কৃষ্ণা রায়ের অন্যান্য লেখা- দেহের কুশল প্রহরীরা(প্রবন্ধ), শতবর্ষের ওপারে(গল্প), কুটুসের স্বপ্ন(গল্প)

ব্রিটিশ এই মহিলার কাছে ভারতের ইতিহাসবেত্তারা নিঃসন্দেহে ঋণী হয়ে আছেন। না হয়ে উপায় কী? উনিশ শতকের প্রথম ভাগে দুই দশক জুড়ে ভারতবাসের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দিয়ে চিনেছিলেন উনিশ শতকের প্রথমার্ধের ভারতবর্ষকে, জেনেছিলেন সমকালের জনসাধারণের যাপনচিত্র, আর সেই জানাটিকে চিরস্থায়ী করে গেছেন তাঁর লেখায়।
ফ্যানি ছিলেন সেই সময়ের সর্বার্থেই একাকিনী নারী-ভ্রামণিক এবং ভ্রমণ লেখক। স্বামীর কর্মসূত্রে উনিশ শতকের প্রথম পাদেই ভারতে এসে ফ্যানি পার্কস আর পাঁচটা ইংরেজ ললনার মতো শুধু সংসার করেননি, চোখ মেলে দেখেছিলেন ভারতবর্ষ নামের অচেনা দেশটিকে। আর সেই সুবাদে হয়ে ওঠেন এক ভ্রমণ লেখক। বহুকাল থেকেই ভারতবর্ষে অনেক বিদেশি পর্যটক তথা ভ্রমণকারী এসেছেন। নতুন দেশ দেখার কৌতূহল, ধর্মপ্রচার, ব্যাবসা, দস্যুবৃত্তি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, জ্ঞান সংগ্রহ ইত্যাদি বিচিত্র কারণে এসেছেন একাধিক পুরুষ পর্যটক। বিভিন্ন সময়ে এসেছেন মেগাস্থিনিস, টলেমি, ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাঙ, আলবিরুনি, মার্কোপোলো, ইবন বতুতা, ভাস্কো-ডা-গামা প্রমুখ কত মানুষ। এই তালিকায় নারী ভ্রমণার্থীর সংখ্যা নেহাতই নগণ্য। যদিও ইডেন ভগিনীদ্বয়ের ভারত ভ্রমণকথা সুপরিচিত। তাঁদের নামেই কলকাতায় গড়ে উঠেছে ইডেন গার্ডেন স্টেডিয়াম। কিন্তু ভারত নিয়ে বিস্তারিত ভ্রমণকথা প্রথম যে নারী লিখেছেন, তিনি ইংরেজ কন্যা, ভ্রমণপিপাসু ফ্যানি পার্কস। গ্রেট ব্রিটেনের উত্তর ওয়েলস প্রদেশের কনওয়েতে ১৭৯৪ সালের ৮ ডিসেম্বর তাঁর জন্ম। পিতৃদত্ত আসল নাম ছিল ফ্রান্সিস সুসান আর্চার। বাবা মেজর উইলিয়াম আর্চার ছিলেন ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর একজন গুরুত্বপূর্ণ ক্যাপ্টেন, ‘ট্যুরস ইন আপার ইন্ডিয়া’ (১৮৩৩) গ্রন্থের লেখক। মায়ের নাম অ্যানি।
ফ্যানির বাল্যজীবন সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা না থাকলেও আঠাশ বছর বয়সে, ১৮২২ সালের ২২ মার্চ তাঁর বিয়ের খবর পাওয়া যায়। বিয়ে হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কর্মরত লেখক চার্লস ক্রফোর্ড পার্কসের সঙ্গে। ১৮২২ থেকে ১৮৪৫ সাল অবধি ভারতে ছিলেন। মাঝে অবশ্য পাঁচ বছরের বিরতি নিয়ে ইংল্যান্ড এবং কেপ টাউনে (১৮৩৯-১৮৪৪) বসবাস করেন। ঔপনিবেশিক ভারত সম্পর্কে তাঁর লেখা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে। স্বদেশে ফিরে গিয়ে ভারতবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিকথা লিপিবদ্ধ করেছেন, যেখানে তিনি কেবল উর্দু লিপিতে স্বাক্ষর করে লেখকত্ব স্বীকার করেছেন।
১৮২২ সাল থেকে ফ্যানি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। প্রিন্স দ্বারকানাথ তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সমানে সমানে বাণিজ্য করছেন গ্রিক-হুন-পাঠান-মুঘলদের মতো। ভারতে ইংরেজদের তখন আহ্বান করা হচ্ছে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য। এরকম এক সময়ে চাকরিসূত্রে স্বামী চার্লস পার্কসের সঙ্গে ফ্যানি পার্কস ভারতবর্ষে আসেন। ভারতবর্ষে তখন ইংরেজরা সবেমাত্র থাবা বসাচ্ছে, স্তিমিত হয়ে আসছে ভারতের উজ্জ্বল অভিজাত তারকাদের জীবন। কিন্তু তখনও আছেন রাজা-রানি-বাদশাহ-বেগমেরা, আছে দরবার, হারেম, সতীদাহ। এসব ছবি ধরা পড়েছে সাধারণ এক ইংরেজ গৃহবধূ ফ্যানির চোখে, যিনি ক্রমে সাধারণ থেকে বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। ফ্যানি মেমসাহেব ক্রমশ পরিণত হচ্ছেন এক ভারতপ্রেমিক রাজনীতিবিদ ও দার্শনিকে। আকৃষ্ট হচ্ছেন এখানকার কৃষ্টি, ইতিহাস, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সম্পদ, ধর্ম, ভাষা ও সর্বোপরি জনসমাজের প্রতি। সমর্থন রয়েছে ভারতের প্রতি, শিখেছেন হিন্দুস্থানি ও উর্দু ভাষা, ভালোবেসে পরেছেন ভারতীয় পোশাক ও গয়না, বাজাচ্ছেন সেতার, খাবার খাচ্ছেন হাত দিয়েই। দেখেছেন সেই সময়ে কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব রাজা রামমোহন রায়ের সুসজ্জিত আবাস; ইউরোপীয় কায়দায় আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো, ঘরে ঘরে সন্ধ্যায় উজ্জ্বল আলো জ্বলে, পেশাদার গায়িকারা গান গায়, নর্তকীরা নৃত্য পরিবেশন করে উপস্থিত অতিথিদের মনোরঞ্জন করে, আতশবাজি পোড়ে। দেখেছেন ভারতীয় জাদুকরদের খেলা; তরোয়াল গিলে ফেলা, আগুন মুখে পোরা। টানটান রোমাঞ্চ আর উত্তেজনায় ভরপুর আরও কতরকমের খেলা। বস্তুত, সমকালের ভারত ও ভারতীয় সমাজ, ইতিহাস, রীতিনীতি, জীবনযাত্রা, ধর্ম, রাজনীতি, সংস্কার, সংস্কৃতি, পরিবেশ-আবহাওয়া ও অন্যান্য দিক যেমন ফসল, খাদ্যদ্রব্য, পোশাক, বিনোদন, উৎসব, বিবাহ ও নারী-ভাবনা, স্থাপত্য শিল্প, দুর্ভিক্ষ—সবকিছুর একটি অনন্য সুন্দর ছবি নিয়ে রচিত হয়েছে ফ্যানি পার্কসের ‘ভ্রমণবৃত্তান্ত’।
ভারতে এসে প্রথম কয়েক বছর কলকাতার চৌরঙ্গী অঞ্চলে গৃহবধূ হয়ে ঘরবন্দি থাকলেও, ওই সময়ে শিখেছেন হিন্দি, উর্দু ভাষা। সূর্যাস্তের পর আরবি ঘোড়ার পিঠে চড়ে ময়দানে ঘুরেছেন। স্বামী কর্মক্ষেত্রে ক্রমশ ব্যস্ত হয়েছেন, চাকরিতে উন্নতি হয়েছে, নিঃসন্তান ফ্যানিকে সঙ্গ দেওয়ার সময় তাঁর নেই। ফ্যানি আশ্রয় করলেন ভ্রামণিকের জীবন। ওয়েলসে রক্ষণশীল সমাজের মেয়ে জীবনকে চেটেপুটে উপভোগ করতে চাইলেন। এরপর স্বামীর কর্মক্ষেত্রে বদলির আদেশ এল। সেই সুবাদে ফ্যানি গেলেন কানপুর, এলাহাবাদ। অত্যন্ত জিজ্ঞাসু এই মহিলা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে অসংকোচে বন্ধুতা পাতালেন। আগেই শিখে নিয়েছেন হিন্দুস্থানি, উর্দু আর ফার্সি ভাষা। ঘোড়ার পিঠে চড়ে শুরু করলেন আঞ্চলিক ভ্রমণ। সেই সময়ের স্মৃতিতে নিজেই লিখেছেন, ‘রোমিং আবাউট উইথ আ গুড টেন্ট অ্যান্ড আ গুড আরব হর্স, ওয়ান মাইট বি হ্যাপি ফর এভার ইন ইন্ডিয়া।’ বিদেশিনী এই স্বাধীনচেতা নারী খুব আন্তরিক এবং প্রাণবন্ত ভাষায় স্মৃতিকথাতে বিশদভাবে তুলে ধরেছেন সমকালের ভারতবর্ষীয় জীবন। উর্দু ভাষায় স্বচ্ছন্দ ফ্যানি একসময় এক সামরিক অফিসারের সঙ্গে গোয়ালিয়রের মহারানি বৈজা বাইয়ের আলাপচারিতায় দোভাষীর কাজ করেছেন। ঔপনিবেশিক শাসনকালের আগে উত্তর ভারতের মানুষের জীবন, সামাজিক প্রথা কিছুটা স্নেহপূর্ণ প্রশ্রয়ের ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন। আবার ব্রিটিশ সরকারের শাসনের ফলে তাদের গার্হস্থ্য সমস্যা, অর্থনৈতিক প্রভাব ইত্যাদিও লক্ষ করেছেন। মুসৌরি সংলগ্ন ক্যান্টনমেন্ট শহর ল্যান্ডৌর থেকে শিমলা যাবার পথে পাহাড়ি রাস্তা ধরে চলার সময় একই সঙ্গে কনৌজের যথেষ্ট ধনী সম্প্রদায় আর দুর্ভিক্ষ-তাড়িত মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে জেনেছেন তাদের যাপনচিত্রের খুঁটিনাটি। তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ এবং শ্রদ্ধা। এমনকি বিভিন্ন ভারতীয় শব্দসম্ভার নিয়ে শব্দকোশ এবং ভারতীয় প্রবাদগুলিরও তালিকা তৈরি করেছেন। লেখার মধ্যে বার বার নিজেকে তীর্থযাত্রী বলে উল্লেখ করেছেন। তীর্থযাত্রীসুলভ স্বভাবে সংগ্রহ করেছেন স্থানীয় স্মারক দ্রব্য, যেমন ঠগিদের ব্যবহৃত লোহার লাঠি।
ফ্যানি পার্কসের কিছু লেখায় সমকালীন বিতর্কিত বিষয়গুলিও স্থান পেয়েছে। তার উজ্জ্বল উদাহরণ সতীদাহ প্রথার মাধ্যমে একজন মহিলাকে হত্যা করার বিবরণ। সেই সময় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গীতে নারী নয়, পুরুষেরাই ছিল বিষয়-সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। ফ্যানি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান, এমনকি ইংল্যান্ডের বিবাহিত মহিলাদের নিয়ন্ত্রণকারী আইনেরও সমালোচনা করতে ছাড়েননি। উনিশ শতকের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে ব্রিটিশ গভর্নর-জেনারেল লর্ড বেন্টিংক-এর আমলে (১৮৩০-এর দশক) ১৬৩১ সালে নির্মিত তাজমহলকে ভেঙে এর মূল্যবান মার্বেল পাথর লন্ডনে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছিল। এর প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন ফ্যানি স্বয়ং। একজন ইউরোপীয় মহিলার এই দৃষ্টিভঙ্গী প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি দিল্লি এবং বারাণসীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আকর্ষণীয় পোশাক এবং পাকশালার নিখুঁত বর্ণনা দেন। আরও বিস্মিত হতে হয়, যখন দেখা যায় তাঁর শেষ লেখাগুলির একটিতে তিনি ভারত ছেড়ে যাওয়ার পর ইউরোপের প্রতি বিতৃষ্ণা অনুভব করার কথা বর্ণনা করেছেন।
১৮৩৯ সালে বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ফ্যানি ইংল্যান্ড ফিরে যান। দু-বছর বাদে মারা গেলেন তাঁর মা। সেই সময় তাঁর স্বামী ভারতে একাই ছিলেন। ১৮৪৫ সাল নাগাদ স্বামীর অসুস্থতার খবর পেয়ে এলাহাবাদে আসেন।
মানসিক রোগে আক্রান্ত স্বামীর কর্মজীবন শেষ হলে তাঁরা ফিরে গেলেন স্বদেশে। স্বামীর স্থান হল পাগলা গারদে। নিঃসঙ্গ ফ্যানির জীবনে লেখাই হয়ে উঠল পরম আশ্রয়। ১৮৫০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ হল তাঁর লেখা স্মৃতিকথা ‘ওয়ান্ডারিংস অফ আ পিলগ্রিম ইন সার্চ অফ দ্য পিকচারেস্ক ডিউরিং ফোর অ্যান্ড টোয়েন্টি ইয়ারস ইন দ্য ইস্ট: উইথ রিভিলেশন্স অফ লাইফ ইন দ্য জেনানা’ (Wanderings of a pilgrim, in search of the picturesque, during four-and-twenty years in the East; with revelations of life in the Zenana) নামে ১৮৫০ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর স্মৃতিকথায় ভরা এই বইটি অনেক পরে পুনরাবিষ্কার এবং সম্পাদনা করেন লন্ডন থেকে উইলিয়াম ডালরিম্পল ‘বেগমস, ঠাগস অ্যান্ড ইংলিশম্যান’ নামে। সেটি পুনর্বার প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে।
১৮৫১ সালে ফ্যানির স্বামী মানসিক হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেন। তিনি তখন নিজে অর্থ বিনিয়োগ করে ‘গ্র্যান্ড মুভিং ডায়োরামা অফ হিন্দুস্থান, ফ্রম ফোর্ট উইলিয়াম, বেঙ্গল টু গঙ্গৌত্রী ইন হিমালয়’ শিরোনামের ক্যাটালগটি প্রস্তুত করলেন। ডায়োরামা হল একটি ত্রিমাত্রিক (3D) দৃশ্য বা মডেল যা কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা, গল্পের অংশ বা প্রাকৃতিক দৃশ্যের বাস্তবসম্মত উপস্থাপনা তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। আর দর্শক একটি নির্দিষ্ট ছিদ্র বা অ্যাপারচারের মাধ্যমে সেটি দেখতে পায়। এটি প্রথমে প্রদর্শিত হয় লন্ডনের পোর্টম্যান স্কোয়ারের বেকার স্ট্রিট বাজারের এশিয়াটিক গ্যালারিতে। এটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে ১৮৫৩ সালে আবার প্রদর্শিত হয়।
নিঃসঙ্গ ফ্যানি মারা যান ১৮৭৫ সালে, একাশি বছর বয়সে, সিটি অফ ওয়েস্ট মিনিস্টারে। জীবনের উপান্ত বেলাতেও লিখে গেছেন, ‘আই শ্যাল নেভার বি টেমড। আই ট্রাস্ট টু দ্য আইডিয়াস অফ প্রপ্রাইটি অফ সিভিলাইজড লেডি লগ।’ শেষ জীবনেও ভারতবাসের স্মৃতি তাঁর কাছে প্রিয় ছিল। উনিশ শতকের ভারত-পথিক ফ্যানি পার্কসের জীবনী লিখেছেন বারবারা ইটন, ২০১৮ সালে। বইয়ের নাম, ফ্যানি পার্কস: ইন্ট্রেপিড মেমসাহিব। ভারতের সেই সময়ের ইতিহাস গচ্ছিত রয়েছে নৈর্ব্যক্তিক এক বিদেশিনীর কলমে।
(কৃষ্ণা রায় মানব শরীরতত্ত্বের বিশেষজ্ঞ। অধ্যাপনার পাশাপাশি দীর্ঘকাল সাফল্যের সঙ্গে বেথুন কলেজের অধ্যক্ষের পদ সামলেছেন। বিজ্ঞান ও ইতিহাস এই দুটি এলাকাতেই বাংলা সাহিত্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। )