নাটক(অপেরা)-গুরুদক্ষিণা-রচনা ও সঙ্গীত: কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়-শরৎ ২০২৩

জয়ঢাকের নাট্যশালা:
হাবুদের ডালকুকুরে , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুরাতন ভৃত্য যোগীনদাদা –রবীন্দ্রনাথের কবিতার নাট্যরূপঃ (তাপস শঙ্কর ব্রহ্মচারী)  রাজপুত্তুর(কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়)   সেলফিশ জায়েন্ট- (অনুপম চক্রবর্তী,) পুজোর প্রস্তুতি(আশুতোষ ভট্টাচার্য) , অমৃতযাত্রী(কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), চিচিং ফাঁক(কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), নিউটনের সঙ্গে একবেলা(বামাচরণ ভট্টাচার্য), ঘ্যাঁঘাসুর(কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়)

————————————————————————————
natok86
চরিত্র: সূত্রধার, দ্রোণাচার্য, নকুল, ভীষ্ম, দুর্যোধন, একলব্য, বিদুর, দুঃশাসন, নর্তকী, ধৃতরাষ্ট্র, যুধিষ্ঠির, সভাসদের দল, পাণ্ডু, অর্জুন, রাজকুমারগণ।
প্রথম দৃশ্য
(পর্দা বন্ধ। মঞ্চের সামনের অংশে সূত্রধারের প্রবেশ ও গান।)
গান – ১
শুন শুন ভক্তজন শুন দিয়া মন।
অপূর্ব কাহিনি এক করিব বর্ণন।।
সে এক শিষ্যের কথা লোকমুখে ফেরে।
গুরুদক্ষিণা সে দেয় নিজ বক্ষ চিরে।।
গুরু-প্রতি নিষ্ঠা তার এমনই অটল।
ত্যজিল আপন হস্তে আপনার বল।।
***
সেই সে প্রাচীন রাজ্য হস্তিনানগরে।
কুরু ও পাণ্ডব সবে পড়িল কৈশোরে।।
তাহাদের শিক্ষা লয়ে চিন্তান্বিত সবে।
কে সে আছে সর্ববিদ্যা-পারদর্শী ভবে।।
অস্ত্রশস্ত্র যুদ্ধবিদ্যা কে করিবে দান।
এমত সময়ে শুরু মোদের আখ্যান।।
(সূত্রধারের প্রস্থান)
(পর্দা খুলে যায়। রাজসভা। সিংহাসনে আসীন ধৃতরাষ্ট্র। তাঁর চারপাশে ভীষ্ম, বিদুর, কৃপাচার্য প্রমুখ মানীগুণী ব্যক্তিরা বসে আছেন। মাঝে নর্তকীর নৃত্য।)
আবহসঙ্গীত সহযোগে নর্তকীর নৃত্য।
(সহসা কুরু ও পাণ্ডবকুমারদের প্রবেশ কলকোলাহল করতে করতে।)
রাজকুমারগণ।— মহারাজ! মহারাজ!
ধৃতরাষ্ট্র।— কী হয়েছে বৎসগণ? কী হেতু এমন কোলাহল?
রাজকুমারগণ।— অপূর্ব! অদ্ভুত! অত্যাশ্চর্য!
ভীষ্ম।— (স্নেহের সঙ্গে) সত্য নাকি? ঘটনা এমনই অভিনব, যা দেখে বিস্ময়াবিষ্ট রাজপুত্রগণ! কহো বৎসে, কহো শুনি পূর্ণ বিবরণ।
(সকলে মিলে একযোগে বিবরণ দিতে যায়, তাতে কোলাহলের সৃষ্টি হয়। অবশেষে সকলকে থামিয়ে দুর্যোধন বলে।)
দুর্যোধন।— মহারাজ! এ কন্দুক লয়ে, নগরীর পূর্বপ্রান্তে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ছিলাম ক্রীড়ায় ব্যাপৃত। (হাতের বল তুলে দেখায়।) সহসা গভীর কূপে কন্দুক হইল পতিত। আমরা তো দিশাহারা, কী উপায়ে কন্দুক করিব উদ্ধার। অকস্মাৎ ব্যক্তি এক সৌম্যদর্শন, সেথায় করিল আগমন। আর কী অকল্পনীয়, অদ্ভুত লক্ষ্যভেদ তাঁর—ধনু হতে একটি বাণ নিক্ষেপের পর, একে একে শরকাঠি দিয়া পরস্পর, নিম্ন হতে কন্দুক করিলেন উদ্ধার!
সকলে।— সাধু! সাধু!
ভীষ্ম।— (চকিতে দাঁড়িয়ে উঠে) গুরু দ্রোণাচার্য!
ধৃতরাষ্ট্র।— কী বলছেন জ্যেষ্ঠতাত!
ভীষ্ম।— হ্যাঁ, মহারাজ। ত্রিভুবননন্দিত আচার্য দ্রোণ—নগরীতে হয়েছে আজ তাঁর পদার্পণ। কোনও সন্দেহ নেই মনে। বিদুর!
বিদুর।— জ্যেষ্ঠতাত!
ভীষ্ম।— দ্রুতচক্র রথ শীঘ্র করো প্রস্তুত। চলো যাই তাঁর সন্নিধানে। যথাযোগ্য পাদ্য-অর্ঘ্যে করিয়া ভূষিত রাজদরবারে তাঁরে করি আনয়ন। আর কোনও চিন্তা নেই, রাজপুত্রদের প্রধান আচার্যপদে তাঁরে করিব বরণ। অনুমতি দিন মহারাজ!
ধৃতরাষ্ট্র।— তবে তাই হোক। যথাযোগ্য সমাদরে বরন করুন তাঁরে গিয়ে। মনে জাগে আনন্দের বান—এত চিন্তা, এত প্রতীক্ষার আজ বুঝি হল অবসান। বিদুর! সংবাদ পাঠাও দিকে দিকে—শিক্ষা শুরু রাজপুত্রদের। আজি হতে নগরীর প্রধান আচার্য সর্ববিদ্যা-বিশারদ গুরু দ্রোণাচার্য!
(পর্দা পড়ে। পর্দার আড়ালে রাজসভার সজ্জা বদলে অরণ্যের সজ্জা লাগানো হয়। পর্দার সামনে চলতে থাকে সূত্রধারের গান ও নাচ।)
গান – ২
যত ছিল রাজপুত্র পাণ্ডব আর কুরু।
সকলের অস্ত্রশিক্ষা হৈল হৈল শুরু।।
অসিবিদ্যা, রথবিদ্যা, ধনুর্বিদ্যা লয়ে।
উঠিতে লাগিল সবে পারদর্শী হয়ে।।
আচার্য করেন দান যত বিদ্যা ছিল।
রাজকুমারেরা তাহা শিখিতে লাগিল।।
***
হেনকালে একদিন গূঢ় শিক্ষা দিতে।
দ্রোণাচার্য সবে লয়ে যান নির্জনেতে।।
সেথায় নিষাদপুত্র একলব্য ছিল।
তখনি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটিল।।
(পর্দা খোলে। একলব্যের প্রবেশ।)
আবহসঙ্গীত সহযোগে একলব্যের শিকার নৃত্য।
(নাচের শেষে একলব্য হরিণের পিছনে তাড়া করতে করতে বেরিয়ে যায়। আবহ চলতে থাকে। পুনরায় একলব্যের প্রবেশ ও তির ছুড়ে হরিণ শিকার। হরিণের দেহ কাঁধে তুলে একলব্যের প্রস্থান। আলো নেভে। আবার আলো জ্বললে দেখা যায় দ্রোণাচার্যকে বেষ্টন করে কুরু ও পাণ্ডবপুত্রেরা বসে আছে।)
গান – ৩
সামগান (অথবা ওঁ কথাটি বিভিন্ন ধ্রুপদী সুরে গীত হয়।)
আবহসঙ্গীত সহযোগে দ্রোণাচার্যের শিক্ষাদান পর্ব (অসি, রথ ও ধনুর্বিদ্যা)
(শিক্ষাদান শেষ হলে সকলে কৃতাঞ্জলিপুটে দ্রোণাচার্যকে ঘিরে দাঁড়ায়।)
দ্রোণাচার্য।— অয়ি শিষ্যগণ!
সকলে।— গুরুদেব!
দ্রোণাচার্য।— অধীত বিদ্যা মোর যত ক্ষত্রিয়ের প্রয়োজনমতো শিখায়েছি তোমাদের পূর্ণ যত্ন লয়ে। ধনুর্বিদ্যা, অসিবিদ্যা, রথবিদ্যা আর বিদ্যা ছিল যতেক প্রকার—পারদর্শী তোমরা আজ সকল বিষয়ে। তবে এইবারে প্রস্তুত হও পরীক্ষার তরে।
সকলে।— কী পরীক্ষা গুরুদেব?
দ্রোণাচার্য।— লব অতি সামান্য পরীক্ষা—ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা। দেখি কে কতটা জ্ঞানে হইয়াছ পূর্ণ। ওই যে বৃক্ষশাখে পক্ষী নীলবর্ণ—তীক্ষ্ণ শরাঘাতে ওর মস্তকটি করে দাও চূর্ণ। যার দ্বারা এই কার্য অনায়াসে হইবে পালিত—মম শ্রেষ্ঠ ছাত্র বলি বিশ্বমাঝে সে হবে পূজিত।
(সূত্রধারের গান শুরু হয় এবং গানের বর্ণনা অনুযায়ী মঞ্চে নৃত্যছন্দে মূকাভিনয় চলতে থাকে।)
গান – ৪
একে একে শিষ্যদের ডাকেন দ্রোণাচার্য।
বুক ফুলিয়ে সবাই আসে, হবেই কৃতকার্য।।
ধনুর্বাণ লয়ে যবে লক্ষ্য করে স্থির—
সহসা গুরুর প্রশ্নে হয় যে অস্থির।।
গুরু বলে, কহো কহো কী করো দর্শন?
বলে সবে, সবকিছু দেখছি ভগবন।।
এমত উত্তর শুনি দ্রোণাচার্য বলে।
হায় মম সর্বশিক্ষা যাইল বিফলে।।
দুর্যোধন, দুঃশাসন, ভীম, যুধিষ্ঠির
কুরু ও পাণ্ডবের বংশে যত ছিল বীর।
সকলেই নতশিরে চলে যায় ফিরে।
তখন অর্জুন আসি দাঁড়াইল ধীরে।।
(গানের শেষে অর্জুন ধনুর্বাণ হাতে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ায়।)
দ্রোণাচার্য।— অর্জুন, বৎস মম, তুমি একা রহিয়াছ আর—যে পারে সহিতে মম শিক্ষার ভার। তুমি একা, তুমি শুধু পারো দিতে তার যোগ্য উত্তর, এত কিছু শিক্ষা মম কোন পাত্রে করেছি অর্পণ। কহো তবে, এ মুহূর্তে কী করো দর্শন?
অর্জুন।— গুরুদেব! মম চক্ষু হতে সবকিছু অপসৃত; ওই নীলবর্ণ পক্ষী, শুধু তার নীল চক্ষু দুটি হয় উদ্ভাসিত।
দ্রোণাচার্য।— অপূর্ব! অপূর্ব! তবে এইবারে লক্ষ্য করো স্থির। তীক্ষ্ণ বাণে ছিন্ন করো শির।
(মুহূর্তের মধ্যে টঙ্কার ওঠে। অর্জুনের বাণ ছুটে যায়।)
দ্রোণাচার্য।— ধন্য! ধন্য কুন্তীপুত্র অর্জুন! আজি হতে মম শ্রেষ্ঠ ছাত্র শুধু তুমি মাত্র; আর নহে কেহ। পাবে মোর একচ্ছত্র স্নেহ—আর পাবে সর্ববিদ্যা মোর। আজি হতে ভবে তোমা হতে শ্রেষ্ঠতর কেহ নাহি রবে।
(আশীর্বাদ প্রদান। সকলে স্থির। সহসা একলব্যের প্রবেশ।)
গান – ৫
হে প্রাজ্ঞ ব্রহ্মানন্দ, হে দ্বিজোত্তম।
খ্যাত তুমি ভূভারতে, অস্ত্রে সর্বোত্তম।।
তোমারই মহিমা শুনি
তোমারেই গুরু মানি
অস্ত্রশিক্ষা করি ভিক্ষা, নমো আর্য নমো।।
হে মহাত্মা ভগবন
ধন্য করো এ জীবন
এ পতিতে করো গ্রহণ, ক্ষমো প্রভু ক্ষমো।।
দ্রোণাচার্য।— কে তুমি বৎস? কী-বা পরিচয় তব?
একলব্য।— নিষাদরাজের পুত্র একলব্য নাম, পিতা হিরণ্যধনু, এ অরণ্যে ধাম।
সকলে।— সে কি! এত স্পর্ধা!
দুর্যোধন।— সামান্য ব্যাধের পুত্র হয়ে, এসেছ দ্রোণের কাছে ভিক্ষাপাত্র বয়ে?
সকলে।— ধিক তোরে। ধিক!
দ্রোণাচার্য।— শোনো বৎস। হস্তিনাপুরের আমি আচার্যপ্রধান—ক্ষত্রিয়ের পুত্র ছাড়া করি না বিদ্যাদান। ফিরে যাও বৎস, লহো মম আশীর্বাদ; পূর্ণ করিতে তব সাধ অন্য কোথা গিয়া করো গুরুর সন্ধান।
কুরুপুত্রগণ।— (ব্যঙ্গ) যাও বৎস, বনে গিয়ে ছোড়ো ধনুর্বাণ। হাঃ হাঃ হাঃ—
(সকলের হাসি। দ্রোণাচার্যের চোখে শিষ্যদের প্রতি ভর্ৎসনা। অপমানিত একলব্যের ধীরে ধীরে প্রস্থান। সূত্রধারের প্রবেশ।)
গান – ৬
চলিলেক একলব্য অরণ্য-গহন।
শিক্ষালাভে ব্যর্থকাম, বিষণ্ণ-বদন।।
তনু তার থরো থরো তীব্র অপমানে।
হৃদয়ের অভিমান কেহ নাহি জানে।।
অকস্মাৎ হৈল যেন মহা-বজ্রপাত।
নিষাদপুত্র পাইল চরম আঘাত।।
(গান চলাকালীন সকলের প্রস্থান। গানের শেষ একলব্যের প্রবেশ।)
আবহসঙ্গীত সহযোগে একলব্যের আহত-নৃত্য।
গান – ৭
এ কী নিদারুণ অস্ত্রাঘাতে ভাঙিল আশার দ্বার।
হানিল আঘাত বক্ষপিঞ্জর হল আজি ছারখার।।
কী মহাসাগর হতে উথালপাতাল স্রোতে উঠল ঘূর্ণি আসিল তুফান ভাসিল সকল পার।
কার সে নিশ্বাসে প্রবল আশ্বাসে করি দিল চুরমার।।
আজি উঠিল ঝড় দুর্বার।
পশ্চিম আকাশ থেকে ঝঞ্ঝা উঠিল হেঁকে ঝড়ের মাতনে বেদনা-বর্ষণে হইল ভক্তির হার।।
(একলব্যের প্রস্থান। সূত্রধারের প্রবেশ ও গান। এই গান চলাকালীন মঞ্চের দু-দিকে ক্রমান্বয়ে আলো পড়ে গানের বর্ণনার সঙ্গে তাল রেখে। প্রথমে একদিকে দেখা যায় একলব্য দ্রোণের এক মাটির মূর্তির সামনে ধ্যানরত। অন্যদিকে কুরু ও পাণ্ডবকুমারেরা যথারীতি দ্রোণের কাছে অস্ত্রশিক্ষা নিচ্ছে।)
গান – ৮
এরপরে কেটে যায় বৎসর কত।
একলব্য রহে একা বুকে লয়ে ক্ষত।।
অন্য কোনও গুরুর সে তো করে না সন্ধান।
দ্রোণাচার্য-পদে সে যে দিয়েছে মনপ্রাণ।।
তাই তো দ্রোণের মূর্তি গড়িয়া নির্জনে।
একা অস্ত্রশিক্ষা করে একান্ত গোপনে।।
***
অন্যদিকে কুরুরাজ্যে কুরু ও পাণ্ডবে।
ক্রমাগত অস্ত্রশিক্ষা লয়ে চলে সবে।।
এক-একজন এক-এক অস্ত্রে হয় ধুরন্ধর।
তবু সর্বশ্রেষ্ঠ থাকে অর্জুনের শর।।
হায় বিধাতার লীলা! অন্য এক প্রান্তে
একলব্যের শিক্ষালাভ কেউ পারে না জানতে।।
***
হেনকালে একদিন ওঠে মহাধ্বনি।
বাজে তূর্য, শিঙা, শঙ্খ, অসির ঝনঝনি।।
জাগিল হস্তিনাপুর অশান্ত প্রভাতে—
যত রাজপুত্র ছিল, চলে মৃগয়াতে।।
(গানের শেষ অংশে মঞ্চের আলো নিভে যায়। শুরু হয় আবহসঙ্গীত। গান শেষ হলে আলো জ্বলে। দেখা যায় রাজকুমারগণ মৃগয়ায় চলেছে। তাদের সঙ্গে আছেন দ্রোণাচার্য।)
আবহসঙ্গীত সহযোগে রাজকুমারদের মৃগয়া-গমনের নৃত্য।
(কুরু-পাণ্ডবেরা মঞ্চের একদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। মঞ্চের অন্যদিকে আলো পড়লে দেখা যায় একলব্য দ্রোণের মূর্তির সামনে ধ্যানমগ্ন। হঠাৎ বাইরে থেকে শোনা যায় কুকুরের চিৎকার। প্রথমে একলব্য কর্ণপাত করে না। তারপর ক্রমাগত কুকুরের ডাকে শেষে বিচলিত হয়।)
একলব্য।— আহ্! এ কী উৎপাত হল? এই নির্জন অরণ্যে সারমেয় কোথা হতে এল?
(একলব্য আবার ধ্যানে বসে। আবার কুকুরের ডাক। একলব্য প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে গর্জে ওঠে।)
একলব্য।— তবে রে শ্বাপদসন্তান! জানা নাই তোর, কত শক্তি ধনুর্বাণে মোর। এই পরালাম জ্যা, দিলাম টঙ্কার—এবারে ছুড়িব বাণ, হবি রুদ্ধবাক, লহমায় স্তব্ধ হবে সকল চিৎকার।
(বাণ ছোড়ে। মুহূর্তে কুকুরের ডাক স্তিমিত হতে হতে স্তব্ধ হয়ে যায়। আলো নেভে। আলো জ্বললে দেখা যায় অর্জুন ধনুক পরীক্ষা করতে ব্যস্ত। নকুলের হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ।)
নকুল।— (প্রচণ্ড বিস্ময়ে) জ্যেষ্ঠ! জ্যেষ্ঠ! এ যে অকল্পনীয়!
অর্জুন।— কী হয়েছে প্রিয়?
নকুল।— এই দেখ আমাদের পোষা সারমেয়। অপূর্ব অদ্ভুত এক শরসন্ধানে বাকশক্তি হয়েছে রহিত, অথচ বিন্দুমাত্র নেই ক্ষত!
অর্জুন।— (বিস্ময়াবিষ্ট) তাই তো! এ যে কল্পনাতীত! দ্রোণের শ্রেষ্ঠ শিষ্য অর্জুন আমি; মোর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর ধনুর্বিদ্যা তার! একদণ্ড দেরি নয় আর। কোন সে ধনুর্ধারী এত শক্তিমান—এ মুহূর্তে চাই সে সন্ধান।
(আলো নেভে। আবহসঙ্গীত চলে। আলো জ্বললে দেখা যায় দ্রোণের মূর্তির কাছে একলব্য একমনে শরসন্ধান করে যায়। পিছন দিয়ে অর্জুনের প্রবেশ।)
অর্জুন।— (স্বগত) এই সামান্য ব্রহ্মচারী ক্ষীণতনু, ফলমূলাহারী—এই দেহে এত তেজ? এর বাণে এত কৌশল? সপ্তবাণে সারমেয় হল রুদ্ধবাক! কোথা হতে পেল এই বল? (একলব্যকে) হে বীরাঙ্গন! তব বীর্যে মম অভিবাদন।
একলব্য।— কে আপনি মহাভাগ? পরিচয় তব?
অর্জুন।— আমি অর্জুন। পাণ্ডবকুমার। তব পরিচয় জানতে প্রয়াসী।
একলব্য।— আমি এক সামান্য বনবাসী। একলব্য নাম মোর। জীবিকা মোর ভিক্ষা। এ অরণ্যে নির্জনে করি অস্ত্রশিক্ষা।
অর্জুন।— হে বীরবর! ধন্য তুমি! ধন্য তব ধনুর্বিদ্যাজ্ঞানে। এমন অদ্ভুত শিক্ষা কার কাছে, কার সন্নিধানে?
একলব্য।— হে কৌন্তেয়! এই সামান্য বিদ্যালাভে যাঁর অনুগ্রহ—ওই যে অদূরে তাঁর মাটির বিগ্রহ—তিনিই আচার্য মোর—গুরু দ্রোণাচার্য!
(কথার সঙ্গে সে আঙুল দিয়ে দেখায় ও একই সঙ্গে মূর্তির ওপর আলো পড়ে।)
অর্জুন।— (বিস্ময়ে চিৎকার করে ওঠে) গুরুদেব!
(সঙ্গে-সঙ্গেই আলো নিভে যায় ও আবহ বেজে ওঠে। আলো জ্বললে দেখা যায় শিষ্যদের সঙ্গে দ্রোণাচার্য উপস্থিত। উত্তেজিত অর্জুনের প্রবেশ।)
অর্জুন।— গুরুদেব! গুরুদেব!
দ্রোণ।— কী হয়েছে বৎস মোর? কী হেতু এমন উত্তেজনা?
অর্জুন।— ধিক ধিক গুরুদেব! পূর্বে কেন বুঝি নাই তব এ ছলনা?
যুধিষ্ঠির।— অর্জুন! স্তব্ধ হও। কোন দুঃসাহসে আচার্যদেবে করো অপমান? এই তব আচরণজ্ঞান?
অর্জুন।— মার্জনা করুন জ্যেষ্ঠ। ধৃষ্টতা করুন মার্জনা। করিতে চাহিনি আম গুরু-অবমাননা। শুধু তীব্র ক্ষোভের অনলে অন্তর যায় জ্বলে—
দ্রোণ।— পুত্র মোর ওরে, সবকিছু ব্যক্ত করো মোরে। কী হেতু এমন তীব্র অভিমান তব? মম শ্রেষ্ঠ শিষ্য হয়ে—
অর্জুন।— এই, এই বাক্য বুকে লয়ে বারংবার হয়েছি প্রতারিত।
দ্রোণ।— কী কহিছ অর্জুন?
অর্জুন।— যথার্থ গুরুদেব। আমি তব শ্রেষ্ঠ শিষ্য হব, শ্রেষ্ঠতম বিদ্যা শিখি লব—এই তব প্রতিজ্ঞা ছিল। নিষাদপুত্র একলব্য আসি আজি সেই স্থান কাড়ি নিল!
দ্রোণ।— একলব্য! একদিন যারে আমি করেছি বিতাড়ন তার এমন ঘৃণ্য আচরণ! এত স্পর্ধা তার? মিথ্যাচারী, ভণ্ড, দুরাচার! এ-মুহূর্তে চলো সেই স্থানে—এমন শিক্ষা দিব তারে, জীবনে মিথ্যার জাল বুনিতে না পারে।
(সকলের প্রস্থান। আলো নেভে। আবহসঙ্গীত। আলো জ্বললে দেখা যায় পূর্বস্থানে একলব্য ধ্যানমগ্ন। সকলের প্রবেশ।)
দ্রোণ।— একলব্য!
একলব্য।— (চমকে ওঠে) গুরুদেব ! (প্রণাম করতে যায়।)
দ্রোণ।— স্তব্ধ হও মিথ্যাচারী! কে তোমার গুরু? আমি তো তোমার গুরু নই। শিষ্যরূপে তোমারে তো করিনি বরন।
একলব্য।— গুরুদেব! আপনি মম জীবন-মরণ। আমার এ নিভৃত-শিক্ষা আপনারই দান। এ তুচ্ছ বিদ্যার উৎস আপনার বিতাড়নে মম অভিমান। তাই বলি, মোর পরিচয় আপনার শিষ্য শুধু, আর কিছু নয়।
গান – ৯
হে আচার্য! আপন অন্তরতলে
আসন দিয়াছি তব চরণকমলে।।
অন্য কারে নাহি জানি
গুরু বলে নাহি মানি
হৃদয় ভরা তব সৌরভ-শতদলে।।
তাই তব মূর্তি গড়ি
তোমারেই স্মরণ করি
ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা করি একা এ বিরলে।।
দ্রোণ।— (স্বগত) ধন্য, ধন্য এই নিষাদরাজপুত্র। কেবল একক নিষ্ঠায় এতখানি দক্ষ—ধনুর্বাণে ভূভারতে নেই সমকক্ষ। এ যে বড়ো কঠিন বিচার—একনিষ্ঠ ভক্তির সম্মান, না প্রিয়তম শিষ্যের অভিমান? কিন্তু না। শক্ত হও মন, সর্ব্বোচ্চ কর্তব্য মম প্রতিজ্ঞাপালন। (একলব্যকে) শোনো বৎস একলব্য—আছে নাকি জানা, গুরু বলে মেনে নিলে দিতে হয় গুরুদক্ষিণা?
একলব্য।— গুরুদেব, করুন আদেশ। হোক যত কঠিন সাধন—সাধ্যমতো নিমেষেই করিব পালন।
দ্রোণ।— তবে শোনো আজ্ঞা মম—যে হস্তে রোপণ করো জ্যা, যে হস্তে বাজাও টঙ্কার, মোরে যদি মানো গুরু বলি—দাও সেই দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধ অঙ্গুলি।
(সকলে চমকিত। একলব্য স্তব্ধ, চকিত। ধীরে ধীরে তার মাথা নত হয়।)
একলব্য।— যে আজ্ঞা গুরুদেব।
(আবহসঙ্গীত বাজে। নেপথ্যে সূত্রধারের গান শুরু হয়। গানের সঙ্গে মঞ্চে দেখা যায়, একলব্য ধীরে ধীরে ছুরি দিয়ে তার ডানহাতের বুড়ো আঙুলটি কেটে দ্রোণের পায়ের কাছে রাখে। দ্রোণের আশীর্বাদ প্রদান। কুরু-পাণ্ডবের দল চিত্রার্পিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।)
গান – ১০
গুরুবাক্য মেনে নিয়ে বেদবাক্য বলি’।
একলব্য নিজ হস্তে কাটে যে অঙ্গুলি।।
গুরু আজ্ঞা শিরোধার্য
নাহি আর অন্য কার্য
গুরুর চরণে তাই দিল সে অঞ্জলি।।
ভবিষ্যৎ অন্ধকার
তবু মক্ত মন তার
আপন খড়গে দিল আপনারে বলি।।
(সবাই স্থির। ধীরে ধীরে পর্দা পড়তে থাকে।)

1 thought on “নাটক(অপেরা)-গুরুদক্ষিণা-রচনা ও সঙ্গীত: কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়-শরৎ ২০২৩

Leave a Reply