উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়টা পার হয়ে গিয়েছে তখন। কোলকাতার আধুনিক ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির অনেকেই ডিরোজিও সাহেবের আলোয় ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্টে সামিল হয়েছে। ডিরোজিও সাহেব এ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে গেলেও তাঁর দীক্ষিত নব্য বঙ্গ যুবসম্প্রদায় রমরম করছেন প্রচলিত সবকিছুর বিরোধীতা করে, চলতি গোঁড়ামিকে উড়িয়ে দিয়ে। সে এক রেনেসাঁসের মুখোমুখি নগর কোলকাতা। প্রেসিডেন্সি কলেজের মেধাবী ইংরেজি শিক্ষিত যুবসম্প্রদায় তখন মদ্যপান, গো মাংসভক্ষণ, হিন্দু আচার-আচরণের আদ্যোপান্ত বিরোধীতা ইত্যাদি নানাপন্থায় উগরে দিচ্ছে মনের মধ্যে পুষে রাখা বিষবাষ্প, ওলোটপালট করে দিতে চাইছে চলতি সবকিছুকে।
ঠিক তখন একজন মেধাবী, মিতভাষী, উচ্চশিক্ষিত মানুষ, কোনোরকম হুজুগে না মেতে উঠে সঙ্কল্প নিয়েছিলেন সমাজটাকে গড়ে তোলায় নিজের মত করে ভূমিকা নিতে। মানুষটির নাম প্যারীচরণ সরকার। স্কুল শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করে বেশ কয়েকটি স্কুলে শিক্ষকতার কাজে কাটিয়ে দিয়েছেন এরই মধ্যে। আর বুঝে গিয়েছেন স্ত্রীশিক্ষার বিস্তার না হলে সমাজের অন্ধ গোঁড়ামি ঘোচা অসম্ভব।
বেথুন স্কুল তখনও স্থাপিত হয়নি। প্যারীচরণ তখন বারাসাত স্কুলের হেডমাষ্টারমশাই। বারাসাতের দুই ভাই নবীনকৃষ্ণ মিত্র আর কালীকৃষ্ণ মিত্র এই হেডমাষ্টারমশাইকে বললেন ওঁরা মেয়েদের স্কুলের জন্য টাকাপয়সা দিতে পারেন যদি উনি স্কুল প্রতিষ্ঠায় দায়িত্ব নেন। প্যারীচরণ যথারীতি দায়িত্ব নিলেন এবং ১৮৪৭ সালে চালু হল সে স্কুল।
কিন্তু নগর কোলকাতার রেনেসাঁস থেকে দূরে থাকা বারাসাত ছিল গোঁড়া ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত। উচ্চশ্রেণীর মানুষ ক্ষেপে উঠলেন মেয়েদের এমন শিক্ষাদীক্ষার আয়োজন দেখে। গুজব উঠল, জমিদারেরা নাকি টাকাপয়সা দিয়ে লোক লাগিয়ে প্যারীচরণকে খুন করার চেষ্টা করছেন।
এসব শুনে বেথুন সাহেব এগিয়ে এলেন। পাশে দাঁড়ালেন প্যারীচরণের। আর বারাসাতের সেই মেয়েদের বিদ্যালয় দেখে এতটাই মুগ্ধ হলেন যে ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন বেথুন স্কুল। হেদুয়ার পশ্চিমে ছিল বেথুন সাহেবের এই বিদ্যালয়টি।
কিন্তু সেখানেও উচ্চশ্রেণীর হিন্দু বালিকাদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। পন্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কার নিজের মেয়েকে সেই বেথুন স্কুলে পাঠিয়ে সমাজচ্যূত হয়েছিলেন। প্যারীচরন বুঝেছিলেন শুধু বেথুন স্কুলে হবে না। শহর কোলকাতার বিভিন্ন ভদ্রপল্লীতে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার কিছুতেই হবে না। সেইমত নিজের খরচে ভদ্রাসন বাড়িতে ‘চোরবাগান বালিকা বিদ্যালয়’ স্থাপন করলেন। এছাড়াও এমন অনেক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সরাসরি অংশ নিতে শুরু করলেন।
ইতিমধ্যেই নানা ইংরেজি স্কুলে প্যারীচরণ সরকারের ‘ফার্ষ্ট বুক অফ রিডিং’, ‘সেকেন্ড বুক অফ রিডিং’, ‘থার্ড বুক অফ রিডিং’ আর ‘ফোর্থ বুক অফ রিডিং’ পাঠ্যসূচিতে স্থান পেয়ে গেছে। বই ও লেখকের মেধার খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষক হিসেবে প্যারীচরণের নাম শিক্ষিত মহলে ততদিনে সর্বজনবিদিত।
এই সময় তাঁর জীবনের আরেকটি বাঁক। প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগ দিলেন তিনি ১৮৬৩ সালে। নতুন এই অধ্যাপক খুবই প্রিয় হয়ে গেলেন ছাত্রদের কাছে। মধুরভাষী এই শিক্ষক যে আদ্যপান্ত শিক্ষা ও ছাত্র অন্তপ্রাণ, এ বুঝতে সময় লাগল না কারো। অল্প কিছুদিন পরে প্যারীচরণ ব্যথিত হলেন ইয়ং বেঙ্গল সম্প্রদায়ের উছৃঙ্খল মদ্যপানে। কিন্তু এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার মানুষ উনি নন। মেধাবী ছাত্রদের মদ্যপানের উগ্রতা থেকে ফিরিয়ে আনতে উনি প্রতিষ্ঠা করলেন মদ্যপান-নিবারণী সভা। আমৃত্যু ছিলেন এই সভার সম্পাদক।সম্ভবত তাঁর পূর্বে শিক্ষিত বাঙালীদের মধ্যে আর কেউ মদ্যপান বিরোধী এমন কার্যকলাপ করেননি। সাধারন মানুষের মনে এই কার্যকলাপের খুব প্রভাব পড়েছিল। সে’সময় কোলকাতার রাস্তাঘাটে একটি গান খুব প্রচারিত হয়েছিল এ নিয়ে।
“মধু পান আর কোরো না।
প্যারীচাঁদ করেছে মানা
ইয়ং বেঙ্গল আর বাঁচবে না
খাড়া বড়ি থোড়ের নাড়ি
তাতে হলে বাড়াবাড়ি
অগ্নি যাবে যমের বাড়ি, কালবিলম্ব আর সবে না”।
(সংস্কৃতে মধু শব্দটি মদ্য অর্থে ব্যবহৃত। এগানেও সে অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছিল)।
বছর বারো মদ্যপানের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলনের ফল বৃথা যায়নি এই শিক্ষকের। মদ্যপান বিরোধী একটি চিন্তাধারাও কোলকাতাও স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল ইংরেজি শিক্ষিতদের মধ্যে।
পঞ্চাশোর্ধ বয়েসে তাঁর হাতে একটি ক্ষত দেখা দেয়। সেই ক্ষতটিই এই মহান চিন্তাবিদের প্রাণ কেড়ে নিল। ১৮৭৫ এর জুলাই মাসে প্যারীচরণ সরকারের মৃত্যু হল। কলকাতার ছাত্র যুব শিক্ষাবিদ সমাজই শুধু নয়, সাধারন মানুষও চোখের জল ফেলেছিল এই মহান মানুষটির শেষযাত্রায়।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে একই দিনে জন্মগ্রহণ করলেও বাঙালির কাছে অনেকটাই অচেনা রয়ে গিয়েছেন প্যারী চরণ সরকার; এই গুরুত্বপূর্ণ লেখাটির জন্যে লেখক ও জয়ঢাক, দুজনকেই অসংখ্য ধ্যন্যবাদ !
ছোট ভ্রম সংশোধন করে নিতে চাই, উপরের মন্তব্যে “একই তারিখে” উল্লেখ করতে চেয়েছি।
অনেক ধন্যবাদ। আপনাদের ভালো লাগলেই আমাদের কাজ সার্থক।