এস গান শুনি সুরঢাক-টোড়ি প্রদীপ মুখোপাধ্যায় শরৎ ২০১৭

সুরঢাক আগের পর্বগুলো

এবার শুরুটাই করা যাক ২ নং অডিও লিঙ্ক-এর প্রথম তারানা-টি দিয়ে – উস্তাদ সালামত্ খাঁ-এর গলায় গুজরি বা গুর্জরী টোড়ির এই তারানাটি শোনার পর যদি বলি – “বাব্বাঃ কী দাপঅঅট্” – তাহলেই বোধহয় মনে পড়ে যাবে কোথায় শুনেছ। পড়েনি মনে? দোলায় বসে ওস্তাদজি আর পিছনে চলমান তবলচি – কারবাঁ চলেছে রাজদরবারে – রাজা শুনে খুশি হলে ইনাম মিলবে, সেই শুনে দুই বন্ধুও চলল রাজবাড়ি, পরে ঘটনাচক্রে যারা হয়ে গেল ভায়রাভাই। হ্যাঁ – ঠিক – গুপী বাঘা।

হারাধনের দশটি ছেলের শেষটি, হিন্দুস্তানী সঙ্গীতের দশটি ঠাটের ন’টি ঠাটের কথা বলার পর টোড়ি ঠাটের টোড়ি রাগটি নিয়ে এবার ঠাটপর্ব শেষ করার কথাই ছিল।

দশটি ঠাটের অন্য জনক রাগগুলির মত টোড়িও এই একই নামের ঠাটের, মানে টোডি ঠাটের জনক রাগ। টোড়ি কে শুদ্ধ টোড়ি ও বলা হয়। যে স্বরগুলি এই রাগে সাধারণতঃ ব্যবহৃত হয় সেগুলি হল -সা ঋ জ্ঞ ক্ষ প দ ন। রে (ঋ) গা(জ্ঞ) ধা(দ) এই তিনটি স্বর কোমল, আর মা (হ্ম) স্বরটি তীব্র, অর্থাৎ -এই রাগে চারটি বিকৃত স্বর ব্যবহৃত হয়।

তবে দশটি ঠাটের অন্যান্য রাগগুলির তুলনায় টোড়ি বেশ একটু অদ্ভুত – পরিবেশণকারীর দক্ষতায় বিষাদ আর উচ্ছলতা – এই দুই বিপরীত ধরণের রসই প্রকাশ করা যায় টোড়ির সুরে। কথিত আছে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উদ্-দৌলা সঙ্গীতের আসর বসাতেন গভীর অরণ্যে, মূলতঃ পশু-পাখীদের জন্য – টোড়ির সুরে নাকি হরিণরা এসে হাজির হত সেই আসরে। সত্যমিথ্যা জানা নেই, তবে প্রকৃতির যাদুময় মনোহারিত্বের কাছে পশু বা পাশবিকতার আত্মসমর্পণ (Todi is the surrender of animal life to the magic and enchantment of the beauty of nature)- ও সি গাঙ্গুলীর লেখায় টোড়ির এই বর্ণনার সাথে গল্পটার বেশ একটু মিলও আছে। চিত্রশিল্পীদের কাছেও টোড়ি  প্রিয় বিষয়। টোড়ির চিত্ররূপে প্রায়ই দেখা যায় সদ্যফোটা সাদা পদ্মফুলের মত সংযত, সুন্দরী রমণী বীণা হাতে ঘন সবুজ বনের পাশে দাঁডানো, আর তার পাশে এক বা একাধিক মুগ্ধ হরিণ। জাফ্‌রান আর কর্পূরের গন্ধের সাথেও টোড়ির সম্বন্ধের কথা বলা আছে সঙ্গীত দর্পনে।

টোড়ির বৈশিষ্ট্য ফোটে কোমল রে থেকে কোমল গা তে পৌঁছে তাকে সম্বাদী স্বরের যথাযোগ্য সম্মান-নজরাণা দিয়ে আবার সা তে ফেরার আগে কোমল রে তে ন্যাস(ফৈয়াজ খাঁর অডিও লিঙ্ক টা শুনে দেখ)। ফেরার পথে রে তে মৃদু আন্দোলন (জিন্দাবাদ টিন্দাবাদের মত প্রাণঘাতী আন্দোলন নয়, হাল্কা হাওয়ায় পাতার কাঁপনের মত) ও হতে পারে। এই ঋ-জ্ঞ, জ্ঞ-ঋ কে টোড়ির জান ও বলা হয়, যা না থাকলে টোড়ি শুধু প্রাণহীন প্রতিমা।

টোড়ির বহু বিখ্যাত রচনা ও পরিবেশনার মধ্যে জিয়া মহিউদ্দিন ডাগরের রুদ্রবীণা, হাবিব আলী খাঁ-এর বিচিত্র বীণা, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেতার, আলি আকবর খাঁ সাহেবের সরোদ, হীরাবাঈ বরদেকরের কাঙ্কারিয়া জী না মারো, রামচতুর মল্লিকের ধ্রুপদ(বৈশিষ্ট্য পঞ্চম স্বরে সম্‌ -দইয়া বতা দুবারা ভঈ), মল্লিকার্জুন মন্‌সুর ও গঙ্গুবাঈ হাঙ্গলের ভজো রে, ডি ভি পালুশকরের আব মোরে রাম, তানরস খাঁর আব মোরে নইয়া পার করো রে বেশ উল্লেখযোগ্য।

লঘুসঙ্গীতের জগতেও টোড়ি আশ্রিত গান প্রচুর। পণ্ডিত রবিশঙ্করের পরিচালনায় এরি ম্যয় তো প্রেম দিওয়ানি গানটির প্রিল্যুড এ ঐকতানটা শুনে দেখতে পার। ৭ মাত্রার তেওড়া তালের এই গানটির বাণী এরি ম্যয় তো শুরু হওয়ার ঠিক আগে একটা একেবারে পণ্ডিতজীর ছাপ লাগানো সরল কিন্তু অসাধারণ অনাগত সম্‌ এর তেহাই আছে

 একটু বয়স্কদের মনে পড়বে লতা মঙ্গেশকরের নন্দ নন্দন, বৈজু বাওরা ছায়াছবিতে মহঃ রফির ইন্সান বনো, মান্না দের জাগো রে প্রভাত আয়া – সন্ত জ্ঞানেশ্বর ছবিতে। আর একটু কম বয়েসীরা একবারেই মনে করতে পারবে অমর প্রেম ছায়াছবিতে লতা মঙ্গেশকরের সেই বিখ্যাত গান – রাহুল দেব বর্মণের সুরে – র্যয়না বীত যায়।   

আরোহণ  – স, ঋ, জ্ঞ, ক্ষ, প, দ, ন, র্স (ভিন্নমতে আরোহণে প বর্জিত)

অবরোহণ – র্স, ন, দ, প, ক্ষ, জ্ঞ, ঋ, স।

জাতি      –  সম্পূর্ণ- সম্পূর্ণ (ভিন্নমতে – ষাড়ব-সম্পূর্ণ

বাদী স্বর  – দ (ভিন্নমতে জ্ঞ), সম্বাদী স্বর-জ্ঞ (ভিন্নমতে ঋ)।

পকড়      –  দ্‌ ন্‌ স, ঋ জ্ঞ-, ঋ-স।

মুখ্য অঙ্গ  – দ্‌ , দ্‌দ্‌, ক্ষ্‌ দ্‌ ন্‌ দ্‌, দ্‌, দ্‌ ন্‌ স জ্ঞঋ, স, জ্ঞঋ জ্ঞ ক্ষ দ, প, দ ক্ষ জ্ঞ, জ্ঞঋ জ্ঞ, ঋ, স।

টোড়ির মিল আছে ঐ একই নামের করণাটকি রাগের সাথে নয়, বরং কর্ণাটকি পদ্ধতির শুভপন্তুবরালি বা রাগম্ এর সাথে। আরোহণ সা, র১, গ২, ম১, প, ধ১ ন৩ র্স, আর অবরোহণ -র্স, ন৩, ধ১, প, ম১, গ২, র১, স।  সাথের লিঙ্ক-এ শুভপন্তুবরালির আরোহ-অবরোহ শুনে দেখ।  

টোড়ি রাগ ভিত্তিক রবীন্দ্রসঙ্গীতের কয়েকটি: আর কি আমি ছাড়ব তোরে, ভবকোলাহল ছাড়িয়ে, সখীরে পীরিত বুঝাবে কে। নজরুল গীতি – নয়ন মুদিল কুমুদিনী হায়, সেদিন অভাব ঘুচবে কি মোর (খট্‌ টোড়ি), সে ধীরে ধীরে আসি (দেশি টোড়ি), উদার অম্বরে দরবারে টোড়ি প্রশান্ত প্রভাত (দরবারী টোড়ি)।

টোড়ি রাগের অনেক মিশ্র রূপ আছে – ভূপাল টোডি, লাচারি টোড়ি, সহেলি টোড়ি, বিলাসখানি টোড়ি, গুর্জরী টোড়ি, আসাবরী টোড়ি, বাহাদুরী টোড়ি, আহিরী টোড়ি, খট্‌ টোড়ি, জৌনপুরী টোড়ি, লক্ষী টোড়ি, মঙ্গল টোড়ি, হুসেইনি টোড়ি, আভেরী টোড়ি (স্বল্প প্রচলিত -আসাবরি আর খমাজ অঙ্গ মিশিয়ে), সুহা টোড়ি, বৈরাগী টোড়ি, নিরঞ্জনী টোড়ি। আবার নাম ছাড়া টোড়ির সাথে মিল নেই বিশেষ তেমন টোড়িও আছে, যেমন দেশি টোড়ি, অঞ্জনী টোড়ি, গোবর্ধনী টোড়ি। ভাতখন্ডেজী উল্লেখ করেছেন কিছু অপ্রচলিত টোড়ির – মার্গ, মুদ্রিকী, জিল্‌ফ, কাফী টোড়ি।

লিঙ্ক-১   এবারের অডিও লিঙ্কের প্রথমেই পণ্ডিত রবিশঙ্করের পরিচালনায় এরি ম্যয় তো প্রেম দিওয়ানি গানটির প্রিল্যুড এর ঐকতান। এরপর মান্না দের জাগো রে প্রভাত আয়া – সন্ত জ্ঞানেশ্বর ছবিতে, শেষে অমর প্রেম ছবির জন্য গাওয়া লতা মঙ্গেশকরের ‘রহনা বীতি যায়ে।’

লিঙ্ক-২ঃ দ্বিতীয় লিঙ্কটায় আছে -সালামত খাঁ সাহেবের গুর্জরী টোড়ির তারাণা। এরপর টোড়ির আরোহন-অবরোহণ, কর্ণাটিক শুভপন্তুভরালির আরোহণ-অবরোহণ, তারপর DAW -সফ্টওয়্যারে বাজানো ভাতখন্ডেজীর ‘কঁহা নর অপনো জনম গঁওয়াবে’ (এর স্বরলিপিও দেওয়া আছে)। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রদ্ধেয় দীপক চৌধুরীর স্বরলিপি সমেত একটি সরগম দেওয়া আছে তারপর। এরপর বিসমিল্লা খাঁ সাহেবের সানাই, ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের খেয়ালের অংশবিশেষ, হীরাবাঈ বরোদেকারের কংকারিয়া জী না মারো (এই অংশটি ‘স্বার্থপর দৈত্য’র সম্পত্তি হওয়ায় লিঙ্ক থেকে বাদ দিতে হল – ইউটিউবে খুঁজে শুনে নিতে পার), আর শেষে মল্লিকার্জুন মনসুরের বিলম্বিত খেয়াল।

 কঁহা নর অপনো জনম গঁওয়াবে র পণ্ডিত বিষ্ণুদিগম্বর ভাতখন্ডেজীর স্বরলিপি নীচে দেওয়া হল।

 

টোড়ি ত্রিতাল (মধ্যলয়)

কঁহা নর অপনো জনম গঁওয়াবে

মায়া মদ বিষয়ারস রচেও

রাম শরণ নাহি আওবে।

য়হ সংসার সকল হ্যয় সুপনো

দেখ কহা লুভাওয়ে,

যো উপজে সো সকল বিনাশে

রহন ন কোউ পাওয়ে।

সুরঢাক আগের পর্বগুলো

Leave a Reply