ভূতের আড্ডা -ভূতের গল্প-খুলির আর্তনাদ -চতুর্থ পর্ব -মহাশ্বেতা

আগের পর্ব

bhooteradda012 (Small)আপনি যদি ওকথা না বলতেন তাহলে আমরা নিশ্চয়ই ওই চিৎকার শুনতাম না, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আপনি ব্যাপারটাকে কাকতালীয় বলতেই পারেন, সে আপনার ইচ্ছা। কিন্তু কিছু মনে করবেন না, আমার মনে হয় আপনার আর ওকে গাল দেওয়াটা উচিৎ হবে না। আহা রে, হয়তো বেচারি বউটা শুনতে পায়, শুনে দুঃখ পায়, বুঝতে পারছেন না আপনি?

ভূত? না, না! যে জিনিসটাকে দিনের বেলা হাতে নিয়ে দেখতে পারি, আর ঝাঁকালে খটখট করে ওঠে সেটাকে তো আর ভূত বলা যায়না ঠিক। কিন্তু জিনিসটা সব শোনে, সব বোঝে, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। এখানে প্রথম থাকতে এসে আমি সেরা শোবার ঘরটাতে ঘাঁটি গাড়বার চেষ্টা করেছিলাম। কারণ গোটা বাড়িতে সবপচেয়ে বেশি আরাম ওই ঘরটাতেই। কিন্তু কিছুদিন পরেই সে আশা ছেড়ে দিতে হল আমায়, বুঝলেন মশায়। ওই ঘরেই তো আগে শুত ওরা। আর ওই খাটেই তো বেচারির মৃত্যু। আর আলমারিটা দেয়ালের গায়ে, খাটের মাথার দিকে। ওখানেই ওটা থাকতে চায়, ওর ওই বাক্সে। আমি এখানে আসার পর সপ্তাহদুয়েক ওই ঘরে থাকতে পেরেছিলাম, তারপর বাপ বাপ করে নিচতলায় ছোট একটা ঘরে চলে গেলাম, লিউকের সার্জারিতে। রাত্তিরে কল আসবার সম্ভাবনা থাকলে লিউক ওখানে শুতো।

ডাঙায় থাকলে আমি চিরকালই মড়ার মত ঘুমোই। আট ঘন্টা হল আমার রোজকার হিসেব। একা থাকলে এগারোটা থেকে সাতটা। সঙ্গে কেউ থাকলে বারোটা থেকে আটটা। কিন্তু ওই ঘরে ভোর তিনটের পর আর ঘুমোতে পারতাম না। ঠিক সোয়া তিনটেতে শুরু হত, আমি আমার পকেট ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি। ঠিক তিনটে বেজে সতেরোতে। হয়তো ওই সময়ই ও খুন হয়েছিল।

    আপনি যেটা শুনলেন সেরকম কিছু নয়। ওরকম হলে আমি দু রাতের বেশি সহ্য করতে পারতাম না। খালি আলমারি থেকে একটু কেমন আঁতকে ওঠার আওয়াজ, একটু গোঙানি, টেনে টেনে নিশ্বাসের শব্দ,  কয়েক মুহূর্ত ধরে। সাধারণত অতটুকু আওয়াজে আমার ঘুম ভাঙার কথাই নয় । এইদিক থেকে আপনিও বোধ করি আমার মত, আর আর পাঁচটা নাবিকদের মতই প্রাকৃতিক আওয়াজে আমাদের কিছু আসে যায় না।বেজায় ঝড়ে সমুদ্র উথালপাথাল হলেও নয়। কিন্তু যদি একটা পেনসিল হঠাৎ ভেসে উঠে কেবিনের টেবিলে ড্রয়ারের মধ্যে খটখট করতে থাকে তাহলে মুহূর্তের মধ্যে আমি উঠে পড়ব। এইরকমই – সবসময় আমি বুঝতে পারি। সে যাই হোক, আলমারির শব্দটা ওর থেকে বেশি কিছুই ছিল না, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার ঘুম ভেঙে গেছিল।

    আমি আঁৎকে ওঠার আওয়াজ বলেছিলাম। আমি জানি আমি ঠিক কী শুনেছি, কিন্তু অন্য কাউকে সেটা বোঝাতে গেলে পাগলের প্রলাপ মনে হবে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আঁৎকে ওঠার আওয়াজ নেই কোন, দাঁত চিপে রেখে, ঠোঁট দুটো ফাঁক করে খুব জোরে নিশ্বাস টানার আওয়াজ হতে পারে বড়োজোর। আর কাপড় সরে যাওয়ার মৃদু শব্দ। এইরকমই কিছু শুনতে পেয়েছিলাম আমি।

টের পাচ্ছিলাম কাবার্ডের মধ্যে কিছু একটা শুরু হয়েছে। শব্দটা হয়ত কাবার্ডে নয়, আমার মাথার মধ্যেই হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন একটা বাক্সের মধ্যে থেকে চাপাভাবে বেরিয়ে আসছে। শুনে কিন্তু তখন মাথার মাথার চুলও খাড়া হয়ে যায়নি, রক্তও ঠান্ডা হয়ে যায়নি। শুধু ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল কাবার্ডের কোন একটা ফাটল দিয়ে বাইরের বাতাস ঢুকেছে ভেতরে। আলো জ্বালিয়ে ঘড়িতে দেখলাম রাত তিনটে সতেরো।

বাঁ কানটায় কম শুনি। ছোটোবেলায় একবার সমুদ্রে ডাইভ দিতে  গিয়ে চোট লেগেছিল। কাজেই এবার কাত হয়ে ডান কানটা বালিশে চেপে ফের চোখ বুঁজলাম। আওয়াজ কিন্তু থামল না। আর তারপর প্রত্যেক রাতে ওই একই সময়ে–

 bhu08

দিনপনেরো  এমন চলার পর আর সহ্য হল না। হয়েছিল কি, সেদিনও ভালো কানটাকে বালিশে গুঁজে শুয়েছিলাম। ও অবস্থায় বালিশের পাশে ফগহর্ন বাজলেও আমার কিছু শুনতে পাবার কথা নয়। কিন্তু সেদিন দেখি আমার বাঁ কানেও শব্দটা শুনতে পাচ্ছি। মাথাটা গরম হয়ে গেল আমার। সটান উঠে বসে আলো জ্বালিয়ে কাবার্ড খুলে ফেললাম। তারপর বাক্সটাকে বের করে এনে একটানে জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। আর তারপরেই মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে উঠল আমার। জিনিসটা চিৎকার করে উঠল!! বারো ইঞ্চি কামানের গোলার শিসের মতন আওয়াজ করে উড়ে গিয়ে পড়ল রাস্তার একেবারে ওপাড়ে।

সে রাতে আর ঘুম হবে না বুঝে উঠে পড়লাম আমি। পাইপ জ্বালিয়ে একটা বই টেনে নিয়ে পড়তে বসলাম, কিন্তু তার একটা লাইনও আমার মাথায় ঢুকছিল না। মাথায় না ঢকবার কারণ ওই চিৎকার। আধঘন্টাটাক বাদেই বাইরে থেকে ফের এই আজকের রাতের মত চিৎকারের শব্দ ভেসে এল। তারপর খানিক বাদেবাদেই বারবার চিৎকার উঠছিল, আর মনে হচ্ছিল  প্রতি বারে সেটা আরো কাছে এগিয়ে আসছে। শেষমেষ আর যখন সহ্য হচ্ছে না তখন নীচে, বাইরের দরজায় কে যেন টোকা দিল। ভাবলাম বাঁচা গেল। একটা মানুষের শব্দ হাজার হোক।

তাড়াতাড়ি নীচে গিয়ে দরজা খুলে দেখি কেউ কোথাও নেই। ঠিক তক্ষুণি মেঝেতে কিছু একটা গড়িয়ে এসে পায়ে ঠোক্কর খেয়ে থেমে গেল। চমকে উঠে দেখি খুলিটা এসে পয়ের কাছে ঠেকেছে।

তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে জিনিসটাকে হাতে তুলে টেবিলের পর মোমবাতিটার পাশে বসিয়ে দিলাম। মোমের কাঁপা কাঁপ আলোয় বারবার মনে হচ্ছিল খুলিটার চোখের কোটরগুলো খোলাবন্ধ করছে। আর—তারপর—হঠাৎ করে মোমবাতিটা নিভে গেল। হাওয়াবাতাস কিছু ছিল না অবশ্য। এমনিমনিই নিভে গেছিল সেটা। গোটা ছয়েক দেশলাইকাঠি নষ্ট হল আমার সেটাকে ফের জ্বালাতে।

হ্যাঁ ভয় পেয়েছিলাম আমি। অস্বীকার করে লাভ নেই। চুপচাপ বসে খুলিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বইছিল আমার। মনে হচ্ছিল, সে  ফিরে এসেছে। দোতলায় নিজের জায়গাতে ফিরে যেতে চায়। আস্তে আস্তে উঠে খুলিটাকে নিয়ে ফের তার জায়গায় ফিরিয়ে দিয়ে এলাম। মনে আছে যেতে যেতে সেটার সঙ্গে কথাবার্তাও বলছিলাম আমি। বাকি রাতটা জেগেই কাটিয়ে দিলাম আমি। আলোটা জ্বালিয়েই রেখেছিলাম। রাস্তা পেরিয়ে যে খুলি এসে দরজায় টোকা দিতে পারে তার সঙ্গে এক ঘরে থেকে ঘুম আসা সম্ভব নয়।

সকাল হতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে থেকে খুলির বাক্সটাকে ফেরত এনে কাবার্ডের খুলিটাকে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম। খানিক বাদে কাজের মেয়েটা ফ্যাকাশে মুখে আমার সকালের খাবারটা নিয়ে এসে বলল, মাইনেটাইনেয় কাজ নেই, সে আর এ বাড়িতে থাকছে না। না বোঝার ভান করে বেশ অবাক অবাক মুখ করে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা কী? সে তাতে পাত্তাই না দিয়ে মুঘ ঝামটা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল আমি কি এই ভূতের বাড়িতে এর পরেও থেকে যেতে চাই নাকি। আর থাকলে আমি আর কদিন প্রাণে বাঁচব সে বিষয়ে কিছু ভেবেছি কি না!

কাজের মেয়ে চলে যাবার পর সেদিন আমি সেরা ঘরে ঘুমোবার আশা ত্যাগ করে নিচতলায় নেমে এলাম। কদিন বাদে কিছু মাঝবয়েসি কয়েকটা স্কটিশ কাজের লোক জোগাড় করে নিয়ে এলাম বাড়িতে। এরপর বেশ কদিন খুব নিশ্চিন্তে কাটনো গেল। দুই নতুন কাজের মহিলা গল্পটল্প শুনে বাঁকা হেসে বললেন, ওসব কর্নিশ ভূতের গল্পে তাঁদে বিশ্বাস নেই। এ আগে নাকি তাঁরা গুটিদুই ভূতের বাড়িতে কাজ করে এসেছন, কিন্তু ভূতের টিকিটো দেখেন নি। তবে সে বছরের শেষের দিকে তাদের একজন কাজে জবাব দিল আর অন্যজন  আমাদের চার্চের পাদ্রি জেমস ট্রেনহ্যামকে বিয়ে করে সংসার পাতল।

অতএব এখন রাতে আমি  বাড়িতে একলাই থাকি। দিনের বেলায় মিসেস ট্রেনহ্যাম এসে সব কাজকর্ম সেরে দিয়ে যান। খুলিটাকে দেখবেন ভাবছেন? আমার কোন আপত্তি নেই মশাই। নিখুঁত খুলি। শুধু নীচের চোয়ালের দুতিনটে দাঁত নেই। বলতে গিয়ে মনে পড়ল, খুলিটার নিচের চোয়ালটা কিন্তু ট্রেনহ্যামই খুঁজে পেয়েছিল। গত বসন্তে অ্যাসপারাগাস রুইবার জন্য বাগানে গর্ত খুঁড়তে গিয়ে সে চোয়ালটা খুঁজে পায়। মাটি খুঁড়তে গিয়ে একদলা পোড়া চুণ উঠেছিল। তার মধ্যেই চোয়ালটা আটকে ছিল। ট্রেনহ্যামের এ ব্যাপারে ভালো অভিজ্ঞতা আছে। বলে এটা কোন কমবয়েসি মেয়ের।  মরার সময় দাঁতগুলো তার আস্তই ছিল, তবে মাটি খোঁড়বার সময় কোনভাবে সেগুলো খুলে বেরিয়ে গেছে। জিনিসটা আমার কাছে নিয়ে সে সে বলে চাইলে আমি সেটা রেখে দিতে পারি, আর তা না হলে সে চার্চের কোন কবরে সেটা দিয়ে দেবে। হয়ত কোন সৎ খ্রিষ্টানের হাড়! ঠিকঠাক কবরে তার যাওয়াই উচিত হবে।

bhu07তাকে বললাম, ডাক্তাররা অনেকসময় চুণের মধ্যে হাড় রেখে দেয় তাকে ঠিকঠাক পরিষ্কার করবার জন্য। বোধ হয় প্র্যাটও এই উদ্দেশ্যেই এইটেকে চুণের মধ্যে ভরে মাটির তলায় পুঁতে রেখেছিল।

জবাবে ট্রেনহ্যাম শুধু আমার দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে বলে, “আপনার ঘরে রাখা খুলিটার সঙ্গে চোয়ালটা বোধ হয় মানিয়ে যাবে স্যার। ওই খুলিটাকেই বোধ হয় প্র্যাট ডাক্তার চুণের মধ্যে রেখেছিল পরিষ্কার করবার জন্য। তারপর সেটা বের করে নেবার সময় চোয়ালটা সেখানেই থেকে যায়। কী বলেন? চুণের ড্যালাটার মধ্যে মানুষের মাথার দু এক গাছি চুলও ছিল স্যার।”

ট্রেনহ্যাম বোধ হয় কিছু জানে। ওর চার্চের চ্যাপেলেই তো দের কবর দেয়া হয়েছে। মিসেস প্র্যাটকে কবর দেবার সময় কি খেয়াল করেছিল যে ওর মাথাটা নেই? নাকি লিউককে একই জায়গায় গোর দেবার সময়–

ঝড় উঠছে আবার! আওয়াজ পাচ্ছেন? আজকের রাতটা ভালো যাবে না মশাই—

ক্রমশ