ক’দিন এই অঞ্চলে বৃষ্টি হয়নি। ফলে তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছিল নদী উপত্যকার। গত চব্বিশ ঘণ্টার গড় তাপমাত্রা ছিল ৮৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট।

পাথরের শহরের খোঁজ

একদিন বিশ্রাম নেবার পর আমি আমার লোকেদের আশেপাশে পাঠিয়েছিলাম আদিবাসীদের কোনও সন্ধান পাওয়া যায় কি না খুঁজে দেখতে। আর আমি ক্যাম্পের খানিক দূরের একটা পাহাড়ে মাথায় চড়েছিলাম চারপাশটা দেখে নিতে। পাহাড়ের মাথা থেকে যতদূর নজরে যায়, শুকনো সমতল ঘাসজমি ছাড়া আর কিছু দেখতে পাইনি। পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে কম্পাস নিয়ে সবে মাপজোক শুরু করেছি, তখনই ক্যাম্পের দিক থেকে গুলির শব্দ। তড়িঘড়ি ক্যাম্পের কাছে পৌঁছে দেখি, আমার কয়েকজন লোক একজন স্থানীয় লোককে ধরেছে। যাতে সে দৌড়ে না পালায়, তাই ভয় দেখাতে বন্দুক থেকে গুলি ছুড়েছিল আমার ছেলেরা।

স্থানীয় লোক খুঁজে বের করাটা খুব দরকার ছিল সামনের পথের হদিস জানার জন্য। একবার নদীর পাশ থেকে সরে গেলে অন্য কোথাও জল পাব কি না কারও জানা নেই। জানা নেই সামনে কী বাধা আছে। তাই আমি আমার ছেলেদের হুকুম দিয়ে রেখেছিলাম, কোনও স্থানীয়কে দেখলেই পাকড়াও করবে। কিন্তু পাশাপাশি বন্দির যেন কোনও শারীরিক ক্ষতি না হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। বন্দি যুবকটি কোনও তথ্য দিতে চাইছিল না। বেশ বুঝতে পারছিলাম, একটা আতঙ্ক যুবকটির মনে কাজ করছে। তাই ওকে ক্যাম্পে নিয়ে এসেছিলাম বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ভয় ভাঙিয়ে সামনের পথের কিছু খবরাখবর আদায় করতে। ক্যাম্পে পৌঁছে দেখি, আমার অন্য কিছু ছেলে আরও একজন লোককে ধরে এনেছে। ছেলেটিকে বেশ বুদ্ধিমান বলে মনে হয়েছিল।

গতকাল সারারাত দলের আটটা ছেলের একটা দল বাইরে কাটিয়ে সকালে ক্যাম্পে ফিরে জানাল, ক্যাম্প থেকে মাইল কুড়ি দূরে একটা ছোটো নদী তারা দেখে এসেছে আর নদীটি শেবেলি নদীতে মিশেছে। ধরে রাখা নেটিভরা বলল, নদীটির নাম দারদে। নদীটি এসেছে বহুদূরের উত্তরের উঁচু পাহাড় থেকে। সেই উঁচু পাহাড়ি অঞ্চল যেমন ঠান্ডা, তেমন স্যাঁতসেঁতে।

ধরা পড়া ছেলেগুলো জানাল, উত্তরের সেই পাহাড়ের কাছের মানুষ তারা। সেখানকার মানুষজন পাথরের ঘর বানিয়ে থাকত, শস্য ফলাত, কাপড় বুনত, পশুর পাল চরাত। একটা শহর ছিল রীতিমতো। আর সেই শহরটার নাম, শেখ হোসেন। ছেলেগুলোর কথা শুনে আমি চমকে গিয়েছিলাম। আফ্রিকার এই অংশে পাথরের ঘর! আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম, যদি একেবারেই অসম্ভব না হয়, শেখ হোসেন দেখতেই হবে। বন্দি দুজন জানিয়েছিল, বছর চারেক আগে আবিসিনিয়ানরা তাদের শহর আক্রমণ করে তছনছ করে দিয়েছিল। ছেলেমেয়েদের ক্রীতদাস বানাবে বলে বন্দি করেছিল আর পশুর পাল থেকে শুরু করে যা কিছু ছিল, সব লুঠ করে নিয়ে গিয়েছিল।

প্রচণ্ড পরিশ্রম করে দুপুর নাগাদ ক্যারাভান নিয়ে পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে মালভূমির ঘাসজমিতে পৌঁছে খান কয়েক জলের ঝোরা দেখে তার পাশে ক্যাম্প খাটিয়েছিলাম। তার খানিক দূরে একটা ক্ষুদে নদীও আবিষ্কার করেছিলাম। কিন্তু সেই নদীর জল ছিল বিস্বাদ, অনেকটা ম্যাগনেসিয়াম সালফেট দ্রবণের মতো।

উত্তরের দিকে এগোতে গিয়ে একের পর এক গ্রাম পড়েছিল চলার পথের পাশে। সব গ্রাম জনশূন্য। ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ইতোমধ্যে দুই বন্দি বুঝে গিয়েছিল, আমাদের কোনও খারাপ উদ্দেশ্য নেই। আমরা লুঠ করতে আসিনি, বরং বন্ধু হতে এসেছি। আমাদের এই দেশে আসার কারণও তারা জেনে গিয়েছিল। তাই ওই দুজনকে আমরা পুরোপুরি মুক্ত করে দিয়েছিলাম। তারা আমাদের দলের অংশ হয়ে গিয়েছিল। ওদেরকে বলা হয়েছিল চারপাশে লুকিয়ে থাকা নিজের লোকেদের খবর দিয়ে নিয়ে আসতে। বলেছিলাম, আমাদের খাবার চাই, আর খাবারের পরিবর্তে অবশ্যই আমরা জামাকাপড় ও অন্যান্য জিনিসপত্র দেব, যা ওদের কাজে লাগবে।

পরদিন কুড়িজন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আমি দারদে নদী অভিযানে বেরিয়েছিলাম। সঙ্গে নিয়েছিলাম বন্দি করা একজন হারি বেরোইসকে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল দারদে যেখানে শেবেলি নদীতে মিশেছে, সেই জায়গাটা দেখে আসা। উত্তর-পশ্চিমদিকে বহুক্ষণ চলার পর হাজার খানেক গভীর এক গিরিখাতের ধারে পৌঁছেছিলাম। গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে দারদে। আমরা গিরিখাতের মধ্যে নেমে দারদেকে পাশে রেখে পৌঁছেছিলাম দারদে-শেবেলির সঙ্গমে।

নদীর ধারে অসংখ্য মানুষের পায়ের চিহ্ন দেখলেও, একটা মানুষের দেখাও পাইনি। যদিও বেশ টের পেয়েছিলাম, তারা আমাদের আশেপাশেই আছে। নদীর ধারে খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাতে হয়েছিল, কারণ সঙ্গে কোনও তাঁবু আমরা নিয়ে আসিনি। মশার ঝাঁক মনে হচ্ছিল যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে। এত মশার কামড় এই যাত্রায় আগে কখনও খাইনি। পরদিন সন্ধের আগে ফিরে এসেছিলাম মূল দলে। ফেরার সময় নজরে এসেছিল, অনেক দূরে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা ভেড়ার পাল চরাচ্ছে। আমি হারি-সহ আরও দুজনকে ওদের কাছে পাঠিয়েছিলাম বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ওদের ক্যাম্পে নিয়ে আসতে। ওরা এসেছিল। বলেছিল, ওরাই শুধু এখন এই অঞ্চলে রয়ে গেছে, বাকিরা আমাদের আবিসিনিয়ানদের মতো দস্যু ভেবে পালিয়ে গেছে এলাকা ছেড়ে। ওদেরকে ক্যাম্পে নিয়ে এসে অনেক উপহার দিয়ে ভয় ভাঙিয়ে বলেছিলাম বাকি লোকেদের ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। বলেছিলাম, আমরা কোনও দস্যুর দল নই, ওদের বন্ধু। এই অঞ্চল দেখতে আর চিনতে এসেছি। পরদিন ফেজি নামের এক জলকুণ্ডের কাছে পৌঁছে দেখি অনেক আদিবাসী এসে জড়ো হয়েছে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে।

ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply