আগের পর্বগুলো-পর্ব ১
। দ্বিতীয় অধ্যায়।
খেলতে খেলতে অঙ্ক
ডমিনো খেলা
ডমিনো খেলার সূচনা হয়েছিল চিনদেশে সং রাজবংশের আমলে। এতে কিছু আয়তাকার টাইল থাকে। এদের বলে ডমিনো। প্রতিটা টাইলের ওপরে দু-খানা বর্গাকার অংশ। তার প্রতিটাতে শূন্য থেকে ছ’খানা অবধি ফোঁটা আঁকা থাকে। টাইলগুলোর অন্যদিকটা ফাঁকা।

দেখতেই পাচ্ছ, এতে মোট ২৮খানা টাইল হওয়া সম্ভব।
খেলাটা এইরকমভাবে হয়—
একটা থলের মধ্যে টাইলগুলো রাখা থাকবে। দুজন খেলুড়ে বসে প্রত্যেকে সাতটা করে টাইল নেবে। সেগুলো তারা এমনভাবে সাজাবে, যাতে প্রতিপক্ষ দেখতে না পায় তার কাছে কোন কোন টাইল রয়েছে। এরপর একজন খেলুড়ে তার স্টক থেকে একটা টাইল বের করে সামনে রাখবে। ধরো টাইলটা হল
। এবারে তার প্রতিপক্ষকে নিজের স্টক থেকে এমন একটা টাইল বের করতে হবে যার একটা বর্গাকার এলাকায় হয় দুটো ফোঁটা, না-হয় পাঁচটা ফোঁটা আছে। ধরো সে এইটা তুলল—![]()
এইবার দ্বিতীয়জন সে টাইলটাকে প্রথমজনের টাইলের পাশে এমনভাবে বসাবে, যাতে দুটো একই সংখ্যক ফোঁটা পাশাপাশি থাকে। এতভাবে সে সেটা বসাতে পারে—

এবারে এর প্রতিটা সজ্জার ক্ষেত্রে প্রথম খেলোয়াড়কে আবার এমন একটা টাইল বাছতে হবে নিজের স্টক থেকে, যাতে ওপরের সজ্জার যে-কোনো দুটো প্রান্তের টাইলের ফোঁটার সমসংখ্যক ফোঁটা সে-টাইলে থাকে। অর্থাৎ, তাকে বাছতে হবে এমন কোনও টাইল, যাতে দুটো কিংবা চারটে ফোঁটা আছে।
এইভাবে খেলা চলবে। প্রত্যেকে টাইল বসিয়ে ঝোলা থেকে না দেখে নতুন টাইল তুলবে।
খেলা বেশ খানিক চললে বোর্ডটাকে এইরকম দেখায়—

খেলাটা শেষ হয় দু-ভাবে—
ক) যখন একজন তার হাতের সব টাইল শেষ করে ফেলবে, অন্যজনের হাতে তখনও টাইল থেকে যাবে ও ঝোলায় আর টাইল থাকবে না।
খ) যখন বোর্ডের দশা এমন হবে যে এক খেলুড়ের চালের পর অন্য খেলুড়ে তার হাতের কোনও টাইল বোর্ডে বসাবার জন্য কোনও উপযুক্ত জায়গা পাবে না।
দু-ক্ষেত্রেই প্রথমজন জিতবে।
সঙ্গে যে প্রথম ছবিটা দেয়া হয়েছে, সেটাকে কপি করে নিয়ে মোটা কাগজের গায়ে সেঁটে মাপমতো কেটে নিলেই তোমার ডমিনো সেট তৈরি। তারপর বন্ধুদের নিয়ে খেলা শুরু হয়ে যাক। পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও।
চ্যালেঞ্জ – ১
২৮টা ডমিনো টাইলকেই একত্রে বোর্ডে সাজাতে হবে ডমিনোর সব নিয়ম মেনে। কীভাবে সেটা করবে?
চ্যালেঞ্জ – ২
ধরো, সজ্জার শুরুতে আছে পাঁচটা ফোঁটা। তাহলে সজ্জার শেষে ক’খানা ফোঁটা থাকবে?
চ্যালেঞ্জ – ৩
সেট থেকে একটা ডমিনো সরিয়ে নিলাম। এবারে আমার বন্ধুকে বললাম বাকি সাতাশটা ডমিনোকে এক নং চ্যালেঞ্জের স্টাইলে সাজাতে। বন্ধু বলল, ‘একটা টাইল সরিয়ে নিলে বাকি সাতাশটাকে ডমিনোর নিয়ম মেনে একসঙ্গে সাজানো যায় নাকি?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, যায়।’
কী করে বললাম?
এর পর আমি নিজের চোখ বেঁধে নিলাম। দেখা যাবে, বন্ধু যতবার যতরকম সজ্জাই করুক, আমি ঠিক বলে দিচ্ছি সজ্জার একেবারে শেষে ক’খানা ফোঁটা আসছে। কী করে বলতে পারছি?
চ্যালেঞ্জ – ৪
সঙ্গের ছবিতে একটা ডমিনো ফ্রেম দেখানো গেল। এর প্রত্যেক ধার সমান মাপের। ওপরের আর বাঁয়ের ধারের প্রতিটির ফোঁটাদের যোগফল ৪৪। অন্য দুটো ধারের ক্ষেত্রে যোগফলটা হল যথাক্রমে ৫৯ আর ৩২। চ্যালেঞ্জটা হল এই— এমন একটা ডমিনো স্কোয়ার বানাতে পারবে কি, যার প্রত্যেক ধারের ফোঁটাদের যোগফলই ৪৪?

চ্যালেঞ্জ – ৫

সঙ্গের বর্গক্ষেত্রটা দেখো। এতে ঠিক চারখানা ডমিনো ব্যবহার করা হয়েছে। যে বর্গক্ষেত্রটা এর ফলে তৈরি হয়েছে, তার প্রত্যেকটা ধারের ফোঁটাদের যোগফল হল ১১। চ্যালেঞ্জটা হল, তোমার ২৮টা ডমিনোর সেট থেকে এরকম সাতটা আলাদা আলাদা বর্গক্ষেত্র বানাতে হবে, যার প্রত্যেক ধারের ফোঁটার যোগফল সমান হবে।
চ্যালেঞ্জ – ৬

সঙ্গের ছবিটা ১৮টা ডমিনো দিয়ে তৈরি একটা বর্গক্ষেত্র। এর মজাটা হল, এর প্রত্যেকটা রো, কলাম আর ডায়াগোনালের ফোঁটার সংখ্যার যোগফল হল ১৩। এবারে নানান রকম ফোঁটাওয়ালা ডমিনো ব্যবহার করে এরকম ম্যাজিক স্কোয়ার আরও কিছু বানাও দেখি। প্রতিক্ষেত্রে ডমিনোর সংখ্যা হবে ১৮। যোগফলগুলো হতে হবে ১৩ থেকে ২৩-এর মধ্যে।
চ্যালেঞ্জ – ৭

সঙ্গের ছবিতে খেলার নিয়ম মেনে ছ’টা ডমিনো সাজানো হয়েছে। পাশাপাশি ডমিনোদের খেয়াল করলে দেখবে, প্রতিটায় মোট ফোঁটার সংখ্যা আগেরটার চেয়ে এক বেশি। প্রথম ডমিনো→০+৪=৪, দ্বিতীয়→৪+১=৫, তৃতীয়→১+৫=৬, চতুর্থ→৫+২=৭, পঞ্চম→২+৬=৮, ষষ্ঠ→৬+৩=৯
এই যে আগেরটার চেয়ে পরেরটায় একই পরিমাণে বেড়ে চলা (এক্ষেত্রে প্রতি ধাপে ১ করে। সেটা প্রতি ধাপে দুই, তিন, চার—যা খুশি হতে পারে) একে বলে পাটিগাণিতিক বৃদ্ধি। ইংরিজি ভাষায় এর নাম অ্যারিথমেটিক্যাল প্রোগ্রেশন।
চ্যালেঞ্জটা হল, আটাশটা ডমিনো থেকে এরকম আরও কিছু ছয় ডমিনোর সজ্জা যাতে যোগফলগুলো পাটিগাণিতিক বৃদ্ধি দেখাবে।
সমাধান:
চ্যালেঞ্জ – ১
প্রথমে সাতখানা ডাবল ডমিনো-(০–০, ১-১………৬-৬)-কে সরিয়ে রাখা যাক। থাকল ২১টা। খেয়াল করে দেখবে, ওতে প্রত্যেকটা ফোঁটার সংখ্যা (শূন্যটা ফোঁটা, একটা ফোঁটা, দুটো ফোঁটা ইত্যাদি) ৬ বার করে আসছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নীচের ছ’খানা ডমিনোর একটা বর্গক্ষেত্রে চারটে ফোঁটা থাকবে—
৪-০, ৪-১, ৪-২, ৪-৩, ৪-৫, ৪-৬
তার মানে প্রত্যেকটা ফোঁটা সংখ্যা জোড়সংখ্যকবার ঘুরে আসছে। জোড়সংখ্যক মানেই তাদের পাশাপাশি বসিয়ে লিংক করা সম্ভব। তাহলে এইভাবে তাদের লিংক করে বসিয়ে তারপর যেখানে পরপর দুটো শূন্য লিংক হয়েছে, তাদের মাঝখানে (০-০) ডাবল ডমিনোটা, যেখানে পরপর দুটো ১ লিংক হয়েছে, তাদের মাঝখানে (১-১) ডাবল ডমিনোটা— এইভাবে বসিয়ে দিলেই কাজ শেষ।
একটা উদাহরণ রইল:
(০-০)(০-১)(১-১)(১-২)(২-২)((২-৩)(৩-৩)(৩-৪)(৪-৪)(৪-৫)(৫-৫)(৫-৬)(৬-৬)(৬-০)(০-২)(২-৪)(৪-৬)(৬-১)(১-৩)(৩-৫)(৫-০)(০-৩)(৩-৬)(৬-২)(২-৫)(৫-১)(১-৪)(৪-০)
চ্যালেঞ্জ – ২
ধরে নিলাম চেন-এর একেবারে শুরুতে যে সংখ্যাটা আসছে, চেন-এর একেবারে সে সংখ্যাটা আসবে না। সেক্ষেত্রে সে সংখ্যাটা বেজোড় সংখ্যকবার থাকবার কথা সেটে।
কিন্তু আমরা জানি যে একটা ডমিনো সেটে প্রত্যেকটা ফোঁটা-সংখ্যা (০……৬) আটবার করে ঘুরে আসে। (উদাহরণ- ধরো ছ’টা ফোঁটা বা সংক্ষেপে ৬। ৬ যুক্ত টাইলগুলো হল ০-৬, ১-৬, ২-৬, ৩-৬, ৪-৬, ৫-৬, ৬-৬। গুণে দেখো, আটবার ছয় ফোঁটা আসছে।) অর্থাৎ, একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা জোড়সংখ্যক বার ঘুরে আসে। অতএব ‘একেবারে শুরুতে যে সংখ্যাটা আসছে, চেন-এর একেবারে সে সংখ্যাটা আসবে না’ এইটা ধরে নেয়াটা ভুল। অতএব চেন-এর শুরুতে যে সংখ্যাটা আসছে, চেন-এর শেষেও সে-সংখ্যাটাই ঘুরে আসবে।
এই যে যুক্তিটা, অঙ্কের ভাষায় এর নাম ‘রিডাকশিও অ্যাড অ্যাবসার্ডাম।’
একটা উদাহরণ দিয়ে এই যুক্তিটার মানে বোঝানোর চেষ্টা করা যাক।
দাবি- ঈশ্বর মাত্র সাতদিনে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরি করেছিলেন।
ধরে নেয়া যাক, দাবিটা সত্যি।
সেক্ষেত্রে এমন দুটো ফসিল পাওয়া সম্ভব হবে না যাদের বয়সের দূরত্ব সাতদিনের বেশি।
বাস্তবের পরীক্ষা দেখাচ্ছে, মিউজিয়ামে রাখা ডাইনোসরের ফসিল আর মিশরের মমির বয়সের তফাত কয়েক কোটি বছরের।
অতএব, দাবিটাকে এই পথে যুক্তি দিয়ে তুড়ি মেরে অ্যাবসার্ড বলে প্রমাণ করে দেয়া হল।
এ-প্রসঙ্গে খেয়াল করো, প্রথমে আর শেষে একই ফোঁটা আসার অর্থ হল ডমিনোর একটা সেটকে একটা বৃত্তাকারে সাজানো যায়, যার শুরু বা শেষ নেই।
আর একটা মজার তথ্য, ঠিক কতভাবে একটা ডমিনো সেটের টাইলগুলোকে চেন হিসেবে সাজানো যায় জানো? ৭৯৫৯২২৯৯৩১৫২০ ভাবে।
চ্যালেঞ্জ – ৩
আমরা দেখেছি, আটাশটা ডমিনো দিয়ে একটা চেন বা রিং বানানো যায়। তাহলে সে-চেনটার শুরু বা শেষের পিসটাকে সরিয়ে নিলেও একটা নিয়ম মানা চেন তো পড়েই থাকছে, তাই না? তবে এই চেনের দুই প্রান্তে আলাদা আলাদা সংখ্যক ফোঁটা হবে। আর বলাই বাহুল্য, যে ডমিনোটা সরিয়ে নেয়া হয়েছে, তাতে যে সংখ্যা দুটো রয়েছে, এই চেনের দু-পাশের শেষ সংখ্যা দুটো তাই হবে।
উদাহরণ
১) (০-০)(০-১)(১-১)(১-২)(২-২)((২-৩)(৩-৩)(৩-৪)(৪-৪)(৪-৫)(৫-৫)(৫-৬)(৬-৬)(৬-০)(০-২)(২-৪)(৪-৬)(৬-১)(১-৩)(৩-৫)(৫-০)(০-৩)(৩-৬)(৬-২)(২-৫)(৫-১)(১-৪)(৪-০)
এর থেকে শুরুর টাইলটা সরিয়ে নিলে একটা চেন পাচ্ছি—
(০-১)(১-১)(১-২)(২-২)((২-৩)(৩-৩)(৩-৪)(৪-৪)(৪-৫)(৫-৫)(৫-৬)(৬-৬)(৬-০)(০-২)(২-৪)(৪-৬)(৬-১)(১-৩)(৩-৫)(৫-০)(০-৩)(৩-৬)(৬-২)(২-৫)(৫-১)(১-৪)(৪-০)। যে ডমিনোটা সরিয়ে নেয়া হয়েছে (০-০), তাতে যে সংখ্যা দুটো রয়েছে, এই চেনের দু-পাশের শেষ সংখ্যা দুটো তাই।
২) (২-৩)(৩-৩)(৩-৪)(৪-৪)(৪-৫)(৫-৫)(৫-৬)(৬-৬)(৬-০)(০-২)(২-৪)(৪-৬)(৬-১)(১-৩)(৩-৫)(৫-০)(০-৩)(৩-৬)(৬-২)(২-৫)(৫-১)(১-৪)(৪-০)(০-০)(০-১)(১-১)(১-২)(২-২)
এর থেকে শেষের টাইলটা(২-২) সরিয়ে নিলে একটা চেন পাচ্ছি—
(২-৩)(৩-৩)(৩-৪)(৪-৪)(৪-৫)(৫-৫)(৫-৬)(৬-৬)(৬-০)(০-২)(২-৪)(৪-৬)(৬-১)(১-৩)(৩-৫)(৫-০)(০-৩)(৩-৬)(৬-২)(২-৫)(৫-১)(১-৪)(৪-০)(০-০)(০-১)(১-১)(১-২)। যে ডমিনোটা সরিয়ে নেয়া হয়েছে(২-২), তাতে যে সংখ্যা দুটো রয়েছে, এই চেনের দু-পাশের শেষ সংখ্যা দুটো তাই।
চ্যালেঞ্জ – ৪
এই জাতের যে-কোনো বর্গেক্ষেত্রের চার ধারের মোট ফোঁটার সংখ্যার যোগফল হবে ৪৪ x ৪ =১৭৬।
সব ডমিনোর মিলিত ফোঁটার সংখ্যা ১৬৮, মানে ১৭৬ থেকে ৮ কম। কারণ, বর্গক্ষেত্রের কোনায় কোনায় যে ফোঁটাগুলো পড়ছে, সেগুলোকে দু-বার করে গোনা হচ্ছে। তার মানে, বর্গক্ষেত্রের কোনায় কোনায় যে ফোঁটাগুলো থাকবে, তাদের যোগফল ৮ হতে বাধ্য।
এইটেকে মাথায় রেখে সাজিয়ে গেলে একটা বর্গক্ষেত্র মিলবে, যার প্রতিটি ধারের ফোঁটাদের যোগফল ৪৪।

চ্যালেঞ্জ – ৫
এইটা অজস্রভাবে করা যায়। সঙ্গে কয়েকটা করে দেখানো হল। বাকিগুলো খুঁজে বের করাটাও একটা মজার খেলা হতে পারে তোমাদের জন্য।

চ্যালেঞ্জ – ৬
অনেক সমাধান আছে। একটা করে দেখানো হল।

চ্যালেঞ্জ – ৭
পাটিগণিতিক বৃদ্ধি-(প্রতি ধাপে ২)-র একটা সজ্জা হতে পারে—
০-০, ০-২, ২-২, ২-৪, ৪-৪, ৪-৬
বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে