আতা গাছে তোতা পাখি
ডালিম গাছে মৌ
এত ডাকি তবু কথা
কয় না কেন বৌ

যে গাছটি সম্বন্ধে এত সুন্দর ছড়া রয়েছে সেই গাছটির নাম যে সব বাঙালি ছেলেবেলা থেকেই জানে সে কথা বলাই বাহুল্য। এই গাছটি শহরাঞ্চলে বিশেষ আর দেখা যায় না। তবে গ্রামের খামার বাড়িতে বা বাগানে আম, কাঁঠাল , নারকেল গাছের সঙ্গে এর দেখা মেলে আজও।
এই গাছটি আম,জাম গাছের মত বৃক্ষ শ্রেণীর নয়। বরং জবা গাছের মত গুল্ম জাতীয় গাছ। আতা গাছের পাকা ফল খুবই সুস্বাদু। ইংরাজিতে তাই এই গাছটিকে সুগার অ্যাপল বলে। আর বিজ্ঞানীরা ডাকেন অন্য নামে—অ্যানোনা স্কুয়ামোসা।
এই গাছ আট থেকে চোদ্দো-পনেরো ফুটের মত লম্বা হয়, তবে সঠিক পরিচর্যা করলে আরও বড় হতে পারে। সবুজ পাতাগুলি দুই থেকে ছ ইঞ্চি লম্বা, বর্শার ফলার মত আকৃতি, তবে অগ্রভাগ সামান্য ভোঁতা। পত্রবৃন্ত রোমশ। পাতাগুলি মুঠির মধ্যে রেখে ডললে একটি উগ্র গন্ধ পাওয়া যায়। ডালের অগ্রভাগে এক থেকে দেড় ইঞ্চি লম্বা সুগন্ধযুক্ত ফুল ফোটে। ফুল সবুজাভ হলুদ রঙের।
আতা ফল আকারে ডিম্বাকৃতি, গোলাকার বা কতকটা মোচাকৃতি। সাধারণত আড়াই থেকে তিন ইঞ্চি লম্বা। কাঁচা অবস্থায় সবুজ। পাকলে রঙের পরিবর্তন ঘটে হলদেটে সবুজ বর্ণের হয়ে যায়। এই অবস্থায় হালকা সুগন্ধ বের হয়। ফলটির বহিঃত্বক অমসৃণ, অনেকগুলি আয়তাকার গাঁটের মতন দেখা যায়। পাকা ফলের স্বাদ মিষ্টি, খানিকটা ক্ষীরের মত। তাই পাকা ফলের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে বাজারে। পাকা ফলের মধ্যে ঘনকৃষ্ণবর্ণের অনেকগুলি করে বীজ থাকে। বীজগুলি লম্বাটে (আধ ইঞ্চি) এবং শক্ত। ফল পাকলে নরম হয়ে যায় এবং দিনদুয়েকের বেশি রাখা যায় না। তবে অপেক্ষাকৃত কম তাপমাত্রায় রাখলে চার-পাঁচদিন পর্যন্ত থাকতে পারে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মালয়দেশে পাকা আতাফলের মিষ্ট শাঁসটি ছাঁকনিতে ছেঁকে নেয়া হয় ও দুশ বা আইসক্রিমের সঙ্গে মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়।
আতা গাছ দক্ষিণ আমেরিকার বিষুব অঞ্চলের গাছ বলেই অনেকে মনে করেন। আজ থেকে চারশো বছরেরও আগে আতা গাছের বীজ দক্ষিণ ভারতে নিয়ে আসে পর্তুগিজরা। সেখান থেকে সারা ভারতে এই গাছটি ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের মতন সারা পৃথিবীতেই প্রায় আতা গাছ কমবেশি দেখা যায়। তবে উষ্ণপ্রধান অঞ্চলেই এই গাছ বেশি চোখে পড়ে।
ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে আতা গাছের নাম বিভিন্ন। এর কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হল—আর্টিকাম, সারিকা, সীতাফল, আথা চাক্কা ইত্যাদি। ভারতবর্ষের প্রতিবেশী এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে আতা গাছের ডাকনামের মধ্যে যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়। নেপাল এবং পাকিস্তানে আতা গাছের নাম সারিকা। ইন্দোনেশিয়ায় জনসাধারণ একে শ্রীকায়া বলে ডাকেন। অপরদিকে তাইওয়ানের মানুষেরা ডাকেন শাক্য নামে। কন একজন চাষি আতাফলের সঙ্গে শাক্যমুনির মাথার সাদৃশ্য লক্ষ করেছিলেন। তাই এর নাম হয়েছে শাক্য। ব্রহ্মদেশে (মায়ানমার) এর নাম আজা থি। আর ফিলিপাইনসের মানুষরা বলেন আতিস।
আতাফলের নানা গুণ রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। পাকা ফলে ভিটামিন সি, বিভিন্ন শ্রেণীর ভিটামিন বি, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি পাওয়া যায়। ফিলিপিন দেশের একটি কোম্পানি আতা ফল থেকে মাদক দ্রব্য তৈরি করে ব্যবসা করে। তাছাড়া কাঁচা ফল কোষ্ঠবদ্ধতা সারাবার জন্য কাজে লাগে। বীজচূর্ণ মাথার উকুন মারবার কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন এই চূর্ণ চোখের পক্ষে ক্ষতিকারক।
আতা গাছের কথা উঠলেই একই সঙ্গে উচ্চারিত হয় নোনা আতার নাম। এই গাছটি আতা গাছের আত্মীয়, কিন্তু ভিন্ন প্রজাতির গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম অ্যানোনা রেটিকুলাটা। ইংরিজিভাষীরা একে ডাকেন কাস্টার্ড অ্যাপল বলে। তাছাড়া ফলটির আরো কয়েকটি নাম রয়েছে, যেমন বুলস্ হার্ট, বুলক্স্ হার্ট বা অক্স হার্ট।
আতা গাছের মত নোনা আতা গাছ গ্রামাঞ্চলে প্রচুর দেখা যায়। তবে আতা গাছের সঙ্গে এই গাছের সামান্য কিছু পার্থক্য রয়েছে। এই গাছের পাতার ডগাটি আতা গাছের তুলনায় বেশি ছুঁচালো। পত্রবৃন্তে কোন রোম থাকে না। ফলটি ত্রিকোণাকৃতি হৃৎপিন্ডের মত অথবা গোলাকৃতি বা আয়তাকার। ফল পাকলে পরে হলুদ বা বাদামি বর্ণের সঙ্গে লাল ছাপ দেখা যায়।
নোনা আতা গাছের ছাল ডায়েরিয়া বা উদরাময় প্রতিরোধকারী হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ভারতবর্ষের কোন কোন স্থানের মানুষেরা নোনা আতা ফল কেশবর্ধনকারী হিসেবে ব্যবহার করেন। এছাড়া বীজচূর্ণ চুলে উকুন হলে মাথায় লাগানো হয়। কোন স্থান পুড়ে গেলে জ্বালা-যন্ত্রণা নিবারণের জন্য আতা ফল ব্যবহার করা হয়।
আতা এবং নোনা আতা গাছের ফল সুস্বাদু হওয়ার সুবাদে মানুষের প্রিয়। তাছাড়া এর ভেষজ গুণও অনস্বীকার্য।
জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর