ধারাবাহিক অভিযান কনটিকি অভিযান থর হেয়ারডাল অনুবাদ ইন্দ্রনাথ শীত ২০১৮

কন-টিকি অভিযান-আগের পর্বগুলো

থর হেয়ারডাল (অনুবাদঃ ইন্দ্রনাথ)

আগের কথা

ভেলা বানানোর কাঠ পাওয়া গেছে, পেরুতে সমস্ত যন্ত্রপাতি এবং রসদ ও সাহায্য এসে পৌঁছেছে। কাঠখড় পুড়িয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে বন্দরে নৌবাহিনীর এলাকার অনুমতিও আদায় হল ভেলা বানানোর জন্য।  একদিন একজন লোক এসে থরের সাথে দেখা করলেন, সদ্য আমাজনের জঙ্গলে ক্যানো অভিযান সেরে ফিরেছেন, নাম বেঙ্গট। বলাই বাহুল্য দলের ছ নম্বর সদস্য হলেন তিনি। এর মধ্যেই শেষ কিছু দরকারি কাজে থর যখন ওয়াশিংটনে, খবর এল হারম্যান ঢেউয়ের ধাক্কায় পড়ে ঘাড়ে চোট পেয়েছে। লিমার হাসপাতালে ভর্তি। অভিযানে যাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরী হল সবার মনে, শুধু হারম্যান বাদে। ক্রমে ছজন বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে জুটল লিমাতে। থর, হারম্যান, ন্যুট, টরস্টাইন, এরিক আর বেঙ্গট। অবশেষে একেবারে প্রাচীন ইনকা পদ্ধতিতে ভেলা তৈরি হল, বালসা কাঠ, বাঁশ, আর পাতার সাহায্যে। দড়িদড়াও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে গাছের আঁশ থেকে নেওয়া হল। দেখেশুনে বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ছাড়পত্র দিতে রাজি হলেন না। এক রাষ্ট্রদূত তো আবার থরের দলের সকলকে একটা করে বাইবেল উপহার দিলেন, যখন শুনলেন যে কোনোভাবেই তারা নিরস্ত হবে না। ভেসে পড়ার দিন এসে গেল। আনুষ্ঠানিকভাবে ভেলা সমুদ্রে ভাসানো হল, যাত্রা সূচনাও করা হল। আর ডাঙা ছেড়ে জলে ভেসে পড়ার আগের দিন থর তার সঙ্গীদের নিয়ে চলল কাছের পাহাড়ে, ভেসে পড়ার আগে শক্ত ডাঙায় শেষবার একটু হেঁটে চলে আসার জন্য। আন্দিজের রুক্ষ পাথরের পাশে নিজেদের বোঝাচ্ছিল এবারে সত্যিই ভেসে পড়ার জন্য তারা ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।

সাগর পাড়ি

কনটিকি যেদিন ভেসে পড়বে, কাল্লাও বন্দরে সেদিন দারুণ ভিড়। সমুদ্র-বিষয়ক মন্ত্রী নৌবাহিনীর ‘টাগ-বোট’ ‘গার্ডিয়ান-রিও’কে আদেশ দিলেন আমাদের ভেলাটাকে নির্বিঘ্নে মাঝসমুদ্রে ছেড়ে আসতে, তীরের কাছাকাছি নৌকো এবং জাহাজের গতিবিধির বাইরে, যেখানে প্রাচীন ইন্ডিয়ানরা তাদের ভেলায় চড়ে দিব্যি মাছ ধরতে যেত।

কাগজে আমাদের খবরটা ছাপা হয়েছিল লাল কালো দুরকমের কালিতেই, আর সে-জন্য আঠাশ এপ্রিলের সকাল থেকেই বন্দর এলাকায় লোক এসে ভিড় করেছিল। আমরা যারা ভেলায় উঠব, শেষমুহূর্তে তাদের কিছু না কিছু কাজ ছিলই, সেগুলোই সারছিল সকলে।

আমি যখন এলাম বন্দরে, দেখলাম একা হারম্যান ভেলাটা পাহারা দিচ্ছে। আমি একটু দূরে গাড়িটা রেখে ইচ্ছে করে বাকি পথটা হেঁটে গেলাম, লম্বা লম্বা পায়ে, কে জানে কদ্দিন বাদে আবার এমন সুযোগ হবে! লাফিয়ে ভেলাতে উঠে দেখি, কলার স্তূপ, ফলের ঝুড়ি একগাদা বস্তা শেষ মুহূর্তে কোনোমতে তুলে রাখা, অগোছলো, যেগুলো খুব দ্রুত গুছিয়ে রাখতে হবে। ডাঁই করা জিনিসগুলোর মাঝে হারম্যান হাল ছেড়ে বসে আছে, হাতে ধরা খাঁচায় একটা সবুজ তোতাপাখি; লিমার কোনো সহৃদয় বন্ধুর দেওয়া।   

“একটু তোতাটাকে দেখো”, হারম্যান বলে,“তীরে উঠে শেষ এক গেলাস বিয়ার খেয়ে আসছি, টাগ বোট ঘন্টাকয়েকের আগে আসছে না।”

হারম্যান ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়েছে কি হয়নি বন্দরের লোকেরা কী একটা দেখিয়ে খুব হাত নাড়াতে লাগল। শিগগিরই সেটা দেখা গেল, আমাদের টাগ-বোট গার্ডিয়ান রিওস, দ্রুত ভেসে এসে নোঙর করল মাস্তুল উঁচিয়ে ভাসতে থাকা একগাদা জলযানের ওপাশে, কনটিকি অবধি তার আসার উপায় ছিল না। একটা বড়ো মোটর বোট পাঠানো হল কনটিকিকে বেঁধে জলযানগুলোর মধ্যে দিয়ে টাগ অবধি নিয়ে যাবার জন্য। নাবিক, অফিসার, মুভি তোলার লোকজনে ঠাসা ছিল সেটা। আদেশ হতেই, ক্যামেরার শাটারের আওয়াজের সাথে সাথে একটা মোটা জাহাজ-বাঁধা দড়ি দিয়ে ভেলার সামনেটা বেঁধে ফেলা হল।     

“এক মিনিট,” যেখানে বসেছিলাম তোতাটাকে নিয়ে সেখান থেকেই আমি স্প্যানিশে চেঁচিয়ে উঠলাম,“আগেভাগেই নিয়ে যাচ্ছেন যে, অভিযাত্রীদের তো আসতে দিন!” বলে আমি শহরের দিকে দেখালাম।

কিন্তু কেউই বুঝল না। অফিসারটি স্মিতহাসি দিলেন, এবং অত্যন্ত তৎপরতার সাথে আমাদের ভেলাটা কষে বেঁধে ফেলা হল। আমি দড়িটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে নানারকম অঙ্গভঙ্গী আর হাতের মুদ্রা দেখিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলাম। তোতাও এই ডামাডোলের সুযোগে ঠোঁট বার করে খাঁচার দরজাটা খুলে ফেলতে পারল; আমি ফিরে দেখতে দেখতেই ওটা বাঁশের ডেকের ওপর দিব্যি উঠে বসে লেজ দোলাচ্ছে। আমি ধরতে গেলাম, কিন্তু ওটা অসভ্যের মতো স্প্যানিশে চেঁচিয়ে উঠল আর কলার স্তূপে সেঁধিয়ে গেল। যারা ভেলার ডগায় দড়ি বাঁধছিল, সেই নাবিকদের দিকে খেয়াল রাখতে রাখতে আমি আরেকবার তোতাটাকে ধাওয়া করলাম। ওটা এবার চেঁচিয়েমেচিয়ে বাঁশের কেবিনে ঢুকে পড়ল। এক কোণায় বাগে পেয়ে এবারে ওর একটা পা ধরে ফেললাম, ঝাপটা দিয়ে চলে যেতে চাইছিল যদিও। বাইরে এনে ওটাকে খাঁচায় পুরতে পুরতে দেখি ডাঙার নাবিকেরা ভেলার দড়িদড়াগুলো খুলে ফেলেছে, আর আমরা ঢেউয়ের ধাক্কায় অসহায়ভাবে দুলছি। মরিয়া হয়ে আমি একটা বৈঠা হাতে সামাল দিতে চেষ্টা করলাম, যাতে পাড়ের কাঠের গুঁড়িগুলোর সাথে প্রবল ধাক্কাটা এড়ানো যায়। এরই মধ্যে মোটরবোটটা স্টার্ট দিয়ে দিল, কনটিকিও তার যাত্রা শুরু করল।

আমার সঙ্গী, একমাত্র স্প্যানিশভাষী একটা তোতা, রাগী রাগী মুখ করে খাঁচায় বসে। পাড়ের লোকগুলি উৎসাহে বাহবা দিচ্ছে, হাত নাড়াচ্ছে, আর ভিড় করে আসা মুভি ক্যামেরাম্যানরা পেরু থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ ধরে রাখার জন্য, পারলে বোট থেকে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়ে আর কি! হতাশ হয়ে একলা ভেলাটায় দাঁড়িয়ে আমার হারানো সঙ্গীদের খুঁজছিলাম, কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। সুতরাং গার্ডিয়ান রিওর কাছে চলে এলাম, আর সেটা নোঙর তুলে প্রস্তুত হয়েই ছিল, ছেড়ে দেবার জন্য। আমি চট করে দড়ির মই বেয়ে ওপরে উঠে এমন চেঁচামেচি জুড়ে দিলাম যে টাগবোট ছাড়া স্থগিত রইল, আর একটা ছোটো নৌকো পাড়ের দিকে পাঠানো হল। অনেকক্ষণ বাদে ওটা ফিরে এল অনেক সুন্দরী মহিলাদের নিয়ে কিন্তু কনটিকির কোনো একজন অভিযাত্রীও তাতে নেই। ব্যাপারটা ভালই কিন্তু আমার সমস্যার সমাধান তাতে হল না; ভেলা জুড়ে রইল আকর্ষণীয়া সিনোরিতা র দল, ছোটো নৌকোটা আবার গেল নরওয়ের হারানো অভিযাত্রীদের খোঁজে।

এরমধ্যে বেঙ্গট আর এরিক ধীরেসুস্থে চলে এসেছিল পাড়ে, হাতভর্তি একগাদা পড়ার বইটই আর এটা সেটা নিয়ে। ওরা বাড়ি-ফেরা দর্শকদের উল্টোদিকে আসছিল, ফলে একটা পুলিশ পোস্টে একজন সহৃদয় পুলিশ কর্মী ওদের আটকাল, বলল, আর কিছুই দেখার অবশিষ্ট নেই। বেঙ্গট স্বভাবসিদ্ধ সিগারের ধোঁয়া ছেড়ে বলল, না দেখতে নয় ওরা ভেলাটাতে চড়ে যাবে বলেই এসেছে।

“লাভ নেই” অফিসারটি খুব প্রশ্রয় দিয়ে বললেন, “কনটিকি একঘন্টা আগেই ছেড়ে গেছে।”

“অসম্ভব” এরিক একটা পার্সেল তুলে ধরে, “ এই যে লণ্ঠনটা।”

“আর এই যে ন্যাভিগেটর, দিকপ্রদর্শক”, বেঙ্গট বলে, “এবং আমি হলাম স্টুয়ার্ড।”

ওরা জোর করে এসে দেখে ভেলাটা চলে গেছে। বন্দরের এপাশ ওপাশ পাগলের মতো ছোটাছুটি করার সময় বাকিদের সঙ্গেও দেখা হল, ওরাও ভেলাটাকে খুঁজছিল। তখুনি ছোটো নৌকোটা আসছে নজরে এল ওদের, আর শেষমেষ আমরা ছ’জন একত্র হলাম আর গার্ডিয়ান সমুদ্রের গভীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য টানতেই ভেলাটার পাশ দিয়ে জলের ফেনা কেটে চলল।

শুরু করতে করতে বিকেল হয়ে গেছিল, পরদিন সকাল অবধি গার্ডিয়ান আমাদের নিয়ে চলল ততক্ষণ, যতক্ষণ না সাধারণ জলযানের যাতায়াতের পথ ছাড়িয়ে যাই! বাইরের সমুদ্রে এসে পড়লাম; সঙ্গের নৌকোগুলো একে একে ফিরে যেতে শুরু করেছে। কেবল দু’একটা বড়ো পালতোলা নৌকো উপসাগরের মুখ অবধি এল দেখতে ব্যাপারটা ঠিক কীরকম! টাগের পেছনে কনটিকি দড়িবাঁধা গোঁয়ার ছাগলের মতো যাচ্ছিল, ভেলার গোড়াটা এমনভাবে এই সমুদ্রে পড়ল যে জল ছলকে ভেলায় উঠে এল। ব্যাপাটা মোটেই সুখকর হল না, কেন না এখানকার সমুদ্র, যে বিক্ষুব্ধ সমুদ্র এরপর পেতে পারি তার তুলনায়, যথেষ্টই শান্ত। উপসাগরের মাঝামাঝি এসে বাঁধা কাছিটা ছিঁড়ে গেল আর আমাদের দিকের অংশটা টুপ করে সমুদ্রের জলে ডুবে গেল। টাগবোটটা এগিয়ে গেল। আমরা ঝাঁপিয়ে ভেলার পাশ থেকে দড়ির অংশটা উদ্ধারের চেষ্টা করতে থাকলাম, এদিকে পালতোলা নৌকোগুলো এগিয়ে গেল টাগটাকে থামাতে। চ্যাটচেটে জেলিফিশগুলো ভেলার চারপাশ থেকে ঢেউয়ে উঠছিল নামছিল; সেগুলো সবকটা দড়িতে আটকে পেছল চ্যাটচেটে হয়ে উঠেছিল। ভেলাটা একপাশে কাত হতেই আমরা শুয়ে পড়ে যতটা সম্ভব জলে হাত ঢুকিয়ে বাঁধার কাছিটা ধরলাম, অমনি ভেলাটা অন্য পাশে কাত হল আর আমাদের মাথামুখে নোনতা জল আর জেলিফিশ ঢুকে এল। আমরা মাথা মুখ থেকে জেলিফিশ ছাড়াতে লাগলাম; অবশ্য টাগবোট চলে আসার আগেই কাছিটা আমরা জল থেকে তুলে ফেলেছিলাম, আবার জুড়ে দেবার জন্য।

কাছিটা ছুঁড়ে দেব, এ সময়েই হঠাৎ করে আমাদের ভেলাটা ঢেউয়ের ধাক্কায় টাগ-বোটের ঝুঁকে থাকা পেছনের অংশের এত কাছে চলে এল যে ভয় হল জলের ধাক্কায় ওটার গায়ে গিয়ে না পড়ে ভেলাটা। সবকিছু ছেড়ে আমরা বাঁশ আর বৈঠা নিয়ে যথেষ্ট দেরি হয়ে যাবার আগেই পিছিয়ে আসার চেষ্টা চালালাম। কিন্তু ঠিকঠাক মতো তাল খুঁজে পাচ্ছিলাম না, ঢেউয়ের তলায় পড়লে টাগবোটের পেছনের লোহার ছাতমতো অংশের নাগাল পাওয়া যাচ্ছিল না, আর ঢেউয়ের তালে জল ওপরে উঠলেই গার্ডিয়ান রিওস-এর পুরো পেছনের অংশ  জলের মধ্যে ঢুকে আসছিল। জলের টানে আমরা নীচে পড়ে গেলে ওটা আমাদের মাথায় পড়ে স্রেফ গুঁড়িয়ে দিত। টাগ-এর ওপরের ডেকে মানুষেরা ছটোছুটি করছিল আর চ্যাঁচাচ্ছিল। শেষ মুহূর্তে পাশাপাশি প্রপেলার ঘুরতে আমরা গার্ডিয়ানের পেছনের জলের ধাক্কা থেকে সরে এলাম। ভেলার মাথাটা বার কয়েক ধাক্কা খেয়ে বাঁধনগুলো টেরাবেঁকা হয়ে গেছিল, কিন্তু পরে ধীরে ধীরে সেটা আবার ঠিক হয়ে গেল।

“এত খারাপভাবে যখন কোনো জিনিস শুরু হয়, তার শেষটা ভালো হতে বাধ্য”, হারম্যান বলল, “খালি এই দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়াটা বন্ধ হোক! এটাই ভেলাটাকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে টুকরো করে ফেলবে।”

সারা রাত ধরে ভেলাটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হল খুব আস্তে আস্তে। বড়োজোর দুটো একটা বাঁধনের ওপর  টানা। পালতোলা নৌকোগুলো বিদায় নিয়েছে অনেক আগেই। পাড়ের আলোও ভেলার পেছন থেকে দেখা দিগন্তে মিলিয়ে গেছে। অন্ধকারের মাঝে কয়েকটা জাহাজের আলো আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। আমরা পালা করে রাত জাগলাম, ভেলা-টানার কাছিটাকে খেয়াল রাখতে। এতে করে সকলেই বেশ খানিকটা ঘুমিয়ে নিতে পারল। ভোরের আলো ফুটল, পেরুর দিগন্তে তটরেখাজুড়ে কুয়াশার চাদর। সামনে পশ্চিমের দিকে ঝকঝকে নীল আকাশ!

গোটা সমুদ্রজুড়ে ছোটো ছোটো ঢেউ, ঢেউয়ের মাথায় সাদা চূড়া; আমাদের জামাকাপড় কাঠের গুঁড়ি শিশিরে ভিজে স্যাঁতসেতে হয়ে আছে। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব, চারপাশের জলও ১২ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের তুলনায় আশ্চর্যরকম ঠান্ডা!

আমরা হামবোল্ট স্রোতে পড়ে গেছি; এই স্রোতটা আন্টার্কটিক থেকে ঠান্ডা জল বয়ে উত্তর অভিমুখে পেরুর সৈকত বরাবর বয়ে আসার পর পশ্চিমে ঘুরে বিষুব রেখার নীচ দিয়ে সোজা সাগর পেরোয়। এখানেই, পিযারো বা জারাত এদের মতো পুরোনো স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা প্রথমবার ইনকা ইন্ডিয়ানদের বিশাল বিশাল ভেলাগুলো দেখেছিল। ওগুলো পঞ্চাশ ষাট মাইল সমুদ্রের গভীরে হামবোল্ট স্রোত বরাবর টুনা আর ডলফিন ধরত। সারাদিন একটা বাতাস বইত স্থলভাগের দিক থেকে আর সন্ধের মুখে উলটো দিকে হাওয়া দিত, যাতে দরকারে সেই হাওয়ায় ভর করে ভেলাগুলো ঘরে ফিরতে পারে।

ভোরের প্রথম আলোয় দেখি যে টাগ বোটটা আমাদের খুব কাছেই ভাসছে। আমাদের ছোট্টো রাবারের ভেলাটা জলে নামানোর সময় সতর্ক ছিলাম যাতে টাগ বোটটার পেছনে গিয়ে আমাদের ভেলাটা আবার ধাক্কা না মারে। রাবারের বোটটা জলে পড়ে ফুটবলের মতো ভাসতে লাগল আর এরিক বেঙ্গট ও আমাকে নিয়ে ঢেউয়ে নাচতে নাচতে গার্ডিয়ানের গায়ে গিয়ে ভিড়তেই দড়ির সিঁড়ি বেয়ে আমরা ওপরে উঠে গেলাম। বেঙ্গটকে দোভাষী করে চার্টে আমরা আমাদের অবস্থান বুঝে নিলাম। আমরা এখন কাল্লাও বন্দরের উত্তরপশ্চিম দিকে ৫০ সামুদ্রিক মাইল দূরত্বে আছি আর প্রথম কয়েকটা রাত আমাদের আলো জ্বালিয়ে চলতে হবে যাতে তীরের দিকে যাওয়া জাহাজগুলো আমাদের ডুবিয়ে দিয়ে না যায়! আরো দূরে চলে গেলে আমরা একটাও জাহাজের দেখা পাব না, কেননা প্রশান্ত মহাসাগরের ওই অংশ দিয়ে কোনো জাহাজই যাতায়াত করে না।

আমরা টাগবোটের সবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলাম। যখন রাবারের ডিঙিটায় নেমে ফেরৎ আসছি, অনেকেই অদ্ভুত চোখে দেখছিল আমাদের। আমরা ঢেউয়ের মাথায় দুলতে দুলতে কনটিকিতে ফিরে এলাম। কাছির বাঁধন খুলে দেওয়া হল, আর ভেলাটা এবারে সম্পূর্ণ একলা হয়ে গেল। গার্ডিয়ানের রেলিং ধরে পঁয়ত্রিশজন লোক আমাদের যতদূর দেখা যায় হাত নেড়ে বিদায় দিচ্ছিল,আর ছটা মানুষ কনটিকির ওপর প্যাকিং বাক্সে বসে যতক্ষণ টাগবোটটাকে দেখা যায়, দেখছিল। দিগন্তে কালো ধোঁয়া উগরে বোটটা মিলিয়ে যেতে আমরা মাথা নেড়ে একে অন্যের দিকে তাকালাম।

“বিদায়, বিদায়” টরস্টাইন বলে উঠল, “বন্ধুরা! এবারে আমাদের ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে হবে যে!”

আমরা হেসে উঠলাম, বাতাস এসে লাগল গায়ে। হালকা বাতাস, দক্ষিণ থেকে দক্ষিণ পুবে বইছে। আমরা বাঁশের ডগায় খাটানো চৌকো পালটা তুললাম। পালটা ঝুলে রইল, তাতে আঁকা কনটিকির মুখটা কুঁচকে, কেমন বিরক্তির ভাব সেখানে!

“বুড়োটা ব্যাপারটা পছন্দ করছে না!” এরিক ফুট কাটল, “ওর যৌবনে পালে অনেক টাটকা বাতাস লাগত।”

“মনে হচ্ছে বেকায়দায় পড়েছি” হারম্যান মুখ খোলে, একটা বালসা কাঠের টুকরো ভেলার সামনের দিকে জলে ছুঁড়ে ফেলে।

“এক দুই তিন …উনচল্লিশ চল্লিশ একচল্লিশ”

বালসার টুকরোটা ভেলার পাশে শান্ত হয়ে ভাসতে থাকে। পাশ বরাবর আধাআধিও এগোয়নি সেটা।

“এই নিয়েই চলতে হবে আমাদের।” টরস্টাইন খুব উৎসাহ নিয়ে বলে।

“আশা করি সন্ধের বাতাস আমাদের আবার পেছনে নিয়ে যাবে না” বেঙ্গট যোগ করে, কাল্লাও বন্দরে বিদায় সম্বর্ধনাটায় দারুণ মজা হয়েছিল,এখন দেখছি আবার শিগগিরিই স্বাগত জানাবে ওরা!”

এখন কাঠের টুকরোটা ভেলার পাশ দিয়ে ভাসতে ভাসতে শেষে পৌঁছেছে। আমরা উৎসাহে চিৎকার করে উঠলাম আর তাড়াতাড়ি মালপত্র গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম,শেষ মুহূর্তে তোলা প্রচুর জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। বেঙ্গট খালি বাক্সের ভেতরে একটা প্রাইমাস স্টোভ আটকে নিল আর জলদিই আমরা আয়েশ করে বিস্কিটের সাথে গরম কোকোয় চুমুক দিতে শুরু করলাম আর তাজা নারকোলও ভাঙা হল। কলাগুলো তত পাকেনি এখনো।

“আমরা এক পক্ষে দিব্যি আছি বলা যায়!” এরিক হেসে বলল। ওর পরনে ভেড়ার চামড়ার ট্রাউজার আর বড়ো ইন্ডিয়ান টুপি, কাঁধে একটা তোতা; ও বলে চলে, “এই বিরুদ্ধ স্রোত সম্পর্কে খুব কম জানাটা একেবারেই ভাল্লাগছে না আমার,এখানে এভাবে ভাসতে থাকলে স্রোতটা পাড়ের পাথরে নিয়ে আছড়ে ফেলবে আমাদের।”

বৈঠা বাওয়াই যায়, আমরা রাজিও হলাম কিন্তু বাতাসের জন্য অপেক্ষা করাই সাব্যস্ত হল। 

বাতাস বইল। দক্ষিণপূর্ব থেকে ধীরে ধীরে এবং স্থিরভাবে বইতে লাগল। পালে বাতাস লেগে ফুলে উঠল সামনের দিকে, কনটিকির মাথা উঁচু করে ধরল যুদ্ধং দেহি ভঙ্গীতে। আর অমনি তার চলা শুরু হল। পশ্চিমের দিকে মুখ করে আমরা চেঁচিয়ে উঠলাম,হোওও! আর দড়িদড়া নিয়ে টানাটানি শুরু করে দিলাম। দাঁড় নামিয়ে দেওয়া হল জলে,ঘড়ি ধরে হিসেব করে প্রত্যেকের কাজের পালা আরম্ভ হয়ে গেল। কাগজের বল আর কাঠের টুকরো ভেলার সামনের দিকে জলে ফেলে ভেলার পেছনে ঘড়ি ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

“ এক দুই তিন… আঠেরো ঊনিশ – এইবার!”

কিছুক্ষণের মধ্যেই কাগজ আর কাঠের টুকরোগুলো হালের পাশ দিয়ে ভেসে ভেসে ভেলার পেছনের দিকে সমুদ্রের জলে একটু দূরে মুক্তো মালার মতো ঢেউয়ের মধ্যে ডুবতে ভাসতে থাকল। আমরা একগজ একগজ করে এগোতে থাকলাম। রেসিং বোটগুলোর মতো কনটিকি সমুদ্রের জল চিরে এগোচ্ছিল না। ভোঁতা আর চওড়া,ভারী এবং নিরেট কনটিকি খুব শান্তভাবে ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ভেসে চলেছিল। তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু একবার যখন ভেসে পড়েছে তখন স্থির শক্তিতে এগিয়ে চলেছে।

আমাদের এখন সবচেয়ে সমস্যা স্টিয়ারিং ব্যবস্থা নিয়ে। হুবহু প্রাচীন স্প্যানিয়ার্ডদের বিবরণ অনুযায়ী  ভেলাটা বানানো হয়েছে। কিন্তু এমন কেউ আর বেঁচে নেই যে হাতে কলমে ইন্ডিয়ান-ভেলা চালানোটা শিখিয়ে দেবে! সমস্যাটা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সাথে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে ডাঙায় থাকাকালীন,কিন্তু তেমন কিছু উপায় হয়নি। আমরাও যতটুকু জানি ওরাও ততটুকুই। দক্ষিণের হাওয়ার তেজ বাড়লে ভেলাটাকে এমনভাবে রাখার দরকার হয়ে পড়ল যাতে পালে বাতাসটা পেছন থেকে এসে লাগে। বাতাসের গতির দিকে ভেলাটা পাশ ঘুরে যাচ্ছে,এবারে পালটা সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়ে মালপত্র মানুষজনকে ঝাপটা দিয়ে ফেলে তো দেবেই উলটে পেছনদিকটা ঘুরে সামনের অভিমুখে এসে চলতে শুরু করবে। কঠিন কাজ,তিনটে মানুষ পাল নিয়ে আর বাকি তিনজন হাল ধরে প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছে যাতে ভেলার সামনেটা বাতাস যেদিক থেকে আসছে তার উলটো দিকে থাকে। ভেলাটা সঠিক দিকে ঘুরে যেতেই,হালের লোকটিকে সতর্ক থাকতে হল,যাতে আবার পরমুহূর্তেই একই ঘটনা না ঘটে।

হালটা উনিশ ফুট লম্বা, দুটো কাঠের ওপর পেছনের দিকে রাখা। ইকুয়েডরে পালেনক্যু থেকে কাঠ ভাসিয়ে নিয়ে আসার সময় আমাদের স্থানীয় বন্ধুরা যেমন দাঁড় ব্যবহার করছিল তেমনি। লম্বা ম্যানগ্রোভ কাঠের দাঁড়, লোহার মতো শক্ত, কিন্তু এমন ভারী যে একবার জলে পড়ে গেলে ডুবে যাবে। দাঁড়ের মাথায় ফার কাঠের চওড়া পাটাতন গোছের একটা কাঠ দড়ি দিয়ে বাঁধা। সর্বশক্তি দিয়ে ওটাকে সোজা ধরে রাখতে হচ্ছিল ঢেউয়ের বিরুদ্ধে। আমাদের আঙুলগুলো কুঁকড়ে বেঁকে অবশ হয়ে যাচ্ছিল ওটাকে জলের ভেতর সোজা ধরে রাখতে । এই শেষ সমস্যাটা সমাধান হল একটা ছোটো কাঠের টুকরো আড়াআড়ি দাঁড়ের হাতলের সাথে বেঁধে দেওয়াতে। খানিকটা লিভারের মতো কাজ করছিল ওটা। এর মধ্যেই বাতাসের বেগ বেড়েছে।

বিকেলবেলার মধ্যেই বাণিজ্যবায়ু পূর্ণমাত্রায় বইতে শুরু করল। সমুদ্রকে শিগগিরই অশান্ত করে তুলল বাতাস, আর পেছন থেকে আমাদের ওপর সেই ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল। এই প্রথম সত্যিই অনুভব করলাম  সমুদ্দুরের সাথে আমাদের দেখা হল। একটা বিচ্ছিরি সঙ্কটজনক অবস্থা, আমাদের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেল। সব ঠিকঠাক থাকবে কিনা এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে খোলা সমুদ্রে বালসা ভেলার গুনাগুনের ওপরে। আমরা জানতাম, এর পর থেকে আমরা পাড়ের দিকের বাতাস কিংবা ফিরে যাবার কোনো সুযোগ আর পাব না। আমরা বাণিজ্যবায়ুর মধ্যে পড়ে গেছি, রোজই এটা আমাদের আরও আরও গভীর সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাবে। একটাই কাজ করার আছে, পুরো পাল খাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া; আমরা ফেরার চেষ্টা করলে, ভেলাটা উল্টোমুখ করে সমুদ্রে আরো পিছিয়েই যেতে থাকবে। একটাই সম্ভাব্য গতিপথ, বাতাসের অনুকূলে, সূর্যাস্তের দিকে দাঁড় বেয়ে যাওয়া। মোটের ওপর সেইটেই আমাদের অভিযানের উদ্দেশ্য – সূর্যকে অনুসরণ করা; পেরু থেকে তাড়িয়ে দেবার সময় কনটিকি আর প্রাচীন সূর্য উপাসকেরা নিশ্চই এমনই করেছিল।

প্রথম ভয়াল ঢেউটার মাথার ওপর কাঠের ভেলাটা অনায়াসে চড়ে গেল। আনন্দও হল আশ্বস্তও হলাম। কিন্তু হাল ধরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়ছিল, জলের ধাক্কায় ভেলার সঙ্গে আটকানোর জায়গা থেকে উঠে যাচ্ছিল দাঁড়টা, আর মাঝে মাঝে জলের ধাক্কায় মানুষ শুদ্ধু ঘুরিয়ে দিচ্ছিল অন্য দিকে, অসহায় দড়াবাজিকরের মতো। সমুদ্রের ঢেউ উঠে পেছন থেকে যেই এসে পড়ছে, দুজনে মিলেও দাঁড়টা জায়গামতো ধরে রাখা যাচ্ছিল না। ভেবে টেবে দাঁড়ের চওড়া অংশের দুপাশে দড়ি বেঁধে ভেলার দুপাশে নিয়ে গেলাম, আর ভেলাতে আটকানো অংশে দড়ি টড়ি দিয়ে বেঁধে দিলাম যাতে নড়াচড়াটা কম হয়; যদি আমরা দড়িদড়াগুলো ঠিকঠাক ধরে রাখতে পারি, তীব্র ঢেউও সামাল দিয়ে দেবে এটা।

ঢেউয়ের খাদ ক্রমশ আরো নিচু হচ্ছে টের পেলাম, তার মানে পরিষ্কার, আমরা হামবোল্ট স্রোতের সবচেয়ে দ্রুতগামী অংশে এসে পৌঁছেছি। শুধু বাতাস নয়, অবশ্যই এই স্রোতও সমুদ্রকে উত্তাল করেছে। আমাদের চারপাশে সর্বত্র ঠান্ডা, সবজেটে জল। পেরুর রুক্ষ পাহাড়গুলো পেছনের ঘন মেঘের আড়ালে অদৃশ্য। জলের ওপর অন্ধকার নেমে এলে আমাদের আসল লড়াইটা শুরু হল। আমরা সমুদ্রকে নিয়ে নিঃসন্দেহ হতে পারছিলাম না, সে আমাদের এতটা কাছে পেয়ে বন্ধুর মতো ব্যবহার করবে না শত্রুর মতো সেটা আমাদের কাছে তখনও অনিশ্চিত! অন্ধকার পুরোপুরি নেমে এলে চারপাশের সমুদ্রের সাধারণ আওয়াজগুলো থেমে গিয়ে একটা ঢেউয়ের বিকট আওয়াজ প্রবল হয়ে উঠল আর সেটা ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে; তার সাদা চুড়ো দেখতে পেলাম আমাদের কেবিনটার মাথা বরাবর। আমরা উৎকন্ঠায় ছিলাম বিশাল জলরাশি ভেলা এবং আমাদের ওপর ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়!

আর প্রত্যেকবারই একই চমক আর পরিত্রাণ। কনটিকি নির্বিকারভাবে তার লেজ তুলে আকাশের দিকে উঠে পড়ে আর জলের ঢেউ দু’পাশ দিয়ে বয়ে যায়। তার ঠিক পরেই আমরা ঢেউটা পেরিয়ে নীচে নেমে এসে আবার পরের ঢেউটার জন্য অপেক্ষা করি। মাঝে মাঝে বিশাল বিশাল ঢেউগুলো দুটো বা তিনটে একের পর এক আসতে থাকে। আর তার ফাঁকে ফাঁকে পরের পর ছোটো ছোটো ঢেউ। পরপর দুটো বড়ো ঢেউ যখন খুব কাছাকাছি চলে আসছে দ্বিতীয়টা অবশ্যম্ভাবী ভেলার পেছনে ভেঙে পড়ে, কেন না প্রথম ঢেউটা ভেলার গলুইকে তখনও আকাশের দিকে তুলে রেখেছে। এর ফলে অলঙ্ঘ্যনীয় শর্ত হল, পেছনের স্টিয়ারিঙে যারা থাকছে তাদের কোমরে বাঁধা দড়ির আরেকটা দিক ভেলার সাথে বাঁধা থাকবে কেননা ভেলাতে কোনো বুরুজ ছিল না। ওদের কাজ ছিল ভেলার পেছনটাকে সমুদ্র আর বাতাসের দিকে এমনভাবে রাখা যাতে পালটাকে বাতাস যথাযথ ফুলিয়ে রাখে।

পুরোনো জাহাজের একটা কম্পাস আমরা পেছনের দিকে একটা বাক্সের মধ্যে আটকে দিয়েছিলাম যাতে এরিক দিকনির্ণয় করে আমাদের ভেলার অবস্থান ও গতি মাপতে পারে। আপাতত আমাদের অবস্থান জানিনা, কেননা আকাশ মেঘে ঢাকা আর দিগন্তজুড়ে ফুঁসে ওঠা ঢেউ। দুজন পালা করে হালের দিকে নজর রাখছে, পাশাপাশি সমস্ত শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করে সেটাকে ঠিক জায়গায় রাখতেও হচ্ছে। বাকীরা ততক্ষণ বাঁশের খোলা কেবিনটাতে একটু ঘুমিয়ে নেবার চেষ্টা করছে।      

এরই মধ্যে একটা বড়ো ঢেউ এসেছে; দাঁড়ে যারা ছিল, দাঁড় টার ছেড়ে কেবিনের ছাত থেকে বেরোনো বাঁশের ডান্ডা ধরে ঝুলে পড়ল আর ঢেউটা ভেলার পেছনে ওদের ওপরেই ভীমবেগে আছড়ে পড়ে আশপাশ দিয়ে কাঠের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে গেল। ভেলাটা বোঁওওও করে ঘুরে যাবার আগেই তারা দাঁড় সামলাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কেননা ভেলাটা ঢেউয়ের সঙ্গে কোনাকুনি করে থাকলে, ঢেউগুলো এসে বাঁশের কেবিনের ওপরেই আছড়ে পড়বে। পেছন থেকে যে ঢেউগুলো উঠছে সেগুলো ক্কচিৎ কেবিনের দেয়াল অবধি এসে পৌঁছচ্ছে, সেগুলো তার অনেক আগেই পেছনদিকে বাড়ানো লগদুটোর মধ্যেই মিলিয়ে যাচ্ছে। কাঁটাচামচের বাড়ানো দাঁতের মতো, পেছনের দুটো লগের মধ্যে জল কেটে যাচ্ছে। এই ভেলার সুবিধেই অবশ্য এটা, যত জল আশপাশ দিয়ে গলে যায় তত ভাল। ভেলার মেঝের ফাঁকফোকর দিয়ে জল গড়িয়ে বেরিয়ে যায় কিন্তু ভেতরে ঢোকে না।

মাঝরাতে একটা জাহাজের আলো দেখা গেল, উত্তর দিকে যাচ্ছে। রাত তিনটের সময় আরেকটা, একই দিকে যাচ্ছে। আমাদের ছোট্টো প্যারাফিন লন্ঠনটা নিয়ে নাড়ালাম, বৈদ্যুতিক টর্চ নিয়ে অনেকবার সঙ্কেত করলাম, কিন্তু আমাদের দেখতে পেল না ওরা, উত্তর দিকে অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে আমাদের পেরিয়ে আলোগুলো মিলিয়ে গেল। জাহাজের লোকেরা বুঝতেই পারল না যে ওদের কাছেই একটা প্রকৃত ইনকা-ভেলা ঢেউয়ের মধ্যে ভাসছে। আর ভেলার ওপরে আমরাও টের পেলাম না, এটাই আমাদের দেখা শেষ জাহাজ অথবা মানুষের চিহ্ন কেন না এর পর আবার সমুদ্দুর পেরোনোর আগে মানুষ দেখা যাবে না।

আমরা মাছির মতো দাঁড়ে আটকে রইলাম অন্ধকারের ভেতর, দুজন দুজন করে; আমাদের চুল বেয়ে সমুদ্রের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল, দাঁড়ের সামনে পেছনে সামাল দিতে দিতে আমাদের হাতের আঙুলগুলো শক্ত আর অসাড় হয়ে আসছিল। প্রথম কয়েকটা দিনরাত আমাদের ভালোরকম শিক্ষাদীক্ষা হয়েছে, আদ্যন্ত ডাঙার মানুষ থেকে আমাদের পুরোদস্তুর নাবিক বানিয়ে দিয়েছে। প্রথম চব্বিশ ঘন্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রত্যেকে দুঘন্টা দাঁড়ে আর তিনঘন্টা করে বিশ্রাম পেয়েছে। আমরা ঠিক করেছিলাম, প্রতি ঘন্টায় একজন করে দাঁড়ের দুজনের একজন বদল হবে, যার দুঘন্টা পার হয়েছে। সারাক্ষণ দাঁড় সামলাতে সামলাতে দেহের প্রতিটা পেশি ব্যথা করতে শুরু করল। দাঁড় ঠেলতে ঠেলতে ক্লান্ত হয়ে গেলে জায়গা বদলে আমরা উল্টোদিকে গিয়ে টানা শুরু করতাম আর হাত বুক ব্যথা শুরু হলে পিঠ দিয়ে ঠেলতাম। বুকে পিঠে দাঁড়ের ঘসটানির দাগ হয়ে গেল। একেকজনের দাঁড়ের পালা শেষ হলে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে প্রায় টলতে টলতে হামাগুড়ি দিয়ে এসে  বাঁশের কেবিনে ঢুকে, পায়ে দড়ি বেঁধে, নুনে ভেজা জামাকাপড় পরেই ঘুমিয়ে পড়তাম, স্লিপিংব্যাগে ঢোকা অবধি হত না। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দড়িতে টান পড়ত, তিনঘন্টা হয়ে গেছে এরই মধ্যে, বাইরে গিয়ে দাঁড়ের দুজনের একজনকে ছাড়তে হবে।  

পরের রাত্তিরটা আরো খারাপ, আরো বড়ো বড়ো ঢেউ, কমার লক্ষণ নেই। দু’ঘন্টা দাঁড়ে বসে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ল, দ্বিতীয় দফায় সে মোটেই কাজের কাজ করতে পারছিল না, আর সমুদ্র আমাদের বাগে পেয়ে ঘুরিয়ে টুরিয়ে একসা, জল উঠে পড়ছে ভেলার ওপরে। আমরা ঠিক করলাম একঘন্টা দাঁড়ে আর দেড়ঘন্টা বিশ্রাম। পরের ষাটঘন্টা যুদ্ধ করে কাটল পরের পর ঢেউ সামলাতে, অনবরত ঢেউ আর ঢেউ, থামার লক্ষণ নেই। উঁচু ঢেউ নিচু ঢেউ, খোঁচা ঢেউ গোল ঢেউ, আঁকা ঢেউ বাঁকা ঢেউ, ঢেউয়ের মাথাতে ঢেউ।

আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভুগেছে ন্যুট। ওকে দাঁড় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। তার বদলে ওকে সমুদ্রদেবতা নেপচুনের কাছে প্রার্থনা করতে হচ্ছিল আর নিঃশব্দ উদ্বেগে কেবিনের এক কোণায় সিঁটিয়ে বসে কাটাতে হচ্ছিল। তোতাটা গোমড়া মুখে খাঁচায় বসে, ভেলাটায় বেশি ঝাঁকুনি লাগলেই বা পেছনের দেয়ালে ঢেউ এসে লাগলেই দাঁতে খাঁচার জাল কামড়ে ডানা ঝটপটিয়ে উঠছে। কনটিকি বাড়াবাড়ি রকম দুলছিল না। একই মাপের কোনো নৌকোর থেকে অনেক ভালোভাবে সমুদ্রের সঙ্গে যুঝে চলেছে সে কিন্তু প্রতিবার ডেকটা কোন দিকে কাত হবে এটা বলা খুব কঠিন হয়ে পড়ছিল। আমরা ভেলাতে সহজভাবে চলাফেরাটা তখনও একেবারেই রপ্ত করতে পারিনি। ভেলাটা যতবার দুলছে ততবার ঝুঁকেও পড়ছে। 

তৃতীয় দিন রাত্তিরে সমুদ্র অল্প শান্ত হল, বাতাস অবশ্য তখনও জোরেই বইছে। ভোর চারটে নাগাদ দাঁড়ের লোকজন কী ঘটছে কিছু বুঝে ফেলার আগেই অন্ধকারে এক মহাঢেউ এসে আছড়ে পড়ে ভেলাটাকে তক্ষুনি ঘুরিয়ে দিল। পালটা বাঁশের কেবিনের ওপর আছড়ে পড়ল আর মনে হচ্ছিল যেন কেবিনটাকে তো ভাঙবেই, নিজেও ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। সবাই মিলে বেরিয়ে এসে মালপত্র আর পাল টেনে ধরে সামলাতে লাগলাম, প্রার্থনা করছি যেন ভেলাটা আবার সঠিক দিকে ঘুরে যায়, তাহলেই পালটা সামনের দিকে ফুলে উঠবে আর শান্তি পাব। কিন্তু হল না, ভেলাটা সঠিক দিকে এল না। ঘুরে গিয়ে পেছনের দিকটা সামনে চলে যে এল তো এলই। টানাটানি, ঠেলাঠেলি, দাঁড় বাওয়ায় যেটা হল, আমাদের দুজন ভেলা থেকে প্রায় জলে পড়ে যাচ্ছিল অন্ধকারের মধ্যে। পালে আটকে গেল।

সমুদ্র স্পষ্টত অনেকই শান্ত হয়ে এসেছে। শক্ত, টাটানো আঙুল, শুকনো হাতের পাতা আর ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে আমাদের অবস্থাটা তখন পাঁশুটে ও বেকার। এইবেলা শক্তি সঞ্চয় করে রাখা ভাল, আবহাওয়া আবার একটা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধির মধ্যে টেনে নেবার আগে। বলা যায় না, ফলে আমরা পালটা গুটিয়ে নিয়ে বাঁশের লাঠির গায়ে জড়িয়ে রেখে দিলাম। কনটিকি আড়াআড়ি সমুদ্রে ভাসতে লাগল কর্কের মতো, ভেলার ওপরে সমস্ত জিনিষ দড়িতে শক্ত করে বাঁধা হল আর ছজন প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বাঁশের কেবিনটায় ঢুকে গাদাগাদি করে শুয়ে মরার মতো ঘুমোলাম, টিনের সার্ডিনমাছগুলোর মতো।

আন্দাজ করছিলাম আমাদের অভিযানের সবচেয়ে কঠিন দাঁড় বাওয়াটা আমরা পেরিয়ে এসেছি বোধহয়। অবশ্য সমুদ্রে আরো অনেকটা না যাওয়া অবধি আমরা ইনকাদের সহজ এবং দক্ষ হাল ধরার পদ্ধতিটা আবিষ্কার করতেই পারিনি।

অনেক বেলা অবধি ঘুমোলাম আমরা, ঘুম ভাঙল তোতাটার ডাক আর হৈচৈয়ে এবং খাঁচার দাঁড়ে বসে তার নাচানাচিতে। বাইরে সমুদ্রে উঁচু উঁচু ঢেউ ছিল বটে কিন্তু বেশ কিছু অন্তর অন্তর এবং সমান মাপের। আগের দিনের মতো উথালপাথাল, বেমক্কা ঢেউ নয়। প্রথম যেটা লক্ষ্য করলাম, চড়া রোদ্দুর উঠেছে, হলদে ডেকের ওপর আর চারপাশের সমুদ্রে আলো পড়ে পরিবেশ খুব উজ্জ্বল এবং অনুকূল দেখাচ্ছে। ঢেউ ফুলে ফেঁপে উঠুক না তাতে কি আসে যায় যদি আমরা নিশ্চিন্তে  ভেলার ওপরে ভেসে থাকি? কীইই বা আসে যায় যদি নাকের ডগায় ঢেউ উঠে যায় সোজা ওপরে, কারন একটু পরেই তো ভেলাটা ওর ওপর চড়ে বসবে স্টিম রোলারের মতো আর ঢেউ নীচে নেমে আসবে। বিপুল জলের পাহাড় আমাদের শূন্যে তুলে ফেলবে ঠিকই, তারপর গড়িয়ে যাবে আর গুড়গুড় করতে থাকবে ভেলার নীচে। পেরুর প্রাচীন ওস্তাদরা ঠিকঠাক জানত যে ফাঁপা জাহাজের কাঠামো জলে ভরে যেতে পারে! অথবা একটা অতবড়ো যান পরপর ঢেউ সহ্য নাও করতে পারে! কিন্তু বালসা ভেলা হল একদম কর্কের স্টিম রোলার।

দুপুর নাগাদ এরিক আমাদের অবস্থান মাপল। পাল খাটিয়ে যদ্দূর এসেছিলাম, তার চেয়ে উত্তর দিকে অনেকটাই এগিয়ে এসেছি। আমরা এখনও হামবোল্ট স্রোতের মধ্যেই আছি আর ডাঙা থেকে মাত্র ১০০ সামুদ্রিক মাইল দূরত্বে। বড়ো প্রশ্নটা হল, গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণে অবিশ্বাস্য ঘুর্ণির মধ্যে না পড়ে যাই। ভয়ানক পরিনতি হতে পারে সেটা, কেননা যেকোনো দিকেই প্রবল স্রোতের টানে আমরা ভেসে যেতে পারি  মধ্য আমেরিকার ভূখন্ডের দিকে। কিন্তু হিসেব ঠিকঠাক থাকলে গ্যালাপাগোস অবধি অত উত্তরে যাবার আগেই মূল সামুদ্রিক স্রোত আমাদের পশ্চিমে ঘুরিয়ে দেবে। হাওয়া তখনও সরাসরি বইছে দক্ষিণপূর্ব দিক থেকে। আমরা পাল খাটিয়ে, ভেলার মুখ ঠিক করে হালে নজরদারি বজায় রাখলাম।

ন্যুট সমুদ্রপীড়ার সাঙ্ঘাতিক কষ্ট থেকে মোটামুটি  সামলে উঠেছে। ও আর টরস্টাইন খুব কসরৎ করে দুলতে থাকা মাস্তুলে উঠে বেলুন আর ঘুড়ির মতো অদ্ভুত সব রেডিও এরিয়াল লাগিয়ে রেখে সেসব নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করতে লাগল। হঠাৎ ওদের মধ্যে একজন কেবিনের রেডিও-কর্নার থেকে চেঁচিয়ে উঠল, ও লিমার নৌবন্দর থেকে আমাদের জন্য পাঠানো সঙ্কেত শুনতে পেয়েছে। ওরা আমাদের জানাচ্ছে যে ইতিমধ্যেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের বিমান আকাশে উড়েছে আমাদের শেষবার বিদায় জানানো এবং সমুদ্রে আমাদের কেমন লাগছে সেইটে দেখার জন্য। বিমানে বেতার প্রেরকের সাথে সরাসরি সংযোগ হবার পর অপ্রত্যাশিতভাবে অভিযানের সম্পাদক, গেয়ার্ড ভল্ড-এর সাথে কথা হল। ও-ও বিমানেই ছিল। আমরা যথাসম্ভব আমাদের অবস্থান জানালাম আর ঘন্টাখানেক ধরে দিকনির্দেশ বার্তা পাঠাতে থাকলাম। উল্টোদিক থেকে বেতারে আওয়াজ যথাক্রমে বাড়ছিল কমছিল কেন না আর্মি-১১৯ আমাদের খোঁজার জন্য চক্কর কাটতে কাটতে কাছে আসছিল আর দূরে সরে যাচ্ছিল। কিন্তু আমরা না শুনতে পেলাম ইঞ্জিনের শব্দ না বিমানটাকে দেখতে পেলাম। সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যে এইটুকু ভেলা খুঁজে পাওয়া অবশ্য সহজ কম্ম নয়! এদিকে আমাদের দৃষ্টিও সীমাবদ্ধ। শেষ অবধি হাল ছেড়ে বিমানটা ডাঙায় ফিরে গেল। ওই শেষবারের মতো আমাদের কেউ খুঁজতে এসেছিল।

পরের দিনগুলোয় সমুদ্রে বড়ো বড়ো ঢেউ উঠছিল, তবে মসৃণগতিতে, দক্ষিণ পূর্ব দিক থেকে কিছুক্ষণ ছাড়া ছাড়া। হালধরাটা সহজ হয়ে গেল। আমরা ভেলাটাকে এমন করে রাখলাম যাতে ঢেউ আর হাওয়া এসে বাঁদিকে পেছন থেকে ধাক্কা মারে তাতে হালের সঙ্গে যে থাকবে সে ঢেউয়ের ঝাপটা কম খাবে আর ভেলাও ঘুরে না গিয়ে সমানভাবে এগোবে। বাণিজ্যবায়ু আর হামবোল্ট স্রোত দিনে দিনে আমাদের গ্যালাপ্যাগোসের চারদিকের উলটো স্রোতের দিকে ঠেলে নিয়ে চলছিল, সেটা লক্ষ্য করে একটু আশঙ্কাই হল। উত্তরে এত দ্রুত এগোচ্ছিলাম আমরা যে তখন আমাদের গড় গতিবেগ ছিল দিনে ৫৫-৬০ সামুদ্রিক মাইল। সর্বোচ্চ একদিনে ৭১ মাইল অবধিও পাড়ি দিয়েছিলাম।

“গ্যালাপাগোস ভাল? যাবার মতো জায়গা?” ন্যুট সাবধানে একদিন আমাদের চার্টের দিকে তাকিয়ে বলে। চার্টে আমাদের অবস্থানগুলো পরপর মালার মতো দাগানো আর তার মুখ সাংঘাতিকভাবে একটা দিকই নির্দেশ করছে – অভিশপ্ত গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ। 

“কঠিন” আমি বলি, “ইনকা টুপাক ইউপাঙ্কি ইকুয়েডর থেকে গ্যালাপ্যাগোস এসেছিলেন কলম্বাসের ঠিক আগে আগেই কিন্তু তিনি বা অন্য কেউ ওখানে বসতি স্থাপন করেননি, কারণ জল নেই।”

“বেশ” ন্যুট বলে, “তাহলে ওখানে যাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এমনিতেও, আশা করি, সেখানে যাচ্ছি না!”  

ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s