আগের পর্বগুলো-

ষষ্ঠ অধ্যায়
সেদিন বিকেলে নতুন কোন কমিক বই এসেছে কি না দেখতে রাতুল গিয়েছিল লাইব্রেরিতে। হোস্টেলের ছাত্রদের জন্য লাইব্রেরি সন্ধ্যার আগে পর্যন্ত খোলা থাকে। লাইব্রেরিতে সে সাধারণত যায় না খুব একটা। বিকেল হচ্ছে খেলার সময়। তবে সেদিন লাইব্রেরিতে অনেকেই ছিল। কারণ গতরাতে বিনয়ের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় একটা ছোটোখাট হুলস্থুল পড়ে যায়। সেজন্য স্বাভাবিক নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম হচ্ছে আজ। রাতুল গিয়ে প্রথমেই কমিক বইয়ের তাকটা ভালো করে দেখল। নতুন কোন কমিক বই আসেনি।
সে যখন ফিরে আসবে তখন দেখতে পেল ক্লাস নাইনের বড়ো ভাইয়েরা পত্রিকার একটি খবর বেশ মনযোগ দিয়ে পড়ছে। নাইনের শফিক ভাই হাত নেড়ে বলছে, “এটা স্কুলের সবাইকে বলতে হবে। কখন কী হয় বলা যায় না।”
আফজাল ভাই বলল, “আচ্ছা, এদের ধরে নিয়ে গিয়ে এরা কী করে আসলে?”
তৌফিক ভাই বলল, “কী আর করবে। পাচার করে দেয় মিডলইস্টে।”
শফিক ভাই বলল, “শুধু কি পাচার? ঐ যে নদীর উপর ব্রিজ হয়, এই ব্রিজ তৈরি করতে নদীতে ছেলেদের কাটা মাথা ফেলতে হয়। শুনিস নি এটা?”
এরকম আরো কিছু কথা বলছিল তারা। রাতুলের খুব আগ্রহ হল। সে একটু এগিয়ে গেল। শফিক ভাই তাকে দেখে বলল, “এই রাতুল, তোমাদের ক্লাসের ঐ ছেলেটার কী খবর?”
রাতুল বলল, “সে এখন ভালো আছে ভাই।”
শফিক ভাই বলল, “লাইব্রেরিতে তোমাদের ক্লাসের আর কয়জন আছে দেখ ত?”
তৌফিক ভাই বলল, “খালি তোমাদের ক্লাসের না। যে যে আছে সবাইকে বল এখানে আসতে। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার নিয়ে কথা বলব।”
রাতুল “জি ভাই” বলে যারা যারা লাইব্রেরিতে ছিল সবাইকে জড়ো করল। সবাই জড়ো হলে শফিক ভাই পত্রিকা হাতে নিয়ে বলতে লাগল, “তোমরা খুব সাবধান থাকবে। এলাকায় ছেলেধরা শুরু হয়েছে। আজ পত্রিকায় বেরিয়েছে রাজশাহীর একটা স্কুল হোস্টেলের সুপার ছেলেধরা চক্রের সাথে জড়িত। চোখ কান খোলা রেখে চলবে সবাই।”
রাতুল পত্রিকার দিকে তাকিয়ে দেখল একটা রিপোর্টের হেডলাইন- “রাজশাহীতে ছেলেধরাঃ স্কুল হোস্টেল সুপার আটক।”
তৌফিক ভাই বলল, “তোমাদের রুমমেট এবং হোস্টেলের অন্য বন্ধুদেরও সতর্ক করবে। সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লে জানাবে আমাদের।”
বড়োভাইরা সতর্ক করে দেয়াতে রাতুল আরো ভয় পেল। ছেলেধরাদের ব্যাপারে সে শুনেছে। এরা ছোটো বড়ো বাচ্চাদের ধরে নিয়ে যায়। নিয়ে পাচার করে দেয়। তাই ক্লাসে স্যারেরা বলেন, “অপরিচিত কেউ কিছু দিলে তা খাবে না।”
সপ্তম অধ্যায়
সেদিন রাতে দেখা গেল বেশ বড়ো চাঁদ উঠেছে। জানালা দিয়ে সে চাঁদের আলো খুব সামান্য ঘরে এসে পড়ছে। রাতুল তার ড্রয়ার খুলে কাগজে মোড়ানো বীজটা বের করল। সে চকলেটের বীজটি নিয়ে রুম থেকে বের হল। বের হয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখল এক কোনে বেশ খানিকটা চাঁদের আলো এসে পড়ছে রেলিং এর উপরে। সেখানে গিয়ে কাগজটি খুলে চাঁদের আলোয় রাখল বীজটিকে। কালো বীজটি চাঁদের আলো পেয়ে যেন সতেজ হয়ে উঠল।
খুব বেশি সময় রাখা গেল না। কারণ বেশি সময় বাইরে থাকলে স্যার-ম্যাডাম কারো চোখে পড়লে রক্ষা নেই। এছাড়া বাতাস কিংবা অন্য কোন কারণে সামান্য নড়চড় হলেই বীজ গিয়ে পড়বে সোজা নীচে। সুতরাং, মিনিট দশেক রাখার পর বীজটিকে রুমে নিয়ে এসে আগের জায়গায় রেখে দিল।
তার রুমমেট আকাশ খুব মগ্ন হয়ে ক্লাসের অংক করছিল। সে একবার মুখ তুলে বলল, “এই যে বিনয় ছেলেটা ওকে ভূতে নিয়েছিল আমি নিশ্চিত। ওর চোখ দেখেছ? লাল লাল।”
রাতুল বলল, “আমি তো দেখলাম কালো।”
আকাশ বলল, “আমি খেয়াল করে দেখেছি লাল। আর ছেলেটি একা একা হাঁটে। মাঠের ধারে ঐ বেঞ্চিতে একা একা বসে থাকে। সবাই বলছে ও নাকি ভূতের বাচ্চা।”
রাতুল বলল, “ভূতের বাচ্চা মানুষের মত দেখতে হয় নাকি? ও তো দেখতে মানুষের মত।”
আকাশ হয়ত আরো কিছু একটা বলত। কিন্তু বলতে পারল না কারণ হোস্টেলের একজন স্টাফ এসে দাঁড়িয়েছিল রুমের দরজায়। ছাত্ররা পড়ালেখা করছে কী না তা দেখার জন্য এরকম প্রতি সন্ধ্যা-রাতেই আসেন ইনি। তার নাম হাফিজুর রহমান। ছাত্ররা ডাকে হাফিজ স্যার।
রাতে বিনয় ছেলেটাকে নিয়ে অনেক চিন্তা করল রাতুল। ছেলেটা কে? কীভাবে সে জানল চকলেটের বীজ সম্পর্কে? এই ছেলেটার সাথে কী জাদুকরের কোন সম্পর্ক আছে? সত্যিই কি সে ভূত?
ইত্যাদি বিভিন্ন চিন্তা করতে করতে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন যথারীতি স্কুল এবং স্কুল থেকে ফেরার পর বিকেলে সে ছুটে গেল মাঠে। মাঠ অনেক বড়ো। সমস্ত মাঠ জুড়ে সবুজ ঘাস। প্রতিমাসে এ ঘাসগুলো কিছুটা ছেঁটে ফেলা হয়। মাঠের চারধারে বড়ো বড়ো গাছ। রাতুল গাছগুলোর নাম জানে না।
মাঠের এককোণে কেউ কেউ ফুটবল খেলে, কেউ আরেক কোণে খেলে ক্রিকেট। শুধু বামদিকের কোণে খেলা হয় না। সেদিকটাতে ঘাসও বেশি। সেখানেই একটি চারফুট লম্বা বেঞ্চি আছে। সে বেঞ্চিতেই বিনয় ছেলেটা একা একা বসে থাকত।
মাঠে রাতুল যাওয়ার পর দেখল ক্লাসের ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। সে প্রায়দিনই খেলে। তাই একজন ডেকে তাকে খেলায় নিতে চাইল। কিন্তু রাতুল অন্য কাজের কথা বলে বাঁদিকের কোণের দিকে হাঁটা দিল। এই ছেলেদের মধ্যে রিমন, সিয়ামি, মুস্তাফিজ এবং তাদের দলবলও ছিল। রাতুল আজ না খেলে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে দেখে রিমন আরেকজনকে বলল, “ও যাচ্ছে কোথায় রে?”
ওই ছেলেটা বলল, “জানি না।”
মুস্তাফিজ রিমনের কানে মুখ নিয়ে বলল, “ওকে ফলো করা দরকার। হয়ত নতুন কিছু করছে ওই চকলেটের প্যাকেটটা নিয়ে।”
রিমন বলল, “চল তাহলে।”
রিমন, সিয়ামি, মুস্তাফিজ এবং আরো দুয়েকজন রাতুলকে ফলো করে তার পিছু পিছু চলল।
এদিকটা অনেকটাই নির্জন। যদিও এখান থেকে দেখা যায় দুই কোণে খেলা হচ্ছে। রাতুল গিয়ে দেখল বিনয় বেঞ্চিতে বসে সবুজ ঘাসের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রাতুল তার পাশে গিয়ে বলল, “আমি এসেছি। তুমি কতক্ষণ হল এসেছ?”
বিনয় রাতুলের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্কুল ছুটির পর। সবুজ আমার ভালো লাগে। আগে যেখানে ছিলাম সেখানে একটা সবুজ পার্ক ছিল। আমি সে পার্কের মধ্যে গিয়ে বসে থাকতাম।”
রাতুল বেঞ্চে বসে বলল, “হ্যাঁ। সবুজ আমারও ভালো লাগে। কিন্তু আমি জানতে চাই তুমি কীভাবে জানতে পারলে আমার চকলেটের বীজের কথা?”
বিনয় সামান্য হেসে বলল, “এ আর এমন কী!ওই বীজটা যে তোমাকে দিয়েছে তাকেও আমি চিনি।”
রাতুল প্রশ্ন করল, “এ থেকে কী সত্যিকার গাছ হয়?”
বিনয় বলল, “বিশ্বাস রাখতে হবে। তোমার বিশ্বাস যদি থাকে তাহলে অবশ্যই হবে। এটা জাদুর চকলেটের বীজ। এর সাথে জড়িয়ে আছে জাদুজগতের অনেক কিছু। ভাগ্যের কারণে তুমি এবং আমি একসাথে জড়িয়ে পড়েছি। এর যোগসূত্র হচ্ছে এই চকলেটের বীজ।”
রাতুল জিজ্ঞেস করল, “আমি এর কিছুই বুঝতে পারছি না।”
বিনয় বলল, “বুঝতে পারবে। জাদু জগতের সম্রাট নিকোলাই মারা যাবার পর তার ছেলে হারিরি সম্রাট হবার কথা ছিল। কিন্তু হারিরি বয়সে খুব ছোটো। তাই তার চাচা তাকে মেরে ফেলতে চাইল…”
বিনয় হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। কারণ বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিমন, সিয়ামি, মুস্তাফিজ এবং আরো কয়েকজন।
রিমন বলল, “আরে রাতুল! আজ দেখি তুই খেলা ছেড়ে এই ভূতের বাচ্চার সাথে গল্প করছিস!”
রাতুল রাগী কন্ঠে বলল, “ওকে ভূতের বাচ্চা বলবি না।”
রিমন বলল, “শুধু আমি বলছি নাকি! ওর নামই তো এখন ভূতের বাচ্চা। সবাই বলে।”
সিয়ামি বলল, “আমাদের কবি বন্ধু শফিকুর এ নিয়ে একটা কবিতাও রচনা করেছে।”
মুস্তাফিজ বলল, “আমি কবি শফিকুরকে আহ্বান করছি ভূতের বাচ্চা নিয়ে তার কবিতা আবৃত্তির জন্য।”
শফিকুল সামনে এসে পকেট থেকে কাগজ বের করে পড়তে লাগল,
“কবি শান্ত শফিকুর। ক্লাস সেভেন। কবিতার নাম ভূতকাব্য-২৭
বারো ভূতে ঘাস খায়
তেরো ভূতে পানি
কালো ভূতের নাকে বসে
সাদা ভূতের নানি
রিমন, সিয়ামী এবং তাদের সাথে যারা এসেছিল এরা হাততালি দিল। রাতুল তখন রাগান্বিত মুখে বসে আছে।
মুস্তাফিজ শফিকুরকে বলল, “এটা তো ভূত নিয়ে। ভূতের বাচ্চার কবিতাটা আবৃত্তি কর।”
শফিকুর পিছনে চলে গিয়েছিল। সে আবার সামনে এসে চশমা ঠিক করে পকেট থেকে কাগজ বের করে পড়তে লাগল,
“কবি শান্ত শফিকুর। ক্লাস সেভেন। কবিতার নাম ভূতের বাচ্চা কাব্য-১।
ভূতের বাচ্চা বিনয়
নাকের সংখ্যা কি নয়?
দেখতে ভীষণ ভালো
মাথায় পোকা ঢালো
এবার হাততালির শব্দ আরো বাড়ল। রিমন বলল, “শাবাস! দারুণ লিখেছিস বন্ধু।”
শফিকুর বলল, “আরেকটি আছে। কবিতার নাম
ভূতের বাচ্চা কাব্য-২
ভূতের ছেলে ভূতের ছেলে
তুই শচীন নাকি পেলে?
কোথায় তোর ঘর?
পেত্নী কী তোর পর?
খাস কী রে তুই ঘাস?
দুঃখ বারোমাস।
হু হু দুঃখ বারোমাস!
রাতুল এবার এগিয়ে এসে রিমনের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বলল, “তুই এদের নিয়ে এখান থেকে চলে যা। ভালো হবে না বলছি।”
এরই মধ্যে এদিকে জটলা দেখে এসেছে রাতুলের রুমমেট আকাশ। তাকে দেখে রিমন কবি শান্ত শফিকুরের দিকে তাকিয়ে বলল, “একে নিয়ে নতুন কবিতা লিখতে যে বলেছিলাম, হয়েছে?”
কবি শান্ত শফিকুর বলল, “হ্যাঁ। কবিতার নাম,
মটকু কাব্য-১
চলে যায় দিন তার
খেয়ে ভূতের গু
সে আমাদের পরিচিত
আকাশ মটকু
সবাই হো হো করে হাসছিল এই সময় রাতুল ধাক্কা দিয়ে কবি শান্ত শফিকুরকে ফেলে দিল মাটিতে।
রিমন বলল, “এটা কী হল? আমরা কী কাউকে মেরেছি? তুই ওকে মারলি কেন? ও কি তোকে কিছু বলেছে?”
কবি শান্ত শফিকুর উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে আরেকটি কাগজ বের করে পড়ল,
রাতুল
মাথায় শুধু ভুল
পেটটা গোল
মারে খালি গুল।
এটা শেষ হবার সাথে সাথেই রাতুল ঝাঁপিয়ে পড়ল কবি শান্ত শফিকুরের ওপর। রিমন সহ আরো কয়েকজন তাকে আটকাতে চেয়েছিল। কিন্তু রাতুল রেগে গেলে তাকে আটকানো অসম্ভব প্রায়। সে এলোপাথাড়ি কিছু কিল ঘুষি মারল কবি শান্ত শফিকুরকে। তারপর তার পকেট থেকে সব কাগজ অর্থাৎ তাতে লেখা কবিতাগুলো নিয়ে চলল হোস্টেলের দিকে। আকাশ গেল তার পিছু পিছু। রাতুলের আকস্মিক আক্রমনে রিমনের দল হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। এবং তারা কিছুটা ভয় পেয়েছে।
রিমন শান্ত শফিকুরকে বলল, “চিন্তা করবি না। ম্যাডামের কাছে আমরা সবাই গিয়ে নালিশ দেব। টিসি খাবে।”
এই মারামারির মধ্যে বিনয় কবেই চলে গেছে। রাতুল তার রুমে গিয়ে কবিতাগুলো ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিল। তখন দ্বিতীয়বার আকাশ তার বুদ্ধির প্রমাণ দিল। সে বলল, “এগুলো ছিঁড়লে ম্যাডামকে কী দেখাবে? তারা নালিশ দিলে তুমি ম্যাডামকে এসব দেখাতে পারবে।”
তাই রাতুল না ছিঁড়ে কবিতাগুলো রেখে দিল। সন্ধ্যার পর পর ম্যাডামের রুমে বিচার বসল। দুই পক্ষ উপস্থিত হবার পর ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, “রাতুল এগুলো কি সত্যি? তুমি শফিকুরকে মেরেছ?”
রাতুল দাঁড়িয়ে বলল, “জি ম্যাডাম। সে আমাদের নিয়ে বাজে কবিতা লেখে।”
ম্যাডাম অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন “বাজে কবিতা মানে?”
রাতুল কবিতা লেখা কাগজগুলো এগিয়ে দিল। ম্যাডাম হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে পড়লেন। তারপর বললেন, “হুম। শান্ত শফিকুরটা আবার কে?”
পিছন থেকে একজন বলল, “ম্যাডাম এটা শফিকুরের ছদ্মনাম। কবিদের ছদ্মনাম থাকতে হয়।”
ম্যাডাম শফিকুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি এসব লিখেছ?”
শফিকুর মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল।
ম্যাডাম বললেন, “এই তোমার পড়ালেখা? এসব করে বেড়াও? তোমার বাবাকে এসব সাহিত্যকর্ম দেখাব?”
আর রাতুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “একজন লিখেছে বলে তাকে কি মারতে হবে? লেখার জবাব হবে লেখায়। এর জন্য মারামারি কেন?”
তারপর দুজন অপরাধীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এগুলো আমার কাছে বাজেয়াপ্ত থাকল। শফিকুর এসব বাজে কবিতা আর লিখবে না। তোমরা প্রথমবার মারামারি করেছ। তাই টিসি দেয়া হল না। দুজনে দশবার করে কানে ধরো। এবং আর যেন কখনো মারামারির কথা না শুনি।”
দুজনই কান ধরে উঠবস করতে লাগল। সমস্ত রুমজুড়ে ভয়ার্ত নীরবতা ভর করল। তবে ভাগ্য ভালো আজ ম্যাডাম খুব রেগে যাননি। হয়ত তা কবি শান্ত শফিকুরের কবিতার গুণে। দেখা গেল ম্যাডাম কবিতাগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছেন। ম্যাডাম রেগে গেলে শাস্তির পরিমাণ এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হত।
শাস্তি পর্ব শেষ হলে সবাই যার যার রুমে ফিরে এল।
অষ্টম অধ্যায়
সেদিন রাতে আরেকটি ঘটনায় হইচই পড়ে গেল। রাতের খাবারের পর হঠাৎ দেখা গেল বিনয়কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভয়ংকর কথা! কারণ এই সেদিনও সে একা একা একটা খালি রুমে গিয়ে বসে ছিল।
বিনয়কে পাওয়া যাচ্ছে না এটা ছাত্ররাই প্রথম লক্ষ করল। সে খেতে আসেনি। তার রুমমেটকে জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলতে পারল না। কেমন যেন হাবার মত তাকিয়ে থেকে যন্ত্রের মত উত্তর দিল, “আমি তাকে সন্ধ্যার পর দেখিনি।”
সাজু ভাই, হাফিজুর রহমান সহ আরো যারা স্টাফ ছিল তারা সবাই মিলে খুঁজতে শুরু করল।
ম্যাডাম ছাত্রদের বললেন, “তোমরা নিজেদের রুমে গিয়ে খুঁজে দেখ। হয়ত সে কারো রুমে থাকতে পারে।”
ম্যাডামের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। অন্য ফ্লোরগুলোর স্যারেরাও এসেছিলেন। তারা সবাই কী যেন আলোচনা করছিলেন।
বন্ধ রুমগুলো একে একে তালা খুলে দেখা হল। সব ফ্লোরে এবং ছাদে খোঁজা হল। কিন্তু বিনয় কোথাও নেই! সে যেন হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
হেডমাস্টার স্যার শিক্ষকদের ভবনে থাকতেন। তাঁকে ফোন করে বিষয়টি বলা হলে তিনি চলে আসলেন। সাদা পাঞ্জাবী পরা অবস্থায় গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ পায়চারি করলেন। তারপর নাক দিয়ে কেমন যেন গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ম্যাডাম-স্যারদের বললেন, “আপনারা দুশ্চিন্তা করবেন না। ছেলেটা হয়ত আছে কোথাও।”
ম্যাডাম বললেন, “স্যার, আমরা কি পুলিশে খবর দেব?”
হেডমাস্টার স্যার বললেন, “না, তার দরকার হবে না। আপনারা চিন্তা করবেন না। আমি ব্যাপারটা দেখছি।”
বলে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে চারিদিকে তাকিয়ে খুঁজতে খুঁজতে তিনি হাঁটতে লাগলেন।
ম্যাডাম সাজু ভাইকে বললেন, “সাজু রেজিস্ট্রার সাহেবকে গিয়ে বল এই ছেলেটার অভিভাবকদের নাম ঠিকানা নিয়ে এক্ষুনি আমার সাথে দেখা করতে। ছেলের অভিভাবকদের অন্তত জানানো দরকার।”
সাজু ভাই নিচে রেজিস্ট্রারের রুমে গিয়ে রেজিস্টার সহ ফিরে এলেন মিনিটপাঁচেকের মধ্যে।
রেজিস্ট্রার জমির সাহেব এসে বললেন, ‘ম্যাডাম, এই ছেলেটার অভিভাবকদের বিষয়ে কোন তথ্য নেই।”
ম্যাডাম যেন আকাশ থেকে পড়লেন এই কথা শুনে। তিনি বেশ উত্তপ্ত এবং অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “নেই মানে? কী বলছেন এসব?”
রেজিস্ট্রার সাহেব বললেন, “ম্যাডাম, হেডস্যারের অনুরোধে এই ছেলেটাকে ভর্তি করা হয়। যখন তথ্যের দরকার হয় তখন হেডস্যার বলেছিলেন, “ভর্তি করে নাও। ওসব তথ্য ফথ্য আমি দেখব।”
ম্যাডাম কোন কথা না বলে গম্ভীর হয়ে গেলেন। অন্য স্যারেরাও বেশ অবাক হয়েছেন এই ব্যাপারটা যেনে তা বোঝা গেল।
তখন রাত খুব বেশি না। বারোটার মত বাজে। বিনয়ের হারিয়ে যাওয়ায় রাতুলের বেশ মন খারাপ হল। সে ভাবতে লাগল, ছেলেটা গেল কোথায়? হোস্টেলের গেট সব সময় বন্ধ থাকে। সবসময় একজন দারোয়ান বসা থাকে। তার চোখ এড়িয়ে বাইরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাহলে কি সে অদৃশ্য হয়ে গেল? সব ছাত্ররা যে বলছে তাকে ভূতে নিয়ে গেছে, এ কি সত্যি?
রাতুল মন খারাপ করে তার রুমের সামনের বারান্দায় হেটে যাচ্ছিল কোণের দিকে। হোস্টেলে হঠাৎ করেই ভূতের ভয় নেমে এসেছে। যেসব ভূতের গল্প এখানে প্রচলিত ছিল সেগুলো সম্পর্কে এখন কারো কোন সন্দেহ নেই। তাই ছাত্ররা জায়গায় জায়গায় জড়ো হয়ে আছে। জড়ো হয়ে তারা যেসব কথা বলছে তার প্রায় সব কথাই ভূত এবং ভয়কে নিয়ে। রাতুলের এসব ভালো লাগে না। তাই সে একা একা এদিকে চলে এসেছে।
হঠাৎ করে বারান্দায় ঠিক কোণটায় গাঢ় অন্ধকার দেখে রাতুলের খটকা লাগল। বেশ উজ্জ্বল চাঁদ উঠেছে আকাশে। হোস্টেলের বৈদ্যতিক বাল্বের আলোও আছে। বারান্দাটা অন্ধকার না। এমন পরিষ্কার যে ক্রিকেট খেলা যাবে। কিন্তু কোনার দিকে ছোটো একটা অংশ দেখে মনে হচ্ছে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মনে হচ্ছে কিছু অন্ধকার সেখানে ঘাপটি মেরে বসে আছে।
রাতুলের কিছুটা ভয় হল। কিন্তু তবুও সে আস্তে আস্তে পা ফেলে এগিয়ে গেল ঠিক সেই অন্ধকারটার সামনে। কালো ধোঁয়ার মত অন্ধকার। সাধারণ আলোর মধ্যে এমন দলা পাকানো অন্ধকার দেখা যায় না।
রাতুল যখন ঠিক অন্ধকারটার সামনে তখন এর ভিতর থেকে কথা এল, “রাতুল! আমি এখানে আছি। তোমার জন্য অপেক্ষায়।”
রাতুল ভয়ে ভয়ে বলল, “কে? তুমি বিনয়?”
তখন অন্ধকারটা অনেক কমে গেল। রাতুল দেখতে পেল বিনয়ের মুখ। বিনয় কোনায় বসে আছে। তার চারপাশ ঘিরেই ছিল কালো অন্ধকার।
বিনয় বলল, “হ্যাঁ। আমি।”
রাতুল জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখানে বসে আছ কেন?”
বিনয় বলল, “আমি লুকিয়ে আছি। তোমাকে সেদিন যে জাদুরাজ্যের কথা বলেছিলাম সেই জাদুজগতের সম্রাট নিকোলাই আমার বাবা ছিলেন। আমি তাঁর ছেলে হারিরি। এখন আমি নতুন সম্রাট হবার কথা। কিন্তু আমার চাচা তা মানতে নারাজ। সে ভয়ংকর লোক। কালো জাদুবিদ্যায় তার দখল অনেক। সে আমাকে মেরে ফেলতে চায়। তাই আমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।”
রাতুল জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তুমি এখানে এলে কী করে?”
বিনয় বা জাদুসম্রাট নিকোলাই এর ছেলে হারিরি বলল, “আমাকে বাঁচিয়ে এই মানুষের মাঝে ছদ্মবেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন আমার বাবার এক বন্ধু। পৃথিবীর কিছু মানুষ জাদুজগতের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। যেমন তোমাদের হেডমাস্টার স্যার। আমার বাবার বন্ধুর সাথে তার ভালো সম্পর্ক আছে। তার মুখে আমার দুর্দশার কথা শোনে তিনি আমাকে সাহায্য করছেন। তিনিই আমাকে এখানে ভর্তি করেছেন যাতে আমার চাচা অর্থাৎ সেই কালো জাদুকর না জানতে পারে। তিনি চান না সে সম্রাট হোক। কারণ কালো জাদু হল ভয়ংকর জাদু। কোন কালো জাদুকর রাজা হলে তা মানুষের রাজ্য এবং জাদুরাজ্য উভয়ের জন্যই খারাপ হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এখানেও আমার চাচার গুপ্তচর এসেছিল। সে আমাকে দেখে চিনে ফেলে। তাই সেদিন রাতে আমি তালাবদ্ধ রুমে লুকিয়ে ছিলাম। আজ লুকিয়ে আছি এখানে। তবে মনে হচ্ছে খুব বেশি সময় থাকতে পারব না।”
রাতুল জিজ্ঞেস করল, “কেন বেশি সময় থাকতে পারবে না?”
হারিরি বলল, “কারণ আজ ওরা তৈরি হয়ে এসেছে। ওদের শক্তির থেকে আমাকে যারা লুকিয়ে রাখছেন তাঁদের শক্তি কম। তোমার তো সেই জাদুকরের কথা মনে আছে যিনি তোমাকে চকলেটের বীজটা দিয়েছিলেন?”
রাতুল বলল, “হ্যাঁ।”
হারিরি বলল, “উনিই আমার বাবা নিকোলাই এর বন্ধু। তিনি তোমাকে চকলেটটা দিয়েছেন তার এক বিশেষ উদ্দেশ্য আছে।”
রাতুল জিজ্ঞেস করল, ‘কী উদ্দেশ্য?”
হারিরি বলল, “আমাদের জাদুজগতে এক মন্দির আছে। সেখানে ভাগ্যদেবতাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি ভাগ্য বলে দেন। সেখানে যাওয়া খুব কঠিন। বাবা সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি আমার ভাগ্যের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তখন ভাগ্যদেবতা বলেন আমার খুব বিপদ হবে। এবং সে বিপদে দুজন মানুষ সরাসরি সাহায্য করবে। এদের একজন হলে তুমি আর একজন তোমার বন্ধু আকাশ। তাই ঐ জাদুকর তোমাকে জাদুর চকলেট দিয়েছিলেন।”
রাতুল জিজ্ঞেস করল, “তাহলে চকলেটের বীজে কি গাছ হবে না?”
হারিরি বলল, “হবে কি হবে না, তা তুমি নিজেই দেখতে পাবে। তবে আমার এখন যেতে হবে। তোমাকে অনেক কথা বলার ছিল। কারণ আমাদের প্রতিপক্ষ অনেক শক্তিশালী। কালো জাদুবিদ্যার মাধ্যমে তারা অসাধ্যসাধন করতে পারে। কিন্তু আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে। আমি তোমাকে একটি জাদুর বই দিয়ে যাচ্ছি। তুমি জাদুজগতে না যাওয়া পর্যন্ত এই বই কাজ করবে না। জাদুজগতে গেলে এই বই থেকে তুমি অনেক তথ্য পাবে।”
হারিরি হাতে বিদ্যুতের ঝলকের মত কিছু একটা খেলে গেল। সে একটা ছোটো বই রাতুলের হাতে দিয়ে একটা দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে বলল, “আমি নিশ্চিত না আমরা পারব কি না। ভাগ্যদেবতা এটা স্পষ্ট করে বলেননি আমরা জিতব না ওই কালো জাদুকররা জিতবে। ওরা এগিয়ে আসছে। আমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে এখন। তুমি ভালো থেকো। শীঘ্রই দেখা হবে। বিদায়।”
রাতুল দেখল খুব তাড়াতাড়ি হারিরি বা বিনয়ের মুখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার ধোঁয়ার রঙ আরো কালো হল। এবং কুন্ডলি পাকিয়ে ঘুরতে লাগল চরকির মত। অবিশ্বাসী চোখে রাতুল তাকিয়ে দেখল তার সামনে গাঢ় কালো বর্নের ধোঁয়ার ঘূর্ণন।
ক্রমশ