ভোজবাজি-থমকে চমকে থাইল্যান্ড-অংশুমান দাশ-শরৎ ২০২৪

আগের পর্বঃ  ব্যাঙ ও লাওসনেপালি বাদুরইথিওপিয়ার সিংহ, পাহাড়িয়া খাবারদাবার, সাদা চামড়ার লেহ্যপেয় , পাশের বাড়ি বাংলাদেশ, পিকনিক, তাজিকিস্তানে তাজ্জব

বিমানবন্দর থেকে সোজা পাটায়ার ওয়াকিং স্ট্রিট। শুনশান রাস্তায় একটা গলি দিয়ে ঢুকে হোটেল। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে হাবিজাবি বার্গারে পেট ভরিয়েছি, ঢোকার মুখে গলিতে দেখে এসেছি দোকানে ঘচাঘচ মাংস কুচি হচ্ছে। একটু বিশ্রাম নিয়েই রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। ও কি, ঢোকার সময় যে-হোটেলে ঢুকেছিলাম এটা সেইটাই তো? সন্ধে হব হব, হোটেলের বাইরে এরকম সাইক্লোরামা ঝিনচ্যাক আলো কোথা থেকে এল? গোটা গলিটাই ছোটবেলার দীপাবলির রঙিন দেশলাইর আগুনে কে যেন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আলো জ্বলছে-নিভছে, ঘুরছে, গড়িয়ে পড়ছে—আলো, আলো, আলো।

bhojbaji9003

বড়ো রাস্তায় পা দিয়ে দেখি, যেখানে দুপুরে ট্যাক্সি এসে আমাদের নামিয়ে দিয়েছিল, সেখানে ব্যারিকেড। সন্ধ্যা হলে হাঁটা নিষেধ। শুধু ওয়াকিং, তাই নাম ওয়াকিং স্ট্রিট—হন্টন গলি। ডানদিক ধরে যেতে যেতে দেখি যত ঝাঁপ-ফেলা দোকানের ঝাঁপ উঠে আলো জ্বলে উঠেছে। রাস্তায় ঢোকার মুখে নিরীহ খাবারের ঠেলাগাড়ি। চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা হাড়বিহীন কাবাব, একটু লম্বাটে আইসক্রিম স্টিক—যেন হালকা সাঁতলানো ঝোলের মধ্যে গা এলিয়ে শুয়ে আছে যাবতীয় প্রাণীজগৎ—মুরগি, শুয়োর, গোরু, স্কুইড, অক্টোপাস, কাঠিতে গাঁথা মাছ। এর নাম ‘সটে। তার পাশের কাচ-ঢাকা গাড়িতে গুঁড়ি গুঁড়ি কী যেন দেখে নীচু হয়ে উঁকি দিলাম। দু-তিন সাইজের কাঁকড়াবিছে, কোন এক পোকার লার্ভা, দু-জাতের উচ্চিংড়ে—না, চলমান বিজ্ঞান প্রদর্শনী নয়, চলাফেরার পথে টুকটাক মুখে ফেলার মতো কুড়মুড়ে করে ভাজা। ছেলের চক্ষু ছানাবড়া, জিভে জল—কী সব্বোনাশ। একহাতে গোরু ও অন্য হাতে শুয়োরের সটে তুলে দিয়ে ওখান থেকে তাড়াতাড়ি সটকানো গেল।

bhojbaji9002

মাঝে মাঝে দাঁড়াচ্ছি খাবারের দোকানের সামনে। অ্যাকোরিয়াম ভরতি জ্যান্ত চিংড়ি—মস্ত মস্ত, ভিনদেশি। কাঁকড়া—লাল, নীল, সবুজ—কোনও ভেদাভেদ নেই, একসঙ্গে এ ওর ঘাড়ে। কোথাও থুম্বো মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে অক্টোপাস। পাশের দোকানে বিচিত্র মাছ। যাকে দেখিয়ে দেবেন, ঝপ করে ধরে কেটেকুটে প্লেটে ও পেটে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে একজন একটা আস্ত শুয়োর রডে গেঁথে পোড়াচ্ছেন। রেস্তোরাঁর ভিতরগুলো বিলকুল খালি, সবাই তো রাস্তায়। তারই একটায় বসে থাইল্যান্ডের স্কুইড দেওয়া ফ্রায়েড রাইস, ইউরোপের বিফ স্টেক আর সবজি সেদ্ধ দিয়ে ডিনার সারি। পাটায়া সম্পূর্ণ পর্যটকদের জায়গা, তাই নির্ভেজাল থাই খাবার পাওয়া মুশকিল। তবে রাস্তার খাবার কিন্তু থাইল্যান্ডের শহরের স্থায়ী বাসিন্দাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। ব্যাংককের মতো বড়ো শহরে অনেক সময় ছোটো বাড়িভাড়া খুঁজলে তার সঙ্গে রান্নাঘর পাওয়া যায় না। কম রোজগেরে লোকেরা ধরেই নেওয়া হয় রাস্তা থেকেই কিনে খাবেন।

থাইল্যান্ডের রাস্তার খাবারের ইতিহাস কিন্তু প্রাচীন। ঊনবিংশ শতকের শেষে আর বিংশ শতকের শুরুর দিকে ব্যাংককের রাস্তাঘাট করা শুরু হয়। এই সময় নানা ওঠাপড়া হচ্ছে—চাইনিজরা চলে আসছেন থাইল্যান্ডে কাজের খোঁজে, নানা পেশায়। কেউ নাবিক, কেউ কুলি, কেউ মজুর—সেই সঙ্গে চলে আসছে তাদের খাবার বানানোর রীতিনীতি। সেইসব মজুর বস্তিতে সস্তায় খাবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য থাই মহিলারা চটজলদি খাবারের চটজলদি দোকান দিচ্ছেন। দেখাদেখি রোজগারের জন্য চৈনিক পুরুষরাও খাবারের দোকান দিচ্ছেন। এখনও ব্যাংকক জুড়ে রাস্তার খাবারের অধিকাংশ পুরুষ দোকানিরা চাইনিজ, মহিলারা থাই। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে রাস্তার খাবারের দোকানের জনপ্রিয়তা—শুধু স্বাদ হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক সংস্থান হিসাবেও।

থাইল্যান্ডে রাস্তার খাবার যেরকম, সেরকম খাবার বিচের ধারেও। একদিন কো লার্ন বিচ পৌঁছলাম পাবলিক স্টিমারে চেপে। প্লাস্টিকের প্যাকেটে বিক্রি হচ্ছে টক-মিষ্টি কাঁচা আম ফালা ফালা করে কাটা, বাদাম। নীল স্বচ্ছ জল। এখানে সামুদ্রিক মাছের অনেক রকমফের। কুঁজো ভেটকির মতো দেখতে গোলাপি, সাদা। ম্যাকারেল জাতীয় আঁশ ছাড়া আর একরকম মাছ। দু-তিন মাপের স্কুইড। গোলাপি, বরফসজ্জায় ছাই ছাই ছোটোবড়ো চিংড়ি, কাঁকড়া, ঝিনুক, গোরা চেহারার মাছ। কাউকে সেদ্ধ, কাউকে পোড়া—একটু নুন, দু-ফোঁটা লেবু, সঙ্গে দুটো কাঠি। তোলো আর খাও। খাওয়া গেল ঝিনুক সেদ্ধ, সুড়ুত সুড়ুত করে।

bhojbaji9003

ঝিনুক থাইল্যান্ডের এক খানদানি রাস্তার খাবার। দক্ষিণ থাইল্যান্ড, মানে যেদিকে ফুকেট, এসব খাবারের জন্মভূমি সেখানে। লম্বা লম্বা উঁচু বেদিতে ডাঁই করে রাখা টাটকা ঝিনুক, এক-একটা প্রায় বাঘের থাবার সাইজের আর কেউ কেউ বিড়ালের থাবা। একদম বড়োগুলোকে ঠকাস ঠকাস করে হাতুড়ি মেরে খুলে নিয়ে সোজা জলে। সেখান থেকে চালান টেবিলে। পোড়ানো লংকার সস, তার উপরে মুচমুচে পেঁয়াজ ভাজা, কাঁচা লংকা আর রসুনের সস সেই টাটকা ঝিনুকের উপরে ছড়িয়ে দিয়ে চামচে করে কুঁড়ে নিয়ে টপ করে মুখে—একমুখ হিলহিলে স্বাদের বিস্ফোরণ। কখনও এক মুখে ধরে না, কেটে নিতে হয়। পার্শলে পাতা চিবিয়ে নিতে পারেন সঙ্গে বা ধনেপাতা।

থাই খাবার আদতে এই নানা স্বাদ-গন্ধের বিস্ফোরণ। হালকা রান্না, অথচ সুস্বাদু মশলাদার—নানারকম হার্ব-এর গন্ধে ভরপুর। ঘটি রান্নায় যেরকম সবেতেই চিনি লাগে, এদের কোনো-কোনো রান্নাতেও ওইরকম মিষ্টির ভাব বেশি, এমনকি কিছু কিছু মাছ-মাংসেও। আর ঝালের কথাও ভুলে গেলে হবে না—শুকনো, পচা, কাঁচা—নানারূপে লংকা-কাণ্ড। আমি এ-ব্যাপারে অতটা উদারপন্থী নই, ঝালে আমার অরুচি। রাস্তায় বসে শুয়োরের পাঁজরাভাজা ওইরকম করে খেতে গিয়ে আমি তো নাজেহাল!

থাই খাবারে যেটুকু ফ্যাট, তার উৎস নারকেল। নারকেলের দুধে সেদ্ধ করা চটচটে ভাত, তাতে পাকা আমের কুচি আর অঙ্কুরিত মুগ—আমাকে জ্বলন্ত শুয়োরের পাঁজরা থেকে উদ্ধার করেছিল এই আম-ভাত। ঝাল থেকে বাঁচতে, গরম থেকে বাঁচতে বা এমনি এমনি—এর জুড়ি মেলা ভার। থাইল্যান্ডে জনপ্রিয় আম তোতাপুরির মতো দেখতে, এছাড়া নানারকম আমের স্বাদ বদলে এই আম-ভাতের স্বাদ বদলে যায়। এর আর একটা সংস্করণ হচ্ছে এর উপরে শুকনো নোনতা চিংড়ি ছড়িয়ে খাওয়া। সত্যি বলতে কি, এই বিচিত্র কম্বিনেশন আমার সইবে না বলে আর ফিরেই তাকাইনি।

চিয়াং মাই-এর রাত্রি-বাজার এক অভিজ্ঞতা। বিকাল পাঁচটা থেকে শুরু, শেষ হতে হতে মধ্যরাত। স্যুভেনির কিনতে হলে বা চাখতে হলে এমন মজার বাজার আর নেই। যখন ঢুকেছি তখন সাজানো চলছে, ভাজা হচ্ছে হালকা মশলা দেওয়া সসেজ আর কোলবালিশের মতো দেখতে উত্তরের সাই কুয়া—ঝাল ঝাল ঝাঁঝালো। এ-বাজারের সবটাই টিফিন, ভারী কিছু নেই, কিন্তু এইসব এটা সেটা খেতে-খেতেই সময়, পয়সা, পেট সবই কোন সময় যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করতে থাকে। সসেজ দিয়ে শুরু করেই আমি সেই শুয়োরের পাঁজরের পাল্লায় পড়েছিলাম। সেখান থেকে বাঁচতে আম-ভাত—সে-গল্প তো বলেছি। তারপর আরও এগিয়ে দেখি মস্ত কড়াইয়ে রসগোল্লা ফুটছে। জিজ্ঞাসা করাতে বুঝলাম রসগোল্লা নয়, পর্ক বলস। শুয়োরের মাংসের কিমা দিয়ে বল, ধবধবে সাদা জলের মধ্য উঠছে পড়ছে। কলাপাতার ঠোঙায় উঠে পেটে চালান হচ্ছে রোস্ট করা রসুনের সস দিয়ে। এমন নির্ভেজাল ও সৎ মাংস জীবনে আমি খুবই কম খেয়েছি।

একদম শেষে এসে পৌঁছলাম ব্যাংকক। ব্যাংকক না এলে রাস্তার খাবারের মক্কাই দর্শন হয় না। গোটা শহরটাই একটা আস্ত খাবারের দোকান। আমাদের থাকার জায়গা একটা রেল স্টেশনের উলটোদিকে। সেখান থেকে যাব চাটুচাক মার্কেট। বাজার করতে নয়, দেখতে। আসার সময় বিমানের পাশের মাসিমা পই পই করে বলেছেন চাটুচাক মার্কেটের কথা, তাঁরা যাচ্ছেন ভাইপোর বিয়ের বাজার করতে। শুনলাম খাট-পালঙ্কও নাকি কিনে আনবেন ব্যাংকক থেকে! চললাম চাটুচাক।

বাপ রে কী ভিড়, বাপ রে কী রোদ! ঢোকার মুখে প্লাস্টিকের প্যাকেটে কেনা হল অলিয়াং—থাই বরফিলা কফি। প্লাস্টিক প্যাকেটে গোঁজা চুষি পাইপ। কন্ডেনসড মিল্ক, কফি, মিন্টের পাতা—চরম মিষ্টি। আমার মন ঠেলাগাড়ির দিকে। কলাপাতার ডোঙায় ও কী? নারকেলের দুধ, নদীর মাছ, ডিম আর মশলাপাতি—কলাপাতার ডোঙায় রেখে স্টিম দেওয়া। বেশ একটা নোনতা পুডিং গোছের স্বাদ। এই খাবারের যতটা নাম শোনা উচিত ছিল, ততটা বিখ্যাত সে নয়। নাম তার হরমোক। উপরে একটু লেবু পাতা, একটু নারকেল ক্রিম—গরম ফুটপাতে ঘামতে ঘামতে এক ঝলক টাটকা হাওয়ার মতো। কোনো-কোনোটায় স্কুইড দেওয়া, কাঁকড়ার মাংস দেওয়া। একটা খেয়ে দুপুরের খাবার হয় না। তাই পা বাড়ালুম অমলেটের দোকানে। ঝিনুক আর অঙ্কুরিত মুগডালের উপরে আচ্ছাদন হয়ে এল কুড়মুড়ে ভাজা ডিম। চামচে কেটে মুখে ফেললে কুড়মুড়ে ডিম, নরম ঝিনুক আর কচমচে কাঁচা ডালের বৈপরীত্য—খাবার শুধু আস্বাদ নয়, দর্শন ও স্পর্শও বটে।

bhojbaji9002sukumvit

সই ৩৮ সুকুম্বিত রাস্তার উপরে এইরকম এক জায়গা, পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে খাবার উদযাপনের। রঙ, গন্ধ, শব্দ। তাওয়ার উপরে তেলের শব্দ, সিজলারের শোঁ শোঁ ঝড়, সরু রাস্তায় উপচানো ভিড়, তার গুনগুন শব্দ, কখনও কোনও উচ্চকিত হাসি। রাস্তার উজ্জ্বল হলুদ আলোর বৃত্তের নীচে রঙ্গমঞ্চের মতো গোল গোল আলোকবৃত্ত—শুয়োরের পা, মুরগির ডানা সেই আলোর নীচে আসছে যাচ্ছে। এইরকম শুনে এসেছি বটে, দেখেছি ছবিতে, কিন্তু বাস্তবে সেই জমি গেছে এখন। শপিং মল হবে। এখনও দু-চারটি দোকান ভাঁজ করা টেবিল ঘাড়ে আসে যায়। রাতচরার রাত্রি-বাজারে সে-আবেশ তাও এখনও আছে, চিয়াং মাই-এর মতোই। সেখানে গিয়ে আবার পড়েছিলাম লোডশেডিংয়ের পাল্লায়। মোমবাতির আলোয়, উনুনের আগুনের আভায় আর মানুষের ছোটো-বড়ো হতে থাকা চলমান ছায়ায়, সে এক অদ্ভুত আলো-আঁধারের সিম্ফনি।

উন্নয়নের ধাক্কায় গেছে পাক খলং তালাদের ফুলের বাজার। আর রাস্তায় বসা নুডলসের পাশে গাঁদা ফুলের হলুদ, অর্কিডের রঙিন ঘাগরা আর গোলাপের হালকা গন্ধের পাশে হাঁসের স্ট্যু আর পর্কের সটে। রাস্তায় এই রঙচঙে ক্যানভাসের বদলে হলুদ একঘেয়ে সারি সারি তাঁবু।

সবুজ চিকেন কারিতে মন দিই। সারা পৃথিবীতেই এই কারি বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। এত সবুজ কেন? একধারে থেকে কীসব পাতা-টাতার নাম বলে গেলেন দোকানদাদু, আমি বুঝলাম না প্রায় কিছুই। কিন্তু দেখলাম বেগুন, বাঁশ, আর ধনেপাতা চিকেনের সঙ্গে জেগে আছে। আর সঙ্গে নারকেলের দুধের ঘন ক্রিম আর তুলসিপাতার গন্ধ, তাতে লেবুপাতার অঙ্গসজ্জা।

আমার উৎসাহ দেখে পাশ থেকে একজন বললেন, “আমি রোজ চাকরি করতে আসি, এই তো কাছে।”

তাঁর সামনে দু-প্লেট উপচানো সোম টাম বু প্লা রা। কাঁচা পেঁপের স্যালাড, তাতে কাঁকড়ার মাংস আর মাছের সস। কোনো-কোনো পেঁপের স্যালাডে রোস্টেড বাদাম, এমনকি তাল-চিনিও দিতে দেখেছি লংকা কুচির সঙ্গে। পেঁপের বদলে আমও চলে। টক-ঝাল-মিষ্টি-নোনতার বৈচিত্র্যে সে এক চমৎকার ঐক্য।

“রবিবার রবিবার আমার বাড়ির নীচেই দারুণ কচুর স্যালাড পাওয়া যেত। এখন সেই দোকানটা যে কোথায় গেল! গ্রিন চিকেন কারি তো তুমি তাও খেতে পাবে, একটা পরিচিত ডিশ। আমিও বানাতে পারি। কিন্তু কত যে পুরোনো পুরোনো খাবার হারিয়ে গেল! সাধারণ খাবার—মাছের সসে ভাজা বাঁধাকপি। এখন আর কেউ চায় না।” ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক।

বুঝলাম, কয়েকটি দ্বীপের মতো জায়গা ছাড়া এই যে ট্যুরিস্টের পাশে বসে ড্রাইভার, ড্রাইভারের পাশে বসে সাফাইওয়ালা, সাফাইওয়ালার পাশে বসে হেড অফিসের বড়ো বাবু—পাশাপাশি লাল প্লাস্টিকের টুলে বসে বাঁকানো চামচ আর চটা ওঠা চপস্টিক দিয়ে মেলামাইনের বাটি থেকে সুড়ুত সুড়ুত করে নুডলস স্যুপ খাচ্ছেন, এই মেলামেশাটা বন্ধ হয়ে গেছে। ৩০ বাট থেকে সবথেকে সস্তার খাবার গিয়ে দাঁড়াল ১০০ বাট, রাস্তা উঠে গেছে বাজারে। তাতে জুড়ে গেছে স্ট্যাটাস।

খুঁজেপেতে দেখলাম এখন চেষ্টা হচ্ছে পুরোনো রেল ইয়ার্ড, ব্রিজের তলা—এইসব জায়গায় রাস্তার দোকান গজিয়ে তোলার। বাজার নয়, হকার। রাস্তার হকার, ওই গন্ধটা জরুরি। খাবারের গন্ধ, টুকটুকের ধোঁয়া, তার পাশে ম্যাসেজ পার্লারের বিজ্ঞাপন—এই সবকিছু মিলে ব্যাংককের রাস্তার দোকান। সারা পৃথিবীর সব শপিং মল একইরকম, একঘেয়ে চকচকে—ওখানে দেশের গন্ধ কই? অট্টালিকার দেওয়াল রঙ করা ছেড়ে ওই যে নোংরা জামা পরা শ্রমিক চপস্টিক রেখে বাটির শেষ ঝোলটুকু চেটে খাচ্ছেন, তাঁর দেখাদেখি আমিও গ্রিন থাই কারির শেষ বিন্দুটুকু মুখ উঁচু করে প্লেট থেকে গলায় ঢেলে নিই। তুলসি আর নারকেলের গন্ধের সঙ্গে আস্ত একটা দেশ আমার গলা বেয়ে নেমে আসে।

(ক্রমশ)

2 thoughts on “ভোজবাজি-থমকে চমকে থাইল্যান্ড-অংশুমান দাশ-শরৎ ২০২৪

  1. আবারও দারুণ। স্বাদে এবং হারিয়ে যাওয়া খাবারের বিষাদে উপভোগ্য হয়েছে। চলুক… বই হোক।

  2. ছবিগুলোর ক্যাপশন দিতে অনুরোধ করছি সম্পাদকীয় দফতরকে।

Leave a Reply