টাইম মেশিন-বাজি রাউত- দেশের সর্বকনিষ্ঠ শহিদ-কৃষ্ণেন্দু দেব-বর্ষা ২০২৬

আগের লেখা–ভূবনডাঙার ভূত  অছু সাহেবের বিষয় আশয়, শিক্ষাব্রতী বিদ্যাসাগর, আহত ঈশ্বর, স্বাধীনতার তিন অধ্যায়, আন্দামানে ভাইসরয় নিধন, স্বাধীনতার তিন অধ্যায়, লোম্যান হত্যাকাণ্ড

ওড়িশার ঢেঙ্কানল জেলার একটা প্রত্যন্ত গ্রাম ভুবন। পাশেই নীলকণ্ঠ ঘাট। সেখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ব্রাহ্মণী নদী। সেই গ্রামেই ১৯২৬ সালের ৫ অক্টোবর এক হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম হল এক শিশুর। পরিবারের সবচেয়ে ছোটো ছেলে। বাবা হরি রাউত সেই ছেলের নাম রাখলেন বাজি। হরি পেশায় ছিলেন মাঝি। যাত্রীদের নৌকা পারাপার করে যে আয় হত, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চালাতেন তিনি।

একটু বড়ো হতেই বোঝা গেল, বাজি খুব চঞ্চল আর জেদি প্রকৃতির। বাড়িতে তার মন বসে না। বাবার সঙ্গেই সারাদিন সে ব্রাহ্মণী নদীতে থাকতে পছন্দ করে। বাবাও জেদের কারণে ছেলেকে কাছছাড়া করেন না। তাকে নিয়েই নৌকায় যাত্রী পারাপার করেন। এইভাবেই বাবার সঙ্গে থাকতে থাকতে বাজি একদিন নৌকা চালানোয় রীতিমতো দক্ষ হয়ে উঠল।

কিন্তু এরপর একদিন রাউত পরিবারে নেমে এল বিপর্যয়। বাজির বাবা নীলকণ্ঠ ঘাটের মাঝি হরি রাউত হঠাৎই মারা গেলেন। এবার সংসার চলবে কীভাবে? সেদিন বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান বছর দশেকের বাজিই এগিয়ে এল সংসারের হাল ধরতে। সে হাতে তুলে নিল তার বাবার নৌকার হাল। সারাদিন ব্রাহ্মণী নদী পারাপার করতে লাগল নৌকা নিয়ে। আর ওদিকে বাজির মা দিনভর পড়শির বাড়িতে ঢেঁকি চালিয়ে সামান্য কিছু রোজগার করতে লাগলেন। ফলে বাজিদের সংসার সচলই থাকল।

ওই সময় ঢেঙ্কানলের রাজা ছিলেন শঙ্করপ্রতাপ সিংহদেব। গরিব প্রজাদের শোষণ করার ব্যাপারে তাঁর জুড়ি ছিল না। তাঁকে মদত দিত ইংরেজ সরকার। তাই ওই রাজা ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচুর ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এই সময়েই ঢেঙ্কানলের বৈষ্ণবচরণ পট্টনায়ক (পেশায় একজন রেলকর্মী) ও হরমোহন পট্টনায়কের মতো কয়েকজন বিপ্লবী ‘প্রজামণ্ডল’ নামে একটা সংগঠন গড়ে তুলে ব্রিটিশ ও রাজার বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। কিছুদিন বাদে এই প্রজামণ্ডল থেকেই তাঁরা গড়ে তুললেন ‘বানর সেনা’। এই বানর সেনায় তাঁরা নিলেন দশ থেকে পনেরো বছরের ছেলেদের। তাদের কাজ ছিল ব্রিটিশদের সম্পর্কে গোপন তথ্য জোগাড় করে বিপ্লবীদের জানানো। বাজি রাউত এবার যোগ দিলেন সেই বানর সেনায়।

রাজা ও ইংরেজের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে জনরোষ বাড়তে লাগল। ঢেঙ্কানল জুড়ে প্রতিবাদ-আন্দোলন তীব্র হল। এই সময় আশেপাশের রাজারা ও ব্রিটিশ সরকার রাজা শঙ্করপ্রতাপ সিংহদেবকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। সাধারণ মানুষের আন্দোলনের মাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশরাও সেই সময় পাল্লা দিয়ে বাড়িয়ে দিল পুলিশি দমন-পীড়ন। রাজার লোক ও পুলিশ মিলে গ্রামবাসীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার শুরু করল। যারা কর দিতে পারছিল না, তাদের ঘরবাড়ি হাতি দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল। এরপর ব্রিটিশ সরকার কলকাতা থেকে পাঠাল ২৫০ জন বন্দুকধারী সেনা। তারা ভুবন গ্রামে তল্লাশি চালাল বিপ্লবী হরমোহন পট্টনায়কের সন্ধানে। ঘরে ঘরে ঢুকে জেরা করল, তল্লাশির নামে ঘরের জিনিসপত্র লণ্ডভণ্ড করল, কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মারধোর করল। পুলিশ নিশ্চিত ছিল, হরমোহন পট্টনায়ক ভুবন গ্রামেই লুকিয়ে আছেন। কিন্তু তাঁর নাগাল পুলিশ পেল না।

এরপর এল সেই দিনটা, ১৯৩৮ সালের ১০ অক্টোবর। সেই দিন রাতে বানর সেনার হয়ে নৌকা নিয়ে রাত পাহারা দিতে বেরোল বাজি রাউত। তখন প্রতিরাতেই তাদের দলের একজন নৌকা নিয়ে বের হত রাত পাহারা দিতে। সেদিন ছিল বাজি রাউতের পালা। প্রায় গোটা রাত কেটে গেল। ভোররাতে পুলিশের একটা দল এসে পৌঁছল নীলকণ্ঠ ঘাটে। তারা ব্রাহ্মণী নদী পার হয়ে ঢেঙ্কানলে যাবে। ওদের কাছে খবর, ওখানে সেই মুহূর্তে রয়েছেন বেশ কয়েকজন বিপ্লবী।

পুলিশ বাজির কাছে এসে বলল তাদের নৌকায় করে নদী পার করিয়ে দিতে। বাজি চুপ করে রইল, কোনও কথা বলল না, যেন কিছু শুনতেই পায়নি। পুলিশ এবার অধৈর্য হয়ে আবার একই কথা বলল। বাজি তখন তাদের মুখের ওপর না বলে দিল।

একটা বাচ্চা মাঝির এত সাহস! রাগে ফেটে পড়ল তারা। এক ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার এবার বাজিকে নৌকা ছাড়তে হুকুম করলেন। বললেন, “নদী পার না করিয়ে দিলে তোকে মেরে ফেলব।”

বাজি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “মেরে ফেললেও আমি তোমাদের নৌকায় তুলব না।”

আসলে বাজি রাউত জানত, প্রজামণ্ডলের অনেক কর্মকর্তাই সেই সময় গ্রামেই আছেন। তাই এই সময় পুলিশকে নদী পার করালে তাঁরা সবাই ধরা পড়ে যাবেন। পুলিশও নাছোড়বান্দা। তারা এবার হম্বিতম্বি শুরু করে দিল। বাজি দেখল, আর সময় নেই। সে এবার জোরে চিৎকার করতে শুরু করল।

নিশুতি নিস্তব্ধ রাত। তাই নদী পেরিয়ে বাজি রাউতের কণ্ঠস্বর দিব্যি পৌঁছে গেল প্রজামণ্ডলের কর্মকর্তাদের কানে। পুলিশও বুঝে গেল ব্যাপারটা। তাই রেগে গিয়ে এক ব্রিটিশ পুলিশ বন্দুক দিয়ে বাজির মাথায় সজোরে আঘাত করল। বাজির মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল গলগল করে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল বাজি। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার দাঁড়িয়ে উঠে বাজি চিৎকার করতে লাগল। এবার আগের থেকেও জোরে। ততক্ষণে ও-পাড়ে প্রজামণ্ডলের লোকেরা সজাগ হয়ে তাঁদের ডেরা থেকে বেরিয়ে পড়েছেন।

এবার ভীষণ রাগে ব্রিটিশ পুলিশ আরও একবার বন্দুক দিয়ে আঘাত করল বাজির মাথায়। তাতেও দমানো যাচ্ছে না দেখে এবার নৃশংস পুলিশ গুলি চালিয়ে দিল বাজির বুক লক্ষ্য করে। ছোট্ট বাজি শহিদ হল তখনই। বাজির চিৎকার আর গুলির শব্দ শুনে একটু বাদেই ঘটনাস্থলে দিকে অনেক গ্রামবাসীরা ছুটে আসতে লাগল।

তাদের দেখে ব্রিটিশ পুলিশ ভয়ে নৌকা নিয়ে নিজেরাই পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। নৌকায় চড়ে পালানোর সময় ওরা বেপরোয়া গুলি ছুড়তে লাগল গ্রামবাসীদের দিকে। তাতে মারা গেলেন বাজির চার সঙ্গী— লক্ষ্মণ মালিক, ফাগু সাহু, রুশি প্রধান ও নাটা মালিক।

কিশোর বাজি রাউত ও তার সঙ্গীদের আত্মত্যাগের সংবাদ সেদিন ঢেঙ্কানল সমেত গোটা ওড়িশার স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে প্রবল আলোড়ন তৈরি করেছিল। ফলে সাধারণ ইংরেজ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন আরও জোরদার হয়েছিল।

ইতিহাস বলছে, আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ শহিদ ওই বাজি রাউত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ১৯৩৮ সালের ১১ অক্টোবর ভোরে ব্রিটিশ পুলিশের হুকুম না মেনে তার সেই আত্মবলিদানের কাহিনি আমরা মনে রাখিনি। তবে কে বলতে পারে, আজও ভোরবেলা ব্রাহ্মণী নদীর পাড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে আপনি হয়তো বাজি রাউতের সেই নির্ভীক কণ্ঠস্বর শুনতে পাবেন!

স্বাধীনতার লড়াইয়ের এমনই সমস্ত বীর যোদ্ধাদের নিয়ে জয়ঢাকের এই বইগুলো প্রকাশিত হয়েছে। জয়ঢাক প্রকাশন থেকে বইগুলো সংগ্রহ করতে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করতে পারেন।

Leave a Reply