টাইম মেশিন সীমান্তের অন্তরালে সমরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী শীত ২০১৬

সীমান্তের অন্তরালে-আগের পর্বগুলো

time07পূর্বপ্রকাশিতের পর

সোয়াত উপত্যকায় জেনারেল ক্যাম্বেলের অভিযানের মাস দুই পরেই পেশাওয়ারে বৃটিশ সামরিক হেডকোয়ার্টারস এ জরুরি বার্তা এসে পৌঁছল যে চার সাদ্দার উপকণ্ঠে কয়েকটি বৃটিশ সামরিক ঘাঁটি কেড়ে নিয়েছে উৎমনখেল উপজাতিয় পাখতুনরা। স্যর ক্যাম্বেলের সৈন্যবাহিনী সোয়াত উপত্যকা থেকে ফেরার পর অটুট ও প্রস্তুত অবস্থাতেই ছিল। সেই বাহিনী আবার পাড়ি দিল চারসাদ্দা অঞ্চলে। স্যর ক্যাম্বেলের গোলন্দাজ, অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য উৎমনখেলদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে হারানো বৃটিশ ঘাঁটিগুলি পুনরোদ্ধার করল পাখতুনদের রক্ত স্রোত বহিয়ে দিয়ে। উপরন্তু বৃটিশ শক্তিকে উপেক্ষা করার ধৃষ্টতার দণ্ডস্বরূপ উৎমনখেলদের গ্রামের পর গ্রাম আগুনে ভস্মীভূত করে দিলেন ক্যাম্বেল তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে।

উৎমনখেলদের দমন করে বিজয়ী জেনারেল ক্যাম্বেল ফিরে এলেন পেশাওয়ারে। তাঁর ফিরে আসার কয়েকদিনের মধ্যেই খবর এল যে রানিজাই সর্দাররা ক্যাম্বেল দ্বারা আরোপিত শর্ত পালন করতে অস্বীকার করেছেন। তাঁরা ব্রিটিশের আধিপত্য মেনে নেবেন না বলে জানিয়েছেন। আরও জানিয়েছেন যে রানিজাইদের ওপর চাপানো জরিমানার এক পয়সাও দেবেন না। এ ছাড়া ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে জানা গেল যে রানিজাই নেতারা সাড়ে চার হাজার যোদ্ধা জড়ো করে একটি লশকর গঠন করেছেন ইংরাজের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য।

বৃটিশ হেডকোয়ার্টার্স আবার স্যর ক্যাম্বেলকেই মনোনীত করলেন রানিজাই এলাকায় আরও জবরদস্ত ধরনের অভিযান চালাতে। এবার তাঁকে দেওয়া তিন হাজার দুশ সোলজার ও অফিসার যার মধ্যে ছিল পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য এবং দূরপাল্লার এক ব্যাটারি কামান সমেত গোলন্দাজ সৈন্য। জেনারেল সেই বাহিনী নিয়ে যাত্রা করলেন সোয়াত উপত্যকায় এলাকায় রানিজাইদের ঘাঁটির উদ্দেশ্যে।

রানিজাইদের দুটি শক্তিশালী কেন্দ্র ছিল সাখাকোট ও দরগাই গ্রাম। এই গ্রাম দুটির দক্ষিণে এরা অনেক সাঙ্গড় গড়েছিল ইংরাজ ফৌজের আক্রমণ রোধ করতে। উপজাতীয় যোদ্ধারা জাজ়য়েল ও তলোয়ার নিয়ে সাঙ্গড়গুলিতে অপেক্ষা করছিল আক্রমণকারী বৃটিশ বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য। যোদ্ধাদের উদ্দেশ্য ছিল বৃটিশ সৈন্যের অগ্রগতি গ্রামের বাইরেই রোধ করা যাতে তারা গ্রাম দুটি ঘিরে না ফেলতে পারে। স্যর ক্যাম্বেল আগেই তাঁর গুপ্তচরদের কাছ থেকে রানিজাইদের সাঙ্গড় তৈরির খবর পেয়েছিলেন ও সাঙ্গড়গুলির সঠিক অবস্থান জানতে পেরেছিলেন। তিনি গ্রাম থেকে বেশ দূরে কামান সাজিয়ে গোলাবর্ষণ করলেন সাঙ্গড়ের ওপর। সাঙ্গড়গুলি তাসের বাড়ির মতই একের পর এক লুটিয়ে পড়ল। পাখতুন যোদ্ধারা অনেকেই মারা গেল, বাদবাকি পিছু হটে গ্রামের দিকে গেল গ্রামদুটিকে রক্ষা করার জন্য। সেই অবসরে বৃটিশ পদাতিক ও ঘোড়সওয়ার সৈন্য ঝটিকা আক্রমণ চালাল গ্রাম দুটির ওপর। রানিজাইরা প্রভূত সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিল। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি ,অলিগলিতে তারা বৃটিশ সৈন্যকে বাধা দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করল।

কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারল না। যুদ্ধ শেষে স্যর ক্যাম্বেল গ্রাম দুটিকে বিস্ফোরক দিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়ে গেলেন। এই যুদ্ধের প্রামাণিক বিবরণ থেকে জানা যায় যে বৃটিশ সৈন্যের হতাহতের সংখ্যাও ছিল প্রচুর।

১৮৫৫ সালের প্রথম দিকে থাল এর আশপাশের ওয়াজিরিরা পুনরায় সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে বৃটিশ সামরিক ঘাঁটি সমূহের ওপর হামলা আরম্ভ করল। এদের সঙ্গে যোগ দিল কোহাট- থাল এর মধ্যবর্তী এলাকার তূরি ও জায়মুখট্ উপজাতি। এদের বারংবার হামলায় ঐ বিস্তৃত অঞ্চলের বৃটিশ রক্ষিদল ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল, তোরাওয়াড়ি নামক গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি বেদখল হয়ে গেল আর অন্যান্য ঘাঁটিগুলির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়ে উঠল। ইংরাজের যেটুকু ক্ষমতা, প্রভাব ও সম্মান এসব অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল তাও ভেঙে পড়বার উপক্রম হল। সংকটাপন্ন বৃটিশ রক্ষীদলকে সাহায্য এবং বৃটিশ প্রভাব ও সম্মান পুণঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কোহাটে পাঁচ হাজার সৈন্যের একটি অতিরিক্ত বাহিনী সমবেত করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নেভিল চেম্বারলেনের অধিনায়কত্বে পাঠানো হল অকুস্থলে।  

থাল এর পূর্বে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে পথের পাশেই দর্সমন্দ এর ছোট্ট ঘাঁটি আর তার উত্তর তোরাওয়াড়ি গ্রাম। তোরাওয়াড়িতে দেড় হাজার পাখতুন উপজাতিয় লশকর ঐ অঞ্চলের কাছাকাছি বৃটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলির ওপর চড়াও হবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। জেনারেল নেভিল চেম্বারলেন তোরাওয়াড়িতে পাখতুন উপজাতিয় লশকর সমাবেশের খবর পেয়েছিলেন। তিনি দর্সমন্দ এর পশ্চিমে দোয়াবাতে তাঁর আর্টিলারি বসিয়ে সেখান থেকে তোরাওয়াড়িতে জমায়েত পাখতুন লশকর এর ওপর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করে তাদের ঘায়েল ও ছিন্নভিন্ন করে দিলেন। লশকরের যোদ্ধারা পশ্চাদপসরণ করার সময় বা সুযোগ পেল না কারণ কামানের গোলাবর্ষণ বন্ধ হবার সঙ্গেসঙ্গেই অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য তাদের ঘিরে ফেলে সংহার আরম্ভ করে দিল(অবশ্য পাখতুনরা সুবিধা পেলে তারাও তাই করত)। বৃটিশ ফৌজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর যুদ্ধাস্ত্রের উৎকর্ষের জন্য পাখতুনরা বৃটিশ আক্রমণের সামনে টিকে থাকতে পারল না। যুদ্ধে অনেক লোক হতাহত হবার পর বৃটিশ ইজ্জত আবার সেখানে কায়েম হল।

যুদ্ধে জয়লাভ করার পর নেভিল চেম্বারলেন থাল এর উপকণ্ঠে পাখতুন গ্রামগুলি ধ্বংস করে দিয়ে এগিয়ে গেলেন তাঁর ফৌজ সমেত কুরাম উপত্যকার ভিতর দিয়ে আরাওয়ালি,সাদ্দা ও পারাচিনার হয়ে পেওয়াড় গিরিসংকটের দিকে। পথে তিনি আর কোনও পাখতুন উপজাতিকে উৎখাত করার চেষ্টা করেননি। উপত্যকার ভিতর উপজাতিদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ইচ্ছা তখন তাঁর ছিল না। তাঁর অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। পারাচিনার এর উত্তর পশ্চিমে শালোজ়ান গ্রাম থেকে পেওয়াড় গিরি সংকট অতিক্রম করে কীভাবে আফগানিস্তানের ভিতর প্রবেশ করা যায় সে সম্বন্ধে গবেষণা ও অনুসন্ধান করাই ছিল সে অভিযানের লক্ষ। সেই অনুসন্ধানের ফল দ্বিতীয় অ্যাংলো আফগান যুদ্ধে জেনারেল রবার্টস এর কাজে লেগেছিল।

******

…..”.and the pride of the people that they have never known a master and never will.(Frontier folks of the Afgan and beyond” by Lilian .A.Starr .

১৮৫৮ সালের শেষের দিকে থাল অঞ্চলে কুরাম নদীর পশ্চিম পাড়ে কাবুল খেল উপজাতির কিছু লোকের সঙ্গে একটি বৃটিশ রক্ষিদলের কলহ থেকে রাইফেলের গুলি বিনিময় হয়ে গেল ,ফলে একজন বৃটিশ অফিসার নিহত হলেন। থাল এর মূল ঘাঁটির বৃটিশ অধিনায়ক কাবুল খেল সর্দারের কাছে আল্টিমেটাম পাঠিয়ে দাবি জানালেন যে, যে দলটি বৃটিশ অফিসারের মৃত্যুর জন্য দায়ী সে দলের সব লোককে বৃটিশ কতৃপক্ষের হাতে সমর্পণ করতে হবে যথোপযুক্ত শাস্তি গ্রহণের জন্য। কাবুল খেলদের জির্গা বসল ইংরাজের দাবি বিবেচনার জন্য। জির্গার সভাসদরা মত প্রকাশ করলেন যে এ ক্ষেত্রে দোষ সম্পূর্ণভাবে বৃটিশ সামরিক রক্ষিদলের, কারণ তারা কাবুল খেল এলাকায় অনধিকার প্রবেশ করেছিল। সাবধান করা সত্বেও রক্ষি দল জবরদস্তি উপজাতীয় এলাকায় প্রবেশ করে ও প্রথমে গুলি চালায়। কাবুল খেল সর্দার ইংরাজ অধিনায়কের দাবির উত্তরে জানালেন যে কাবুল খেল দলটিকে ইংরাজের হাতে সমর্পণ করা হবে না , তারা কোনও বিদেশীর হুকুম মানে না।

১৮৫৯ সালের প্রথমেই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নেভিল চেম্বারলেন সাড়ে পাঁচ হাজার সৈন্যের এক ফৌজ নিয়ে পৌঁছে গেলেন থাল এ উদ্ধত কাবুল খেলদের শায়েস্তা করতে। নির্ভীক কাবুল খেল উপজাতি এত বড় ফৌজের ভয়েও মাথা নত করল না, সংশ্লিষ্ট দলকে বৃটিশ শক্তির হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করল। কাবুল খেলরা বৃটিশ বাহিনীর তুলনায় সংখ্যায় ছিল নগণ্য, তারা বৃটিশ ফৌজের সঙ্গে যুদ্ধে ঝড়ের মুখে তৃণের মতই উড়ে গেল। তারপর নেভিল চেম্বারলেন কাবুল খেলদের গ্রামগুলি আগুন দিয়ে ভস্মে পরিণত করে দিলেন।  

জেনারেল নেভিল চেম্বারলেন এর অধীনে এত বড় ফৌজ শুধু ক্ষুদ্র সংখ্যক কাবুল খেলদের দমন করার জন্য পাঠানো হয়েছিল বলে মনে হয় না। ইংরাজের উদ্দেশ্য ছিল সুদূরপ্রসারি। উত্তরপশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধ বৃত্তান্তের লিপিকাররা লিখেছেন যে,ওয়াজিরিস্থানে  মাসূদ খণ্ড জাতি বৃটিশ মূল ঘাঁটি আক্রমণ করার প্রস্তুতি করছিল, তাই বৃটিশকে  আগেভাগে তাদের ওপর চড়াও হতে হল তাদের পরিকল্পনা বিফল করার জন্য। জেনারেল নেভিল চেম্বারলেন নিজের ফৌজ নিয়ে মাসূদ অঞ্চলে যেতে সেই কারণে বাধ্য হয়েছিলেন। ইংরাজের ওজরটা যুক্তিযুক্ত মনে হল না। মাসূদ অঞ্চলটি সাত আট হাজার ফুট উঁচু খাড়া পাহাড়ে অবস্থিত আর অজস্র খরস্রোতা পাহাড়ি নদী নালা এবং ছোট বড় অসংখ্য গিরিসংকটে  ভরা।

তাদের দুর্গম আর সুরক্ষিত নিরাপদ পার্বত্যআশ্রয় ছেড়ে প্রায় ষাট- সত্তর মাইল নেমে এসে ইংরাজের সমতল ভূমিতে যেখানে ইংরাজের শক্তি অজেয়, সেখানে আক্রমণ করবে, ততটা নির্বোধ মাসূদরা নয়। তাছাড়া কোনও পাখতুন উপজাতির কাছে কামান ছিল না যার সাহায্যে তারা আগে গোলাবর্ষণ করে নিজেদের আক্রমণের পথ সুগম করতে পারত। যে কারণটা এখানে যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয় সেটা হল যে মাসূদরা ইংরাজের অভ্যুদিত শক্তিকে স্বীকার না করে তখনও কাবুল সরকার এর সঙ্গে নিজেদের চিরাচরিত রাজনৈতিক ও ব্যভারিক সম্বন্ধ বজায় রেখে চলছিল। চেম্বারলেন এর অভিযান এর উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখিয়ে মাসূদদের কাবুল এর প্রতি প্রীতি ও আনুগত্য লোপ করা।        

মাসূদদের কাল্পনিক ও সম্ভাব্য আক্রমণের ওজর দেখিয়ে নেভিল চেম্বারলেন টাঁক নামক বৃটিশ ঘাঁটিতে নিজের ফৌজ পুনর্গঠন করে সেখান থেকে রওনা হলেন কানিগুরাম ও মাকিন অভিমুখে। বৃটিশ বাহিনী খিরগি ও জানজোলা হয়ে পালোসিন এর বহির্ভাগ পর্যন্ত বিনাক্লেশে এগিয়ে গেল। ইতিমধ্যে মাসূদরা সংবাদ পেল ইংরাজের সেই অপ্রত্যাশিত ও অতর্কিত আক্রমণ সম্বন্ধে। তারা তাড়াহুড়া করে তিন হাজার সৈন্য একত্রিত করে ইংরাজকে বাধা দেবার চেষ্টায় পালোসিন এ পাঠাল। পালোসিনের যুদ্ধে মাসূদরা ইংরাজের সুপরিকল্পিত অভিযানের প্রতিরোধ করতে পারল না। সে যুদ্ধে মাসূদদের লোকক্ষয় হল অপরিমিত। পাঁচ হাজার যোদ্ধার আর একটি মাসূদ লশকর বৃটিশদের  বাধা দিল পালোসিন এর মাইল কয়েক উত্তরে বারাড়ি গিরিসংকটে। অপরিসর গিরিসংকটের দু পাশের পাহাড়ের চূড়াগুলি থেকে জাজ়য়েলের গুলি বর্ষণ করে বৃটিশ বাহিনীর অগ্রগতি অচল করে দিল। জেনারেল নেভিল চেম্বারলেন দেখলেন যে পাহাড়ের চূড়া থেকে মাসূদ লশকরকে স্থানচ্যুত না করতে পারলে গিরিসংকট অতিক্রম করা বৃটিশ ফৌজ এর পক্ষে অসম্ভব। তিনি পদাতিক সৈন্যের দুটি বড় দল পাঠালেন পাহাড়গুলির পিছন দিয়ে উঠে মাসূদ লশকরের ওপর ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে তাদের স্থানচ্যুত করতে।

timemachinesimanter01কিন্তু পাহাড়ের চূড়ার নাগালের মধ্যেও বৃটিশ দলদুটি পৌঁছতে পারল না।  মাসূদদের গুলির আঘাতে প্রচুর প্রাণহানি হল বৃটিশ সৈন্যদলের। কয়েকবার চেষ্টা করল বৃটিশ সৈন্যদল, কিন্তু প্রত্যেকবারই অকৃতকার্য হল। তখন বাহিনীর গোলন্দাজ সৈন্য পিছু হঠে গিয়ে সুবিধা মত জায়গায় কামান বসিয়ে গোলাবর্ষণ আরম্ভ করল পাহাড়ের মাথায় মাসূদ লশকরের ঠিকানা লক্ষ করে। মাসূদ লশকর কামানের গোলায় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তারপর বৃটিশ বাহিনী এগিয়ে চলল গিরিসংকটের ভিতর দিয়ে শত শত মাসূদ যোদ্ধাদের মৃতদেহ পায়ের তলায় দলিত করে।

মাকিন পৌঁছে চেম্বারলেন সেখানকার স্থানীয় মাসূদদের আত্মসমর্পণ আর ইংরাজের বশ্যতা স্বীকার করার দাবি জানালেন। মাকিন মাসূদদের জির্গা দাবি সম্বন্ধে বিবেচনা করে তাদের সর্দার মারফত উত্তর দিলেন যে তাঁরা সেই অন্যায় দাবি গ্রাহ্য করবেন না। নেভিল চেম্বারলেনের আদেশে তখন কামানের গোলা বর্ষণ করে সম্পূর্ণরূপে গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া হল। মাসূদরা তাদের আবাসস্থল হারিয়ে দুর্গম পাহাড়ের গুহায় ও জঙ্গলে আশ্রয় নিল, কিন্তু আত্মসমর্পণ করল না, সব কিছু হারিয়েও তারা অপরাজিত রয়ে গেল। এদিকে বৃটিশ বাহিনীর রসদ ফুরিয়ে আসছিল, তার ওপর সমগ্র মাসূদ অঞ্চলে ভারি তুষারপাত আরম্ভ হওয়ায় ফিরে যাবার রাস্তাঘাট বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল আর শীতের প্রকোপও হয়ে উঠল প্রচণ্ড , কাজেই নেভিল চেম্বারলেন এর পক্ষে মাসূদদের  বিরুদ্ধে তখন আর অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হল না। তিনি মাসূদদের পদানত করার চেষ্টা পরিত্যাগ তাঁর বাহিনীকে ফেরত নিয়ে গেলেন বান্নুতে। 

১৮৬৫ সাল নাগাত পাখতুনিস্থানের প্রায় সব উপজাতিগুলিই দুর্বল হয়ে পড়ল। ইংরাজ তাদের ঘরবাড়ি, বিধ্বস্ত করে গবাদি গৃপালিত পশু ও খেতদখামার সব ধংস করে দিয়েছিল, কাজেই তাদের না ছিল আশ্রয় আর না ছিল খাদ্য, তাদের আপাতত আত্মসমর্পণ করা ছাড়া উপায় ছিল না।

আপাতদৃষ্টিতে ইংরাজ প্রায় সমস্ত পাখতুনিস্থানেই নিজের প্রভুত্ব কায়েম করতে সফল হয়েছিল, বাকি ছিল শুধু উত্তরে উৎমনজাই আর দক্ষিনে মাসূদ উপজাতি। এদেরও বড় বড় গ্রাম এবং খেতখামার সব ধংসস্তূপে পরিণত করে দেওয়া হয়েছিল , কিন্তু এরা কাবুল, গ়জনি ও কান্দাহার থেকে কিছু কিছু খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে কোনও রকমে জীবনধারণ করতে পেরেছিল। ইংরাজ সরকার এ কথা জানতে পেরে এই দুই উপজাতির এলাকা সম্পূর্ণ ভাবে অবরোধ করলেন যাতে এক কণা খাদ্যও আফগানিস্তান থেকে তাদের কাছে না আসতে পারে। পার্বত্য দেশের নিষ্ঠুর প্রকৃতি আর কঠিন পরিবেশ, তার ওপর খাদ্যের অভাবে তাদের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ক্ষুধার তাড়নায় কাতর, এ হেন অবস্থায় এই দুই উপজাতির পক্ষে ইংরাজের কাছে সাময়িকভাবে নতি স্বীকার করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না। ফলে উৎমনজাইরা ১৮৬১ সালে ও মাসূদরা ১৮৬২ সালে ইংরাজের কাছে আত্মসমর্পণ করল।

ইংরাজ সরকার নিশ্চিন্ত হয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। সমগ্র পাখতুনিস্তান আজ তাঁদের পায়ের তলায়, বৃটিশ ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত, একমাত্র যে অঞ্চল তাঁদের ভয়ের কারণ ছিল, আজ নিরাপদ। এখন তাঁরা নিরুপদ্রবে ভারতবর্ষের ওপর আধিপত্য সুদৃঢ় করতে পারবেন। গোটা আফগানিস্তানে বৃটিশ প্রভাব অক্ষুন্ন থাকবে আর রাশিয়ার ছায়াও পড়তে পারবে না সেখানে। কিন্তু একটা কথা ইংরাজ ধারনা করতে পারেনি যে পাখতুনদের সেইরূপ প্রতিকুল অবস্থার মধ্যেও তারা ইংরাজের বিরুদ্ধে অসি ধারণ করবার জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিল।

তবে তাঁরা নিশ্চিন্ত হয়ে বসে ছিলেন না।  এ অবস্থায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজ চলতে লাগল দিন রাত আর সেই সব স্থানে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সঙ্গে নকশা প্রভৃতির সুরক্ষার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসগুলিতে কড়া সামরিক প্রহরার ব্যবস্থা করা ছিল। বিশেষ অনুমোদনপ্রাপ্ত কর্মচারি ছাড়া সকলেরই প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল সেখানে। অশ্বেত কর্মচারিদের তল্লাশি নেওয়া হত বাইরে আসার সময়। এক টুকরো বাজে কাগজও কেউ অফিসের বাইরে আনতে পারত না। গোটা কুরাম অঞ্চলে ক্যামেরা রাখা অশ্বেত লোকেদের জন্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল যাতে গোপনীয় নকশা বা প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ছবি কেউ না তুলতে পারে।

কাজের চাপে সরকারি কর্মচারীদের নিশ্বাস ফেলবার ফুরসত নেই। কেউ বা সত্যসত্যই কাজে মগ্ন, কেউ বা ব্যস্ত থাকার ভান করতেই ব্যস্ত। রশীদ খাঁও ভীষণ ব্যস্ত, রাতে খাবার টেবিলেও তার উপস্থিতি সম্প্রতি বিরল হয়ে পড়েছিল। কুদরৎ খাঁর সরকারি চাকুরির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক ছিল না তবে বন্ধুত্বের খাতিরে প্রায়ই রশীদ খাঁ কিংবা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন কিন্তু বেশ কয়েক দিন হল তাঁকেও দেখতে পাইনি।

কুদরৎ খাঁর সাম্প্রতিক অনুপস্থিতি সম্বন্ধে মহম্মদ জান (মহম্মদ জান কোহাট অঞ্চলের আফরিদি ও থালে সরকারি কাজে নিযুক্ত মেকানিক) এর কাছে একটি গল্প শুনলাম। গল্পটি হয়ত আষাঢ়ে পর্যায়ে পড়ে কিন্তু বেশ রসালো। মোহম্মদ জান বলল, “ইংরাজ কর্তারা অবশ্য প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি, কিন্তু উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অতি গোপনীয় নকশা ও নথিপত্রের প্রতিলিপি কোনও অজ্ঞাত লোক মারফত কয়েকজন উপজাতীয় সর্দারের হাতে গিয়ে পৌঁছায়। এই সর্দাররা একজন বড়দরের মুক্তি সংগ্রামী পাখতুন নেতার কাছ থেকে নির্দেশ পেয়েছিলেন নকশা এবং নথিপত্র সম্বন্ধে। তাঁদের বলা হয়েছিল যে তাঁরা এক নির্দিষ্ট স্থানে ও সময়ে এক অজ্ঞাত ছদ্মবেশীর কাছ থেকে একখানি শিলমোহর করা লেফাফা পাবেন, তাঁরা যেন সত্বর সেই লেফফাটি কোনও বিশ্বস্ত অনুচর মারফত পাঠিয়ে দেন সুতরগর্দন গিরিসংকটের নিকট একটি নিদিষ্ট স্থানে ‘আলেফ’ সাহেবের কাছে। আলেফ সাহেবের প্রকৃত পরিচয় খুব কম লোকই জানে। জনাচারেক উচ্চস্তরের সর্দার, যারা নাম করা মুক্তিসংগ্রামী আর যারা তাঁর অন্তরঙ্গ তাঁরাই আলেফ সাহেবের প্রকৃত পরিচয় ও তাঁর কার্যকলাপ সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল।

“স্থানীয় সর্দাররা কুদরৎ খাঁকে মনোনীত করেছিলেন বার্তাবাহক রূপে কাজ করার জন্য। সর্দার হুসেনগুল এর নির্দেশ অনুযায়ী কুদরৎ খাঁ শিলমোহর করা লেফাফাটি নিয়ে হাঁটাপথে রওনা হলেন রাতের অন্ধকারে পেওয়াড়ের দিকে। এদিকে কুদরৎ খাঁর অনুপস্থিতে বাড়িতে তাঁর স্ত্রী সলমার খুবই একা মনে হচ্ছিল। মনকে ভোলাবার প্রয়াসে তিনি একরাশ কাঠ চেলালেন কুড়ুল দিয়ে, বাড়ির সমস্ত জিনিসপত্র ওলটপালট করে করে সেগুলিকে আবার সাজালেন। এত কাজ করেও তাঁর সময় কাটে না। তাঁর অস্থিরতা দেখে গ্রামের অন্যান্য স্ত্রীলোকেরা নেপথ্যে একটু আধটু টিটকারি দিতেও কসুর করেনি কারণ স্বামীর বিরহে পাখতুন মহিলার এরকম ভাবালুতা সাজে না। পরদিন সলমা একা বাড়িতে থাকতে না পেরে বাড়ির আগল বন্ধ করে চলে গেলেন কালোজান গ্রামে তাঁর বাপের বাড়িতে।

“ভোরবেলা কুদরৎ খাঁ পৌঁছে গেলেনা আরাওালির কাছে। সেখান থেকে পারাচিনারগামি এক মালবাহী লরিতে উঠে পড়লেন। লরির চালক কুদরৎ খাঁর পরিচিত, কিন্তু গাড়িতে আর দুজন যাত্রিকে তিনি পূর্বে কখনও দেখেন নি। বিকেলবেলা তাঁরা পারাচিনার পৌঁছে সকলে ঢুকলেন এক ঢাবাত জলযোগের জন্য। সকলে যখন ঢাবায় আহারে ব্যস্ত সেই সময় কুদরৎ খাঁ সকলের অজ্ঞাতে চুপিচুপি সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন। পারাচিনার মালভূমির তিন দিকে করাতের দাঁতের মত উঁচু পর্বতশ্রেণী। পাহাড়গুলি খাড়া ওপর দিকে উঠে গেছে এবং মাঝে মাঝে তার ভিতর দিয়ে চলে গেছে দুর্গম ও সংকীর্ণ গিরিপথ। কতকগুলি গিরিপথ চলে গেছে আফগানিস্থানে আর কিছু গিয়ে মিশেছে পেওয়াড় গিরিসংকটে। একটি পাহাড়ের গুহায় রাত কাটিয়ে পর দিন একটি গিরিপথ ধরে কুদরৎ খাঁ এগোতে লাগলেন সুতর গর্দনের দিকে। পথে পেওয়াড় গিরিসংকটের মাঝামাঝি জায়গায় তাঁর সঙ্গে হটাৎ দেখা হল সেই দুটি লোকের সঙ্গে যারা তাঁর সহযাত্রী ছিল মালবাহী লরিতে আগের দিন। লোক দুটি কুদরৎ খাঁর সঙ্গে বেশ আলাপ জমিয়ে নিল। কথায় কথায় তারা কুদরৎ খাঁর মতামত জানতে চাইল মহাযুদ্ধ ও যুদ্ধে পাখতুনদের কর্তব্য সম্বন্ধে। কুদরৎ খাঁ বললেন যে পাখতুনিস্তানের গিরিবর্ত্মগুলিতে ইংরাজের সঙ্গে জার্মানির ঘোরতর যুদ্ধ হওয়া অনিবার্য এবং সে যুদ্ধে দুপক্ষেরই দুর্বল হয়ে পড়া স্বাভাবিক। পাখতুনদের উচিত হবে সেই সুযোগে নিজেদের স্বাধীনতা পুণরুদ্ধার করা। গল্প করতে করতে সহযাত্রীদুটি হঠাৎ ছোরা বার করে কুদরৎ খাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আপাতদৃষ্টিতে কুদরৎ খাঁকে অন্যমনস্ক মনে হলেও তিনি এরকম বিপদের সম্ভাবনা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন। তিনি চকিতে সরে দাঁড়ালেন আর আক্রমণকারীরা টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। ইতিমধ্যে তড়িৎবেগে কুদরৎ খাঁ নিজের রিভলবার বার করে দুজনকেই গুলিবিদ্ধ করলেন, আক্রমণকারীরা আর মাটি ছেড়ে উঠতে পারল না।কুদরৎ খাঁ আবার যাত্রা আরম্ভ করলেন।

ক্রমশ

জয়ঢাকের টাইম মেশিনের লাইব্রেরি

Leave a Reply