বই পড়া

পুরোনো বই-বনপথের পাঁচালি

রিভিউ করলেনঃ পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়

bookreviewold (Small)ঘুরে বেড়ানোর গল্পকথা,সেও আবার ছোটদের মত করে গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে-এমন বই হাতে পেলে ছোটরা তরতর করে পড়ে ফেলবেই। এমনিই একটা বই নতুন করে ছেপেছে সপ্তর্ষি প্রকাশন,২০১৩ সালে।এই ৮৭ পৃষ্ঠার বইয়ের দাম রাখা হয়েছে ১২৫/-লেখক হলেন পরিমল গোস্বামী;সহযাত্রী শ্রী বিভূতিভূষণের স্মরণে বইটির নামও রেখেছেন লেখক “বনপথের পাঁচালি।” ১৯৭৪ সালে যদিও এর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল “রূপা” থেকে;তার প্রচ্ছদের ছবিও দেওয়া হয়েছে;নতুন করে বইটি সাজিয়েছেন শ্রী সৌরিশ মিত্র।

উৎসর্গে আছে তিনটি বিখ্যাত নাম। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়,কিরণকুমার রায় ও সুধাংশুপ্রকাশ চৌধুরী। এঁরা সবাই মিলে বেড়াতে বেরিয়েছেন। এই বেড়ানো-কাণ্ডের সূচনা হয়েছিল “বঙ্গশ্রী” মাসিক পত্রিকার দপ্তরে। কে না আসতেন সেখানে! ৫০ দশকের সাহিত্যের সব তারাদেরই ভিড় ছিল সেখানে।

আর কী ফাটাফাটি আড্ডা-ঝগড়া,তর্ক,মারামারি,বন্ধুত্ব! হ্যাঁ মারামারি শুনে যেন অবাক হয়ো না। লেখকের ভাষায় “নিখিলচন্দ্র দাস এলে বিপর্যয় ঘটত…তাঁকে হাসিয়ে দিলে তিনি হাসতে হাসতে সবাইকে মারতেন…বেশি ঘনিষ্ঠদের বেশি মারতেন।”

সেটা ১৯৩৩ সালের কথা। লেখক তখন ৩৬,বিভূতিবাবু ৪০,একদিন বিভূতিবাবু এসে হন্তদন্ত হয়ে বললেন “পরিমলবাবু আমায় চট করে ফোটোগ্রাফিটা শিখিয়ে দিতে পারেন? এখুনি দরকার। ”

এমন আশ্চর্য ছেলেমানুষী আবদার হয়ত একমাত্র বিভূতিভূষণকেই মানায় কারণ সেদিনই তারা ট্রেনে উঠবেন উড়িষ্যার বিক্রমখোলে এক প্রাচীন শিলালিপির সন্ধানে। পরিমলবাবুও ঝুলে পড়লেন ঐ দলে। শেখানোর চেয়ে একজন ফটোগ্রাফার থাকার অনুমতি জোগাড় হয়ে গেল।

দলপতি বিভূতিভূষণ “কখনো রাগ করতেন না। তাঁর পোশাকআশাক ছিল এলোমেলো। শহুরে চাল তিনি ভালোবাসতেন না।”

তিনি ডিক্রি জারি করলেন-খাবার দাবার নিয়ে পথের ভার বাড়ানো কোনোমতেই চলবে না। তবু পরিমলবাবুরা লুকিয়ে মাখন,রুটি,মার্মালেড ভরলেন ব্যাগে। এবার ট্রেনে উঠে শুরু হল মজা।

অনেকদূর যাবার পর “সিনি” স্টেশনে ঘুম ভেঙে উঠেই বিভূতিবাবু বলছেন

“এখানকার হাওয়া অতি সাংঘাতিক।”bookreviewoldodlcover (Small)

“কেন! ঠাণ্ডা লাগল নাকি?”

“ঠাণ্ডা!ঠাণ্ডা লাগেনি। আগুন লেগেছে।”

“কোথায়?”

“পাকস্থলীতে। প্রমোদবাবু ব্যাগে কিছু থাকে তো বার করুন,অবিলম্বে।”

এই পর্যন্ত পড়ে হাসতে হাসতে অস্থির হবে পাঠক। এরপর এরকম ঘটনা আগে ঘটতে থাকবে। কাহিনী গড়াবে লেখকের স্বভাবসিদ্ধ হাস্যরস পরিবেশনের বর্ণনা ধরে।

প্রথম প্রকাশকালের মলাট

প্রকৃতিপাগল বিভূতিভূষণকে বইয়ের ছত্রে ছত্রে ধরা আছে। ট্রেন থেকে বাইরের প্রকৃতি দেখে “হঠাৎ বিভূতিবাবু চড়া সুরে কীর্তন গাইতে আরম্ভ করলেন…উন্মাদের মত আসন থেকে উঠে আমার হাত চেপে ধরে বললেন, ‘পরিমলবাবু খেপে যান…তা ছাড়া কোন আর উপায় নেই।’ ”

দ্বিতীয় অভিযান “হাতি খেদা।” আরেক অভিজ্ঞতা। খেলার ধারাভাষ্যের মত বর্ণনায় আমরাও লেখকের সঙ্গে চড়ে পড়ি ট্রেনে,বাসে,ট্রেকার,গরুর গাড়িতে। এবার অন্য দুজন বন্ধু সঙ্গী। হাতিখেদা কী? কী করে বুনো হাতি ধরা পড়ে সেই দেখতে এবার গন্তব্য জয়ন্তী। এই জয়ন্তীর এক আশ্চর্য বর্ণনা লেখকের কলমে এভাবে ফুটেছে-

“আধঘন্টার মধ্যে সেখানে জমে গেল অনেকগুলো ছোটো মেঘশিশু…সমস্ত মেঘ কুয়াশা হয়ে আমাদের ঘিরে ফেলল,দেখতে দেখতে সমস্ত কুয়াশা ঘন নীল হয়ে গেল…যেন বিরাট পিচকিরি দিয়ে নীলের গুঁড়ো স্প্রে করে দিয়েছে…সুধাংশু বিজ্ঞানী কিন্তু সে হঠাৎ বিজ্ঞান ভুলে নীলার গান গাইতে লাগলো…”

আবার একজায়গায় রসিক লেখক কাঞ্চনজঙ্ঘায় প্রথম সূর্যোদয়ের বর্ণনা দিতে দিতে একসময় লিখছেন “দুপুরে যখন ভাত খেতে বসলাম তখন সে চালের সুগন্ধ,মাংসের অপূর্ব স্বাদ এ সব ভুলিয়ে দিল। মনে হল কীসের কাঞ্চনজঙ্ঘা।”

ছোটদের মনের মত লেখা,প্রকৃতিবর্ণনা বা অভিজ্ঞতার ঝুলি উপুড় করে কোথাও ভার বাড়ানো নেই। বন আর বন্যপ্রাণকে ভালোবাসার নজির বই জুড়ে। যখন লেখেন হাতিখেদা নিয়ে “আগাগোড়া সবটাই একটা অতি নিষ্ঠুর ব্যবস্থা…এদের আটক করে বন্য স্বভাব ভুলিয়ে ক্রীতদাস বানানো…মানুষ এদের কিনে নিয়ে নিজের কাজে লাগাবে”-

এখানটা পড়ে একটা শিশুমন কিছুতো ভাবনার রসদ পাবে। হয়ত বেড়াতে গিয়ে হাতি চড়ে আনন্দ করার মানেও একটু ভাববে। এভাবে সহজে বন্ধন আর মুক্তির কথা পড়ে নিতে পারবে।

বাইরে বেরোলে যে কত কিছু জানা যায়,সেই প্রকৃতিপাঠের সূচনা করেছেন এই বইতে। শেষদিকে আছে এক মজার ছড়া। পরশুরামের। সবমিলিয়ে বইটা ভারি চমৎকার।

“চাঁদের জয় হোক

পরোপকারী ভদ্রলোক

আস্ত  খেঁদো ফালি সব অবস্থাতে

যথাসাধ্য লন্ঠনের কাজ করে রাতে

সূর্য্যিকে নমস্কার

এ দেবতা মহা ফাঁকিদার

চোপর রাতে দেখা নেই মোটে                                                 

দিনের বেলা রূপ দেখাতে ওঠে”

আগের পর্বগুলো একত্রে এইখানে