
কানাডার চিঠি- পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব ৫ পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব-৮, পর্ব ৯
রকি বেয়ে গল্পেরা সব প্রেইরি জুড়ে নামে,
জুটিয়ে নিয়ে লিখছি চিঠি, মেপল পাতার খামে।
আগেই বলেছি, কানাডার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল আর তীব্র শৈত্য মানুষের মনে অদ্ভুত সব ভয়ের জন্ম দিত। কিছু কিছু সত্যিকার ভয় থাকলেও, কল্পনার মিশেলও ঘটেছিল বহুল পরিমাণে। কখনও ব্যাখ্যা না করতে পারা প্রাকৃতিক ঘটনা, কখনো-বা তুষারে ঢাকা জনহীন প্রান্তরে দলের কোনও সদস্যের হারিয়ে যাওয়া; নানা কারণে তৈরি হত অপার্থিব সব কাহিনি। কাহিনির কেন্দ্রে থাকত নানা অলীক চরিত্র। জঙ্গলের আলোছায়ায় অনেক সময় চেনা প্রাণীদেরও দেখা-না-দেখার ধাঁধায় অচেনা মনে হত। না-দেখার অংশটা মানুষ ভরিয়ে তুলত তার কল্পনা দিয়ে। তাই উপকথার অলীক চরিত্রদের বর্ণনা নিয়ে হামেশাই নানা মতভেদ দেখা যায়। কানাডার ফার্স্ট নেশনরা চিরকাল প্রকৃতির কাছাকাছি থেকেছে; অসীম শ্রদ্ধায় প্রকৃতির দান যেমন তারা মাথা পেতে নিয়েছে, তেমনই প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গেও তাদের লড়তে হয়েছে নিরন্তর। মানুষ যাতে প্রকৃতির দানে অতিরিক্ত লোভ না করে, তার প্রয়োজন যতটুকু, প্রাকৃতিক সম্পদে তার থেকে বেশি ভাগ না বসায়, তার জন্যও কিছু রক্ষক ধাঁচের উপকথার চরিত্রের প্রয়োজন ছিল। হয়তো গোষ্ঠীর প্রধান বা প্রধানা যাঁরা ছিলেন, তাঁদের এহেন বিচক্ষণতার ফলেই জন্ম হয়েছিল তেমন কিছু কাল্পনিক চরিত্রের। তারপরে ইউরোপিয়ানরা যখন আসতে শুরু করল কানাডায়, তাদের সংস্কৃতিতে থাকা উপকথা বা লোককথার চরিত্ররাও ধীরে ধীরে মিশে যেতে থাকল কানাডার জঙ্গল, পাহাড় আর লেকের গল্পদের সঙ্গে।
কানাডার উপকথার চরিত্রদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হল বিগফুট বা স্যাসকোয়াচ। কেউ বলে এর উচ্চতা সাত ফুট, কেউ বলে পনেরো ফুট। বনমানুষের মতো আকৃতির লোমশ এই প্রাণীর বিচরণভূমি মূলত ব্রিটিশ কলম্বিয়া। ফার্স্ট নেশনদের মধ্যে অতি প্রাচীনকাল থেকেই লোমশ দৈত্যাকার এক প্রাণীর গল্পকথা প্রচলিত ছিল; কোনও অঞ্চলে তার নাম স্টেনকুইন, কোথাও আবার সে ওট-নে-ইয়ার-হেহ্ বা প্রস্তরদৈত্য নামে পরিচিত। তার অনেক পরে, ইউরোপীয়রা যখন কাঠের ব্যাবসা শুরু করেছে পুরোদমে, তাদেরই এক বুলডোজার চালক জঙ্গলে প্রায় ফুট দেড়েক লম্বা পায়ের ছাপ দেখতে পায়। তারা ওই পায়ের মালিককে বিগফুট বলে উল্লেখ করতে থাকে। কালক্রমে স্টেনকুইন আর বিগফুট মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়, কারণ পনেরো ফুট লম্বা দৈত্যের পায়ের ছাপ ওই ফুট দেড়েকের মতোই হওয়ার কথা। বিগফুট কিন্তু বিপজ্জনক হলেও আসলে প্রকৃতির প্রহরী। কেউ প্রকৃতির ক্ষতি বা অসম্মান করলে ছেড়ে কথা বলে না। মানুষের চোখের আড়ালে থাকতে ভালোবাসলেও কখনো-কখনো নাকি পোষ্য হিসেবে মানুষকেই চুরি করতে পারে। ‘টিনটিন ইন টিবেট’-এর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে না? মজা হল, জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো বা কোনও প্রয়োজনে জঙ্গলে যাওয়া বহু মানুষ বিগফুটকে দেখেছে বলে দাবি করে। যদিও স্পষ্ট ছবি বা মৃত বিগফুটের হাড়গোড়ের প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ বলে, এরা আসলে গুহায় বসবাসকারী নির্জনতাপ্রিয় কোনও জনজাতি, আবার কারও মতে জঙ্গলের আলো-আঁধারিতে দুই পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভালুককে দেখে মানুষের এই দৃষ্টিবিভ্রম। ভ্রম হোক বা সত্যি, বিগফুট যে কানাডার সুপ্রাচীন গৌরবময় বনভূমির প্রতীক, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
তবে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বাসিন্দাদের প্রথম আলাপেই বিগফুটের কথা জিজ্ঞেস করলে কিন্তু ভারি ক্ষেপে যায়, মানে কানাডিয়ানদের পক্ষে যতটা ক্ষেপে যাওয়া সম্ভব আর কি।
বিগফুটের সঙ্গে সখ্য স্থাপনের বৃথা চেষ্টার ছবি রইল নীচে।

স্কটল্যান্ডের নেসি তো বিখ্যাত, সব্বাই চেনে। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ওকানাগেন লেকেও নাকি তেমনই এক প্রাণী বাস করে। চল্লিশ থেকে ষাট ফুট লম্বা একাধিক কুঁজ আর ঘোড়ার মতো মাথাওলা এই প্রাণীর নাম ওগোপোগো। ফার্স্ট নেশনদের দেওয়া নামটা একটু খটোমটো– নহাহাইটকো। উচ্চারণটা গোলমেলে হলেও, শব্দটার অর্থ হল জলে বাস করা অতি পবিত্র প্রাণী। তা একসময় নাকি এই অতি পবিত্র প্রাণীটির অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য এক মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। আজ পর্যন্ত প্রচুর মানুষ নাকি একে দেখতে পেয়েছে, তবে প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারেনি। বলা বাহুল্য, ওগোপোগোকে ঘিরে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলে, ওটা নাকি একটা মস্ত স্টার্জন মাছ। আবার কারও মতে, ওকানাগেনের জলে বাস করে প্লেসিওসর কিংবা প্রাগৈতিহাসিক তিমি বেসিলোসরাস। কিন্তু এইসব প্রাণীরা তো অনন্তকাল জলের নীচে থাকতে পারে না, অন্তত বাতাসের জন্যও মাঝে মাঝে ভেসে উঠতে হবে।
তবে, কখনো-কখনো ওকানাগেনের বুকে সত্যিই অদ্ভুত একটা ঢেউ ওঠে, হাওয়া না থাকলেও। তার অবশ্য অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণ থাকতেই পারে। কিছু ঝাপসা ছবিও আছে, তাতে লেকের বুকে বড়োসড়ো একটা কিছু ভাসছে বলেই মনে হয়। সত্যি-মিথ্যে বোঝা দায়, তবে ওগোপোগো খুবই জনপ্রিয়। উৎসবের সময় আলোকসজ্জাতে ওগোপোগোর উপস্থিতি সেটাই প্রমাণ করে। আমাদের এখানে ক্রিসমাসের সময় ক্যালগেরির বিশাল চিড়িয়াখানার ভেতরটা আলো দিয়ে সাজায়। প্রতিবছর ওগোপোগোকে দেখা যায় সেখানে। রইল সেই পবিত্র প্রাণীর ছবি।

ব্রিটিশ কলম্বিয়ারই চিলিওয়্যাকের জলাভূমিতে আরও একটা জলজ দানোর উপস্থিতির কথা শোনা যায়। এরও শরীরটা সাপের, আর মাথাটা ওগোপোগোর মতোই ঘোড়ার। দশ থেকে পনেরো ফুট লম্বা এই বকচ্ছপ প্রাণীটির নাম সিলকি। কারো-কারো মতে, সিলকির শরীরের দুই প্রান্তে দুটি মাথা। কালো রঙের ওপর লাল চকরাবকরা কাটা সিলকি খুবই বাহারি। কিন্তু স্থানীয়দের বিশ্বাস, সিলকির দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ানো যায় না, তাহলে নাকি অসুখ করে! অর্থাৎ, ওকে দেখে পালানোটা ভারি সমস্যার ব্যাপার হবে।
কানাডার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে উপত্যকা, গিরিখাত, নদী সংবলিত নাহানি ন্যাশনাল পার্ক এমনিতেই হেরিটেজ সাইট। তার ওপর সেখানে নাকি ওয়াহিলা নামের এক ক্ষ্যাপাটে নেকড়ের উপদ্রব আছে। তার শরীরটা বিশাল, চেহারাটা খানিকটা নেকড়ে আর খানিকটা ভালুকের মতো। ওয়াহিলা খুব একটা পবিত্র প্রাণী নয়, মানুষের মাথার ওপর তার বেজায় লোভ। নাহানি উপত্যকার স্থানীয় নামটা তাই বড়োই মনোহর– কবন্ধ উপত্যকা। উপত্যকাটা যেন পৃথিবীর একঘেয়ে জীবনের নিয়ম মানে না একেবারেই। সেখানে কবন্ধরা দিনমানে গুপ্তধনের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়, যদিও কবন্ধ হওয়ার দরুন কিছু খুঁজে পেতে তাদের স্ট্র্যাটেজিক কিছু সমস্যা হওয়ার কথা। মাঝেসাঝে আবার ওয়াহিলার সঙ্গে নাকানিও এসে যোগ দেয়। তার যেমন উচ্চতা, তেমন ভীমের গদার মতো হাত। লোমশ নাকানির চোখ দুটো টকটকে লাল। এ আপাদমস্তক খুনে, মানুষ ধরে চিবিয়ে খায়। একে ‘তুন্দ্রার জংলি’ বলেও উল্লেখ করা হয়। একেবারে নাকানিচোবানি খাওয়ার মতোই ব্যাপার বটে।
ব্রিটিশ কলম্বিয়ার উপকূলবর্তী অঞ্চলের ক্লিঙ্কিট (Tlingit) গোষ্ঠীর ফার্স্ট নেশনদের ভেতর চালু আছে গোনাকাডেটের উপকথা। আধা-নেকড়ে আর আধা-তিমি মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই বিচিত্র প্রাণীর চেহারা। সঙ্গে আবার মস্ত দুটো কান (মতভেদে শিং)। দেখতে যেমনই হোক না কেন, এরা কিন্তু সমুদ্রের রক্ষক। সম্পদ আর ক্ষমতার প্রতীক গোনাকাডেটদের রীতিমতো সম্মান করা হয়। আবার হাইডা গোষ্ঠীর মানুষরা এদের ওয়াসগো বলে ডাকে। এই উপকূলে বসবাসকারী ফার্স্ট নেশনরা একখণ্ড সিডার কাঠ বেঁকিয়ে ভারি সুন্দর একরকম ঢাকা দেওয়া চৌকো বাক্স বানায়। খাবারদাবার থেকে উৎসব-অনুষ্ঠানের পবিত্র জিনিস, সবকিছুই রাখা যায় ওই বাক্সে। প্রাচীন ঐতিহ্যশালী এই বাক্সের গায়ে চমৎকার সব নকশা করা থাকে, গোষ্ঠী অনুযায়ী নকশার তারতম্য হয়। গোনাকাডেটদের ছবিও এই নকশার অন্যতম প্রিয় বিষয়।
এইসব উপকথার প্রাণীরা মূলত আঞ্চলিক হলেও, থান্ডারবার্ড বা ঝঞ্ঝাপক্ষীর দাপট কিন্তু প্রায় সারা কানাডা জুড়ে। নু-চা-নুলথ, হাইডা আর কোয়াকোয়াকেওয়াক-(Kwakwaka’wakw- নামটা কিন্তু সত্যি, মোটেও বানাইনি)-রা অর্থাৎ, উপকূলের ফার্স্ট নেশন গোষ্ঠীরা বিশ্বাস করে, ঝঞ্ঝাপক্ষী উঁচু পাহাড়ে থাকে আর তিমি শিকার করে।
পূর্ব কানাডার ইরোকোইয়ানদের কাছে থান্ডারবার্ড আবার স্থলভূমির রক্ষক, জলের তলার হিংস্র প্রাণীদের সঙ্গে সে সদাই যুদ্ধে ব্যস্ত।
প্রেইরির ক্রি, নাসকাপিরা দৈত্যাকৃতি শিকারি পাখির কাহিনি বলে, তার নাম কখনও মেটকো, কখনো-বা কুলোনা।
অঞ্চলভেদে নাম বা আচার আচরণের ভেদ থাকলেও চেহারায় এরা সকলেই বিশাল, সবারই পাখার ঝাপটায় ঝড় ওঠে, চোখে খেলে যায় বিদ্যুতের ঝলক। তবে ফার্স্ট নেশনরা বিশ্বাস করে, থান্ডারবার্ড মানুষের ক্ষতি খুব একটা করে না, বরং খাদ্যাভাব দেখা দিলে খাদ্য সংগ্রহ করতে সাহায্য করে।
বলা বাহুল্য, এই ঝঞ্ঝাপক্ষীকে নিয়ে প্রায় প্রত্যেক গোষ্ঠীর নানারকম অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প আছে। এগুলোকে গল্প না বলে বোধ হয় কিংবদন্তি বলাই ভালো। ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্লদ শেফারের সঙ্গে প্রেইরির ব্ল্যাকফুটদের বেশ সখ্য ছিল। এক গাইনাই দলপতি শেফারকে থান্ডারবার্ড নিয়ে যে রোমাঞ্চকর কাহিনি শুনিয়েছিলেন, সেটা না বললেই নয়।
দলপতির ঠাকুরদাকে নাকি থান্ডারবার্ড অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল, এ-কাহিনিতে রয়েছে তারই আশ্চর্য ব্যাখ্যান। গল্প বলিয়ের নাম মূষিক অধীনস্থ হ্যারি (Harry Under Mouse!) ঠাকুরদার নাম শ্বেত ভল্লুক (White Bear), তিনি আবার মাটাপিকসি, মানে বৈদ্য। এই শ্বেত ভল্লুক মহাশয় কিন্তু ব্ল্যাকফুট (সিকসিকা, গাইনাই আর পিগানি) ছিলেন না, তিনি ছিলেন ক্রি গোষ্ঠীর মানুষ। ব্ল্যাকফুট আর ক্রিদের মধ্যে সাংঘাতিক শত্রুতা থাকলেও ইনি এক গাইনাই কন্যাকে বিবাহ করে তার গোষ্ঠীতে যোগদান করেন। ব্ল্যাকফুটদের উৎসব-অনুষ্ঠানে ইগল পাখির লেজের পালকের বিশিষ্ট ভূমিকা চিরকালই আছে। শ্বেত ভল্লুক ইগল পাখি ধরতে ওস্তাদ ছিলেন, সম্ভবত সেই কারণেই এই বিবাহে আপত্তি করেননি গাইনাই চিফ। এই কাহিনি ১৮৫০ সালের, সেই বছরের শীতকালে শ্বেত ভল্লুকের দল আস্তানা গেড়েছিল অধুনা এডমান্টন অঞ্চলে, তখনকার ফোর্ট এডমান্টনের দক্ষিণে। সে-বছর শিকার তেমন মেলেনি, শুকনো মাংস আর বেরি মেশানো পেমিকানের ভাঁড়ারও তাই প্রায় শূন্য। খাদ্যাভাব দেখা দেওয়ায় শ্বেত ভল্লুক আর কয়েকজন শিকারি পশ্চিমে রকির দিকে গিয়েছিলেন শিকারের সন্ধানে। হঠাৎ দেখা গেল, শিকারিরা এক-একজন করে দল থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। তবুও বাকিরা ভাবল ছড়িয়ে গিয়ে আলাদা আলাদা দিকে গেলে শিকার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এখনকার ব্যাঁফ অঞ্চলের কাছাকাছি পৌঁছে অবশেষে শ্বেত ভল্লুক একটা হরিণ শিকার করতে পারেন। মৃত হরিণের দেহ থেকে মাংস সংগ্রহ করে তিনি ফিরে আসছেন, এমন সময় একটা মস্ত পাখির ছায়া এসে পড়ে তাঁর ওপর। কী ঘটছে ভালো করে বোঝার আগেই তাঁকে কে যেন শূন্যে তুলে নেয়। প্রসঙ্গত বলে নিই, ব্ল্যাকফুটরা থান্ডারবার্ডকে ‘ওমাক্সসাপিটাউ’ বলত। পিটাউ মানে ইগল, আর ওমাক্সসা মানে বেজায় বড়ো। তা এদিকে শ্বেত ভল্লুক তো সভয়ে টের পেলেন, ওমাক্সাসপিটাউ তাঁর হরিণের মাংসের পুঁটলি নখে আঁকড়ে উড়তে শুরু করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে তিনিও মহাশূন্যে পাড়ি জমিয়েছেন। ততক্ষণে বোধ হয় এতটাই ওপরে উঠে গিয়েছিলেন যে পুঁটলি ছেড়ে নীচে লাফিয়ে পড়ার আর উপায় ছিল না। পাহাড়ের ওপর দিয়ে, বনজঙ্গল পেরিয়ে অবশেষে থান্ডারবার্ড গিয়ে পৌঁছল এক খাড়া পাহাড়ের ওপর, তার নিজের বাসায়। আতঙ্কিত শ্বেত ভল্লুক দেখলেন, বাসার ভেতর দুটো ছানা, আর তাদের আশেপাশে প্রচুর হাড়গোড় পড়ে আছে। কিছু হাড় দেখলে বোঝা যায়, সেগুলো মানুষ ছাড়া আর কোনও প্রাণীর নয়। শ্বেত ভল্লুকের কপাল ভালো, ছানাগুলো তখন সবেমাত্র উড়তে শিখছিল। ছানা হলেও তারা আকারে শ্বেত ভল্লুকের সমান। একটা ওড়ার প্র্যাকটিস শুরু করতেই তিনি ঠিক যেমন কায়দায় ইগল পাখি ধরতেন, তেমনভাবে তার পা দুটো ধরে ঝুলে পড়লেন। ছানাটা বেশি ওজন নিয়ে উড়তে শেখেনি তখনও, সে তো প্রবলভাবে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে নীচে নেমে এল। শ্বেত ভল্লুক কি আর দাঁড়ান সেখানে! পত্রপাঠ দৌড় দিলেন পুবের প্রেইরির দিকে। তবে ওরই মধ্যে বেচারি ছানাটির লেজের দুটো পালক খুলে নিতে তিনি ভোলেননি। এক-একটা পালক নাকি এক হাত করে লম্বা ছিল।
এই ব্ল্যাকফুট সম্প্রদায়ের অনেকেই কিন্তু থান্ডারবার্ডকে দেখেছে বলে দাবি করে। বন্দুকধারী কুকুর (Dog takes a gun) নামে একজনের মা-বাবা নাকি অধুনা ক্যালগেরির কাছে থান্ডারবার্ডকে একবার দেখেছিল। এসবই ওই ১৮৬০-৭০ নাগাদ।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, পরবর্তী সময়েও ফার্স্ট নেশনরা ছাড়াও অনেকেই কানাডার পর্বতশ্রেণির ওপর বিশাল এক পাখিকে উড়তে দেখেছে। ১৯২৫ সালে একদল হাইকার লেক লুইজের কাছের এক পাহাড়ের ওপর অতিকায় এক পাখিকে নাকি উড়তে দেখেছিল। তারও বহুদিন পরে, ১৯৭৪-এ কোয়েবেকের এক সুপ্রতিষ্ঠিত মানুষ তাঁর পরিচিতদের সঙ্গে ভ্রমণে গিয়ে লুভিকোর গ্রামে বিরাট একটা পাখিকে পুকুর থেকে জল পান করতে দেখেছিলেন। সে নাকি উচ্চতায় ছিল চার ফুটের বেশি। তাঁদের দেখে সে-পাখি তখনই উড়ে পালিয়েছিল বটে, কিন্তু তার ডানার বিস্তার এতটাই ছিল যে তার মাপ আর কাউকে বলে উঠতে পারেননি তাঁরা। আশঙ্কা ছিল, কেউ তাঁদের কথা বিশ্বাস করবে না।
এত মানুষ এই পাখিকে দেখার ফলে একে স্রেফ উপকথা বলে ধরে নেওয়া বোধ হয় ঠিক হবে না। অবশ্য সব উপকথার পেছনে যে কেবল কুসংস্কার আর কল্পনা থাকে, এমনটা একেবারেই নয়। ঝঞ্ঝাপক্ষীর গায়ে লেগে থাকা কল্পনার আঁশগুলো যত্ন করে ছাড়িয়ে নিলে এক অতিকায় শিকারি পাখিকে আমরা দেখতে পাই, যার সঙ্গে হাজার দশেক বছর আগে লুপ্ত হওয়া টেরাটর্নদের আশ্চর্য মিল আছে। টেরাটর্নদের এক প্রজাতির পাখার বিস্তার ছিল প্রায় উনিশ ফুট। টেরাটর্নদের কোনও প্রজাতির প্রতিভূ কি আজও থেকে গেছে রকির গুহায়? প্রমাণসাপেক্ষ অবশ্যই, কিন্তু অসম্ভব নয়।
নীচে রইল থান্ডারবার্ড টোটম পোলের ছবি। লাল সিডারের ওপর খোদাই করা ভ্যাঙ্কুভারের এই টোটেম পোলে সবার ওপরে থান্ডারবার্ড, মাঝখানে গোনাকাডেট, আর একেবারে নীচে গ্রিজলি ভালুক। চিত্র ঋণ: স্ট্যানলি পার্ক সোশ্যাল হ্যান্ডেল।

কানাডার উত্তরতম প্রদেশ হল নুনাভুট। এর বেশিরভাগ অংশ আর্কটিক বৃত্তের মধ্যে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই বসবাসযোগ্য নয়। এই এলাকা কানাডার বাকি অংশ থেকে একেবারেই আলাদা। জঙ্গল তো দূরের কথা, গাছগাছালির চিহ্নই নেই। রুক্ষ ভূমির তলায় পার্মাফ্রস্ট, আর বছরের বেশিরভাগ সময় তুষারাবৃত এই অঞ্চলের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ০.০২। আর্কটিক মহাসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে কিছু মানুষের বসতি আছে, মূলত তারা ইনুইট। তাদের উপকথা, তাদের সংস্কার, তাদের কল্পনার প্রাণীরা অবশ্যই বেশ আলাদা। হয়তো এমন রুক্ষ জীবনযাপনের কারণেই ইনুইটদের এলাকার অলীক প্রাণীরা রীতিমতো হিংস্র।
সমুদ্রের বরফের স্তরের নীচে বাস করে কোয়ালুপিলুইট। তাদের মানুষের মতো দেখতে হলেও গায়ের রঙ সবুজ, আর চুল বেশ লম্বা। ইনুইট মায়েরা এক বিশেষ ধরনের পার্কা, মানে তুষার-জ্যাকেট পরে, তাকে বলে আমাউটি। কোয়ালুপিলুইট আমাউটি পরে যেসব অবাধ্য বাচ্চারা বরফের একেবারে কিনারে, বিপজ্জনক জায়গায় চলে যায়, তাদের ধরে নিয়ে পালায়। বোঝাই যাচ্ছে, বাচ্চাদের ভয় দেখিয়ে বিপদ থেকে দূরে রাখার জন্যই একে সৃষ্টি করা হয়েছে, আমাদের জুজু যেমন।
মাহাহা বলে আরও একটি ভয়ানক দানো আছে ইনুইটদের, সে সত্যিই খুব বিশ্রী। মানুষকে ঠান্ডায় প্রথমে জমিয়ে, তারপর কাতুকুতু দিয়ে মেরে ফেলে। মৃতদেহের মুখে ফুটে থাকে এক চিরস্থায়ী হাড় হিম করা (pun ইচ্ছাকৃত নয়) হাসি।
আমাউটি পরা আরও একটি শিশুহন্তা রাক্ষসীর কথা শোনা যায়, তার নাম আমাউটালিক।ক্ষতিকারক অলৌকিক চরিত্রদের মাঝে একটিমাত্র ব্যতিক্রম হলেন সেডনা। তিনি সমুদ্রের দেবী, সামুদ্রিক প্রাণীদের রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
যুগ যুগ ধরে কানাডার ফার্স্ট নেশন শিশুরা দিনশেষে আগুনের ধারে জড়ো হত গল্প শোনার জন্য। গল্পের ছলে গোষ্ঠীর বয়স্করা তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন জীবনযাপনের উপাদান, কার্যকর উপদেশ। জন্ম নিত নানা উপকথা। কোয়ালুপিলুইটের শিশু চুরির কাহিনিতে যেমন গাঁথা থাকত তুষারের বিপজ্জনক সীমানা অতিক্রম না করার সাবধানবাণী, তেমন মাহাহার গল্পে জানা যেত মৃত্যুর আকস্মিকতা।
অ্যলগনকুইয়ানদের ওয়েন্ডিগো আবার দুরন্ত খিদে আর লোভের প্রতীক। তার আকার মানুষের মতো হলেও সে নরখাদক, অর্থাৎ স্বজাতি-মাংসভোজী। তার ফ্যাকাশে ত্বক, গর্তে ঢোকা চোখ, এবড়োখেবড়ো দাঁত আর পচা গন্ধ নিয়ে সে আতঙ্ক ছড়াতে ওস্তাদ। কিন্তু এই ভয়ানক চরিত্রের আড়ালেও রয়েছে খাদ্যাভাবের সময়ে লোভী না হওয়ার, স্বার্থপর না হওয়ার এক অমোঘ শিক্ষা।
আমাদের কাছে যা নিছক ভয়ের গল্প বা মজাদার উপকথা, ফার্স্ট নেশনদের কাছে সেগুলোই বেঁচে থাকার পাঠ।
ইউরোপ থেকে আসা সেটলাররা নিজেদের উপকথা নিয়ে এসেছিল আগেই বলেছি। সে-সব কাহিনি কীভাবে মিশে গিয়েছিল কানাডার উপকথার সঙ্গে, বা কখনো-কখনো কীভাবে দুটোর সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছিল নতুন উপকথা, সে গল্প বলব পরের পর্বে।
আজ তবে এই পর্যন্ত।
টা টা।