বিশ্বের জানালা নদীর গল্প-ধলেশ্বরীর দিনরাত্রি মীম নোশিন নাওয়াল খান শীত ২০১৭

আরো নদীর গল্প- ———————————————————-

পাহাড়ের কান্না-মেঘনা নদী ,পদ্মানদীর গল্প  , দুরন্ত মেয়ে সুরমা , নদীর গল্প-ব্রহ্মপুত্রের পৃথিবী ভ্রমণ , কর্ণফুলির দিনরাত্রি

ধলেশ্বরীর দিনরাত্রি

মীম নোশিন নাওয়াল খান

অনেক অনেকদিন আগের কথা। তখন মাত্র যমুনা নদীর জন্ম হয়েছে। চোখ খুলে এই দেশটাকে দেখে তার মনে হলো, এই দেশটা কী সুন্দর! এখানে কত কিছু আছে দেখার! কিন্তু উত্তেজনায় যমুনা বুঝেই উঠতে পারল না, সে এই দেশটার কোনদিকটা আগে ঘুরে দেখবে। তবুও সে বিপুল উদ্যমে বইতে লাগল। কিন্তু বইতে বইতে যখন তার ক্লান্তি চলে এল, তখন যমুনা করলো কী, অনেকগুলো শাখা নদী হয়ে ভাগ হয়ে গেল।

টাঙ্গাইল জেলার উত্তর পশ্চিম প্রান্তে যমুনা নদী এসে নিজের গা থেকে জলরাশি গড়িয়ে দিল দুই পাশে। এরা হয়ে গেল দুটো শাখা নদী। একজন ধলেশ্বরী, আরেকজন কালীগঙ্গা। যমুনা ধলেশ্বরীকে বলল, “ধলা মা, তুমি উত্তরে চলে যাও।  আমি খুব ক্লান্ত। আমার হয়ে তুমি উত্তরে গিয়ে দেখে এসো, কী আছে ওখানে। আমি এখানেই আছি। আমাকে সব গল্প শোনাবে কিন্তু!”

ধলেশ্বরী মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা মা। আমি তবে আসি।”

এই বলে সে উত্তর দিকে চলে গেল।

তারপর যমুনা কালীগঙ্গাকে পাঠিয়ে দিল দক্ষিণে। কালীগঙ্গা ছুটে গেল দক্ষিণ দিক ধরে।

ধলেশ্বরী প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। সে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা ঘুরে ঘুরে দেখল। কুলকুল করে বয়ে বেড়াল।

কিন্তু কালীগঙ্গা বড্ড অলস মেয়ে। মানিকগঞ্জের কাছে এসে তার সঙ্গে যখন ধলেশ্বরীর দেখা হল, সে বলল, “ধলা দিদি, আমি আর এত ঘুরতে পারছি না গো। আমাকে তোমার কোলে আশ্রয় দাও না!”

ধলেশ্বরী দু’হাত বাড়িয়ে বোনকে বুকে টেনে নিল। ধলেশ্বরীর গায়ে মিশে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ধলেশ্বরীর পরিচয়েই বইতে লাগল কালীগঙ্গা।

কালীগঙ্গাকেও নিজের বুকে নিয়ে চলতে চলতে এক সময় ধলেশ্বরীও ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তখন সে নারায়ণগঞ্জের কাছে এসে যখন শীতলক্ষ্যা নদীর দেখা পেল, একটুও দেরি করল না। ঝাঁপিয়ে পড়ল তার কোলে। শীতলক্ষ্যা মায়ের স্নেহে ধলেশ্বরীকে নিয়ে বয়ে চলল। চলতে চলতে সে পরবর্তীতে মেঘনা নদীতে গিয়ে মিশে গেল।

শীতলক্ষ্যা

আর এই লম্বা পথ ঘুরে ধলেশ্বরীর দৈর্ঘ্য হল ২৯২ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ১৪৪ মিটার।

তবে কেউ কেউ বলেন, ধলেশ্বরী আসলে পদ্মা নদীর মেয়ে ছিল। ধলেশ্বরী এবং বুড়িগঙ্গার মধ্য দিয়ে পদ্মা গিয়ে মিশেছিল মেঘনায়। কিন্তু পরে ধলেশ্বরীর সঙ্গে ঝগড়া করে পদ্মা তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। দক্ষিণ দিকে সে কীর্তিনাশা নদীর কাছে চলে গিয়েছিল। আর এখনও সে সেখান দিয়েই বয়ে চলেছে।

যমুনা যখন এসে ধলেশ্বরীকে কাঁদতে দেখে, তখন নাকি তার খুব মায়া হয়। সে তখন ধলেশ্বরীকে নিজের মেয়ের মতো করে কাছে টেনে নেয়। তারপর তাকে আবার নতুন উদ্যমে বইতে শেখায়।

অবশ্য ধলেশ্বরী কিন্তু এখন যমুনাকেই মা বলে ডাকে। যদি কখনও ধলেশ্বরী নদীতে যাও, কান পাতলেই শুনতে পাবে, সে তার মাকে তার দুইপাড়ের গল্প শোনাচ্ছে অবিরাম।

 বিশ্বের জানালা       সব পর্ব একত্রে

2 thoughts on “বিশ্বের জানালা নদীর গল্প-ধলেশ্বরীর দিনরাত্রি মীম নোশিন নাওয়াল খান শীত ২০১৭

    1. মীম ধারাবাহিকভাবে অত্যন্ত সুন্দর কাজ করে চলেছে বাংলাদেশের নদীদের নিয়ে। আমরা ওকে নিয়ে গর্বিত।

Leave a Reply