FUNবিজ্ঞান- মহাবিশ্বে মহাকাশে-টাইটান-কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়-বর্ষা ’২৬

আমাদের সৌরজগত অসংখ্য বিস্ময়ে ভরা। এই বিস্ময়লোকের মধ্যে শনি গ্রহ তার বলয়ময় সৌন্দর্যের জন্য যেমন বিখ্যাত, তেমনি তার উপগ্রহগুলোর মধ্যেও লুকিয়ে আছে চমকপ্রদ রহস্য। গ্রহটির উপগ্রহগুলোর মধ্যে টাইটান (Titan) একেবারেই ব্যতিক্রমী ও অনন্য। বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ ও সম্ভাবনার দিক থেকে এই উপগ্রহটি বিজ্ঞানীদের গভীর কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। টাইটানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিকটি হল, এর সঙ্গে পৃথিবীর অদ্ভুত সাদৃশ্য। অনেক বিজ্ঞানী একে ‘আদিম পৃথিবী’ বা ’হিমায়িত পৃথিবী’ বলে অভিহিত করেন। তাঁদের ধারণা, কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী যখন প্রাণধারণের উপযোগী হয়ে উঠছিল, তখন আমাদের গ্রহের বায়ুমণ্ডল অনেকটা টাইটানের বর্তমান অবস্থার মতোই ছিল। এটিই একমাত্র পরিচিত উপগ্রহ, যার একটি ঘন বায়ুমণ্ডল আছে যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের চেয়ে অনেক বেশি ঘন। পৃথিবীর বাইরে টাইটানই একমাত্র মহাজাগতিক বস্তু, যার পৃষ্ঠতলে তরল পদার্থের স্থিতিশীল অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও সেখানে জলের পরিবর্তে প্রবাহিত হয় তরল মিথেন ও ইথেন; তবুও এর মেঘ, বৃষ্টি এবং ঋতুচক্রের প্রক্রিয়াটি পৃথিবীর আবহাওয়া মণ্ডলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

টাইটান শনির সাতটি মহাকর্ষীয়ভাবে গোলাকার (gravitationally rounded) উপগ্রহের মধ্যে অন্যতম এবং দূরত্বের দিক থেকে এদের মধ্যে দ্বিতীয়। ব্যাসের দিক থেকে এই উপগ্রহটি পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে ৪৮.১৬% বড়ো এবং ভরের দিক থেকে ৮০% বেশি। এটি বৃহস্পতির গ্যানিমেডের পর সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাঁদ এবং আকারে বুধ গ্রহের চেয়েও বড়ো। বুধ গ্রহের ব্যাস ৪,৮৭৯ কিলোমিটার আর টাইটানের ব্যাস ৫,১৫০ কিলোমিটার। তবে বুধের ভরের মাত্র ৪০% হল টাইটান। কারণ, বুধ প্রধানত লোহা ও শিলা দিয়ে গঠিত, যেখানে টাইটানের বেশিরভাগ অংশ বরফ দিয়ে গঠিত যা তুলনামূলক কম ঘন। গতির দিক দিয়ে টাইটান আমাদের চাঁদের চেয়ে অনেকটাই দ্রুতগামী। উপগ্রহটি শনি থেকে ১২,২১,৯০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে।

ওলন্দাজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস ১৬৫৫ সালে টাইটান আবিষ্কার করেন। এটি ছিল শনির আবিষ্কৃত প্রথম উপগ্রহ। এর আগে পৃথিবীর মানুষ পাঁচটি উপগ্রহের সঙ্গে পরিচিত ছিল। এই উপগ্রহগুলো ছিল পৃথিবীর চাঁদ এবং বৃহস্পতির চারটি গ্যালিলীয় উপগ্রহ। গ্রিক পুরাণে টাইটানরা ছিলেন দৈত্যের বংশ। ইউরেনাস ও গাইয়ার পুত্র এরা। হাইগেনস তাঁর এই আবিষ্কারের নাম দিয়েছিলেন ‘সাটুর্নি লুনা’ (Saturni Luna)। এটি ল্যাটিন ভাষা। এর অর্থ হল ‘শনির চাঁদ’। ১৬৭৩ থেকে ১৬৮৬ সালের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিওভান্নি ডোমেনিকো ক্যাসিনি শনির আরও চারটি চাঁদ আবিষ্কার করেন। এরপর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা টাইটান ও অন্য চাঁদগুলোকে ‘শনি ১’ থেকে ‘শনি ৫’ (Saturn I-V) নামে ডাকতে শুরু করেন। সেই সময় টাইটানের অবস্থান ছিল চতুর্থ স্থানে। পরবর্তীকালে আরও উপগ্রহ আবিষ্কারের পর বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (IAU) আনুষ্ঠানিকভাবে টাইটানকে ‘শনি ৬’ (Saturn VI) হিসেবে সংখ্যায়িত করেছে।

টাইটানে একটি ঘন বায়ুমণ্ডল আছে। ভয়েজার মহাকাশযান এর বায়ুমণ্ডলের বর্ণালি বিশ্লেষণ করে যে তথ্য পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের কাছে পাঠিয়েছে, তা থেকে জানা গেছে যে উপগ্রহটির বায়ুমণ্ডলে (৯০-৯৫)% নাইট্রোজেন রয়েছে যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত নাইট্রোজেনের পরিমাণের প্রায় সমান। এছাড়াও সেখানকার বায়ুমণ্ডলে আছে মিথেন, ইথেন, হাইড্রোজেন, কার্বন মনোক্সাইড, অ্যাসিটিলিন, আর্গন, হাইড্রোজেন সায়ানাইড এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড। এখানে হাইড্রোকার্বন মেঘ এবং ঘন অর্গানোনাইট্রোজেন কুয়াশা তৈরি হয়। এখানে বাতাস প্রবাহিত হয়, আকাশে ভেসে বেড়ায় মিথেন-নাইট্রোজেন মেঘ। সেই মেঘ থেকে তরল ইথেনের বৃষ্টিধারা নেমে আসে উপগ্রহটির পৃষ্ঠে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে নদী, হ্রদ ও সাগর। যেগুলি তরল ইথেন-মিথেন দ্বারা পরিপূর্ণ। এখানকার আবহাওয়া পৃথিবীর মতোই ঋতুভিত্তিক নিয়ন্ত্রিত। শক্তিশালী নাইট্রোজেন বায়ুমণ্ডলের কারণে টাইটানের মিথেন চক্রটি অনেকটা পৃথিবীর জলচক্রের মতো কাজ করে, যদিও এর তাপমাত্রা অনেক কম— প্রায় ৯৪ কেলভিন (-১৭৯° সেলসিয়াস)-এর মতো। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে টাইটানকে অনেক সময় সৌরজগতের সবচেয়ে ‘পৃথিবী-সদৃশ’ মহাজাগতিক বস্তু বলা হয়।

সূর্য থেকে আসা শক্তির প্রভাবে টাইটানের বায়ুমণ্ডলের সমস্ত মিথেন মাত্র ৫ কোটি বছরের মধ্যে জটিল হাইড্রোকার্বনে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার কথা। তাহলে উপগ্রহটিতে এখনও এত মিথেন রয়ে গেল কীভাবে? বিজ্ঞানীদের অনুমান, টাইটানের অভ্যন্তর থেকে ক্রায়োভলকানো অর্থাৎ বরফ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে এই মিথেন নির্গত হয়ে জমা হচ্ছে। ২০১৩ সালে নাসা জানায় যে, টাইটানের বায়ুমণ্ডলে ‘থোলিন’ (tholin) নামক এক জটিল জৈব রাসায়নিক তৈরি হয়। ওই একই বছরে বিজ্ঞানীরা টাইটানের ওপরের বায়ুমণ্ডলে ‘পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন’ (PAHs) শনাক্ত করেন। এছাড়াও ওই বছরেই, ৩০ সেপ্টেম্বর, ক্যাসিনি মহাকাশযান টাইটানের বায়ুমণ্ডলে ‘প্রোপিন’ (propene) শনাক্ত করে।

টাইটান মূলত বরফ এবং পাথুরে উপাদানে গঠিত। কেন্দ্রের এই পাথুরে উপাদানের ব্যাস ৩,৪০০ কিলোমিটার। ধারণা করা হয়, এই পাথুরে কেন্দ্রটি (core) বরফের বিভিন্ন স্তর দিয়ে ঘেরা, যার মধ্যে ‘আইস ওয়ান-এইচ’ (ice Ih)-এর একটি ভূত্বক এবং অ্যামোনিয়া সমৃদ্ধ তরল জলের একটি ভূগর্ভস্থ স্তর রয়েছে। শুক্র গ্রহের মতো টাইটানের বায়ুমণ্ডলও ঘন ও অস্বচ্ছ। তাই পৃথিবী থেকে দূরবীনের সাহায্যে এর পৃষ্ঠতল সম্পর্কে তেমন কিছু জানা সম্ভব ছিল না। ২০০৪ সালের ‘ক্যাসিনি-হাইগেনস’ মিশনের পর এর মেরু অঞ্চলের তরল হাইড্রোকার্বন হ্রদ ও বায়ুমণ্ডলীয় ‘সুপার-রোটেশন’ (atmospheric super-rotation) কথা জানা যায়। এছাড়াও কিছু পাহাড় এবং সম্ভাব্য কয়েকটি ক্রায়োভলকানো (বরফ আগ্নেয়গিরি) খুঁজে পাওয়া গেছে।

১৯৯৪ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপে তোলা ইনফ্রারেড ছবি থেকে জানতে পারা গেছে যে টাইটানের একটি বিস্তৃত অঞ্চল যেমন উজ্জ্বল, তেমনই অন্য আর একটি অঞ্চল অন্ধকারাচ্ছন্ন। উজ্জ্বল অংশের মধ্যে রয়েছে জানাডু (Xanadu) নামের একটি বিশাল প্রতিফলনশীল নিরক্ষীয় অঞ্চল। এর আকার অস্ট্রেলিয়ার সমান। বিজ্ঞানীদের মতে, এই এলাকাটি পাহাড়, উপত্যকা এবং গিরিখাতে পরিপূর্ণ। এখানে কিছু অন্ধকার রেখা (lineaments) দেখা গেছে যে আঁকাবাঁকা শৈলশিরা বা ফাটল হতে পারে। আরও একটি সম্ভাবনা রয়েছে, এগুলি নালা বা নদী হতে পারে। বৃষ্টির পর এগুলি দিয়ে তরল মিথেন সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়। এছাড়াও এগুলি টেকটোনিক কার্যকলাপের লক্ষণ হতে পারে। সেটা হলে বলা যায় যে জানাডু ভূতাত্ত্বিকভাবে যথেষ্ট তরুণ। অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলগুলি সমুদ্র এলাকা বলে মনে করা হয়। এই সমুদ্রগুলির মধ্যে একটির নাম ‘লিগিয়া মেয়ার’ (Ligeia Mare)। এটি টাইটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম সাগর। এটি প্রায় বিশুদ্ধ তরল মিথেনে পরিপূর্ণ।

টাইটানের হ্রদ ও সমুদ্রগুলো মূলত এর মেরু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। উত্তর মেরুতে রয়েছে তিনটি বড়ো সমুদ্র। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়োটি হল, ক্রাকেন মেয়ার (Kraken Mare)। লিগিয়া মেয়ার (Ligeia Mare)-এর কথা আগেই বলেছি। এটা দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র। আর তৃতীয়টির নাম পুঙ্গা মেয়ার (Punga Mare)। এই তিনটি সমুদ্র সম্মিলিতভাবে টাইটানের মোট হ্রদ ও সমুদ্র এলাকার প্রায় ৮০% (৬,৯১,০০০ বর্গকিমি) দখল করে আছে। এই তিনটি সমুদ্রের জলস্তর প্রায় একই উচ্চতায় হওয়ায় বিজ্ঞানীদের ধারণা যে সমুদ্র তিনটির মধ্যে ভূগর্ভস্থ কোনও সংযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে চারটি বড়ো শুকনো গহ্বর রয়েছে। মনে করা হয়, একসময় এগুলি তরলে পূর্ণ ছিল, কিন্তু বর্তমানে কোনও কারণে এগুলি শুকিয়ে গেছে।

টাইটান শুধু শনি গ্রহের একটি উপগ্রহ নয়, এটি সৌরজগতের অন্যতম রহস্যময় জগৎ। ২০২৭ সালে টাইটানের উদ্দেশে নাসার (NASA) ‘ড্রাগনফ্লাই’ (Dragonfly) নামক একটি ড্রোন মিশন পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এটি ২০৩৪ সালে সেখানে পৌঁছাবে এবং উপগ্রহটির রহস্যময় পরিবেশ সম্পর্কে আরও তথ্য দেবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

এই লেখকের অন্যান্য বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ
ধ্রুবতারা ধ্রুব নয়,  মহাকাশে আমরা কোথায়, বিস্ময় ভরা ‘আদ্রা’ নক্ষত্র, সৌড়ঝড়ের আঘাতে টালমাটাল পৃথিবী, কৃষ্ণগহ্বর, পিঙ্গল বামন, সূর্য, সৌরকলঙ্ক, মহাকাশের ভূতুড়ে আলো, কোয়াসার, মহাকাশের অচেনা বস্তু-পালসার, মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ (অশ্বিনী থেকে রেবতী) – (১), মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-২, মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৩, মহাবিশ্বে মহাকাশে-আকাশগঙ্গার ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৪, মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৫,চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৬, অগস্ত্য-বাতাপি উপাখ্যান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান, মহাবিশ্ব সৃষ্টির গোড়ার কথা, মহাবিশ্বে মহাকাশে- নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য, মহাবিশ্বে মহাকাশে-নক্ষত্রের শেষ দিন, মহাবিশ্বে মহাকাশে- চাঁদের ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্বে মহাকাশে তারাজগতের সৃষ্টি রহস্য, মহাবিশ্বে মহাকাশে তারাজগতের প্রকারভেদ, মহাবিশ্বে মহাকাশে –  বিচিত্র গ্যালাক্সি, ১১-এর জালে নিল আর্মস্ট্রং, মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে-বুধ গ্রহ, মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে-শুক্র গ্রহ, মহবিশ্বে মহাকাশে-আমাদের বাসভূমি পৃথিবী, মহবিশ্বে মহাকাশে-চাঁদ, মঙ্গলগ্রহ, ফোবস, ইউরোপা, গ্যানিমিড, ক্যালিস্টো, স্যাটার্ন

জয়ঢাক প্রকাশন থেকে এই লেখকের লেখা মহাবিশ্বে মহাকাশে বইটি কিনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Leave a Reply