এই লেখকের আগের লেখা- যারা হারায় রূপকথায়, এক অন্য জালিয়ানওয়ালাবাগের গল্প

ভাটির টানে এগিয়ে চলেছে নৌকা। তরতরিয়ে আপন ছন্দে। কৃষ্ণবর্ণ, শীর্ণকায় মাঝির দাঁড় টানার দৃপ্ত ভঙ্গিমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন সাহেব পোস্টমাস্টার। তিনি চলেছেন অত্যন্ত জরুরি কিছু চিঠিপত্র নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিতে। চিঠির ঝোলাটি তাঁর কোলের ওপর রাখা। গুরুত্বপূর্ণ কিছু চাকরির নিয়োগপত্র আছে এই ঝোলাতে। মৃদুমন্দ হাওয়া, উজ্জ্বল সোনালি দিন, নদীর জলে সূর্যের আলোর ঝিলিমিলি খেলা আর নদীতীরের দৃশ্যপটে মজে আছেন সাহেব পোস্টমাস্টার। হঠাৎই একটা ঝাঁকুনিতে নৌকা টলমল করে উঠল। তিনি নিজেকে সামলে নিলেন, কিন্তু তাঁর কোলের ঝোলাটি ছিটকে পড়ল জলে। হায় হায় করে উঠল মাঝি এবং দ্রুত নৌকা পাড়ে নিয়ে এল। চিঠির ব্যাগ হারিয়ে ব্যথিত পোস্টমাস্টার বিমর্ষ চিত্তে এসে দাঁড়ালেন পথপ্রান্তের উপাসনালয়টিতে। সোনালি দিন মলিন হল। কাতর প্রার্থনায় কেটে গেল অনেকখানি সময়। ফিরে যাবার জন্য যখন নদীর ঘাটে এলেন, দেখলেন একজন মৎস্যজীবী মানুষ তাঁর চিঠির ব্যাগটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিস্ময়ে হতবাক সাহেব পোস্টমাস্টার আবার ছুটে গেলেন সেই উপাসনালযয়ে। এবারে আনন্দাশ্রু দিয়ে প্রভু যিশুকে তিনি জানালেন অশেষ কৃতজ্ঞতা। ফরাসডাঙা সেক্রেড হার্ট চার্চের ঘণ্টা বেজে উঠল ঢং ঢং ঢং।
১৬৮৮ সাল নাগাদ হুগলি নদীর ফরাসডাঙায়, এখনকার চন্দননগর, এলেন কয়েকজন অগাস্টিনীয় সন্ন্যাসী। এর বছর পনেরো আগেই ফরাসিরা চন্দননগরে উপনিবেশ স্থাপন করেছে। অগাস্টিনীয়রা এখানে আসার তিন বছরের মধ্যেই একটি উপাসনালয় স্থাপন করলেন। ক্রমে এখানে ক্যাথলিক অনুরাগীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। তার সঙ্গে সঙ্গে সময়ের শিলালিপিতে লেখা হল অনেক ইতিহাস। ঢেউ আসে, ঢেউ যায়। হুগলি নদীর তীরে অপরূপ সুন্দর আধখানা চাঁদের আকারের ফরাসডাঙা চন্দনের গন্ধের মতোই ফরাসি স্থাপত্য ও শিল্পে সুরভিত হয়ে উঠতে থাকে।
কালের নিয়মে পুরাতন হাসিমুখে নতুনকে জায়গা করে দেয়। আজকের চন্দননগর সেক্রেড হার্ট চার্চ তারই উদাহরণ। একে আমরা চন্দননগর চার্চ বলে থাকি। প্রাকৃতিক এবং অন্যান্য নানা কারণে পুরাতন চার্চটি ধ্বংস হবার পর ১৮৮৪ সালের ২৭ জানুয়ারি ভারতে ফরাসিদের প্রধান ধর্মগুরু রেভারেন্ড পেরে করবেটের উপস্থিতিতে কলকাতার আর্চ বিশপ ডক্টর পল গ্যাথালসের হাত ধরে তৈরি হয় এটি। এই চার্চের নবরূপে আত্মপ্রকাশ এবং এর উদ্বোধন অনুষ্ঠান ছিল সে-সময়কার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
এক অতিসাধারণ রোদ্দুরে পাওয়া বিকেল অসাধারণ হয়ে উঠল চন্দননগর সেক্রেড হার্ট চার্চের দরজায় দাঁড়িয়ে। যেখানে পবিত্র হৃদয়ের কোমল কৃপাময় মূর্তি। অপলক দৃষ্টিতে শান্তি আর মায়া। শতাব্দীর পর শতাব্দী মানবতার বন্ধনে তিনি বেঁধে রেখেছেন সকলকে। ইন্দো-ফ্রেঞ্চ স্থাপত্যের খাঁটি নিদর্শন এই চার্চটির স্থপতি ছিলেন বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ আর্কিটেক্ট জ্যাক ভুক্যাটজ। চার্চের মাঝখানে একটি গম্বুজাকৃতি স্তম্ভ, যার মাথায় একটি ক্রুশ। বিশ্বাস আর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ সে প্রতীক অনন্ত আকাশের দিকে স্থির। সেদিকে তাকালে হৃদয় প্রকাশ হয়। চার্চের দরজাটি অসম্ভব চোখ জুড়ানো। দু-পাশে সুন্দর সাতটি খিলান দেওয়া জানালা। নীচের দিকের থামগুলি ফরাসি স্থাপত্য ও জানালাগুলোতে ইউরোপীয় ছোঁয়া। এরপর প্রার্থনার জায়গা, যেখানে আপনি মাথা নুয়ে আসে। অপার শান্তি আর স্তব্ধতা বিরাজমান। হলের মাঝখানে সারি সারি বেঞ্চ দু-ভাগে ভাগ করে পাতা, যা বসার জায়গা। প্রার্থনা বেদিখানি সম্পূর্ণ শ্বেতপাথরের। এখানকার শিল্পরীতি নিমেষে মন কেড়ে নেয়। ওপরদিকটি বেলজিয়াম কাচ দিয়ে এমনভাবে সাজানো, যেখান থেকে প্রার্থনাগৃহে ছড়িয়ে পড়ে নরম আলো। দেওয়ালে যিশু খ্রিস্টের জীবনের নানা গল্প আঁকা। আর আছে কাঠের তৈরি তিনটি স্বীকারোক্তি বাক্স, যা মনে করায়, উপাসনালয় শুধুমাত্র প্রার্থনার জায়গা নয়, অনুতাপ, আত্মোপলব্ধি ও আত্মশুদ্ধির জায়গা। ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের এদিকে এগিয়ে যাওয়া।
তিনশো বছরেরও আগে একদল ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মানুষ পথচলা শুরু করেছিল খ্রিস্টধর্মকে পাথেয় করে। এই পথ সহজ ছিল না। ফরাসি শাসনের মধ্যে সেই চলা শুরু হলেও, একসময় ব্রিটিশরা দখল করেছিল চন্দননগর। ফরাসিরা পুনরায় ছিনিয়ে নিয়েছিল তাদের সাম্রাজ্য। রুচিশীল, শিল্প-স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষক ফ্রেঞ্চ কমিউনিটির সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে চন্দননগরের প্রতিটি কোণে। ডুপ্লে ভারতের গভর্নর জেনারেল থাকাকালীন চন্দননগরের শিল্প-স্থাপত্য অন্য মাত্রা লাভ করে। ব্যাসিলিকা, গির্জা ইত্যাদি হর্ম্যগুলি নবরূপে সজ্জিত হয়। পুরোনো সেক্রেড হার্ট চার্চ রেভারেন্ড পি. বার্থেট ও তাঁর ভাই জোয়াকিমের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় টানা নয় বছর কাজ করার পর নতুন হয়ে ওঠে। বলা হয়, এই দুজন নেপথ্য শিল্পী। বর্তমানে কলকাতার আর্চ ভায়োসিসের অধীনে থাকা এই উপাসনালয় পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন কর্তৃক ঘোষিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান।
দিনের আলো কমে এলে চার্চের সৌন্দর্য হয় দ্বিগুণ। নজরকাড়া আলো ঘিরে ধরে। বেলজিয়াম কাচে এসে পড়ে সে-আলো, যা এক অপার্থিব রূপ সৃষ্টি করে। সাক্ষী থাকলাম সেই আলোছায়ার মায়াময়তার শান্ত সমাহিত পরিবেশের। তার মধ্যেই জ্বলে উঠল অজস্র আলো। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল শান্তি ও মুক্তি হয়ে। মানুষের মনে এ-আলোর শিখা চিরন্তন ও শাশ্বত। সারাবছর সকল ধর্মের মানুষ এখানে আসেন। উৎসব, অনুষ্ঠান, প্রার্থনা, ভক্তি, শান্তি ও সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার হয়। কিছুদিন আগে পর্যন্ত যখন ডাকবিভাগের পত্র বন্টন বিভাগটি মানুষের জীবনে ভীষণভাবে অপরিহার্য ছিল, তখন নিয়োগপত্র, জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পাঠানোর আগে বা যথাসময়ে হাতে পাওয়ার বাসনায় মানুষ এখানে প্রার্থনা করে যেতেন। কারণ, জনশ্রুতি আছে, এক সাহেব পোস্টমাস্টার তাঁর হারিয়ে যাওয়া চিঠির ঝোলাখানি একজন জেলের সাহায্যে আশ্চর্যজনকভাবে ফেরত পান। নদীপথ দিয়ে যাবার সময় জলে ঝোলাটি পড়ে এবং তিনি ফরাসডাঙার যিশুর কাছে কাতর প্রার্থনা করে অলৌকিকভাবে ফিরে পান গুরুত্বপূর্ণ চিঠির ঝোলা। এই নিতান্তই কল্পকাহিনি হয়তো। কারণ, প্রায় সব উপাসনালয়কে ঘিরে থাকে অজস্র মিথ বা কল্পকাহিনি।
শেষ বেলার সৌন্দর্যকে ম্লান করে আলোকময় প্রভু যিশুর মাথাময় রূপ ব্যাকুল করে তোলে মন। অন্তরে করাঘাত পড়ে নিঃশব্দে। অন্তর আর বাহিরের টানাপড়েন স্তিমিত হয়। কখন যেন সমস্ত ব্যথারা আলো হয়ে জ্বলে ওঠে। সে-আলোর সাজসজ্জায় ভেসে হেঁটে আসি অদূরে চন্দননগর স্ট্যান্ড বা জোড়া ঘাটে। আলোর বন্যায় ভাসে ডুপ্লের শিল্প শহর তার ছায়া নদী জলে। অন্যদিকে আলোকময় হয়ে পাহারায় থেকে যায় মহাকালের জাগ্রত এক প্রহরী—অনন্তকাল। সদাসর্বদা।