funবিজ্ঞান -আণবিক দানবিক (পর্ব ২)-অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়- বর্ষা ২০২৬

(দ্বিতীয় পর্ব)

১৯৩৩ সাল, বার্লিন, জার্মানি।

জার্মান ফেডারেল রিপাবলিকের পঁচাশি বছরের বৃদ্ধ প্রেসিডেন্ট ডক্টর পল ভন হিন্ডেনবার্গ দেশের শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে দিলেন। অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম দিলেন কমিয়ে। জার্মান প্রেসিডেন্টের নির্বাচন আসন্ন। নিজের পদ বজায় রাখতে আর কোনও পথ হিন্ডেনবার্গের কাছে খোলা ছিল না।

ডেমোক্র্যাটিক আর কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা হিন্ডেনবার্গের ওপর তাঁদের এতদিনের ভরসা হারালেন। এতকাল অ্যাডলফ হিটলারের বিরোধিতা করে এলেও, দেশ বাঁচাতে হিটলার যে হিন্ডেনবার্গের চাইতে বেশি উপযুক্ত, সে-ই হিটলার বিরোধী নেতারা আলোচনা করতে লাগলেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের বিরুদ্ধে ভোট দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে হিটলারকে পরোক্ষভাবে সাহায্য করলেন, যদিও নাৎসি বিরোধিতা ছিল পার্টির অন্যতম লক্ষ্য।

প্রথম দফার নির্বাচনে হিন্ডেনবার্গ সবচাইতে বেশি ভোট পেলেন, হিটলার দ্বিতীয় স্থানে। ভোট ভাগ হয়ে গেল অন্যান্য পার্টির পক্ষে, কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না কেউ। সংবিধান অনুযায়ী, দ্বিতীয়বার নির্বাচন আয়োজন হয়ে গেল বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয় নির্বাচনে হিটলার বাহিনী প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়ল আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে। ইহুদি আর কমিউনিস্টরা যে জার্মানির আসল শত্রু, আর এদের জন্যই যে জার্মানির অর্থনীতি তলিয়ে যাচ্ছে, নির্বাচনী প্রচারে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে তা-ই প্রচারিত হতে লাগল।

ভোট বেশি পেয়েও দ্বিতীয়বার নির্বাচনী ফলাফল হিটলারকে আবার দ্বিতীয় স্থানাধিকারী করে দেওয়ায় হিটলারের মানসিক হতাশা চরমে উঠল। তিনি নানা ফন্দিফিকির খুঁজতে লাগলেন পার্লামেন্ট বা রাইকস্টাগ দখল করার। চলতে লাগল চক্রান্ত। নাৎসি পার্টি হিটলারকে চ্যান্সেলর পদে বসাতে চেয়েও অসমর্থ হল। রাইকস্টাগে বহুমত পেয়ে কোনও পার্টির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না আসায় পরিস্থিতি সামলাতে বছরের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ ফ্রাঞ্জ ভন পাপেনকে চ্যান্সেলর পদ থেকে সরিয়ে কার্ট ভন স্লাইকারকে সেই পদে বসিয়ে দিলেন। তাতেও অবস্থার পরিবর্তন হল না। হিন্ডেনবার্গের অজান্তে হিটলার গোপনে ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত চালাতে লাগলেন।

কার্ট ভন স্লাইকার ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারি জেনারেল। কারা যেন রটিয়ে দিল, তাঁরই নেতৃত্বে এবার সামরিক অভ্যুত্থান হবে জার্মানিতে এবং রাইকস্টাগ ভেঙে দেওয়া হবে। অপরদিকে স্লাইকার হিটলারের ক্ষমতা হ্রাস করার চেষ্টা করতে থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হল ষড়যন্ত্র। শারীরিক কারণ দেখিয়ে জানুয়ারির ৩০ তারিখে স্লাইকার পদত্যাগ করলেন চ্যান্সেলর পদ থেকে। জার্মানির প্রজাতান্ত্রিক ওয়েমার রিপাবলিকের পতন হল। হিটলার এই দিনটারই অপেক্ষায় ছিলেন।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ হিটলারকে চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ করে ভন পাপেনকে হিটলারের সহযোগিতায় সরকার গঠন করতে বললেন। সেই রাতেই আত্মগর্বে দৃপ্ত হিটলার এক গোপন ক্যাবিনেট মিটিং করলেন।

ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখে বার্লিনের এক অভিজাত ক্লাবে হিটলার তাঁর প্রচার সচিব গোয়েবলস আর ডেপুটি চ্যান্সেলর পাপেনের সঙ্গে ডিনারে বসেছেন। সঙ্গ দিচ্ছে নাৎসি পার্টির উচ্চশ্রেণির নেতারা। সুদৃশ্য সোফায় হেলান দিয়ে চলছে খানাপিনা। ক্লাসিক্যাল জার্মান সংগীতের মৃদু সুর ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরে। সুরের মূর্ছনায় ডুবে গিয়ে হিটলার পানপাত্রে চুমুক দিয়ে পায়ে তাল দিচ্ছেন। হঠাৎ কর্কশ শব্দে টেলিফোন বেজে উঠল। যে টেলিফোন তুলল, সে প্রথমে অপর প্রান্তের কথা প্রথমে নেশার ঝোঁকে বুঝতে না পেরে হাঁ আর হুঁ করে ফোন রেখে দিল। তারপর ব্যাপারটা বুঝে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল বিভ্রান্তের মতো, “হের হিটলার! সর্বনাশ হয়ে গেছে। রাইকস্টাগ বিল্ডিংয়ে আগুন লেগেছে!”

ঘরে উপস্থিত মানুষদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তে। শোরগোল উঠল। কেউ চিৎকার করে গাড়ি বার করতে হুকুম দিল। কেউ ছুটে গেল জানালার দিকে।

রাইকস্টাগের ঐতিহ্যময় বাড়িটা ক্লাবের ঘর থেকেও নজরে আসে। হিটলার উঠে দাঁড়ালেন। গোয়েবলসের সঙ্গে চোখাচোখি হল তাঁর। উত্তেজনা সংবরণ করে হিটলার জিজ্ঞেস করলেন, “জানালা দিয়ে কী দেখা যাচ্ছে? আগুন কি সত্যিই লেগেছে?”

পানপাত্রের ট্রে নিয়ে এতক্ষণ যে অর্ডারলি ঘুরে বেড়াচ্ছিল ডাইনিং হলের এক কোনা থেকে আর কোনায়, সে উত্তেজিত গলায় জানাল, “হের হিটলার! আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে। কী ভয়ংকর! হায় রে, আপনার চ্যান্সেলর হবার শুভ মুহূর্তে এ কী অঘটন ঘটে গেল!”

“চুপ! বাস্টার্ড! ছোটোলোক! ছোটো মুখে বড়ো কথা? যা ভিতরে, বেজম্মা কোথাকার!” হিংস্র গলায় ধমকে উঠলেন ডেপুটি চ্যান্সেলর ভন পাপেন।

“গাড়ি বার করো। রাইকস্টাগ যেতে হবে।” শান্ত গলায় উত্তর দিলেন অ্যাডলফ হিটলার।

ক্লাব খালি করে সবাই ছুটল রাইকস্টাগের দিকে।

হিটলার আর গোয়েবলস রাইকস্টাগের সামনে গাড়ি থেকে নামতেই দৌড়ে এলেন নাৎসি পার্টির এক প্রবীণ সাংসদ, হারমান গোরিং। ঘামে তাঁর শরীর ভিজে যাচ্ছে, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে। হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি হিটলারকে জানান, “কমিউনিস্ট ছাড়া আর কারও কাজ নয়… আমাদের এই অভিজাত সংসদ ভবন পোড়ানোতে তাদেরই হাত আছে। দেখুন হের হিটলার, দাউ দাউ করে জ্বলে যাচ্ছে সংসদ ভবন। হায়, কী সর্বনাশ হয়ে গেল! হায়…”

(রাইকস্টাগ বিল্ডিংয়ে আগুন)

হিটলারের চারদিকে হতবাক নাৎসি এস.এ. বাহিনীর তরুণদের দৃষ্টি থেকে গোয়েরিংকে সরিয়ে নিয়ে যান গোয়েবলস। তাঁর কানের কাছে ফিসফিস করে বলেন, “নাটকটা একটু কম করো। এখনও লোকে যদি জানতে পারে এই কাজ আমাদের পার্টির, তবে সমূহ বিপদ। এখনও সম্পূর্ণ ক্ষমতা আমাদের হাতে আসেনি। সরকারি পুলিশ আমাদের ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পারলে জেলে পুরে দিতে সময় লাগাবে না। তারপর আসন্ন নির্বাচনে নাৎসি পার্টির চিহ্ন পর্যন্ত দেখা যাবে না কোথাও। কাজটা সম্পূর্ণ হয়েছে ভালো কথা, হিটলারকে আমি বলে রেখেছি, পরের ক্যাবিনেটে তোমার মন্ত্রিত্ব পাকা। যাও, এস.এ. বাহিনীর ছেলেদের লাগাও কমিউনিস্ট নিধন করতে।”

পরদিন হিটলারের চাপে পড়ে জার্মানির প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে এক বিধিলিপি জারি করলেন— ‘জার্মান নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর, মতামত প্রকাশের অধিকারের ওপর (যার মধ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও অন্তর্ভুক্ত), সমস্ত সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ জারি করা হল। ডাক, টেলিগ্রাফ এবং টেলিফোনের সমস্ত যোগাযোগের ওপর নজর রাখা হবে। দেশদ্রোহের অপরাধে প্রয়োজনে যে-কোনো বাড়ি তল্লাশ করা যাবে এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে। নির্ধারিত আইনি সীমার বাইরে সরকারি যে-কোনো পদক্ষেপের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অনুমোদিত হল।’

সঙ্গে সঙ্গে এস.এ. বাহিনী, সরকারি পুলিশ ও সামরিক বাহিনী বার্লিন শহরে ঝাঁপিয়ে পড়ল কমিউনিস্ট সদস্যদের ওপর। বহু সাংসদ এবং নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হল। চলতে লাগল নিষ্ঠুর হত্যালীলা। বাজার বন্ধ হয়ে গেল। লুঠ হতে লাগল ইহুদিদের দোকান ও কারখানা। সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ইহুদি কর্মচারীদের চাকরি থেকে বরখাস্ত বা পদ থেকে নীচে নামিয়ে দেওয়ার আদেশ জারি করা হল।

দাবানলের মতো কমিউনিস্ট ও ইহুদি বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হতে লাগল জার্মানি জুড়ে। সীমান্ত এলাকায় কড়া সতর্কতা জারি করা হল, যাতে একজন পলাতকও শাস্তি না পেয়ে দেশ ছেড়ে যেতে না পারে। দলে দলে ইহুদি ও কমিউনিস্টদের গ্রেপ্তার করে তাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার শুরু হল।

পদার্থবিজ্ঞানী লিও জিলার্ড কিন্তু আগেই আভাস পেয়েছিলেন, এমন কিছু ঘটতে পারে জার্মানিতে। মার্চ মাসের তিরিশ তারিখ নিজের জামাকাপড় আর কাগজপত্রে ভরা মাত্র দুটি ঢাউস সুটকেস সঙ্গে নিয়ে বার্লিন থেকে অস্ট্রিয়া পাড়ি দেবার জন্য ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে পড়লেন লিও। আপাতত ঠিকানা অস্ট্রিয়া। তারপর সেখান থেকে লন্ডন।

পরদিন জার্মান সীমান্তে পুলিশ ট্রেনের কামরায় উঠে কাগজ চাইলে লিও তাদের জার্মান পাসপোর্ট দেখালেন। পরিচয়পত্রে পেশা ‘সহায়ক অধ্যাপক’ লেখা আছে দেখে পুলিশ তাঁকে সেলাম ঠুকে চলে যেতে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল লিও জিলার্ডের। ট্রেন চলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর লিও দেখলেন, তিনি দানিউব ব্রিজের ওপর দিয়ে ভিয়েনা শহরে পৌঁছে গিয়েছেন।

খবরের কাগজ পড়ে সেইদিন লিও জানতে পারলেন, বার্লিন থেকে পরের যে ট্রেনটি রওনা দিয়েছিল, তাতে চিরুনি তল্লাশি করে সমস্ত ইহুদিদের নামিয়ে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কোনও এক অজ্ঞাত আস্তানায়। নিজের ভাগ্য এবং বুদ্ধি—দুটিকেই ধন্যবাদ জানিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে এগিয়ে গেলেন লিও।

যেদিন লিও জিলার্ড বার্লিন ছাড়লেন রাতে, সেদিনই আমেরিকা থেকে বেলজিয়ামের এক সমুদ্র বন্দরে জাহাজ থেকে নামলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। নেমেই ইহুদি নিধনের খবর পেয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন, আর তিনি দেশের মাটিতে বার্লিন ফিরে যাবেন না, বেলজিয়ামেই থেকে যাবেন।

অ্যাডলফ হিটলার চ্যান্সেলর পদে আসীন হবার চার মাস বাদে একদিন গভীর রাতে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে হাজার খানেক ছাত্র জড়ো হল, হাতে তাদের জ্বলন্ত মশাল। স্তূপীকৃত বইয়ের রাশি আগে থেকেই জমা হয়েছিল বিশাল মাঠের মাঝে। ছাত্ররা বইগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিল। দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল ইতিহাস, বিজ্ঞান আর দর্শনের বই, যার লেখক ছিলেন এরিক মারিয়া রেমার্ক, আলবার্ট আইনস্টাইন, হাইনরিখ মান। পুড়িয়ে দেওয়া হল জার্মান সংবিধানের লিপিকার হুগো প্রসের লেখা বইপত্র। আগুনের লেলিহান শিখা দেখে জড়ো হওয়া নাৎসি এস.এ. বাহিনীর ভাড়াটে সৈনিকরা জান্তব উল্লাসে ফেটে পড়ল। আরও বই এনে আগুনে ফেলে দিতে লাগল তারা। বিদেশি লেখক এইচ.জি. ওয়েলস, জ্যাক লন্ডন, সিগমন্ড ফ্রয়েডের মতো আধুনিক লেখকদের বই এনে ছাত্ররা ফেলে দিল আগুনে।

প্রচার দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ডক্টর গোয়েবলস সম্পূর্ণভাবে রেডিও এবং সংবাদমাধ্যম নিজের হাতে তুলে নিলেন। সংবাদপত্রের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন হল— ‘সব সম্পাদককে জার্মান অ-ইহুদি নাগরিক হতে হবে এবং তাঁদের কারও স্ত্রী ইহুদি হতে পারবেন না।’ কাগজ বন্ধ হতে লাগল। যেসব ইহুদি ব্যবসায়ী সংবাদমাধ্যমে লগ্নি করে রেখেছিল, তাদের ভয় দেখিয়ে নাৎসি অনুরাগী মানুষ জলের দরে কাগজের মালিকানা কিনে নিল।

সিনেমা হলে শুধু পুরোনো জার্মান সংস্কৃতির সিনেমা দেখানো হতে লাগল। সামান্য আধুনিকতার ছাপ থাকলে তা বন্ধ করে দেওয়া হল। হিটলারের অনুগামী বার্নার্ড রাস্টকে দায়িত্ব দেওয়া হল শিক্ষা ও বিজ্ঞান দপ্তরের। একদা স্কুল-মাস্টার রাস্ট চাকরি হারিয়েছিলেন ছিটগ্রস্ত লোক বলে। এবার তিনি আশাতীত উন্নতিতে খুশি হয়ে ধ্বংস করতে লাগলেন এতদিনে তিলতিল করে গড়ে ওঠা জার্মান শিক্ষাব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ফলে আইন করে স্কুল ছাত্রদের সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হয়ে গেল। পাঠ্যবই এবং সিলেবাস বদলে গেল। নতুন করে বই লিখে স্কুলের পাঠক্রমে নাৎসি আদর্শ তুলে ধরা হল ছাত্রদের সামনে। শিক্ষকদের জন্য নতুন সংস্থা ‘ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট টিচার্স লিগ’-এ যোগদান করা বাধ্যতামূলক করা হল, যা তৈরি হল নাৎসি ভাবাদর্শে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিজ্ঞান পড়ানোর নামে অপবিজ্ঞানের পাঠ দেওয়া হতে লাগল। ভুল তথ্য, মিথ্যে দর্শন তুলে ধরে ছাত্রদের মগজ ধোলাই হতে লাগল।

আলবার্ট আইনস্টাইন এবং জেমস ফ্রাঙ্কের মতো স্বনামধন্য পদার্থবিদ্যার শিক্ষক চাকরি হারালেন। যে জার্মানি পদার্থবিদ্যা এবং রসায়ন বিজ্ঞানের ‘মক্কা’ বলে গণ্য হত, ধর্মোন্মাদ ফ্যাসিস্ট শক্তি তাকে ধুলোয় লুটিয়ে দিল। নোবেলজয়ী, নাৎসি সমর্থক পদার্থবিদ ডক্টর জোহানেস স্টার্ক এক বক্তৃতায় ছাত্রদের জানালেন, সব বিজ্ঞান আসলে আর্যদের হাতে তৈরি। গ্যালিলিও থেকে নিউটন—সবাই আর্য বংশোদ্ভূত ছিলেন। বাকি যা কিছু ইউরোপে আবিষ্কার হয়েছে, সব জার্মানি থেকে চুরি করা বিদ্যে।

যা তিনি বলেননি তা হল, ১৯০১ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত জার্মানি থেকে যে এগারোজন নোবেল পুরস্কার পান, তাঁদের মধ্যে দশজন ছিলেন ইহুদি। একমাত্র অ-ইহুদি নোবেলজয়ী ছিলেন স্টার্ক স্বয়ং।

সেপ্টেম্বর ১৯৩৩, লন্ডন।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই লিও জিলার্ড বুঝলেন লন্ডনের আবহাওয়া তাঁর শরীরে কেমন প্রভাব বিস্তার করেছে। গলা ব্যথা, কাশি এবং সঙ্গে জ্বর। মাথা ভার নিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়তেই মনে পড়ল, আজ ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনে আরনেস্ট রাদারফোর্ডের বক্তৃতা শুনতে যাবার কথা ছিল। শরীরের ভাবগতিক সুবিধের না ঠেকায় লিও আবার বিছানায় শুয়ে পড়ে কড়িকাঠের দিকে চেয়ে নিজের ভাগ্যকে দোষ দিতে থাকলেন। রাদারফোর্ড বর্তমানে ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরির ডাইরেক্টর। তিনি লন্ডনের বিজ্ঞান আলোচনা সভায় জানতে পেরেছিলেন, সেপ্টেম্বরের এগারো তারিখে রাদারফোর্ড পরমাণু ভাঙা নিয়ে কিছু নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণার দিক তুলে ধরবেন। জানলার কাচে চোখ রেখে লিও হতাশ হলেন। ঘন ধোঁয়াশায় আকাশ ঢাকা, বৃষ্টিও হচ্ছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে বাইরে বেরোলে কপালে দুঃখ আছে। এমনিতেই ভিয়েনা থেকে কয়েকমাস আগে লন্ডনে এসেও কাজ পাননি তিনি। জ্বরে দুই চোখের পাতা তাঁর বুজে এল।

পরদিন সকালে লিওর শরীর একেবারে চাঙ্গা। খবরের কাগজের পাতায় চোখ রাখতেই বড়ো হেডলাইন নজরে এল— ‘পরমাণু ভেঙে পদার্থের রূপান্তরের নতুন সম্ভাবনা। এই রূপান্তরে নিউট্রন কণার বড়ো ভূমিকা। কী বললেন লর্ড রাদারফোর্ড?”

লিও আগ্রহ নিয়ে কাগজটা মুখের কাছে এনে আরও পড়তে লাগলেন— ‘লক্ষ লক্ষ ভোল্ট বিদ্যুৎ নয়, হয়তো তিরিশ বা চল্লিশ হাজার ভোল্টই যথেষ্ট হবে পরমাণু ভেঙে ফেলার জন্য। আর এমনি করেই আমরা এক পদার্থ থেকে আর এক পদার্থের রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হব। প্রোটন ছুড়ে পরমাণু ভাঙার জায়গায় নতুন আবিষ্কৃত কণা নিউট্রন দিয়ে আমরা অনেক কম শক্তি খরচ করে পরমাণু ভেঙে নতুন পরমাণু সৃষ্টি করতে পারব। কিন্তু যদি আমরা ভাবি, এইভাবে পরমাণু ভেঙে আমরা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি পরমাণু থেকে আহরণ করতে পারব, তাহলে তা হবে অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।’

এই পর্যন্ত পড়ে লিও জিলার্ড কাগজ ভাঁজ করে পাশে সরিয়ে রেখে দিয়ে ভাবলেন, রাদারফোর্ড পারমাণবিক গবেষণায় একজন বিশেষজ্ঞ অবশ্যই, কিন্তু বিশেষজ্ঞ তিনিই, যিনি শুধু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের অসম্ভব দিকের উদ্দেশে আঙুল তোলেন। পরমাণু ভেঙে যে আণবিক শক্তির ভাণ্ডার খুলে যাবে, লিওর দৃঢ় বিশ্বাস, অতি বড়ো বিজ্ঞানীও টলাতে পারবেন না।

লিওর জানা ছিল, আগের বছরেই নিউট্রন কণা আবিষ্কার হয়েছে জেমস চ্যাডউইকের হাতে। আগে মনে করা হত, পরমাণু শুধু ইলেকট্রন এবং প্রোটন দিয়ে তৈরি। চ্যাডউইক নিউট্রন আবিষ্কার করায় জানা গেল, পরমাণুর কেন্দ্রে আছে প্রোটন আর নিউট্রন। প্রোটন ধনাত্মক এবং ইলেকট্রন ঋণাত্মক কণা। নিউট্রন হল চার্জ-নিরপেক্ষ। তাই সব পরমাণুর কেন্দ্রে যতগুলো প্রোটন আছে, ঠিক ততগুলো ইলেকট্রন কেন্দ্রের চারদিকে পাক খাচ্ছে। কেন্দ্রে মোট প্রোটন এবং নিউট্রনের সংখ্যা হল তার ভর সংখ্যা।

চ্যাডউইক বিজ্ঞানের জগতে তখন তুমুল সাড়া ফেলে দিয়ে লিখে ফেলেছেন বিশাল এক গবেষণাপত্র। নিলস বোর এই আবিষ্কারের ভিত্তিতে বানিয়ে ফেললেন পরমাণুর মডেল। রাদারফোর্ড পরমাণু ভাঙা নিয়ে কাজ করে চলেছিলেন কয়েক দশক ধরে। সোনার পাতের ওপর তেজস্ক্রিয় রশ্মি ‘আলফা’ (আসলে ধনাত্মক হিলিয়াম কণা) ফেলে তিনি পরমাণুর গঠন জানতে চেষ্টা করছিলেন। চ্যাডউইক নিউট্রন আবিষ্কার করার পর বোর কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহার করে গড়ে তুললেন তাঁর পারমাণবিক তত্ত্ব।

লিও রাদারফোর্ডের পরমাণু ভেঙে অনেক শক্তি পাওয়ার ‘অলীক কল্পনা’ মন্তব্য পড়ে বিপর্যস্ত বোধ করতে লাগলেন। তাঁর মনে হল, এই চার্জ-নিরপেক্ষ নিউট্রন দিয়ে আঘাত করেই পরমাণু ভেঙে ফেলে সৃষ্টি হবে আণবিক শক্তি। লিজ মেইটনারের সঙ্গে কাজের দিনগুলো মনে পড়ে গেল তাঁর। লিও গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে লন্ডনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগলেন লিও। সাদাম্পটন রোডের ট্রাফিক সিগনালের সামনে লাল-বাতি জ্বলতে দাঁড়িয়ে পড়লেন লিও। তখন আবার ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। আচ্ছা, একটা নিউট্রন যদি প্রবল বেগে কোনও তেজস্ক্রিয় পরমাণুকে আঘাত করে, তাহলে কী ঘটতে পারে? ধরা যাক, প্রবল বেগে ছুটে আসা একটা নিউট্রন ইউরেনিয়ামের একটা বড়ো টুকরোর ওপর আঘাত করল। একটা ইউরেনিয়াম পরমাণু থেকে তিনটি নিউট্রন বার হতে পারে সেক্ষেত্রে। আচ্ছা, যদি সেই তিনটে নিউট্রন আরও তিনটে ইউরেনিয়াম পরমাণুকে ভেঙে দেয়—এক থেকে তিন, তিন থেকে নয়? এই পুরো ঘটনাটা ঘটতে কয়েক সেকেন্ড লাগবে। একটা পরমাণু নয়, লক্ষ লক্ষ পরমাণু একসঙ্গে ভেঙে প্রচুর আণবিক শক্তি পাওয়া যাবে।

সিগনাল সবুজ হতে রাস্তা পার হতে লাগলেন লিও জিলার্ড। মনের মধ্যে অঙ্ক কষতে লাগলেন তিনি। এইচ.জি. ওয়েলসের কথা ফলে যাবে না তো! আণবিক বোমা আবিষ্কার হবার এটাই একমাত্র রাস্তা। কিন্তু কীভাবে বানানো যাবে সেই বিধ্বংসী অস্ত্র? হিটলারের অগ্রগতি থামাতে একমাত্র সক্ষম হতে পারে এই হাতিয়ার। আবার সংশয় জাগে লিওর মনে, পৃথিবীর সবচাইতে প্রতিভাশালী পরমাণু বিজ্ঞানীরা এখন বার্লিনেই কাজ করছেন। তাঁদের কেউ যদি বানিয়ে ফেলেন এমন অস্ত্র? কে তিনি?

মেইটনারের কথা মনে পড়ে যায় লিওর। তাঁর জানা নেই লিজ এখন কোথায় ও কেমন আছেন। তিনিও তো ইহুদি! এখন সব ইহুদি বিজ্ঞানীদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে জার্মানিতে। ইতালিতেও শুরু হয়েছে একই ঘটনা। হাইসেনবার্গ কিন্তু ইহুদি নন। যদি হিটলার তাঁকে আণবিক বোমা বানাবার দায়িত্ব দিয়ে ফেলেন? নাহ্‌, লিওর এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, হাইসেনবার্গ নাৎসিদের হয়ে কাজ করবেন না কখনোই। কিন্তু যদি তাঁকে চাপ দেওয়া হয়, তবে?

মাথা হালকা করতে লিও জিলার্ড বিজ্ঞান চিন্তা সরিয়ে ভাবতে লাগলেন, লন্ডন ছেড়ে আমেরিকায় কীভাবে চলে যাওয়া যায়। এই কয় মাসে এটুকু তিনি বুঝে গিয়েছেন, লন্ডনে অধ্যাপনা বা গবেষণার কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ফেরার পথ ধরেন লিও। আবার নিউট্রন চিন্তা মাথায় গজিয়ে ওঠে। একটা নিউট্রন থেকে বহু নিউট্রন পাওয়ার যে কাল্পনিক দৃশ্যের জায়গা দিয়েছিলেন তাঁর মস্তিস্কে, তার নাম দেন—নিউক্লিয়ার ফিউশন রি-অ্যাকশন।

অক্টোবর ১৯৩৩, ব্রাসেলস, সপ্তম সলভে কনফারেন্স।

সলভে সম্মেলনে এবারের বিষয় ছিল, নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা। প্রায় চল্লিশ জন বিজ্ঞানী এই সম্মেলনে যোগ দিলেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বয়সে তরুণ এবং তাঁরা জার্মানি, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ইতালি, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশে পদার্থবিদ্যায় আধুনিকতার পরশ আনছিলেন। অনেকেই পরবর্তীকালে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন।

অভিজ্ঞদের মধ্যে ছিলেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, নিলস বোর, লিজ মেইটনার, মেরি কিউরি; তরুণ পদার্থবিদদের মধ্যে ছিলেন ওয়ার্নার হাইসেনবার্গ, পল ডিরাক, এনরিকো ফের্মি, পিটার ডিবাই, জর্জ গ্যামো, উলফগ্যাং পাউলি, আর্নেস্ট লরেন্স, আইরিন ও জলিয়েট কিউরি প্রমুখ।

(সলভে সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা)

সম্মেলনে পরমাণুর গঠন এবং গবেষণালব্ধ তথ্য নিয়ে চলল প্রবল বিতর্ক। আমেরিকান পদার্থবিদ কার্ল অ্যান্ডারসন কিছুদিন আগেই পজিট্রন আবিষ্কার করেছেন, যাতে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ম্যাটার থাকলে অ্যান্টিম্যাটার থাকতে পারার সম্ভাবনা রয়ে গিয়েছে। পজিট্রনের ধর্ম একেবারে ইলেকট্রনের মতোই এবং তাঁর ভরও একই, শুধু ইলেকট্রনের আধান ঋণাত্মক আর পজিট্রনের ধনাত্মক। যদিও অ্যান্ডারসন এই সম্মেলনে যোগ দেননি, কিন্তু তাঁর গবেষণা যথেষ্ট গুরুত্ব পেল।

আর্নেস্ট লরেন্স তখন সাইক্লোট্রন যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। এই যন্ত্রে আলফা বা প্রোটনের মতো ধনাত্মক কণার বেগ উচ্চ ভোল্টের বিদ্যুৎ ছাড়াই হাজার হাজার গুণ বাড়িয়ে আঘাত করা যেত কোনও মৌল পদার্থকে। এই আঘাতের ফলে নতুন মৌল বা তার আইসোটোপ তৈরি হয় কি না পরীক্ষা করে দেখার এক নতুন দিশা দেখালেন লরেন্স। এই সম্মেলনে সবাই লরেন্সের নব আবিষ্কৃত যন্ত্রের বিবরণ শুনে ফলিত পদার্থবিদ্যার জগতে যে দ্রুত পরিবর্তন আসতে চলেছে, সেই কথাই বলাবলি করতে লাগলেন।

আইরিন এবং জলিয়েট জানালেন, মধ্যম ভরের মৌলকে আলফা কণা দিয়ে আঘাত করে তাঁরা যে কণা পেয়েছেন, তা হল প্রোটন; কিন্তু কম ভরের মৌলকে আলফা কণা দিয়ে আঘাত করলে যে কণা পেয়েছেন, তা চ্যাডউইক আবিষ্কৃত নিউট্রন ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। এর কারণ হিসাবে তাঁরা এটাও দেখালেন যে, নিউট্রনের সঙ্গে একটি পজিট্রন কণার হদিসও তাঁরা পেয়েছেন। প্রোটন এবং নিউট্রনের ভর সমান, তাই প্রোটন যদি একটা পজিট্রন কণা ত্যাগ করে, তাহলে আধান নিরপেক্ষ নিউট্রন তার সঙ্গী হবে।

লিজ মেইটনার কিউরি দম্পতির গবেষণার বর্ণনা শুনে প্রবল প্রতিবাদ করে প্রায় আক্রমণ করতে লাগলেন তাঁদের। তিনি জানালেন, এই একই পরীক্ষা করে তিনি ও অটো হান কাইজার উইলহেম ইন্সটিটিউটে শুধু প্রোটন পেয়েছেন, নিউট্রন নয়। কাজেই কিউরি দম্পতির কাজ সম্পূর্ণ ভুল। ভেঙে পড়লেন তরুণ পদার্থবিদ আইরিন ও জলিয়েট। আড়ালে তাঁদের সমর্থন জানালেন নিলস বোর, ভরসা দিলেন উলফগ্যাং পাউলি।

সম্মেলনের শেষে সবাই বুঝতে পারছিলেন, কোনও পরমাণুর নিউক্লিয়াস থেকে প্রোটন বা নিউট্রন নির্গত হওয়া নির্ভর করে আলফা কণার শক্তির ওপর। তবে নিউট্রন নির্গত হলে সঙ্গ দেবে পজিট্রন। দীর্ঘকাল তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কাজ করার ফলে আইরিনের মা মেরি কিউরির শরীর তখন লিউকেমিয়া রোগে আক্রান্ত। তিনি সম্মেলনে মেয়ে ও জামাইকে সমর্থন করার মতো শক্তি সঞ্চয় করতে পারলেন না, নীরব রইলেন। কিন্তু মেরি জানতেন, ওঁদের কাজ ঠিক পথে এগোচ্ছে, তাঁরা অবশ্যই একদিন কৃত্রিম আইসোটোপ বানাতে সক্ষম হবেন। এনরিকো ফের্মি রোমে প্রায় একই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। তিনিও মনে মনে স্থির করে নিলেন, এই পথেই নতুন মৌল আবিষ্কার করতে হবে। একে একে পর্যায় সারণির সব মৌলকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে ফলাফল লক্ষ করতে হবে।

সম্মেলনের শেষে ঘরে ফিরে এসে কিউরি দম্পতি আবার পরীক্ষা করে বুঝলেন, তাঁরা ঠিক অনুমানই করেছিলেন এবং প্রায় অজান্তে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার হল তাঁদের হাতে, যার ফলে এই সম্মেলনের ঠিক দুই বছর পর তাঁদের নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

সলভে সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন রুশ বিজ্ঞানী জর্জ গ্যামো। রাশিয়ার কমিউনিস্ট শাসন ক্রমে তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের উপেক্ষা করতে শুরু করে, এমনকি তাঁদের সেই দেশে চাকরি হারানোর সম্ভাবনাও দেখা দেয়। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জর্জ গ্যামো কসমিক রশ্মির ওপর কাজ করছিলেন। তিনি রাশিয়ার সরকারের ভয়ে স্ত্রী রোহকে সঙ্গে নিয়ে এবং সামান্য কিছু খাবারদাবার ও কাগজপত্র নিয়ে চড়ে বসেছিলেন একটি রাবারের তৈরি নৌকোয়। রাশিয়ার সমুদ্র উপকূল থেকে তুর্কিতে চলে গিয়ে সেখান থেকে বেলজিয়াম পাড়ি দেবার বাসনা ছিল গ্যামোর। একবার বেলজিয়ামে পৌঁছলেই নিলস বোরের উদার হৃদয়ে তিনি জায়গা পেয়ে যাবেন, এই বিশ্বাস তাঁর ছিল।

গ্যামো রাতের অন্ধকারে তুর্কি পৌঁছানোর মতলব করেছিলেন, কিন্তু সেদিন উপকূলে ঝড় উঠল। আবার রাশিয়ার উপকূলে, যেখান থেকে তাঁরা যাত্রা করেছিলেন, সেখানেই ফিরে এলেন গ্যামো দম্পতি। ঠিক এমন সময়ে বেলজিয়াম থেকে সলভে সম্মেলনে যোগ দেবার জন্য গ্যামোকে মনোনীত করে রাশিয়ার সরকারকে চিঠি লেখে ব্রাসেলস বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের নাম রাখতে এবার সানন্দে গ্যামোকে সম্মেলনে যোগ দেবার ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এই সুযোগ ব্যবহার করে গ্যামো সস্ত্রীক পাড়ি দিলেন বেলজিয়াম। জীবনে আর রাশিয়ায় ফিরে যাননি তিনি।

জর্জ গ্যামো সলভে সম্মেলনে পরমাণুকে আলফা কণা দিয়ে কেন ভেঙে ফেলা সম্ভব, তার হদিস দেন কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহার করে। ইনিই পরবর্তীতে নিউক্লিয়ার ফিউশন রি-অ্যাকশনের আবিষ্কর্তা এবং সৌরশক্তির আসল রহস্য যে এখানেই লুকিয়ে আছে, সেই কথা জানান। তবে তিনবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়নি।

১৯৩৪, লন্ডন।

লিও জিলার্ড সলভে সম্মেলনে ডাক পাননি, কারণ তখনও তিনি পদার্থবিদ্যার জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কোনও কাজ করে উঠতে পারেননি; লন্ডনে স্থায়ী চাকরির জন্য ছোটাছুটি করছেন। ইদানীং নিউক্লিয়ার চেন রি-অ্যাকশন নিয়ে কাজ করতে তাঁর প্রবল ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু না তিনি সে-ধরনের পরীক্ষাগারের সঙ্গে যুক্ত, না আছে তাঁর অর্থবল, যা দিয়ে নিজেই তিনি খুলে বসতে পারেন একটা পরীক্ষাগার।

লিও বুঝতে পারছেন, আলফা কণা নয়, নিউট্রন দিয়েই ভাঙতে হবে পরমাণু। কারণ, নিউট্রন একটি আধান-নিরপেক্ষ কণা, যা অনায়াসে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে বাধা না পেয়ে ঢুকে পড়বে; পরমাণু ভারসাম্য হারাবে এবং নতুন পরমাণুর সৃষ্টি করবে। তবে কোন মৌল নিউট্রন দিয়ে আঘাত করলে তবেই সফলভাবে চেন রি-অ্যাকশন হবে, তা তাঁর জানা নেই। পরীক্ষা করে দেখতে হবে, যা এখনও পর্যন্ত করে দেখিয়েছেন কিউরি দম্পতি।

লন্ডনের পদার্থবিদ প্যাট্রিক ব্ল্যাকেট সদ্য সলভে সম্মেলন থেকে ফিরে এসেছেন। তিনি গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌল পদার্থের পারমাণবিক রূপান্তর (Nuclear Transmutation) নিয়ে কাজ করেছিলেন। লিওর সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল। ব্ল্যাকেটের সঙ্গে লন্ডনে দেখা করে নিউক্লিয়ার চেন রি-অ্যাকশনের ওপর কিছু পরীক্ষা করার প্রস্তাব দিলেন লিও জিলার্ড। ব্ল্যাকেট ধৈর্য ধরে সবটা শুনে বললেন, “লন্ডনে এই ধরনের কাজে কেউ অর্থ জোগাবে বলে যদি ভেবে থাকো, তাহলে তুমি আকাশকুসুম কল্পনা করছ। যদি সত্যি কাজ করার ইচ্ছে থাকে, তাহলে রাশিয়ায় চলে যাও। রুশ কমিউনিস্ট সরকার যদি পারমাণবিক শক্তি আহরণ করার এমন এক প্রজেক্টের কথা জানতে পারে, তারা কাঁড়ি কাঁড়ি রুবল লাগিয়ে দেবে তোমার পরীক্ষাগারের পিছনে।”

১৯৩৪, রোম।

সলভে সম্মেলনেই এনরিকো ফের্মি বুঝে গিয়েছিলেন, আলফা কণা দিয়ে আঘাত করে মৌলকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা প্রায় ব্যর্থ। এই বিষয়টা নিয়ে তিনি এতটাই চিন্তা করতে থাকেন যে, রোমে নিজের ল্যাবে ফিরে গিয়ে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা তাঁর মাথায় বদ্ধমূল হয়ে যায়। তিনি বোঝেন, নিউক্লিয়াসের চারধারে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রনরা যেহেতু আলফা কণাকে আকর্ষণ করে, তাই এখানেই অনেকটা শক্তি ক্ষয় করে ফেলে আলফা। গতি কমে গিয়ে সেই ধনাত্মক কণা যখন নিউক্লিয়াসের দিকে এগিয়ে যায়, তখন প্রোটনের সঙ্গে তার বিকর্ষণ হয়। তার গতি আরও কমে যায় এবং নিউক্লিয়াস ভেঙে নতুন কণা সৃষ্টি করা যায় না। কিউরি দম্পতি এই কাজে কিছুটা সফল হয়েছিলেন, কারণ তাঁরা কম ভরের মৌলের ওপর পরীক্ষা করছিলেন। যত ভর বেশি হবে, তত তার প্রোটন এবং ইলেকট্রন সংখ্যা বেশি হবে; ততই কঠিন আলফা কণা দিয়ে আঘাত করে পরিবর্তন আনা।

নিউট্রন ব্যবহার করে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা সৃষ্টি করা যেতে পারে, কারণ নিউট্রন একটি আধান-নিরপেক্ষ কণা, যার ওপর ইলেকট্রন বা প্রোটনের কোনও প্রভাব নেই। ফের্মি তাঁর তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা ছেড়ে পরীক্ষাগারে মন দিলেন। যন্ত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞতা কম হলেও তাঁর মাথাটা ক্ষুরধার এবং মাত্রাতিরিক্ত ঠান্ডা।

ফের্মি গবেষণাগারে তাঁর সঙ্গে নিলেন অভিজ্ঞ এক যন্ত্রবিদ রাসেটিকে। রাসেটি লেগে গেলেন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বানাতে। এবার সমস্যা হল, আলফা কণা যেমন রেডিয়াম থেকে সহজে পাওয়া যায়, নিউট্রন অত সহজে নির্গত হয় না। ফের্মি দেখলেন, রেডিয়াম থেকে র‍্যাডন পাওয়া যায় স্বভাবিক তেজস্ক্রিয়তার মধ্যে দিয়ে। র‍্যাডন গ্যাস যদি বেরিলিয়াম পাউডারের সঙ্গে মেশানো যায়, তবে আলফা কণার আঘাতে নিউট্রন নির্গত হয়। নিউট্রনের উৎস বানিয়ে ফেললেন রসেটি। এবার তেজস্ক্রিয় পদার্থ শনাক্ত করতে গেলে লাগবে গাইগার কাউন্টার (তেজস্ক্রিয়তা থেকে কোনও কণা নির্গত হলে এই যন্ত্রে ‘টক’ করে শব্দ হয়)। এই যন্ত্রটি বানাতে হত, বিক্রি হত না বাজারে, কারণ খুব কমই এর চাহিদা ছিল। একই পরীক্ষাগারে যদি কাউন্টার রাখা হয়, তাহলে অন্যান্য বিকিরণ পরীক্ষার ফলাফল ভুল দেখাবে।

পরীক্ষাটা এমন দাঁড়াল যে, পরীক্ষাগারে স্যাম্পলের ওপর নিউট্রন উৎসের কাছে নিয়ে গিয়ে তারপর সেই টিউব দূরের এক অন্য ঘরে গাইগার কাউন্টারের কাছে নিয়ে গিয়ে তেজস্ক্রিয়তা পরীক্ষা করতে হবে। করিডরের শেষ প্রান্তে ছিল সেই ঘর। এবার শুরু হল পরীক্ষাকারীদের দৌড়। ফের্মি যেন এক প্রতিযোগিতায় ফেলে দিলেন সাথীদের। কাচের টিউবে স্যাম্পল রেখে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে গাইগার কাউন্টার রাখা ঘর পর্যন্ত ছুট লাগানো। ছুট লাগানোর কারণ ছিল পরীক্ষায় প্রতিটি কণাকে শনাক্ত করা। এনরিকো নিজে ভালো খেলোয়াড় ছিলেন বলে দৌড়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যেতেন।

অত্যন্ত অধ্যবসায় নিয়ে ফের্মির দল এক এক করে পর্যায় সারণির সব মৌলর ওপর নিউট্রন আঘাত করে পরীক্ষা করতে লাগল। কিন্তু সাফল্য আর আসে না। ক্লোরিন পর্যন্ত পরীক্ষা করে ফের্মি আশাহত হয়ে তাঁর পরীক্ষা প্রায় ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, কিন্তু ফ্লোরিনের ব্যাপারে ঘটে গেল বিস্ময়কর ঘটনা।

ফ্লোরিনের ওপর নিউট্রন আঘাত করতেই কাচের টিউবে তেজস্ক্রিয়তা লক্ষ করা গেল। এবার ফের্মি ঠিক করলেন, পর্যায় সারণির ৯২টি মৌলর ওপর একই পরীক্ষা করে দেখতে হবে। সমস্যা দাঁড়াল, এই মৌলগুলো যৌগ অবস্থায় পাওয়া সম্ভব বাজার থেকে, আবার অনেকগুলো পাওয়াও যায় না। ফের্মির বন্ধু এমিলো সেগ্রি রাসায়নিক বস্তুর বাজার ঘেঁটে জোগাড় করলেন বিভিন্ন যৌগ। ফের্মির সহকারীরা প্রবল উৎসাহে একের পর এক পরীক্ষা করতে লাগলেন। তাঁদের কাজে সবচাইতে বড়ো বাধা ছিল—র‍্যাডনের হাফ লাইফ অনেক কম, কাজেই দু-একদিনেই নিউট্রনের উৎস তার তেজস্ক্রিয়তা হারিয়ে ফেলে।

পর্যায় সারণির শেষ মৌল হল ইউরেনিয়াম। অতিকষ্টে ইউরেনিয়াম জোগাড় করে তাঁর ওপর নিউট্রন আঘাত করে যা দেখা গেল, তা চাঞ্চল্যকর। নতুন এক পরমাণু পাওয়া গেল, যার পারমাণবিক সংখ্যা ৯৩। ইউরেনিয়ামের পারমাণবিক সংখ্যা ৯২, তাই ইউরেনিয়ামের আইসোটোপ নয়, আবিষ্কার হয়ে গেল নতুন এক মৌল, যা পৃথিবীর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ এর স্থায়িত্ব খুব কম। আরও দেখা গেল, পারমাণবিক বিক্রিয়ায় দুটি ভিন্ন পদার্থ জন্ম নিয়েছে।

রোমের এই পদার্থবিদদের গোষ্ঠী যুগান্তকারী এক আবিষ্কার করে ফেলল, কিন্তু অন্যদিকে জার্মানিতে প্রায় একই সময়ে অটো হান এবং ফ্রিজ স্ট্র্যাসম্যান একই আবিষ্কার করে ফেললেন। তবে তাঁদের ফলাফল একটু ভিন্ন ছিল। রোমের কাগজে কাগজে ফলাও করে ছাপা হল ইতালির অ-ইহুদি বিজ্ঞানীদের অপরূপ আবিষ্কারের গল্প। এমনকি একটা কাগজে ছাপা হল, এনরিকো ফের্মি নাকি ইতালির রানির হাতে অভূতপূর্ব তেজস্ক্রিয় মৌল ৯৩-এর একটি নয়নাভিরাম বোতল তুলে দিয়েছেন।

মিথ্যে গুজবে ফের্মি বেজায় চটে গেলেন। নিজের কাজের বিজ্ঞাপন দেওয়া তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর ওপর মৌল-৯৩ যৎসামান্য অস্তিত্বের প্রমাণ পরীক্ষাগারে পাওয়া যে কতটা কষ্টকর, তাঁর চাইতে বেশি আর কে তা জানত? কিন্তু আমেরিকার কাগজ নিউ ইয়র্ক টাইমস কিছুদিন পর প্রথম পাতায় শিরোনাম লিখল— ‘ইউরেনিয়ামের ওপর গোলাবর্ষণ করে ইতালি নতুন মৌল-৯৩ আবিষ্কার করেছে।’

অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানী মহলে ফের্মির নব আবিষ্কারের চাঞ্চল্যকর খবর ছড়িয়ে পড়ল। কেউ কেউ অবিশ্বাস করলেন; আবার মেইটনার এবং অটো হান যেহেতু একই ধরনের ধরণের কাজ করে চলেছিলেন, তাই তাঁরা ফের্মির আবিষ্কারকে মান্যতা দিলেন। মৌল-৯৩ প্রথম ধরা দিয়েছিল এনরিকোর হাতে। পরবর্তীকালে অন্যান্য বিজ্ঞানীরা ফের্মির পরীক্ষা নিজেদের পরীক্ষাগারে করে সত্যতা বিচার করে দেখেন। এই মৌলটি পরবর্তীকালে খ্যাত হল ‘পোলোনিয়াম’ নামে।

১৯৩৪, বার্লিন।

নাৎসি এস.এ. বাহিনীর গুপ্তহত্যা এবং ব্যাভিচারে উত্যক্ত হয়ে নানাদিক থেকে হিটলারের ওপর চাপ আসতে থাকে সমাজবিরোধী এস.এ. বাহিনীর শক্তি খর্ব করার জন্য। হিন্ডেনবার্গ নিজেও হিটলারকে ডেকে প্রকাশ্য রাস্তায় ব্রাউন শার্ট বা এস.এ. বাহিনীর উৎপাত বন্ধ করার জন্য পরামর্শ দিতে থাকেন। এস.এ. বাহিনীর প্রধান আর্নস্ট রোহম একসময় হিটলারের ছায়া সঙ্গী ছিলেন। কিন্তু নাৎসি পার্টির অন্য দুই প্রধান গোয়েবলস ও গোরিংয়ের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল চরম। শেষোক্ত দুই নেতার চাপে পড়ে হিটলার এস.এ. বাহিনীকে এস.এস. এবং জার্মান সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে রোহমের কর্তৃত্ব হ্রাস করে দিলেন। মানসিক কষ্টে এবং হিটলারের চাপে রোহম নিজের রিভলভার দিয়ে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করলেন। হারমান গোরিং গুপ্ত পুলিশবাহিনী বা গেস্টাপোর প্রধান হলেন।

প্রেসিডেন্ট ডক্টর হিন্ডেনবার্গ মারা গেলেন। বিশেষ ক্যাবিনেট মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, জার্মান চ্যান্সেলর এবং প্রেসিডেন্টের পদ এক করে দেওয়া হবে এবং অ্যাডলফ হিটলার সেই পদে বহাল হবেন। জার্মানির সর্বোচ্চ পদাধিকারী হবার বাসনা পূর্ণ হল হিটলারের। শুরু হল পৃথিবীর ইতিহাসের এক অন্ধকার সময়, নৃশংস ইহুদি নিধন। জার্মানিতে বহু কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প খোলা হল। সেখানে নিরপরাধ বন্দিদের ওপর চলতে লাগল অকথ্য অত্যাচার।

কাইজার উইলহেম ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক চিঠি পেলেন সমস্ত ইহুদি বিজ্ঞানীদের যেন অবিলম্বে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। অজস্র গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ইহুদি বিজ্ঞানীরা তখন মগ্ন। তাঁদের কাইজার থেকে বার করে দিলে গবেষণার কাজ মুখ থুবড়ে পড়বে। চিন্তিত হয়ে প্ল্যাঙ্ক সরাসরি হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়ে আবেদন জানালেন। দেখা করার অনুমতিও পেয়ে গেলেন তিনি কিছুদিনের মধ্যেই।

প্ল্যাঙ্ক কাইজার ইন্সটিটিউটে ইহুদি বিজ্ঞানীদের অবদানের কথা হিটলারকে স্মরণ করিয়ে দিতেই ফুয়েরার প্রচণ্ড রেগে গিয়ে টেবিলে মুঠি ঠুকে চিৎকার করে উঠলেন, “একজন ইহুদিরও জার্মানিতে জায়গা নেই। ওরা সবাই কমিউনিস্ট, দেশদ্রোহী, রাশিয়ার সমর্থক। যদি আদেশ পালন না করতে পারো, তবে চাকরি যাবে তোমারও। যদি জেল হয়, তাহলে আমাকে দোষ দিও না।”

হতোদ্যম ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক কাইজার ইন্সটিটিউটে ফিরে এসে লিজ মেইটনারকে ডেকে পাঠালেন। শান্ত গলায় তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার নোটিশ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি জানি পারমাণবিক পদার্থবিদ্যায় তোমার গবেষণা একেবারে যুগান্তকারী পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেতন পাবে না ঠিকই, কিন্তু কিছু আর্থিক সহায়তা অবশ্যই আমি দেব। কাজটা বন্ধ কোরো না, অন্য কোথাও চলেও যেও না।”

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের দুই কন্যার সমবয়সি ছিলেন লিজ মেইটনার। তিনিও প্ল্যাঙ্ককে পিতৃতুল্য বলে মনে করতেন, তাই প্রতিবাদ না করে ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে চলে যেতে গিয়ে আবার ফিরে এসে বললেন, “ডক্টর প্ল্যাঙ্ক, আপনি আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন এখনই পড়বে না। এই অস্থির সময় কেটে যাবেই, ভরসা রাখি। আর আমি তো অস্ট্রিয়ার নাগরিক, জার্মানির নই। নতুন যে আদেশ এসেছে, তা কি আমার জন্যও প্রযোজ্য?”

“অবশ্যই নয়। আমি নাৎসি পার্টির সমর্থক নই ডক্টর স্টার্কের মতো, কিন্তু দেশ থেকে সমস্ত ইহুদিদের বিতাড়নে নাৎসি পার্টির বিরোধিতা করার শক্তিও আমার নেই।”

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ককে থামিয়ে দিলেন লিজ। তাঁর কণ্ঠস্বর যেন একটু উঁচু শোনাল, “কিন্তু আমি তো ইহুদি নই, স্যার! আমার পিতৃপুরুষ ছিলেন ইহুদি। আমি নিজে একজন ক্যাথলিক, যদিও ধর্ম নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা আমার নেই।”

“সেটাই স্বাভাবিক, মাই চাইল্ড। তবে এই দেশের বর্তমান আইন বলে, ইহুদি ধর্ম রক্তে প্রবাহিত হয়। তাই ইহুদিদের সন্তানসন্ততি, এমনকি স্বামী বা স্ত্রী ইহুদি না হলেও তাদের একই গোত্রে ফেলা হবে।”

নিজের ডেস্কে ফিরে এসে লিজ চিঠি লিখলেন নিজের ভাইপো অটো ফ্রিসকে। ফ্রিস জার্মানি থেকে আগেই লন্ডনে চলে গিয়ে গবেষণা করছিলেন কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে। তাঁর নিজের কাজের বর্ণনা দিয়ে ফ্রিসের বর্তমান কাজের খোঁজখবর নিতে চাইলেন লিজ মেইটনার। এই ভাইপোটি তাঁর খুব প্রিয়, আর সে একজন সম্ভাবনাময় পদার্থবিদ তো বটেই। চিঠি লেখা শেষ করে লিজ কফির কাপ হাতে কাইজার ইন্সটিটিউটের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে বুঝলেন, কাইজার ছেড়ে যাওয়ার তাড়া নিজের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। অনেক কাজ বাকি। হয়তো কিউরি দম্পতির কাজই ঠিক। নিজের গবেষণার কাজ এখন ছেড়ে দিলে আজীবন আপশোশ করে যেতে হবে।

১৯৩৪, লন্ডন।

লিও জিলার্ড নিউক্লিয়ার চেইন রি-অ্যাকশন নিয়ে তাঁর পেটেন্ট জমা করলেন লন্ডনে। প্রস্তাব দিলেন, বেরিলিয়াম, ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামকে যদি নিউট্রন দিয়ে আঘাত করা যায়, তবে স্বতঃস্ফূর্ত বিকিরণ হবে এবং একাধিক নিউট্রন নির্গত হবে, যারা সাস্টেইন্ড চেন রি-অ্যাকশন (তেজস্ক্রিয় বিক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট হারে চলতে থাকা) ঘটাতে পারবে। যদিও বেরিলিয়ামের সঠিক ভর না জানায় তিনি মারাত্মক এক ভুল করে বসলেন। তিনি পেটেন্টে লিখলেন, ‘নিউট্রনের আঘাতে বেরিলিয়াম বিদীর্ণ হবে’, অথচ কার্যক্ষেত্রে তা আদৌ হয় না।

পেটেন্ট জমা করে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখতে লাগলেন লিও। এই শক্তি কাজে লাগিয়ে হয়তো কয়লা বা পেট্রোলের ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে না মানবজাতিকে, হয়তো বানানো যাবে মারাত্মক এক পারমাণবিক অস্ত্র! কিন্তু সেই তথ্য যদি জার্মানিতে নাৎসি পার্টির কাছে চলে যায়, তবে গোটা পৃথিবীতে তাণ্ডবলীলা চালাবে কি তারা?

নিজস্ব পরীক্ষাগার না থাকায় লিও রাদারফোর্ডের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে মনস্থ করলেন। রাদারফোর্ডের সঙ্গে দেখা করে নিজের আণবিক পরীক্ষার কথা তাঁকে জানালেন তিনি। সবটা খুলে না বলে, শুধু এক্স-রে ব্যবহার করে তেজস্ক্রিয়তার পরীক্ষার কথা বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডের কাছে তুলে ধরে নিজের বিপদ ডেকে আনলেন লিও জিলার্ড।

অভিজ্ঞ রাদারফোর্ড লিও জিলার্ডের কথার অসঙ্গতি লক্ষ করে তাঁকে একরকম বার করে দিলেন নিজের ঘর থেকে। ভগ্ন মনোরথ লিও লন্ডনের জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানির কর্তাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের কাছ থেকে অর্থসাহায্য চাইলেন। যথারীতি কোম্পানির বড়োকর্তারা লিওকে উপেক্ষা করলেন পাগলাটে বিজ্ঞানী ভেবে। তবে ক্যানসার রিসার্চের জন্য পারমাণবিক আইসোটোপের উপযোগিতার ভবিষ্যৎ তুলে ধরে অতিকষ্টে একটা হাসপাতালে বেরিলিয়াম ও এক্স-রে নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেলেন লিও জিলার্ড। তাঁর এই কাজের কথা চাপা থাকল না।

রোমে এনরিকো ফের্মির কাছে সংবাদ পৌঁছল যে লিও জিলার্ড লন্ডনে চেন রি-অ্যাকশন পদ্ধতি আবিষ্কারের তাগিদে আইসোটোপ পৃথক করার পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। খবর পাওয়া মাত্র ফের্মির গবেষণা দল তাঁদের পেটেন্ট জমা করে দিলেন ইতালিতে। পারমাণবিক গবেষণার নতুন দিক খুলে যাবার সংবাদে খবরের কাগজের সংবাদদাতারা আমেরিকাতে আলবার্ট আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, তাঁর কী মনে হয়, এই গবেষণা কোনও কাজের কাজ হতে পারে? শোনা মাত্র প্রফেসর আইনস্টাইন ঘাড় নেড়ে জানালেন, এমন কোনও শক্তিলাভের কোনও সম্ভাবনা আছে বলে তিনি আদৌ মনে করেন না।

গবেষণায় বিফল লিও জিলার্ড লন্ডন ছাড়লেন ১৯৩৫ সালের শুরুতেই। অলিম্পিক জাহাজে চড়ে আমেরিকা পাড়ি দিলেন লিও। আইনস্টাইন ততদিনে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে লিওকে একটা শিক্ষকতার কাজ দেবার জন্য পদার্থবিদ্যা বিভাগে একটি অনুমোদন পত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন।

১৯৩৪, আমেরিকা।

বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট ওপেনহাইমারের কাছে বেলজিয়াম থেকে একটা চিঠি এল। চিঠিতে জার্মান উদ্বাস্তু অধ্যাপকদের অর্থসাহায্যের আবেদন জানানো হয়েছে। নিজে যে একজন ইহুদি, সে-কথা রবার্টের মনেই থাকে না। পত্রপাঠ তিনি বুঝে গেলেন, ইহুদি এবং একজন দায়িত্ব সচেতন ব্যক্তি হিসাবে এই ত্রাণ তহবিল গড়তে তাঁর অবশ্যই এগিয়ে আসা উচিত। তিনি চিঠি লিখলেন যে, প্রতিমাসের বেতন থেকে তিন শতাংশ তিনি এই ত্রাণ তহবিলে পাঠাবেন। আপাতত দুই বছরের জন্য এটাই বহাল থাকবে।

চিঠি লেখা শেষ হতে রবার্ট অনেকক্ষণ পৃথিবী জুড়ে রাজনীতির পালাবদল নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। রবার্টের জার্মান অধ্যাপক, জেমস ফ্র্যাঙ্ক তখনও বার্লিনে গোটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। তিনিও একজন ইহুদি, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বীরত্বের কাজ করার জন্য জার্মানি তাঁকে আয়রন ক্রস উপাধি দেয়। কাজেই এই অধ্যাপককে বরখাস্ত করতে নাৎসি পার্টি পারেনি। কিন্তু ফ্র্যাঙ্কের ওপর চাপ আসছে অন্যান্য ইহুদি অধ্যাপকদের চাকরি কেড়ে নেবার জন্য। ফ্র্যাঙ্ক কতদিন যে ওদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন কে জানে।

রাজনীতি নিয়ে আগে মাথা ঘামাতেন না ওপেনহাইমার। কিন্তু তাঁর নতুন এক পিএইচডির ছাত্র রবার্ট সারবার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সামান্য যোগাযোগ রাখে। জার্মান কমিউনিস্টদের ওপর নাৎসি অত্যাচারের নানা ঘটনা সে তুলে ধরে প্রিয় অধ্যাপকের সামনে। ওপেনহাইমার সব শোনেন, কিন্তু নিজে আলোচনায় সক্রিয় অংশ নেন না। বরং মেধাবী ছাত্রটি রাজনীতি সরিয়ে রেখে গবেষণায় মন দিলে কত ভালো হবে, মাঝে-মধ্যে বলেন তাকে। ওপেনহাইমার জানেন, তাঁর সহোদর ফ্র্যাঙ্ক নিজেও কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠনের একজন সক্রিয় কর্মী। তবে রবার্টকে সে রাজনীতি বোঝাতে আসে না।

(দুই রবার্ট, ছাত্র ও অধ্যাপক)

এর মধ্যে সারবার আর ফ্র্যাঙ্কের সঙ্গে ওপেনহাইমারের কাছে এল তরুণী জিন ট্যাটলক। বেশ আকর্ষণীয় তার চেহারা। পড়াশুনো করেছে মনস্তত্ত্ব নিয়ে। এক নজরেই প্রেমে পড়ে গেলেন রবার্ট ওপেনহাইমার। মানুষের মানসিক জটিলতা নিয়ে ওপেনহাইমারের বেশ কিছু প্রশ্নের মনোগ্রাহী উত্তর হৃদয় জয় করে নিল মেয়েটি। সেও নাকি কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় কর্মী! জমে গেল দুজনের বন্ধুত্ব; রবার্ট ওপেনহাইমারকে ট্যাটলকের সঙ্গে শহরের রাস্তায় ঘুরতেও দেখা গেল। ট্যাটলকের একটাই দুঃখ, আমেরিকার কমিউনিস্ট সংগঠনে জোর করেও ব্যস্ত অধ্যাপককে নিয়ে যাওয়া গেল না। নিজের গবেষণায় আত্মমগ্ন এক সন্ন্যাসী যেন রবার্ট।

(ক্রমশ)

বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক-নাসির অল-দিন অল-তুসি – এক বহুমুখী প্রতিভা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬২
বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক-টাইকো ব্রাহেঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৩
বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক-মাইকেল ফ্যারাডেঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৪
বিজ্ঞান দিশারী নিকোলা টেসলাঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৫
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-নেপিয়েরঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৬
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-অ্যাম্পিয়ারঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৭
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-নোবেলে উপেক্ষিতা পদার্থবিদ লিস মেইটনারঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৮
বাগ্মী হকিং ১অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৮
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-ল্যাভশিয়ারঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৯
বাগ্মী হকিং -২ ব্রহ্মাণ্ডে প্রাণ সৃষ্টি প্রসঙ্গেঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৯
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক রোবোটিক্সের পূর্বপুরুষ আল জাজারিঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭০
তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ(১)-মেরি কুরিগৌতম গঙ্গোপাধ্যায়৭০
বাগ্মী হকিং-৩অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭০
মহাকাশে সুরের খোঁজে । উইলিয়াম হার্শেল অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭১
তেজস্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগন(২) হ্যারিয়েট ব্রুকসগৌতম গঙ্গোপাধ্যায়৭১
বাগ্মী হকিং -৪অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭১
বাগ্মী হকিং -৫অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭২
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-লুই আগাসিজঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭২
তেজস্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ- নিউক্লিয় বিজ্ঞানে নারী (৩) লিজে মাইটনার, স্টেফানি হরোভিৎজ, এডা হিচিন্স ও এলেন গ্লেডিচগৌতম গঙ্গোপাধ্যায়৭২
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-রবার্ট বয়েলঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৩
তেজস্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ পর্ব ৪গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়৭৩
বাগ্মী হকিং ৬অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৩
জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৪
তেজস্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ- নিউক্লিয় বিজ্ঞানে নারী (৫)গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়৭৪
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক লিউয়েন হকঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৫
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক অঙ্কের যাদুকর- কার্ল ফ্রেড্রিক গসঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৬
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-লুই মর্গ্যানঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৭
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-লিওনার্দো দা ভিঞ্চিঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৮
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-রন্টগনঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৯
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-বোলজম্যানঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮০
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-উপেক্ষিত বিজ্ঞানী রবার্ট মেয়ারঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮১
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন –দ্য ডার্ক লেডি অফ ডি এন এঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮২
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-প্রতিবাদী বিজ্ঞানী- জোসেফ প্রিস্টলেঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৩
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-বিজ্ঞান সাধক কবি ওমর খৈয়ামঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৪
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-লুইগি গ্যালভানিঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৫
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৬
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-লাপ্লাসঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৭
এডোয়ারড জেনারঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৮
এডমণ্ড হ্যালিঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৯
গ্যালিলিওর দুরবিণঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৯১
ক্ষুদ্রতম কণার খোঁজে ডিমোক্রিটাস থেকে ডালটনঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৯৩

জয়ঢাকের  বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

Leave a Reply