ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা অভিযান মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক বর্ষা ২০১৮

  এই লেখার আগের পর্বগুলো              তাপস মৌলিকের সব লেখা

     জয়ঢাকের খেলা লাইব্রেরিতে এমন অনেক অভিযানের সংগ্রহ

১৯৫০ সালের সেই তেসরা জুন যখন প্রথম ভোরের আলো ফুটল আমরা তখনও পাঁচ নম্বর শিবিরের ভেতরে তাঁবুর খুঁটিগুলো প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে শুয়ে আছি। ধীরে ধীরে হাওয়ার জোর কমে এল, তারপর সকাল হতে না হতে একেবারেই থেমে গেল। তাঁবুর ছাদে জমা হওয়া নরম তুষারের চাপে আমার তখন একেবারে চিঁড়েচ্যাপটা অবস্থা। শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে সেই ছাদের ভার ঠেলে উঠে বসার চেষ্টা করলাম। প্রতিটা নড়াচড়াই যেন এক অমানুষিক পরিশ্রমের ব্যাপার। মস্তিস্কও যেন শ্লথ হয়ে গেছে, মনে হচ্ছিল এমনকি চিন্তা করতেও খুব পরিশ্রম হচ্ছে। দু’জনের কেউ কোনও কথা বলছিলাম না।

যাচ্ছেতাই জায়গা বটে একটা! এই পাঁচ নম্বর ক্যাম্প অবধি যারা আসবে তাদের কপালে নিঃসন্দেহে অশেষ দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে! আমাদের মাথায় তখন একটাই ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল, কত তাড়াতাড়ি এখান থেকে বেরোনো যায়। সূর্য ওঠা অবধি অপেক্ষা করা উচিত ছিল আমাদের, কিন্তু সাড়ে পাঁচটা নাগাদ মনে হল আর পারা যাচ্ছে না।

“ল্যাচেনাল, চলো বেরিয়ে পড়া যাক।”

“হ্যাঁ, চলো।”

প্রশ্ন হল, সকালের চা কে বানাবে? মনের গতি শ্লথ হয়ে গেলেও চা বানাতে গেলে পর পর কী কী কাজ করতে হবে সেটা দিব্যি মানসচক্ষে ভেসে উঠল, আর ভেবে রীতিমতো আতঙ্ক হল। কী দরকার চায়ের! একদিন সকালে চা না খেলে কী হয়? স্লিপিং ব্যাগের ভেতর থেকে নিজেদের শরীরটা আর জুতোজোড়া বার করতেই পরিশ্রমে প্রাণ বেরিয়ে যাবার জোগাড়। ব্যাগের ভেতর থাকা সত্ত্বেও বুটজোড়া ঠান্ডায় জমে একেবারে শক্ত হয়ে গেছে, পায়ে গলানো এক বিড়ম্বনা বিশেষ! জুতোর ওপরে ঢাকা দেবার গেইটার ঠান্ডায় পিচবোর্ডের মতো শক্ত হয়ে আছে; অনেক কষ্টে আমারটা বাঁধতে পারলেও ল্যাচেনাল হাল ছেড়ে দিল। জুতো পরার পরিশ্রমেই দু’জন দমছুট হয়ে হাঁপাতে লাগলাম।

“রোপ নেওয়ার দরকার আছে, ল্যাচেনাল?”

“কোনও দরকার নেই,” সঙ্গে সঙ্গে ল্যাচেনালের জবাব।

যাক! দু’পাউন্ড বোঝা কমল। আমার রুকস্যাকে একটা কনডেনসড মিল্কের টিউব, কিছু চকোলেট আর একজোড়া মোজা ভরে নিলাম। কী মনে হল, একজোড়া বাড়তি মোজা যে কোনও সময়েই কাজে আসতে পারে, তাই মোজা-জোড়াকে ফার্স্ট এইড কিটের সঙ্গে রাখলাম। ক্যামেরায় একটা সাদাকালো ফিল্ম ভরে বাড়তি একটা রঙিন ফিল্ম স্যাকে ঢোকালাম। স্লিপিং ব্যাগের তলা থেকে সিনে ক্যামেরাটা বার করে চালিয়ে দেখলাম, খচ করে একটা আওয়াজ করে সেটা স্তব্ধ হয়ে গেল।

“যাঃ, এতদূর বয়ে নিয়ে আসাটা বেকার হল,” বলল ল্যাচেনাল।

আইজ্যাক এই সিনে ক্যামেরাটা কত যত্নেই না রেখেছিল, ঠান্ডায় যাতে জমে না যায় তার জন্য বিশেষ ধরণের গ্রিজ দিত, কিন্তু এই ভয়ঙ্কর ঠান্ডায় স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে থাকা সত্ত্বেও সেটা সেই জমেই গেল! ওটা তাঁবুতেই রেখে গেলাম। ভেবেছিলাম একেবারে শৃঙ্গ অবধি নিয়ে যাব! কী আর করা! তবে প্রায় ২৪,৬০০ ফিট উচ্চতা অবধি ক্যামেরাটা আমি ব্যবহার করেছি।

বাইরে বেরিয়ে পায়ে ক্র্যাম্পন বেঁধে নিলাম। সারাদিন সেই ক্র্যাম্পন আর খুলিনি। জামাকাপড় যা সঙ্গে ছিল সব গায়ে চাপিয়ে নিয়েছি, রুকস্যাক তাই একদম হালকা। ছ’টার সময় রওনা দিলাম। আবহাওয়া ঝকঝকে পরিষ্কার, তবে প্রবল ঠান্ডা। প্রথমেই জমাট বাঁধা তুষার আর কঠিন বরফমিশ্রিত বেশ চড়াই একটা ঢাল। ক্র্যাম্পন গেঁথে গেঁথে ওঠা শুরু করলাম আমরা।

প্রথম ঢালটা পেরোনোর পর চড়াই একটু কমল। এরপর মোটামুটি সমানভাবে উঠে যাওয়া একটা ঢাল। কখনও কখনও তুষারের ওপরের জমাট বাঁধা আস্তরণ আমাদের শরীরের ভার সয়ে নিচ্ছিল, আবার কখনও সেই আস্তরণ ভেঙে পা ডুবে যাচ্ছিল নরম তুষারে। এই উচ্চতায় এরকম নরম তুষার ঠেলে চলা প্রচণ্ড পরিশ্রমের। আমি আর ল্যাচেনাল পালা করে সামনে থেকে রাস্তা তৈরি করছিলাম। একটু পর পরই দম নিতে থামতে হচ্ছিল। কারও মুখে কোনও কথা নেই। দু’জনেই যে যার নিজের মনে গভীর চিন্তায় মগ্ন। আমার মাথাটা কেমন যেন ভোঁতা ভোঁতা লাগছিল। বেশ বুঝতে পারছিলাম মগজে বুদ্ধি খেলছে না, বেশি কিছু চিন্তা করতে গেলেই কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। তার চেয়ে যে কোনও একটা ব্যাপারে মনঃসংযোগ করাটা দেখলাম সহজ হচ্ছে। ভাবলাম, খুব বেশি চিন্তা করে দরকার কী! মাথাটা হালকা রাখাই বরং নিরাপদ। তীব্র ঠাণ্ডাটা গায়ে কাঁটার মতো বিঁধছে। এত কাপড়জামা চাপিয়েও মনে হচ্ছে যেন খালি গায়ে হাঁটছি।

যখনই বিশ্রাম নিতে থামছিলাম, ক্র্যাম্পন বাঁধা পা দুটো বেশ করে তুষারে গেঁথে দাঁড়াচ্ছিলাম। এরকমই একবার দম নেওয়ার সময় হঠাৎ দেখি ল্যাচেনাল তার এক পায়ের জুতো খুলে ফেলল। প্রথম থেকেই একটু আঁট ছিল জুতোটা। ল্যাচেনাল ভয় পাচ্ছিল, এই ঠান্ডায় পায়ের আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করতে না পারায় তুষারক্ষত না হয়ে যায়। “শেষে ল্যামবার্টের মতো দশা হোক আমি চাই না,” বলল সে। রেমন্ড ল্যামবার্ট জেনেভার একজন পর্বতারোহী, গাইডের কাজ করে। একবার এক ঘটনাবহুল পর্বতারোহণের সময় তার পায়ের পাতায় তুষারক্ষত হয়, ফলে দুটো পায়ের পাতাই আঙুল-টাঙুল সমেত কেটে বাদ দিতে হয়।

জুতো খুলে ল্যাচেনাল বেশ করে পায়ের পাতাগুলো রগড়াতে শুরু করল যাতে রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক হয়। আমি আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা পর্বতশৃঙ্গগুলির দিকে চোখ ফেরালাম। দূরে দেখা যাচ্ছে ধৌলাগিরি। একমাত্র তার চুড়োটা ছাড়া বাকি সমস্ত পর্বতশৃঙ্গই এখন আমাদের পায়ের নিচে। সুবিশাল আর অসম্ভব জটিল এই অন্নপূর্ণা পর্বতপুঞ্জ, পরিশ্রমসাধ্য অনুসন্ধানের দিনগুলোয় যার ব্যাপ্তি এবং জটিলতার সঙ্গে কিঞ্চিৎ পরিচয় ঘটেছে আমাদের, এখন একটা ত্রিমাত্রিক মানচিত্রের মতো আমাদের পায়ের নিচে বিছিয়ে রয়েছে।

চড়াই ভাঙতে অসম্ভব পরিশ্রম হচ্ছিল। প্রতিটি পদক্ষেপ এগোনোর জন্য সমস্ত ইচ্ছাশক্তিকে একাগ্র করে শরীরের পুরো শক্তি নিংড়ে দিতে হচ্ছিল। ছায়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে রোদ্দুরে পৌঁছে আমরা ফের বিশ্রাম নিতে দাঁড়ালাম, দম নেবার একটা অজুহাত পাওয়া গেল! ল্যাচেনাল তার পা নিয়ে ক্রমাগত অভিযোগ জানিয়ে চলেছে। “পায়ে কোনও সাড় পাচ্ছি না আমি, তুষারক্ষত গেড়ে বসছে মনে হয়!” বলে সে বুটজোড়া ফের খুলে ফেলল।

এইবার আমার বেশ দুশ্চিন্তা শুরু হল। এই পরিস্থিতিতে আমাদের তুষারক্ষত হওয়ার যে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে সে ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলাম। অভিজ্ঞতা থেকে এও  জানি অত্যন্ত সাবধানি না হলে কীভাবে প্রায় অজান্তে ও অতর্কিতে কারও শরীরে তুষারক্ষত বাসা বাঁধতে পারে! ল্যাচেনালের আশঙ্কা মোটেই অমূলক নয়। “আমাদের দু’জনেরই পায়ে তুষারক্ষত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাপারটা খুব ঝুঁকির হয়ে যাচ্ছে। কী মনে হয়? আর এগোনো উচিত হবে?”

বেশ ঝামেলায় পড়ে গেলাম। অভিযানের দলনেতা হিসেবে আমার কর্তব্য দলের সকলের সুবিধে-অসুবিধে বিপদ-আপদের কথা খেয়াল রাখা। তুষারক্ষতের বিপদ যে বাস্তবিকই আছে সে ব্যাপারেও কোনও সন্দেহ নেই। ঝুঁকিটা নেওয়া কি ঠিক হবে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম আমি। একদিকে অন্নপূর্ণা শৃঙ্গের হাতছানি, অন্যদিকে তুষারক্ষতের চোখরাঙানি! শৃঙ্গজয়ের জন্য এই ঝুঁকিটা নেওয়া কি সঙ্গত? ব্যাপারটা বেশ ভাবিয়ে তুলল।

ল্যাচেনাল ফের জুতো পায়ে গলিয়ে ফিতে বেঁধে নিল। নরম তুষার ঠেলতে ঠেলতে আবার আমাদের যাত্রা শুরু হল। কাস্তে হিমবাহের সম্পূর্ণটাই এখন আমাদের দৃষ্টির আওতায়, সূর্যের আলোয় দুধের মতো ফটফট করছে সাদা। হিমবাহটা পুরো পেরোতে এখনও প্রচুর রাস্তা বাকি, আর তারপরে রয়েছে একটা খাড়া পাথুরে দেওয়াল – একটা রক ব্যান্ড। সেটার ওপরে ওঠার কোনও সহজ রাস্তা বা ফাঁকফোকর খুঁজে পাওয়া যাবে তো?

ল্যাচেনালের মতো আমার পায়ের পাতা দুটোও অসম্ভব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। অনবরত পায়ের আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করে চলেছিলাম আমি, এমনকি চলতে চলতেও তাই করে যাচ্ছিলাম। আদৌ আছে কিনা পাতাদুটো মাঝে মাঝে বুঝতেই পারছিলাম না, তবে সেটা পাহাড়ে খুব অস্বাভাবিক নয়। ক্রমাগত আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করে চললে রক্ত সঞ্চালনটা চালু থাকবে।

ল্যাচেনালকে দেখে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যেন সিনেমায় দেখছি ওকে, ব্যাপারটা যেন বাস্তব নয়। সে তার নিজের চিন্তার রাজ্যে ডুবে আছে, আমি আমার। তবে একটা আশ্চর্য ব্যাপার, সেই মুহূর্তে চলতে যেন আগের থেকে একটু কম পরিশ্রম হচ্ছিল। মনে হয় শৃঙ্গজয়ের আশা যত জোরালো হচ্ছে মনের ভার ততই কেটে যাচ্ছে, চলতেও তাই কষ্ট কম হচ্ছে। স্নো গগলসের কালো কাচের মধ্য দিয়েও তুষারে প্রতিফলিত প্রখর সূর্যালোক চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। চারপাশের গিরিশিরাগুলো দেখে এখন মনে হচ্ছে, নিচের দিকে নামতে নামতে যেন পাতালে মিলিয়ে গেছে। অনেক নিচে হিমবাহগুলো ছোট্ট ছোট্ট দেখাচ্ছে। নিচের কুয়াশাবৃত রহস্যময় আলোআঁধারি থেকে পরিচিত পর্বতশৃঙ্গগুলো যেন এক একটা উজ্জ্বল তিরের ফলার মতো আকাশপানে উঠে এসেছে।

হঠাৎ ল্যাচেনাল কাছে এসে আমার হাতটা জড়িয়ে ধরল। “আমি যদি এখান থেকে ফিরে যাই, কী করবে তুমি?” বলল সে।

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। একের পর এক ছবি আমার মনের চোখে যেন ফিল্মের মতো ভেসে উঠল – প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরমে হিমালয়ের তরাই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে আমাদের সেই ট্রেক, অনুসন্ধান পর্বের সেই কষ্টকর যাত্রাগুলো, শৃঙ্গে ওঠার পথে পেরিয়ে আসা কঠিন বাধাগুলি, সবাই মিলে যে অমানুষিক পরিশ্রমের পর এই অন্নপূর্ণায় অবশেষে একটু পা রাখার জায়গা খুঁজে পেয়েছি, যে শৃঙ্খলা এবং স্বার্থহীন দায়বদ্ধতায় আমার বন্ধুরা শরীর ও মনের সমস্ত পুঁজি নিঃশেষ করে এই পর্বতগাত্রের ওপর একের পর এক শিবির স্থাপন করে গেছে – সব, স…ব! এখন আমরা আমাদের লক্ষ্যের কাছাকাছি। সম্ভবত আর দু’এক ঘন্টার মধ্যে সাফল্য আমাদের হাতের মুঠোয় আসতে চলেছে। এখন হাল ছেড়ে দেব? না, তা হয় না, অসম্ভব। আমার সমগ্র সত্তা পিছু হটার এই চিন্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে উঠল। আমি মন ঠিক করে নিয়েছি, আর তা বদলানো সম্ভব নয়। আমার জীবন আমি দেবী অন্নপূর্ণাকে উৎসর্গ করে দিয়েছি! যা হয় হবে, শৃঙ্গে পৌঁছনোর বিনিময়ে যে কোনও ত্যাগ স্বীকার করতে আমি প্রস্তুত।

পরিষ্কার স্বরে কেটে কেটে উচ্চারণ করলাম, “আমি একাই যাব।”

হ্যাঁ, একাই যাব আমি। ল্যাচেনাল যদি নেমে যেতে চায় তো যাক, ওকে আটকানো ঠিক হবে না আমার। নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার পূর্ণ স্বাধীনতা ওর আছে।

“ঠিক আছে, তাহলে তুমি সামনে সামনে চলো, আমি পেছন পেছন উঠছি,” একটু চুপ করে থেকে বলল ল্যাচেনাল।

ব্যস! মুহূর্তে আমার মনের থেকে সমস্ত দুশ্চিন্তা আর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর হয়ে গেল। জগতের আর কোনও শক্তি আমাদের ঠেকাতে পারবে না এবারে। এই কয়েকটা কথায় যেন পুরো পরিবেশটাই বদলে গেল! দুই ভাইয়ের মতো ফের আমরা সামনে এগিয়ে চললাম।

মনে হচ্ছিল কোনও এক সম্পূর্ণ নতুন অচেনা অজানা দুনিয়ার মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমরা। এত বছর পর্বতারোহণের সঙ্গে যুক্ত থেকেও এরকম বিচিত্র অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি। চারিদিকে সবকিছু কেমন স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, পরিষ্কার। সূর্যের আলো পড়ে চারপাশের তুষার হীরের মতো ঝলমল করছে, অবর্ণনীয় তার দ্যুতি। এত স্বচ্ছ আবহাওয়া আমি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি। এ যেন স্ফটিক দিয়ে তৈরি এক দেশ। এত নিঃশব্দ যে মনে হয় কানে তালা ধরে গেছে। ছোটো ছোটো মেঘ কার্পাস তুলোর মতো আনমনে আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই স্বর্গীয় পরিবেশ, এই নিষ্কলুষ পবিত্রতা – না, এই পাহাড়কে আমি চিনি না! এ যে আমার স্বপ্নে দেখা দেশ! আমার শরীর থেকে সমস্ত কষ্ট আর পরিশ্রমের বোধ লোপ পেয়েছে। যেন মাধ্যাকর্ষণ বলে আর কিছু নেই, বাতাসে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলেছি আমরা। অদ্ভুত একটা বোধ হচ্ছে – আমি যেন আমার মধ্যে আর নেই! আমার আত্মাটা যেন শরীর থেকে বেরিয়ে এসে ওপর থেকে দেখছে আমাদের – ওই তো আমি তুষার ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে চলেছি, ওই তো পেছনে দেখা যাচ্ছে ল্যাচেনালকে। দেখছি, আর হাসি পাচ্ছে – বেচারারা! প্রকৃতির এই বিশালত্বের কাছে কত তুচ্ছ, কত ক্ষুদ্র এরা! আর এদের ভাবখানা দেখ! ভাবছে প্রকৃতিকে জয় করে ফেললাম, খুব দারুণ কিছু একটা করে ফেললাম! হঠাৎ মনে হল, তাহলে কি আমি মরে গেছি? আত্মাটা কি তাই শরীর থেকে বেরিয়ে গেছে? এই স্ফটিকস্বচ্ছ নিস্তব্ধ নির্ভার মায়াবী পরিবেশ – এই কি তাহলে স্বর্গ? আমার শরীরটা হয়তো চলতে চলতে তুষারের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে কোথাও, আর শৃঙ্গজয়ের অপূর্ণ স্বপ্ন শরীরের রূপ ধরে ধীরে ধীরে ওপরদিকে এগিয়ে চলেছে! বেঁচেই যদি থাকব তবে কোনও কষ্ট হচ্ছে না কেন আর? হাঁপ ধরছে না কেন? কেন মনে হচ্ছে মেঘের মতো বাতাসে ভাসতে ভাসতে চলেছি?

এক অনির্বচনীয় প্রসন্নতা আমার সমগ্র চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। কেন কে জানে! হয়তো ভাবছিলাম, মরেই যখন গেছি তখন আর ভয় কীসের? আমি তো এখন আমার চির-আকাঙ্খিত স্বর্গরাজ্যে! স্বর্গই বটে! সবকিছু এত নতুন, এত অকল্পনীয় সুন্দর!

আল্পসে এত ঘোরাঘুরি করেও এরকম অভিজ্ঞতা আমার কখনও হয়নি। সেখানে কাছাকাছি সবসময়ই অনেক মানুষ থাকে, সরাসরি চোখে দেখা না গেলেও জানি যে আছে। এই সান্নিধ্যের বোধ মনকে অনেক নির্ভরতা দেয়, নিশ্চিন্ত লাগে। বহু দূরে নিচে হয়তো কোনও গ্রাম দেখা যাচ্ছে, সেটাও অনেক ভরসা জোগায়। জানি যে নিচে নেমে গেলেই সমস্তরকম সুযোগসুবিধা পাওয়া যাবে। এখানে ব্যাপারটা পুরোপুরি আলাদা। এ এক আলাদা বিশ্ব – বহির্জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন প্রাণস্পন্দনহীন ঊষর এক মরুভূমির মতো – যেন মহাকাশের প্রাণহীন কোনও গ্রহ। এই অসাধারণ বিশ্ব আপনার মধ্যে আপনি সম্পূর্ণ। মানুষের উপস্থিতি এখানে কেমন যেন বেমানান, হয়তো অবাঞ্ছিতও। যেন কোনও অদৃশ্য সীমারেখা অতিক্রম করে এই নিষিদ্ধ গ্রহে ঢুকে পড়েছি আমরা। কিন্তু তাও আমাদের মনে কোনও ভয়ডর নেই। নির্ভাবনায় উঠে চলেছি। কী জানি, আমরা দু’জন হয়তো ঠিক অবাঞ্ছিত নই, আমন্ত্রিত! সমগ্র মানবজাতির মধ্য থেকে বাছাই করে আমাদের দু’জনকেই হয়তো এই গ্রহে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ওই তো আমাদের জন্য স্বর্গের সিঁড়ি উঠে গেছে!

ল্যাচেনাল কী ভাবছিল কে জানে! ধীরে ধীরে শৃঙ্গ অবধি সটান উঠে যাওয়া গিরিশিরাটার কাছাকাছি চলে এলাম আমরা, পৌঁছলাম সেই খাড়া পাথুরে দেওয়ালের পাদদেশে – শৃঙ্গে ওঠার পথে শেষ বাধা! এখানে ঢাল বেশ খাড়াই, পাথুরে জমির মাঝে মাঝে এখানে-সেখানে তুষার জমে আছে।

“ওই দ্যাখো একটা নালা!” পাথুরে দেওয়ালটার একদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে ফ্যাসফেসে গলায় বলল ল্যাচেনাল। দেখি একটা বরফের নালা খাড়া পাথরের দেওয়ালটার গা বেয়ে ওপর থেকে নেমে এসেছে। বেশ খাড়াই হলেও নালাটা ধরে ওঠা অসম্ভব নয়।

“হুম, আজ ভাগ্য আমাদের সহায়!” বললাম আমি। আকাশ আজ সকাল থেকেই গাঢ় নীল।

পায়ে ক্র্যাম্পন বাঁধা আছে, তাই তুষারের ওপর থাকাই সুবিধের। পাথুরে জমি এড়িয়ে অনেক কষ্টে ডানদিক দিয়ে ঘুরে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বরফের নালাটার নিচে উপস্থিত হলাম। বেশ খাড়া নালাটা। এক মিনিট আমরা ইতস্তত করলাম। এই শেষ বাধাটা অতিক্রম করার মতো যথেষ্ট শক্তি শরীরে অবশিষ্ট আছে তো?

সৌভাগ্যক্রমে নালার তুষার জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে আছে, ক্র্যাম্পন গেঁথে গেঁথে এক পা এক পা করে উঠতে তাই তেমন সমস্যা হল না। একটা ভুল পদক্ষেপ মানেই অবশ্য মৃত্যু! তবে বরফে খোপ কেটে হাতে ধরার জন্য হোল্ড বানানোর দরকার পড়ল না, আইসঅ্যাক্সটা সামনে যতটা সম্ভব বরফে গেঁথে দিচ্ছিলাম, তারপর তাই ধরে শরীরটা টেনে তোলা – দিব্যি খুঁটির কাজ হচ্ছিল।

ল্যাচেনাল দুর্দান্ত উঠছিল। পুরো নিজের ফর্মে ফিরে এসেছে ও। নালা বেয়ে ওঠাটা বেশ শক্ত ছিল, কিন্তু দিব্যি উঠে চলল ল্যাচেনাল। মাঝে মাঝে ঘাড় তুলে ওপরে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলাম নালাটা ঠিক কীরকম জায়গা থেকে নেমে এসেছে? ওপরে উঠে কোন জায়গাটায় পৌঁছব? শৃঙ্গ অবধি উঠে যাওয়া গিরিশিরাটার পিঠে কি? কিন্তু চুড়োটা কোথায়? বাঁদিকে না ডানদিকে? প্রতি পদক্ষেপেই থামতে হচ্ছিল আমাদের, সামনে গাঁথা আইসঅ্যাক্স ধরে ঝুঁকে পড়ে দম নিচ্ছিলাম আর হৃৎপিণ্ডটা একটু শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম। সে ব্যাটা এতই লাফাচ্ছে যে মনে হচ্ছে বুকের খাঁচা ভেঙে এই বেরিয়ে এল বলে! বুঝতে পারছিলাম আমরা লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, আর কোনও বাধাই ঠেকাতে পারবে না আমাদের। একে অন্যের দিকে তাকানোর ফুরসত ছিল না, তবে না তাকিয়েই পরস্পরের চোখেমুখে বজ্রকঠিন এক প্রতিজ্ঞার ছবি দেখতে পাচ্ছিলাম। নালার ওপরে পৌঁছে সামান্য একটু বাঁদিকে হাঁটা, কয়েকটা মাত্র পদক্ষেপ – শৃঙ্গের গিরিশিরাটা ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে এল – ওই পাথরগুলো এড়িয়ে তুষারাবৃত অংশটা দিয়ে শরীরটা টেনেহিঁচড়ে গিরিশিরার ওপরে তুলতে হবে। পারব তো?

হ্যাঁ… যাক! পেরেছি অবশেষে!!

হঠাৎ ঝড়ের মতো এক দামাল হাওয়া প্রচণ্ড বেগে আমাদের চোখেমুখে আছড়ে পড়ল।

আর ওপরে ওঠার কোনও রাস্তা নেই। এটাই এখানকার সর্বোচ্চ বিন্দু। অন্নপূর্ণার শৃঙ্গের ওপরে দাঁড়িয়ে আছি আমরা! ৮,০৭৫ মিটার; ২৬,৪৯৩ ফিট।

আমাদের দু’জনের হৃদয় এক অনির্বচনীয় আনন্দের বন্যায় ভেসে গেল।

পেরেছি! আমরা পেরেছি!! উফফ, দলের বাকিরা যদি জানতে পারত! তোমরা শুনতে পাচ্ছ? টেরে, রেবুফত, শ্যাজ, কোজি… শুনতে পাচ্ছ তোমরা? আমার দেশের মানুষ.. আমার প্রিয় মাতৃভূমির মানুষ… শুনতে পাচ্ছ তোমরা? আমরা পেরেছি!! পৃথিবীর কোনও মানুষ কোনওদিন যা পারেনি… আমরা পেরেছি…!!

শৃঙ্গটা কঠিন বরফের ঢালু ত্রিকোণাকৃতি একটা চাঁই। আমরা যেদিক দিয়ে উঠেছি তার উলটোদিকে, অর্থাৎ দক্ষিণদিকে এক্কেবারে খাড়া বহু নিচে, যেন অতলে নেমে গেছে। সে দৃশ্য দেখলে ভয় হয়। এত উঁচু একটা পর্বতশৃঙ্গের একটা দিক এমন সটান খাড়া, পৃথিবীতে এরকম পর্বত বোধহয় খুব বেশি নেই। নিচে তাকালে দক্ষিণদিকে, অন্নপূর্ণার মোটামুটি অর্ধেক উচ্চতায়, আকাশে মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছে, তার নিচে ঢাকা পড়ে আছে পোখরার শান্ত উর্বর উপত্যকা… এখান থেকে ২৩,০০০ ফিট নিচে। আর ওপরে তাকালে? কিচ্ছু নেই! ফাঁকা! শুধু গাঢ় নীল আকাশ!

এক কথায় বললে আমাদের অভিযানের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু কি আমরা অর্জন করিনি? এরপর থেকে আমাদের জীবনটাই যে বদলে যাবে! লক্ষ্যে পৌঁছনোর যে তৃপ্তি, দীর্ঘদিন যাবৎ লালিত কোনও স্বপ্নপূরণের যে পরিপূর্ণতা, সে অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সাফল্যের ওই মুহূর্তটা আমার মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। অত তীব্র এবং সেইসঙ্গে অমন নির্মল আনন্দ, ওই সুখানুভূতি আমি আর কোনোদিন অনুভব করিনি। অথচ ভাবতে অবাক লাগে, একটা ধূসর প্রস্তরখন্ডের চূড়া কিংবা একটা তুষারাবৃত গিরিশিরার সর্বোচ্চ বিন্দু কীভাবে কারও সারা জীবনের লক্ষ্য হতে পারে? মানুষের অহং পরিতৃপ্ত করার চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে?

“কী হল তোমার, নিচে নামবে না?”

ভাবনায় বিভোর হয়ে গেছিলাম, ল্যাচেনালের ঝাঁকুনি খেয়ে সংবিৎ ফিরল। ও ভাবছেটা কী? ওর মনে আমার মতো কোনও অনুভূতি হচ্ছে না? নাকি ভাবছে স্রেফ একটা শৃঙ্গে চড়া শেষ হল, আল্পসের মতো! এই উঠলাম, আর এক্ষুনি এইভাবেই নেমে যাব? ইয়ার্কি নাকি?

“এক মিনিট, কিছু ছবি তুলতে হবে।”

“জলদি কর!”

পাগলের মতো রুকস্যাক হাতড়ে তাড়াতাড়ি ক্যামেরাটা বার করলাম, একেবারে তলা থেকে বার করলাম শ্যাজের দেওয়া ছোট্ট ফ্রান্সের পতাকাটা। আমার নিয়ে আসা স্মারকচিহ্নগুলিও বার করলাম একে একে। ঘাম আর স্যাকের মধ্যে রাখা খাবারদাবারের সংস্পর্শে সব কেমন রঙচটা হয়ে গেছে। আমার আইসঅ্যাক্সের দন্ডটার আগায় বাঁধলাম পতাকাটা, তারপর সুতো দিয়ে বাঁধা স্মারক চিহ্নগুলি ঝুলিয়ে দিলাম সেখান থেকে। ওই উচ্চতায় ব্যাপারটা যে অকাজ সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু কত মানুষের কত শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা জড়িয়ে আছে এই স্মারকচিহ্নগুলির সঙ্গে! আমার কাছে এদের দাম অনেক! বাঁধাছাঁদা হয়ে গেলে আইসঅ্যাক্সটা ল্যাচেনালের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ওর ওপর ক্যামেরা তাক করলাম। ছবি তোলা হল।

“ঠিক আছে। এবারে তুমি ক্যামেরা ধর, আমার ছবি তুলে দাও।”

“দাও দাও – তাড়াতাড়ি কর!” বলল ল্যাচেনাল।

অনেক ছবি তুলে দিল সে, তারপর ক্যামেরাটা ফিরিয়ে দিল আমায়। সাদাকালো ফিল্ম খুলে এবার রঙিন ফিল্ম ভরলাম ক্যামেরায়, তারপর ফের সেই প্রক্রিয়া – আমি ল্যাচেনালের ছবি তুলি, ল্যাচেনাল আমার। শৃঙ্গারোহণের প্রমাণ হিসেবে তো ছবিই ভরসা! তাই প্রচুর ছবি তোলা হল। জীবনভর এই ছবিগুলো তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা যাবে!

আরও কিছু ছবি তোলার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ল্যাচেনাল বলল, “তুমি কী পাগল হয়ে গেছ? আর এক মিনিটও নষ্ট করার সময় নেই আমাদের। এক্ষুনি নামতে হবে।”

চারদিকে একঝলক চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম, আবহাওয়া আর সকালের মতো চমৎকার নেই! ল্যাচেনাল অধৈর্য হয়ে পড়েছে, “এক্ষুনি… এই মুহূর্তে নামা শুরু করতে হবে!”

ঠিকই বলছে ল্যাচেনাল। একজন অভিজ্ঞ পর্বতারোহীর মতোই আচরণ করছে। কিন্তু আমরা যে সত্যি সত্যিই অন্নপূর্ণা শৃঙ্গ জয় করে ফেলেছি সেই ব্যাপারটার সঙ্গে আমি তখনও ঠিক খাপ খাইয়ে উঠতে পারিনি। কেমন অবাক লাগছিল – নিচের ওই তুষারগাত্র বেয়ে শৃঙ্গ অবধি উঠে আসা পায়ের চিহ্নগুলো আমাদেরই!

পাথরের টুকরো সাজিয়ে যে একটা স্মারক স্তূপ বা কেয়ার্ন তৈরি করব তার কোনও উপায় নেই, চারপাশে আলগা পাথরের কোনও টুকরো নেই। সবকিছুই যেন ঠান্ডায় জমে স্থাণু হয়ে আছে। ল্যাচেনাল বারবার পা দিয়ে ধপ ধপ করে তুষারের ওপর দাপাচ্ছিল, ভাবছিল পা’দুটো জমে না যায়! আমার পা’দুটোও জমে যাবে মনে হচ্ছিল, তবে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছিলাম না। আজ অবধি মানুষের জয় করা সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এখন আমাদের পায়ের তলায়! আট হাজার মিটারের চেয়ে বেশি উচ্চতার কোনও শৃঙ্গ জয় করার জন্য আমাদের আগে মোট বাইশটা অভিযান হয়েছে। আমাদের পূর্বসূরী সেই পর্বতারোহীদের নামগুলি একে একে আমার মনে পড়ল – মামেরি, ম্যালোরি আর ইরভিন, বয়ার, ওয়েলজেনবাখ, টিলম্যান, শিপটন। এঁদের মধ্যে কতজন যে ওই অভিযানগুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন, কতজন তাঁদের স্বপ্নপূরণের চেষ্টায় হিমালয়ের এই চিরতুষাররাজ্যে চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়েছেন, তার ঠিকঠিকানা নেই! আজ বেঁচে থাকলে তাঁরা দেখতে পেতেন তাঁদের চেষ্টা আর আত্মত্যাগ বিফল হয়নি। তাঁদের দেখানো পথেই আজ আমাদের এই সাফল্য।

শুধু আমরা দু’জন যে আজ শৃঙ্গজয় করলাম তা তো নয়, এই জয় পুরো অভিযানের জয়। নিচের পর্বতগাত্রের বিভিন্ন উচ্চতায় ছড়িয়ে থাকা অভিযানের শিবিরগুলিতে আমার সহযোদ্ধাদের কথা আমার মনে পড়ল। আমি জানি তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিঃশর্ত স্বার্থত্যাগের জন্যই আজ আমরা শৃঙ্গে উঠতে পেরেছি। এ ধরণের বিশাল অভিযানের সাফল্য দু-একজনের ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। অভিযানের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত অজস্র বিচিত্র ও জটিল কর্মকাণ্ডের প্রতিটি পর্বে ধারাবাহিকভাবে নিখুঁত ও ছন্দবদ্ধ দলগত প্রচেষ্টার শেষেই আসে চূড়ান্ত সাফল্য।

আমার মনের পর্দায় একের পর এক ছবি ভেসে উঠছিল – ফ্রান্সের শ্যাময় উপত্যকা, যেখানে ছোটোবেলার সেরা সময়টা কাটিয়েছি আমি; মঁ ব্লা পর্বতশৃঙ্গ, যা আমায় প্রচণ্ড প্রভাবিত করেছিল। খুব ছোটো থেকেই দেখতাম মঁ ব্লা শৃঙ্গে আরোহণ শেষে পর্বতারোহীরা একে একে শ্যাময় উপত্যকায় নেমে আসছে। তাদের দিকে গোল গোল চোখে তাকিয়ে থাকতাম আমি, চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি দেখতে পেতাম ওদের। ওরাই ছিল আমার শৈশবের হিরো।

“মরিস, চলে এসো শিগগির! সোজা নিচে নামো। আর এক মুহূর্তও নয়!” নিচ থেকে চিৎকার করে ডাকছিল ল্যাচেনাল। রুকস্যাক গুছিয়ে নিয়ে সে ততক্ষণে নামতে শুরু করে দিয়েছে। আমি পকেট থেকে অ্যানেরয়েড অল্টিমিটারটা বার করলাম, উচ্চতা দেখাচ্ছে ৮,৫০০ মিটার! হাসি পেল। ভুলভাল দেখাচ্ছে। এই উচ্চতায় যন্ত্রটা তো আগে ওঠেনি, অভিজ্ঞতা নেই! বসে বসে কনডেনসড মিল্কের একটা টিউব শেষ করে খোলটা সেখানেই ফেলে দিলাম – আমাদের শৃঙ্গজয়ের একমাত্র চিহ্ন হিসেবে। রুকস্যাক গুছিয়ে, দু’হাতে গ্লাভস গলিয়ে নিয়ে চোখে স্নো গগলস পরে নিলাম। তারপর আইসঅ্যাক্সে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আমিও ঢাল বেয়ে তড়িঘড়ি নামতে শুরু করলাম। বরফের খাড়াই নালাটা বেয়ে নেমে যাওয়ার আগে পেছন ফিরে শেষবারের মতো শৃঙ্গটা একবার দেখে নিলাম। এ জীবনে এ দৃশ্য আর দেখা হবে না। তবে সারাজীবন এ দৃশ্য ভুলবও না!

ল্যাচেনাল অনেক নিচে নেমে গেছে, বরফের নালাটার একেবারে গোড়ায় পৌঁছে গেছে। ওর পায়ের ছাপের ওপর পা ফেলে ফেলে আমিও তাড়াতাড়ি নামতে শুরু করলাম। যত দ্রুত সম্ভব নামছিলাম, কিন্তু ব্যাপারটা বেশ বিপজ্জনক। প্রতি পদক্ষেপেই খেয়াল রাখতে হচ্ছিল শরীরের ভারে যাতে তুষারের ওপরের জমাটবাঁধা আস্তরণটা ভেঙে না যায়। ল্যাচেনাল যে এত দ্রুত নামার ক্ষমতা রাখে জানতাম না! সে যখন কাস্তে হিমবাহের বুক চিরে নামা শুরু করে দিয়েছে, আমি তখন নালার নিচে পাথর আর তুষারমিশ্রিত ঢালটা সবে পেরোচ্ছি। অবশেষে খাড়া পাথুরে দেওয়ালটার পাদদেশে পৌঁছলাম। তাড়াতাড়ি নামার ফলে খুব হাঁপিয়ে গেছিলাম। একটু বিশ্রাম নেবার জন্য রুকস্যাকটা পিঠ থেকে মাটিতে নামিয়ে খুললাম। কী জন্য যে খুলেছিলাম ভগবান জানে!

“আরে আরে… আমার গ্লাভস…!!”

নিচু হয়ে ধরার আগেই মাটিতে খুলে রাখা আমার গ্লাভসদুটো সরসর করে নিচে গড়িয়ে যেতে শুরু করল। ঢাল বেয়ে গড়িয়ে ক্রমশ সে দুটো দূর থেকে আরও দূরে চলে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে স্থাণুর মতো যেখানে ছিলাম সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। থামার কোনও লক্ষণই নেই গ্লাভসদুটোর, গড়িয়েই যাচ্ছে, গড়িয়েই যাচ্ছে। কিচ্ছু করার নেই আমার। দৃশ্যটা আমার মনে এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মতো চিরতরে গাঁথা হয়ে রইল। এর পরিণাম কী হতে পারে ভেবে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা কনকনে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।

এখন কর্তব্য কী? কে যেন আমার মনের মধ্যে চিৎকার করে উঠল, “তাড়াতাড়ি, যত শীঘ্র সম্ভব পাঁচ নম্বর শিবিরে পৌঁছোতে হবে!” রেবুফত আর টেরের সেখানে থাকার কথা। মন থেকে যত আবোলতাবোল রোমান্টিক চিন্তাভাবনা মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। শৃঙ্গজয় হয়ে যাওয়ার পর কেমন যেন উদ্দেশ্যহীন, ফাঁপা মনে হচ্ছিল নিজেকে। এই তো ফের একটা নতুন লক্ষ্য পাওয়া গেছে – ক্যাম্পে পৌঁছনো! এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে পড়ল না রুকস্যাকে ঠিক এই ধরণের বিপদের আশঙ্কাতেই একজোড়া বাড়তি মোজা রাখা আছে, সবসময় রাখা থাকে।

ল্যাচেনালকে ধরার জন্য প্রাণপণে নামতে লাগলাম। বেলা দুটোর সময় শৃঙ্গে পৌঁছেছিলাম আমরা, সকালে বেরিয়েছিলাম ছ’টায়, তবে স্বীকার করছি সময়ের কোনও বোধ আমার ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল আমি দৌড়চ্ছি, আসলে স্রেফ স্বাভাবিকভাবে হাঁটছিলাম, বরং স্বাভাবিকের থেকে ধীরে ধীরেই নামছিলাম। দম নেবার জন্য মাঝে মাঝে থামতেও হচ্ছিল। আকাশ জুড়ে মেঘ ছেয়ে এসেছে, চারদিকে সবকিছুই এখন ধূসরবর্ণ। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো হিমশীতল একটা হাওয়া ছাড়ল। দেরি করলে চলবে না, তাড়াতাড়ি নামতে হবে! কিন্তু ল্যাচেনাল কোথায়? কয়েকশো গজ নিচে একবার ওকে দেখতে পেলাম, এমনভাবে নেমে চলেছে যেন ব্রেক ফেল করেছে। রোবটের মতো ভাবলেশহীন ভাবে হেঁটেই চলেছে!

মেঘ আরও ঘন হয়ে যেন একেবারে আমাদের ঘাড়ের ওপর নেমে এল। হাওয়ার জোরও বাড়ল। তবে ঠান্ডা তেমন লাগছিল না আর। নিচে নেমে এসেছি বলে সম্ভবত রক্ত সঞ্চালন ফের স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এই কুয়াশার মধ্যে পাঁচ নম্বর শিবিরটা খুঁজে পাব তো? নিচে তিরের ফলার মতো গিরিশিরাটার প্রান্তে পাখির ঠোঁটের আকৃতির ঢিবিটা দেখতে পাচ্ছিলাম, ওই ঢিবিটার ঠিক নিচেই পাঁচ নম্বর ক্যাম্প। ধীরে ধীরে জায়গাটা মেঘের আড়ালে চলে যাচ্ছিল, তবে তিরের ফলার মতো গিরিশিরাটার নিম্নাংশ দেখা যাচ্ছিল। ঠিক করলাম কুয়াশা যদি আরও গাঢ় হয়ে আসে তবে সোজা ওই গিরিশিরা লক্ষ করে নামব। তারপর ওটার ঢাল বরাবর নিচে নামলেই পাঁচ নম্বর শিবির পেয়ে যাওয়া উচিত।

ল্যাচেনাল মাঝে মাঝেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল। এরপর কুয়াশা এত ঘন হয়ে এল যে পুরোপুরি চোখের আড়ালে চলে গেল সে। আমি একই গতিতে নেমে চলেছিলাম, দমছুট না হয়ে যতটা দ্রুত সম্ভব।

ঢালটা ক্রমশ আরও খাড়াই হয়ে এল – সমানভাবে বিছিয়ে থাকা তুষারঢালের পর কিছু কঠিন বরফে ঢাকা অংশ – ভালো লক্ষণ – এর মানে ক্যাম্পের কাছাকাছি চলে এসেছি। এই ঘন সাদা কুয়াশায় দিক ঠিক রাখা যে কী সাংঘাতিক অসুবিধেজনক! যেরকম ভেবেছিলাম সেইমতো সোজা তিরের ফলার আকৃতির বরফে ঢাকা গিরিশিরাটার ওপর পৌঁছে গেলাম, তারপর ওটার খাড়াই বরফঢাল ধরে ক্র্যাম্পন গেঁথে গেঁথে নেমে চললাম। আর সামান্য রাস্তা – মাত্র কয়েকটা পদক্ষেপ! হ্যাঁ, ওই তো পাঁচ নম্বর শিবির দেখা যাচ্ছে! তবে এ যে দুটো তাঁবু দেখতে পাচ্ছি!

সকালে আমাদের ছেড়ে যাওয়া তাঁবুটার সঙ্গে আরেকটা তাঁবু যোগ হয়েছে। তার মানে টেরে আর রেবুফত চলে এসেছে এখানে! কী পরম সৌভাগ্য আমাদের!! সাফল্যের খবরটা ওদের জানাতে পারব! ওফ, এতক্ষণে দুটো লোক পাওয়া গেছে যে বলব আমরা সফল, অন্নপূর্ণা শৃঙ্গজয় করে নেমে আসছি আমরা। শুনে কী খুশিই না হবে ওরা!

পৌঁছে গেলাম ক্যাম্পে। তাঁবু ফেলার জন্য বরফ কেটে তৈরি সমতল জায়গাটা আরও চওড়া করা হয়েছে, সেখানে দুটো টেন্ট মুখোমুখি। তাঁবু খাটানোর একটা দড়িতে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লাম আমি। নড়াচড়ার আওয়াজ পেলাম তাঁবুর ভেতর – ওরা শুনেছে – আমার পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেয়েছে ওরা! একটু ফাঁক হল তাঁবুর চেনটা, ফাঁক গলে রেবুফত আর টেরের দুটো মাথা বেরিয়ে এল বাইরে।

“পেরেছি! আমরা পেরেছি!! অন্নপূর্ণা শৃঙ্গ জয় করে ফিরছি আমরা!”

ব্যবহৃত ছবিঃ অন্নপূর্ণা অভিযান                                               (এরপর আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply