সুরঢাক সব এপিসোড একত্রে

মারোয়া বা মারওয়া ঠাট এর রাগ মারোয়ার পর এবার কাফি ঠাটের জনক রাগ কাফি।
মিলন, বিচ্ছেদ, ভক্তি সব রকম রসেরই আধার এই জনপ্রিয় রাগ কাফি রাতের ভৈরবী নামেও পরিচিত।
পণ্ডিত বিষ্ণুদিগম্বর ভাতখন্ডে’র ‘হিন্দুস্হানী সঙ্গীত পদ্ধতি – ক্রমিক পুস্তক মালিকা’য় কল্পদ্রুমাঙ্কুর, চন্দ্রিকাসার, অভিনবরাগমঞ্জরী ইত্যাদি প্রাচীন বই থেকে সর্বজনপ্রিয় এই কাফি রাগটির বর্ণনা অনুযায়ী গা ও নি স্বরদুটি এই রাগে কোমল। বাদী স্বর পা ও সম্বাদি স্বর সা। জাতি সম্পূর্ণ -সম্পূর্ণ – অর্থাৎ আরোহণ ও অবরোহণে সবকটি স্বরই লাগে। পরিবেশনের সময় মধ্যরাত্রি। ভিন্নমতে রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর (৯-১২)। রাগে বৈচিত্র আনার জন্য আরোহণের সময় শুদ্ধ গা আর শুদ্ধ নি অনেকসময়ই লাগান হলেও মনে রাখতে হবে এই স্বরদুটি এই রাগের নিয়মিত স্বর নয়। এই স্বরদুটির প্রয়োগ হয় বিবাদী স্বর হিসেবে। আবার অনেক পারদর্শী সঙ্গীতকার রাগরূপের হানি না করেও কখনও কখনও কোমল ধা প্রয়োগ করতে পারেন। মূলতঃ স, জ্ঞ(গ), ম, প, ণ (ন) এই স্বরগুলির মধ্যেই কাফির রাগবৈশিষ্ট নির্ভর করে। ‘সস রর জ্ঞজ্ঞ মম প’ -এই স্বরসঙ্গতি শুনলেই এই রাগটিকে সহজে চিনে নেওয়া যায়।
প্রাচীন যে বন্দীশটি দেওয়া আছে নীচের লিঙ্ক এ, সেটি দীপচন্দী তালে বলে এই তালটির বোল নীচে দেওয়া হল, কারণ এই তালটিও দাদরা, কাহারবা বা ত্রিতালের মত তেমন বেশি শোনা যায় না।

DAW সফ্টওয়্যারে তালটির ঠেকা বাজিয়ে লিঙ্ক দেওয়া আছে এই লেখাটির সাথে।
বাদী সম্বাদী স্বর নিয়ে মতবিরোধ আছে এই রাগে। প্রাচীন শাস্ত্র মতে পা ও সা, আবার অন্য অনেকের মতে কোমল গা(জ্ঞ) ও কোমল নি(ণ) যথাক্রমে এই রাগের বাদী সম্বাদী স্বর। ধ্রুপদ, ধামার ছাড়াও, গা, নি স্বরদুটির কোমল ও শুদ্ধ দুটি রূপেরই প্রয়োগ করা যায় বলে এই রাগে হোরি, কাজরী, ঠুমরী, টপ্পা, টপ্ খেয়াল, দাদরা, ভজন, গীত ইত্যাদি সব ধরণের রচনাই পরিবেশন করা যায়।
কাফি রাগের কিছু বিশেষ স্বরবিন্যাস –
সস রর জ্ঞজ্ঞ মম প-; রণ ধণ পধ মপ জ্ঞর; সর মজ্ঞ রজ্ঞ স-; ধপ মপ মপ জ্ঞ র; রজ্ঞ মপ রজ্ঞ র-; ণধ পম জ্ঞর; ণ ধ; মপ ধণ পধ র্স; র্সণ ধপ মপ ধপ জ্ঞর; প ম জ্ঞ র ম জ্ঞ র স।

জাতি-সম্পূর্ণ সম্পূর্ণ, বাদী – পা(ভিন্নমতে-জ্ঞ), সম্বাদী – সা (ভিন্নমতে -ণ; জাতি – ষাড়ব – ষাড়ব); সময় – মধ্যরাত্রি। ভিন্নমতে রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর।
মজার কথা হল আধুনিক কালে (মোটামুটি চতুর্দশ শতক বা ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দের পর) বিলাবল রাগের স্বরসপ্তককেই শুদ্ধ সপ্তক বলে ধরা হয়, অর্থাৎ বিলাবল রাগের স্বরগুলিকেই আমরা শুদ্ধ স্বর বলে জানি। কিন্তু তার আগে বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে এই কাফি রাগের স্বরগুলিকেই শুদ্ধ সপ্তক ধরা হত। তখন কাফির কোমল গা আর কোমল নি স্বর দুটিই ছিল শুদ্ধ সপ্তকের অঙ্গ। দক্ষিণ ভারতীয় পদ্ধতিতে কোমল গা কে সাধারণ গান্ধার বলা হয়।
অডিও লিঙ্ক ১ এ প্রথমে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সুরে কাফি রাগে আধারিত ‘গোদান’ সিনেমায় মহঃ রফির গাওয়া ‘বিরজ মে হোলি খেলত নন্দলাল’, তারপরে ‘চাচা জিন্দাবাদ’ ছবিতে মদনমোহনের সুরে ‘ব্যয়রন নিঁদ না আয়ে’, লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া, তৃতীয় অংশে শচীন দেব বর্মনের সুরে ‘জাল’ ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্য়াযের গাওয়া ‘ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনী’ গানগুলির অংশ শুনলে খানিকটা বোঝা যাব রাগটির চলন।
এরপর ঐ লিঙ্কে শোনা যাবে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতারে রাগ কাফির অংশবিশেষ, তারপর সিদ্ধেশ্বরি দেবীর হোরির একটুখানি, আর শেষে মালিনী রাজুরকর এর টপ্পার অংশবিশেষ।
লোকসঙ্গীতের আধার হওয়া বা গা ও নি শুদ্ধ কোমল দুটি স্বরেরই প্রয়োগ সত্ত্বেও এই রাগটি লঘু সঙ্গীতের স্তরের এমন ভাবার কোন কারণ নেই। এই রাগে ধ্রুপদ, ধামার, ছোট খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা সবই পরিবেশিত হয়। বিভিন্ন কানাড়া, বাহার, মল্হার, মিশ্র অঙ্গ মিলে পঞ্চাশটিরও বেশী রাগ আছে কাফি ঠাটে বা স্কেলে। সত্যি বলতে কি কাফি কথাটির মানেও প্রচুর বা অনেক। এমনকি কোরাণে ঈশ্বরকে কাফি বা ‘সেই তিনি যিনিই যথেষ্ট’ এমন ইঙ্গিত আছে। ভারতের বিভিন্ন লোকগানে কাফির ছায়া বা সঙ্গীতে দিক্ষিত, অদিক্ষিত সব ধরণের কানেই এই রাগের গ্রহণযোগ্যতা এই রাগের জনপ্রিয়তা ও প্রাচীনত্বকেই প্রমান করে। এই রাগের চলন সোজাসুজি, বক্র সব রকমই হতে পার, যে কোন লয়েও এই রাগ পরিবেশন করা যায়, অনেক ধরণের রসেরও আধার এই রাগ আবার রাগের গঠন অনুযায়ী যদিও মধ্যরাতের রাগ, তবু যে কোন সময়েই বা ঋতুতেই এই রাগ পরিবেশন করা যায় – তাই কাফি রাগের পরিসর অনেক বিস্তৃত।
দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের খরহরপ্রিয়া মেল কাফি ঠাটের সাথে তুলনীয়। কাফি রাগকে দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দুস্তানী কাপির সাথে তুলনা করা হয়, যদিও এর মিল পিলু রাগের সাথেই বেশি। ষড়জ, পঞ্চম বাদে খরহরপ্রিয়া ঠাটে যে স্বরগুলি ব্যবহৃত হয় সেগুলি হল – চতুঃশ্রুতি ঋষভ(R2), সাধারণ গান্ধার(G2), শুদ্ধ মধ্যম(M1), চতুঃশ্রুতি ধৈবত(D2), কৈশিকি নিষাদ(N2)। আধুনিক গ্রীক ডোরিয়ান মোড (ডায়াটোনিক জেনাস) বা বালাকিরেভ এর মতে রাশিয়ান মাইনর এর সাথে এই ঠাটটির মিল আছে।
ডোরিয়ান মোড-এ বিখ্যাত ‘সি চ্যান্টি’ বা সাগর-মাল্লাদের গান ‘হোয়াট শ্যল আই ডু উইদ আ ড্রাঙ্কেন সেইলর’ এর একটুখানি আর নীচের রেকর্ডটির কিছু অংশ বাজিয়ে দেওয়া আছে অডিও লিঙ্ক ২এর প্রথমে।
What shall we do with a drunken sailor,
What shall we do with a drunken sailor,
What shall we do with a drunken sailor,
Early in the morning?
Put him in the long boat till he’s sober.
What shall we do with a drunken sailor
Early in the morning? ……...(এ বিষয়ে আরো তথ্য এইখানে)
সাথে দেওয়া অডিও লিঙ্ক ২এ হোয়াট শ্যল আই ডু এর পর দুই আবর্তন দীপচন্দী তালের ঠেকা, তারপর ব্রজ মে হরি হোরি মচাই (মধ্যলয় দীপচন্দী তাল) ও পরে প্রভু তেরী দয়া হ্যয় অপার (মধ্যলয় ত্রিতাল) DAW সফ্টওয়্যারে বাজিয়ে দেওয়া আছে। এই দুটির স্বরলিপি দেওয়া হল।
