রাজীব কুমার সাহার সমস্ত লেখা এই লেখার আগের পর্বগুলো
এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব-প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন খোঁজ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই বিভাগে।
পর্ব – ৬
কাজল (Eyeliner) (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০)
বহু শতাব্দী প্রাচীন এই প্রসাধনীর সাহায্যে মানুষ নিজের সৌন্দর্যবর্ধন বা ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করে আসছে। সর্বপ্রথম কাজলের ব্যবহার দেখা যায় প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বে। এর স্বপক্ষে প্রাচীন নগরসভ্যতাগুলোতে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের খোঁজ মেলে। দক্ষিণ ইরাক এবং মিশরের আদিবাসীরা নরনারী নির্বিশেষে অশুভ শক্তির কুদৃষ্টি থেকে নিজেদের রক্ষার্থে চোখের চারপাশে মোটা করে কাজলের প্রলেপ লাগাত। মাটিতে মিশে থাকা সীসার সালফাইড বা অ্যান্টিমনি সালফাইড দ্বারা প্রস্তুত এই ঘন কালো মলমের মতো কাজল এদের অন্যতম প্রসাধন সামগ্রী হিসেবেও বিবেচিত হত।
আঠা (Glue) (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০)
আমরা হয়তো রোজ রোজ আঠা ব্যবহার করি না। কিন্তু আঠা ব্যবহৃত কোনও না কোনও জিনিসপত্রের ব্যবহার নিশ্চয়ই করে থাকি। বিশ্বে সর্বপ্রথম আঠার ব্যবহার চালু হয়েছিল ইতালিতে। সেখানে দু’দিকে দুটো এবং ওপরদিকে ঢাকা দেওয়া একটা পাথরের টুকরোর ভেতরে কিছু আঠা খুঁজে পাওয়া যায় যা প্রায় ৬০০০ বছরের পুরনো বলে গবেষকরা দাবি করেন। তাছাড়া কিছু আদিম উপজাতিদের সমাধিক্ষেত্র খুঁড়ে বৃক্ষজ আঠা দ্বারা জোড়া লাগানো খাদ্যপূর্ণ কিছু ভাঙা মৃৎপাত্র পাওয়া যায়। পাশাপাশি কিছু ব্যাবিলনিয় মন্দিরে মূর্তির গায়ে বিটুমিনাস সিমেন্টেরও হদিস পান প্রত্নতাত্ত্বিকেরা যেগুলো প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বের বলে দাবি করেন তাঁরা।
গাছের গুঁড়ি বিছানো পথ (Log-laid Road) (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০)
ভারী মালপত্র আনা নেওয়ার ক্ষেত্রে তখনকার আদিবাসীরা গাছের মোটা মোটা গুঁড়ি বিছিয়ে একধরনের রাস্তা তৈরি করে নিয়েছিল। গাছের গুঁড়ির এবড়োখেবড়ো গায়ে বালি আর কাদা মিশিয়ে প্রলেপ দিয়ে যতটুকু সম্ভব মসৃণ করে নিত এরা। ফলে অগম্য পথেও ভারী ভারী মালপত্র সহজেই এর ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে পারত গরু-মোষ বা ঘোড়া। বেশ কয়েকটা গুঁড়ি একসাথে মুখোমুখি বিছিয়ে পেছনের দিকের গুঁড়িগুলো তুলে এনে আবার সামনের দিকে বিছিয়ে এগিয়ে যেত এরা। মানুষেরা প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বেই এধরনের রাস্তা তৈরি করতে শিখে গিয়েছিল বলে ইংল্যান্ডের গ্ল্যাস্টনবারিতে তার প্রমাণ মেলে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি এবং সোভিয়েত উভয় বাহিনীই এধরনের রাস্তা তৈরি করেছিল। তবে তাতে গাছের গুঁড়ি ব্যবহার না করে বড়ো বড়ো কাঠের তক্তা বিছিয়ে দিয়েছিল তারা।
নাচি (Rivet) (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০)
এই ক্ষুদ্র জিনিসটিই সম্ভবত সুবিশাল টাইটানিকের সলিলসমাধি ঘটিয়ে দিয়েছিল। আদিমানব নাচির ব্যবহার অনেক আগেই শিখে গিয়েছিল। ৪৪০০ থেকে ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বের মধ্যবর্তী সময়কার কিছু বর্শা-ফলকে এর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া প্রত্নতাত্ত্বিকেরা তাম্রযুগের হাতলযুক্ত কিছু তরোয়াল আর ছোরায়ও নাচির ছিদ্র খুঁজে পান। নাচিগুলো ধাতুর তৈরি ছোট ছোট শলাকাকৃতির ছিল। বর্তমান যুগের আধুনিক প্রকৌশলী বিদ্যায়ও বিশেষত নৌকো, জাহাজ, সেতু, বিমান নির্মাণে বা জটিল স্থাপত্যের ক্ষেত্রে এই নাচির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
চাকা এবং চক্রনেমী (Wheel and Axle) (খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০)
মানবসভ্যতার ইতিহাসে খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ এক অবিস্মরণীয় সময়কাল। একটা যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে গোটা সভ্যতার আকাশে নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল তখন। জিনিসটা আর কিছুই নয়, চাকা। বিশ্ববাসী এক নতুন আর উন্নত সময়চক্রে প্রবেশ করে এই চাকার হাত ধরে। পৃথিবীর ছ’টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের মধ্যে চাকা হচ্ছে অন্যতম।
চাকা প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিল মেসোপটেমিয়ার এক মৃৎশিল্পীর হাত ধরে। দ্রুত আর অধিক গুণমানযুক্ত মৃৎপাত্র উৎপাদনে বিশেষ চিন্তাভাবনার ফসল এই চাকা আবিষ্কার। পরবর্তী সময়ে তা স্লেজগাড়িতে লাগিয়ে আর সাথে অক্ষধুরা বা চক্রনেমী যুক্ত করে অসমতল ভূমিতেও স্বচ্ছন্দ চলাফেরায় এক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিল মানুষ। প্রাচীনতম বিভিন্ন চিত্রলেখায় এর প্রমাণ মেলে। মেসোপটেমিয়ার সুমের অঞ্চলের উরুকে অবস্থিত চিত্রলেখায় কিছু চাকাযুক্ত আর কিছু চাকাবিহীন স্লেজগাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। মোটা গাছের গুঁড়ি থেকে চাকতি কেটে বের করে একটা আরেকটার সাথে চক্রনেমী দ্বারা যুক্ত করে দুটি কি তিনটি কাঠের তক্তা বিছিয়ে তৈরি করা হয়েছিল বিশ্বের প্রথম গাড়ি।
তবে মেসোপটেমিয়ার পাশাপাশি উত্তর ককেশাস এবং পোল্যান্ডে খুঁজে পাওয়া কিছু মৃৎপাত্রেও চাকার চিত্রের সন্ধান মেলে। সেখানে চারটি চাকা এবং দুটো চক্রনেমীযুক্ত বাহনের খোঁজ পাওয়া যায়। অবশ্য সর্বপ্রাচীন কাঠের চাকা এবং চক্রনেমীর সন্ধান মেলে স্লোভেনিয়ার রাজধানী লিউব্লিয়ানার ২০ কিমি দক্ষিণে ২০০২ সালে। রেডিও কার্বন পরীক্ষায় এর বয়স ৫১০০ থেকে ৫৩৫০ বছর বলে প্রমাণিত হয়। চাকাটি অ্যাশ এবং ওক কাঠের তৈরি ছিল আর এর ব্যাস ছিল ৭০ সেমি। পাশাপাশি চক্রনেমীটা ছিল ওক কাঠের আর এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২০ সেমি।
প্লাইউড (Plywood) (খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০)
ওপরে ও নিচে দুটো উৎকৃষ্ট গুণমানের পাতলা কাঠের তক্তার মধ্যবর্তী জায়গায় কিছু নিম্নমানের পুরু কাঠ আঠার সাহায্যে যুক্ত করে আধুনিক প্লাইউডের ব্যবহার মানুষ শিখে গিয়েছিল সেই ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বের কাছাকাছি সময়েই। প্লাইউডের দু’দিকে বিভিন্ন কারুকাজ করে তখনকার মানুষ নানাধরনের আসবাবপত্র বানাত। ৫০০০ বছর আগেই মানুষ বুঝতে পেরে গিয়েছিল যে প্লাইউড সাধারণ কাঠের মতো বেঁকিয়ে উঠে না। অঙ্ক বা জ্যামিতি সম্পর্কে অজ্ঞ এই আদিবাসীরা কিন্তু নিচের পাতলা কাঠের ওপর অন্যান্য টুকরো কাঠগুলো ঠিক ৯০ ডিগ্রি কোণ মেপেই আঠার সাহায্যে বসিয়ে দিত। ফলে এগুলো পরবর্তী সময়েও ঋজুই থাকত, বেঁকিয়ে উঠত না।
পিচ্ছিলকারক চর্বি (Lubricating Grease) (খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০)
চাকা এবং চক্রনেমী আবিষ্কারের ঠিক পর পরই মানুষের পিচ্ছিলকারক কোনও পদার্থেরও প্রয়োজন হয়ে পড়ল। কারণ, চাকা এবং চক্রনেমীর কাঠের অবিরাম ঘর্ষণে সেগুলো দিন দিন ক্ষয়ে যেতে শুরু করল। সেই ঘর্ষণ রোধ করতে প্রয়োজন যেকোনও একটা পিচ্ছিলকারক পদার্থের। প্রথমে মেসোপটেমিয়া এবং পরে গ্রিস ও রোমে তৈরি হল জলপাইয়ের নির্যাস থেকে প্রস্তুত তেল ও প্রাণীজ চর্বি মিশিয়ে একপ্রকারের কার্যকরী পিচ্ছিলকারক পদার্থ – আধুনিক কালের লুব্রিক্যাটিং গ্রীজ। এতে শুধু ঘর্ষণজনিত ক্ষয়ই রোধ হল না, বাহনের গতিও বৃদ্ধি পেল অকল্পনীয়ভাবে।
পাল (Sail) (খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০)
হাজার হাজার বছর ধরে জাহাজ বা নৌকোর পাল বায়ুকে যেন বর্মভূষিত করে আসছে। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০-এর নিকটবর্তী সময়েই বড়ো বড়ো নৌকো নীলনদের বুকে পাল তুলে জল কেটে বিচরণ করতে থাকে। নৌ-চালনার ক্ষেত্রে বায়ুর গতিবেগ পালের সাহায্যে কাজে লাগানোর বিদ্যা তখনকার সময়েই মিশরীয় আদিবাসীরা রপ্ত করে নিয়েছিল। উন্মোচিত হল এক নতুন দিক, নৌবিদ্যা। উন্নত হতে লাগল সে বিদ্যা সময়ের সাথে ধীরে ধীরে।
পশুবাহিত দু’চাকার গাড়ি (Cart) (খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০)
চাকা আবিষ্কারের সাথে সাথেই মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন তৈরির ধারণার উদ্ভব হতে লাগল দ্রুত। জীবনযাত্রাও সহজ হতে লাগল ক্রমশ। ছোটখাটো নানান জিনিসপত্র একস্থান থেকে অন্যস্থানে বহন করে নিয়ে যেতে হালকা ধরনের দু’চাকাবিশিষ্ট যান তৈরি হয়ে গেল অচিরেই। এগুলোকে সাধারণত গরু, মোষ, ঘোড়া, গাধা বা মেরু-কুকুর টেনে নিয়ে যেত। মেসোপটেমিয়ায় কাঠে খোদাই করা কিছু ফলকে এধরনের যানবাহনের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া ইউরোপে – জার্মানির কিয়েলে এবং পোল্যান্ডের ব্রোনোসিসে একটা বীকারে খোদিত চিত্রলেখায় বগি আকৃতির গাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এসব প্রমাণাদির বয়স প্রায় ৫৫০০ বছর বলে মনে করেন।
বীণাজাতীয় বাদ্যযন্ত্র (Bull Lyre) (খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০)
প্রাচীন ইরাকের সুমেরীয়রা প্রায় ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বে এই বিশেষ ধরনের বাদ্যযন্ত্রের উদ্ভাবন করে। সে অঞ্চলের রাজকীয় সমাধিক্ষেত্র খনন করে আলাদা আলাদা তিনটি বিশেষ ধরনের এই বাদ্যযন্ত্রের সন্ধান মেলে। প্রত্যেকটির স্বকীয় পরিচয় হিসেবে আলাদা আলাদা প্রাণীর মাথা লাগানো ছিল এই বাদ্যযন্ত্রগুলোতে। ষাঁড়ের মাথাযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ ছিল গুরুগম্ভীর। বকনা বাছুরের মাথাযুক্ত বীণার সপ্ত সুর আর পুরুষ হরিণের মাথাযুক্ত বাজনাটার আওয়াজ ছিল চড়া সুর। সবগুলোই ছিল কাঠের তৈরি। প্রথমটির উচ্চতা ছিল প্রায় ১.২ মিটার। এই বীণাজাতীয় বাদ্যযন্ত্রগুলোতে ওপর থেকে নিচে অবধি প্রায় ত্রিভুজ আকৃতি করে বেশ কয়েকটি টানটান সরু তার লাগানো ছিল।
এরপর আগামী সংখ্যায়