গল্প-দেশলাই-রাজকুমার রায়চৌধুরী-শরৎ২০২৩

এই লেখকের আগের গল্প-গণপতি বেহেরা, জীবরত্নের ডায়েরি, প্রতীক্ষা, রুমমেট

GOLPODESHLAI

শীতল পাইনকে আড়ালে অনেকে শীতল স্পাইন বলে উল্লেখ করে। ওঁর গল্প শুনে নাকি ভিতু লোকদের স্পাইন দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইতে পারে। আমার মনে হয় এটা বাড়াবাড়ি। তবে শীতল পাইনের অনেক গল্পই বিশ্বাস করতে অসুবিধে নেই। শুধু অলৌকিক বর্ণনাগুলোতে একটু নুন মাখিয়ে নিতে হবে।

আমার নিজের জীবনেও একটা ঘটনা ঘটেছিল যার হয়তো অলৌকিক ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু আমার মনে হয় এটা মনের ভুল। আমি তখন এম.এসসি পড়ি। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে বাস ধরব বলে বেরিয়েছি। গলি থেকে বিডন স্ট্রিটে যেতেই দেখি গলির মুখে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমি বললাম, “স্যার আপনি?”

স্যার মানে অনিলবাবু স্যার। স্কুলে ইতিহাস পড়াতেন। খুব স্মার্ট ছিলেন। মাঝে মাঝে কালো রঙয়ের পাঞ্জাবি পরে আসতেন। আমাদের স্কুল জীবনের হিরোদের একজন।

অনিলবাবু হাসলেন না।—”আমাকে কিছু টাকা দিতে পার? বড়ো দরকার।”

ঘটনাক্রমে সেদিন আমার পকেটে একটু বেশি টাকা ছিল অন্যান্য দিনের তুলনায়। আমি কিছু টাকা ওঁকে দিলে উনি পাঞ্জাবির পকেটে টাকা ঢুকিয়ে চলে গেলেন। আমিও বাস ধরবার জন্য আর দাঁড়ালাম না।

বাসে উঠে হঠাৎ মনে হল, কাকে আমি টাকা দিলাম? অনিলবাবু তো গতবছরেই মারা গেছেন হঠাৎ হার্ট ফেল করে। তাহলে লোকটা কি ঠগ? অনিলবাবুর মতো দেখতে? কিন্তু লোকটি যে দুঃস্থ এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

এরপর আর কোনোদিন এই দ্বিতীয় অনিলবাবুর দেখা পাইনি।

এবার শীতল পাইনের গল্পে ফিরে আসি। ওঁর অনেক গল্পে অনেক সময় হয়তো কিছুই তেমন ঘটেনি, কিন্তু গল্প শেষ  হওয়া পর্যন্ত শ্রোতাদের আগ্রহ থাকে। পরে যতই হাসিঠাট্টা হোক না কেন। আর একটা ব্যাপার জানিয়ে রাখা দরকার, ওঁর গল্পে প্রচলিত অর্থে সমাপ্তি বলে কিছু নেই। এটা কিন্তু ‘শেষ হয়েও না হইল শেষ’ নয়। উনি যে জায়গায় শেষ করবেন, আমাদের শত অনুরোধ সত্ত্বেও আর এগোবেন না। আমি বক্রেশ্বরের গল্প দিয়েই শুরু করি।

শীতল পাইন কোনও এক শীতকালে বক্রেশ্বর গিয়েছিলেন। বক্রেশ্বরের কাছে একটি গ্রাম আছে। ওখানে কয়েকটি প্রাচীন মন্দির আছে। উৎসাহীরা দেখতে যান। শনিবার সন্ধেটা আমরা সাধারণত শীতলবাবুর ওখানে কাটাই। বেশিরভাগ সময় বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না ইত্যাদি আলোচনা চলে। আমি ছাড়া সবাই ভূত, আত্মা, পরজন্ম ইত্যাদিতে বিশ্বাস করে। আমি নাস্তিক। কিন্তু শীতলবাবুর নানাধরনের অলৌকিক ঘটনার অভিজ্ঞতা মন দিয়ে শুনি। এর কারণ, ওঁর বলার ভঙ্গি। কোনও উত্তেজনা বা নাটকীয়তা নেই।

শীতলবাবু ছোটোখাটো চেহারার মানুষ। সবসময় দেখেছি পাজামা-ফতুয়া পরা। শীতকালে একটা শাল। সরকারি চাকরি করতেন। বেশ কিছুদিন হল রিটায়ার করেছেন। পোস্টাপিস গল্পে বলেছিলাম, শীতলবাবু অকৃতদার। ওঁর ভাইঝি প্রতিমা ওঁর এবং বাড়ির সবকিছু দেখাশুনা করে। প্রতিমার বাবা ও মা এক দুর্ঘটনায় মারা যান।

শীতলবাবু ঘুরতে খুব ভালোবাসেন। কিন্তু পশ্চিমবাংলার বাইরে খুব কম বেড়ান। ওঁর মতে, নিজের রাজ্যেই এত কিছু দেখার আছে, তা দেখতেই একটা জীবন কেটে যাবে। এছাড়া ওঁর পুরোনো মন্দির দেখার শখ আছে। কয়েকমাস আগে এক শনিবার শীতল পাইন তাঁর বক্রেশ্বর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শোনান। আমি ওঁর ভাষাতেই বলি।—

আমি বক্রেশ্বর অনেকবার গেছি৷ তোমরা বোধহয় জানো, এখানকার উষ্ণপ্রস্রবণের সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তার সম্পর্কের উপর গবেষণায় উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্বয়ং সত্যেন্দ্রনাথ বোস এবং এই গবেষণায় তাঁর সহকর্মী শ্যামাদাস চ্যাটার্জী। এর আগে বক্রেশ্বর গেছিলাম খানিকটা কাজের সূত্রে। এবার একাই কলকাতা থেকে ট্রেনে করে যাওয়া। রাত্রে ট্রেন সিউড়ি পৌঁছবে। ঠিক করলাম, সিউড়িতে একরাত কাটিয়ে পরদিন একটা গাড়ি ভাড়া করে বক্রেশর যাব। বক্রেশ্বরে থাকতে আমার বেশ ভালো লাগে। সূর্যাস্তের পর জায়গাটা নির্জন হয়ে যায়। সন্ধেবেলা হাঁটলে মনে হয় কোনও হিল স্টেশনে আছি। শেষ গেছিলাম চার বছর আগে। উঠেছিলাম ট্যুরিস্ট লজে। খুব কম লোকেই এখন এখানে থাকে। বেশ বড়ো একটা ঘর পেয়েছি। ছাদের বাগানটাও বেশ। এর আগে ম্যাসাঞ্জোর আর দেবরাজপুরের পাহাড়েশ্বর মন্দির ঘুরে এসেছি। এবার আর অফিসের কাজে নয়, শুধু বেড়াতে যাবার জন্যই যাওয়া।

তবে যেদিন সিউড়ি যাবার কথা, সেদিন একটা ঘটনা ঘটেছিল। জানি না আমার বক্রেশ্বরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক আছে কি না। সেদিন দুপুরে আমি সুটকেস গোছাচ্ছিলাম। আমি বেড়াতে যাবার জন্য খুব বেশি কিছু নিই না। কিছু জামাকাপড়, টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, রেজর-ব্লেড ইত্যাদি। একটা টর্চ আর ছাতা সবসময় সুটকেসেই থাকে। রাতের ট্রেন ধরে সিউড়ি। সিউড়িতে একরাত কাটিয়ে একটা গাড়ি ভাড়া করে বক্রেশ্বর।

আমি দুপুরবেলা একটা ঝোলানো ব্যাগে জামাকাপড় ঢোকাচ্ছিলাম। এমন সময় বেল বাজল। বাদল এসে বলল, “তিনটি ছেলে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে।”

“কেন, চাঁদা? এখন তো কোনও পুজো নেই।”

আমার কথা শুনে বাদল বলল, “চাঁদা চাইছে। তবে পুজোর জন্য নয়। একটা গরিব লোক পুড়ে মারা গেছে। পিছনের বস্তিতে থাকত। কী করে যেন আগুন লেগে যায়। ওকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে ওই ইলেকটিক চুল্লি না কী বলে—ওখানে নিয়ে গিয়ে পোড়াবে।”

আমি ভাবলাম, ভাগ্যের পরিহাস একেই বলে। বাদলকে বললাম, “ওরা সত্যি কথা বলছে?”

“হ্যাঁ, স্যর। এটা একটা বাংলা কাগজেও বেরিয়েছে। পুলিশও এসেছিল।”

আমি বাদলের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললাম, “ওদের বল এর বেশি আমি দিতে পারব না।”

মনটা খারাপ লাগল। শুনেছি পুড়ে মরার থেকে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু আর হয় না।

যাই হোক, বক্রেশরের কথায় আবার আসি। পুরোনো ট্যুরিস্ট লজেই উঠলাম। ভাবলাম, এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটা গ্রাম আছে, কয়েকটা প্রাচীন মন্দির আছে—এগুলো আগে দেখিনি, দেখে আসি। আমি এখনও ভালো হাঁটতে পারি।

বিকেল পাঁচটেয় বেরিয়ে একটা চায়ের দোকানে চা-বিস্কুট খেয়ে রওনা দিলাম। শীতকাল হলেও খুব বেশি ঠান্ডা নেই। সূর্য প্রায় ডুবুডুবু। তবে গোধূলির আলোয় রাস্তা চলতে অসুবিধে হচ্ছিল না।

আমি আস্তেই হাঁটছিলাম। গ্রামটাতে পৌঁছতে ছ’টা বেজে গেল। এখানে সন্ধে তাড়াতাড়ি আসে। তবে গ্রামের মধ্যে বিদ্যুতের আলো আছে। তাও মনে হল সকাল সকাল এলেই ভালো করতাম। শুধু মন্দির কেন, কয়েকটি বাড়িও বেশ প্রাচীন মনে হল। ভালো করে চারদিক ঘুরে দেখলাম। একটা দোকানে দেখলাম জিলিপি ভাজা হচ্ছে। লোভ সামলাতে পারলাম না। জিলিপি আর চা খেতে খেতে গ্রামের কিছু লোকের সঙ্গে আলাপ হল। আমি সবচেয়ে বড়ো যে বাড়িটা দেখলাম, ওটা নাকি জমিদারবাড়ি। আমি গাড়ি নিয়ে আসিনি শুনে জিলিপি বিক্রেতা বলল, “বেশি রাত করবেন না। সাতটার পর কোনও যানবাহন পাবেন না। আর সাবধানে যাবেন। এদিক ওদিক করবেন না। সোজা পাকা রাস্তার উপর দিয়ে যাবেন। ধানের ক্ষেতে নামবেন না।”

আমি কীসের ভয় থাকতে পারে জিজ্ঞাসা করায় বলল, অনেকে নাকি রাত্রিবেলায় এই রাস্তায় কিছু দেখে খুব ভয় পেয়েছে। এর বেশি কিছু আমায় বলল না। একজন শুধু বলল, “আপনার পকেটে দেশলাই আছে?”

আমি বললাম, “না। আমি সিগারেট খাই না। এমনকি টর্চটাও আনতে ভুলে গেছি।”

গ্রাম ছেড়ে যখন বক্রেশ্বরের দিকে রওনা হয়েছি তখন বেশ অন্ধকার। রাস্তায় কোনও আলো নেই। তবে চাঁদনি রাত। মাঠ কুয়াশায় ভরা থাকলেও রাস্তা চলতে অসুবিধে হচ্ছিল না। শুধু কুয়াশায় আশপাশ অস্পষ্ট।

এক কিলোমিটারের মতো হেঁটেছি। হঠাৎ কী মনে হল, ডানদিকে তাকালাম।

“দেশলাই আছে?” যেন মাঠি ফুঁড়ে একটা লোক উঠে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল। অস্পষ্ট অবয়ব। সাদা চাদরে গা ঢাকা।

আতঙ্কে কি না জানি না, আমার গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোল না। ইঙ্গিতে জানালাম আমার কাছে দেশলাই নেই। লোকটা তারপর হাওয়ায় মিশে গেল। আমি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। শুনশান রাস্তা। কোনও যানবাহন নেই। মনে হয় না কোনও মানুষজন এখানে বাস করে।

আরও এক কিলোমিটার যাবার পর আবার সেই ফিসফিস প্রশ্ন—”দেশলাই আছে?”

এবারের অবয়ব একইরকম—সাদা চাদরে ঢাকা, তবে আগের লোকটার তুলনায় বেশি ঢ্যাঙা। এও একই প্রশ্ন করার পর হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। এবার আতঙ্কে শীতের মধ্যেও আমি ঘামতে লাগলাম৷ মাথা দপদপ করতে লাগল৷ এবার প্রায় ছুট লাগালাম।

কতক্ষণ এরকম হনহন করে হেঁটেছি জানি না, তবে দূরে বক্রেশ্বরের আলো দেখতে পেয়ে ভরসা হল। হাঁটার স্পিড   বাড়িয়ে দিলাম।

“দেশলাই আছে?” আবার সেই প্রশ্ন কানের কাছে।

আমি ভয়ে শিউরে ছিলাম। ডাইনে বাঁয়ে তাকানোর সাহস ছিল না। বাকি পথটা সত্যিই দৌড়ে এসে লজে ঢুকে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম।

রিসেপশনের একটি ছেলে বলল, “এত রাত করে ফিরলেন? মনে হচ্চ্ছে খুব ভয় পেয়েছেন।”

আমার মুখ থেকে শুধু ‘দেশলাই’ কথাটা বেরোল।

শীতল পাইন এখানে এসেই থামলেন। ওঁর গল্গের স্টাইলই এই। হাজার অনুরোধ করলেও আর কিছু বলবেন না।

GOLPODESHLAI2

উপসংহার

শীতল পাইনের বক্রেশ্বরের গল্প শোনার পর আমার ইচ্ছে হল বক্রেশ্বর যাওয়ার। বহুদিন আগে একবার গিয়েছিলাম। শুনেছি এখন অনেক পালটে গেছে। বক্রেশর থেকে ম্যাসাঞ্জোরের রাস্তাও নাকি খুব ভালো। হঠাৎ একটা সুযোগ এসে গেল। সিউড়িতে একটা কাজে যেতে হবে।

আমি যথাসময়ে সিউড়িতে হাজির। এক রাত শিউড়িতে কাটিয়ে একটা গাড়ি ভাড়া করে বক্রেশ্বরে শীতলবাবু যে লজে উঠেছিলেন, সেই লজেই উঠলাম। শীতের সময়ও লজ প্রায় ফাঁকা। একটা প্রাইভেট কোম্পানি এখন এটা চালায়। এখানে সস্তার অনেক হোটেল আছে বলে তীর্থযাত্রীরা খুব একটা এখানে ভিড় করে না। আমি অবশ্য সিউড়ি থেকেই একটা ঘর বুক করে এসেছি। বেশ বড়ো একটা ঘর পেয়ে গেছি।

লজটা অনেকখানি জায়গা জুড়ে। কিন্তু এখন অনেক জায়গার রঙ চটে গেছে। কয়েক জায়গার পলেস্তারা খসে গেছে। তবে লজটার পজিশনটা খুব ভালো। নির্জন ফাঁকা জায়গা, হই-হট্টগোল নেই।

আমি পৌঁছেছি দুপুরে। ঠিক করেছি, শীতলবাবু যে-রাস্তা দিয়ে গেছেন, সেই রাস্তা দিয়েই উনি যে গ্রামে গিয়েছিলেন সেই গ্রামটাতে যাব এবং ওই একই সময়ে। উষ্ণপ্রস্রবণে গিয়ে লাভ নেই। এখন আর সেই নোংরা জায়গা নেই, সব কিছু বাঁধানো। কিন্তু যা জল তাতে পাও ডোবে না।

আমি শেষ বিকেলের দিকে গ্রামটির রাস্তায় হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তায় এক কিলোমিটার চলবার পর ঝুপ করে সূর্য ডুবে গেল। পূর্ণিমা না হলেও চাঁদনি রাত। আমার ভয়ডর বরাবরই কম। মাঝে-মাঝেই ডাইনে বাঁয়ে তাকাতে তাকাতে চললাম। অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না।

তিন কিমি হাঁটার পর গ্রামটিতে পৌঁছলাম। কিন্তু কিছু একটা অস্বাভাবিক লাগল। কেউ জিলিপি ভাজছে না। চায়ের দোকানও নেই। রাস্তাঘাটে লোকজনও নেই। হয়তো রাত হয়ে গেছে। আর শীতটাও বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। যাই হোক, আমি কয়েকটা পুরোনো বাড়ি আর মন্দির দেখে বক্রেশ্বরের পথে রওনা হলাম।

গ্রাম থেকে বেরোবার সময় একটি লোকের সঙ্গে দেখা হল। একই প্রশ্ন—”দেশলাই এনেছেন?”

আমি বললাম, “না, দরকার হবে না। রাস্তা চিনে যেতে পারব।”

কুয়াশায় ভরা মাঠ। চাঁদের ম্লান আলো আর অস্পষ্ট গাছের ছায়া মিলে একটা গা ছমছম পরিবেশ। আমি অবশ্য এর মধ্যে ভয়ের কোনও ব্যাপার দেখিনি। চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম। ঘড়িতে সময় দেখছি। পনেরো মিনিট অন্তর একটু থেমে চারদিকে তাকাচ্ছিলাম যদি শীতলবাবুর মতো কোনও অভিজ্ঞতা হয়। না, কিছুই নেই। এখনও পর্যন্ত রাস্তায় একটা লোক বা কোনও যানবাহন চোখে পড়ল না। ভাবলাম, আমার এখানে আসাটা নিতান্তই নিরামিষ হল। কী করা যাবে? আমার মতো অবিশ্বাসীর পক্ষে অদ্ভুত কিছু দেখা হয়তো সম্ভব নয়।

যাই হোক, পথ তো একসময় শেষ হবেই। ট্যুরিস্ট লজের কাছাকাছি এসে পড়েছি, হঠাৎ একটা জিনিস পায়ে ঠেকল। তুলে দেখি একটা দেশলাই। বেশ পুরোনো মনে হল। এই ব্র্যান্ডটা এখন দেখা যায় না। এখনও বেশ কিছু কাঠি আছে। তবে সব পোড়া কাঠি। আমি হাতের মুঠোয় ওটাকে নিয়ে গেস্ট হাউসে ঢুকলাম। দুটি লোক দরজার সামনে একটা টেবিলে বসে ছিল। আমাকে দেখে বলল, “রাত করে ফেললেন। আপনার ডিনার তৈরি আছে। ঘরে পাঠিয়ে দেব?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, দিন।”

দুজনের মধ্যে বয়স্ক যিনি তিনি বললেন, “আপনি গ্রাম থেকে হেঁটে এসেছেন?”

“হ্যাঁ, কেন বলুন তো?”

“কতক্ষণ লাগল?”

আমি সময়টা বলাতে লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। একটু মাথা চুলকে বললেন, “গ্রামটা আরও দূরে।”

“এর আগে আর কোনও গ্রাম আছে?”

“না, আর কোনও বসতিই নেই।”

আমি ভাবলাম লোকটা হিসেবে ভুল করেছেন। একটা গ্রাম পুরো এক কিমি কী করে এগিয়ে আসবে?

“আপনি রাস্তায় কিছু দেখেননি তো?”

আমি বললাম, “না। কী দেখব?”

“আসলে অনেকে বলে নাকি তারা অদ্ভুত কিছু দেখেছে।”

“অদ্ভুত মানে ভূত?”

আমার কথা শুনে লোকটা একটু চমকে গেলেন।—”তা বলতে পারব না। তবে অনেকে জানি ওই রাস্তায় মাঝে-মাঝেই ধানক্ষেতে কিছু শব্দ শুনতে পায়।”

“কীসের শব্দ?”

“গোঙানির মতো শব্দ। একজন তো ভয়ে হার্ট ফেল করে মারা গেল।”

“কবে এটা ঘটল?”

“তা স্যার, বছর পাঁচেক আগে।”

লোকটা কোনও কথা বললেন না দেখে আমি বললাম, “আমি কিছু দেখিনি। কিন্তু প্রায় চার বছর আগে শীতলবাবু বলে আমার পরিচিত ভদ্রলোক খুব ভয় খেয়েছিলেন।”

আমার কথা শুনে বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন যে শীতলবাবুর কথা ওঁর মনে আছে। শীতলবাবুর মতো আরও অনেকেরই একই অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি বললাম, “ব্যাপারটা একটু খুলে বলবেন?”

ভদ্রলোক বললেন, “আমি যা বলব তার সঙ্গে অনেক লোকের ভয় পাওয়ার কোনও সম্পর্ক আছে কি না জানি না, তবে প্রায় বছর বারো আগে ওই রাস্তার ধানের ক্ষেতে তিনটে লাশ পাওয়া যায়। পুলিশের অনুমান, তিনজনকে মাথায় লাঠি মেরে অজ্ঞান করে পুড়িয়ে মারা হয়। গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেশলাই জ্বেলে আগুন ধরানো হয়। কয়েকটা দেশলাইর কাঠি অকুস্থলেই পাওয়া যায়। ওই কেসের কোনও সুরাহা হয়নি। এমনকি লাশগুলোরও সনাক্তকরণ হয়নি। কারোরই কোনও পরিচয় মেলেনি। দেশলাইটাও পাওয়া যায়নি।”

আমি ইতিমধ্যেই দেশলাইটা পকেটে পুরে ফেলেছি। কে জানে, এটাই হয়তো মার্ডার ওয়েপন। আর খুনি বা খুনির দল হয়তো ওই গাঁয়েরই লোক। আমার বেশ কৌতূহল হল। ভাবলাম আর একদিন এখানে কাটাই।

পরদিন সূর্য ডুবে যাবার একঘণ্টা পরে বেরোলাম। আজকের রাতও চাঁদনি রাত। যেখানে দেশলাইটা পেয়েছিলাম সেখানে খানিকক্ষণ দাঁড়ালাম। তবে এতদিনকার আগের ঘটনা, কোনও ক্লু থাকার কথা নয়।

না, আর কোনও দেশলাই বা কাঠি দেখতে পেলাম না। তবে অকুস্থল থেকে এতদূরে কাল দেশলাইটা পেয়েছিলাম বলে মনে একটা সন্দেহ দানা বাঁধছিল। এটাই সত্যিই কি মার্ডার ওয়েপন? অবশ্য হোটেলের ভদ্রলোক যা বললেন তাতে দেশলাই ব্যবহার করা হয়েছিল শুধু প্রমাণ লোপাট করার জন্য। তবুও দেশলাইটা প্যান্টের পকেটে রেখে দিয়েছি। কালকের চেয়েও মনে হল নির্জন রাস্তা। আগেরদিন যতখানি হেঁটে গ্রামটা পেয়েছিলাম, আজকে মনে হল অতদূরই হেঁটেছি। তবে গ্রামের চিহ্ন নেই।

আরও খানিকটা হেঁটে গ্রামের আলো দেখতে পেলাম। শীতল পাইন যে জিলিপিওলাকে দেখেছিলেন, আজ তাকে দেখতে পেলাম। আমাকে দেখে তাড়াতাড়ি উনুন থেকে কড়াইটা নামিয়ে ফেলল। আমি বললাম, “জিলিপি পাওয়া যাবে?”

“না বাবু, সব শেষ হয়ে গেছে।”

“কিন্তু কড়াইতে তো দেখছি কয়েকটা রয়েছে।”

আমার কথা শুনে লোকটা কড়াইয়ে যে ক’টা জিলিপি ছিল সেগুলো হাতা দিয়ে তুলে রাস্তায় ফেলে দিয়ে বলল, “এগুলি নষ্ট হয়ে গেছে।”

আমি বললাম, “চা কোথায় পাওয়া যাবে?”

“সব বন্ধ হয়ে গেছে।”

লোকটি উনুনে জল ঢেলে কড়াই আর হাতা নিয়ে একপ্রকার দৌড় লাগাল বলা যায়।

আমি কলকাতায় ফিরে এসে শীতলবাবুকে সব বললাম। শীতল পাইন বললেন, “দেশলাইটা নিয়ে এসেছ?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, কেন বলুন তো? তাছাড়া দেশলাইটা অকুস্থল থেকে অনেক দূরে পেয়েছিলাম। কিন্তু শুধু কয়েকটা পোড়া কাঠি ছিল।”

শীতলবাবু যা বললেন তাতে বেশ অবাক হলাম। উনি বললেন, “দেশলাইটা ওখানেই ফেলে আসলে পারতে। আমি দেশলাইটা ওই তিন মূর্তি দেখার পরেই পেয়েছিলাম। পরে ভয় পেয়ে গেলাম। গেস্ট হাউসে ঢোকার আগে ওটাকে রাস্তার ধারে ফেলে এসেছিলাম। কিন্তু একটা জিনিস অবাক লাগছে।”

“কোন জিনিসটা স্যার?”

“আমি যখন দেশলাইটা পেয়েছিলাম তখন বেশ কয়েকটা না পোড়া কাঠি ছিল।”

ছবি-মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প উপন্যাসের লাইব্রেরি