
ছাব্বিশ জন যাত্রী নিয়ে নেপালের এক বেসরকারি বিমান সংস্থা শ্রী এয়ারলাইন্স কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন নারায়ণ বিমানবন্দর থেকে হিমালয়ের উদ্দেশে উড়ান দিল। আমার মনের ভিতর ঠিক সেই মুহূর্তে এক সাংঘাতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। আমার বহুবছরের স্বপ্ন এভারেস্টকে সামনে থেকে দেখার। এই বয়েসে আর বেস ক্যাম্প পর্যন্ত নামচে বাজার থেকে ট্রেক করে যাওয়ার সাহস হল না। বাড়িতে বৃদ্ধা ও অসুস্থ মা আমাদের অপেক্ষায় রয়েছেন। হৃদকম্পন দ্রুত গতিতে চলছিল উড়ানে বসে এই ভেবে, যে সশরীরে বাড়িতে ফিরতে পারব তো, নাকি এই হিমালয়ের মধ্যেই জীবনের ইতি ঘটে। কারণ, যে হারে সেই সময় নেপালে ছোটো বিমানের দুর্ঘটনা ঘটে চলেছিল, বিমান ফিরে আসা পর্যন্ত আতঙ্কগ্রস্ত ছিলাম। আবার এক বন্ধুকে যখন যাওয়ার আগের দিন শোনালাম যে পরের দিন এভারেস্ট চূড়া দেখতে চলেছি, সে আবার সাবধান করে দিল যে ছোটো প্লেনে করে না যাওয়াই ভালো, সেগুলো সমানে ভেঙে পড়ছে ওখানে। সেই কথা আর আমার স্ত্রীকে জানাইনি, নিজের মনের মধ্যেই রেখেছি এই ভেবে যে যা হওয়ার হবে। যদি ফিরে আসি, তাহলে প্রথমে নেমেই সেই বন্ধুকে ফোন করে তারস্বরে নিজের অভিজ্ঞতার কথা শোনাব।
বিমান একের পর এক ৮,০০০ মিটার উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গের পাশ দিয়ে উড়ে চলেছে, আর আমার মন তৃপ্তিতে ভরে উঠছে। এই দৃশ্য আর কোনও দেশে দেখা যাবে না। ইউরোপ, মার্কিন প্রদেশ আমাদের ভারতবর্ষের চেয়ে সুন্দর হতে পারে না। আমার বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন নিজের চোখে এভারেস্ট চূড়া দেখা, সে বিমানে বসে সামনেই থেকেই হোক না। এই প্রাকৃতিক বিস্ময় আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল ছাড়া আর কোথাও যে নেই। আমার দেশের পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো ৮,০০০ মিটারের পর্বতচূড়া দেখা যায়। কোনও পশ্চিমি দেশ থেকে এত উঁচু কোনও চূড়া দেখা যায় না।
নেপালের কথা উঠলেই প্রথমেই মনে পড়ে অবহেলিত বাঙালি ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী রাধানাথ শিকদারের কথা। আর মনে পড়ে গৌতম বুদ্ধের কথা, যাঁর জন্মস্থান নেপালের লুম্বিনীতে। নেপাল ভ্রমণের ইচ্ছা আমার দশ বছরের পুরোনো। এভারেস্টের ছবি দেখলেই মনে হত, আহা, আমি যদি বিশ্বের এই সর্বোচ্চ পাহাড়ের একটা ছবি নিজের হাতে তুলে আমার বাড়ির দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখতে পারতাম!
তা, ২০২৩ সালের জুন মাসে এক বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। অনেক কথার মধ্যেই সে জানাল তার নেপাল ভ্রমণের কথা। শুনেই চমকে উঠলাম। ওকে হিংসা করতে শুরু করলাম। আমার আগেই এভারেস্ট দেখে ফেলল? ওর কাছে বিশদ বিবরণ জেনে পরের দিনই আমি গেলাম সেই ভ্রমণ সংস্থায় যারা ওর নেপাল ভ্রমণের সব ব্যবস্থা করেছিল। বিস্তারিত আলোচনার পর সে ক’দিনের মধ্যেই জানিয়ে দিল দুজনের যাত্রার খরচ কত পড়তে পারে। ঠিক করে ফেললাম, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস হবে সঠিক সময় নেপাল ভ্রমণের জন্য। আলোচনায় ঠিক করা হয়েছিল আর কিছু হোক বা না হোক, এভারেস্ট চূড়া যে করে হোক দেখতে হবেই।
এক মাস পর ভ্রমণ সংস্থা জানাল, এভারেস্ট ভ্রমণ নেপালে গিয়েই পাকা করতে হবে। এখান থেকে আগে থেকে সে-ব্যবস্থা করলে হয়তো অর্থের জলাঞ্জলি হতে পারে। কারণ, এভারেস্ট সফরের দিন যদি কোনও কারণে আবহাওয়া খারাপ থাকে তাহলে সফর বাতিল হবে আর প্রদত্ত অর্থ ফেরত নাও পাওয়া যেতে পারে। সেটা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। প্লেনের টিকিট, হোটেল, ভ্রমণ-সূচি সব ঠিকঠাক করা হল প্রায় এক বছর আগে। অর্থাৎ ২০২৪ সালে যাত্রা আরম্ভ হবে ছয় রাত, সাত দিনের জন্য।
এদিকে সব ঠিক হয়ে যাওয়ার পর আরও এক বিপত্তি এসে হাজির হল। আমাদের কলকাতা থেকে কাঠমান্ডু সরাসরি এয়ার ইন্ডিয়ার টিকিট কাটা ছিল। কিন্তু তার আগেই দেশ হারাল তার কৃতী সন্তান রতন টাটাকে। তাঁর মৃত্যুর পর এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে টাটা গোষ্ঠীর আর এক বিমান সংস্থা ভিস্টারার একত্রীকরণ আরম্ভ হয়ে গেল। ফলে পুরো সপ্তাহের জন্য তাঁদের সমস্ত আন্তর্জাতিক উড়ান বাতিল হয়ে গেল। এক নতুন সমস্যায় পড়লাম। যাই হোক, আমার ভ্রমণ সংস্থা নতুন করে যাওয়া এবং ফেরার টিকিট দিল্লি হয়ে করে দিল। দিল্লি থেকে কাঠমান্ডু যাওয়া ও ফেরা নেপালের বিমান সংস্থা রয়াল নেপাল এয়ারলাইন্সে পাকা করা হল। এই আমার প্রথম বিদেশি বিমানে যাত্রা হবে।
অবশেষে ৩ নভেম্বর এসে গেল আর আমরা সকাল সাতটার প্লেন ধরার জন্য দমদম বিমানবন্দর রওনা দিলাম। সকাল ন’টার মধ্যে দিল্লি পৌঁছেও গেলাম। কাঠমান্ডুর উড়ান বিকেল পাঁচটায়। অতএব দুপুর দেড়টা পর্যন্ত কাছাকাছি কুটুম্বগৃহে কাটিয়ে আবার দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত হলাম গিয়ে। আন্তর্জাতিক যাত্রার জন্য বিমানবন্দরে তিন ঘণ্টা আগে রিপোর্ট করতে হয়। অনেকরকমের সরকারি বিধিনিয়মের পালন করতে হয়। নেপাল যাত্রার জন্য ভারতীয়দের দুটি মাত্র দলিল গ্রাহ্য করা হয়— পাসপোর্ট, অথবা ভোটার কার্ড। আমরা আমাদের পাসপোর্ট দেখিয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশ করলাম। তারপর কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষা ও ইমিগ্রেশন দফতরের নানান প্রশ্নোত্তরের শেষে পাসপোর্টে একটা ছাপ পড়ল—ডিপার্টেড, অর্থাৎ এই ব্যক্তি ভারত ছেড়ে নেপালের উদ্দেশে রওনা হল।
রয়াল নেপাল এয়ারলাইন্সের বিমান আকারে বেশ বড়ো, প্রায় ৩৫০ যাত্রী ধরার ক্ষমতা এই বিমানের। নভেম্বর মাস। তাই ওড়ার কিছুক্ষণ পরেই সূর্যাস্ত হয়ে গেল। কাঠমান্ডুর আকাশ কেমন তা আর দেখা গেল না। দীপাবলির সময়। ওপর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, নেপাল রাজধানী আলোয় সুসজ্জিত। বিমান ঠিক সন্ধে সাতটায় অবতরণ করল। বিমানবন্দরের বাইরে হাতে পোস্টার নিয়ে অপেক্ষা করছিল আমাদের নেপাল ভ্রমণ সংস্থার একজন— আমাদের গাড়ির চালক ও পুরো নেপালের জন্য আমাদের গাইড বিক্রম। বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর সময়ও কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হল নেপাল আধিকারিকদের কাছে। পাসপোর্ট দেখে তাঁরাও একটা ছাপ দিলেন—অ্যারাইভড, অর্থাৎ আমার নেপালে আগমন হল।
এর পরের বৃত্তান্তে যাওয়ার আগে নেপালের কিছু ভারতীয় ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সম্প্রতি ড. নির্মল দাশ মহাশয়ের এক গ্রন্থ পড়ে বেশ কিছু তথ্য জানতে পারলাম। তাঁর গ্রন্থ ‘চর্যাগীতি পরিক্রমা’-তে উনি লিখেছেন, ১৮৫৮ সালে রাজেন্দ্রলাল মিত্র ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’ পত্রিকায় ‘বঙ্গভাষার উৎপত্তি’ নামে যে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, সেখানে বাংলাকে হিন্দির পূর্বী শাখা থেকে উৎপন্ন বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন সেখানে বিদ্যাপতির রচনাবলি; অন্যদিকে ১৯১১ সালে প্রকাশিত দীনেশচন্দ্র সেনের The History of Bengali Language and Literature-এ বাংলা সাহিত্যের আদিপর্বে বৌদ্ধ প্রভাবের কথা উল্লিখিত হলেও তার আলোচনা প্রধানত গোপীচন্দ্রের গান, ডাক-খনার বচন ইত্যাদি কতকগুলি লৌকিক উপাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এইসব আলোচনায় অনুমানের স্থান যতটা প্রশস্ত ছিল, তথ্যের প্রতিষ্ঠা ততটা প্রধান ছিল না। অবশ্য উপযুক্ত তথ্যও তখন সহজপ্রাপ্য ছিল না। সেদিক থেকে চর্যাগীতিগুলির আবিষ্কার ইতিহাসের অনেক শূন্যস্থান পূরণ ও পূর্বে অনুমিত সূত্রের পুনর্মূল্যায়ন সম্ভব হয়েছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই অমূল্য ঐতিহাসিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয় বাংলার বাইরে রক্ষিত নেপালের রাজকীয় গ্রন্থ ভাণ্ডারে। প্রকৃতপক্ষে নেপাল ও তিব্বতে রক্ষিত বিভিন্ন বৌদ্ধ শাস্ত্র-গ্রন্থের পুথির দিকে সর্বপ্রথম বিদেশি গবেষকদেরই দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। ব্রায়ান হজসন (Brian Hodgson) নামে জনৈক ইংরেজ নেপাল থেকে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের অনেকগুলি পুথি আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কারের পর তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস রচনা ও শাস্ত্র-গ্রন্থ সম্পাদনার ব্যাপারে গবেষকদের মধ্যে বিশেষ তৎপরতা দেখা দেয়। বিস্তৃতভাবে এ-কাজ প্রথম শুরু করেন Eugene Burnouf (১৮৪৪)। এর পর আরও অনেক গবেষক নতুনতর পুথির সন্ধানে অনেকবার নেপাল গিয়েছেন। Daniel Wright ও Cecil Bendall-এর নাম এ-প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাঙালি গবেষকরাও এ ব্যাপারে পশ্চাৎপদ ছিলেন না। রাজেন্দ্রলাল মিত্র নেপাল গিয়ে সংস্কৃত ভাষায় রচিত বিভিন্ন বৌদ্ধ পুথির সন্ধান করে ১৮৮২ সালে Sanskrit Buddhist Literature in Nepal নামে একটি পুথির সন্ধান-তালিকা প্রকাশ করেন। রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর সরকার হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উপর বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার পুথি সন্ধান ও সংগ্রহের দায়িত্ব ন্যস্ত করে। রাজেন্দ্রলালের তালিকা ও আরও নবাবিষ্কৃত পুথির ভিত্তিতে হরপ্রসাদের মনে হয় যে নেপালের নানা জায়গায় বৌদ্ধধর্ম-সংক্রান্ত নানা পুথি ছড়িয়ে রয়েছে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এইসব উপকরণ একান্ত অপরিহার্য। এইসব উপকরণ সংগ্রহের জন্য তিনি ১৮৯৭-৯৮ সালে দুইবার নেপালে গিয়ে আরও কিছু পুথি আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কৃত পুথিগুলির মধ্যে ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’, সরহপাদের দোহা ও অদ্ব্যবজ্রের সংস্কৃতে রচিত ‘সহজাস্নায়পঞ্জিকা’ নামে টীকার পুথিগুলিকে প্রাচীন বাংলায় রচিত বলে তাঁর মনে হয়। এই তিনখানি পুথির সঙ্গে ডাকার্ণবের পুথিটি গ্রহণ করে তিনি বাংলা ১৩২৩ সনে (১৯১৬ ইং) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘হাজার বছরের পূরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা’ প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থ প্রকাশের পর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ বিষয়ক পূর্বতন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলি বিচলিত হয়ে পড়ল। শুধু বাংলাই নয়, হিন্দি, মৈথিলী, ওড়িয়া ইত্যাদি অন্যান্য নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহাসিকদের মধ্যেও বিশেষ তৎপরতা দেখা গেল। ফলে হরপ্রসাদ-আবিষ্কৃত রচনাবলির নিবিড়তর বিশ্লেষণ শুরু হল। এই বিশ্লেষণের ফলে দেখা গেল, হরপ্রসাদের আবিষ্কার চমকপ্রদ হলেও তাঁর সিদ্ধান্তগুলি সমস্তই অভ্রান্ত নয়।
এ গবেষণার ফল কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, বরং সমগ্র ভারতের সাহিত্যের ইতিহাসে এক সন্দেহাতীত দৃঢ় পদক্ষেপ যা ওপরের গ্রন্থ থেকে বাছাই করে নেওয়া শেষের পংক্তিগুলো পড়লেই অনুধাবন করা সম্ভব। অর্থাৎ, নেপালের বৌদ্ধ মঠগুলো আমাদের দেশের সাহিত্যের এক বড়ো মাপের গবেষণা কেন্দ্র হিসাবে এখনও যথেষ্ট প্রভাবশালী। পরিব্রাজক ও তিব্বতে ভ্রমণকালে বুদ্ধের প্রচারক হিসাবে পূজিত ও আচার্য বলে সম্বোধিত বাঙালি অতীশ দীপঙ্করের লেখা পুথি আবিষ্কার নিয়েও বহু গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। অতীশ দীপঙ্করের পৃথিবী নিয়ে এক উপন্যাস রচনা করেছেন সন্মাত্রানন্দ। এ তাঁর সুদীর্ঘ এক দশকব্যাপী চর্চা, চিন্তন ও গবেষণার ফসল। এই উপন্যাস আচার্য অতীশ দীপঙ্করের জীবন নিয়েই লেখা। তাই এই ভ্রমণ কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে সে-সব পণ্ডিত ব্যক্তিদের একবার স্মরণ করে, তাঁদের সশ্রদ্ধ প্রণাম ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অগ্রসর হতে আগ্রহী।
ক্রমশ
(শীর্ষচিত্র: আকাশ থেকে এভারেস্ট। ছবি: লেখক)