
ভূতদাদু বাড়িতে এলে পড়াশোনায় ছুটি। ভূতদাদু কিন্তু ভূত নন, মানুষ। গা ছমছমে ভূতের গল্প বলেন, তাই ওরকম নাম। শুধু আমরাই নয়, ভূতদাদুর গল্প শুনতে মাঝে মাঝে মা-কাকিমারাও এসে গোল হয়ে বসেন।
ভূতের গল্প শুনে আমরা কেউ যে বিশেষ ভয় পাই তা নয়। তা হলে ভূতের গল্প শুনি কেন? তার একটাই কারণ, শাওন একটা খাতা করেছে। ও আমার পিসির ছেলে, আমাদের বাড়িতেই থাকে। ও খাতাটার নাম দিয়েছে ভূতায়ন। সেই খাতায় ভূতের নানা রকম তথ্য সংগ্রহ করার কাজ শুরু করে দিয়েছি আমরা।
কী কী রাখা হবে সেই খাতায়? সে নিয়ে আমরা ভাইবোনেরা তিন-তিনবার মিটিং-ও করেছি। সবশেষে আমরা একমত হয়েছি যে ভূত নিয়ে যে সব তথ্য এখনও কেউ জানে না, সেই সব তথ্যই এখানে রাখা হবে। অনেক তথ্য জোগাড় হয়ে গেলে ছোটোকাকুর সুপারিশে ওঁর প্রকাশক বন্ধুর প্রকাশনী থেকে ভূতায়নের প্রথম খন্ড বের করা যেতে পারে। তবে সেসব আমরা বড়ো হলে তারপর!
এরকম একটা খাতা তৈরির আইডিয়াটা প্রথম মাথায় আসে ছোটোকাকুর ছেলে ঝিলমের। শাওন একাই যে সব তথ্য জোগাড়, করে তা নয়। আমরাও হাত লাগাই। যে যেখানে ভূত নিয়ে যেমন তথ্য পাই, সব এনে সেই খাতায় লিখে ফেলি।
ভূতের গল্প বলতে গিয়ে মাঝে মাঝেই তাই ভূত দাদুকে থেমে যেতে হয়। সেজোকাকুর মেয়ে নোলক জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, ভূতদাদু, বলো তো, ভূত কি মানুষকে কামড়ায়?”
দাদু বললেন, “কামড়ায় বইকি! সেবার তেঁতুলবেড়িয়া গ্রামের মাধাই সামন্তের ছোটো ছেলেকে……”
আমরা কেউ আর মাধাই সামন্তের গল্পের মধ্যে ঢুকলামই না। সঙ্গে সঙ্গে ভূতায়নের পাতায় নোট নিয়ে নিলাম, “ভূত মানুষকে কামড়ায়।”
গতকাল দাদু যখন সন্ধেবেলা একটা ভূতের গল্প বলছিলেন, “একদিন এক চাইনিজ রেস্টুরেন্টে একটা ভূত ঢুকেছিল…”
অমনি দাদুকে থামিয়ে দিয়ে আমি বললাম, “দাদু, ভূত কি চাইনিজ খেতে ভালোবাসে, না মোগলাই?”
ভূতদাদু বললেন, “ভূতের বেশি পছন্দ চাইনিজ। পিয়াল, তোকে বলি, আমার নিজের চোখে দেখা। সেবার ধর্মতলার একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ……”
ব্যস, আমরা আর কেউ ভূতের গল্পের মধ্যে মনই দিলাম না। ভূতায়নের পাতায় চটপট লিখে নিলাম, “ভূত চাইনিজ খেতে ভালোবাসে।”
বছরে একবার করে সপরিবার আমাদের বেড়াতে যাওয়া হয়। জায়গার নামটা ঠিক করা হয় লটারির মাধ্যমে। বাড়ির সব সদস্যেরই ভোটদান বাধ্যতামূলক, বাবার কড়া নির্দেশ। ভোটদানে আমাদের মতো ছোটোদেরও সমান অধিকার। ছোটো ছোটো কাগজের টুকরোয় যে যার পছন্দের জায়গার নাম লিখে ভরে দেবে বাবার সামনের প্লাস্টিকের কৌটোয়। বাবা বাড়ির সবচেয়ে খুদে সদস্যের হাতে তুলে দেন লটারির অধিকার। এবারও তাই হলো। ঝিলম বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে ছোট। ও যে কাগজটা তুলবে, তাতে যে জায়গার নাম লেখা থাকবে, সেখানেই বেড়াতে যাওয়া হবে।
সেবার লটারিতে উঠল দিঘার নাম। আমরা কেউ চেয়েছিলাম লোলেগাঁও, কেউ অযোধ্যা পাহাড়, কেউ ভালকিমাচান। কিন্তু কে যে মাঝখান দিয়ে দিঘার নামটা লিখে দিল! কিন্ত এতো আর নড়চড় হওয়ার নয়।
একটা মিনিবাসের মতো গাড়ি ভাড়া করে দিঘায় বাবার অফিসের বাংলোয় গিয়ে পৌঁছতে এগারোটা বাজল।
সন্ধেবেলা বাংলোর কেয়ারটেকার হরিবংশীদাদু ভূতের গল্প বলতে শুরু করলেন, “দিঘার ঝাউবনের ভূত, অন্য সব ভূতের চেয়ে দেখতে একদম আলাদা। তার পাঁচটা চোখ। দুপাশে দুটো, সামনে পিছনে, মাথার উপরে……”
তক্ষুণি মেজোকাকুর মেয়ে মেঘলা জিজ্ঞেস করে বসল, “ও দাদু, ভূত কী সমুদ্রে সাঁতার কাটতে পারে?”
হরিবংশী দাদু চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে বললেন, “তা পারে না বটে! তবে জলের উপর দিয়ে…”
আমরা আর দিঘার ভূতের গল্পে নেই। পাঁচজনেই ভূতায়নের পাতার ওপর হুমড়ি খেয়ে নোট করলাম, “ভূত সমুদ্রে সাঁতার কাটতে পারে না।”
এ পর্যন্ত ভূতায়নের পাতায় যে সব তথ্য আমরা সংগ্রহ করতে পেরেছি এর বেশির ভাগটাই ভূতদাদুর মুখ থেকে শোনা ভূতের গল্প থেকে সংগ্রহ করা। এবার তার একটা তালিকা তুলে দিচ্ছিঃ
- ভূত বিখ্যাত মানুষদের অটোগ্রাফ পেলে জমায়।
- ক্রিকেট মাঠে ভূত থাকে গ্যালারির নিচে।
- মানুষ তো বটে, সব প্রাণীই মরলে ভূত হয়।
- ভূতের বয়স বাড়ে না।
- প্ল্যানচেটে ডাকলে ভূত রাগ করে।
- মেট্রো রেলের ভেস্টিবিউলে ভূত থাকে।
- ভূত ছোটোদের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেয়।
অনেকদিন ধরে অনেক কষ্টে সংগ্রহ করা ভূতের তথ্য আমরা এভাবে কেন সকলের সামনে তুলে ধরলাম? এর কারণ আর কিছুই নয়, আমাদের বয়সী ছোটোরা যারা ভূতের ভয় পায়, তারা এরপর থেকে সতর্ক হতে পারবে। আর আমাদের মতো যাদের ভূতের নানারকম তথ্য জোগাড় করার বাতিক আছে, তাদের সংগ্রহে এর বাইরে কিছু তথ্য থাকলে যেন আমাদের মেলে পাঠিয়ে দেয়। আমাদের মেল আইডি হলোঃ ভূতায়ন@ভয়মেলডটকম।