আগের লেখা- পাখির মধুর ডাকে ভরে যায় মন, পাখির চোখ

সন্তানের প্রতি বাবা-মার ভালোবাসা চিরন্তন ও শাশ্বত। একটি মানবশিশু জন্ম নেওয়ার পর পিতামাতা যেমন তাঁদের সদ্যোজাত সন্তানের খাওয়ানো থেকে শুরু করে লালন-পালনের সবরকম ব্যবস্থা করে থাকেন, ঠিক তেমনি বিভিন্ন প্রাণীকুল ও পক্ষীকুলও তার ব্যতিক্রম নয়। পাখিদের শাবকদের প্রতি সব দায়িত্ব-কর্তব্য, নিরাপত্তার জন্য তাদের বাবা-মার মনোভাব সেই চিরন্তন সত্যকেই বার বার প্রমাণ করে। পাখির বাবা-মার শাবকদের প্রতি যত্ন ‘প্যারেন্টাল কেয়ার’ বলতে কতকগুলি পর্যায়কে বোঝায়; যেমন বাসা তৈরি, ডিমে তা দেওয়া বা ‘ইনকিউবেশন’, সন্তানের জন্য খাবারের ব্যবস্থা, শিকারিদের হাত থেকে সন্তানদের রক্ষা-সহ বিভিন্ন ধরনের।
পাখির বাবা-মার শাবকদের প্রতি যত্ন (প্যারেন্টাল কেয়ার) হল একটি আচরণগত ও বিবর্তনীয় কৌশল। পিতামাতার যত্ন উপযোগীভাবে তাদের সন্তানদের বেঁচে থাকার জন্য জরুরি। এই বিষয়টি পাখি গবেষকদের মধ্যে একটি জনপ্রিয় গবেষণার ক্ষেত্র। পাখিদের মধ্যে এটি অনেক রূপে দেখা যায়। পিতামাতার যত্নের নিদর্শনগুলি পাখির জগৎ জুড়ে বিস্তৃত ও অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। পাখির বাবা-মা যেভাবে সন্তানের যত্ন নেয় ও তাদের ভূমিকায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের মধ্যে ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে। আবার তাদের প্রতিটি বাবা-মার যত্নের মধ্যেও আচরণেও যথেষ্ট তফাত রয়েছে। স্ত্রী পাখিরা কিছু প্রজাতিতে বেশি যত্নশীল হতে পারে, আবার পুরুষরা অন্য অনেক প্রজাতির মধ্যে যত্নশীল বেশি হয়। এই প্রকার একক মাতৃত্ব বা পৈতৃক যত্নের আচরণকে বলা হয় ‘ইউনিপ্যারেন্টাল কেয়ার’। অনেক সময় এই কাজটি উভয়ে সমানভাবে ভাগ করে নেয়। তাকে বলা হয় ‘বাইপ্যারেন্টাল কেয়ার’। প্রায় ৮১ শতাংশ পাখিদের এরকম আচরণ দেখা যায়। আর এক ধরনের আচরণ হয়, যাকে বলা হয় ‘অ্যালোপ্যারেন্টাল কেয়ার’, যেখানে বাচ্চারা নিজেদের বাবা-মা দ্বারা প্রতিপালিত হয় না। প্রায় ১৫০টির মতো পরভৃত প্রজাতির বেলায় তা হয়।
বিজ্ঞানী কেন্ডইগের মতে, পাখির ‘বাইপ্যারেন্টাল কেয়ার’ হল আদর্শ। অন্যান্য উন্নত প্রাণীগোষ্ঠীতে ‘বাইপ্যারেন্টাল’ কেয়ারের তুলনায় ‘ইউনিপ্যারেন্টাল কেয়ার’ বেশি মাত্রায় দেখা যায়। এই ধরনের কারণগুলি এখনও সম্পূর্ণরূপে অজানা। পাখির ‘প্যারেন্টাল কেয়ার’-এর ওপর গবেষণাগুলি থেকে জানা যায়, পাখিদের মধ্যে এই আচরণ ছিল আদিম। প্রথমদিকের গবেষণাগুলিতে পাখির ‘বাইপ্যারেন্টাল’ কেয়ার পদ্ধতিটি কীভাবে বিকশিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত ছিল। কিন্তু এখন তা পরিবর্তিত হয়েছে। বিজ্ঞানী কাভানাউয়ের (১৯৮৭) মতে, সরীসৃপ থেকে পাখিদের পিতামাতার যত্নের ধারণাটি অর্জিত হয়। তাঁর মতে, বিবর্তনের পথে পিতামাতার যত্নের বিষয়টি প্রাথমিক স্তরে পাখিদের বেলায় প্রথম দেখা যায়। তারপর আরও পরিবর্তিত হয়ে উন্নত ‘বাইপ্যারেন্টাল’ কেয়ার অর্জন করে।
পৃথিবীতে প্রায় দশ হাজারের বেশি প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। তারা ডিম উৎপাদনের মাধ্যমে তাদের প্রজাতির বিস্তার করে চলেছে। পাখিরা যত্ন নিয়ে বাচ্চাদের বেঁচে থাকা ও ভবিষ্যতের প্রজনন সুস্থতা বাড়ায়। তবে পাখিদের পিতামাতার মধ্যে কার কতটা যত্ন নেওয়া উচিত, তা নিয়ে মতভেদ আছে। তাছাড়া প্রত্যেকের কতটা যত্ন পাওয়া উচিত, তা নিয়ে ভাইবোনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। এমনকি যত্নের ধরন ও চাহিদা নিয়েও বাবা-মা এবং সন্তানদের মধ্যে বিরোধ থাকতে পারে।
বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বাচ্চাদের সাধারণত ‘অ্যালট্রিকাল’ এবং ‘প্রিকোসিয়াল’—এই দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়ে থাকে। ‘অ্যালট্রিকাল‘ শ্রেণির পাখির বাচ্চারা দুর্বল প্রকৃতির হয়ে থাকে। জন্মাবার পরপরই এদের বাচ্চাদের শরীরে পালক থাকে না, থাকে শুধু ছাল-চামড়া; একেবারে অসহায়, দুর্বল; চোখেও দেখতে পায় না; হাঁটা বা ওড়ার কোনও প্রশ্ন নেই। এরা শুধু খাওয়ার জন্য মুখ হাঁ করে; মা পাখিরা চঞ্চু দিয়ে বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দেয়। পাখিদের বেশিরভাগ ৮১% প্রজাতি এই শ্রেণির অন্তর্গত।
আর এক শ্রেণির পাখির বাচ্চাদের বলা হয় ‘প্রিকোসিয়াল’—যেমন, হাঁস ও মুরগির ছানা। এদের গা পালকে ঢাকা থাকে, চোখ দুটো উজ্জ্বল। এরা মায়ের পিছু পিছু দৌড়তেও পারে এবং চঞ্চু দিয়ে খাবার খুঁটে খায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, ‘প্রিকোসিয়াল’ ধরনের পাখির বাচ্চাদেরই শৈশব বেশিদিন স্থায়ী হয় এবং ‘অ্যালট্রিকাল’ শ্রেণির পাখির বাচ্চারা ওদের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে ওঠে।
পিতামাতার যত্নকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিশেষ শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়াগুলির এক বিশেষ সিরিজ শুরু হয়। যা মূলত স্নায়ু ও হরমোন দিয়ে পরিচালিত হয়। এইগুলি শাবকদের বেঁচে থাকা, বৃদ্ধি, সামাজিক বন্ধন, প্রজনন সাফল্য ও শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবেশে পাখির সামগ্রিক সুস্থতা যা-কিনা বির্বতনীয় নিরিখে খুব গুরুত্বপূর্ণ। গবেষক ভ্লেক (২০১১) ও স্মাইলির (২০১১) গবেষণা থেকে জানা যায়, ‘অ্যালট্রিকাল’ এবং ‘প্রিকোসিয়াল’—উভয় প্রকার বাচ্চাদের মধ্যে পিতামাতার যত্নের ক্রিয়াকলাপগুলি হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
আবার বেশ কিছু পরিবেশগত উপাদান যেমন তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা ‘অ্যালট্রিকাল’ প্রজাতির বিভিন্ন পর্যায়কে পরিবর্তন করতে শিকারিদের উপস্থিতি, পুষ্টির গুণমান ইত্যাদির বিশেষ ভূমিকা থাকে।
বাসা বাঁধা
বাসা নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য নিরাপদ আশ্রয়, শরীরের তাপমাত্রা রক্ষণাবেক্ষণ ও শিকারিদের হাত থেকে বাচ্চাদের রক্ষা করা। দেখা গেছে, নীড়ের শিকার ও শাবকের মৃত্যুহার প্রায় ৫০% থেকে ৭৮% পর্যন্ত হতে পারে (থমসন, ২০০৭)। উল্লেখ্যযোগ্য বিষয় হল, সব পাখি কিন্তু গুছিয়ে বাসা তৈরি করে না। যেমন, স্যান্ডপাইপার ও প্লোভার মাটিতে ডিম পেড়ে ডালপালা, পালক বা পাতা দিয়ে ঢেকে রাখে।

মা ঈগল ও তার শাবক (Source: nicolasdory.com)
জুক এবং বেইলির (২০০৮) গবেষণা অনুসারে, নীড়ের একটি সঠিক গঠন প্রজনন ঋতুতে নির্মাতা ও শাবকদের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে পারে। সাপের হাত থেকে বাচ্চাদের রক্ষা করার জন্য কিছুটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় বাবুই পাখি ঝুলন্ত বাসা প্রবেশপথ-সহ বানায়। কোনও লুকোনো বাসা সম্ভাব্য শিকারিদের থেকে রক্ষা করে। যা হোক, এই ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নীড়টি ভালোভাবে লুকিয়ে রাখাই প্রয়োজন নয়, বরং যে-কোনো আক্রমণ এড়াতে বাবা-মার যথেষ্ট উপস্থিতিও দরকার।
‘অ্যালট্রিকাল’ প্রজাতির মতো পাখিরা তাদের বাসা তৈরি করতে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ও কৌশল ব্যবহার করে। ফ্ল্যামিঙ্গোরা (Phoeniconotius rogus) বাসার ভিতরে তাপ বজায় রাখার জন্য কাদা সংগ্রহ করে। কাঠঠোকরা, বসন্তবৌরী, ধনেশের মতো পাখিরা গাছের গর্তে বা পরিত্যক্ত গর্তে বাসা বানায়। তাই সব জায়গাতেই পাখিরা বাসা তৈরি করে ডিম পাড়ে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য অনুসারে।
চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন (Pygoscelis antarcticus) নুড়ি দিয়ে তাদের বাসা তৈরি করে। যেহেতু উপনিবেশের অন্যান্য পাখিরা বাসা তৈরি করতে নুড়ি চুরি করে, তাই পাথর সংগ্রহ এই প্রজাতির নির্মাণশৈলীর ক্ষমতা প্রদর্শন করে (মোরেনো,২০১২)। রাফ লেগড বাজার্ড (Buteo lagopus) কোনও এলাকায় প্রাপ্ত ছোটো ইঁদুরের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে বাসা তৈরির জায়গা বেছে নেয় (গ্যারসন, ১৯৮০)। কখনো-কখনো পুরুষ পাখিরা যেমন বাবুই, ইউরোপিয়ান রেন্স যে বাসা তৈরি করে, সেগুলি স্ত্রী পাখিরা পরখ করে দেখে নেয় তা কতটা প্রতিরোধী ও পরবর্তী প্রজন্মের পক্ষে সুরক্ষিত কি না। সেই অনুসারে তারা সঙ্গী নির্বাচন করে (শিল্ডস, ১৯৮৪)। কিছু প্রজাতির পাখি যেমন, গ্রেট ক্রেস্টেড ফ্লাইক্যাচার্স (Myiarchus crinitus) কাঠবিড়ালির মতো শিকারিদের এড়াতে সাপের খোলস ব্যবহার করে (মার্টিন, ১৯৯৫)। আমাদের পরিচিত শালিক পাখিও তা করে (সেনগুপ্ত, ১৯৭৬)। বাসার আকার কমবেশি শিকারিকে আকর্ষণ করে। যদিও তা নিয়ে বিতর্ক আছে। ২০২২ সালে গবেষক কুজলা ও তাঁর সহকর্মীরা দেখেছেন, গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় পরিবেশে ২২টি ‘অ্যালট্রিকাল’ প্রজাতির মধ্যে বড়ো বাসাগুলিতে শিকারের উপদ্রব বেশি ছিল।
ডিম পাড়া ও তা দেওয়া বা ‘ইনকিউবেশন’
ডিমে তা দেওয়া বা ‘ইনকিউবেশন’ হল ডিম পাড়ার পরের ধাপ। এটি এমন একটি পর্যায় যা ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়া ও পরবর্তীতে টিকে থাকার সাফল্যকে প্রভাবিত করে (ক্রাউলি, ২০২০)। সাধারণত মা পাখি ডিমের সুরক্ষা ও তা দেওয়ার জন্য বাসাতেই থাকে। আর বাবা পাখি খাবার সংগ্রহে যায়। যা হোক, আবার কখনও সব শর্তগুলি পূরণ করা যায় না; অর্থাৎ, যখন বাবা-মা অনিয়মিতভাবে বাসায় থাকে বা তারা দীর্ঘ সময়ের জন্য বাসা ছেড়ে চলে যায়, তখন তথাকথিত আংশিক ‘ইনকিউবেশন’-এর মতো ঘটনাগুলি দেখা যায়। বিজ্ঞানী পেইনের (২০০০) গবেষণা অনুসারে জানা যায়, মা পাখি ‘ইনকিউবেশন’-এর স্তরে ৬০% – ৮৩% ও বাবারা তাদের ৩৫% সময় বাসায় কাটায়। অনুকূল পরিবেশ কম শিকারির উপদ্রব ও শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলে ডিম ফোটার কাজটিও ভালোভাবে হয়।
গ্রিফিথের (২০১৬) মত অনুসারে, পরিবেশগত তাপমাত্রার বিষয়ে বলতে গেলে নাতিশীতোষ্ণ ও গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় পাখির মধ্যে তফাত লক্ষ করা যায়। নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশে (তাপমাত্রা ৫-২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) প্রজননের সময় গড়ে ৩-৪ মাস পর্যন্ত হয়। যখন গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় পাখির (৫-৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) ৭-৮ মাস দরকার হয়। এই পার্থক্যগুলি জীবনধারার ওপর নির্ভর করে। যেমন, গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় পাখির বিপাকীয় হার কম হয়। ডিম ফোটার পরে বৃদ্ধির ধীর হারের কারণে এইসব পাখির অল্পসংখ্যক বাচ্চা হয় (ওয়াইজম্যান, ২০০৭)। এছাড়াও অক্ষাংশ হল আর একটি শর্ত যা ডিমের আকার ও সংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। নিরক্ষরেখার সবচেয়ে কাছে অবস্থিত বাসায় ডিমের সংখ্যা ও আকার ছোটো হয়। তাদের বাচ্চাদের যত্ন নেওয়ার জন্য বেশি সময়ের দরকার, কেননা বাচ্চাদের বৃদ্ধির হার কম থাকে। তাই সদ্য ডিম ফুটে বের হওয়া শাবকদের বৃদ্ধির হার পরিবেশের তাপমাত্রা দ্বারা প্রভাবিত হয়।
ডিম ফোটা বা ‘হ্যাচিং’
পরিবেশের তাপমাত্রা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে প্রাসঙ্গিক যা গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় পাখির প্রজাতি তাদের অভিযোজনকে প্রভাবিত করে। পরিবেশের বেশি তাপমাত্রা ডিম ফোটা বা ‘হ্যাচিং’ প্রক্রিয়া এবং শাবকের যত্নের ওপরও প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক ‘ইনকিউবিশন’-এর সময় যদি পরিবেশের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের ওপর থাকে তবে শাবকের বৃদ্ধি ও ওজন কম হয়, হাড় ও হাড়ের জয়েন্টগুলির গঠন পরিবর্তিত হয় (বেনলাপ, ২০১৯)। তাছাড়া পাখিদের ভবিষ্যতে বেঁচে থাকা ও প্রজনন বৈশিষ্ট্যগুলিকেও প্রভাবিত করে (ডুয়েট, ২০১৩)।
আপেক্ষিক আর্দ্রতাও ডিম ফোটার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, যেমনটা শোক ঘুঘুতে (Zenaida macroura) দেখা যায়। এই পাখিদের বেলায় ৯০% ‘হ্যাচিং’ সাফল্য ছিল, যখন আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৩৫% থেকে ৪৫%। আবার ৯৫% থেকে ১০০% আপেক্ষিক আর্দ্রতায় ‘হ্যাচিং’ সাফল্য ছিল মাত্র ৫০% (ওয়ালসবার্গ, ১৯৯২)। সাধারণ শালিক পাখিকে অনেক সময় আপেক্ষিক আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিমগুলিকে প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে রাখতে দেখা যায় (সেনগুপ্ত, ১৯৭৬)।
বাচ্চাদের খাওয়ানো
‘হ্যাচিং’-এর পর ‘অ্যালট্রিকাল’ প্রজাতির বাচ্চাদের দ্রুত বৃদ্ধির কারণে অবিরাম খাবার জোগানের দরকার হয়। খাবারের পরিমাণ ও গুণমান বিশেষ জরুরি। শাবকের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য বাবা-মা শিকার করে নিয়ে আসে প্রোটিন-সমৃদ্ধ পোকমাকড়। গ্রিফন শকুন (Gyps fulvus) ডিম ফোটার পর প্রথম দুই মাস বাবা-মা ক্রমাগত বাচ্চাদের খাওয়ায়। সং বার্ড ডিম ফুটে বেরিয়ে আসার পর বাচ্চাদের ঘণ্টায় ৪ থেকে ১২ বার খাইয়ে দিয়ে থাকে।

মা সং বার্ড ও তার শাবক (Source: tuku.cn)
ইউরোপিয়ান কাক্কুর (Cuculus canorus) শাবকদের জন্মের সময় ওজন থাকে মাত্র চার থেকে ছয় গ্রাম। তিন সপ্তাহ পর তার ওজন বেড়ে দাঁড়ায় পঞ্চাশ গ্রাম। এই সময় তাদের প্রধান খাদ্যই হয় প্রোটিন। অবশ্য পুরোপুরি বড়ো হয়ে গেলে এরা খাদ্যাভাস বদলে ফেলে ফল ও শস্যবীজ খেতে শুরু করে।

ইউরোপিয়ান কাক্কু ও তার শাবক (Source: nationalgeographic.com)
কোনো-কোনো পাখি তার বাচ্চাদের খাওয়াবার জন্য দিনে ৮৪৫ বার চক্কর লাগায়। আবার কিছু পাখি তার জন্য ৯০০ বারেরও বেশি ওড়াউড়ি করে। অন্যদিকে ঈগল পাখি দু-তিন বার চক্কর কাটে সারাদিনে। ওরা এটুকু সময়েই যে-পরিমাণ শিকার করে নিয়ে আসে, তা পেট ভরার পক্ষে যথেষ্ট। এমন কিছু পাখির বাচ্চাকে দুই থেকে তিন সপ্তাহ ধরে মা পাখিকে খাবার সংগ্রহ করে খাওয়াতে হয়। তারা জন্মানোর নয় দিন পরেই বাসা ছেড়ে উড়তে শেখে।
বেশিরভাগ পাখি বাসায় চঞ্চুতে করে খাবার এনে বাচ্চাদের খাওয়ায়। কিন্তু সামুদ্রিক কিছু পাখি আবার খাবার গিলে ফেলে বেশ খানিকটা হজম করে নেয়, তারপর সেটা উগড়ে দিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ায়। এর ফলে পাখিরা বেশি খাবার বহন করে বাসায় নিয়ে যেতে পারে এবং বাচ্চারাও খানিকটা পরিপাক করা খাবার খেতে পারে। এতে তাদের খাবার হজম করার পক্ষে সুবিধে হয়।
সিগাল এবং সারসরা আবার খাবার নিয়ে এসে বাচ্চাদের সামনে ফেলে দেয়। বাচ্চারা সেই খাবার খেয়ে নেয়। সিগাল পাখির শাবকেরা প্রায় তিন মাস পর্যন্ত তাদের বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে।

বাচ্চাদের সামনে খাবার ফেলে রাখে মা সিগাল (Source: AnimalWhoop)
মাতৃত্ব বনাম পৈতৃক যত্ন
‘বাইপ্যারেন্টাল‘ যত্নে পুরুষ খাবার যোগাড় করে, আর মা পাখি তার তদারকি করে। মা পাখি বাচ্চাদের রোদ, বৃষ্টি ও শিকার থেকে আগলে রাখে। আবার পালা করে উভয়েই এই কাজগুলো করে থাকে। রেড-আইড ভাইরোর ক্ষেত্রে (Vireo olivaceus) মা পাখির ভূমিকা ঠিক তার বিপরীত। অ্যাকর্ন কাঠঠোকরার মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখিরাও বাবা-মার সঙ্গে যত্নে সহযোগিতা করে বলে জানা যায় (পল আর. এরলিচ)।
বাবা-মার একক প্রচেষ্টা
বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ককবার্নের মত অনুসারে, পাখি জগতের মাত্র ১%, অর্থাৎ প্রায় ৯০টি প্রজাতির পুরুষ ও ৮%, অর্থাৎ ৭৭২টি প্রজাতি কেবলমাত্র স্ত্রী পাখি বাচ্চাদের যত্ন নেয়। এই ক্ষেত্রে যে সঙ্গীর কম প্রচেষ্টা থাকে, তার পরিত্যাগের সম্ভবনা বেশি থাকে (রবার্ট ট্রিভার্স, ১৯৭২)।
স্পটেড স্যান্ডপাইপার (Actitis macularius) পাখিদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মা পাখি ডিম পাড়ার পরপরই তা দেওয়া শুরু করলেও, পরে বাসা ছেড়ে চলে যায়। বাবা পাখিটি পরে তা দেয়।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জেব্রা ফিঞ্চের বেলায় যাদের নিম্নমানের খাবার খাওয়ানো হয়, তারা ছেলে শাবক উৎপাদন করে; আবার যখন ভালো মানের পুষ্টি খাওয়ানো হয়, তারা মেয়ে উৎপাদন করে। প্রকৃতিতে মেয়ে সন্তানের বেঁচে থাকতে ও বেড়ে উঠতে পুরুষের তুলনায় বেশি পুষ্টির দরকার হয়। পুরুষদের কম পুষ্টির প্রয়োজন। তাই এটিকে ‘প্রি-বার্থ প্যারেন্টাল’ কেয়ার অভিযোজন হিসাবে দেখা যেতে পারে (নিকোলাস বি. ডেভিস)।
তবে দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী পরিবারদের মধ্যে অ্যারিবিয়ান ব্যাবলারদের (Argya squamiceps) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই পাখিরা সাধারণত গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে থাকতে পছন্দ করে। আর তাই পরিবারে কোনও শাবকের জন্ম হলে তাকে খাওয়ানো থেকে দেখাশোনার দায়িত্ব পরিবারের সকলে মিলে করে থাকে, যা সত্যিই বিস্ময়কর।
‘ফিলিয়াল ইমপ্রিন্টিং’ নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাবকরা তাদের বাবা-মার জন্য দৃষ্টি, ঘ্রাণ, শ্রবণ ও স্পর্শকাতর সংকেতের মাধ্যমে একটি পছন্দ তৈরি করে (ভার্সেস, ২০১৮)। এই সংবেদনশীল পদ্ধতির মাধ্যমে শাবকরা নিজেদের ভাইবোনদের চিনতে পারে ও তাদের বাবা-মার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। পালা করে বাবা-মারা বাচ্চাদের ডাকে ও আচরণে সাড়া দেয়। এই সময়ের মধ্যে ছানাগুলি পিতামাতার কাছে প্রথম চলমান বস্তুকে চিনতে পারে ও তাদের ওপর ছাপ ফেলে। বাবা-মারা তাদের পরিবেশে কীভাবে খাবার খুঁজে পাবে ও বেঁচে থাকতে হবে, তা শেখায়। ছানারাও সব গুরুত্বপূর্ণ আদবকায়দা, উড়তে শেখা, বিচরণ ইত্যাদি আচরণ শিখে নেয়।
অ্যালবাট্রস (Diomedea exulans) পাখি সমুদ্রতীরের পাখি হলেও বাচ্চা দেওয়ার জন্য সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা তাদের পছন্দ। জন্মাবার ৩ থেকে ১০ মাস পরেই প্রজাতি-ভেদে বাচ্চরা প্রথমবার সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়তে শেখে। তারা ঠিকমতো উড়তে এবং বেঁচে থাকতে পারবে কি না তা প্রথমবার ওড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়। তাই জন্মাবার প্রথম বছরেই এদের মৃত্যুর হার খুব বেশি।

অ্যালবাট্রস পাখি ও তার শাবক (Source: 1freewallpapers.com)
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল যে বাবা-মায়েরা তাদের বাচ্চাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে, কিন্তু শাবকরা তাদের বাবা- মাকে আদৌ চিনতে পারে না। তাই একটি হাঁসের বাচ্চা অনায়াসেই চরে বেড়ানো মুরগির বাচ্চার সঙ্গে মিশে যেতে পারে। মুরগির বাচ্চা জন্মের পরেই সবকিছু খুঁটে নিতে থাকে মাটি থেকে। সেজন্য তাকে কী খেতে হবে, কী নয় তা শেখানোর দায়িত্ব পড়ে মায়েদের। ছানারা খাওয়ার সময় বিশেষ শব্দ করে। তবে মায়ের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর নির্ভর করে সেই ডাক আলাদা হয় (নিকোল, ২০০৪)। মায়ের সঙ্গে কাটানো সময়টি বাচ্চাদের আশ্বস্ত করে। একবার বাচ্চাগুলি স্বাবলম্বী হলে তারা বাবা-মাকে ছেড়ে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনে সক্ষম হয়।
তথ্যসূত্র:
Aves Biology (https://www.avesbiology.com), Research gate (https://www.researchgate.net), Nature (https://www.nature.com), Ox forms Academic (https://www.academic.oup.com),Ox forms Academic (https://www.academic.oup.com, National Institute of Health (NH)(Gr) (https://www.pubmed.nib.nih.gov), Wikipedia (https://www.er.wikipedia.org)
লেখক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ একাডেমি, কলকাতা-র সদস্য
বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে