বিচিত্র দুনিয়া-জীবাণু অস্ত্রের দ্বীপ – আরালস্ক-৭-অরিন্দম দেবনাথ-বর্ষা ২০২৬

ঠান্ডা যুদ্ধের সময় উজবেকিস্তান এবং কাজাখস্তান সীমান্তের আরাল সির ভোজরোঝদেনিয়া (Vozrozhdeniya) দ্বীপে প্রাণঘাতী জৈব অস্ত্র তৈরির গোপন গবেষণাগার তৈরি করেন জোসেফ স্তালিন (শাসনকাল ১৯২৭-১৯৫৩)। বহুবছর আগে সেই পরীক্ষাগার পরিত্যক্ত হয়ে গেলেও, সে দ্বীপ আজও শুধু প্রাণঘাতীই নয়, বিশ্বজোড়া ভবিষ্যৎ মহামারীর কারণ হয়ে উঠতে পারে। লিখেছেন অরিন্দম দেবনাথ

কাজাক-উজবেক সীমান্তে অবস্থিত মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে থাকা বালির সাম্রাজ্যের মাঝের একটি দ্বীপ। বর্তমানে একে ঠিক দ্বীপের সংজ্ঞায় না মেলানো গেলেও একসময় এটি দ্বীপই ছিল। কেন? কারণ, একে ঘিরে থাকা আরাল সাগরের জল সরে গিয়ে দ্বীপটিকে প্রায় মূল ভূমির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। ফলে জায়গাটি দ্বীপের চরিত্র হারিয়েছে।

দ্বীপটির নাম ভোজরোঝদেনিয়া। একসময় আরাল সাগরের সবজে-রঙা জলে ঘেরা ভোজরোঝ‌দেনিয়া ছিল সবসময় হইচইতে মেতে থাকা জেলেদের এক বিশাল গ্রাম। আরাল সাগর ছিল বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ হ্রদ। ‘ছিল’, কারণ এখন আর নেই। সোভিয়েত যুগে বিশেষ করে স্তালিন জামানায় শুকনো অঞ্চলে চাষের জন্য, মূলত তুলোর উৎপাদন বাড়াতে সেচের মাধ্যমে জল জোগান শুরু হতে আরাল সাগরের দুই মুখ্য জলের উৎস আমু দরিয়া ও সির দরিয়া নদী আরাল সাগরে মেশার আগে আগে তার জলের জোগান হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে আমু দরিয়ার নীচু অংশ প্রায় জলহীন হয়ে যায়, ফলে ভোজরোঝদেনিয়ার চারপাশ শুকনো হয়ে গিয়ে সে এক মরু অঞ্চলে পরিণত হয়। বর্তমান ভোজরোঝদেনিয়ার কাছাকাছি দুই শহর হল, মুয়ানাক ও আরালস্ক। আরাল-সির এই দুই বন্দর শহরই দেড়শো কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে অবস্থিত।

বর্তমানে এটি এমন একটি অঞ্চল যেখানে তাপমাত্রা দিনের বেলায় কখনো-কখনো উঠে যায় ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একসময়কার প্রাণের চিহ্ন বলতে আছে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া গাছ, উটের কঙ্কাল আর মরচে ধরা ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত নৌকো।

ভোজরোঝদেনিয়া দ্বীপ সমুদ্রের বিশাল অংশকে গ্রাস করে বিগত কয়েক দশকে এতটাই বড়ো হয়ে উঠেছে যে সে দ্বীপ না হয়ে মূল ভূখণ্ডের অংশ হয়ে গেছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের তুলনায় তার আয়তন কম করেও দশগুণ বেড়েছে। শুধু সেচের জল তোলার কারণেই যে দ্বীপটির অপমৃত্যু হয়েছে তা নয়, সোভিয়েত আমলের আরও একটি প্রকল্পের জন্য এই দ্বীপটি বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী অঞ্চল। শুধু তাই নয়, এই দ্বীপে সামান্যতম ভুল পদক্ষেপ পৃথিবীর জনসংখ্যা অর্ধেক পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।

মৃত, পরিত্যক্ত এই দ্বীপটির ভয়াবহতা হয়তো আড়ালেই থেকে যেত যদি না ১৯৭০-এর দশকে এই দ্বীপটি রহস্যময় কিছু ঘটনার ইঙ্গিত দিত। ১৯৭১ সালে ‘লেভ বার্গ’ নামের এক সোভিয়েত গবেষণাবাহী জাহাজ ভুল করে আরাল সাগরে বাদামি রঙের এক কুয়াশার আস্তরণের ভেতরে ঢুকে পড়ে। খানিক সময়ের মধ্যেই জাহাজের এক তরুণী গবেষক অসুস্থ হয়ে পড়েন। কয়েকদিনের মধ্যেই ধরা পড়ে, তরুণীর স্মলপক্স হয়েছে। ডাক্তারদের তাঁর এই রোগ অবাক করে, কারণ আক্রান্তের স্মলপক্স না হওয়ার টিকা নেওয়া ছিল। তরুণী বেঁচে উঠলেও তাঁর থেকে তাঁর নিজের শহরে রোগটা ছড়িয়েছিল। নয়জন সংক্রমিত হয়েছিল এবং এর মধ্যে তিনজন মারা গেছিল। এই তিনজনের একজন ছিল গবেষকের ছোটো ভাই এবং সবার স্মলপক্সের টিকা নেওয়া ছিল। এর বেশি আর কোনও তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

এর এক বছর পর নিখোঁজ দুই জেলেকে ভোজরোঝদেনিয়ার কাছাকাছি তাদের নৌকায় ভাসমান ও মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তে প্রকাশ পায়, এদের প্লেগ হয়েছিল। এর কিছুদিন পরেই আরাল সাগরের ভোজরোঝদেনিয়া অঞ্চলের স্থানীয় জেলেদের জাল-ভরতি মরা মাছ ধরা পড়তে থাকে। ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ মরে যাওয়ার কারণ জানা যায়নি।

১৯৮৮ সালের মে মাসে ভোজরোঝদেনিয়ার অদূরের এক চারণভূমিতে চরে বেড়ানো প্রায় ৫০,০০০ সাইগা হরিণকে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ঢলে পড়ে অদ্ভুতভাবে মরে যেতে দেখেন শিকারিরা।

দ্বীপটির রহস্য আজও পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি, কারণ চাইলেই যে-কেউ এই দ্বীপে যেতে পারবে না। ১৯৯০-এর দশকে এই ভোজরোঝদেনিয়া পুরোপুরি পরিত্যক্ত হবার পর মাত্র কয়েকটা অভিযান এই দ্বীপে পরিচালিত হয়েছিল। তার আগে এই দ্বীপ ছিল সোভিয়েত সামরিক বাহিনীর কড়া পাহারায়।

২০০৫ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলবিদ তথা সাংবাদিক নিক মিডলটন এই দ্বীপে গেছিলেন একটি তথ্যচিত্র তৈরি করতে। নিক বলেছিলেন, “আমি জানতাম এই দ্বীপে কী হত। আমি এমন একজন লোকের খোঁজ পেয়েছিলাম, যিনি ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে ছিলেন এবং এই দ্বীপ সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতেন। তিনি আমাদের এই জায়গা দেখে যে ভয় পেতে পারি, তার আগাম আভাস দিয়ে রেখেছিলেন। সত্যি বলতে কি, শুনেই আমার হাত-পা ভয়ে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।”

সেই ভদ্রলোক ছিলেন ডেভ বাটলার। নিকের অনুরোধে বিপদের সম্ভাবনা মাথায় নিয়ে তিনি অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন এক বিশেষজ্ঞ হয়ে। ডেভ জানতেন, ওই মৃত দ্বীপে এমন কিছু আছে যা ভয়ংকর বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাটলার প্রথমেই পুরো দলটিকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো শুরু করিয়েছিলেন অভিযানে শুরুর এক সপ্তাহ আগে থেকেই। শুধু তাই নয়, তিনি অভিযাত্রী দলের সবাইকে ওই দ্বীপে পা রাখার আগে উচ্চ প্রযুক্তির এয়ার-ফিল্টারযুক্ত গ্যাস মুখোশ, পুরু রাবারের বুট ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের ব্যবহৃত সারা শরীর ঢাকা সাদা রঙের বিশেষ পোশাক পরিয়েছিলেন (biocontainment suit)।

আরাল সাগরের এই দ্বীপটি যে কাছাকাছির অন্য দ্বীপ থেকে আলাদা, তার আভাস পাওয়া যায় ১৯৬২ সালে আমেরিকার সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি যা সংক্ষেপে সি.আই.এ নামে বেশি পরিচিত, তার তোলা এক আকাশচিত্র থেকে। আশেপাশের অন্যান্য দ্বীপে যেখানে শুধু কেবল জেটি আর মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের কুঁড়ে ছিল, সেখানে এই দ্বীপে ছিল একটি রাইফেল রেঞ্জ, সেনা ব্যারাক ও কুচকাওয়াজ করার ময়দান। সি.আই.এ জানতে পারে, ওই দ্বীপে চলছিল আরও ভয়ংকর সব কাণ্ডকারখানা। সেনা ব্যারাকের পাশাপাশি ছিল গবেষণাগার, পশুদের খাঁচা আর খোলা পরীক্ষাস্থল। এটি ছিল জৈব অস্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্র তথা অত্যন্ত বিপজ্জনক সামরিক ঘাঁটি।

এই প্রকল্পটি ছিল সম্পূর্ণ গোপন। এমনকি, কোনও সোভিয়েত নথিতে এর উল্লেখ ছিল না। কিন্তু যাদের জানার কথা, তারা জানত। তাদের কাছে এই গোপনীয় কার্যকলাপ পরিচিত ছিল ‘আরালস্ক-৭’ (Aralsk-7) নামে, যার সূচনা হয়েছিল ১৯৫৪ সালে।

জৈবাস্ত্র তৈরির কাজ শুরু হবার পর থেকে যত দিন গড়িয়েছে, ততই দুঃস্বপ্নের দ্বীপে পরিণত হয়েছে ভোজরোঝদেনিয়া। অ্যানথ্রাক্স (anthrax), গুটিবসন্ত (smallpox) এবং প্লেগের (plague) জীবাণু বিশাল মেঘের মতো ভেসে বেড়াতে শুরু করেছিল বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে। তুলারেমিয়া (tularemia), ব্রুসেলোসিস (brucellosis) ও টাইফাসের (typhus) মতো বিরল ও ভয়াবহ সব রোগ যেন বৃষ্টির ধারার মতো ঝরে পড়ে সেখানকার বালুময় মাটির গভীরে মিশে যেত।

বলতে গেলে দ্বীপটি ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। উনবিংশ শতাব্দীর আগে এর অস্তিত্বও সেভাবে জানা ছিল না। অজস্র ছোটো ছোটো দ্বীপের একটিতে পশ্চিমা গোয়েন্দাদের নজর পড়ার সম্ভবনা ছিল না। তাছাড়া চারপাশ ঘিরে থাকা সমুদ্র ছিল প্রাকৃতিক ঢাল। ফলে সে-সময় ক্ষমতার মাথায় বসে থাকা সোভিয়েত কর্তারা এই দ্বীপটিকে মানব ইতিহাসের বৃহত্তম গোপন জৈব অস্ত্র তৈরির কারখানা বানানোর আদর্শ জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যদিও এটিই একমাত্র কারণ কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এইখানে উৎপন্ন জৈব অস্ত্র যে কতটা ভয়াবহ ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭৯-এর ২ এপ্রিল এই দ্বীপের কাছের এক শহর সভের্দলভস্ক (বর্তমানে ইয়েকাতেরিনবুর্গ) মিলিটারি কম্পাউন্ড-১৯ থেকে ছড়িয়ে পড়া মারাত্মক অ্যানথ্রাক্স রেণু থেকে। এই জীবাণু প্রজাতির নাম ছিল অ্যানথ্রাক্স ৮৩৬। সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য (অ্যাডাম স্মিথ ইন্সটিটিউট-এর এক রিপোর্ট থেকে পাওয়া) গবেষণাগারে তৈরি এই জীবাণুগুলোকে শুকিয়ে গুঁড়ো করা হত, যাতে তা হাওয়ায় ভাসিয়ে রোগ ছড়িয়ে দিয়ে মানুষ মারা যায়। অনুমান করা হয়, প্রয়োজনে SS-18 ক্ষেপণাস্ত্রের মাথায় বসিয়ে আমেরিকার শহরগুলো তাক করে এইসব প্রাণঘাতী জীবাণুভরা পাত্র ফেলার পরিকল্পনা ছিল সে-সময়কার সোভিয়েত সমরকর্তাদের।

যে ফিল্টারগুলো অ্যানথ্রাক্সের ধূলিকণা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া আটকাত, সেগুলো জীবাণু শুকানোর মেশিন বন্ধ রেখে পরিষ্কার করতে হত। পরবর্তী তদন্তে জানা যায়, এক টেকনিশিয়ান একটি ফিল্টার সরিয়ে নিয়েছিলেন এবং সে-বিষয়ে একটি ‘নোট’ও মেশিনের গায়ে সেঁটে দিয়েছিলেন। কিন্তু ওঁর পরিবর্তে অন্য একজন টেকনিশিয়ান যখন মেশিন চালু করেন তখন তিনি নোটটি লক্ষ করেনি, ফলে ফিল্টার না লাগিয়েই জীবাণু শুকানোর মেশিন চালিয়ে দেন। ভুলটি ধরা পড়ার আগেই যা সর্বনাশ ঘটার ঘটে যায়। কেন্দ্রটি থেকে অ্যানথ্রাক্সের ধূলিকণা বাতাসে মিশে যায় ও শহরে ছড়িয়ে পড়ে।

ভাগ্য ভালো বাতাস শহরের অনুকূলে ছিল না। ফলে শহরময় জীবাণু ছড়িয়ে না গেলেও যেটুকু অংশে ছড়িয়েছিল, তাতেই আনুমানিক ১০০-র বেশি মানুষ আর অসংখ্য গবাদিপশু মারা গিয়েছিল। সরকারিভাবে মৃত্যুর ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল দূষিত মাংস খাওয়ার কারণ দেখিয়ে। সব চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। (আমাদের বসন্ত রোগ হলে এই কারণেই বসন্তের গুটি শুকিয়ে গিয়ে চামড়া উঠতে শুরু করলে সেগুলোকে একটা বন্ধ পাত্রে রেখে পুড়িয়ে ফেলতে বলা হয়, যাতে ওই জীবাণুবাহী চামড়ার ছোঁয়ায় অন্য কারও শরীরে রোগ না ছড়ায়।)

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর একটি আন্তর্জাতিক পরিদর্শক দল ঘটনাটির তদন্ত করে। ১৯৯২ সালের সেই তদন্তে সোভিয়েত জৈব অস্ত্র কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘনের ঘটনা প্রমাণিত হয়।

‘আরালস্ক-৭’ ছিল এক বিশাল মাপের জৈব অস্ত্র তৈরির গোপন কর্মসূচি। বিশাল সোভিয়েত সাম্রাজ্য জুড়ে প্রায় ৫২টি কেন্দ্রে ৫০,০০০ মানুষ যুক্ত ছিল এই কাজে। বিশাল বিশাল ‘কালচার’ করার পাত্রে (fermenting vat) অ্যানথ্রাক্স উৎপাদন ও লালন করা হত; বাইরে থেকে দেখে মনে হত সামরিক বাহিনীর জন্য বিয়ার তৈরি হচ্ছে।

কম্পাউন্ড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার ন’বছর পর, ১৯৮৮ সালে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ তাদের অ্যানথ্রাক্স ভাণ্ডার ধ্বংস করে দেবে বলে ঠিক করে। অ্যানথ্রাক্স জীবাণুর স্পোরে ভরা বিশাল বিশাল পাত্রে ব্লিচ মিশিয়ে সেগুলোকে নিয়ে যাওয়া হয় আরাল সাগরের তীরের এক বন্দর ‘আরালস্ক’-এ (যা বর্তমানে সমুদ্রতীর থেকে ১৬ মাইল বা ২৫ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত)। সেখানে জীবাণু-বোঝাই পাত্রগুলো বার্জে বোঝাই করে পাঠানো হয় ভোজরোঝদেনিয়া দ্বীপে। ১০০ থেকে ২০০ টন অ্যানথ্রাক্স মিশ্রিত থকথকে বর্জ্য (slurry) তাড়াহুড়ো করে গর্তে ফেলে চাপা দিয়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে সেগুলোর কথা আর কারও মনে থাকে না।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া ‘স্পোর’ হিসেবে নিষ্ক্রিয়ভাবে টিকে থাকে। এদের ওপর যা-ই প্রয়োগ করা যাক না কেন, যত জীবাণুনাশক ছড়ানো হোক, এরা সবকিছু হেলায় প্রতিরোধ করে, এমনকি ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় টানা দু-মিনিট রেখেও এদের ধ্বংস করা যায়নি। এতই শক্তিশালী অ্যানথ্রাক্স।

মাটির নীচে পোঁতা অবস্থায় এই স্পোরগুলো শত শত বছর ধরে টিকে থাকতে পারে। এইরকম একটি প্রমাণ মিলেছিল স্কটল্যান্ডের এক মধ্যযুগীয় হাসপাতালের ধ্বংসাবশেষে পরিচালিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ থেকে। যেখানে কয়েকশো বছর আগে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু চুন চাপা দিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সেই জীবাণু সক্রিয় ছিল।

২০১৬ সালে রাশিয়ার সুদূর উত্তরাঞ্চলের মেরু বৃত্তে একটি বারো বছরের ছেলের মৃত্যু হয় অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণে। অ্যানথ্রাক্সের কবলে ‘নেনেটস’ গোত্রের যাযাবরদের ৭২ জন সংক্রমিত হয়, যার মধ্যে ৮১ জনই ছিল শিশু। মারা যায় হাজার হাজার বলগা হরিণ। হাসপাতালে ভরতি করা আক্রান্ত মানুষদের মধ্যে পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ক ও দুজন শিশুকে আবার শনাক্ত করা হয়েছিল ‘সাইবেরিয়ান প্লেগ’ আক্রান্ত বলে, যা এই অঞ্চলে ১৯৪১ সালে শেষবারের মতো আঘাত হেনেছিল (তথ্য দ্য গার্ডিয়ান, ১ আগস্ট ২০১৬)। মনে করা হয়, তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে বরফ গলে বাতাসের ছোঁয়ায় আসা কিছু বলগা হরিণের মৃতদেহ থেকে এই রোগ ছড়ায়, যা কম করে ৭৫ বছরের পুরোনো। অ্যানথ্রাক্সের জীবাণুর টিকে থাকার ক্ষমতা এতই বেশি।

১৯৮৮ সালের ১৬ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার বেশ কিছু বছর পর, ১৯৯৩ সালের জুলাই মাসে জাপানের টোকিওর কামেইদোতে অবস্থিত একটি আটতলা ভবনের ছাদ থেকে ‘আউম শিনরিকিও’ নামক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী কর্তৃক ‘ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস’-এর জীবাণু বাষ্পের আকারে বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, সাদ্দাম হুসেনের নেতৃত্বাধীন ইরাক জীবাণু অস্ত্র বানাতে শুরু করেছিল। ১৯৭২ সালে ইরাক ‘জৈব অস্ত্র কনভেনশন’-এ (BWC) সই করলেও ১৯৯১ সালের আগে তা বাস্তবায়িত করেননি। বরং ১৯৮০-র শুরুতে জৈব অস্ত্র কর্মসূচি জোরদারভাবে শুরু করেছিলেন তিনি। এ থেকে সন্ত্রাসবাদী বা বিপথগামী সরকারগুলোর হাতে কোনও অস্ত্রোপযোগী রোগজীবাণু চলে যাওয়ার আশঙ্কা ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছিল। তাই মার্কিন সরকার জৈব অস্ত্রে রাশ টানার জন্য বিশেষজ্ঞ দল তৈরি করেছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার ঠিক কোথায় তাদের জৈব অস্ত্র মজুদ করেছিল, তার সঠিক অবস্থান প্রকাশ করেনি। কিন্তু তাতে সমস্যা হয়নি। মহাকাশ থেকে তোলা ছবি থেকে তা স্পষ্ট জানা গেছিল ভোজরোঝদেনিয়ায় খোঁড়া গভীর গর্তগুলো থেকে। ওখান থেকে সংগ্রহ করা মাটির নমুনায় সক্রিয় জীবাণুর নমুনা পাওয়া যায় এবং জীবাণু ভাণ্ডার সঠিকভাবে নিষ্ক্রিয় বা মজুত করার জন্য মার্কিন সরকার ছয় মিলিয়ন ডলার অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেয়।

এই কাজের জন্য সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের খোঁড়া গর্তের পাশে একটি গভীর খাদ খুঁড়েছিল জীবাণু নিষ্ক্রিয়কারী দল। খাদের মধ্যে প্লাস্টিক বিছিয়ে তাতে হাজার হাজার কিলোগ্রাম শক্তিশালী ব্লিচ পাউডার ঢেলে টন টন দূষিত মাটি এনে ফেলা হয়েছিল খাদের মধ্যে। কাজটি করতে হয়েছিল ৫০ ডিগ্রির তীব্র গরমে পুরো শরীর-ঢাকা বিশেষ পোশাক পরে। প্রচুর যন্ত্রপাতি ছাড়াও স্থানীয় একশো জনকে লাগানো হয়েছিল এই কাজে। চার মাস লেগেছিল কাজটি করতে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে সফলতা এসেছিল। মাটি পরীক্ষা করে তাতে আর অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়া যায়নি। শক্তিশালী ব্লিচের ছোঁয়ায় জীবাণুর রেণুগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছিল।

কিন্তু গল্পের শেষ এখানে হয়নি। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে খোলা জায়গায় জৈব অস্ত্র পরীক্ষা চালানোর ফলে পরে পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল, যেখানে জৈব অস্ত্র মাটির তলায় পোঁতা হয়েছিল, শুধু সেই জায়গায় নয়, দূষণ ছড়িয়েছে পুরো দ্বীপ ও আশেপাশে। কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানথ্রাক্স বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ লেস বেইলি বলেন, “ওহ্‌, সেখানে এখনও অ্যানথ্রাক্স রয়ে গেছে—এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।” তিনি এক দশক ধরে যুক্তরাজ্যের সাবেক জৈব অস্ত্র গবেষণাকেন্দ্র ‘পোর্টন ডাউন’-এ কাজ করেছেন।

ওই দ্বীপের খোলা আকাশের নীচে পরীক্ষা চালানোর ফলে শয়ে শয়ে প্রাণীর মৃতদেহ পোঁতা হয়েছিল গর্ত খুঁড়ে। এমনকি ওই পরীক্ষাগারে সংক্রামক উপাদান নিয়ে কাজ করা অসংখ্য নারী-পুরুষ মারা গিয়েছিল, যাদের নামগোত্রের উল্লেখ নেই কোনও নথিতে। তাদেরও পোঁতা হত মাটির তলায়। সেই গর্তগুলো মোটেই গভীর ছিল না। ফলে জায়গাগুলো জলমগ্ন হয়ে গেলে মাটির তলায় থাকা কেঁচো বা অন্যান্য পোকামাকড় বাহিত হয়ে জীবাণুর স্পোর মাটির ওপরে উঠে এসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে মনে করেন লেস বেইলি।

শুধু ভোজরোঝদেনিয়া কেন, এরকম আরও একটি দ্বীপ হল স্কটিশ হাইল্যান্ডসের উপকূলের অদূরের গ্রুইনার্ড (Gruinard Island)। ভয়াবহ ব্যাপার হল, এটি মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ জনহীন তৃণভূমির মাঝে নয়, বরং জনবহুল অঞ্চলের বেশ কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে ১৯৪২-৪৩ সালে মাত্র এক বছরের জন্য এই দ্বীপটি ছিল যুক্তরাজ্যের জৈব অস্ত্র কর্মসূচির মূল কেন্দ্রবিন্দু। পরীক্ষার অংশ হিসেবে ভেড়ার পালকে খোলা মাঠে বেঁধে রাখা হত, অথবা কাঠের খাঁচায় ভরে রাখা হত। তারপর এই প্রাণীগুলোকে আনা হত বিপুল মাত্রার অ্যানথ্রাক্সের  স্পোরের ছোঁয়ায়। একবার দ্বীপটিতে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু বোমা ছোড়া হয়েছিল, আর একবার বিমান থেকে ফেলা হয়েছিল। তিনদিন পর থেকে ভেড়াগুলো মরতে শুরু করেছিল।

“কোনও প্রাণী অ্যানথ্রাক্সে মারা গেলে তা সহজেই চেনা যায়। শরীর ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং সারা শরীরে রক্তক্ষরণ দেখা যায়। যদিও বিজ্ঞানীরা মৃতদেহগুলো নিয়ে সতর্কতা নিয়েছিলেন। দেহগুলো পুড়িয়ে ফেলেছিলেন এবং যেখানে পোড়ানো হয়েছিল সেখানে যাতে কেউ পৌঁছতে না পারে, তাই ডিনামাইট দিয়ে খাড়া পাথরের দেওয়াল ফাটিয়ে সে জায়গাটা ঢেকে দেওয়া হয়েছিল।” জানিয়েছেন লেস।

মাত্র দুটো পরীক্ষাতেই জায়গাটা এত দূষিত হয়ে পড়ে, যে পরিষ্কার করার সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়াতে সরকার দ্বীপটিকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করে।

গত পঞ্চাশ বছরে ওই দ্বীপে পা রাখা ব্যক্তিরা হলেন পোর্টন ডাউনের বিজ্ঞানীরা আর মূল ভূখণ্ড থেকে আসা দুই ফ্লেট ভাই। এই দুই ভাই বিশেষ সুরক্ষা পোশাক পরে বছরে একবার নৌকা নিয়ে ওই দ্বীপে যান (বিবিসির ২০২২-এর এক রিপোর্ট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী) সতর্কীকরণ ফলকগুলোতে নতুন করে রঙ করতে।

১৯৭৯ সালে গ্রুইনার্ড দ্বীপের মাটির নমুনা পরীক্ষায় জানা গিয়েছিল, জৈব অস্ত্র পরীক্ষার চার দশক পরেও প্রতি গ্রাম মাটিতে ৩,০০০ থেকে ৪৫,০০০ স্পোর অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু মাটিতে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা একে ‘দূষিত দানব’ (contaminated monster) বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাব করেছিলেন, দ্বীপের উপরিভাগ কংক্রিট দিয়ে মুড়ে দেওয়া হোক, যাতে জলে ধুয়ে কোনও কারণেই এই মারণ জীবাণু উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের জলে মিশতে না পারে।

শেষ পর্যন্ত ১.৯৬ বর্গ কিলোমিটার মাপের এই দ্বীপটির প্রতিটি ইঞ্চি সমুদ্রজলের সঙ্গে ২৮০ মেট্রিক টন ফরমালডিহাইডের (formaldehyde) মিশ্রণ স্প্রে করা হয় এবং ১৯৯০ সালে এটিকে নিরাপদ বলে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে সহজেই নৌকায় চেপে এই দ্বীপে যাওয়া যায়, অবশ্য যদি আপনি কাউকে নিয়ে যেতে রাজি করাতে পারেন।

অন্যদিকে, ভাগ্য ভালো ভোজরোঝদেনিয়া দ্বীপে পৌঁছোনো সহজ নয়। মিডলটন, বাটলার আর তাঁর দলবল কাজাখস্তান পাড়ি দিয়ে ভোজরোঝদেনিয়ার কাছাকাছি গ্রাম কুইল্যান্ডিতে পৌঁছেন। ভেবেছিলেন, এখান থেকে বড়ো নৌকা ভাড়া নিয়ে আর পথপ্রদর্শক সঙ্গে করে আরাল সাগর দিয়ে ভোজরোঝদেনিয়া পৌঁছবেন। কিন্তু গ্রামের লোকেরা জানত, ওই দ্বীপে যাওয়া মানে মৃত্যু ডেকে আনা, তাই কেউ সঙ্গে যেতে রাজি হয়নি। অবশেষে বাটলার একদল কাবাড়ির (salvage-seekers) খোঁজ পান, যারা ওই দ্বীপে যায় লোহালক্কড় চুরি করে আনার জন্য।

অভিযাত্রীদের যাত্রা শুরু করতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল, কারণ দলের বেশ কয়েকজন সদস্য খাদ্যে বিষক্রিয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরাল সাগরের ওপর দিয়ে বইতে শুরু করে এক ভয়ংকর ধুলো ঝড়। চারপাশের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। “জরাজীর্ণ নৌকার ওপর বসে মনে হচ্ছিল আমরা বোধ হয় আজই শেষ হয়ে যাব। ওই প্রলয় ঝড়ে নৌকা যে উলটে যায়নি, তা আমাদের প্রবল ভাগ্য।” এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন মিডলটন।

পরের দিন দ্বীপের কাছে পৌঁছেও কিন্তু সহজে ভোজরোঝদেনিয়ায় পা রাখতে পারেননি অভিযাত্রীরা। কারণ, আরাল সাগরের জল শুকিয়ে যাবার পর দ্বীপের একটি অংশ উজবেকিস্তানে চলে যায়, আর একটি অংশ থাকে কাজাখস্তানে। উজবেকিস্তানে যাবার ভিসা পাওয়া কঠিন ছিল বলে অভিযাত্রীরা সে চেষ্টা করেননি। ফলে কাজাখস্তান ভূখণ্ড ঘুরে দ্বীপে পৌঁছতে হয় ওঁদের। যদিও এই ঘাঁটিটির মূল অংশের অনেকটাই বর্তমানে উজবেকিস্তানেই অবস্থিত।

১৮৪৮-১৮৪৯ সালে নৌবাহিনীর কর্তা ও গবেষক এ.আই.বুতাকভের নেতৃত্বে ‘কনস্ট্যান্টিন’ নামক একটি স্কুনার জাহাজে করে আরাল সাগরে একটি রুশ সামুদ্রিক অভিযানের আয়োজিত হয়েছিল। এই অভিযানের ফলে একগুচ্ছ দ্বীপ আবিষ্কৃত হয়েছিল। দ্বীপগুলোর নামকরণ করা হয় ‘জার দ্বীপপুঞ্জ,’ ‘নিকোলাস ওয়ান দ্বীপপুঞ্জ’, ‘কনস্ট্যান্টিন দ্বীপ’ ও ‘নাসলেদনিক দ্বীপ’। সোভিয়েত যুগে নিকোলাস ওয়ান দ্বীপের নাম পরিবর্তন করে ‘ভোজরোঝদেনিয়া’ রাখা হয়।

যদিও স্তালিন জামানার আগেই ১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত রেড আর্মির নেতারা জৈব অস্ত্র উদ্ভাবন, উৎপাদন ও পরীক্ষার উদ্দেশ্যে একটি বিজ্ঞান ও সামরিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত স্থানের খোঁজ করছিলেন। পরীক্ষাগার তৈরির জন্য দরকার ছিল এমন একটি বড়ো দ্বীপের, যা উপকূল থেকে ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে হবে। প্রথমে লেক বৈকালের কথা ভাবা হয়েছিল। ভাবা হয়েছিল ‘হোয়াইট সি’র দ্বীপ সলোভেৎস্কি দ্বীপপুঞ্জ, লেক সেলিগারের গোরোদোমলিয়া দ্বীপ ও ভোজরোঝদেনিয়ার কথা। রুশ গৃহযুদ্ধ এবং ১৯৩৬ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে এই কমপ্লেক্স নির্মাণের বেশ কয়েকটি ব্যর্থ প্রচেষ্টার ফলে এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে ওঠে যে, এ ধরনের কোনও কমপ্লেক্স অবশ্যই সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বহুদূরে নির্মাণ করতে হবে। আরাল সাগরের মাঝখানে, যা সোভিয়েত সীমানার বহু ভেতরে অবস্থিত, ভোজরোঝদেনিয়া দ্বীপের অবস্থানটি এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গেছিল।

১৯৩৬ সালের গ্রীষ্মে, ইভান মিখাইলোভিচ ভেলিকানভ ভোজরোঝদেনিয়া দ্বীপে জৈব অস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর উদ্দেশ্যে রেড আর্মির প্রথম অভিযানের নেতৃত্ব দেন। ভেলিকানভের বায়োটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রায় ১০০ জন কর্মী এই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩৭ সালের জুলাই মাসে, দ্বীপে দ্বিতীয় একটি অভিযানের পরিকল্পনা চলাকালীন ভেলিকানভ সোভিয়েত নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তীতে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তারের সঠিক কারণ জানা যায়নি।

১৯৩৭-এর গ্রীষ্মে বায়োটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের নতুন ডিরেক্টর এবং Francisella tularensis (টুলারেমিয়া রোগের জীবাণু)-এর বিশেষজ্ঞ লিওনিদ মোইসেভিচ খাতানেভার ভোজরোঝদেনিয়ায় দ্বিতীয় একটি অভিযানের নেতৃত্ব দেন। টুলারেমিয়া সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার সংক্রান্ত পরীক্ষার কাজে ব্যবহারের জন্য খাতানেভারকে দুটি বিশেষ জাহাজ এবং দুটি বিমান বরাদ্দ করা হয়েছিল।

১৯৪৮ সালে এই দ্বীপে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি অত্যন্ত গোপনীয় জৈব অস্ত্র গবেষণাগার স্থাপন করা হয়; যেখানে অ্যানথ্রাক্স, গুটিবসন্ত, প্লেগ, ব্রুসেলোসিস এবং টুলারেমিয়া-সহ বিভিন্ন ধরনের জীবাণু বা ‘এজেন্ট’-এর ওপর পরীক্ষা চালানো হত।

১৯৫৪ সালে এই কমপ্লেক্সের আয়তন বাড়ানো হয় এবং এর নামকরণ করা হয় ‘আরালস্ক-৭’। এটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার গ্রুপ’-এর অন্যতম প্রধান গবেষণাগার ও পরীক্ষাকেন্দ্র—যাদের ওপর বিভিন্ন মরণঘাতী রোগের জীবাণু উদ্ভাবন এবং সেগুলোর প্রভাব পরীক্ষার গুরুদায়িত্ব ছিল।

এই দ্বীপে কাজের গোপনীয়তা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের ভয়াবহ। এখানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা তাঁদের কাজ নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করতে পারতেন না। এমনকি, তাঁদের পরিবার-পরিজন কেউ জানত না উনি কী নিয়ে কাজ করছেন। গবেষণার সব কাগজপত্র গোপন থাকত। এখানে মৃত্যুর কোনও ঘটনাই নথিভুক্ত হত না, ফলে এখানে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার চিত্র কখনোই জানা সম্ভব নয়। পুরো দ্বীপটি KGB-র নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। সামান্যতম নির্দেশ না মানলে তা রাষ্ট্রদ্রোহমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য হত। যার একটাই শাস্তি নির্দিষ্ট ছিল, বন্দুকের সামনে দাঁড়ানো।

এই দ্বীপ শহরে যারা বাস করত, তাদের ঘরের বাইরে বেরোতে গ্যাস মুখোশ পরতে হত। গ্যাস মুখোশ ছাড়া বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়া, পার্কে খেলা নিষিদ্ধ ছিল। এখানে যাঁরা কাজ করতেন, তাঁদের পরিবার না জানলেও তাঁরা জানতেন কেন গ্যাস মুখোশ পরে থাকতে হচ্ছে। কেন জানালার কাচে প্রতিনিয়ত জমতে থাকা ধুলো খালি হাতে ধরতে বা পরিষ্কার করতে বারণ করা হচ্ছে। মুখে ওগুলোকে মরু থেকে উড়ে আসা মিহি বালি বা দ্বীপের কারখানা থেকে বাতাসে ভেসে থাকা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডাস্ট’ বললেও সেগুলো আসলে কী? সমস্ত প্রতিষেধক নেওয়া থাকলেও সামান্য এদিক-ওদিক হলেই পৃথিবীবাস শেষ।

১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্বের শেষ মুহূর্তে সামরিক কর্তৃপক্ষ জাগোরস্কে (Zagorsk) অবস্থিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাইরোলজি কেন্দ্রে সমবেত হন, যাতে ‘আরালস্ক-৭’-এর ভাগ্য নির্ধারণ করা যায়। কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের সদ্য স্বাধীন প্রজাতন্ত্র দুটি—যাদের অভিন্ন সীমান্তের ওপরই দ্বীপটি অবস্থিত ছিল—তারা কোনোভাবেই জৈব অস্ত্র গবেষণাগারের দায়ভার গ্রহণ করার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহী ছিল না। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সব পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এর পরের বছরই রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলৎসিন প্রকাশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের আক্রমণাত্মক জৈব অস্ত্র কর্মসূচির অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেন এবং ১৯৭২ সালের ‘জৈব অস্ত্র কনভেনশন’ মেনে চলার অঙ্গীকার করেন—সেই একই চুক্তি, যা সোভিয়েত ইউনিয়ন বিগত দুই দশক ধরে লঙ্ঘন করে আসছিল।

কাবাড়িদের কথামতো নৌকায় চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মোটরসাইকেল। যাতে চেপে অনেক প্রায়-মরু পথ ঘুরে কাজাখস্তানের দিক থেকে ভোজরোঝদেনিয়ায় পৌঁছে অভিযাত্রীরা দেখেন, দ্বীপটি দুটো অঞ্চলে ভাগ করা। একটা অংশ যা কান্তুবেক শহর নামে পরিচিত, তা ছিল বিজ্ঞানী, টেকনিশিয়ান ও তাঁদের পরিবারের থাকার জন্য। আর সেখান থেকে প্রায় দু-মাইল দক্ষিণে ছিল গবেষণাগার চত্বর।

“দিগন্তবিস্তৃত ধু ধু বালির মধ্যে দিয়ে কী করে যে পথ চিনে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল কাবাড়ির দল, তা ওরাই জানে।” বলেছিলেন বাটলার। অভিযাত্রীরা সকলেই পরেছিলেন সম্পূর্ণ বায়োকন্টেইনমেন্ট স্যুট।

“কাবাড়িরা ভালোই জানত, এখানে আসা প্রাণঘাতী। তবুও এর আগে ওরা এখানে বেশ কয়েকবার হানা দিয়ে তামার পাইপ, আলোর সরঞ্জাম… বিক্রি করার মতো যা কিছু পেয়েছে তাই খুলে নিয়ে গেছে। এখানে ওদের গতিবিধি দেখলে মনে হবে যেন ওরা শহরে মেরামতের কাজ করছে… 

“কান্তুবেক বর্তমানে একটি জরাজীর্ণ ও জনশূন্য শহর হলেও একসময় এই শহরের আরামদায়ক ছাপগুলোর পাশাপাশি এমন কিছু চিহ্ন আছে যা শুধু ভয় ধরানোই নয়, অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছবি তুলে ধরে। একদিকে রয়েছে বড়ো বড়ো বাড়িঘর, ক্যান্টিন ও স্কুল; অন্যদিকে পড়ে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মীদের ছেঁড়াফাটা ছবি, মার্কস ও লেনিনের বই আর মরচে ধরা ট্যাংক। গা ছমছমে পরিবেশ। পাশাপাশি খেলার মাঠের ধারে দেওয়ালের গায়ে এক যুদ্ধচিত্রের পাশে হাঁসের কার্টুন। একটি পাখি বা পোকামাকড়ও নেই কোথাও। একদম নিস্তব্ধ চারপাশ…” বলেছিলেন মিডলটন।

“আমাদের পথপ্রদর্শকরা তাড়াতাড়ি জায়গাটা ছেড়ে চলে যেতে চাইছিল, তাই আমাদের হাতে বেশি সময় ছিল না। ওরা আমাদের ল্যাবরেটরি কমপ্লেক্সের সামনে পৌঁছে দিয়ে ভেতরে ঢুকতে চায়নি।” জানান বাটলার।

অভিযাত্রীরা ‘ফিল্ড সায়েন্টিফিক রিসার্চ ল্যাবরেটরি’-তে (বা রুশ ভাষায় PNIL) যা দেখেছিলেন, তা ভয়াবহ। কোনোরকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করেই জায়গাটা তছনছ করে পালিয়েছিল ল্যাবরেটরির কর্মীরা। দেওয়াল জুড়ে র‍্যাকে রাখা রাসায়নিকভরা বিশাল বিশাল কাচের জার। অন্যদিকে মেঝেতে ছড়িয়ে হাজার হাজার ভাঙা কাচের শিশি, পিপেট (pipette) আর পেট্রি (petri) ডিশের টুকরো। ভিনগ্রহী প্রাণীদের মুখের মতো মুখোশ ও বাতাসবাহী নল-সহ পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা পোশাক। “যেন এক দুঃস্বপ্নের পৃথিবী।” মন্তব্য করেছিলেন বাটলার।

এখানে ঢোকার আগে বাটলার সবার শ্বাসযন্ত্র ঠিক আছে কি না তা আগে পরীক্ষা করেছিলেন। বাটলার বলেছিলেন, “ভবনের ভেতর যা-ই থাক না কেন, বন্ধ অবস্থায় তা আরও ঘনীভূত হয়ে থাকে। আমরা বদ্ধ ল্যাবরেটরিতে মিনিট পনেরোও থাকতে পারিনি। কারণ, টের পাচ্ছিলাম, শ্বাস নেবার যন্ত্রের ফিল্টারের ক্যানিস্টার (বাক্স) দ্রুত তার কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে। কারণ, ফিল্টারের মধ্যে দিয়ে ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। অত্যন্ত ক্ষয়কারী কোনোও শিল্প-রাসায়নিক পদার্থ যদি অত্যধিক ঘনমাত্রায় বা প্রচুর পরিমাণে সেখানে উপস্থিত থাকে, তবে এমনটা ঘটতে পারে।”

ইতস্তত অ্যানথ্রাক্স ছাড়াও পুরো দলটা ফরমালডিহাইডের ঝুঁকিরও মুখোমুখি হয়েছিল, যা নিশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে তা ক্যানসারের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যা-ই হোক না কেন, অভিযাত্রী দল দ্রুত জায়গাটা থেকে সরে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যদিও বাটলার বলেছিলেন, একটা দিন ওখানে ক্যাম্প করে থেকে পরদিন পরীক্ষা কেন্দ্রটি ভালো করে দেখতে পারলে তিনি খুশি হতেন, যদিও বাকিদের যা দেখার দেখা হয়ে গেছিল। “আমার কাছে বিষয়টা বেশ রোমাঞ্চকর ছিল। অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করার একটা সুযোগ। সে যাক গে, আমি বরাবরই একটু খ্যাপাটে প্রকৃতির।”

সতর্কতা হিসেবে দলের প্রতিটি সদস্যের নাক থেকে বাটলার ‘সোয়াব’ সংগ্রহ করেছিলেন তাতে অ্যানথ্রাক্স স্পোর আছে কি না পরীক্ষা করে দেখার জন্য। বাটলারের চিন্তার যথেষ্ট কারণ ছিল। নানাভাবে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হতে পারেন তাঁরা। সংক্রমণের ধরনের ওপর নির্ভর করে আক্রান্তের ভোগান্তির বীভৎসতা। পাচন নল (gastrointestinal route) দিয়ে সাধারণত তৃণভোজী প্রাণী যেমন গোরু, ঘোড়া, ভেড়া, ছাগল আক্রান্ত হয়। শুধু গবাদিপশু নয়, মানুষও আক্রান্ত হয় এই রোগে। বহু মানুষ আজও মারা যায় এই রোগে। এই রোগের নানান লক্ষণের কিছু হল বমি, ডায়রিয়া, মুখের ভেতর থেকে শুরু করে অন্ত্র পর্যন্ত বিস্তৃত ঘা। এই রোগ চামড়ার ছোঁয়াতেও সংক্রমিত হয়। তবে সবচাইতে ভয়াবহ সংক্রমণ হয় নিশ্বাসের মাধ্যমে এই জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে। একবার কোনও স্পোর শরীরে প্রবেশ করলে প্রথমেই সেটা লিম্ফ নোড (lymph node) বা লসিকা গ্রন্থিগুলোতে আশ্রয় নিয়ে বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে ও রক্তপ্রবাহে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শরীরে টিস্যুর ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ঘটতে থাকে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে মোটামুটি মাস খানেক বা তার বেশি সময় লাগে। দেখা যায়, প্রতি দশজন আক্রান্তের মধ্যে আটজনই মারা যায়।

“অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া একটি আদর্শ জৈব অস্ত্র।” বলেছেন অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী তালিমা পিয়ারসন, যিনি সভের্দলভস্কের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টিকারী স্ট্রেনটির জিনোম সিকোয়েন্স বা বিন্যাস নির্ণয়ে সহায়তা করেছিলেন।

এই জৈব অস্ত্র অ্যানথ্রাক্স মোটেই সাধারণ অ্যানথ্রাক্সের মতো নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে চলা জৈব অস্ত্র প্রতিযোগিতার ডামাডোলের মধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছিল ‘আরালস্ক-৭’—যা ছিল এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড। যার লক্ষ্য ছিল আগে থেকেই প্রাণঘাতী সব রোগজীবাণুকে আরও বেশি সহনশীল, সংক্রামক এবং মরণঘাতী করে তোলা যাতে ব্যাকটেরিয়াগুলো অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে ওঠে এবং ভাইরাসগুলো যেন এমনকি টিকা গ্রহণকারীদেরও সংক্রমিত করতে সক্ষম হয়।

আর এটি করতে বিজ্ঞানীরা বন্য পরিবেশ থেকে রোগজীবাণুগুলো সংগ্রহ করে সেগুলোর ব্যপক বংশবৃদ্ধি ঘটান কারখানা তৈরি করে। তারপর সেগুলো থেকে সঠিক বৈশিষ্ট্যের জীবাণুগুলোকে বেছে নিয়ে তা থেকে তৈরি করেন জীবাণু অস্ত্র। অ্যানথ্রাক্স বিশেষজ্ঞ লেস বেইলির মতে, ‘যত বেশি পরিমাণে জীবাণু উৎপাদন করা যাবে, তার থেকে যা খুঁজছেন তা পাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে।’

১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল জৈব অস্ত্র ব্যবহার করা হবে না মর্মে সোভিয়েত, গ্রেট ব্রিটেন, আমেরিকা-সহ বহু দেশ এই ঘোষণায় সই করলেও সোভিয়েত তাদের এ-যাবৎ কালের ভয়ংকর কর্মসূচি চালু করে। গোপনে ঠিক করে, তারা আণবিক জিনতত্ত্বের (molecular genetics) বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এই জৈবাস্ত্রগুলো কেবল চাষ বা উৎপাদনই করবে না, বরং সুপরিকল্পিতভাবে নকশা করবে।

এর মূলে ছিল অ্যানথ্রাক্সের একটি অত্যন্ত মারাত্মক স্ট্রেইন, যা গবেষকদের কাছে ‘STI’ নামে পরিচিত। এটি পেনিসিলিন, রিফাম্পিসিন, টেট্রাসাইক্লিন, ক্লোরামফেনিকল, ম্যাক্রোলাইড এবং লিংকোমাইসিনের মতো বিশাল পরিসরের অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন ছিল। সাধারণ অ্যানথ্রাক্স মারাত্মক হলেও, STI ছিল ভয়াবহ। জৈব অস্ত্রের বিজ্ঞানীরা সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক কৌশল ব্যবহার করে এর নিকটাত্মীয় ব্যাসিলাস সেরিয়াস থেকে জিন নিয়ে এমন রূপ দিলেন, যা রক্তের লোহিত রক্তকণিকাকে ফাটিয়ে ও মানবদেহের টিস্যুকে পচিয়ে ফেলতে পারে।অ্যানথ্রাক্স প্রাকৃতিকভাবেই গুচ্ছাকারে

জন্মায়। তবে গুচ্ছগুলো অনেক সময় নাকের ফুটোয় গজানো রোমে আটকে যায় ও সংক্রমণ সৃষ্টি করে না। তাই সোভিয়েতরা কারখানা বানিয়ে যন্ত্র ব্যবহার করে সেগুলোকে গুঁড়ো করে নিত। এর ফলে তৈরি হত অ্যানথ্রাক্স স্পোর, যার দৈর্ঘ্য মাত্র পাঁচ মাইক্রোমিটার, যা মানুষের চুলের প্রস্থ থেকে অন্তত ৩০ গুণ ছোটো। বাটলার বলেন, “নিশ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশের জন্য এটিই হল উপযুক্ত আকার।”

দ্বীপ ছেড়ে আসার আগে বাটলার সমুদ্রসৈকতে একটি ‘দূষণমুক্তকরণ অঞ্চল’ তৈরি করেছিলেন, যা আদপে একটি ‘ট্যাপ’ বা স্নান করার কল ছাড়া আর কিছু নয়। প্রচুর জীবাণুনাশক সাবান রাখা ছিল সেখানে। ভোজরোঝদেনিয়া ঘুরে আসার পর বোটে ওঠার আগে সবাইকে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে সাবান ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে হয়েছিল, যাতে শরীরে, বিশেষ করে শরীরের রোমশ অংশে কোনও ধরনের স্পোর লেগে না থাকে।

সৌভাগ্য যে অভিযাত্রী দলের সদস্যদের ‘সোয়াব’ রিপোর্ট ‘নেগেটিভ’ এসেছিল। এমনকি সঙ্গে যাওয়া কাবাড়ি গাইডদেরও। তারা কোনোরকম সুরক্ষা পোশাক পরতে অস্বীকার করেছিল। এটা প্রমাণ করেছিল, যে ভোজরোঝদেনিয়া দ্বীপের অ্যানথ্রাক্স মাটির নীচেই রয়ে গেছে।

১৯৭০-৮০ দশকে ভোজরোঝদেনিয়ায় ঠিক কী হয়েছিল? যা জানা গেছে তা হল, ‘লেভ বার্গ’ জাহাজটি দুর্ভাগ্যবশত জলের ওপর জমে থাকা এমন এক কুয়াশার (aerosol) মধ্যে ঢুকে পড়েছিল, যা ছিল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত গুটিবসন্তের জীবাণু দিয়ে তৈরি এবং যা ভোজরোঝদেনিয়া দ্বীপে সদ্যই বিস্ফোরিত হয়েছিল। তৎকালীন সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে যথারীতি চেপে দিয়েছিল। তাঁরা ঠিক কোন ধরনের (strain) জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়েছিলেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে কানাডার আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট ডেভিড ইভান্সের মতে, সেটি সম্ভবত ‘ইন্ডিয়া-১৯৬৭’ (India-1967) স্ট্রেনটিই ছিল।

“ইন্ডিয়া-১৯৬৭ স্ট্রেইন মনে করা হয়েছে এই কারণেই, যেহেতু সোভিয়েতরা এই স্ট্রেইনের জিনোম সিকোয়েন্স করেছিল।” বলেন ইভান্স, “ওরা অত্যন্ত সেকেলে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল, যার জন্য অবিশ্বাস্য রকমের বিপুল পরিমাণ ডি.এন.এ-র প্রয়োজন হত। তারা ঠিক সেই স্ট্রেইনটিরই সিকোয়েন্স করেছিল, যাকে তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলছিল।”

এই স্ট্রেইনের নাম ‘ইন্ডিয়া-১৯৬৭’ রাখা হয়েছিল কারণ, এই জীবাণু একজন ভারতীয় ব্যক্তির শরীর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, যিনি ১৯৬৭ সালে ভারত থেকে মস্কোতে আসেন। অথচ ওই ব্যক্তির গুটিবসন্তের টিকা নেওয়া ছিল। তবুও ওই ব্যক্তি গুটিবসন্তে আক্রান্ত হন। কারণ হতে পারে, (১) হয় টিকা কাজ করেনি, (২) নয়তো উনি এমন উচ্চ শক্তি বা মাত্রার জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, যা অতীব ভয়ংকর ও রোগ প্রতিরোধকারী টিকাকেও হারিয়ে দিয়েছিল।

তাহলে কি ভোজরোঝদেনিয়া আবার সংক্রমণের কারণ হতে পারে? ইভান্সের মতে, সে ঝুঁকি সম্ভবত আর নেই। সম্প্রতি সাইবেরিয়ায় বসন্ত রোগের মহামারিতে প্রাণ হারানো কিছু মানুষের দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন রুশ বিজ্ঞানীরা। যেগুলো বরফ গলে যাওয়ার ফলে বেরিয়ে এসেছিল, যা একশো বছরেরও ওপর বরফের নীচে পাথরের মতো জমে ছিল। সেগুলো পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা কোনও সক্রিয় ভাইরাসের সন্ধান পাননি, পেয়েছেন কেবল ভাইরাসের ডি.এন.এ।

বর্তমানে জৈব অস্ত্রগুলো মাটির তলায় পুরু কংক্রিটের বাংকারে রাখা। সেই জৈব অস্ত্র তৈরির কারখানা অফিসিয়ালি বন্ধ হলেও অনেকে মনে করেন, সেই কাজ এখনও গোপনে চালু আছে। তবে সে আশঙ্কা অসত্য হলেই খুশি হব। 

যারা এই দ্বীপে কাজ করত বা থাকত, তাদের অবস্থা কেমন ছিল জানতে এই কিউ.আর কোড স্ক্যান করে দেখে নিতে পারেন।

ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

বিচিত্র দুনিয়া- আরো পর্ব–>

ভালুকের খপ্পরে,  বড়োদিনের বারবেলা,     একটি ঈগলের কাহিনিআকাশের ‘ডাক’,  পাইথন শিকার অভিযান,    বল্গাহরিণের খোঁজেচাই গো আমি রাজা হতে,   বামনের দেশ , হীরক জ্বর,   পোষ্যের অন্তিম যাত্রা ,  খেদাই বাগদির বেঁচে ফেরা  ,  তিমির গান ,   চামপ্লিন হ্রদের দানো , মই ছাড়া বলদ দৌড়ফ্রাঙ্কলিন সাহেবের ট্রেন,  কাদার ফাঁদ,   আটহাজার বছর প্রাচীন পদ্ধতির মধু শিকার কি শেষের পথ্‌   ভারতের মিস্টার ভ্যাকসিন কৃষ্ণমূর্তি এল্লা,    ঘুড়ির টানে্‌সমাধিপুরী আস্তানা, হোইয়া-বাকু্‌,    নিষিদ্ধ স্নেক আইল্যান্ডঈশ্বর পর্বতের মৃত্যু হ্রদ্‌, চিয়েঙ্গির বোমা ঘেরা গ্রাম্‌, ঝাড়ুদারি কারচায় লেক,মাকড়শা সাপ্‌, লম্বা চুলের দেশমরুভূমির লেক-এ মাছ ধরালম্বা গলার গ্রাম , জুতা আবিষ্কার, ভূতুড়ে রেডিও স্টেশন, মোবাইল ফোন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রেলপথ, হোলো বান্দর, ডাইনি গ্রামকোলম্যানস্কপ – বালিতে তলিয়ে যাওয়া হিরের শহর, মানুষ যখন দাবার ঘুঁটি

 

Leave a Reply