জয়ঢাকের সমস্ত রাশিয়ান গল্প

অনেককাল আগে অনেক দূরের এক দেশে এক সওদাগর চলেছিল বাণিজ্যে। সওদাগরের তিন মেয়ে। তাদেরকে সে ডেকে জিজ্ঞেস করল, “কী আনবো তোদের জন্যে দূরের দেশের থেকে তাই বল। ”
শুনে বড় মেয়ে বলল, “আমায় তুমি একটা সোনার মুকুট এনে দিও বাবা। ”
শুনে মেজ মেয়ে বলল, “আমায় তুমি একটা স্ফটিকের আয়না এনে দিও বাবা। ”
শুনে ছোট মেয়ে বলল, “আমায় তুমি একটা টকটকে, ছোট্ট লাল ফুল এনে দিও বাবা। ”
তারপর সওদাগর তো চলল বাণিজ্যে। দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে মুকুট আর আয়না তো জোগাড় হল, কিন্তু ছোট্ট মেয়ের আবদারের ছোট্ট লাল ফুল তো আর সওদাগর পায় না। শেষে খুঁজতে খুঁজতে সে গিয়ে হাজির হল এক জাদুবনের ভেতরে। সে বনের একেবারে গভীরে ছিল এক রাজপ্রাসাদ। তার বাগানে নাকি এক আশ্চর্য ফুল ফোটে যা কিনা দুনিয়ার আর কোথাও ফোটে না। সেইখানে গিয়ে সওদাগর বাগানে ঢুকে দেখল, কি আশ্চর্য, এই তো সেই তার ছোট মেয়েটার বলে দেয়া ফুল। টুকটুক করছে লাল। হাওয়ায় দুলছে একটু একটু।
ফুলটা যেই না তোলা,অমনি কোত্থেকে একটা ভয়ানক দেখতে জীব এসে হাজির হল। সে কি তার রাগ! সে কি তার গর্জন। বলে, “আমার বাগানের ফুল তুললি কেন তুই?এবারে বাঁচতে হলে ফিরে গিয়ে তোর একটা মেয়েকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিবি আমার সঙ্গে থাকতে। নইলে তোর আর রক্ষা নেই। ”

সওদাগর আর কী করে? ্জন্তুরর কথাতেই রাজি হয়ে গিয়ে ফুলটা নিয়ে দেশে ফিরে এল। তারপর তার কথা শুনে বড় মেয়ে বলল, “জন্তু তোমায় খেয়ে ফেললে আমার কী? আমি কিচ্ছুতেই যাবো না। ” মেজমেয়ে বলল, “জন্তু তোমায় খেয়ে ফেললে আমার কী? আমি কিচ্ছুতেই যাবো না। ”
ছোট মেয়েটা মিষ্টি করে হেসে বলল, “আমি তোমায় বড্ডো ভালোবাসি বাবা। । তোমায় বাঁচাতে আমিই যাবো সেই জন্তুর বাগানে। ”
এই বলে সে একলা একলা রওনা হল দূরদেশের সেই জাদুবনের দিকে। প্রাসাদে পৌঁছোতে তাকে দেখে জন্তু তো বেজায় খুশি। কিন্তু মেয়েকে সে দেখা দিল না। যদি সে তার ভয়ংকর রূপ দেখে ভয় পায়? আড়াল থেকে সে মেয়ের সেবাযত্ন করে। তাকে ভালো ভালো খাওয়ায় পরায়, দামি দামি জামাকাপড়, গয়নাগাঁটিতে মুড়ে দেয়।
আস্তে আস্তে মেয়ে তার না দেখা বন্ধুকে ভালোই বেসে ফেলল। রোজ সে তাকে বলে, “এইবার আমায় একবার দেখা দাও বন্ধু। ” রোজ সেই জন্তু তাকে মানা করে। এমনি করতে করতে একদিন তার জেদের সামনে হার মেনে সে এল মেয়ের সামনে। অমনি তাকে দেখে ভয়ে কুঁকড়ে গেল মেয়ে। কি ভয়ানক তার চেহারা!
সেদিন রাতে মেয়ে স্বপ্নে দেখল তার বাবার ভারী অসুখ। বন্ধুকে সে বলল, “আমার বাবার ভারী অসুখ। আমার তাঁকে দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। তুমি আমায় তাঁকে দেখতে যেতে দেবে?”
জানোয়ারের মন গলে গেল। “যাও,” সে বলল মেয়েকে, “তবে ঠিক তিন দিনের জন্য। তারপর ফিরে আসবে ফের আমার কাছে। ততদিনের জন্যে তোমার এই লাল ফুলটা আমার কাছে রইল তোমার চিহ্ন হয়ে। ”
মেয়ে তো এলো বাড়িতে। বাবার সঙ্গে দেখা হল। বোনদের সঙ্গে দেখা হল। তার গায়ের দামি দামি পোশাক আর গয়নাগাঁটি দেখে বোনেরা লুকিয়ে লুকিয়ে এমন হিংসে করল যে কি বলব! তখন তারা করল কি, ঘড়িগুলো সব কাঁটা ঘুরিয়ে পিছিয়ে দিল। ছোট বোন কিছু টেরও পায়নি। ঘড়ি দেখে সে যখন ভাবল তিনদিন হয়েছে তখন আসলে পেরিয়ে গেছে অনেক বেশি সময়।
বনের ভেতর প্রাসাদে ফিরে মেয়ে দেখে তার বন্ধু মাটিতে পড়ে মরে আছে। তার বুকের কাছে চেপে ধরা রয়েছে তার সেই লাল ফুলটা। সেই দেখে মেয়ের মন গলে গেল। কাঁদতে কাঁদতে বন্ধুর মরা শরীরটা জড়িয়ে ধরে সে বলল, “তোমায় যে আমি ভীষণ ভালবাসি বন্ধু। ”

সেই বিশ্রি জন্তুটা আসলে ছিল একজন সুন্দর রাজপুত্র। ডাইনির অভিশাপে সে এমন হয়ে গিয়েছিল। ডাইনি বলে গিয়েছিল, কেউ তাকে সত্যিকারের ভালোবাসলে তবেই তার অভিশাপ কাটবে। মেয়ে যেই তাকে ভালোবাসল, অমনি তার অভিশাপ গেল কেটে, আর রাজকন্যার চোখের সামনে সেই ভয়ংকর জানোয়ার এক সুন্দর রাজপুত্রে বদলে গিয়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল, যেন কিচ্ছুটি হয়নি।
তারপর তাদের ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল আর তারা সুখেশান্তিতে ঘরকন্না করতে লাগল।