ধারাবাহিক অভিযান-আমার অভিযাত্রী জীবন(এপিসোড ৮)-স্বেন হেডিন-অনু-রাজীবকুমার সাহা-বর্ষা ২০২৬

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

সব পর্ব একত্রে-পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬, পর্ব ৭

স্বেন হেডিন একাধারে একজন সুইডিশ ভূগোলবিদ, টপোগ্রাফার, অভিযাত্রী, ফটোগ্রাফার ও চিত্রশিল্পী। ১৮৬৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যু: ২৬ নভেম্বর, ১৯৫২, স্টকহোম।
এই আত্মজীবনীতে নিজের জীবনভর অভিযাত্রার দুর্ধর্ষ সব অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন হেডিন। রোমহর্ষক উত্তর মেরু অভিযানের নায়ক সুইডিশ অভিযাত্রী নর্দেনস্কিওল্ডকে দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং পনেরো বছর বয়সেই ভবিষ্যতে উত্তর মেরু অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। পরে তাঁর অভিযাত্রার গতিমুখ পরিবর্তিত হয়ে এশিয়ার দিকে ধাবিত হয়। নিয়তির ফেরে কাস্পিয়ান সাগরতীরের ঝড়ের শহর বাকুতে আসেন আর সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করেন এশিয়ার পথে। শুরু হয় রাশিয়া, ককেশাস আর পারস্য হয়ে প্রায় সমগ্র এশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন। বাধাবিঘ্ন বিপত্তির সম্মুখীনও হন প্রচুর। তুলে ধরেন দেশীয় সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবরণ। গবেষণার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাচিত্র তারই সাক্ষ্য বহন করে। MY LIFE AS AN EXPLORER স্ভেন হেডিনের অসামান্য সৃষ্টি। ১৯২৬ সালে কাসেল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড-এর হাত ধরে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

॥ আঠারো॥

মরুভূমির প্রান্তরে

১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৫ তারিখে বিদায় নিলাম কাশগর থেকে। এশিয়ার কঠিনতম পথগুলোর একটায় চলেছি এইবারে।

দুটো আরাবাস নিয়েছি সঙ্গে। আরাবাস হল চার ঘোড়ায় টানা দুই বড়ো বড়ো চাকার গাড়ি। একটা ঘোড়া থাকে দুই পাশের দুই দণ্ডের মধ্যিখানে, আর বাকি তিনটে সামনে, রশি বাঁধা। গাড়োয়ানকে আরাবাকেশ বলে। গাড়ির মাথায় খিলেনের মতো নলখাগড়ার ছাউনি। প্রথমটায় অল্প কিছু মালপত্র-সহ আমি, আর দ্বিতীয় গাড়িতে ভারী বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে ইসলাম বাই। সঙ্গে দুই কুকুর—পামিরে দলে জোটা ইয়োলদশ আর কাশগর থেকে এসেছে হামরা। দুটিতেই ইসলাম বাইয়ের গাড়িতে বাঁধা।

ভয়ানক ক্যাঁচরম্যাচর শব্দে আর আর মস্ত হলদে ধুলোর মেঘ মন্থন করে কাশগরের কুম-দরবাসেহ্‌ অর্থাৎ বালুকা-তোরণ পেরিয়ে এল আমাদের আরাবাস। ইয়াঙ্গি শহর গোটাটাই এখানে চিনে জনপদ বলা চলে। সেখানে পৌঁছে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হল এক। আচমকা এক চিনে সৈনিক পথরোধ করে দাঁড়াল আমাদের। বলে কিনা হামরা আমার কুকুর, ফেরত দাও। আমরা রাজি নই বুঝেই সে-ব্যাটা করল কী, আমাদের গাড়ির ঠিক সামনে এসে মাটিতে শুয়ে পড়ল দুম করে। পাগলের মতো চিৎকার-চেঁচামেচি জুড়ে দিল সমানে। ততক্ষণে বড়োসড়ো একটা জটলা জমে গেছে চারদিকে। উপায়ান্তর না দেখে বললাম, “বেশ। কুকুরটা ছেড়ে দিচ্ছি। সে যদি তোমার কাছে চলে যায় তবে তোমার। আর যদি আমাদের সঙ্গেই যায় তবে আমাদের।”

হামরাকে ছেড়ে রওনা হয়ে গাড়ির চাকা দু-বারও ঘোরেনি হয়তো, তিরবেগে আমাদের দিকে দৌড়ে এল সে। পেছনে তখন চিনে-ব্যাটাকে নিয়ে হাসির রোল উঠেছে।

কাশগর-দরিয়ার পাড় ধরে চলেছি পুবদিকে। ইতিউতি বরফজমা জলাভূমির ওপর দিয়ে পথ। আচমকা অ্যাক্সেল অবধি বরফের খানায় ডুবে গেল আমার গাড়িটা। সামনের তিনটে ঘোড়া গেল পড়ে। সেও ঘটল রাতের বেলায়। অগত্যা বড়ো করে একটা আগুন জ্বালিয়ে মালপত্র নামিয়ে আনা হল গাড়ি থেকে। ঘোড়াদের পেছনের দিকে তাড়া দিয়ে গাড়িটাকে তুলে আনা হল কোনোক্রমে। আবার রওনা তারপর।

পথে পথে গাঁয়ে-গঞ্জে রাত কাটিয়েছি আমরা। গাড়োয়ানেরা গাড়িতেই থেকে মালপত্র পাহারা দিয়েছে।

পপলারের জঙ্গল আর ঝাউবনের প্রান্তর পেরিয়ে মারাল-বাশি নামে ছোট্ট এক শহরে উঠলাম গিয়ে।

যেখানেই থেমেছি পথে, রাজার সম্মান পেয়েছি। আমাদের উপস্থিত গন্তব্য তাকলা-মাকান মরুর বহু গল্প কানে এসেছে। তাকলা-মাকান প্রাচীন শহর। গোটাটাই বর্তমানে বালির তলায়। এই মরু প্রদেশের ঠিক মধ্যিখানে নাকি এর অবস্থান। বলা হয়, তার নজর মিনার, ঘরবাড়ি, দেওয়াল-পাঁচিলের ধ্বংসাবশেষে আজও নাকি সোনার বাট, রুপোর পিণ্ড খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু কোনও কাফেলা গিয়ে যখন উটের পিঠে সোনাদানা বোঝা চাপায়, তক্ষুনি গাড়োয়ানেরা নাকি বশীভূত হয়ে পড়ে কীসের। গোল করে হাঁটতেই থাকে যতক্ষণ না মূর্ছিত হয়ে পড়ছে। নিজেরা পরিষ্কার দেখছে যে সোজা পথেই হেঁটে চলেছে, আদতে কিন্তু গোল হয়ে চক্কর কাটছে অবিরাম। এক উপায় সোনাদানা তক্ষুনি যদি ছুড়ে ফেলা যায়। তবেই মুক্তি মেলে এই আপদের হাত থেকে।

একবার এক লোক নাকি একাই চলে গিয়েছিল সেই মরুতে। যা পারে সোনাদানা নিয়ে রওনা হবে, এমনি সময় অগুনতি বুনো বেড়াল এসে ঘিরে ধরল কোত্থেকে। সোনাদানা ফেলে দিতেই তক্ষুনি আবার অদৃশ্য হয়ে গেল তারা। একটাকেও দেখা যায়নি আর।

এক বৃদ্ধ আমাকে বললেন, সেই মরুতে কেউ হারিয়ে গেলে নাকি নিজের নাম ধরে ডাকার আওয়াজ পায়। অমনি ভূতগ্রস্তের মতো সেই ডাকের দিকে চলতে শুরু করে। ক্রমে মরুর আরও গভীরে চলে যায় সে। গলা শুকিয়ে এসে মরে যায় একসময়।

ঠিক এমন ঘটনাই সাড়ে ছ’শো বছর আগে মার্কো পোলোও বর্ণনা করে গিয়েছেন। তখন লোপ মরুর ধার ধরে যাচ্ছিলেন তিনি। জায়গাটা আরও পুবে। তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণবৃত্তান্তে তিনি লিখেছিলেন:

বড়ো বিচিত্র ঘটনা ঘটে এই মরুতে। রাতে পথিকেরা যখন মরু পার হয়, অমনি দলছুট হয়ে কেউ না কেউ পিছিয়ে পড়ে। হয়তো ঘুমিয়ে পড়ে বালিতেই বা অন্য কিছু কারণ হবে। তারপর যখন সে আবার দলকে ধরবার চেষ্টা করে, অমনি প্রেতাত্মাদের কণ্ঠস্বর চারদিক থেকে ঘিরে ধরে তাকে। তার বিশ্বাস জন্মে, দল-সঙ্গীরাই কথা বলছে। পেরেতেরা কখনও তার নাম ধরে ডাকাডাকি করে, ফলে বেপথু হয়ে ওই লোকটা আর দলে ফিরে যেতে পারে না। বহু লোক মরুতে হারিয়ে গেছে এইভাবে। রাত তো রাত, দিনের বেলাতেও সেই প্রেতেদের কণ্ঠস্বর শোনা যায় অনেক সময়। কখনও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ কানে আসে, বিশেষত ঢোলের।

ভয়ংকর সেই সুবিশাল তাকলা-মাকানের পথেই চলেছি আমরা। যত দিন যাচ্ছে, তার গভীরে যাবার উত্তেজনা তীব্রতর হচ্ছে। ততই তার অমোঘ টানে প্রলুব্ধ হয়ে উঠছি। যতগুলো গ্রাম পড়েছে পথে, যেখানে যেখানে বিশ্রাম নিয়েছি, গ্রামবাসীদের কাছে এই মরুর রহস্যের খোঁজ নিয়েছি। কোনও শিশুও অতটা আগ্রহ নিয়ে রূপকথার গল্প শোনে না, যতটা উদগ্রীব হয়ে চাষাদের মুখে এইসব অন্ধবিশ্বাসের গালগল্প শুনেছি আমি। বনের পথে চলেছি। সেখান থেকেই ফাঁকে-ফোকরে হলদে বালিয়াড়ির শিরাগুলো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো লাগছে দূর থেকে। যে-কোনো মূল্যে সেগুলোর মধ্যে গিয়ে দাঁড়াতেই হবে আমাকে।

কাশগর-দরিয়া ছেড়ে ততক্ষণে দক্ষিণ-পূর্বে রওনা হয়েছি আমরা। এখানকার প্রধান নদী ইয়ারখন্দ-দরিয়ার পাড় ধরে চলেছি। পথ কখনও মাঠ চিরে এগিয়েছে, কখনো-বা ঘন খাগড়া বনের ভেতর দিয়ে। সেখানে বুনো শুয়োরের রাজত্ব। তারপরই আবার বুনো পথ।

১৯ মার্চ তারিখে মেরকেত গাঁয়ে এসে নদীর ডান পাড়ের কাছে তাঁবু ফেললাম। কিছুদিনের জন্যে এ-ই ছিল আমাদের হেড-কোয়ার্টার।

আমি জায়গাটা খানিক ঘুরে দেখতে দেখতে ইসলাম বাই আমাদের পরবর্তী অভিযানের দরকারি জিনিসপত্র কিনে ফেলল সব। তবে উপযুক্ত উট জোগাড় করাই ছিল কষ্টের। সে-কাজেই বেরিয়েছে ইসলাম বাই। এদিকে অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে উঠছি আমি। সর্দার ছাড়া কাফেলা রওনা হবে কী করে? এক সপ্তাহ গেল, দুই সপ্তাহ গেল, তৃতীয় সপ্তাহও পেরোতে চলল। এদিকে মরু-পারে বসন্ত চলে এল। দিন-কে-দিন গরম বাড়ছে, মরুযাত্রা আরও বেশি কষ্টসাধ্য হয়ে উঠবে এইবারে।

এই উৎকণ্ঠাটুকু ছাড়া আর কোনও অসুবিধে আমার নেই এখানে। গ্রামপ্রধান তোগদা খোজা বেগের বাড়িতে দারুণ আরামে রয়েছি। বিচার-আচারের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া আছে লোকটার হাতে। ফলে তার কাছারিতে আমিও রোজ বসছি গিয়ে। একদিন এক ব্যভিচারিণীকে ধরে আনা হল কাছারিতে। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হল সে। দুই হাত পিছমোড়া করে বেঁধে, মুখে কালি মাখিয়ে, গাধার পিঠে উলটোমুখে বসিয়ে বাজার ঘোরানো হল তাকে।

আর একদিন এক মেয়েকে জেরা করল সে। শক্ত মার খেয়েছে সে স্বামীর হাতে। তার অভিযোগ, ক্ষুর হাতে নাকি তাড়া করেছে স্বামী। যথারীতি স্বামী অস্বীকার করল। তখন গোড়ালিতে দড়ি বেঁধে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হল তাকে। তারপর দোষ স্বীকার করতেই পিঠে পড়ল চাবুক। রেহাই পেয়েই সেও পালটা অভিযোগ করল, মেয়েটিও নাকি মেরেছে তাকে। সেও মিথ্যে প্রমাণিত হলে চাবকানো হল ফের।

নবীর ধর্ম অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় এখানে। রমজানের সময় আসামিদেরও সূর্য ওঠার আগেই খাওয়াদাওয়া সারিয়ে, কালো রঙ মাখিয়ে, দড়ি বেঁধে বাজারে ঘোরানো হয় লোকজনের ধিক্কার কুড়নোর জন্যে।

ক’দিন ধরেই গলা ব্যথায় ভুগছিলাম আমি। তোগদা খোজা এসে বলে, গাঁয়ে কারা আছে নাকি ভূতের রাজার বর পেয়েছে (পেরি-বকশি)। তারাই ভালো করে দেবে আমাকে। “সানন্দে!” আমিও অনুমতি দিলাম। যে পেরেত আমার শরীরে বাসা বেঁধেছে, তাকে ওরা কীভাবে তাড়ায়, তা চাক্ষুষ করবার লোভ সামলাতে পারলাম না। লম্বা দেড়েল তিন মূর্তিমান ঘরে এসে ঢুকল আমার। বসল গিয়ে মেঝেতে। তারপর আঙুল, মুঠো আর তালু দিয়ে সামনে রাখা তিনটে ঢোলক বাজাতে লাগল অনবরত। ঢোলকের ছানি এমন টেনে বাঁধা, বাছুরের চামড়া তো নয়, যেন কোন ধাতুর পাত। সর্বশক্তি দিয়ে এক তালে ওঝারা বোল তুলেছে ততক্ষণে। মনে হচ্ছে যেন একটাই ঢোলক বাজছে। বাজনার গমক বাড়তে বাড়তে শেষে কানা তালা পড়ে যাওয়ার জোগাড়। বোল চড়ছে, কিন্তু তাল কাটছে না। বাজাতে বাজাতে এইবারে উঠে দাঁড়াল তারা। শুরু হল উদ্দাম নৃত্য। কখনও ঢোলক ছুড়ে দিচ্ছে হাওয়ায়, আবার লুফেও নিচ্ছে অনায়াসে। হাতের আঙুল গিয়ে লাগছে ঠিক ছানিতেই। বাজানোয় খামতি নেই। টানা একটি ঘণ্টা চলল এমন। তারপর ক্ষান্ত দিল। ভূত তাড়ানো শেষ হওয়ার পর সত্যিই দেখি খানিকটা ভালো বোধ করছি এইবারে। তবে বাকি গোটা দিন আধ-কালা হয়েই থাকতে হল আমাকে।

ইসলাম বাই ফিরে এল এপ্রিলের ৮ তারিখে। সঙ্গে এনেছে চারটে লোহার জলের ট্যাংক আর ছ’টা ছাগলের চামড়ার থলে। মরুতে উটেদের দেখভালের জন্যে তিলের তেলও এনেছে। সঙ্গে যাবতীয় রসদ— ময়দা, মধু, শুকনো শাকসবজি, ম্যাকারনি ইত্যাদি। কাফেলার জন্যে কোদাল, রান্নার বাসনকোসন—আরও কত কী। তবে কাজের কাজ করেছে দুর্দান্ত আটটা উট এনে। মাথাপিছু দাম পড়েছে পঁয়ত্রিশ ডলার। সবক’টাই মদ্দা আর জাতে ব্যাক্ট্রিয়ান, জোড়া কুঁদ পিঠে। স্থানীয় ভাষা জাগাতাই তুর্কিতে নামকরণও হয়ে গেল এক-একটার—ধলা, বোঘরা (দৌড়বাজ), এক-কুঁদে, বুড়ো, বড়ো কালু, ছোটো কালু, বড়ো হরিণ, ছোটো হরিণ।

তিনটে উটের গলায় ব্রোঞ্জের বড়ো বড়ো ঘণ্টা বাঁধা ছিল। তোগদা খোজার কাছারিতে নিয়ে যাওয়ার সময় বাজতে লাগল ঠুং ঠাং শব্দে। ওদিকে ইয়োলদশ ব্যাটা জীবনে উট দেখেনি। কর্কশ গলায় উন্মাদের মতো কী ঘেউ ঘেউ তার!

ইসলাম বাই বাদেও আরও তিনজন নতুন লোক নিলাম এইবারে মরুর গভীরে সঙ্গে যাওয়ার জন্যে। একজন মহম্মদ শাহ্‌, বৃদ্ধ উট চালক, পাকা দাড়ি। তার স্ত্রী-পুত্র থাকে ইয়ারখন্দে। অন্যজন কাসিম। তার দাড়ি কালো। বলিষ্ঠ এবং দায়িত্ববান লোক। আর শেষের জন মেরকেতে থাকে। তার নামও কাসিম। তাকে অবশ্য ইয়োলচি (গাইড) বলেই ডাকি আমরা। এই মরুকে হাতের তালুর মতোই নাকি চেনে সে। অনায়াসে পথ খুঁজে বের করতে পারে। শেষ মুহূর্তে আমাদের লটবহর বেড়ে গেল সামান্য। তাজা রুটির দুটো থলে, তিনটে ভেড়া, দশটা মুরগি আর একটা মোরগ সঙ্গে নেওয়া হল অসীম বালুকাভূমিতে আমাদের ক্যাম্পকে সরব রাখার উদ্দেশ্যে। লোহার ট্যাংক আর ভিস্তিগুলোতে ৪৫৫ লিটার জল ভরে নেওয়া হল। দিন পঁচিশ চলে যাবে আমাদের।

সুবিশাল মরুর যে অংশে আমরা রওনা হতে চলেছি, জায়গাটা ত্রিকোণাকৃতি। পশ্চিমে ইয়ারখন্দ-দরিয়া, পুবে খোতান-দরিয়া (ইয়ারখন্দেরই উপনদী) আর দক্ষিণে কুন-লুন পর্বতমালা। মোটামুটি পশ্চিম থেকে পুবে আমাদের যাত্রাপথ। আর যেহেতু খোতান-দরিয়া বইছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে, আগে হোক বা পরে সে-নদী আমাদের পেরোতেই হবে। অবশ্য তার আগেই তেষ্টায় যদি না মারা পড়ে গিয়ে থাকি। দশ বছর আগে, অর্থাৎ ১৮৮৫ সালে কেরি এবং ডালগ্লিশ নামে দুই ইংরেজ এবং প্রজভালস্কি নামে এক রুশ এই খোতান-দরিয়ার উপত্যকা হয়ে গিয়েছিলেন। তাই সে-নদীর ঠিকানা আমার জানা। এর পশ্চিম তীরে মাসার-তাগ নামে খুব ছোট্ট এক পর্বতমালা দেখতে পান তাঁরা। যার অর্থ, সাধকের সমাধি পাহাড়। কাশগর-দরিয়া আর ইয়ারখন্দ-দরিয়ার কোণে আর একটি ছোট্ট পর্বতমালা আমি পেয়েছিলাম মেরকেত যাওয়ার পথে। এর নামও মাসার-তাগ। বুঝলাম যে একই রেঞ্জ থেকে দু-দিকে ডানা মেলেছে দুই পাহাড়শ্রেণি। গোটা মরুভূমিতেই উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বে তার বিস্তৃতি। তাই যদি হয়, তবে তার পাদদেশে আমাদের বালি নয়, মাটি খুঁজে পাওয়ার কথা। সম্ভবত অতীত সহস্রাব্দের সভ্যতার চিহ্নও পাওয়া যাবে কিছু। মেরকেত থেকে খোতান-দরিয়ার দূরত্ব ১৭৫ মাইল। তবে নদীর অসংখ্য বাঁক পেরোতে পেরোতে সে-দূরত্ব আরও বেড়ে যাবে আমাদের। আশা আছে, একমাসের কম সময়ে এই মরুভূমি পেরিয়ে যাব আমরা। আর যথাশীঘ্র এই গরমকালের মধ্যেই উত্তর তিব্বতের শীতল পাহাড়ে উঠে যেতে পারব। সে কারণেই পশমি কোট, কম্বল এবং শীতের পোশাক সঙ্গে নিয়েছি আমরা। ছোটোখাটো এক অস্ত্রাগারও চলেছে সঙ্গে। তাতে তিনটে রাইফেল, ছ’টা রিভলভার আর দুটো ভারী অ্যালুমিনিয়ামের বাক্স রয়েছে। আমার ব্যক্তিগত তিনটে ক্যামেরা, সঙ্গে একরাশ কাচের আর সেলুলয়েডের প্লেট। জ্যোতির্বিদ্যা ও আবহাওয়া সংক্রান্ত সাধারণ কিছু যন্ত্রপাতিও রয়েছে। আর আছে সঙ্গে ক’টা বই আর একটা বাইবেল।

১০ এপ্রিল আমাদের আটটা উট চালক-সহ মেরকেত ছেড়ে রওনা দিল। মস্ত সব বোঝা উটেদের পিঠে। গলায় বাঁধা ব্রোঞ্জের ঘণ্টাগুলো এমন গুরুগম্ভীর শব্দে বেজে যাচ্ছে, যেন কোন অন্ত্যেষ্টি যাত্রা। চারদিকে বাড়িঘরের ছাদে আর পথে লোকেরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে। চোখ-মুখ থমথমে। কানে এল এক বৃদ্ধ উক্তি করল, “একটা মানুষও আর ফিরে আসবে না কেউ।” সঙ্গে কে আবার তাল দিল, “উটগুলোর পিঠে কেমন বোঝা চাপিয়েছে দেখলে!” দুই হিন্দু পোদ্দার (টাকা ভাঙানির ব্যাবসা করে যারা) আমার মাথার ওপর ক’টা তামার মুদ্রা ছুড়ে দিয়ে বলল, “যাত্রা শুভ হোক।” শ-খানেক লোক পশুর পিঠে চড়ে খানিকটা পথ এগিয়ে দিয়ে গেল আমাদের।

উটেরা চলেছে দুই ভাগে। প্রথম ভাগে কাসিম আর দ্বিতীয় ভাগে মহম্মদ শাহের নেতৃত্বে। আমি আছি বোঘরার পিঠে, দ্বিতীয় ভাগের প্রথম উটে। ফলে ওপর থেকে অপূর্ব এক সমতলভূমি দেখতে পাচ্ছি চোখে।

উটেরা আগেই খেয়েদেয়ে আর বিশ্রাম নিয়ে চাঙ্গা হয়ে ছিল। ফলে শুরুতে বেশ বেগেই এগোচ্ছিল তারা। চলতে চলতে একসময় প্রথমে কমবয়সি জোড়াটা, শেষে আরও এক জোড়া ভেঙে গিয়ে ঘাসজমিতে লাফিয়ে চলতে শুরু করল। ফলে পিঠের বোঝা সটান মাটিতে। অস্ত্রের এক বাক্স এক উটের পাঁজরের পাশে বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে। অবাধ্য উটেদের গুটিয়ে আনবার পর এইবারে সবক’টা আলাদাভাবে একজন করে নিয়ে চলল এইবারে।

ঘাসজমি আর বালিয়াড়ির মাঝামাঝি এক গিরিখাতে প্রথম তাঁবু ফেললাম আমরা। পশুদের খুলে দেওয়া হল। আগুন জ্বেলে রাতের রান্না বসল। ভেড়ার মাংস আর ভাতের পুডিং। দলের লোকেরা যা খেল, আমিও তাই। আমার তাঁবুতে ফরাস পাতা হল একটা, একটা ক্যাম্প খাট এবং দুটো বাক্সতে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র আর যন্ত্রপাতি। মেরকেত থেকে ক’জন লোক এসেছিল সঙ্গে, ফেরত গেল এইবারে।

উঁচু উঁচু সব বালিয়াড়ির পথে চলেছি পরদিন। দুটো উট পা পিছলে পড়ল। মালপত্র গুছিয়ে ফের চাপাতে হল পিঠে। তবে অচিরেই তারা এই নরম, ঢেউখেলানো বালিভূমির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে নির্বিঘ্নে চলতে শিখে গেল। ক’দিনের জমা গভীর বালি এড়িয়ে তার পাড় ধরে উত্তর-পূর্বে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হল। প্রত্যেকটা ক্যাম্পে একটা করে কুয়ো খুঁড়েছি আমরা। তিন থেকে পাঁচ ফুট নীচেই জল পাওয়া যাচ্ছিল। স্বাদে নোনতা, কিন্তু উটেদের অসুবিধে নেই। ফলে অধিকাংশ জলের ট্যাংকই খালি হয়ে গেল। আমার রওনা হওয়ার সময় ভরে নেওয়া হচ্ছিল আবার।

১৪ এপ্রিল তারিখে কুকুর দুটো কোথায় চলে গেল কে জানে। ফিরে এল যখন, দেখা গেল দুটোরই পেটের দিকটা ভেজা। নিশ্চয়ই কোনও মিষ্টি জলের সন্ধান পেয়েছে তারা। খুঁজেপেতে এক জলাশয়ের পাড়ে সে-রাতে তাঁবু ফেললাম আমরা।

সেখানে ইতিউতি পপলারের সারি। নিষ্ফলা জমি আর মরুভূমির মাঝে বিশাল এক খাগড়ার জমি। পনেরো থেকে ষোলো মাইল পথ অতিক্রম করে চলেছি এক-একদিনে। খাগড়ার ঘন বনে উটেরা পথ ঠেলে হেঁটে চলেছে। খসখস শব্দ ওঠে তাতে।

১৭ এপ্রিল উত্তর-পূর্বে ক’টা পাহাড়ের দেখা মিলল এক ঝলক। উত্তুরে মাসার-তাগ। মরুর এতটা ভেতরেও এর বিস্তৃতি, এ আমাদের ধারণায় ছিল না। দলের কেউই এই দৃশ্য আগে দেখেনি আর।

পরদিন অপ্রত্যাশিতভাবেই মিষ্টি জলের এক জলাশয়ে পৌঁছলাম এসে। তার পাড় ধরে পুবে এগিয়ে চলেছি। সত্যিকারের আদিম এক অরণ্যে গিয়ে ঢুকলাম তারপর। এত গহিন যে বার বার পিছিয়ে আসতে হচ্ছে আমাদের, নতুবা চক্কর কেটে চলেছি একই জায়গায়। ফলে কুড়ুল না চালিয়ে এগোনো যাচ্ছিল না আর। ঝুলন্ত গাছের ডালে আঘাত না পেয়ে বসি, তাই নেমে গেলাম বোঘরার পিঠ থেকে।

১৯ তারিখে আর একটা জলাশয়ের পাড়ে গোটাকতক ঘন পাতার পপলারের নীচে ক্যাম্প করলাম আমরা। দুটো দিন এখানেই বিশ্রাম নেওয়া হল। তারপর আবার যখন ঊষর মরুতে পড়লাম গিয়ে, মন বড়ো উচাটন হল ফেলে আসা জায়গাটার জন্যে। পৃথিবীতেই একটুকরো স্বর্গ হাতে পেয়েছিলাম যেন।

দূরের পাহাড়টায় একটা বেগুনি আভা। সাধারণ জলাশয়টা তখন আমাদের চোখে সমুদ্রের চেয়ে কম কিছু নয়। তার চারধারে শ্যামল সবুজ পপলারের সারি। তাকে ঘিরে নলখাগড়ার বন আর তারপর হলদে বালির রাশি।

একটা ভেড়া জবাই করা হয়েছিল আগেই। দ্বিতীয়টা এইবারে কাটা হল। আর তিন নম্বরটা সঙ্গে রইল।

২১ এপ্রিল দুই আলাদা পাহাড়ের মাঝবরাবর পথে চলেছি আমরা। লম্বা এক জলাশয়ের পশ্চিম পাড় ধরে। তার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে গিয়ে পুব পাড়ে ক্যাম্প করলাম আমরা। দক্ষিণ-পূর্বে কোনও পাহাড় দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না আর। আমাদের ক্যাম্পটা উপস্থিত এক শৈলশিরার দক্ষিণপ্রান্তে রয়েছে, জায়গাটা দেখতে অনেকটা কোনও সমুদ্র উপকূলের এক্কেবারে বাইরের অন্তরীপের মতো।

২২ এপ্রিল গোটা দিনটা বিশ্রাম নেবার সিদ্ধান্ত হল। এই ফাঁকে গিয়ে পাহাড়টায় উঠলাম আমি। পূর্ব, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ধু ধু হলদে বালি ছাড়া কিছুই নজরে আসছে না আর। এক বালি সমুদ্র যেন হাঁ করে আছে আমাদের চোখের সামনে।

সন্ধে হতে হতে এক জলাশয়ের পাড় ঘেঁষে তাঁবু পড়ে গিয়েছে। সঙ্গে আসা সমস্ত জীবজন্তু আর দলের লোকেরা পেট ভরে জল খেল এইবারে। পাড়ে পাড়ে নলখাগড়ার বন। ফলে উটেদের ফুর্তি দেখে কে। একমাত্র ভেড়াটাও দেখি তুরতুর করে চরতে লেগেছে তাতে। অবোলা প্রাণীগুলোও হয়তো রাতে এই ক্যাম্পটিরই স্বপ্ন দেখে তারপর থেকে। ওদিকে ইয়োলচি, মানে আমাদের গাইড-ব্যাটার কী হয়েছে কে জানে, দলের সবার প্রতিই সে যেন অসন্তুষ্ট। আলাদাই থাকে বেশিরভাগ সময়। এক শুধু রাতে সবাই ঘুমোতে গেলে চুপিচুপি হামাগুড়ি দিয়ে এসে ক্যাম্পের আগুনটা উসকে দিয়ে যায়। সে বলে উঠল, পুবে এগিয়ে আর মাত্র চারদিনের পথ খোতান-দরিয়া। অতএব অত জল সঙ্গে না নিলেও চলবে, কেননা পথেও জলের সন্ধান পাওয়া যাবে অনেক। কিন্তু আমি জোর করলাম গোটা দশদিনের মতো জল সঙ্গে নিতে। দূরত্ব যদি আরও বেশি হয়, তখন! ট্যাংকগুলো অর্ধেক ভরতি থাকলেও মরুর ভেতরে উটেদের জল খাওয়ানো যাবে দু-বেলা। কাঠের খাঁচার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখা হল জলের ট্যাংকগুলো। সরাসরি সূর্যের তাপ থেকে বাঁচাতে মুড়েও দেওয়া হল খাগড়ার আঁটি দিয়ে। ট্যাংকে ট্যাংকে জল ভরার মিষ্টি আওয়াজ শুনতে শুনতে এই শেষ জলাশয়ের পাড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি।

(ক্রমশ)

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply