টাইম মেশিন ভারতভ্রমণ দীন মহম্মদ অনুবাদ শান্তনু বসন্ত ২০১৭

আগের পর্বগুলো

time01

পত্র ২৯

প্রাচ্য বা অন্য যে কোন জায়গায় হাতির মতো বিশাল আর একটাও  নেই। আশ্চর্য হবেন আর সাথে সাথে বেশ মজাও পাবেন এই বিরাট চারপেয়েটির কথা পড়লে। এটা সম্ভবত অবিসংবাদিতভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বিশাল । মোটামুটি বারো থেকে পনেরো ফুট উচ্চতার, সাতফুট মত চওড়া; গায়ের চামড়া এতই পুরু যে তলোয়ার ভেদ করতে পারবে না। চোখদুটো খুবই ছোটো ছোটো, কানদুটো খুব বড়ো, সারা শরীরটা বেশ গোলগাল, দেহের পেছনদিকটা ক্রমশ উঁচু হয়ে বেশ একটা খিলানের মতো আকার নিয়েছে। গায়ের রঙ বেশ ঘন, চামড়ায় অসংখ্য লম্বাটে দাগ। মুখের ভেতর দুদিকের চোয়ালে চারটি করে দাঁত, চিবোনোর জন্য; আর সামনের দিকে দুটি লম্বা দাঁত দুপাশ থেকে বাইরে বেড়িয়ে এসেছে। ছেলে হাতির দাঁতগুলি পুরু ও মজবুত আর মেয়ে হাতিদের দাঁতদুটি ছোটো এবং ছুঁচোলো। ছেলে বা মেয়ে উভয়েই, যে দাঁতটা তীক্ষ্ণ সেটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আর যেটা একটু ভোঁতা মত, সেটা দিয়ে গাছপালা উপড়ে নেয় খাবে বলে। পুরুষ হাতিদের দাঁত কখনো কখনো দশফুট পর্যন্ত লম্বা হয় আর একেকটার ওজন কম করে তিনশ পাউন্ড। মেয়ে হাতিদের দাঁত সে তুলনায় কম কিন্তু অত্যন্ত মূল্যবান। প্রতি দশ বছরে হাতি তার দাঁত ফেলে দেয় এবং দাঁত পড়ে গেলে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। মনে হয় হাতিরা ভাবে পাছে মানুষ খুঁজে পেয়ে যায়! হাতির জিভ লম্বায় ছোটো কিন্তু বেশ চওড়া। হাতির পাগুলি গোলাকার ও যথাযথ, নমনীয় এবং ভাঁজ করা যায়। কপাল বড়ো ও উন্নত। লেজটা পুঁচকে, শুয়োরের লেজ মনে পড়ে যাবে দেখলে। প্রাণীটির রক্ত যেকোনো প্রাণীর চেয়েই ঠান্ডা।  আর সবচেয়ে বিচিত্র ও বৈশিষ্টপূর্ণ হল এর শুঁড়। সাতফুট লম্বা, তিনফুট ব্যাসার্ধের এই অঙ্গটি হাতির দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রোমহর্ষক বলে মনে করি। শুঁড়ের ডগার দিকটা ক্রমশ সরু, আর গোড়ার দিকে নাকের কাছটায়, দুটি পথ, একটা মাথার দিকে অন্যটা মুখের ভেতর গিয়েছে। প্রথমটা দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস, দ্বিতীয়টা খাবার খাওয়ার কাজে লাগে। শুঁড় হাতের কাজ করে খাবার সময় আবার অস্ত্রের কাজ করে আত্মরক্ষার সময়। হাতি এতই শক্তিশালী যে বিপুল ওজন অনায়াসেই তুলে ফেলতে পারে। আবার এত সুক্ষ্ম অনুভূতির অধিকারী যে সহজেই মাটিতে পড়ে থাকা পয়সা শুঁড়ে তুলে নিতে পারে। জল পেলে ভীষণ খুশি হয় আর সাঁতারেও ওস্তাদ।

ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে হাতি ধরা হয় কৌশল করে। মূলত এরা যখন পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসে নদী বা ঝিলের ধারে জল খাবার জন্য। হাতি শিকারীরা, যারা বুনো হাতি ধরায় পারদর্শী, হাতিদের যাতায়াতের পথে গভীর গর্ত খুঁড়ে ডালপালা দিয়ে ঢেকে রাখে। জল খেতে নেমে আসার পথে হাতিরা এই বিপদের কথা টেরও পায় না। ফলে গর্তে এসে পড়ে। কখনো কখনো  এই দুঃসাধ্য কাজে   প্রাণের ঝুঁকি নিতেও পিছপা হয় না এই কুশলী হাতি ধরিয়েরা। বয়স্ক হাতিগুলো কোনমতে নিজেদের এই জাল থেকে ছাড়িয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যায় কিন্তু অপেক্ষাকৃত কমবয়েসি হাতিগুলো ধরা পড়ে; তাদের বেশ কিছুদিন ওভাবেই না খেতে দিয়ে ফেলে রাখে হাতি ধরিয়েরা। ক্রমে নিস্তেজ হয়ে এলে গর্তে নামার একটা সোজা পথ বানিয়ে হাতিদের গলায় শিকলি পরিয়ে কুনকি হাতি দিয়ে তাদের কাছাকাছি শহরে বা গ্রামে নিয়ে আসা হয়। এমনিভাবে বেশ অনেকগুলি হাতি ধরার পর হাতিওয়ালারা কয়েকদিন ধরে এদের পোষ মানায় তারপর নবাব বা রহিস লোকেদের কাছে বিক্রি করে। হাতিগুলি বুড়ো হয়ে গেলে যখন আর বড়োমানুষদের মনোরঞ্জনের যোগ্য থাকে না, বা অন্য কাজের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে, তখন তাদের কেবলমাত্র মালপত্র বইবার কাজেই লাগানো হয়। হাতিদের এমনভাবে শিক্ষা দেয়া হয় যাতে সে প্রায় সবরকম কাজেই পারদর্শী হয়ে ওঠে। এককথায় ইউরোপে বিখ্যাত ও দক্ষ ঘোড়সওয়ারেরা যেভাবে ঘোড়াদের নিয়ন্ত্রণ করে এখানে মাহুতেরাও ঠিক সেভাবেই হাতিদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

এই সূত্রেই একটা ঘটনা বলি। এক লোকের দুধের শিশু দোলনায় শুয়ে কাঁদছিল। দুধ খাবার জন্য। বাড়িতে মা-বাপ নেই। বাড়ির পোষা হাতিটি তাকে আলতো করে তুলে দুধ খাইয়ে যথাস্থানে আবার যত্ন করে শুইয়ে দিলে। বিরাট প্রাণীটি এমনই স্নেহপ্রবণ! এমন স্নেহ  মানুষের মধ্যে তো দেখাই যায়; পোষা হাতির মধ্যেও হাতির মালিকের স্নেহমাখা ব্যবহার অনায়াসে প্রবেশ করেছে।

timemachinedinmohammed-mediumহাতির আকার অনুযায়ী এর দাম নির্ধারণ হয়। যেগুলো কমবয়েসি আর ভালো মত শিক্ষিত সেগুলো ‘১৫০ টাকা হাত’ দামে বেচা হয়। হাত মাপা হয় মাথা থেকে লেজ অবধি, হাতি সাধারণত সাতহাত খানেক লম্বা হয় আর এই হিসেবে একেকটা হাতির দাম দাঁড়ায় ১০০ পাউন্ড স্টার্লিং এর ওপর।

হাতির পরই, আকারে ও বিশালতায় গন্ডারের স্থান। ভারতে একে আবাদু বলে ডাকে। বন্য শুয়োরের মতোই প্রায় তবে অনেকটা বড়ো, পাগুলো আরো মোটা, জগদ্দল শরীর। সারা গায়ে কালো রঙের শক্ত চৌকো চৌকো আঁশের মতো জিনিসে ঢাকা, চামড়া থেকে একটু উঠে আছে সেগুলো, একেবারে কুমীরের কথা মনে পড়ে যাবে। বিশাল মাথার পেছনের দিকটা ঘোমটার মতো ঢাকা, মুখটা ছোটো, চোয়ালের দিকে অনেকটা বিস্তৃত। মাথার ওপরে লম্বা শক্ত একখানা খড়গ। অন্য জানোয়ারের কাছে এটাই ভীতিপ্রদ।  জিভখানা বেশ খসখসে, আর চামড়া দুপাশে ঝুলে পেটটা ঢাকা যেমন বাদুরদের ডানা ঝোলে দুপাশে অমনি।

প্রাচ্যদেশে উটের মতো কার্যকরী প্রাণী আর একটিও নেই। মালবহনই বলুন আর যাতায়াতের বাহনই হোক। কিছু কিছু উটতো হাজার মাল পিঠে নিয়ে ঘন্টায় প্রায় সাত আট কিলোমিটার বেগে চলতে পারে। নীচের চোয়ালে ও পেছনের দিকে একসার দাঁত ছাড়া আর দাঁত নেই। এরকম কদাকার বিরাট প্রাণীটির মতো বিপুল খেতে পারে এমন আর একটিও নেই। পিঠে মাল চাপানোর সময় নিচু হয়ে পা মুড়ে পেট দিয়ে বসে আর সবসময়েই কেবল চালকের মুখের কথায় নিয়ন্ত্রিত হয়। মেরে ধরে দৌড় করানোর দরকার নেই। পশুগুলি এমনিতেই ভীতু প্রকৃতির, অত্যন্ত পরিশ্রমী ও ধৈর্যশীল।

(অনুবাদকঃ ১  হাতি স্তন্যপায়ী ও উষ্ণরক্ত বিশিষ্ট  রক্তের উষ্ণতা থাকে ৯৭-৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে। ২ কুনকি হাতি হল পোষ মানানো হাতি, যাকে দিয়ে বুনো হাতি ধরে পোষ মানানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। ৩ মাহুত – হাতি চালক। এদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপর হাতিদের চালনা করা নির্ভর করে। ৪ পাউন্ড স্টার্লিং – ইংরেজদের মুদ্রা, পাউন্ড স্টার্লিং কে সংক্ষেপে শুধু পাউন্ড বলে )

ক্রমশ

জয়ঢাকের টাইম মেশিন

Leave a Reply